কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহান-এর গল্প সমগ্র-১ যূথবদ্ধ গল্পের মধ্যে ‘পথ, হে পথ’ একটি অনন্য গল্পপ্রন্থ। অনন্য নামকরণ। অসাধারণ কিছু গল্প অঙ্কিত করেছে-যা পাঠক মহলকে আকৃষ্ট করবে- গ্রন্থ নাম করণে যেমন পাণ্ডিত্য দেখিছেন তেমন গল্পের নাম নামকরণে দেখিয়েছেন মুন্সীয়ানা। ‘পথ, হে পথ’ গল্পগ্রন্থটি আলোচনার পথে আমাকে নামতে বাধ্য করেছে।
ছোট গল্প হলো একটি সংক্ষিপ্ত, কাল্পনিক গদ্য আখ্যান যা একটি উপন্যাসের চেয়ে অনেক ছোট হয় এবং সাধারণত সীমিত সংখ্যক চরিত্র নিয়ে গঠিত। এতে জীবনের একটি খণ্ডাংশকে ফুটিয়ে তোলা হয়, যা বাহুল্যবর্জিত, রসঘন এবং নিবিড় হয়ে থাকে। ছোট গল্পের প্রারম্ভ ও প্রেক্ষাপট প্রায়শই নাটকীয় হয় এবং এর মূল লক্ষ্য থাকে একটি একক অনুভূতি বা মুহূর্তকে পাঠকের কাছে তুলে ধরা।
কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহান তাঁর প্রতিটি গল্পেই একটি প্রধান চরিত্রকে কেন্দ্র করে আবর্তিত করেছেন। প্রতিটি গল্পের অনুভূতি ভিন্ন এই অনুভূতি বা মুহূর্ত পাঠককে আলাদা করে ভাবনার জগতে কল্পনার জগতে নিয়ে যাবে। যে পাঠকের কল্পনা শক্তি যত প্রখর সে পাঠক তত বেশি সফল। নাসরীন জাহানের গল্প পাঠকে আরো বেশি আকৃষ্ট করবে কারণ তাঁর প্রতিটি গল্পেই একটা নাটকীয়তা আছে। নাটকীয়তা পাঠককে গল্পের গভীরে ডুবিয়ে রাখে। পাঠক গল্প শেষ না করে আর উঠতে পারে না। নাটকীয়তাই ছোট গল্পের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। নাসরীন জাহানের ‘পথ, হে পথ’ গল্পগ্রন্থে ছোট গল্পের সকল উপাধান বিদ্যমান।
নাসরীন জাহান এ সময়কার একজন জনপ্রিয় সাহিত্যিক। তিনি তাঁর চমৎকার ভাবনা চিন্তা চেতনার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে শব্দের সঙ্গে শব্দের মিলন ঘটাতে বেশ পারদর্শীতার পরিচয় দিয়েছেন, বাংলা সাহিত্যে নাসরীন জাহান একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র তাঁর লেখা বাংলাসাহিত্য জ্বল জ্বল করে জ্বলতে থাকবে যতকাল বাংলাসাহিত্যে টিকে থাকবে। কত সভ্যতা এলো আর গেল। আমাদের এই বিশ্বসভ্যতা কতকাল টিকে থাকে তা কে জানে। কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহানের ‘পথ, হে পথ’-এ মোট ৬টি গল্প গ্রন্থিত হয়েছে।
১। অনুসরণ
২। শিবমন্দির
৩। মাটির আদম
৪। একটি অসীম মুহূর্ত
৫। পাখিওয়ালা
৬। পথ, হে পথ
অনুসরণ
