যেমন সাজ্জাদ শরিফ, শান্তনু চৌধুরী, শোয়েব শাদাব, বিষ্ণু বিশ্বাস, রিফাত চৌধুরী, মাসুদ খান, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, ফরিদ কবির, সৈয়দ তারিক, সরকার মাসুদ, আহমেদ নকীব, ব্রাত্য রাইসু, শাহেদ শাফায়েত, মারুফুল আলম, সুহৃদ শহীদুল্লাহ, পাবলো শাহী, কবির মণি, অতীন অভীক, কামরুজ্জামান কামু, সাদী তাঈফ, শামীম কবীর, সাখাওয়াত টিপু, রিসি দলাই, নাভিল মানদার,অভিজিৎ দাস, নৃপ অনুপ, প্রবর রীপন, তৌফিক উল্লাহ, সাব্বির আজম কবি, ফরিদা হাফিজও ঠিক তেমনই একজন কবি ওই সমান্তরালে।পদার্থবিদ্যায় সমান্তরাল অর্থের শেষ পরিণতি অবধারিতভাবে একত্রে দুটির মিল, কিন্তু ফরিদা হাফিজ সে সংজ্ঞায় সূত্রায়িত হননি। বোধকরি সে কারণের উৎস স্বাধীনতা-পরবর্তী দশকে বাংলাদেশের কবিতায় নিরীক্ষার যে বিস্তৃতি যা নিশ্চয়ই এক সুফল ধারা এনেছিলো, ফরিদার কবিতা তার থেকে দূরে, বহুদূরে। সারল্যে শিশুমন, স্বগতকণ্ঠ, সাধিকার উপাসনায় একাভিপ্রায়ী- নিমগ্ন, স্ব-আস্বাদনে স্বরান্বিতা। তার কবিতার রূপ, রূপের মধ্যেকার অপরূপ না খুঁজে স্বরূপকে খোঁজে। ভাল লাগে না/ শুধু একটি বন/একটা গহীন বন আর/পৃথিবীর মত পুরু আঁধার যদি থাকতো/ আমার একটা মনের সবটুকু ভার ডুবিয়ে দিতাম তাতে- (পাথর গলে না)। সমাপ্তির দিকে তিনি গিয়েছেন যখন: পাথরের ভেতর পাথরই থাকে শুধু/পাথর গলে না/গলে না কখনো- একটা কমলালেবু নিয়ে সুমিত কল্পনায় পাথরের ওপরে হাতের তালুতে চাপ দিয়ে রসসিক্ত না করার এই অর্থ যেন প্রমাণ দেয়, ফরিদার কবিতা স্থূলস্বপ্নাক্রান্ত নয়, যেন যা আছে তাই, যা নেই আত্মলীনতায় স্বেচ্ছাচারী হবার প্রয়োজনও নেই। শুধু স্বরূপ দেখে বলা, স্বগত ভাষণে, এটা এই, ওটা ওই, নিজের দিকে কিম্বা অন্যের প্রতিও নয়। অনুচ্চে বিমূর্ত এক বিন্দুর প্রতি বলা।
‘অভ্যর্থনা’ ও ‘প্রত্যাখ্যান’ দুটিকে সমানভাবে মেনে নেয়া আধুনিক কবিতার যদি অন্যতম শর্ত হয় ফরিদার ‘রূপান্তর’ কবিতাটা তেমনই- যে তরী আজ ভাসালে তুমি/ তীর থেকেই তার যাত্রা শুরু/ জীবনের তরী বেয়ে একদিন শেষ হবে জীবনমন্থন/ নিরন্তর চলে যাবে থেমে শেষ পরিক্রমা/ যে সাম্পান আবার ভিড়বে তীরে/ সেদিন, তখন, দেখো তুমি- তোমার তীর গেছে খোয়া/ কালের নিরন্তর স্রোত ক্ষয়ে ক্ষয়ে/ প্রাচীন সে কূল হয়েছে নিঃশেষ/ মাঝি, এবার তোমার কূল বদলের পালা।
