একজন কবি হলেন অধিকতর অনুশীলনকারী। তিনি তার শ্রোতা ও পাঠকের কাছ থেকে কোনো কারণে বিচ্ছিন্ন নয়। কবির ভাষা সাধারণত কথাবার্তা থেকে ভিন্নতর, কিন্তু তা একটি কথ্যভাষা, যা কবি এবং তার রসগ্রহিতাদের মধ্যকার একটি অভিন্ন ব্যাপার। তাদের চেয়ে এ ব্যাপারে কবি আরো সাবলিল, তবে এর একমাত্র কারণ কবি একজন সৃজনশীল মানুষ। সভ্য মানুষ অনেকাংশে প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সফল হয়েছে। কিন্তু তা সম্ভব হয়েছে তার সামাজিক সম্পর্কটি জটিল করে। আদিম সমাজ ছিল সরল, শ্রেণিহীন, প্রকৃতির বিরুদ্ধে দুর্বল হলেও একটি সম্মিলিত ঐক্যমোর্চা ছিল। সভ্য সমাজ হচ্ছে অধিকতর জটিল, উন্নততর, অধিকতর শক্তিশালী। কিন্তু এ সবের আকস্মিক শর্ত হিসাবেই সমাজ আজও অবধি-এর নিজের বিরুদ্ধেই বিভক্ত। সুতরাং সমাজ ও প্রকৃতির দ্বন্দ্ব যা হচ্ছে তা চাপা পড়েছে ব্যক্তি এবং সমাজে দ্বন্দ্বে যা হচ্ছে কবিতার ভিত্তি। অতীতের লিখিত সাহিত্যের বিশ্লেষণ দ্বারা আদিম কবিতার অনুশীলন সম্ভব নয়। কারণ প্রকৃতিগতভাবেই এগুলো অলিখিত, প্রাক-সাহিত্য যুগের। কেবলমাত্র কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে এগুলো লিপিবদ্ধ হয়েছিল। আজকের দিনে মানুষের মুখে মুখে এখনও যে অবস্থায় এইসব কবিতা বেঁচে আছে, অবশ্যই সেই অবস্থাতেই এগুলোকে বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে। কিন্তু এইসব লোকের সমাজ সম্পর্কে কিছু না জানলে তাদের কবিতা আমরা বুঝতে সক্ষম হবো না। তাছাড়া কবিতা হচ্ছে একটি বিশেষ ধরনের বাক প্রণালী। কবিতার উৎস বিচার করতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই সন্ধ্যান নিতে হবে বাক প্রণালীর উৎস্য বিষয়ে এবং এ কথা অর্থ হলো নিজের উৎস্য সন্ধান, কারণ বাক-প্রণালী হচ্ছে মানুষের একটি স্বাতন্ত্রসূচক বৈশিষ্ট্য। কবিতাকে যারা শুধুমাত্র কবিতা হিসেবেই উপভোগ করে তুষ্ট; তাদের কাছে এই পরিকল্পনা অনাকর্ষণীয় বলে মনে হতে পারে। কবিতাকে বিজ্ঞান সম্মতভাবে আলোচনা করলে তা বরং কম না হয়ে আরো বেশি উপভোগ্য হয়। কবিতাকে পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই বোঝা প্রয়োজন কবিতা কী এবং কবিতা কী বুঝতে হলে আমাদের অবশ্যই অনুসন্ধান করতে হবে এর জন্ম এবং বিকাশের কথা।