অনুসরণ গল্পে একটি যুবকের অস্বাভাবিক কাল্পনিক উদ্ভট চিন্তাকে কেন্দ্র করে এগিয়ে চলে। অনুসরণ গল্পের নায়ক নিজেই কল্পনার ছবি আঁকে। শহরে নিমার্ণ কারে সিঁড়িহীন চোদ্দতলা বিল্ডিং যেখানে সে শীর্ষে উঠে আবার নিচে নেমে আসে। যুবক সব সময় অনুধাবন করে কেউ একজন তার পিছু হাঁটছে- তো হাঁটছে তাকে অনুসরণ করে- চৌদ্দতলা বিল্ডিংটি দেখতে সরু লম্বা গাছের মতো- সুরু বিল্ডিং বা সুতার মতো চূড়ায় দাঁড়িয়ে সে প্রকৃতিকে উপভোগ করে। গল্পের যুবক কখনো সাহসী হয়ে উঠে আবার কখনো ভয়ে কুঁকড়ে যায়। অনুসরণ গল্প, রহস্যে মোড়ানো। মোড়ক খোলার দায়িত্ব লেখক পাঠকের হাতে তুলে দিয়েছেন।
***অনুসরণ গল্পে লেখক একটি ঘরের অসধারণ বর্ণনা করেছেন এভাবে, ‘বিচ্ছিন্ন চিন্তা আর ভাবনার তালে তালে পুরো ঘরটি দুলছে। শরীরও দুলছে। সর্বোপরি সেই দোলনার ওপর নিজেকে ছেড়ে দেয়া ছাড়া তার আর পথ থাকে না। ঠাণ্ডা হাওয়া এসে ছোট্ট ঘরটাকে কোলে তুলে নিয়েছে।’
তাছাড়া, একটি শহরকে বিশেষ বিশেষণে বিশেষায়িত করেছেন, ‘রোদে ভাজা শহর’।
গল্পে অসাধারণ গতিময়তা লক্ষ করা যায়। এত গতিময়তার মধ্যে লেখক পাঠককে অত্যন্ত সুকৌশলে ভাবনার অন্তরজালে বন্দী করেন। পাঠকের জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে কিছুটা সময় লাগে। তবে ফাঁকিবাজ পাঠক ভাবনার অন্তরজালের আশে পাশে না ঘেঁষে গল্পের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাবে।
শিবমন্দির
কথিত আছে অনেক সোনাদানা হীরা জহরতের পাত্র শিবমন্দির- মন্দিরের মাঝখানে, মন্দিরের বেদিতে বসে পাহারা দিচ্ছে- বিষধর সাপ, জীন, পরী আর দেও-দানব। রাতের বেলায় তো শিবমন্দিরে কাছে কেউ ঘেঁষে না- পুরনো দেয়াল শ্যাওলা জমে আছে। লতাপাতায় মোড়ানো পুরনো মন্দির- সংসার নিষ্ঠুর পেষণ যন্ত্রে নিষ্পেষিত কাদের আলী রাতের অন্ধকারে যায় শিব মন্দিরে। সোনা দানা মুক্তা মানিকের লোভে। কাদের আলী যখন শ্বেতকরবী গাছের নিচ দিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করছিল তখন সে প্রণামের ভঙ্গিতে উপড় হয় সঙ্গে সঙ্গে তার ধার্মিক বাবার মুখ ভেসে উঠে। একদিকে তার মন্দিরের ভেতরকার সোনা ও তার হাড্ডিসার স্ত্রী ও ক্ষুধার্ত সন্তান অন্যদিকে তার পিতা এবং তার ধর্ম। স্ত্রী সন্তানে কথা চিন্তা করেই শ্বতকরবী গাছের নিচে দাঁড়িয় প্রণাম করে সে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। রাতের অন্ধকারে শিবমন্দিরে যাওয়ার পর কাদের আলীকে রাশি রাশি সাপ দংশন করে। সে তার পা চালাতে পারে না। সে চোখ বুঝে রাতের অন্ধকারে বসে থাকে। সকাল হলে কাদের আলী চোখ মেলে দেখে সে বেঁচে আছে। সে নতুন জীবনে ফিরে আসে। গল্পটি ভৌতিক আলোচনা বলা চলে। অসাধারণ একটি গল্প- তাছাড়া গল্পটিতে হিন্দু মুসলিমের ধর্মীয় দ্বন্দ্বকে অল্প কথায় তুলে এনেছেন।