কবিতার মাত্রা দেয়ার সচেতন প্রয়াস এই কবির ভেতর লক্ষযোগ্য না : ফলত সংগুপ্ত কৃত্রিমতা থেকে উদ্ধার পেয়েছে ফরিদা হাফিজের কবিতাগুলো। যখন কৈশোরের কথা তিনি বলেছেন তখন দু’বেণী চুলের এক কিশোরী : ঝুপ ঝুপ ঝুপ/ বৃষ্টির রিমঝিম/ চুপ চুপ চুপ/ টুপ টাপ টুপ/ দৃষ্টির বিনিময়/ সব নিশ্চুপ/ রিনি ঝিনি ঝিন/ ভেজা চোখ স্বপ্নের/ রাত্রি নিঝুম।
যখন পরিণতমনস্কের দিকে গিয়েছেন, অগ্রবর্তী সংকটকে লালন করেছেন তখন অনর্গল শব্দব্যবহারের মাধুরী নিয়ে কথা বলেননি। বরং ঋণ স্বীকার করেছেন এইভাবে (ঋণ-১) এক কাপ চা-সময় ধার দেবে কি?/ কসম খোদার-/ পুরো জীবন রইলো/ চৌকাঠে তোমার! (ঋণ-২) শীত সন্ধ্যায় হঠাৎ বৃষ্টি/ ফুটপাতের চায়ের দোকানের কোণে/ একা দাঁড়িয়ে আছি/ “বোসো না হয় একটু”-/ তুমি বললে, “চা চলবে?” কি যে হলো আমার!/ সারাজীবনের জন্য/ ঋণী হবার হলো সাধ!
নাগরিক নৈঃসঙ্গের দু’ধারী করাত কতোটুকু শানিত হলে একজন কবির পক্ষে এ ধরনের পঙক্তি লেখা সম্ভব। অন্তর্গত একাকিত্ব, টানাপোড়েন, ব্যক্তিসম্পর্কের ধস, অবলোকনের মিথষ্ক্রিয়া কবিকে নিয়ে গিয়েছে বিকারহীন শূন্যতায়, আধুনিক অচল স্তব্ধতায়, জীবন্মৃত মননে, যেন কবি জন্মান্ধ অথচ তার কবিতার পাপড়িগুলো ঘন, স্ফুটোন্মুখ। ব্যক্তিপ্রেম কবি ফরিদা হাফিজের কবিতায় অরব যুক্তিতে স্থিত, যা মানবিক এবং একইসঙ্গে ব্যক্তিগত, রুচিস্নিগ্ধ স্বর আসে, আনে আহ্বান, যেন এটা শেষবারের নয়, যেন শুরুটাই এতটা বিরল, সম্পন্নতা পায় না পাবেও না যা,- কী বলা যেতে পারে, হয়তো বান্ধবপ্রেম, সেরকম কিছু ছাপ আনে যখন বলেন ‘ফিরে দেখা’ কবিতায়- বন্ধুরা, এসো/ আমরা আরেকবার করমর্দন করি।/ যদিও এ শিল্প আমি/ ভুলেছি অনেক আগেই/ তোমাদের অন্তর্ধানে/ আমি অশ্রুসিক্ত হইনি কখনও/ এমনকি বিরহকাতরও।/ কিন্তু যে অবিরাম অশ্রুপাত/ আমার হৃদয়ে/ যে অশ্রুর নাম শোণিত/ এই যে আমার হাত রক্তাক্ত/ সেই শোণিতে, সেই উষ্ণ অথচ সিক্ত হাতে/ এসো, আমরা পুনর্বার করমর্দন করি।
নাগরিক শূন্যতায় কবির বদ্ধ হয়ে ওঠার সুর পাওয়া যায় ‘রাজপথ’ কবিতায়- আমাদের হাওয়া ঘরে দেখো/ হাওয়া নেই একটি ফোঁটাও/ দরজা জানালা সব আছে খোলা/ হাট করে পাট পাট তবু/ আমাদের হাওয়া ঘরে দেখো/ হাওয়া নেই শুধু আর।/ চিমনির সব কালো ধোঁয়ারা/ অধিকার করে রাখে অবোধ আকাশ/ আর দেখো সব ছেড়ে ছুড়ে ফেলে/ ধাতব গাড়ি সারি সারি/ ওড়ায় নোংরা ধোঁয়া/ বিকলাঙ্গ শব্দসকল যান্ত্রিক তাড়নায়।