প্রাচীন গ্রীসের কবিতা সংগীতের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত। শুধু যন্ত্রসংগীত তথা বাক-বিবর্জিত সংগীত বলতে কিছুই ছিল না এবং প্রচুর সংখ্যক প্রকৃষ্ট কবিতা রচিত হয়েছিল যন্ত্র-সংগীতের অনুসঙ্গী হিসেবেই। আমাদের কবিতা হচ্ছে সাধারণ কথাবার্তার চেয়ে প্রয়াসসাধ্য, উচ্চমাত্রার সচেতন চিন্তার দাবিদার একটি লিখিত শিল্প। আরো পরিষ্কারভাবে বলা যায় কাব্য হচ্ছে এক ধরনের স্বপ্নজগৎ।
আধুনিক ইউরোপীয় কবিতার প্রধান তিনটি রূপ- গীতি কবিতা, মহাকাব্য এবং নাটক। এসবই বিকশিত হয়েছে গ্রিক প্রভাবে। বিকাশকালে তাদের আদিম বৈশিষ্ট্যই কিছু ছাট পড়েছে। এ্যারিস্টটল জানিয়েছেন যে, গ্রিক ট্রাজিডি বর্ণনা শুরু হয়েছিল একজন অভিনেতা দিয়ে এবং তিনি বলেছেন যে, আদিতে এই অংশটি অভিনীত হতো স্বয়ং কবির দ্বারাই। এই মতবাদ আমাদের ধারাবাহিকতার ক্রমটি পূর্ণ করে পুরোহিত কবি- অভিনেতা। একইসাথে একজন কবি প্রেরণাদীপ্ত। শিল্পবিপ্লবের সাথে সাথে সমস্ত সামান্তবাদী অবশেষগুলো চূড়ান্তভাবে অপসৃত হলো। কবিতা হলো পণ্য। আর কবি হলেন খোলা বাজারের জন্য উৎপাদনকারী, তার পণ্যের চাহিদা ক্রমশ নিম্নগামীতা হল। বিগত অর্ধ শতাব্দী ধরে ধনবাদ আর কোন প্রগতিশীল শক্তি নয়, বুর্জোয়াও নয় প্রগতিশীল শ্রেণি এবং তাই বুর্জোয়া সংস্কৃতি, কবিতাসহ হারিয়ে ফেলেছে তার প্রাণশক্তি। আমাদের কবিতা সমাজের মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী নামে পরিচিত ক্ষুদ্র এবং বিচ্ছিন্ন একটি শ্রেণির দ্বারা সৃষ্ট, যারা শাসক শ্রেণি দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হলেও একচেটিয়া ধনবাদের লৌহবেড়ি ভাঙবার একমাত্র শক্তি সর্বহারা জনতার সাথে হাত মেলাতে দ্বিধাগ্রস্ত এবং তাই বুর্জোয়া কবিতা সামাজিক পরিবর্তনের অন্তশীল শক্তির সাথে হারিয়েছে যোগ। বুর্জোয়া কবি যদি তার শিল্পকে পুনর্বিন্যাস করতে না শেখে, তাহলে শীঘ্রই সে তার কথা শোনাবার জন্য নিজেকে ছাড়া আর কাউকেই পাবে না।
কবিতা আদিতে ছিল একটি সামাজিক কর্ম, যাতে কবি এবং জনসাধারণ পরস্পর সম্মিলিত হয়। আমাদের কবিতা এখন মাত্রায় ব্যক্তিক হয়েছে যে, এটা এর উৎসের সাথে হারিয়ে ফেলেছে যোগ। ফলে এর শিকড় গেছে শুকিয়ে। তাই আজও আমরা সুদৃঢ় অতীতকালের জনপ্রিয় কবিতাগুলোকে নিয়ে আজ বেঁচে আছি। কী স্বপ্নে, কী জাগরণে কী বিপ্লবে, কী বিদ্রোহে। আর এর মধ্যদিয়েও অনেক তরুণ কবির কবিতা আমাদের সামনে উঁকি মারছে, হাতছানি দিচ্ছে বাক-বদলের।