***শিবমন্দির গল্পে কাদের আলীর স্ত্রী দুঃখ কষ্টে জর্জরিত একজন গ্রামীণ গৃহবধুর প্রতিচ্ছবি। এই গল্পে লেখক কাদের আলীর অনুভূতি এবং তার স্ত্রীকে এভাবে বর্ণনা করেছেন, ‘আশৈশব এই মন্দিরটি, মন্দিরের রহস্য, সর্পযুগল, সর্বোপরি সেই সোনার হাঁড়িটির স্বপ্ন কাদের আলীর হাড্ডি, মজ্জা, রক্তস্রোতের সাথে মিশে আছে। যখনই স্ত্রীর শরীরে ঘিন ঘিনে ঘামের পুরুষালী গন্ধ অথবা তার শুকনো স্তন নিয়ে গুতোগুড়ি করছে হাড্ডিসার সন্তান, প্রতিনিয়ত তাকে এইসব দৃশ্যের মুখোমুখি হতে হতো, তার কোমল স্নিগ্ধ স্ত্রীকে সংসারের নিষ্ঠুর পেষণে হয়ে উঠতে দেখত খনখনে, কর্কশ- তখনই তার বাঁচার স্পৃহা ফুরিয়ে যেত।’
শিবমন্দিরের উপর আকাশের বিবরণ দিতে লেখক লিখেছেন, ‘ভাঙ্গা মন্দিরের মাথায় কুঁচকানো ছেঁড়া কাগজের মতো এক টুকরো আকাশ’
মন্দিরের আধভাঙ্গা ইটগুলোকে দাঁতের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ‘কাদের আলী বাঁ হাত দিয়ে পিঁপড়ের সারি কচলে কচলে ভাঙ্গা মন্দিরের দাঁত ভাঙ্গা দেয়ালে ভর দিয়ে কোনো রকমে বাহিরে বের হয়ে আসে।’
গল্পটি ভৌতিক এবং নীরব ধর্মীয় দ্বান্দ্বিকতার প্রেক্ষিতে অনন্য নির্মাণ। গল্পের নায়ক কাদের আলী যেন সত্যিকার অর্থে গল্পের প্রাণ। তার অসাধারণ সাহসীকতাতেই প্রমাণ হলো মন্দিরে সোনা দানা বলতে কিছু নেই আছে শুধু কিছু ভূত পেত্নী। আর কিছু বন্য জীব জন্তু। তবে গল্পটি যেখানে শেষ হওয়ার কথা লেখক সেখানে শেষ না করে চাটুর্য্য মশাইয়ের প্রাঙ্গণ এবং পূনরায় বনে বাদাড়ে পাঠকদের হাঁটালেন।
মাটির আদম
কথা সাহিত্যিক নাসরীন জাহান এর গল্পগ্রন্থ ‘পথ, হে পথ’ এ গ্রন্থিত গল্প ‘মাটির আদম’। গল্পটিতে আদম সন্তানের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। বর্তমান সমাজে বৃদ্ধ পিতা মাতার প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল হতে পারি না। পিতা মাতার প্রতি অমানবিক আচরণ অবহেলা অবজ্ঞার মাত্রা যেন দিনদিন বাড়িয়ে দিচ্ছি। এমনই একটি বিষয় লেখক অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন।
