এই ভালো না লাগা, এই নিঃসঙ্গতার আঁধার কে আমি নাম দিতে চাই ভিন্ন অসুখ। যদিও লিও তলস্তোয় তার কনফেশন এ এভাবে বলেননি। জীবনের মানে হচ্ছে অপরিপূর্ণতা। জীবনের মানে হচ্ছে শূন্যতা। আসলেই জীবনের কোনো প্রাপ্তি নেই। মানে নেই। বলছিলাম লিও তলস্তোয়ের লেখা, এ কনফেশন বইটি নিয়ে। লেখক ছোটবেলা থেকেই একজন ভক্ত ছিলেন, ব্যাপ্টিস্ট ছিলেন। ব্যাপ্টিস্ট চার্চ এর সকল নিয়ম কানুন মেনে চলতেন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার চিন্তা-চেতনা ও ধ্যানে পরবর্তন আসতে থাকে। যা তাকে ব্যাপ্টিজম থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। লেখক তার জীবনের মানে খুঁজতে থাকে। যা আরও অতল গহব্বরে নিমজ্জিত করে। লেখক এরমধ্যে বিয়ে করেন। ইউরোপে যাওয়ার বাসনাও করেন। বিয়ে করেন একদম তরুণ একজন মাত্র ১৮ বছরের নারীকে। এরপর ইউরোপ ঘুরে রাশিয়াতে ফেরত আসার প্রয়াস করেন।
রাশিয়ায় ফিরে এসে তার জীবনের এক ভিন্ন অধ্যায় শুরু হয়। বাহ্যিকভাবে সবকিছু ঠিকঠাক-সম্পদ, পরিবার, সামাজিক মর্যাদা-সবই তার আয়ত্তে। তিনি সাহিত্যচর্চায় আরও গভীরভাবে নিমগ্ন হন, এবং তার খ্যাতি ক্রমশ বাড়তে থাকে। কিন্তু এই বাহ্যিক সাফল্যের ভেতরে কোথাও যেন এক অদৃশ্য ফাঁক রয়ে যায়। এই ফাঁকটাই ধীরে ধীরে তার অস্তিত্বকে গ্রাস করতে শুরু করে। তলস্তোয়ের নিজের ভাষায়, তিনি এমন এক জায়গায় পৌঁছান যেখানে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর আছে, কিন্তু কোনো উত্তরের মধ্যেই অর্থ নেই। তিনি উপলব্ধি করেন, মানুষের জ্ঞান যত বাড়ে, জীবনের অর্থ ততই অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। গণিত, বিজ্ঞান, দর্শন-সবকিছুই যেন তাকে একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত নিয়ে যায়, তারপর থেমে যায়। আর সেই থেমে যাওয়ার জায়গাটিই সবচেয়ে ভীতিকর।
এই সময়টাতে তার মানসিক অবস্থা ক্রমশ অবনতি হতে থাকে। তিনি প্রায়ই ভাবতেন, “আমি কেন বেঁচে আছি?”-এই প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক উত্তর তিনি খুঁজে পাননি। এমনকি তার কাছে আত্মহত্যার চিন্তাও অচেনা ছিল না। তিনি লিখেছেন, কীভাবে তিনি দড়ি বা অস্ত্রের কাছাকাছি যাওয়া এড়িয়ে চলতেন, কারণ নিজের ওপর তার আস্থা কমে গিয়েছিল। কনফেশন পড়লে আরও বোঝা যায়, তার সংকটটি কেবল দার্শনিক ছিল না, বরং গভীরভাবে মানসিক ও অস্তিত্বগত। তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করেন-যারা তথাকথিত “শিক্ষিত” বা “উচ্চবিত্ত” শ্রেণির বাইরে, সেই সাধারণ মানুষগুলো যেন এই সংকটে ভোগে না। কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ, যারা প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করে বেঁচে থাকে, তাদের জীবনে কষ্ট আছে, কিন্তু সেই কষ্টের মধ্যেও এক ধরনের স্থিতি আছে। তারা বেঁচে থাকার জন্য কোনো জটিল দর্শনের প্রয়োজন বোধ করে না।