এই প্রেক্ষাপটে আমি সাম্প্রতিককালে তরুণ কবি আশ্রাফ বাবু’র কবিতা নিয়ে কিছু আলোচনা করার চেষ্টা করবো লেখালেখির জগতে কবি আশ্রাফ বাবু মূলত কবিতাই লেখেন। ইতোমধ্যে তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ছয়টি 'ছায়াচিত্র' 'নিশিমন', 'মনের ছাপাখানা', 'ক্ষুধার কোনো ধর্ম নেই', 'আধারে মানচিত্র' এবং 'অন্য জীবন,'। এছাড়া তিনি 'বঙ্গে ও বৈশাখে' নামে একটি কবিতা সংকলন সম্পাদনা করেছেন। কাব্যচর্চার পাশাপাশি তিনি 'মাটি ও বাংলা' ও 'বনফড়িং' নামে দুটি লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করে থাকেন । কবির প্রকাশিত 'আঁধারে মানচিত্র' কাব্যগ্রন্থ পড়ার সৌভাগ্যে জানা গেল তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন বাংলাদেশের রাজবাড়ী জেলায়। তিনি ধন্য এ জেলায় জন্মগ্রহণ করে; কেননা বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী লেখক মীর মশাররফ হোসেন জন্মস্থানও এটি। মীর মশাররফ হোসেন এ জেলায় জন্মগ্রহণ করে বাংলা সাহিত্যাকাশে আলোকিত নক্ষত্র হয়ে ফুটে রয়েছেন। সেই আলোর ছোঁয়ায় কবি আশ্রাফ বাবু কতটুকু উজ্জ্বল হতে পেরেছেন তার কাব্যে আমি সেদিকটা দেখার চেষ্টা করবো।
কবি আশ্রাফ বাবুর 'আঁধারে মানচিত্র' গ্রন্থটি প্রকাশ হয় ২০২২ সালে। এ গ্রন্থের ফ্লাপে তিনি উল্লেখ করেছেন- 'যারা কায়িক শ্রমে দুনিয়া সাজায় তাদের জীবনে যে ঘাম ঝরে তা ধরা দেয় না সকলের। তাই আমি বিবেকের তাড়নায় সকলের মাঝে তুলে ধরার জন্য রচনা করলাম 'আঁধারের মানচিত্র'। মস্তিষ্ক এবং হৃদয়ের গভীরতা এবং চোখের যৌথতায় আমার লেখার উপলব্ধিতে আনার চেষ্টা করেছি কায়িক শ্রমিকের মানচিত্র। তিনি আরো লিখেছেন- ''মননে মাধুর্য অনেক। বুননে মূর্ছনা বাস্তবে' এই গৃহপালিত জীবন যাপনের কালেও সুখ স্বপ্ন ছোঁয়ায় আঁধারেই ঘাম ঝরাচ্ছে নির্দ্বিধায়। ছলচাতুরি সামাজিকতায় পিষ্ট হয়ে যাচ্ছে শর্তহীন ভাবে। জনপ্রান্তে কিংবা আঁধার পথেও আমরা জড়িয়ে নিচ্ছি কমসংখ্যক মাটির পৃথিবীর এই জীবন।''
