ঘরের ভিতরটা আপনারা কল্পনা করে নিতে পারেন, দৈন্য আর দুর্দশা এক সাথে হাত ধরলে যে হতশ্রী! তো একটু ভিতরটা দেখি, তোশক বিছানো একটা খাট আছে চৌকি সদৃশ্য। তোশক খুলে তুলা বের হয়নি কোনো দিন কেননা তালিতে আনাতুলের মা অতি নিপুণা, বলতে পারেন অর্ধশতক আগের চিমসা তোশকের আসল কাপড় আর কোথাও দৃশ্যমান নাই, না থাক তাতে কী ক্ষতি! পৈত্রিক আসবাব বলতে ভূতের মতো বাবলা কাঠের একখানা তেলতেলা মজবুত চেয়ার ছোট জানালার পাশে বিছানা ঘেঁষে, ঢেঁকি বানাতে বানাতে চেয়ারখানা নাকি কীভাবে তৈরি করে ফেলেছিল রাজমিস্ত্রী, অবাক করা গল্প সেটা, মানে তারা ব্যাপারটাকে অবাকের স্তরেই ভাবে বটে! কাঠের ফ্রেমে টিনের চৌচালা ঘর তাদের, প্লাস্টিকের কিছু ডিব্বা-ডাব্বা কাঠের সেলফে আর কোনার দিকে মাটির মটকা দুইটা, মটকায় কিছু নাই, ধরেন ভিতরে বাহিরে কিছু হাতের ছাপ আর শত বছরের মায়া ছাড়া। আর ঘরের ভিতরের ছায়াছন্নতা হা করা বিষণ্ণতাকে কীভাবে ডেকে আনে এ সব দুঃসময়ে তা তো জানেনই!
ঘরের চারধারে অন্যের কি নিজেদের কিছু গাছ, শীতে-শৈত্যে আহত বাতাবি লেবু আম কামরাঙা করমচার ঝাড়, টিনের কানচি কিনারায় মাকড়সার জালে মরা পাতা আর রুগ্ন সজনের গায়ে জঙলা লতা। এই সব গাছগাছালি কোনো বসন্তে কি বর্ষায় ফুল ফুটে ঘ্রাণ ছড়ালে কি ঝরালে বিষণ্ণতায় হাহাকার করে উঠতে পারে আনাতুলের মায়ের পরান! সে কি বার বার স্বামী হারানোয়, নাকি বিধাতার না দেয়া সন্তানের কারণে শিকড় না গজানো জীবনের জন্য!
আনাতুলের মায়ের তৃতীয় স্বামীর ঘর এটা। আনাতুল তার পেটের সন্তান নয়। তার আসল নামটা আমরা জানি না, এমন একটা এলেবেলে নারীর নাম দিয়ে কী হবে বলেন! অন্তত মাইল খানেক লম্বা শিমুলিয়া গাঁয়ের কারো তো কোনো প্রয়োজন নাই তার নামে! জানে ভবের চরে আনাতুলের মায়ের যে বোনটা বেঁচে আছে বৃদ্ধ বয়সে অচল, আর হয়ত আনাতুলের মা নিজে। আর আনাতুলের বাবাকে একবার জিজ্ঞাসা করে দেখা যেত, কী নাম তার এই দ্বিতীয় স্ত্রীর! হায়, সে তো আর কথা বলবে না! সে পরে সময় পেলে জানার চেষ্টা হবে, সে নাকি ডায়েরি লিখত কোনো কালে! সেখানে আছে নাকি নামটা! কোথায় সে সব কে জানে! ডায়েরি আসলে গুজব, সামান্য কৃপণকে কি কৃপণতাকে পোক্ত করার জন্য ডায়েরি নামের ষড়যন্ত্র স্বজন-প্রতিবেশীর! আছে একটা হিসাবের খাতা, গঞ্জে একটা কাপড়ের দোকান থাকতে তারই হিসাবপত্র। বদুরপুরা বেলতলী চৈত্রমাসে লেংটার দরগায় গামছা লুঙ্গির গাঁটরি নিয়ে গেছে বয়স কালে প্রতি বছর কিছু কাঁচা টাকার লাভে, সে সব টাকারই হিসাব খাতায়! তখন তার দোকান ছিল না, সত্যি দারুণ ব্যবসা ছিল কয়দিনের! মন ভালো থাকলে এ সব গল্প দু’একবার করেছে বটে খাতাটা হাতে নিয়ে আনাতুলের মায়ের সাথে। কখনো ব্যবসার কথা ছেড়ে লেংটার কেরামতির গল্প করতে করতে বিভোর দু’চোখ... চৈত্রের খরায় কীভাবে বউঝিয়ের পানির সমস্যা সমাধান করেছে নিজের নেংটি সরিয়ে উঠান ভাসিয়ে ... হোতের লাহান পানিয়ে ভাইসা যায় উডান, কলস ভরে, নাদা ভরে, উডান লেপে। থৈ থৈ পানি দেইখা বউঝিয়েরা আনন্দে আত্মহারা, আহা...। গল্প বলে চোখ বন্ধ করে, যেন দেখতে পাচ্ছে লেংটা ফকিরকে! বস্তুতঃ বাপদাদার মুখে শোনা গল্প, দাদা দেখেছে কিনা তাও সে জানে না। গল্পটা এখন অবিকল আনাতুলের মা বলে প্রতি বছর লেংটার দরগায় গমনেচ্ছু নতুন বউঝিদের, বড়ো মিষ্টি তার গল্প বলা, রসে টইটুম্বুর বাক্যসমগ্র!