এই উপলব্ধিই তলস্তোয়ের চিন্তায় এক বড় পরিবর্তন আনে। তিনি ভাবতে শুরু করেন, হয়তো জীবনের অর্থ খুঁজতে গিয়ে তিনি ভুল পথে হাঁটছিলেন। তিনি এতদিন যুক্তি ও বুদ্ধির ওপর নির্ভর করেছিলেন, কিন্তু হয়তো জীবনের কিছু সত্য আছে যা কেবল অনুভব করা যায়, যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তার মধ্যে বিশ্বাসের পুনর্জাগরণ ঘটে-তবে সেটি আগের মতো অন্ধ বিশ্বাস নয়। বরং এটি এক ধরনের সচেতন গ্রহণ। তিনি ধর্মকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন-প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম-কানুনের বাইরে গিয়ে, মানবিকতার ভিত্তিতে। তার কাছে বিশ্বাস মানে হয়ে দাঁড়ায় জীবনের প্রতি আস্থা রাখা, এমনকি যখন জীবনের অর্থ স্পষ্ট নয় তখনও।
তলস্তোয়ের এই যাত্রা খুব সহজ ছিল না। তিনি নিজের ভেতরে বারবার দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন। একদিকে তার বুদ্ধিবৃত্তিক অহং, অন্যদিকে তার অস্তিত্বের সংকট-এই দুইয়ের মধ্যে তিনি দোলাচলে ছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারেন, জীবনের অর্থ খোঁজার চেয়ে হয়তো জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত থাকা বেশি জরুরি।
আমার শুরুতে বলা কথাগুলোর সঙ্গে এক ধরনের মিল খুঁজে পাওয়া যায়-“জীবনের মানে হচ্ছে অপরিপূর্ণতা”, “জীবনের মানে হচ্ছে শূন্যতা”-তলস্তোয় হয়তো এভাবে সরাসরি বলেননি, কিন্তু তার অভিজ্ঞতার গভীরে এই অনুভূতিগুলোর উপস্থিতি স্পষ্ট। তবে পার্থক্যটা হলো, তিনি এই শূন্যতাকে শেষ সত্য হিসেবে মেনে নেননি। বরং এই শূন্যতার ভেতর থেকেই তিনি অর্থের সম্ভাবনা খুঁজেছেন। তার কাছে জীবন কোনো সম্পূর্ণতা নয়, বরং এক চলমান প্রক্রিয়া-যেখানে প্রশ্ন থাকবে, সন্দেহ থাকবে, কিন্তু তবুও মানুষ বেঁচে থাকবে। এই বেঁচে থাকাটাই হয়তো এক ধরনের উত্তর।
সবশেষে, ‘কনফেশন’আমাদের এমন এক জায়গায় দাঁড় করায়, যেখানে আমরা নিজের জীবনের দিকেও তাকাতে বাধ্য হই। আমরা যে প্রশ্নগুলো এড়িয়ে চলি-জীবনের মানে কী, আমরা কেন বেঁচে আছি-এই বইটি সেই প্রশ্নগুলোকে সামনে এনে দেয়। এবং হয়তো উত্তর না দিয়েই আমাদের ভাবতে শেখায়। এইভাবেই তলস্তোয়ের আত্মস্বীকারোক্তি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সীমা ছাড়িয়ে এক সার্বজনীন বয়ানে পরিণত হয়। তার সংকট আমাদের সংকট হয়ে ওঠে, তার অনুসন্ধান আমাদেরও অনুসন্ধান হয়ে দাঁড়ায়। আর সেখানেই এই বইটির আসল শক্তি।
অলংকরণঃ তাইফ আদনান