উৎকণ্ঠিত স্বরে কেউ যদি ইংরেজিতে বলে এখন কটা বাজে? তাহলে হয়তো সে এভাবে বলবে- হাউ ইজ ইয়োর এনিমি, ফরিদা তার ‘দুরন্ত’ কবিতায় সময়কে সেইভাবে দেখলেন : সদ্য তরুণ তার বালিকা প্রেমিকাকে/ যেভাবে বলে- এই মেয়ে, থামো!/ ঠিক তেমনি- আকস্মিক সচিৎকারে/ সে সময়কে বলে- থামো! দাঁড়াও/ বলছি। নইলে আমি তোমাকে/ আমার দু’হাতের মুঠোয় বন্দি করে/ চুরমার করে দেবো।
সময়ের দ্বিধা, অচরিতার্থতার বোধ, অনিশ্চয়তা, নৈঃসঙ্গের অভিজ্ঞান, পরিপার্শ্বের সাথে অনন্বয়জনিত সঙ্কট, আত্মবিচ্ছেদ এগুলো নিয়েই ফরিদা হাফিজের কবিতামালা। এই সংবেদিতায় আধুনিকতার নিরুপম ধারা, এর দ্বিতীয় ধারাটি ফরিদার কবিতায় স্থান পায়নি। নাকি তার অন্তর্গত সত্তা দ্বিতীয় ধারাটিকে অভিজ্ঞানে গ্রহণ করেনি। অর্থাৎ রাজনীতির দুর্বার প্রভাব, ‘আমি’র আত্মপ্রতিষ্ঠা, মানসিক ক্লেশ, আধুনিকতার বা বোদলেয়ারের সেই ‘ক্লেদজকুসুম’, অস্থিরতা, ইন্দ্রিয়ের বিবিধ বৈচিত্র্যের পরিক্রমায় স্ব-উন্মোচন, কিম্বা ফেটে পড়া অনুভবে বিলজ্জিতবোধ অতিক্রান্ত করে বিবস্ত্রে মুক্ত হওয়া- না সেরকম নয়। বরং কবিতায় জুড়ে থাকে কোমল সন্তর্পণী, অবলীলায়, যেন-বা অজান্তে, ভবিতব্যের সূক্ষ্ম অবহেলায় জন্ম নেয়া দলিত পুষ্পস্তবকের আপন আন্তঃবন্ধন। ফলত ফরিদা হাফিজের কবিতা ফরিদারই আত্মজা। গীতিধর্মিতা, চিত্রকল্প এবং উচ্ছ্বাসপ্রবণ অবয়বকে প্রাধান্য না দিয়ে নিষ্ক্রিয় মননের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এই পরিমিতিবোধ ফরিদার কবিতার অন্যতম উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য। কথ্যভঙ্গিতে বললেও, কথাগুলো আপনক্রিয়া-উদ্বুদ্ধ, শুধু প্রতিক্রিয়ানির্ভর কথ্যরীতি নয়। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হচ্ছে, বাংলাভাষায় কাব্যসংক্রান্ত ভাবনায় দশ-বারো জন ভাষ্যকার আছেন যারা আমার প্রিয় এবং শ্রদ্ধেয়, তাদের ভেতর স্বল্প উচ্চারিত দুটি নাম, সাম্প্রতিক কালে কবিতা বিষয়ক আমার দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তাদের অদৃশ্য যুক্ততা দেখতে পাই; তারা আমাকে ঋদ্ধ করেছেন- সেই দুইজন শ্রীসরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শ্রীমঞ্জুভাষ মিত্র। কথ্য বিষয়ক কবিতার রীতি নিয়ে সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমি একমত হই। তেমন একটি ভাবনা উল্লেখ করছি কথ্যরীতি নিয়ে।