মাঠে আবাদী জমি থাকলেও গামছা পরে নিড়ানি দেয়ার রেওয়াজ নাই নাকি আনাতুলদের গুষ্ঠিতে, বর্গাচাষীরা যা দিয়ে যায় তাতে বছর খোড়াকি কখনো হয় কখনো হয় না। মাঠ ভরা জমি থাকলেই কি! বর্ষা বন্যার দেশ, ব্যাপারটা বুঝতে হবে, ডুব দিয়ে ধানপাট কাটার দেশ এটা। হ্যা, এখন শরীরে না কুলালে বেলতলীর দোকানটা ভাড়া দেয়া হয়েছে তাও সাত বছর, মাসে সাড়ে তিন হাজার টাকা এখন, দুই দিয়ে শুরু হয়েছিল বটে। সেই সাড়ে তিন হাজার টাকাতেই বাজার সদাই ওষুধপত্র এনে দেয় আনাতুল, শহরে আনাতুল ঝুট ব্যবসায় সম্প্রতি নিজেকে জড়াতে সক্ষম হলেও এখনও পসার হয় নাই সেইভাবে, ভবিষ্যতে হবেই, তখন প্রতিপক্ষকে সে খুন করতে পারে কিংবা নিজে খুন হয়ে যেতে পারে, চরের মানুষের কাছে অবশ্য খুন-খারাবি বারোয়ারি শব্দ, বর্শা, বল্লম, কাত্তা তো জন্মবন্ধু! এককালের সিকস্তি পয়োস্তি জমিজিরাত, চরদখল বিবাদ এখন না থাকলেও উপজেলা নির্বাচন, ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন, রাজনীতির কুটিল হিসাবে প্রাণ দেয়া নেয়া মামুলি ব্যাপার। চরে লাঠির ঐতিহ্য প্রাণ পায় চাপাতি কি দোনলায়!
শীতের বিল জেগে উঠেছে হরেক শাকের বৈভব নিয়ে। কোথাও কাদা প্যাচপ্যাচে বিলের বুকে কচুরিপানায় বেগুনি ফুল। শীতে সুদিনে খাল থেকে বাড়ি অনেকটা চড়াই উৎরাই শুধু বাড়ির বউঝিদের আর খালের পানিতে অবগাহন ইচ্ছুদের জন্য। নৌপথ ব্যবহার কমে গেছে বছর পনের, অটো এখন ঘরের দরোজায়, ঢাকা দুই আড়াই ঘণ্টায় যম-জ্যাম না থাকলে। মরাবাড়িতে একটু পরেই সব চলে আসবে, তারপর...। হুম, আলো ফুটতে শুরু হতেই বাড়ি ভরে যাবে মানুষে মানুষে!
