জলধি / গল্প / চলুন নাহয় ঘুরেই আসি
Share:
চলুন নাহয় ঘুরেই আসি

জলপুকুর যেতে চাইলে কিছুটা পথ হাঁটতে হবে আমাদের। যেতে হবে নদীর ঘাটে। ওখানেই নৌকা পাব আমরা। ভাড়া চুকিয়ে চলে যাব জলপুকুর। ততক্ষণে হয়তো দুপুর হয়ে আসবে, তবু সে দুপুরেও দেখা যাবে শঙ্খচিল উড়ছে নদীর আকাশে, সাঁতার কাটছে পানকৌড়ি আর তাড়াতাড়ি করে নেমে আসছে ছোটও না বড়ও না এমন একটা ছেলে আমরা তাকে পা-ন্-নাবলে ডাকব। তাদেরই বাড়ি যাব আমরা। উঠতে থাকব পাড় বেয়ে। আর ঠিক তখনই নেমে আসবে সুন্দর একটি মেয়ে। পাশ দিয়ে এগিয়ে নৌকায় গিয়ে বসবে। ওদিকেই আটকে থাকবে শিশিরের চোখ। যদিও তাকে তার চেনার কথা না, তবু অচেনাও মনে হবে না। আমরা অবশ্য এসব নিয়ে মাথা ঘামাব না। তাই বলে যে নদীর দিকে তাকাব না, তাও না। তাকাব এবং ভালো করে দেখব তার ভেসে চলা, জলের ভাষায় কথা বলা। সবুজ গাছপালা দেখে আপনি হয়তো কবি হয়ে উঠবেন। কান ওড়ালেই শুনবেন, শিশির বলছে পান্নাকে,

কে রে, চিনিস?

সে চিনতে পারবে। এমনকি মাথাও নাড়াবে। তবে এর বেশি কিছু বলবে না। আপনি হয়তো খেয়ালই করবেন না। ওই যে বললাম, কবিতা এসে ভর করবে আপনার কাঁধে? মনের মধ্যে জীবনানন্দও জেগে উঠবেন হয়তো। আবার হয়তো ফিরে আসতে চাইবেন। কী মনে করে জড়িয়ে ধরবেন আমাকে। আর এসব আদেখলাপনা দেখে মেয়েটি ঠোঁট টিপে হাসবে। হয়তো বলেও ফেলবে,

এতদিন কোথায় ছিলেন?

এর উত্তর যে আমাদের জানা থাকবে না, তা আপনিও জানেন। তাই আবার আমরা হাঁটতে শুরু করব। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছেও যাব যেখানে যাবার জন্য ব্যাগ গুছিয়েছিলাম, সেখানে। পেছনে পড়ে থাকবে শিরিষ অথবা শিমুলের গাছ। গাছের তলায় বসে থাকবেন বুড়ো কোনো লোক। তাঁকে সালাম দেব। দিয়ে গলিতে গিয়ে দাঁড়াব। দু-একটা কথাও বলব বারান্দায়। তারপর ঘরে ঢুকে বসে পড়ব পান্নার বিছানায়। এদিকে বেলা গড়ে যাওয়ায় সে বলবে,

বসলে যে ভাইয়া! চল খেয়ে নিই।

আমি নিশ্চিত- খাওয়ার কথা শুনে আপনারও খুব খিদে পাবে। খড়ি মাছের ঝোলও ভেসে উঠবে চোখের সামনে। অথচ অকারণে টিকটিক করবে দেয়াল ঘড়িটা। পেটটা মোচড়াবে। তবে বসে থাকতে হবে আরও কিছুক্ষণ। আর তখন আপনার আগ্রহ জাগবে যার বিয়ের জন্য এসেছেন, তার সাথে একটু কথা বলার। আপনার কেনা শাড়িটা মেয়েটার গায়ে মানাবে কিনা সেটাও সংগোপনে দেখে নিতে চাইবেন। এক পর্যায়ে বলবেনও,

আমেনা আসছে না কেন?

আমি আস্তে করে বলব, ‘কাহিনি আছে।

আর আপনিও চোখের পাতা নেড়ে জিজ্ঞেস করবেন, ‘কী কাহিনি?’

আমি হয়তো বলতেই যাব; তখনই শুনব খালা-আম্মা খেতে ডাকছেন। ভাত বেড়েও রাখবেন। তবে যেহেতু হাত ধুতে হবে, তাই কলতলায় যেতে হবে আমাদের। তাঁদের গলিতেই পোঁতা থাকবে সেই কলটা। সবুজ একটা দাগও থাকবে নলের মুখে। আমাদেরই কাউকে হাতলে বাঁধা বাঁশ চেপে জল ওঠাতে হবে। তবে সে জলে সবার আগে মুখ ধোবে সে। আমেনা এসে এগিয়ে দেবে গা-মোছা গামছা। কে জানে, হয়তো তাতে লেগে থাকবে তার গতরের গন্ধ। সে গন্ধে চোখ বন্ধ হয়ে যাবে শিশিরের। আর আমার মনে পড়ে যাবে, আপনাকে বলা হয়নি, কী ছিল সেই কাহিনি। একটু সুযোগ পেয়ে তখনই বলে ফেলব। আপনি শুনবেন এবং জানতেও চাইবেন,

শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল?