গল্পটিতে কাল্লু নামের একজন বৃদ্ধের অবহেলায় অযত্নে প্রাণ যায় যায়। জীবন অথবা ভুবনের প্রতি বিন্দু মাত্র আকর্ষণ নেই। প্রতিদিন তিনি তার পরিবার পরিজনদের জিজ্ঞেস করেন ‘আমি কবে মারা যাব? আমাকে কবর দেবে কোথায়? এসব প্রশ্ন তার নিত্যদিনের, কিন্তু তিনি কোনো উত্তর পাচ্ছেন না। বৃদ্ধের স্বজনরাও বৃদ্ধের মৃত্যুর অপেক্ষা করতে করতে একেবারে অতিষ্ঠ। একদিন তার স্বজনরা তাকে এক নির্জন বনে একটি কুঠিরে ফেলে আসে আধমরা অবস্থায়। বৃদ্ধ ক্ষুধার যন্ত্রণা আর যেন টিকতে পারছে না। কুঠিরের মেঝোতে একটি ব্যাঙ লাফাচ্ছে দেখে বৃদ্ধ তার সমস্ত শক্তি ব্যয় করে ব্যাঙের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল নিজের প্রাণ রক্ষা করার জন্য। এভাবে ব্যাঙ তার খাদ্যাভ্যাসে পরিণত হয়। কাল্লু শরীরে শক্তি ফিরে পায়। দিনে দিনে কাল্লু সুস্থ হয়ে উঠে দিব্যি হাঁটা চলা করতে পারে। ঝুলে থাকা ভাঁজ করা চামড়া সতেজ হতে শুরু করেছে। ফ্যাকাসে মুখ উজ্জ্বল হতে শুরু করল। বৃদ্ধ কাল্লু যেন আর বৃদ্ধ নয়। দূরে দোকানে যাতায়াত করে।
একদিন একটি বিড়াল ঘরে প্রবেশ করা মাত্রই কাল্লু বিড়ালটি ধরে আগুনে ঝলসে খায়। ক্ষুধার কাছে কোনো কিছু যেন আর অখাদ্য নয়। সকল অখাদ্যকে খাদ্যে পরিণত করেছে কাল্লু। এভাবে অনেক প্রাণী তার খাদ্যের তালিকায় স্থান পায়। যে কাল্লু একদিন মৃত্যুর অপেক্ষায় প্রহর গুনত সে কাল্লুর জীবনের প্রতি প্রবল আসক্তি বাড়ে। তার আয়ু কেবল বাড়ছে। কাল্লু কেবল হাসে আর হাসে। একদিন কাল্লু হাসতে হাসতে নিজের কবর নিজেই খুঁড়ে রাখে।
গল্পটিতে পরনির্ভরতা পরিহার করা এবং স্বনির্ভর হওয়ার তাগিদ লক্ষ করা যায়।
***মাটির আদম গল্পটি অত্যন্ত হৃদয় স্পর্শী একটি গল্প। গল্পটির প্রতিটি বাক্যে প্রতিটি শব্দ একজন পাঠকের হৃদয় জয় করে নিতে বাধ্য। গল্পটি অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং খুবই বেদনাদায়ক। তবে গল্পের প্রধান চরিত্র তথা একক চরিত্রে গল্পটি আবর্তিত। একক চরিত্র বৃদ্ধ কাল্লুই পাঠকে কবর পর্যন্ত নিয়ে যেতে বাধ্য করে যে কবর কাল্লু নিজের জন্য নিজেই খুঁড়েছিল। ‘পথ, হে পথ’ গল্পগ্রন্থের মধ্য গ্রন্থিত ‘মাটির আদম’ গল্পটি লেখিকার এক অনন্য উন্নত সৃষ্টি।
কাল্লুর বর্ণনা দিতে গিয়ে গল্পকার লিখেছেন, ‘আজব বটে তার চেহারা। মাথার লোমওয়ালা টুপি ফুঁড়ে বিটকেলে সাদা জটা চুল ভুরুর ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। ভুরুর লম্বা চুল প্রায় ঢেকে রেখেছে ফ্যাকাশে চোখ দু’টো। কপালে রাজ্যির স্রোত। সেই স্রোত তরঙ্গিত হয়ে সারা শরীর কুঁকড়ে রেখেছে। সবচেয়ে বিদঘুটে চোখে পড়ার মতো একটি জিনিসই- তার নাক। এক কালে এই নাকটির বেশ খ্যাতি ছিল। ‘নেকো কালু’ বললে সবাই চিনত। থুতনি দু’টো কুঁচকানো গালের তলায়। কী গাল! তার ওপরে আবার মেচেতার দাগ। শরীরের তুলনায় ভয়ঙ্কর সরু হাত-পা। সবচেয়ে সুন্দর দাঁত। শেষ বয়সেও ভীষণ শক্তিশালী। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। বাবার এরকম ছিল। শুনেছে দাদারও এবং মুশকিল ওই দাঁতগুলো নিয়েই।’ এমন অনন্য উচ্চতর শক্তিশালী লেখা পাঠককে টানবে এটাই স্বাভাবিক। একজন লেখকের শব্দ গাথুনির কৌশলই তার লেখাকে পাঠকের হৃদয়ে গেথে দিতে পারে। এই গল্পের লেখক তা শতভাগ পেরেছেন। তিনি সফল হয়েছেন বলে আমি মনে করি।
একটি অসীম মূহুর্ত
গল্পটি একটি অসাধারণ অমর প্রেমের গল্প। এ গল্পের নায়িকা তথা গল্প কথিকা নিজেই সাবলীলভাবে অত্যন্ত নির্ভয়ে তিনি তার প্রেম উপাখ্যান বর্ণনা করেছেন। এই গল্পের নায়িকার বয়স মাত্র ষোলো বছর। গল্পের নায়িকার মননে মগজে পুরুষ সংস্পর্শ এবং মধুর চুম্বনে তীব্র আকাঙ্ক্ষা জন্মে। এই তীব্র আকাঙ্ক্ষা জন্ম দেয় আরো একটি ভ্রুণের আরো একটি পরিপূর্ণ মানব সন্তানের। কথিকা যখন বুঝতে পারেন তিনি মা হতে চলেছেন। তখন তার অস্থিরতা বেড়ে যায়। তিনি বিষয়টি তার প্রেমিক মহাশয়কে জ্ঞাত করেন। বিষয়টি প্রেমিক মহাশয় জানার পর পরই প্রেমিকাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। গল্প কথিকা নিজেই উদ্যোগী হয়ে সময় বেঁধে দিয়ে প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করতে যান রেস্তোরাঁয়। প্রেমিক মহাশয় সময় মতো আসেননি। অনেক দেরিতে এসে প্রেমিকাকে বললেন, ‘কেউ যখন মিনিট ধরে সময় বেঁধে দেয়, তখন মনে করতে হবে, সে তার উপর নিজের প্রভাব খাটাতে চাইছে।’ এর অর্থ হচ্ছে প্রেমিক আর প্রভাবিত হতে চান না। প্রভাবিত হয়ে অধরে চুম্বন আঁকতে চান না। তিনি এখন দূরত্ব বজায় রাখতে বেশি পছন্দ করেন। দূরত্ব বজায় রেখে তিনি চলতে থাকলেন। এদিকে অসহায় প্রেমিকা, গর্বিত জননী প্রথম সন্তান ধারণের আনন্দে আত্মহারা নিজের পেটে হাত স্পর্শ করে সন্তানকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে প্রশান্তি যেন তার। অন্যদিকে প্রেমিক তথা পিতার এ বিষয়ে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তার গর্ব নেই আনন্দ নেই দুঃখ নেই লজ্জা ও নেই। সমাজ সংসারকে পায়ে দলে চলতে পারে পুরুষ। পুরুষ সমাজ তৈরি করে কী শুধু নারীদের জন্য? সমস্ত ভয় লজ্জা আর জবাবদিহিতা শুধু নারীর? পুরুষের কোনো দায় ভার নেই! পুরুষ শুধু ভোগ করবে। তার কোনো দায়ভার নেই। আহা নারী জীবন! এভাবে বেশ কিছুদিন চলতে থাকে। অনাগত সন্তানের অপেক্ষায় মা দিন গুনছেন। এর মধ্যে একদিন প্রেমিক ছুটে আসেন তার দায়ভার নিতে। সন্তানের কাছাকাছি থাকার জন্য। আহা প্রেম! আহা ভালোবাসা! আহা কী মোহমায়া!