আনাতুলের মায়ের আজকে একটু বেশি শীত যেন, হ্যাঁ। অন্যদিন একমুঠো পাটকাঠিতে তোলা চুলায় ঘরের কোনে দুকাপ চা হয়, একটা তেজপাতা ছেড়ে দিলে সুঘ্রাণ ছায়া ছায়া শীতল ঘরে, বেড়ায় লুকিয়ে থাকা মাকড়সার জালে। সে সবাইকে ধরে ধরে বলে, পাকা তেজপাতার সুবাস আসলেই একটা বেহেস্তি ব্যাপার, বাজারি তেজপাতা একটা হুদা জিনিস, কিচ্ছু ঘেরান নাই! খাল থেকে রান্নার পানি আনার সময় বাচ্চু চেয়ারম্যানের সুবিশাল বাগিচার পাকা সীমানার বাইরে পড়ে থাকা পাকা পাতা দু’চারটা কুড়িয়ে এনে রাখে প্লাস্টিকের বৈয়ামে, অনেকেই যেমন আনে।
দু’কাপ চা আর বেতের পুড়ায় মুড়ি। বৃদ্ধ স্বামীকে কোনো রকমে আধবসা করে মুখ ধুয়ে সোয়েটার পরিয়ে মোজায় পা সেঁদিয়ে - নেন একটু চা খান!
আনাতুলের বাপ চা খায় তেজপাতার, শুধু তেজপাতার চা। চা পাতা যখন থাকে তখন তেজপাতা দেয় না, দেয় এক কণা আদা, মাসের দশ কি বার দিন আদা-চা। বড়ো ছেলে আনাতুল মাসের বাজার করে দিয়ে যায়, তাতে একশ গ্রাম চা থাকে সত্যি। বাজারে সবই থাকে চাল ছাড়া, যার অর্ধেকটা নিয়ে যায় পাশের দোচালায় থাকা আনাতুলের একমাত্র বোন সাবানা, তালাকপ্রাপ্ত বুদ্ধিখাটো মাঝবয়সী মেয়ে, এক ছেলের মা। ছেলে তার নদীর ওপাড়ে ফোরকানিয়া মাদ্রাসায় পড়ে, খরচ জোগায় সৌদি আরবে থাকা আরেক ভাই জামাতুল। শ্রমিক ভাই সিমেন্টের ব্লক পিঠে নিয়ে ওপরে ওঠে, কাজটা তার কঠিন, রাতে মাজার ব্যথায় কোঁকালেও পরদিন কামাই দেয়ার কথা চিন্তাও করতে পারে না, দালাল আর টিকেট মিলে লগ্নি অনেক যে! বোন যে বাপের ভিটায় ফিরে এলো তা দেখার একমাত্র লোক হিসাবে সেইই মাদ্রাসার খরচ বাবদ মাসে দেড় হাজার টাকা পাঠায়, টাকা সরাসরি মাদ্রাসা একাউন্টে ঢোকে, দেশ এগিয়েছে বটে। ফলে বাপের মাসের বাজারে ভাগ বসান ছাড়া উপায় কী সাবানার! ব্যাপারটা আসলে ঝগড়া পর্যন্ত গড়াতে দেয় না আনাতুলের মা, আনাতুল এনে দেয়, তার বোন নিয়ে যায়, এই তো! লোকে অবশ্য সুযোগ পেলেই উস্কাতে চায়, চাইবে না কেন, জামাইর ভাত খাইতে না পারার অমর্যাদা আছে না! সাবানা এই অমর্যাদা ভোগ করবে না! উপভোগ করা প্রতিবেশিরা গাল বাঁকিয়ে চোখ ভ্রু নাচিয়ে তো বলবেই - হাবলু মাগি এই কয়ডা জিনিস থেইক্যাও ভাগ নিতে আইয়ে তোমার কাছে, শুয়ারনি!
অন্যদিন ভোরে খালপাড়ে গিয়ে কাপড় ধোয়ার সিমেন্টের আসনটায় বসে থাকে কলসি নামিয়ে। জনমানবের আনাগোনা নাই, খাল আর আনাতুলের মা। জোয়ারের পানি বেড়ে বেড়ে পাড়ের শুকনা বালি ভিজে উঠছে। ঘন কুয়াশায় ভাপ ওঠে খালবক্ষ থেকে, যেনবা দীর্ঘশ্বাস! বিলে আটকে থাকা কচুরিপানা অদূরে, পানায় বেগুনিসাদা ফুল, পানির অভাবে এবার শুকাতে থাকবে শীতে কি রোদে। খুব হাসি পায়, জীবন দোলায় দুলে দুলে কী অপূর্ব মিল তাহাতে আর পানাতে! চোখের সামনের ছবিগুলোতে আনন্দ পায়, দুঃখ পায়, কান্না পায় তারপর কলস কাখে চড়াই ডিঙিয়ে ষাট ছোঁয়া মজবুত শরীরটাকে তারিফ করতে করতে নাকি ভর্ৎসনা করতে করতে বান ডাকে কান্নার কিন্তু সে হাসি হাসি মুখ করে কারো কথার উত্তর দেয়। চারটা গাঁয়ের ধুলামাটি তার গায়ে, বাইল্যাকান্দি, ভবের চর, বৈশার চর পেরিয়ে এই শিমুলিয়া! তারপর!