- ‘কথ্যস্রোত বা কথ্যরীতি ইত্যাদি বিষয়কে সহজসুলভ অর্থে গ্রহণ করা অবশ্যই বিপদ আছে। প্রত্যহের সজীব কথ্যস্রোতের ভেতর দিয়ে নিত্যের তটে পৌঁছানো প্রায় দুঃসহ সাধনা।’ কথাটি সত্য। চোখের সামনে অনেক প্রমাণ দেখেছি, দেখছি। না, সম্ভ্রান্ত কাব্যমুন্সিয়ানার পক্ষে বলা হচ্ছে না। সংযোগ সরল হবার বিপক্ষেও বলা না। বিষয়টি এমন, সব শিল্পে ভাষার একটা ছায়া থাকে। ছায়াটা শুধু প্রতিবিম্ব না, অদৃশ্য পোশাকও। বহু রঙের হয়, বর্ণাঢ্যে বর্ণিল থেকে কাফনের রঙ ও- সে আসে ক্রিয়া থেকে- সেই ক্রিয়ার ভাষা উন্মুক্ত, স্বাধীন; শাস্ত্রীয় এবং সামাজিক ব্যাকরণকে অতিক্রম করে। যাবতীয় নগ্নতা উন্মোচন করে এই আপন অন্তর্গত ক্রিয়া। (‘মৌলিক’ বলে যে শব্দটি বলা হয় বা যা অনুধাবন করা হয়, ব্যাখ্যায় অস্পষ্ট আর এলোমেলো হয়ে যায় যা, এই ‘আপনক্রিয়া’ তাই- যেন এক পরম্পরার অদৃশ্য রেখা ধরে আসে, দীপ্তিতে, আর সেখানে ক্ষেত্রটা তৈরি হয় নিরীক্ষাধর্মে বা নতুনত্বের প্রয়োজনে। ক্রিয়া থেকে না উঠে পীড়িত হয়ে ক্রিয়ার ক্রিয়া থেকে প্রতিক্রিয়া থেকে সরল কথ্যরীতি সাহিত্যের দীর্ঘপথের ভাষা না। কোনোকিছু উন্মোচিত করার বা বিয়োজনের ক্ষমতা এর নেই, কারণ নিজে সে নগ্ন। ভাষা তখন ভাষা থাকে না। মৌখিক প্রত্যুৎপন্নমতির অব্যর্থ অস্ত্র হতে পারে। শিল্পের কোনো পাঠক্রমে আওতাভুক্ত হয় না, এমনকি পাঠক্রমের গভীর বিষয়ও হয়ে ওঠে না। নান্দনিক মান অনেক জটিল বিষয়, মনোযোগী পাঠের দাবি করে কি করে না মূলত প্রশ্নটি জরুরি। এই ভাষারীতি প্রশ্নে ফরিদা হাফিজ মধ্যবিত্তের আটপৌরে ভঙ্গিটা নিয়েছেন। তার বোধ আর ভাবনার সঙ্গে যা সামঞ্জস্যতা বজায় রেখেছে। সি এন ব্রাউন তার ‘পোয়েট্রি ইন ইউরোপ’ প্রবন্ধে অর্ধবিংশ শতকের ইউরোপীয় কাব্যপ্রবাহের মূল দুটি ধারা নির্দেশ করেছেন। যা তিরিশের দশকের কবিরা গ্রহণ করেছিলেন। সিম্বলিস্ট বা প্রতীকী, অন্যটি অ্যান্টিসিম্বলিস্ট বা প্রতিপ্রতীকী। শিল্পতাত্ত্বিক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় জানান