***একটি অসীম মুহূর্ত গল্পটি একটি প্রেমের গল্প। এই গল্পে একজন প্রেমিকার প্রেমিক স্পর্শের অনুভূতি এবং গভর্বতী হওয়ার অসীম আনন্দ অত্যন্ত যত্নসহকারে লেখক তাঁর লেখনিতে তুলে ধরেছেন। একজন প্রেমিকার অভিব্যক্তি এভাবে প্রকাশ করলেন, ‘যথারীতি মাস শেষ হলেই আমি ঋতুবতী হয়েছিলাম। কিন্তু আমার কাছে সেটা কোনো ব্যাপার না। অন্য হাজার পুরুষের সাথে তার কোনো তুলনা হয় না। সে অনন্য, অন্য রকম। তার দুর্লভ স্পর্শও অন্য রকম। সেই অন্য রকম চুম্বনের এক মুহূর্ত পরই যে সন্তানের বীজ আমার ভেতর সংস্থাপিত হলো, তার পরের প্রকৃতি অন্যসব অন্তঃসত্তা মহিলাদের মতো হতেই পারে না।’
এখানে ‘সন্তানের বীজ’না লিখে ‘বীজসন্তান’ অথবা, ‘বীজাণু’ লিখতে পারতেন।
পাপপুণ্য নিয়ে একটি চমৎকার উপস্থপনা অথবা যুক্তি তিনি দাঁড় করিয়েছেন গল্পের নায়কের ভাষ্যে। যা এরকম, ‘একদিন পাপপুণ্যের তর্কের সময়, আমাকে বলেছিল- যা জানাজানি হয় তা-ই পাপ। খুব গোপনে একান্ত একা যদি কোনো কিছুতে সুখ পাও- তা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করাও আরেক পাপ।’
যুক্তি যাই হোক না কেন তবে আমার নিকট যৌক্তিক মনে হয়েছে। যদি না আমরা ধর্মকে এখানে টেনে না আনি।
পুরুষের সংস্পর্শে একজন নারীর শারীরিক এবং মানসিক উচ্ছ্বাস কতখানি প্রখর তা লেখক গল্পের নায়িকার অনুভূতির মাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন এভাবে,
‘তার স্পর্শে জ্বরতপ্ত হয়ে উঠেছি। আমার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত সুখের উচ্ছ্বাসে কাঁপতে থাকে। মনে পড়ে যায়, সেই স্পর্শে আমি গর্ভবতী হয়েছি। অনন্তকাল এই স্পর্শ আমি আমার গর্ভে লালন করব। মানুষের তৃষ্ণা যখন প্রবল হয়, তখন যদি তাকে এক চিমটি জল দেয়া হয় তবে তার তৃষ্ণা প্রবলতর হয়। একথা যদি ঠিক হয়, তবে তার স্পর্শে এই যে আমার পরিপূর্ণতা সেটা একটি বিস্ময়কর ব্যাপার, কিন্তু স্রেফ চুম্বনের তীব্রতায় যদি অনন্তকালের জন্য একটি দেহে একটি সন্তানের জন্ম ঘটে, তার জন্য আর কি কোনো তৃষ্ণা অপেক্ষা করে?’
সত্যি একজন নারীর জন্য আর কোনো তৃষ্ণা অপেক্ষা করতে পারে না। অসাধারণ একটি প্রেমের গল্প এটি পাঠকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করবে। গল্পটি দুটি চরিত্রকে কেন্দ্র করে তরতর করে সমুখে এগিয়েছে। গল্পের ভাষা বেশ প্রাঞ্জল। পাঠককে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাবে। এক কথায় অসাধারণ।
পাখিওয়ালা