কবির এই বক্তব্য থেকে আমরা বুঝতে পারি— জগত সংসারে যে এক শ্রেণির মানুষ আছে; যারা নিজেদের শ্রমটুকু সহায় সম্বল করে বেঁচে থাকে। বা বেঁচে থাকতে হয়। সমাজের এক বৃহৎ অংশ শ্রমিক শ্রেণি। যাঁদের বাদ দিয়ে সভ্য সমাজের একটা মুহূর্তও চলতে পারে না। সেই শ্রমিক শ্রেণির মানবেতর জীবন নিয়ে কবি আশ্রাফ বাবু'র হৃদয়ে দোলা লাগে। কম্পন সৃষ্টি হয়। তাই তিনি তাদের কথা তার কবিতায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন মনের মাধুরী দিয়ে আপন দক্ষতায়। কবি তার কাব্যগ্রন্থে লিখেছেন-
'অপার্থিব ধ্বনি আর সারি সারি জলকণ্ঠ
সমুদ্র বেয়েছে জীবন
মাটির সাথে সবুজের কাছাকাছি বেদনায় মিলেমিশে।
আকাশ দেখি সন্ন্যাসী মন বিযুক্ত হয়ে
মাটিতে মিলেমিশে রাত নামাই দিনশেষে
বাতাসের কাছে গিয়ে বসি, দেখা হয় না স্পর্শ করে।
দৃশ্যমান গঞ্জে নুনের দোকান
পরিবারের জন্য দেখেছি অনেক জীবন
গরম ভাতে স্বাদ বাড়াই,
ফেরার আছে ঘুমের আগে অর্থ-চিন্তায়
প্রয়োজনে হাঁটি গরম বালুর স্পর্শতায়'।
(জলকণ্ঠ জীবন-আঁধারে ঘামচিত্র।)
সরল শব্দ চয়নের মাধ্যমে কবি তার কবিতায় এভাবেই জীবন ঘনিষ্ঠ সময়ের বিবৃতি তুলে ধরেছেন। জীবনের চাওয়া পাওয়া ব্যাকরণ, আর না পাওয়ার বেদনা এখানে ফুটে উঠেছে নিবিরভাবে।
তার অন্য একটি কবিতায় তিনি লিখেছেন-
‘অক্লান্তভাবে উন্মোচিত হোক অনাগত দিনগুলো
সময় দেখি, ধরে রাখতে পারি না
লুকোচুরি খেলেছে মৃত্যুর সঙ্গে প্রতিটি কোনে
দেহের কথা ভুলে নব ভাবনায়, নবজীবন খোঁজে।
একসাথে তুমি বলতে পারো আছি
ছিল দিন-রাত কিংবা সন্ধ্যা
সময় শক্ত করে রেখেছি
আনন্দও ছিল এবং সময় সংক্ষিপ্ত।
কেউ একে হুকুম দিতে পারে নিশ্চিত মনোভাবে?
বহুদূরে নিয়ন্ত্রণ অসাধ্য
অতলে ভাসছে মন, দেওয়াল ভেদ করে যায়।
আলিঙ্গন করে বিশ্বকে
সূর্যের মতো প্রদীপ্ত শহরগুলো যখন সামনে প্রসারিত হয়
সত্য ও ন্যায়ের আলো-বাতাস স্নান করে’।
(সত্য ও ন্যায়ের আলো-বাতাস-আঁধারে ঘামচিত্র)
কবিরা সাধারণত ভাবুক প্নবাজ। স্বপ্নের সারথি বিছিয়ে তারা স্বপ্ন দেখে আগামীদিনের। তাই সমাজের কাছে তাদের প্রত্যাশা ঠিক তেমন। সময়ের আবাহনে যে দিন আসবে সামনে তার রকমফের কেমন হবে? কী নিয়ে হাজির হবে জীবনের একান্ত সময়গুলো তারই আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে কবির এই কবিতায়?