বাইল্যাকান্দি বাপের বাড়ি থেকে ভবের চর যাত্রা, প্রথম জীবনের স্বপ্ন নিয়ে ঘর করতে এলেও কপালে টেকেনি নিঃসন্তান হওয়ায়। চার বছরের মাথায় নিজেই স্বামীকে বিয়ের অনুরোধ করলে স্বামী রাজি হয় সানন্দে। মেয়ে তার মামাতো বোন, সুন্দরী, কিঞ্চিত শিক্ষিত মানে হাই স্কুলেও গেছে কিছুকাল। স্বামীর বিয়ের আয়োজন পুরোটাই তার নিজের হাতে, নিজের সামান্য গহনা, ঢাকা থেকে আনানো শাড়ি আর স্যান্ডেল। কী কারণে রাতের বিয়ে কে জানে, স্বামীকে বরযাত্রা করিয়ে প্রতিবেশি নিয়ে সে পিঠা বানাতে বসে। জানে তো বউ পিঠা ভালোবাসে, বরণের জন্য ধান দুব্বা জোগাড় আছে নতুন কুলায়। পিঠা বানায় ধুপি আর পুলি, পুরে ভরা পৌষমাস! কার সর্বনাশ! বোন হবে সতিন, ব্যাপারটা যে কেমন হবে! এ সব প্রতিবেশিদের চিন্তার ব্যাপার অবশ্য। পিঠা বানাতে বানাতে কখন মধ্যরাত, হিমরাতে গল্প জমে না তাদের, ছিঁড়ে ছিঁড়ে যায় আয়োজকদের মনোজগৎ।
স্বামী আসে বউ ছাড়া, সঙ্গী তিনজন। কি ব্যাপার! ব্যাপার কিছু না, তোমারে তালাক না দিলে বিয়া হবে না, তোমার মামি বলছে! হায় আল্লাহ্, পিঠা বানানো হাতে লুটিয়ে পড়ে সে, তারপর সে শুনতে পায়, এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক। স্বাক্ষীরা হাপ ছাড়ে, পিঠা বানাতে আসা প্রতিবেশিরা ছুটে পালায়, যারা আসেনি পিঠা বানাতে খবর পেয়ে তারা এসে তামাশা দেখে, কেউ চোখে মুখে পানি দেয়, মুখে আফসোসের চুকচুক তারপর ভোরের আলো ফোটার আগে, নতুন বউ আসার আগে, বাইল্যাকান্দি বাপের ভিটার উদ্দেশ্যে নৌকায় পা। তারপর বছর ঘুরতে বৈশার চর। গুড়াগাড়া পাঁচটা ছেলেমেয়ে ফেলে মরে গেছে মিদ্যা বাড়ির শরিফ মিদ্যার বউটা, দেখার একটা লোক চাই, বাজা হলেই ভালো। একটা নতুন শাড়ি খরচ হলো শরিফ মিদ্যার, তারপর কত শীত কত বর্ষা... ত্রিশ বছরে পাঁচটা সন্তান বড়ো করা, বিয়ে দেয়া, মেয়েদের বউদের প্রসবপরবর্তী আউজঘর করা তারপর বৃদ্ধ স্বামীর মৃত্যুর পর আবার বাইল্যাকান্দি, শিকড় কি আর গজায় সন্তানহীনের!
