কাজী রাফির লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় হয় “ত্রিমোহিনী” উপন্যাসের মাধ্যমে। হিস্টরিক্যাল ফিকশন ঘরানার উপন্যাসটি পড়ার পর আমাদের দেশ সম্পর্কে জানার এক অজানা দুয়ার খুলে গিয়েছিল আমার সামনে। এই দেশে জন্ম নেয়া অনেকের মতোই আমিও মনে করতাম আমাদের গৌরবের চেয়ে প্রবঞ্চনার ইতিহাস বেশি। কিন্তু ‘ত্রিমোহিনী’ পাঠের পর আমি উপলব্ধি করলাম, আমাদের মতো গৌরবময় ইতিহা্স- ঐতিহ্য এবং কৃষ্টিসমৃদ্ধ জাতি বিশ্বে বিরল।
উপন্যাসটি পড়ে আমি মুগ্ধ হলাম। সেই সঙ্গে বাঙালি এবং বাঙালি জাতি হিসেবে গর্ব অনুভব করলাম। আর “ত্রিমোহিনী” আমাকে আগ্রহী করে তুললো কাজী রাফির লেখা আরো বই পড়তে। এক এক করে পড়ে ফেললাম তাঁর অনেকগুলো উপন্যাস। মেনে নিলাম লেখক সম্পর্কে স্যার হাসান আজিজুল হকের মন্তব্য। তিনি বলেছিলেন, “ঔপন্যাসিক হিসেবে বাংলাদেশে এবং বর্তমান বাংলা সাহিত্যে একজন জিনিয়াসের আবির্ভাব ঘটেছে। সেই জিনিয়াসের নাম কাজী রাফি।”
জিনিয়াস এই লেখক কাজী রাফির লেখা যে উপন্যাসটি নিয়ে আজ আলোচনা করবো তার নাম “রংধনুর সাঁকো”। ২৫০ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসটি আমাকে আবার আলোড়িত করেছে কিছু লিখবার জন্য। ২০১২ সালে উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। অনিন্দ্যপ্রকাশ থেকে ২০১৭ সালে দ্বিতীয় সংস্করণে প্রকাশিত এই উপন্যাসের পটভূমি স্বাধীন বাংলাদেশ। সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা যে দেশটি আমরা বহু ত্যাগের বিনিময়ে পেয়েছি সেই দেশের সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে রচিত। দুটি প্রজন্মের জীবনআখ্যান এখানে রচনা করা হয়েছে। প্রায় এক যুগেরও আগে লেখা উপন্যাসটির যে প্রেক্ষাপট মনে হয় তা যেন আজকের যে বাংলাদেশ, যেসব সামাজিক বিশৃঙ্খলতা এবং অধঃপতন তা যেন আরো স্পষ্ট করে।
রুহান, শারমিন, রাস্নাকে দিয়ে শুরু হয়েছে প্রথম প্রজন্ম।স্কুল কলেজে একসঙ্গে পড়া রুহান ও শারমিনের বন্ধুত্ব, শারমিন রুহানকে ভালোবাসলেও তা বলার আগেই রাস্নার সঙ্গে রুহানের প্রেম হয়ে যায়। শারমিন অভিমানে দেশের বাইরে চলে যায়। পড়াশোনা শেষে দেশের জন্য কিছু করার অভিপ্রায়ে যখন ফিরে আসে দেশে তখন রুহান-রাসনার সংসার পুত্র রায়ানের আগমনে পূর্ণতা পেয়েছে।
শারমিনের রেখে যাওয়া আগের শহর বদলে গেছে অনেকটাই। রাজনীতির ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে বস্তি গড়ে উঠেছে শহরের মধ্যে। ক্ষমতাবানরা বস্তির নানারকম সমস্যা সমাধানের বদলে বরং তা জিইয়ে রাখতে পছন্দ করে রুহান ও শারমিনের কাছে এই তথ্য তখনো পরিষ্কার হয় নি পুরোপুরি। লেকার্স সোসাইটি নামক একটি সংগঠন বস্তিকে ব্যবহার করে ফায়দা লুটছে। শারমিন কিছু করতে চাইলে তাদের মধ্যমেই করতে হবে বললে শারমিন তাতে রাজি হয় না।