পাখিওয়ালা গল্পে বাড়ির বৃদ্ধ অনেক দামী অনন্য সুন্দর একটি পাখি পোষেণ খাঁচায়। তার বাড়িতে এক বৃদ্ধ ভিখারি আসেন। পাখির প্রতি ভিখারির বড় লোভ হয়। পাখির সৌন্দর্যে ভিখারির লোভ নেই তবে পাখির প্রতি তার লোভ। যখনই সে আসে তখনই সে পাখির দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে তার যেন আর চোখের পলক পড়ে না। পাখিটিকে শুধু দেখে দেখে চলে যায় কাউকে কিছু বলে না। বাড়ির বৃদ্ধ ঠিকই বুঝতে পেরেছন পাখিটি ভিখারির ভীষণ পছন্দ হয়েছে। বাড়ির বুড়ো খুব যত্ন করে পাখিটিকে লালন পালন করেন তার সন্তানের মতো করে। বাড়ির সমস্ত চাকর বাকর সবাই পাখির প্রতি যত্নশীল। একদিন বুড়ো খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি চিন্তা করলেন পাখিটি ভিখারির কাছে থাকলে বেশ নিরাপদে থাকবে কারণ ভিখারি পাখিটিকে বেশ পছন্দ করে। তাই তিনি বাড়ির লোকদের আদেশ করলেন পাখিটি ভিখারিকে দিয়ে দেওয়ার জন্য। বাড়ির লোকজন কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না। কারণ বাড়ি অন্যান্য দামী বস্তু বা মানুষের মতো পাখিটিকে তারা ভালোবাসে। শেষ পর্যন্ত বৃদ্ধের আদেশে বাড়ির লোকেরা দামী সুন্দর পাখিটি ভিখারির হাতে তুলে দেয়।
ভিখারি পাখিটিকে হাতে পেয়ে পরম আয়েশ সে পাখিটির মাংসের স্বাদ নিতে লাগলেন। পাখির সৌন্দর্যের প্রতি ভিখারির লোভ ছিল না লোভ তার মাংসের। বৃদ্ধ ভুল মানুষের হাতে তার প্রিয় পাখিটি তুলে দিলেন। এই গল্পে বুঝানো হয়েছে যে কোনো ব্যক্তি বা বিষয়ে ভালোভাবে না জেনে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া একদম ঠিক নয়।
***পাখিওয়ালা গল্পটি দারুণ একটি গল্প। গল্পে পাখি নিয়ে বৃদ্ধে ভাবনা আর ভিখারী মাংস লোলুপ আকাঙ্ক্ষা এবং পাখির ছটপটানি লেখক এভাবে বর্ণনা করেছেন, ‘পাখির প্রতিও সবার চোখ ছিল। তাদের ভেতর উষ্ণ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
ঘোরে পড়া মানুষের মতো তার শেষ বার্তা জানান বৃদ্ধ- দিয়ে দিস... দিয়ে দিস।
ধোঁয়াটে সন্ধ্যায় মন্থর গতিতে হেঁটে আসে সারাক্ষণ বিড়বিড় করে পথ চলা অদ্ভুত ভিখিরিটি। তারও স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছে। দু’পা হাঁটতে গেলে তিনগুণ হাঁপাতে হয়। এরপরও প্রতিদিনের টানে সে এসে দাঁড়ায় সেই বিশাল গেটের সামনে। ভেতরে ঢুকে দেখে, আশ্চর্য! আজ বারান্দা শূন্য।
যাব না- যাব না- পাখিটি যেন ভেতর থেকে এইভাবে আর্তনাদ করছে।
খাঁচাসহ এক ঝাঁক চোখের সামনে পাঠান ওকে বারান্দায় নিয়ে আসে। চোখ থেকে ঝর ঝর বের হতে থাকা জল উল্টো হাতে মুছে সে কৃপণ হাতে খাঁচাটা বাড়িয়ে দেয় ভিক্ষুকের দিকে- নে, তোর কপাল ভালা, এর যত্ন করিস- বলতে বলতে তার কণ্ঠ বুজে আসে।’
এমন নিখাদ নিরেট বাস্তবতাবাদী বর্ণনা করা খুব কঠিন। খুব কমসংখ্যক লেখকের দ্বারা এমন বর্ণনা সম্ভব। তাদেরই একজন নাসরীন জাহান।
‘পথ, হে পথ’