জীবনের পালাবদলের মুহূর্তগুলোকে মোকাবেলা করে সমাজে টিকে থাকার যে চেষ্টা, নতুন দিনের আয়োজন তার নির্মোহ সত্যতা মেনে নেয়াই পাথেয়। সেই আকাঙ্ক্ষা থেকে কবি তার ‘স্পর্ধা’ কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। তিনি নীল মেঘের ওপারে কী আছে তা ছুঁতে চান। ছুঁতে চায় তার মন। তিনি আবার নিজের কাছে প্রশ্ন করেছেন ‘আমরা কি পেয়েছি চূড়ায় পৌছাতে?’ কবির মনের অবস্থা, অসহায়ত্ব আর দোদুল্যমানতাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় মানুষ হিসেবে আমরা কতটা সীমাবদ্ধতায় বাস করি।
কবি আশ্রাফ বাবু’র ‘আঁধারে মানচিত্র’ কাব্যগ্রন্থের পাঠ পূর্বাপর আমার মনে হয়েছে। কবির দ্বিধাবিভক্ত মন পাড়ি জমিয়েছে এক অসীম আকাশের শূন্য ভেলায়। যেখান থেকে শুধু ভেসে বেড়ানো যায় আর অনুসন্ধানুৎসু মন শুধু কী যেন খোঁজে।
গ্রন্থের অন্য একটি কবিতা এরকম-
‘স্পষ্ট জবাব নেই আমাদের
ক্ষণেক্ষণে ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিই আমরা।
প্রতিদিন আমাদের নতুন দিন
সময়ের সঙ্গে নিজেদের বাজিয়ে নিই নতুন ছন্দে।
মানুষের মন মিশে যায় ঘরের দেওয়ালে
খুঁজে পায় অদৃশ্য রংতুলি
বারবার রঙিন করতে চায় নিজেদের সাহসী স্বপ্নগুলো।
নীল মেঘের ওপারে কী আছে তা ছুঁতে চায়
মন সকলের বিস্ময়ভরা চোখ
আমরা কি পেরেছি চূড়ায় পৌঁছাতে?
সুখের সফর অব্যাহত নাকি ছেদ পড়ছে কোথাও?
দুঃখ-সুখের জটিল বাঁক
হাতের বাইরে যেতে দেইনি কোনো প্রতিরোধ’।
(স্পর্ধা- আঁধারে ঘামচিত্র)
গ্রন্থের অন্য একটি কবিতা-
‘শুয়ে থাকা রাস্তাটা আমার অনেকদিনের চেনা-জানা
জীবন ভরে তার উপর ভর করে চলা
সকল গল্পের সাক্ষী, ছাউনি-টাউনি ছিল না
আকাশ-বাতাস দেখতে দেখতে শহরে ঢুকতে বলা
অনেক হেঁটেও ক্লান্তি আসে না।
যাদের পা পড়ে না, আলাদা করে চলা-
চলাচল যন্ত্রে অথবা গাড়িতে
অনেক ভেবেছিলাম সময়ের হাত ধরে বলা
গল্পের দুয়ার ছিল আধশোয়া ছাউনিতে।
ভেজা গায়ে আকাশতলে বৃষ্টিমাখা
মাটির গল্প পা জানে,
পথে যত ব্যস্ত গাঁয়ের ছন্দ দেখা
এখন কার ঠিকানা-প্রাণে’।
(ঘরের বাইরে মাটির পথে- আঁধারে ঘামচিত্র)
কবিতায় তিনি তার চিরচেনা জানা পথটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছেন। জীবনমাত্রার এ পথ তার সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। তিনি সবশেষ আশা ব্যক্ত করেছেন এভাবে যে- ক্ষণিকের অনুভুতিতে মাথা রেখে জীবনে একসময় বৃষ্টি নামবে। ভিজে যাবে মাটির উর্বর ভূমি। আর তখন তিনি পৌছে যাবেন কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে কোননা কোনভাবে। কবির এই যে পৌঁছে যাবার আকাঙ্ক্ষা এখানেই তার কবিতার পরম সার্থকতা ফুটিয়ে তুলেছেন। এর প্রকাশের মধ্য দিয়ে বলতে চেয়েছেন তিনি আশাবাদী। তিনি একদিন তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে যাবেন ঠিকই। কবির এই আশাবাদ পাঠকের নিকট আকর্ষিত হবে এবং কবির মাধ্যমে পাঠকেরাও আশাবাদী হয়ে উঠবেন।
তার আরো কিছু চমৎকার কবিতার কথা আমরা এখানে উল্লেখ করতে পারি, যেমন-
‘কিছু ভুল পুড়িয়ে ফেলে বিশ্বাস
কিছু স্পর্শ দম বন্ধ করে দেয় একাংশ
অনুশোচনা ভুল করে দেখো
অচেনা এক প্রাপ্তি নিজের কাছে রাখো।
অনেকের থেকে পাওয়া আশ্রয়
অচেনা গন্ধ ছড়ায়
আপন কিছুই নেই
অন্তহীন পথচলায়।
চলছি স্বপ্ন বুনে
ধরে আছি বুকের কোণে
অবিরত চির মর্মাহত
ভেসে ওঠে হৃদয়ের যন্ত্রণা যত’।
(হৃদয়ের আয়োজন- আঁধারে ঘামচিত্র)
কিংবা
‘একমুঠো ক্ষুধায় জল জড়িয়ে চোখ ভাসে
ক্ষুধার আগুন বাড়ায় রাষ্ট্রের সুস্বাদু বুলেটে!