তাদের সঙ্গে না মিলে পৌর মেয়রের অনুমোদন সাপেক্ষে শারমিন বিল মিলিন্দা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে যখন বস্তির শিশু কিশোরদের শিক্ষাদানের প্রোজেক্টি চালু করলো তখন থেকেই বিপর্যয় নেমে এলো বন্ধু রুহানের সংসারে কেননা রুহান এই প্রজেক্টে শারমিনের পাশে ছিল। একমাত্র ছেলে রায়ান অপহৃত হলো, স্ত্রীর সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করা হলো এবং একটা পর্যায়ে এসে স্ত্রী রাসনা অভিমান করে ডাক্তার না দেখিয়ে মৃত্যুকে বেছে নিলেন।
রুহানের প্রতি দুর্বলতা ছিল তার উপর রায়ান এতিম হয়ে গেলে শারমিন সেই দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিতে চাইলো। রায়ানকে নিজের সন্তান হিসেবে চাইলো শারমিন। কিন্তু রুহান কোনো এক অন্ধআবেগের বশে এবং হয়তো দেশের প্রতি অভিমান থেকেই ছেলেকে নিয়ে চলে গেল সুদূর স্পেনে। ছেলে বড় হলো একসময় কিন্তু তার মনে গেঁথে যাওয়া ছোটবেলার বন্ধু রুহিকে সে ভোলে নি। বড় হয়ে সে বাংলাদেশে ফিরে এসে দেখতে পেলো রুহি ভীষণ ব্যস্ত এক মিডিয়া স্টার। রায়ানকে দেবার জন্য সময়ের বড় অভাব তার হাতে।
বাবার জীবনের কাহিনিটা যেন উল্টো করে ঘুরিয়ে দিলেন সৃষ্টিকর্তা। শারমিনের জায়গায় রায়ানকে অধিষ্ঠিত করা হলো। তবে রায়ান একসময় এই বেদনা সামলে উঠলো মোনা নামক এক গভীর মননের মেয়ের প্রেমে পড়ে। মোনা আবার রুহির বান্ধবি এবং সে তখন সদ্য বিবাহিত। বিবাহিত মোনার প্রেম আহ্বানে ভেসে গেল রায়ান। আর এই কথা জানতে পেরে রুহি যেন নিজের মনের ভেতরের আয়নায় নিজেকে দেখবার অবসর খুঁজে নিলো। রুহি আবিস্কার করলো সে আসলে সারাজীবন রায়ানকেই চেয়ে এসেছে, রায়ানই ওর সত্ত্বা দখল করে আছে যুগ যুগ ধরে। রুহির ভুলে রায়ান ভুল করে মোনার কাছে গিয়েছে। মোনার কাছ থেকে কিংবা এই অসামাজিক সম্পর্ক থেকে কীভাবে ফেরাবে রায়ানকে এসব ভাবার আগেই রায়ান ফেঁসে গেল এক খুনের মামলায়। রায়ানকে মুক্ত করতে গিয়ে মোনা নিজের চরিত্রের উপর কলংক মেনে নিলো, ডিভোর্স চাইলো স্বামীর কাছে। রায়ানের সন্তান তখন মোনার গর্ভে।
ডিভোর্স দেবে বলে মোনাকে মিথ্যা কথা বলে দূরে নিয়ে গিয়ে খুন করে ফেললো মোনার স্বামী। রায়ান জেল থেকে বের হলো একসময়। সেই যে রুহানের বন্ধু ছিল শারমিন, সেই শারমিন পুত্রস্নেহবশত রায়ানকে উদ্ধারের জন্য সমস্ত আইনি লড়াই একজন লড়াকু নারীর মতো চালিয়ে গেলেন। এবং রায়ানকে তিনি মুক্ত করে আনলেন। ইতোমধ্যে রায়ান শারমিনকে মা বলে ডেকেছে রুহানকে জানানো ছাড়াই।
