সব ভাষা কি আর সব বয়সে বোঝা যায়? চোখের ইশারায় যে কবিতা রচিত হয়, যার ডানায় পাওয়া যায় প্রাণের স্পন্দন, সেই কবিতার ক্ষণ খুঁজে পাবার জন্যও তো একটা সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। ‘চন্দ্রভানু’র ভাষা বুঝতে তাই আমাকে পার করতে হয়েছে অনেকটা সময়। তবুও যে খুব একটা বুঝেছি, তা বলতে পারি না। হয়তো সেজন্যই সেই কৈশোরে চেনা ‘চন্দ্রভানু’কে আজও আমি উল্টেপাল্টে দেখি। অথবা দেখি তার স্রষ্টার শক্তিমত্তাকে-সময়ের অনন্য কথাশিল্পী নাসিমা আনিসকে, যাঁকে আমি চিনেছিলাম স্কুলে পড়ার সময়। সে সময়েই শুরু করেছিলাম তাঁর ‘চন্দ্রভানুর পিনিস’; এবং টের পেয়েছিলাম-ইনি এমনই এক লেখক, যাঁর লেখা পড়তে গেলে প্রস্তুতি নিতে হয়। যদিও সে প্রস্তুতি আমার আজও নেয়া হয়নি, তবুও সময়ে সময়ে তাঁকে না পড়ে পারিনি। তারই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি পড়লাম তাঁর ‘নির্বাচিত গল্প’। ভাবছি, এ বইটিই আবার একটু উল্টেপাল্টে দেখি। সত্যি বলতে কি, প্রিয় পাঠক, মনে মনে আপনার সঙ্গ কামনা করছি। আরও একবার হেঁটে আসতে চাইছি নাসিমা আনিসের হাতে গড়া সেই গল্পের পাড়া থেকে।
শুরুতেই আমরা চলে যেতে চাই সাতবাড়িয়া শ্মশানঘাটে। যেতে যেতে যদি সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে, কালচে হয়ে আসে বাতাসের বুক, তবে হয়তো সে ঘাটেই দেখা যাবে একজন নারী-যার নাম শুভারানি-হবিষ্যি হিসেবে কিছু আতপ চালের ভাত ভাসিয়ে দিচ্ছে হিসনার জলে, যার তাবৎ নষ্ট জল শুষে নিয়ে একসময় শান্ত হবে পিদিম নামের এক আদিবাসীর আত্মা, বেঁচে থাকার সময় তার যে আত্মা খালি খালি কষ্ট পেত তরমুজ খাওয়ার জন্য। এমনকি সে কষ্ট সহ্য করতে না পেরে চেঁচিয়েও উঠেছিল সে-‘শুইভ্যা, তরমুজ খাওয়া, বছরকার ফল, আত্মায় কষ্ট পায় না খালি।’ শুনে মুখ ভেংচিয়ে বলেছিল শুভা-‘ভাত পাবেন কি ঠিক লাই, নাগচেন তরমুজ লিয়্যা!’ বলেছিল বটে। তাই বলে কি খাওয়ায়নি? খাওয়েছিল। পাঁচ টাকা দিয়ে দুই ফালি কিনে এনেছিল। শেষ পর্যন্ত সেটাই কি কাল হলো পিদিমের জন্য? সে গোগ্রাসে গিলে ফেলল তো ঠিকই; কিন্তু শেষ রাতেই যে তাকে হেঁচড়ে হেঁচড়ে তিনবার গর্তে যেতে হলো; লুঙ্গি হোগলা ভাসিয়ে কোঁকাতে হলো তাকে? এমনকি শুভাকেও বলতে শোনা গেল-‘তরমুজ, ওরে কি খাওয়া খাওয়াইলিরে তরমুজ, আমার মাতার সিঁন্দুর কারিয়া নিলি...’ শুভার মাথার সিঁদুর, তার স্বামী, পিদিম-যে নির্যাতিত হয়েছে; নিগৃহিত-লাঞ্ছিত-বঞ্চিত হয়েছে জনমভর-মৃত্যুর পর চন্দনকাঠটুকুও জোটেনি তার জন্য। কেন? কিসের জন্য? সে শোষিত শ্রেণীর সামান্য এক আদিবাসী-এই জন্য? প্রিয় পাঠক, এটা জানার জন্য হলেও আপনাকে যেতে হবে গল্পের পাতায়। প্রতিটি পৃষ্ঠায় ছড়িয়ে থাকা বাক্যরাজির ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে জালের মতো করে বোনা জীবনকে দেখতে পাবেন আপনি। হয়তো জড়িয়েও যাবেন তাদের সাথে। আমি অধম তার কতটুকুই-বা বলতে পারি? তবে অনায়াসে এটুকু বুঝতে পারি-এই গল্প বেঁচে রবে বহুদিন। এ এমন এক গল্প, যার আছে কই মাছের প্রাণ, যে সহজে মরবে না। নিজেরে সে দেবে না ভুলিতে। কলমের কালিতে এমনই সব শব্দ নিয়ে খেলেছেন নাসিমা; এবং যেখানে নিজের শিল্পস্বত্তার সবটুকু ঢেলে দিতে এতটুকু কার্পণ্য করেননি। অবশ্য আমি অবাক হই তাঁর দেখার চোখ দেখে-এভাবেও দেখা যায়; এতটা সূক্ষ্মভাবে!