আমার গায়ে, বুকের ক্ষত
আমার দামে কেনা লাশ হয়েছে যত।
পায়ে পিষে মারে মনের পচন দিয়ে
টিগার চাপার শক্তি পেয়েছে
আমার রক্তের টাকায়
আমার আজ অন্ধজীবন!’
(রাষ্ট্রের বুলেট-আঁধারে ঘামচিত্র)
অথবা
‘মৃদু বাতাসে দোল খাচ্ছে কাঁচা-পাকা ধান
দিগন্ত ছুঁয়ে গেছে সোনারঙের চাদরে
মৌ মৌ ঘ্রাণে পাকা ধানের আনন্দে
উঁকি দিচ্ছে রোদমাখা আদরে।
সবুজে সবুজে বিমুগ্ধ মন মাতায়
প্রাণ জুড়ায়, কাছে টানে
তোমার মাঝে লালসা আমার
ধূলিকণামাখা সোনারঙের ধানে।
ধান ভাঙার গান ভাসে বাতাসে
তালে তালে মুখর বাড়ির আঙিনা
তৈরি হবে পিঠা-ক্ষীর-পায়েস
কৃষকের ঘরে চলে জাগ্রত বন্দনা’।
(ধূলিকণামাখা সোনারঙের ধান- আঁধারে ঘামচিত্র)
উপরিল্লিখিত কবিতাগুলোতে কবির মনের বিভিন্ন ব্যঞ্জনা ও নানা অনুসঙ্গের সাথে আমরা পরিচিত হতে পেরেছি। এসকল কবিতায় তিনি দক্ষতার সাথে বিভিন্ন বিষয়ের দিকে দৃষ্টিপাত করতে সক্ষম হয়েছেন।
তার আরো একটি কবিতা-
‘রোদঝলসিত দুপুরের ছায়াসঙ্গম বেতঝাড় ঘেঁসে
কাঁটাঝোপের ভেতর থেকে ডাহুকের ডাক আসে
সাপের হিসফিস মাটির ফাটলে চেয়ে দেখা
শুকনো পাতায় খুঁজেছি কিংবা
পাতার আড়াল থেকে দূরে চেয়ে দেখা।
বাতাসের ঢেউগান ভেসে আসে ঘূর্ণিবায়ুর তোড়ে
হেঁটে দেখা সূর্য সমন্বিত একটি দিন তীব্র করে।
চারিদিক সেজেছে সবুজ ছায়াসঙ্গমে
মুক্ত করেছি ললাট গাছের ছায়ায়
মনে হয় বিপন্ন বিস্ময় জীবন আর তার প্রভূত শ্রমে’।
(প্রত্যাশা প্রকৃতির চেনা-জানা- আঁধারে ঘামচিত্র)
কবিতাটিতে কবি আশ্রাফ বাবু অতি সহজ ভাষায় গ্রামীণ নৈসর্গিক প্রকৃতির অপরূপ সময়কে তুলে ধরেছেন। তিনি রোদঝলসিত দুপুরের ছায়াসঙ্গম বেতঝাড় থেকে ডাহুকের ডাক শুনেছেন এবং অপরাপর মাটির ফাটলে বিষাক্ত সাপের অবস্থানকে অপূর্বভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন- ‘বাতাসের ঢেউগান ভেসে আসে ঘূর্ণিবায়ুর তোড়ে/ হেঁটে দেখা সূর্য সমন্বিত একটি দিন তীব্র করে’।