শারমিনের ভয়ংকর অতীত (লেকার্স সোসাইটির মানুষগুলো শারমিনকে স্কুলটি চালাতে দেয় নি, গণধর্ষণের শিকার হয়েছিল শারমিন), মায়ের মৃত্যুর কারণ জানতে পেরে এবং প্রেমিকা মোনা হারানোর বেদনায় বিমূঢ় হয়ে থাকলো রায়ান। মোনার স্বামী সেই লেকার্স সোসাইটির একজনের পুত্র এবং এখন পর্যন্ত তারা সমাজে বুক ফুলিয়ে চলে এসেছে। শারমিনের সেই ঘটনার পর তারা কেবল শহর বদলে রাজধানীতে এসেছে। আর কোনো শাস্তি হয় নি তাদের।
রুহি সিদ্ধান্ত নেয় বান্ধবীকে খুনের প্রতিশোধ নেবে রায়ানকে না জানিয়েই। একটা গোষ্ঠী যুগের পর যুগ ধরে অন্যায় করে যাচ্ছে এই দেশে। আইনের ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে যারা তাদেরকে তাদের মতো করেই শায়েস্তা করবে। রায়ান কি তাই হতে দেবে? স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে না সে?
মোনাকে হারানোর পর রুহিকেও একইভাবে হারানোর পথটা কি খোলা রাখবে রায়ান? নাকি বাবার মতো করে সেও শুধু নিজে বাঁচার জন্য স্বার্থপর হবে?
পড়ার শুরুর দিকে এটি একটি ত্রিভুজ প্রেমের গল্প বলে মনে হলেও আদতে এর মূল আরো গভীরে প্রোথিত করেছেন কৌশলী এই লেখক। বৃক্ষের যেমন মূল শিকড় আর গৌণ শিকড় থাকে বিষয়টা অনেকটা এমন। প্রেম এখানে গৌণ শিকড় হয়ে আমাদেরকে নিয়ে গেছে দেশের অরাজকতার মূল শিকড়ের কাছে।
পাখির চোখে আমাদের দেশের বর্তমান অবস্থাটা তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং পাঠককে গল্পে গল্পে প্রেমের ও আবেগের মধ্য দিয়ে তাই দেখানোর চেষ্টা করেছেন। এদেশে মানুষের স্বাভাবিক জীবন, দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টাকে কীভাবে ক্ষমতার দাপট দেখানো লোকদের হাতে কুঁড়িতেই বিনষ্ট হয়ে যায় তার উদাহরণ প্রেমের গল্পের মাধ্যমে বলার ধরণ দেখে অভিভূত হয়েছি।
নিম্নআয়ের মানুষ তথা বস্তিতে যারা থাকেন তাদের জীবনযাপনের ধরণ, তাদের বাচ্চাদের বখে যাবার মূল কারণগুলো যেভাবে উপস্থাপিত হয়েছে তাতে লেখক নিজে ফিল্ড ওয়ার্ক করেছেন মনে হয়েছে। সমস্যার মূল এবং তার প্রতিকার কীভাবে করা যায় সেই সমাধানও তিনি দিয়েছেন। ত্রিমোহিনী পড়ার কারণে আমি জানি লেখক গভীর অনুসন্ধানী দৃষ্টিসম্পন্ন একজন মানুষ। আমরা যেভাবে দেখি তিনি সেভাবে দেখেন না। তার দেখায় আর্ট বা শিল্প থাকে। একজন আর্টিস্ট যেমন ছবি আঁকার সময় জানেন কোন তুলিতে কোন আঁচড় ভালো হবে তিনিও সেভাবেই তাঁর গল্পকে তুলে আনেন। চরম এক সমাজবাস্তবতা তুলে আনতে গিয়েও লেখকের ভাষা এবং শব্দবুঁননের যে ঐন্দ্রজালিক আবহ তা থেকেও তিনি বিচ্যূত হন নি।