আমি বলব, ‘এই কলের কাছেই তাকে না করে দিয়েছিল।

কিন্তু কী জন্য এই না’, তা জানা না-থাকায় বেশিকিছু বলতে পারব না। জানি, আপনিও জোর করবেন না। এমনকি সে যে স্মৃতির ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়বে, সেটাও সেভাবে খেয়াল করব না আমরা। উল্টো খেয়েদেয়ে গা এলিয়ে শুয়ে থাকব। আপনি কবিতা পড়লে সেটা মন দিয়ে শুনব। চোখ বুজে চলেও যাব চেনা-অচেনা-আধচেনা জগতে। যেখানে দেখা যাবে কাক-চিল সারস-শালিক বক-পায়রার দল। দোল খাবে অসংখ্য ধানগাছ। সোনালি শিষে ঝরে পড়বে রোদেলা আলো। অথচ সে যে মুখ কালো করে তাকিয়ে আছে বাইরে, সেটা হয়তো অনেকক্ষণই অদেখা রয়ে যাবে। তবে একসময় ঠিকই আমাদের চোখে পড়বে, কোনো একটা গাছের দিকে অপলকে চেয়ে আছে ছেলেটা। সম্ভবত শিমুল গাছ হবে সেটা। দু-একটা ফুলও ফুটে থাকবে অথবা থাকবে না। তবে সে চোখ সরাবে না সেদিক থেকে। আটকেই থাকবে তার চোখ। আর আমাদের চোখে ভেসে উঠবে সুন্দর কোনো মুখ। কী মনে করে মুখটার একটা নাম দেবেন আপনি। বলবেন,

তার নাম শিমুল।

আর আমারও মনে হবে, সে-ই আমাদের শিমুল বিনতে সামিউল, যে ছিল সফিকুল স্যারের ভাতিজি। যদিও ততদিনে তাকে হারিয়ে ফেলব আমরা, তবু যতদিন চড়ুই পাখিরা চোখে চোখে রাখত, অনেকেরই ঠোঁটে লেগে থাকত, তারই একদিন তাদের বাড়ি যাওয়া হবে আমাদের। মূলত স্যারের সাথেই দেখা করতে যাব। তবে শিমুলকেও দেখতে পাব সেখানে। আর ভাগ্যগুণে সাক্ষী হব সুন্দর একটা স্মৃতির। সেই স্মৃতির পরশে পাগল হয়ে যাবে ছেলেটা। কিন্তু কী একটা কারণে মেয়েটা চলে যাবে চোখের আড়ালে। তাই বলে কি সে ভুলে যাবে তাকে? ভুলবে না; বরং ভেঙে পড়বে। তখন বন্ধু হিসেবে আমাকেই বলতে হবে,

যা, কোথাও থেকে ঘুরে আয়।

সে কথা শুনেই বোধহয় সে-বার সে গিয়ে থাকবে সেখানে। আমেনাও তাকে সময় দেবে সকাল-বিকাল। সন্ধ্যাতেও হয়তো হাঁটতে বেরুবে তারা। আর সেভাবেই সৃষ্টি হবে সেই মুহূর্তটির, যেটি তারই একটু আগে শোনাব আপনাকে। তবে এমনও হতে পারে, শিমুল নয়; আমেনাই কল্পনায় আঁকিবুঁকি কাটবে। সেই হঠাৎ দেখা মেয়েটিও আসতে পারে কল্পনা হয়ে। তবুও এটা আমি জোর দিয়েই বলব যে, ঝরে পড়া শিমুলের পাতা নিশ্চয় মনে করিয়ে দেবে সেই কবিতাটা, যেটা সে লিখেছিল শিমুলকে নিয়ে। শুয়ে শুয়ে সেটা স্মরণ করব আমি; এবং শোনাবও আপনাকে। যেহেতু কবিতার সাথে সংযোগ থাকবে আপনার, সেহেতু শুনেই বুঝতে পারবেন বাকিটা। জানালাটা খোলাই থাকবে। আপনিও তকিয়ে থাকবেন গাছটার দিকে। দেখবেন ফুলটুল কিছু ফুটেছে কিনা। অথচ আমরা টেরই পাব না তার হৃদয় ফুঁড়ে উঠে আসছে ছপছপে বেদনা। চোখ দুটোও ভিজে উঠবে। হয়তো কিছু বলতেও চাইবে। কিন্তু তার আগেই এসে পড়বে পান্না। বলবে,