শুধুই কি বাইরে বাইরে? না। ভেতরে, বুকের ভেতরে, যেখানে হৃদয়ের বাস, সেখানেও তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য বিচরণ। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে আরও কিছু গল্প-এই যেমন: ‘ডুবসাঁতার’ কিংবা ‘একটা ছবি’। তাঁর ‘ডুবসাঁতার’ গল্পটিকেও অনন্য উচ্চতায় দেখতে পাই। এ গল্প যে কেবলই জেবুননেসার, তা নয়। এ গল্প বোধহয় আমাদের সকলের-অন্তত আমরা যারা জেবুর মতো স্মৃতির পীড়ায় কাতরাই, তাদের তো বটেই। পিপলু-যার এক পা ছোট ছিল বলে লোকে পিপলু লেংড়া বলে ডাকত, পরে তো অন্ধই হয়ে গেল জেবুর দুষ্টুমিতে, সে তো আমাদেরও সেই শৈশবের বন্ধু, জীবন-প্রবাহে যাকে হারিয়ে ফেলি আমরা; কিংবা হয়তো হারাই না কখনো। নানান বেশে সে আসে স্মৃতির পাতায়। আর যদি হঠাৎ দেখা হয়ে যায় কোনো এক পথের ধারে-হয়তো তাকে সবজি বেচতে দেখলাম; দৌঁড়ে গেলাম; বললামও, ‘ঢেঁড়সের ফুল খুব সুন্দর হয়, না!... ঢেঁড়স ফুলে প্রজাপতি ওড়ে নানা রঙের, তাই না পিপলু, তোমার মনে আছে না, সেই যে বিলে!’-তখন হয়তো তারও মনে পড়ে সবকিছু। আর মনে পড়ে বলেই তার দারিদ্র্য তাকে সঙ্কুচিত করে ফেলে। সে বিব্রত বোধ করে; লুকোতে চায় নিজেকে। বলে, ‘আমি আক্কাস আলী...;’ অথচ আমরা পরিষ্কার দেখতে পাই, ও পিপলু।
প্রিয় পাঠক, আমি জানি, এ গল্প পড়েও আপনি নড়েচড়ে বসবেন। ‘একটা ছবি’ও নাড়িয়ে দেবে। কালো এক কোমল ছায়া ঢেকে ফেলবে আপনাকে। আর্দ্র হয়ে উঠবে আপনার ভেতরটা। ভেতরবাড়িতে ভেঙে পড়বে কোনো একটা কিছু। আর হ্যাঁ, আপনার চোখেও ভাসতে থাকবে-‘...একটা শাড়ি, একটা লুঙ্গি আর [আমার] একটা গেঞ্জি ট্রাউজার পাশাপাশি ঝুলছে। বাতাস তাতে ছুঁয়ে যাচ্ছে, বাতাসে হুটোপুটি হচ্ছে, আহা!’