তার এক আলোচনায়, সাম্প্রতিক কবিতার শেষমেশ দুটি ধারা রয়েছে- প্রতীকী এবং আধুনিক। ফরিদা হাফিজ প্রতীকী ধারার কবি নন। পারিপাট্যের চেয়ে ভাবাত্মক হওয়াটাই ফরিদার কবিতার মুখ্য শিল্পরূপ। ইমানুয়েল কান্ট-এর ‘ক্রিটিক অব জাজমেন্ট’ দার্শনিকের চোখ থেকেও যদি দেখি একটা উদ্ধৃতি বাংলায় এরকম দাঁড়ায়, ‘সৌন্দর্য দু’ধরনের, মুক্ত এবং নির্ভরশীল সৌন্দর্য। ভিত্তি যদি বস্তুজ্ঞান হয়, তাহলে তা নির্ভরশীল শিল্প। আর আত্মজ্ঞানের অনুভবকে গুরুত্বপূর্ণ করায় মুক্তশিল্প।’ অর্থাৎ মনন এবং চিন্তনের সমন্বয়ে যা বোধিজাত হয়ে অগ্রবর্তী সঙ্কটকে শুধু স্বীকার করে তা না, তার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে আধুনিক কবির দায়ও তৈরি হয়। অর্থাৎ মুক্তশিল্পই তার পাথেয়। এই প্রবণতার মৃদু ছাপ কখনো কখনো ফরিদার কবিতায় লক্ষণীয়। ঐতিহাসিক পরম্পরাকে এই সূত্রে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন ‘যাযাবর’ কবিতায়- ক’পাত্র সুরা সঞ্চয় প্রভু,/ পাঠ করি আমরা পিতা/ পিতামহ প্রপিতামহের নামে-/ রক্তে যার অধিকার করার স্বাদ/ অধীন করার, ভোগের স্বাদ;/ তারে তুমি বাঁধো সংসার মন্ত্রে?/ করো গান, স্থিত আহ্বান?/ কোন্ মাটি (?) তবে/ টানে তোমার নিরন্তর?/ কোন্ দরবারে সাজাও সুরাপাত্র আর সভাসদ/ ঘিরে থাকে চারদিক, বহুদিন- বহুদিক-।/ তাই আমার গালে দাও সুরামন্ত্র/ পিতা পিতামহ প্রপিতা ক্ষম। এর জমজ হিশেবে পাশাপাশি ‘বানভাসি’ কবিতাটাকে আখ্যায়িত করা যায়- রক্তের উষ্ণতায় সীসা গলে/অগ্ন্যুৎপাত! সভা- এবারে/ ভাবো বসে, জ্বলন্ত লাভায়/ সাঁতার কাটা সম্ভব হবে কি?/ কেননা, আমিও যেতেছি ভেসে/ নিরুদ্দেশ স্রোতে।
‘সঞ্চয়’, ‘নীল শ্বেতপাথর’, ‘দর্পণ’, ‘তৃষ্ণা’, ‘ডুব সাঁতার’, ‘ধোয়া’, ‘পরিত্যক্ত’, ‘রূপকথা’ এই কবিতাগুলো বাণীধর্মিতায় বিশিষ্ট, এক সমতল অনুভূতির একই বিন্যস্ততায় গাঁথা। বিস্ময়বোধ এবং বিবর্তিত সত্তাকে কেন্দ্র করে কবির নতুন ভাবনা, নবজীবন, সাশ্রয়ীমনন-উদ্বুদ্ধ উন্মুক্ত বাঙ আর প্রত্যয়জনিত আশা-উষ্ণতা, আপন স্বপ্নকাতরতা, আকাঙ্ক্ষার মাঝে পার্থিব বিষয়সমূহকে খোঁজা- কবিতাগুলোর ভেতর এই প্রবণতাকে চিহ্নিত করে। ‘আদিম ঘুম’ ও ‘জ্যোৎস্নার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনায়’ এই দুটি কবিতা ফরিদা হাফিজের তেত্রিশটা কবিতার ভেতর পৃথকভাবে চূড়ান্ত সম্পন্নতায় শুধু সফলই নয়, সার্থক, কবিতা দুটি বহুদিন স্ব-গরিমায়, শুদ্ধ আত্মবেদনায় আর স্বীকারোক্তির কাব্যমহিমায় দীপ্তস্বাক্ষরে অত্যুজ্জ্বল হয়ে থাকবে। দুটি কবিতার এক নিজস্ব আত্মঐক্য লক্ষণীয়। ‘জ্যোৎস্নার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনায়’ একটা প্রবর্তনক্রিয়া যেভাবে শুরু হয়েছিলো পরে যা তীব্র আকাঙ্ক্ষা আর অনিশ্চয়তার দ্বন্দ্ব-জর্জরিত ফলাফল; আর সে কারণেই তার স্বরূপ রচিত হয়েছে দ্বিতীয় কবিতা ‘আদিম ঘুমে’। স্বরের দৃঢ়তা, আকাঙ্ক্ষার স্পষ্টতায় যেমন ঋজু তেমন দ্বন্দ্বের সঙ্কটে পরাভূত হতে না চাওয়া আকুল চেষ্টায় ফুটে উঠেছে কথামালা ‘জ্যোৎস্নার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনায়’- জীবনের এক ভয়ঙ্কর রাতের কথা বলছি আমি,/ রোমহর্ষক মুহূর্তের ঘটনাবলীর উপাখ্যান।/ চাঁদ-জ্যোৎস্না- সমুদ্র... ওহ! কী ভয়ঙ্কর!/ চাঁদ-বরফ গলে উন্মত্ত সমুদ্রের/ রূপালী ফেনিল থাবা!/ আহ! আস্ফালন...সর্বগ্রাসী, বিষাক্ত/ পারদ ফেনিল জিভ। ভয়ঙ্কর!/ মনে পড়ে যায় আত্মাহুতির মনোরম/রূপকথা। অথচ ফিরতে হয়/ খুবই পার্থিব নিয়মে। সব ফেলে/ শরীর পালিয়ে বাঁচে বটে;/ কিন্তু জ্যোৎস্না তার পিছু ছাড়েনি।
সপ্তম স্তবকে কবি বলছেন- ক্ষমা নেই তবু, কেননা জ্যোৎস্না ক্ষমা/ জানে না। অপ্রতিরোধ্য ধারায়/ ভেসে জ্যোৎস্নাক্রান্ত শরীর/ অবশেষে মুক্তিপ্রার্থী-/ ক্লিশ কণ্ঠ তার/ “ক্ষমা কর হে ভয়ঙ্কর সুন্দর!" এখানে এমন একটি অভিজ্ঞান এই আত্মোপলব্ধি যেন সিদ্ধান্তমুখী। ‘আদিম ঘুম’-এ তার ধারাবাহিকতার ছাপ কাকতালীয়ভাবেই তার পরবর্তী বাস্তবতাটাকে সনাক্ত করে। যদিও ‘জ্যোৎস্নার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনায়’- এর রচনাকাল মার্চ-২০০০, ‘আদিম ঘুম’ তার আগে লেখা হয়েছে ফেব্রুয়ারি-১৯৮৯, দশ বছর পরে ‘জ্যোৎস্নার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনায়’ কবি যেন ‘আদিম ঘুম’-এর কারণটা জানালেন। চারপাশে উল্লাসে মেতেছে ক’জন বন্ধু-/ বহুদিন পাশাপাশি হেঁটে আজ ওরা হৃদ্যতার চরমবিন্দু অতিক্রান্ত।/ উল্লাসে মেতেছে আজ ক’জন- আঁধার, ভয়ঙ্কর, মিথ্যে আর সর্বনাশ।/ একটি মেয়ে নীরবে ঘুমোচ্ছে- আদিম ঘুম...