বাবামা তত দিনে গত হলে আর বিয়ে নয়, ভাইদের ঘরে দাসীর কাজে কোনো অসুবিধা নাই কিন্তু একটা পেট খাওয়াতে রাজি নয় ভাইরা, আসলে বউরা। তবু পঞ্চাশ পেরিয়ে এই শিমুলিয়ায় এসে পৌঁছেছে একজন বৃদ্ধের সেবা দিতে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নিয়ে, মানে বিয়ে হয়ে। কথা ছিল ভিটার কিছুটা আর মাঠের তিন কানি জমি লিখে দিলে তবে বিয়ে। কথা ছিল বিয়ের আসরেই লিখে দিলে বিয়েতে কবুল বলবে, নচেৎ নয়। দুপুরের বিয়ে, বাগবিতণ্ডা করতে করতে রাত্রি দ্বিপ্রহর। কন্যা কবুল বলতে রাজি নয় লিখে দেয়ার আগে, সারা গ্রাম উপচে পড়ে তামাশা দেখতে। কন্যার ভাইরাও রাজি নয় লিখে না দিলে। শেষ পর্যন্ত কী সব অশ্লীল কথা, আত্মীয় অনাত্মীয় প্রতিবেশিদের মুখ থেকে, খুনখুনা বুড়ারে বিয়া করবে কী কারণে! বুড়ার আছেডা কী ভিটা আর জমি ছাড়া! ঐ তো শরীল!
ফিরে যাবে বলে তো আসেনি বুড়া, এসেছে নিয়ে যেতে। ত্রাতাগণ বাড়িতেই আছে, আপদ বিদায়কারী ভাইয়ের বউ দুটো। শেষরাতে আর প্রতিরোধ করা গেল না। ঘুম জড়ানো গলায় সে কবুল বলেছে কি বলে নাই সে জানে না, বউ দুটো বলেছে, কবুল বলেছে। তারপর এই নয় বছর শিমুলিয়া এই গাঁয়ে, কিছুমাত্র শিকড়বাকড় না গজিয়ে, আশ্চর্য হওয়ার কিছু নাই!
২.
সকালে কি সে ওমরকে খবর দিবে! বলবে, বাবা আমার মাথার উপরের ছায়াটুকু সরে গেল! ওমর তাকে মা বলে না কিন্তু মায়ের সম্মান দেয়, ওমর তার প্রথম স্বামীর বড়ো সন্তান, মামাতো বোনের ছেলেও বটে। সারা জীবনে এই এক ফোঁটা সম্মান সে পেয়েছে না চেয়ে। বছরে দুই ঈদের আগে আসে একটা শাড়ি আর পাঞ্জবি লুঙ্গি নিয়ে, সাথে কিছু সেমাই চিনি আর পোলাউর চাল। গুঁজে দেয় হাতে শতখানেক টাকা। ঘরে সে বসে না, দক্ষিণদ্বারে কয় মিনিট দাঁড়ায়, রোদ কি বৃষ্টি কিছুই তাকে ঘরে নিতে পারে না। না, এই নয় বছর সে ঘর জমি লিখে দেয়া নিয়ে কোনো কথা বলেনি আনাতুলের বাপকে, ঘৃণায় নাকি লজ্জায়! আর ছেলেরা, আনাতুল কি এই হাবাগোবা মেয়েটা তো সময়সুযোগ পেলে জানিয়েই দেয়, বাপ যে কয়দিন সে কয়দিন তুমি, যাওয়ার জায়গা মনে মনে ঠিক কইরা রাখ! ঐ তো বাপের শরীল, যায় যায়! বস্তুত আনাতুল এখানে পাকা দালান বানাবে দোতলা কি তিনতলা, আওয়াজ দেয় বাড়ি আসলেই। ঝুঁট ব্যবসায় পয়সা কামাতে কয় দিন! সৌদিতে সিমেন্টের ব্লক টানা ভাই কিছু বানাতে পারবে কিনা সংশয়, যা করার তাকেই তো করতে হবে! এই গাঁয়ে দোতলাা তিনতলা আছে বটে কিছু, বাড়ি বানিয়ে তালা দিয়ে শহরে চলে যাওয়াই ভবিতব্য বাড়িগুলোর! এককালে গণ্ডায় গণ্ডায় ঘর ছিল না বাপদাদাদের, থাকলেও জরাজীর্ণ পড়পড় ঘর, হাভাতে ঘরে গণ্ডায় গণ্ডায় মানুষ, ঘরে ঘরে ডিঙিই তখন একমাত্র বাহন এবং প্রায় মানুষের জীবিকা জাল-জল, ছয় মাস পানিতে ডোবা চাষের জমি, স্বাধীনতার আগে পরে এমনই। এখন ঘরের দরোজায় অটো টেক্সি, গেল দুই তিন প্রজন্ম অধিকাংশই শহরবাসী কি বিদেশগামী।