আহা জীবন! আহা রে জীবন! জীবনের আর্তি তো আরও কত রূপেই-না দেখা দেয়! সেগুলোও তুলির আঁচড়ে তুলে এনেছেন নাসিমা। সে স্বাক্ষ্যই যেন বহন করছে তাঁর ‘সদানন্দ মুণিদাস’। প্রান্তিক এক জীবন কী চমৎকার করেই-না এঁকেছেন তিনি! সাদা চোখে যেটাকে লোভ বলে মনে হয় (হয়তো সেটা লোভই; একইসাথে প্রতারণাও), তবুও লেখকের আঙুলের মায়ায় তা আর অমন থাকে না। কেমন এক আর্দ্রতায় সিক্ত হয়ে ওঠে। হয়তো তাতে নতুন কোনো চারা গজিয়ে উঠবে বলে। এমনকি সেটা ওঠেও। অসহায় পিতার অশ্রুসজল অক্ষরগুলো স্পর্শ করে পাঠকের মর্ম। অথচ শুরুটা ছিল অন্যরকম। গল্পের ডাইমেশন তো এমনই হওয়া চাই। নাসিমা আনিসের ‘নির্বাচিত গল্প’র অনেকগুলো গল্পেই এই বহুমাত্রিকতা পরীলক্ষিত হয়। তাঁর গল্পে শ্রুত হয় মানুষের, বিশেষত নারীর, আর্তস্বর। ‘পুত্রবতী ভবতী’ কিংবা ‘বন্ধুর বন্ধু’ গল্পগুলো তো রীতিমতো কাঠগড়ায় দাঁড় করায় আমাদের। এমনকি মুখের ওপর একদলা থুতুও ছিটিয়ে দেয় ‘আসল মানুষ’ গল্পটি। যখন বাসের কন্ডাকটার ছেলেটা, যে কিছুক্ষণ আগেই কারণে-অকারণে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি খেয়েছে, অথচ এতগুলো যাত্রীর কাউকেও কাছে পায়নি, তাকে যখন কেউ জিজ্ঞেস করে , ‘নাম কী তোমার’, তখন তো তার মুখ ফিরিয়ে নেয়াই স্বাভাবিক।
নাসিমা আনিসের আরেকটি বহুল পঠিত গল্প, ‘কিডনির কারবার’। গল্পটি ইতোমধ্যেই বোদ্ধা পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। যেখানে চিত্রিত হয়েছে এই অর্থলিপ্সু সময়ের সকরুণ চিত্র-মধ্যস্বত্বভোগী চরিত্রের নিকষ-কালো দিক, যার কাছে কমিশনটাই আসল। অন্যকিছু কিছুই না। অন্যদের বাঁচলেও চলে, মরলেও চলে! মানুষ কী অসহায় তাদের জিম্মায়! আরেকটা কালো দিকের দেখা পাওয়া যায় ‘কয়লা নামে কোনো জায়গা নেই’ গল্পে। যেখানে লেখক এক বস্তি এলাকায় ঘুরপাক খেতে থাকা দারিদ্র্যের দুষ্টুচক্রকে শব্দের জালে ধরেছেন। ‘পাতাদের এভাবেই শুরু’ গল্পটিতেও তিনি উন্মোচন করেছেন আরও এক অন্ধকার সুড়ঙ্গের দ্বার, যার দরজার ওপার থেকে ভেসে আসে গোঙানি, যা হয়তো শুনতে পাই না (কিংবা কে জানে, হয়তো শুনতেই চাই না) আমরা! কিন্তু লেখককে যে শুনতে হয়; কান পেতে থাকতে হয়। এবং এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, তিনি তাঁর প্রায় প্রতিটি গল্পে এই কাজটি করেছেন; শুনে গেছেন খসে পড়া পাতার শব্দ। তার মুচড়ে যাবার শব্দও তিনি শুনেছেন; এবং শুনিয়েছেন।
আলোচ্য বইটির ভূমিকা লিখতে গিয়ে কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক মাইনুল ইসলাম মানিক বেশ জোর দিয়ে বলেছেন-‘নাসিমা আনিসের গল্পপাঠে যেকোনো পাঠক ঋদ্ধ হবেন, এ কথা হলফ করে বলা যায়।’ একজন পাঠক হিসেবে মোটাদাগে আমার বলবার কথাও আসলে এটাই। তাঁর লেখায় একইসাথে যেমন জীবনকে যাপিত হতে দেখা যায়, তেমনই তাঁর বাক্যের বুকে পাওয়া যায় যাপনের গন্ধ-যে গন্ধ ঘামের গন্ধ; পুড়তে থাকা তুষের গন্ধ। আর এ গন্ধই যেন গদ্যের রূপে গ্রন্থভুক্ত হয়েছে নাসিমা আনিসের ‘নির্বাচিত গল্পে’।
গল্পগুলো ভালো লেগেছে। আমার প্রণতি জানবেন, প্রিয় লেখক।
বই পরিচিতি-
নাম: নির্বাচিত গল্প
লেখক: নাসিমা আনিস
ধরণ: গল্প
প্রকাশক: অনুপ্রাণন প্রকাশন
মুদ্রিত মূল্য: ৬০০ টাকা মাত্র।
অলংকরণঃ তাইফ আদনান