শেষ স্তবকে ফরিদা যেন এক প্রকার অ্যাবসলিউটে... তার আদিম ঘুম আবারো কেঁপে ওঠে, ভারী নিশ্বাসে পড়ে/ তবু- ঘুম তার ভাঙে না। কবে সে জাগবে কেউ জানে না।/ জাগতে তার বড় ভয়। তেত্রিশটা কবিতার পাশাপাশি ফরিদা হাফিজের ছয়টি অনুগল্পও রয়েছে। অনুগল্পগুলোতে কথাবস্তুর ও গদ্যের প্রয়োগ বেশ পরিণত। রিয়েলিস্টিক বিন্দু থেকে কাব্যময় আবহে ক্ষণকালীন কোনো ঘটনামুহূর্তের তুঙ্গে থেকে ক্যাটাস্ট্রফি। কবিতায় ফরিদা যা করেননি, গদ্যে তা করেছেন। প্রতীক রূপক ব্যবহারে দক্ষতায় গল্পগুলো লিখেছেন। অনুগল্পগুলো খুবই ব্যক্তিক যা নিঃসঙ্গতার বহুমাত্রিক দিকের ইঙ্গিত দেয়। প্রথম অনুগল্পটির নাম ‘শিলা’, ঈশ্বর ও তার স্বরূপ অন্বেষণ, অধ্যাত্মবাদের দৃষ্টি থেকে না, সসীমতা, উপলব্ধিতে দেহ ও মনের বিভক্তিকরণ, আত্মজিজ্ঞাসা, আমি এবং আপন সত্তার অসীমতা, তার বর্ণিল বিবর্তন, দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক ধারণা, প্রত্নতাত্ত্বিক বিশ্বাস আর বিবর্তনের যে জমাট ঘোর নিয়ে আমি সত্তা অবিরত অহমকে বাঁচিয়ে রাখে যে স্বয়ম্ভু ‘আমি’ সেই ঈশ্বর। গল্পটি সুন্দর। ‘শিলা’ নামকরণটি গল্পের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। ‘রসায়ন’ এই নামে ‘আমি-১’ ‘আমি-২’ এই দুটি অনুগল্পের বিষয়বস্তু বিযুক্তি এবং পুনঃকাঙ্ক্ষা। ‘আমি-১’ গল্পটির পয়েন্টলাইন, একটা বিচ্ছেদ মুহূর্ত, একটা ট্রমা, ক্ষণকালীন স্কেপ, মুহূর্তগুলো কতোটা ধারালো তারই প্রক্ষালন। ‘আমি-১’-এর শুরুটা এরকম- ‘আমি যাই বললাম, তবে উঠলাম না।’ ‘আমি-২’-এর বিষয় : ক্ষণকালীন স্কেপ করে বেরিয়ে আসার সফল চেষ্টা। ‘আমি-২’-এর শুরুটা ‘তোমাকে আর কোথাও যেতে দেব না আমি, ভাবী এবার আর তার যাওয়া হবে না।’ আমি-২-এর অনুগল্পটি আমি-১-এর অনুগল্পটির পরিণতিকে অনেকখানি সম্পন্ন করেছে। অনুগল্প আবর্তনে লেখক খুব নান্দনিকভাবে কাব্যময় অনুভূতি অবলীলায় প্রকাশ করেছেন। শিল্পরূপ বিষয়বিন্দুকে অতিক্রম না করে পাশাপাশি চলেছে। ফলে দুরূহ না হয়ে বরং সাবলীল এবং বহুমাত্রিক হয়েছে। এই গল্পে লেখিকার উন্নত সৌন্দর্যবোধ লক্ষযোগ্য। অনুগল্প ‘সমাধি’ দুই পর্বে। সমাধি-১, সমাধি-২ দুটি অনুগল্পের একটি কাব্যভারাক্রান্ত নৈসর্গিক পরিবেশকে কেন্দ্র করে রূপকথার মতো বিবরণ। সমাধি-২-এ সেই রূপকথার আদলে লেখা, দেখা, দেখানো, জীবন-সম্পদ-ঘর-গৃহস্থালি-প্রবল ঔজ্জ্বল্য এ সবের আকাঙ্ক্ষাকে কনডেমন করার অভীপ্সা। এই ধরনের গল্প ফরিদা লিখেছেন, অবাকই হতে হয়। নির্ধারিত