চল ভাইয়া, চা খেয়ে আসি।

খুশি হয়েই বাইরে বের হব। হাঁটতেও থাকব। শুনতে পাব শিয়ালের ডাক। কাক কা কা করবে। বাদুড় উড়ে যাবে ওপাশ দিয়ে। কিছুটা নত হয়ে হেলে পড়া বাঁশটা পার হব আমরা। শুনতে পাব গানের শব্দ। উচ্চ শব্দে গান বাজবে কাছেরই কোনো এক দোকানে। আমরা সেখানে বসব না। তবে যেখানে গিয়ে বসব, সেখানে হয়তো টিভি থাকবে না, তবে ঠিকই বসে থাকবে বেশ কয়েকজন। তাদেরই একজন ঢুকে পড়বে আমাদের মাঝে। জানতে চাইবে এটা-ওটা। স্বাভাবিকভাবেই সেটা কারও ভালো লাগবে না। তাই আর বসে থাকতে চাইব না; আর্লিই উঠে যাব। তবে যাবার সময় সালাম দেয়ায় শুনতে পাব,

আজমত ভুল কললে জি; ঘরেই তো ভালো ছাইল্যা ছিল।

চট করেই কথাটা হয়তো ধরতে পারবেন না আপনি। মাথার ওপর দিয়ে যাবে। তবে আমার ঠিকই মনে পড়বে পুরনো কোনো কথা। এবং যখন আপনিও জানবেন যে, এমন একটা কথা শিরিষ কিংবা শিমুলের নিচে বসে থাকা বুড়োটাও বলেছিলেন একবার, তখন তা জানার আগ্রহ পেয়ে বসবে আপনাকে। আমাকে জিজ্ঞেসও করবেন। তবে শিশির সাথে থাকায় চোখের ইশারায় বলব,

একটু পরে।

কী মনে করে ঝোপ দেখে দাঁড়িয়ে যাব। কিন্তু কোপ মারতে পারব না। মানে একটা সিগারেট খেতে চাইলেও পান্না পাশে থাকায় সেটা সম্ভব হবে না। তাকে যেতেও বলতে পারব না। শেষমেশ তাদের সাথেই এগোব। আঙিনায় এসে চমকেও উঠব মেয়েটিকে দেখে। ওই মেয়েটিকে দেখে, যাকে নদীর পাড়ে দেখেছিল শিশির, ঘাড়ও ঘুরিয়েছিল কয়েকবার, সেই মেয়েটি এসে বসে থাকবে আমেনার সাথে। জোসনা-রাতে কী সুন্দরই-না লাগবে তাকে! আমাকেও আকৃষ্ট করবে। তবে আপনার যে কী হবে! সঙ্কোচে সরে দাঁড়াবেন। আমিও বাইরে চলে যাব। শিশির অবশ্য ওখানেই থাকবে। এদিক-ওদিক তাকাবে। কিন্তু আমাদের দেখতে না পেয়ে একসময় একা একাই চলে যাবে নির্জন জায়গায়। তাই একটু পরেই পান্নার বিছানায় কিংবা ঘরের বারান্দায় তাকে আর পাব না আমরা। তখনও জেগে থাকবে আকাশের তারা। তারই আলোয় শিমুলগাছটার কাছে যাব। দু-একটা পাতাও কুড়াব। দেখাও পাব বুড়ো লোকটার। কিন্তু তিনিও বলতে পারবেন না শিশিরকে দেখেছেন কিনা। আমাদেরও আর কিছুই করার থাকবে না। ঘরে গিয়ে শুয়ে থাকব। আর হ্যাঁ, অতি অবশ্যই ফোনেও ট্রাই করব। কিন্তু রিচ করতে পারব না। সম্ভবত সুইচ অফ করে রাখবে।

কে জানে, হয়তো একা একাই হেঁটে বেড়াবে নদীর পাড়ে। তার কোমল ঘাড়ে ভর করবে কোনো এক কবিতা-কুমারী। তারই শ্রীচরণে নৈবেদ্য নিবেদন করবে ছেলেটা। যদিও রাতটা ভারী হয়ে আসবে, তবুও তা বকের পালকের মতো মনে হবে তার। অথচ আপনার এবং আমার চোখের পাতা বুজে আসবে। সেও ফিরে আসবে একসময়। দ্রুতই হেঁটে আসবে। তবু প্রশ্নের তীর ছুটে যাবে তার দিকে-কোথায় গিয়েছিলি, কী করছিলি, আমেনা কই? এসব শুনে সে আকাশ থেকে পড়বে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবে। বুঝতে পারবে না কোনোকিছু। এমনকি কেউ একজন দু-চার চড় বসিয়ে দিলেও বলতে পারবে না- আমেনা কোথায় গেল; কার সাথে গেল। তবে আমাদেরই কেউ একজন (হয় আপনি নাহয় আমি) তখন চিৎকার করে বলে উঠব, ‘ওই যে ওই দিকে দেখুন, আমের ডালে ঝুলে আছে আমেনা।' কোনো কারণই থাকবে না; তবুও পুলিশ এসে নিয়ে যাবে তাকে।



অলংকরণঃ তাইফ আদনান