একটি জটিল গল্প তবে লেখক অত্যন্ত সহজ সরল ভাষায় গল্পের শারীরিক কাঠামো তৈরি করেছেন। উক্ত গল্পে একটি দাম্পত্য জীবনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। গল্প কথিকা নিজেই তার দাম্পত্য জীবনের সুখ দুঃখ ব্যথা বেদনা বর্ণনা করেছেন অত্যন্ত নিপুণভাবে। গল্প কথিকা নিজেই দাম্পত্য জীবনে প্রবেশের পূর্বে অনেকের সঙ্গেই সম্পর্কে জড়িয়েছেন। গল্প কথিকার স্বামীও একই রকমভাবে সম্পর্কে জড়িয়েছেন। গল্প কথিকার স্বামী যেমন ঘরে স্ত্রীকে রেখে হৃদয় রাজ্যে প্রাক্তনদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন। অন্তর জ্বালায় জ্বলে পুড়ে মরছেন। মরণ যন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য নিজেক এবং সংসারকে ভুলে থাকার জন্য নিয়মিত মদ্যপানে ব্যস্ত থাকেন। অন্যদিকে গল্প কথিকাও নিজেকে এবং সংসারকে ভুলে থাকার জন্য কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যান। তিনি তার কল্পনার রাজ্যে নতুন করে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেন। যেখানে তিনি তার প্রাক্তনদের নিয়ে নতুন করে ঘর সাজাবেন। ঘরের আসবাবপত্র যেমন করে মানুষ সাজিয়ে রাখে। তবে গল্প কথিকা তার কল্পনার রাজ্য থেকে বারবার ফিরে আসেন তার স্বামীর সংসারে। তিনি স্বামী মঈনের পথ চেয়ে বসে থাকেন। স্বামী মঈন নেশাতুর ঘুম ঘুম চোখে সারারাত পথে পথে ঘুরে ঘুরে প্রাক্তন অতসীর ঘর ঘুরে অবশেষে ফিরে আসে অপেক্ষমান স্বীয় স্ত্রীর ঘরে।
গল্পটি অসাধারণ এবং বাস্তবধর্মী। আমাদের সমাজের বাস্তব প্রতিচ্ছবি লেখক তাঁর কলমের আঁচড়ে যত্ন করে এঁকেছেন।
***‘পথ, হে পথ’ একটি প্রেমের গল্প। গল্পটিতে যদিও বহুমুখী প্রেমের আভাস আছে তবে গল্পটি দুটি চরিত্রকে কেন্দ্র খুব সাবলীলভাবে সহজ সরল পথে চালিত হয়েছে। গল্পটি চরিত্রে প্রয়োজনে অথবা গল্পের প্রয়োজনে দীর্ঘায়িত হয়নি। আমার মনে হয় লেখক ইচ্ছে করে দীর্ঘায়িত করেছেন। এতে পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখা অনেকটাই অসম্ভব হবে বলে আমি মনে করি। প্রমথ চৌধুরীর রচনার শীল্পগুণ মাথায় রেখে লেখক এগুতে পারতেন। এই গল্পটিতে লেখককের পরিমিতিবোধের অভাব লক্ষণীয়।
তবে গল্পটিতে রসবোধ যেমন আছে তেমন আছে অবসাদ ক্লান্তি আর একরাশ না পাওয়ার আক্ষেপ এবং অপেক্ষা।
পরিশেষে বলতে পারি কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহানের প্রতিটি গল্পই মৌলিক এবং অতুলনীয়। কোনোকালে কোনো গল্পের সঙ্গে কোনো রকম সাদৃশ্য নেই। এখানেই লেখকের সার্থকতা। আমি লেখকের সুস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘায়ু কামনা করছি।
জলধি কতৃক প্রকশিত নাসরীন জাহানের গল্পসমগ্র-১ এবং গল্পসমগ্র-২ আমার পঠিত। দুটি সমগ্রই অসাধারণ গল্পে সুসজ্জিত। সমগ্র দুটির প্রচ্ছদ বেশ আকর্ষণী। বাঁধাই, ছাপার অক্ষর বেশ ঝকঝকে চশমা ছাড়া পড়তে বেশ একটা অসুবিধা হয় না। জলধির উন্নত কাজের অনন্য একটি কাজ নাসরীন জাহানের গল্পসমগ্র-১ এবং গল্পসমগ্র-২। জলধি ভালো কাজের মধ্যে নিমগ্ন থাকুক। এইটুকু প্রত্যাশা।
অলংকরণঃ তাইফ আদনান