একটি অবজেক্টকে একেবারে উল্টোভাবে স্থাপন করা, শুধু উপরিসাহস দিয়ে না, চিন্তাশীল প্রজ্ঞায়, তারিফযোগ্য। সন্দেহ নেই ফরিদা হাফিজ তার চিন্তায়, তার নিজস্ব কর্মের তৎপরতা এবং একইসঙ্গে তার সীমাবদ্ধতা এবং তদুপরি আশাবাদ মনের অতিক্রমমনস্কতা- এ সবকিছু সম্পর্কে তিনি খুবই স্পষ্ট, মোহমুক্ত এবং পরিচ্ছন্ন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে, গদ্য-পদ্যের একাত্মতা যতোই কাছাকাছি হোক-না কেন কবিতার ক্ষেত্রটি অনেক মুক্ত, সমস্তকিছুর পরেও চূড়ান্ত পর্যায়ের তোয়াক্কা না করেও দেখা গেছে গদ্য কোনো-না-কোনোভাবে শেষমেশ ব্যাকরণশাসিত। গদ্যের শব্দও অভিধানশাসিত। শব্দের এই আক্ষরিক অর্থ থেকে গদ্যকে মাত্রা দেয়া, নিজস্ব গদ্য তৈরি করা শুধু মেধার বিষয় নয়, রীতিমতো প্রতিভার ব্যাপার। ফরিদার অনুগল্পগুলোর গদ্যের সবাক-নির্বাক-সংহতি-স্থৈর্য্য-গতি-স্বর (মডিউলেশন অব টোন)-এ প্রতিভার ছাপ রয়েছে। ‘আমআঁটির ভেঁপু’ গদ্যটি আশির শক্তিশালী কথাশিল্পী, চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক শাহরিয়ারকে নিয়ে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’র অপু ও দুর্গার প্রতিবিম্বে স্মৃতিমূলক এই মৃত্যাঞ্জলি। সার্ত্রের বোন ছিলো না, এক জায়গায় তিনি বলছেন- ‘বোন’ বলতে আমি যা বুঝি, সে হবে স্নেহপ্রবণ, দাবিদার, আনন্দে খুব নিজস্ব, ইন্দ্রিয়রহিত। শিল্পের সম্পর্ক কতোটা ব্যক্তিক এবং নিভৃত হতে পারে লেখাটি সেই আদর্শের। ‘নারীবাদ ও মানবতাবাদ’ প্রবন্ধে মানবিক সঙ্কটের সময়কাল, পুরুষ ও নারীর দু’পক্ষের সম-সহমর্মিতায় মানবমুক্তির আলোকে নারীর অবস্থান পরিবর্তন এর একটি সামগ্রিক দিক নিয়ে সংক্ষিপ্ত আকারে বলা হয়েছে। তেমন নতুন কিছু না হলেও খুব বিশ্বাস থেকে লেখা। সুপারফিসিয়ালি র্যাডিক্যাল হবার চেষ্টা নেই লেখাটিতে, শুধু এই নিবন্ধে না, তেত্রিশটি কবিতায়, তার ছয়টি অনুগল্পে, একটি শ্রদ্ধাঞ্জলিতে কোথাও বিশ্বাস এবং বিশ্বাস সংক্রান্ত বিষয় এবং উপলব্ধির বাইরে কিছু লেখেননি। তিনি যা তা-ই প্রতিবিম্বিত হয়েছে তার ‘অগ্নিযুগ, প্রস্তরকাল’ কাব্য/ গদ্যগ্রন্থটিতে। কবি ও লেখক ফরিদা হাফিজকে সাধুবাদ জানাচ্ছি- গাণ্ডীব, অনিন্দ্য, চর্যাপদ, প্রতিশিল্প, চালচিত্র, জংশন, শিরদাঁড়া- এই সাতটি লিটলম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে।
ফরিদা হাফিজের ‘অগ্নিযুগ, প্রস্তরকাল’ গ্রন্থ সম্পর্কিত।
প্রকাশক- উলুখড় (২০১০-২০১২)
অলংকরণঃ তাইফ আদনান