শব্দের অপার বন্ধন তার প্রকাশভঙ্গিকে সহজ সরল অভিব্যক্তিই ব্যক্ত করে। যা পাঠকের বুঝবার বা কবিতার রস আস্বাদন করবার জন্য উপযুক্ত হিসেবে উপস্থাপিত।
কাব্যগ্রন্থের নামে একটি কবিতায় আমরা দেখতে পাই-
‘সারাদিন ধরে ভাঁজে ভাঁজে ঘাম ঝড়ে মুখে ঢুকে যায়
আয়নার সামনে গিয়ে মুখ ধোয়ার জায়গা নাই
নগরীর নির্যাতন নীরবে আমাকে পুড়িয়ে দিয়ে যায়
চোখ ফেরাবে অন্যদিকে আমি শীতল ভাপে তপ্ত হব।
আমার চোখের ভাঁজে
মৃদুস্বরে দুলতে থাকে বহুদূরে পুড়ছি তীব্র তাপে।
অদৃশ্য কেউ যেন চেপে ধরছে টুটি।
চুল্লির আগুন নিভে গিয়ে জমছে ছাই আমার মাঝে
চোখের জলের ফোঁটা ফোঁটা নোনা ক্ষার’।
(আঁধারে ঘামচিত্র- আঁধারে ঘামচিত্র)
কবিতার মানচিত্র তুলে ধরতে তিনি লিখেছেন ‘সারাদিন ধরে ভাঁজে ভাঁজে ঘাম ঝরে মুখে ঢুকে যায়/ আয়নার সামনে গিয়ে মুখ ধোয়ার জায়গা নাই’ অথবা ‘দাপিয়ে বেড়াচ্ছে নিরুপায় হয়ে কেউ কেউ খুঁজে পাচ্ছে জীবন যাপনের প্রণোদনা। অদৃশ্য কেউ যেন চেপে ধরছে/ পুড়ছি মৃত্যুর টানে/ আঁধার মায়ায় জড়িয়ে থাকে আমার প্রাণে’-ই কথাগুলোর মধ্যেই যেন কবি তার কাব্যগ্রন্থের মূলকথা বলতে বা বোঝাতে চেষ্টা করেছেন।
তার ‘আঁধারে ঘামচিত্র' কাব্যগ্রন্থের কবিতা পাঠ করে আমার মনে হয়েছে- কবিতাগুলোর রূপ-রস বেশ উজ্জ্বল ও বিচিত্র ভাবনার। এর গতি গিয়েছে নির্দিষ্ট একটি পথে। যে পথ ভিন্নস্বরের। অবধারিত সে স্বর নিম্নস্বরের। নিমজ্জিত নদী যেমন, ক্লান্তকরা বিকেল যেমন আর গোধুলীরঙা সন্ধ্যা যেমন। কখনো কখনো যা আলো-আঁধারের মধ্যে দিয়েও প্রস্ফুটিত আলো ছড়ায়; যে আলোয় পথ রচিত হয় আগামীর ভোর। সূর্যদয়ের নতুন সকাল।
কবি আশ্রাফ বাবু'র কবিতায় তেমনিভাবে সকাল আসুক, আসুক প্রান্তিক জীবনের সোনালী ভোর। তার মনের মাধুরী দিয়ে সেই সকল মানুষের জীবনচিত্রের ছবি আঁকা হোক যেখানে থাকবে সংখ্যাগরিষ্ঠ সুবিধাবঞ্জিত মানুষের জীবনকথা।
অলংকরণঃ তাইফ আদনান