সমাজ বা রাষ্ট্রীয় সমস্যাকে শিল্পীত ভঙ্গিমায় চিহ্নিত করে তার সমাধান বাতলে দিয়েছেন তিনি। কিন্তু একইসঙ্গে তিনি শিল্পীর জায়গা থেকে সরে সাধারণ মানুষের কাতারে এসে দাঁড়িয়ে দেখেছেন, এভাবে কোনো সমাধানই আসলে আলোর মুখ দেখবে না যদি ক্ষমতাসীন মানুষগুলো না বদলায় এবং দেশের আপামর জনসাধারণের মধ্যে বেসিক সততা না থাকে। তাই তো তিনি দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে দেশের বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন উপন্যাসের কুশীলবদের। সেই ২০১২ সালে তিনি যে বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করে উপন্যাসে তুলে এনেছেন সেই-বাস্তবতাই যেন আজকাল চরম আকার ধারণ করেছে। বাস্তব বড় নির্মম! পাঠক হিসেবে আমার মন খারাপ হয়েছে। জানি, উপায় নেই/ছিল না তবুও দেশকে ছেড়ে যেতে কার ভালো লাগে!
ষাটের দশক থেকে বাংলা সাহিত্যের যে ধারা, গল্প-উপন্যাস তৈরির যে ভাষা-ভঙ্গিমা; কাজী রাফি যেন সেই পরম্পরার বাইরের ধাঁচের একজন গল্পকার। একইসাথে তাঁর ভাষা দ্রুতগতিসম্পন্ন আবার কোথাও কোথাও থামিয়ে দেয়, ভাবতে বাধ্য করে। তাঁর গল্প বলার ধরণও সরলরৈখিক নয়। একটা উপন্যাসের বহু চরিত্র এবং যে বহুস্তরবিশিষ্ট যে বর্ণিল ক্যানভ্যাস তা তাঁর উপন্যাসে আমরা খুঁজে পাই। জীবন এবং জগতের জটিলতা এবং তা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পেতে তাঁর উপন্যাস মাইলফলকের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। আর ভাষার মাধ্যমে কাজী রাফি তাঁর গল্প-উপন্যাসে যে আবহ এবং অনুভব ছড়িয়ে দেন তা ঐন্দ্রজালিক, মানুষের অন্তর্গত চেতনার কুহক এবং কুহেলিকা হয়ে খেলা করে। পাঠকের মন এবং মননে দীর্ঘস্থায়ী এক রেখাপাত রেখে যায় তাঁর লেখাগুলো। আমি মনে করি, গল্প-উপন্যাস সৃষ্টির এই জাদুকাঠিটিই কাজী রাফির সৃষ্টির এক উল্লেখযোগ্য দিক। এই উপন্যাসটি সাহিত্য হিসেবে আমাকে উচ্চাশা দেখিয়েছে। মনে হয়েছে এই বইটিও অনুবাদ হলে আমরা আন্তর্জাতিক মহলে বড় কোনো পুরস্কার পেয়েও যেতে পারি। বুকারপ্রাপ্ত লেভেলের একটি বই বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। উপন্যাসটি জনপ্রিয় হোক সেই কামনার সঙ্গে সঙ্গে আশা করছি, লেখক কাজী রাফি তার এই বই এবং ভবিষ্যতে আসা নতুন নতুন বই দিয়ে আমাদের বাংলা সাহিত্যজগতকে সমৃদ্ধ করে যাবেন প্রতিনিয়ত। এ ধরনের উপন্যাসের অনুবাদের মাধ্যমে আমরাও বিশ্বসাহিত্য এবং বিশ্ববাসিকে আমদের সাহিত্যের প্রতিও আগ্রহান্বিত করে তুলতে পারি।
অনেক অনেক শুভকামনা লেখকের জন্য।
অলংকরণঃ তাইফ আদনান