সে যাক, আনাতুলের মায়ের খুব শীত করে, প্রবল শীতের পাতাঝরা দিন সমাগত, এই ভেবে! আযান ভেসে আসতে একটু সময় বাকি, দু’একটা পাখি অসহায় ডাকে জগ ডুমুর পাতার আড়ালে নাকি কেবল ফুল আসা কামরাঙার ডালে! মেঝেতে শুয়ে আছেন যিনি তিনি তাকে স্ত্রীর আসনে বসিয়েছিলেন সেবা নিতে। চোদ্দ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর বিয়েতে কবুল বলেছে কি বলে নাই তা সে আজও জানে না, জানে খালি উপরওয়ালা আর তার ভাইয়ের দুই বউ। হিসাব করলে সামনের আষাঢ় মাসে নয় বছর হবে এই আশ্রয়টুকুর। মাথার উপর আশ্রয় দেয়া ছাড়া শরীর ঘেঁটে কেবল ঘাঁটাঘাঁটির সামর্থ দিয়ে নয়টা বছর কাটিয়ে দিয়েছে এই বৃদ্ধ! তৃষ্ণাকাতর আনাতুলের মায়ের এই সব আবার খবর নাকি!
একটু পর আযান হবে, এখনই কি সে দরোজা খুলে দিবে মুসুল্লিদের আসার জন্য!
মেঝেতে শুয়ে থাকা লোকটার জন্য তার প্রথমে মায়া হয় তারপর হয় আক্রোশ, তারও পর বুক ভেঙে কান্নায় আছড়ে পড়ে পাকা মেঝেতে। আক্রোশের কান্না, আশ্রয়হীন বঞ্চিতের কান্না।
নামাজ শেষ করে লোকগুলো এই বাড়ির সীমানায় পা রাখে গায়ের চাদরটা আরেকটু ভালো করে পেঁচিয়ে। কেউ বলে ওঠে, আউজকাই জার ঠাডার লাহান পড়ল! দরোজায় ধাক্কা দেয়ার আগে তারা আনাতুলের মায়ের কান্না মন দিয়ে শোনে, বেচারা আনাতুলের মায়ের জন্য তাদের আবেগ সামান্যই, ছন্নছাড়া একটা মানুষের জন্য কতটুকু আবেগ দেখানো যায় সেটা তারা জানে অভ্যাসবশতঃ। দক্ষিণদ্বারের সিফটি লতার কুচিকুচি পাতায় কমলা আলো পড়তে শুরু করবে পুবদিকে মেঘনার শাখা নদীর ওপাড়ে সূর্য উঁকি দিলে, একদা এই সিফটি মুড়ার লতানো ঘন ঝোড়ে তাদের পায়খানা বানানো হত, গুঁ টুপটুপ করে পড়ত ভরা বর্ষায় নামার কালো পানিতে, তাতে টাকি শিং মাগুর ঘাঁই দিয়ে গু খেত আর শুকনাকালে দৃশ্যমান গুয়ে মুরগির খোঁচাখুঁচি। সে সব দিন শেষ হয়েছে বহু আগে, গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকেই, এখন দশখানা চাকে পায়খানা বসে, পাকা দেয়ালে ঘেরা, টিনের ছাউনি ঘর্ েঘরে। শিমুলিয়ায় এত কিছুর নবায়ন হলেও মানুষের চরিত্রখানায় ভালো কিছু ঢোকার নাব্যতা পেল না!
আনাতুলের মা উঠে বসে, কান্নাপর্ব শেষ। দরোজায় দাঁড়ানো মুসুল্লিরা ফিরে গেছে যার যার ঘরে, প্রাতঃরাশ অন্তে আসবে, মৃতের খাবার না লাগলেও জীবিতদের বেলায় বেলায় লাগে, এমন কি মরে গেলে খেতে পাবে না ভেবে যেন একটু বেশিই লাগে! শীতকালে লাশ নিয়ে অতো তাড়াহুড়ার কিছু নাই গো মিয়ারা! লাশ নতুন মসজিদে যাইব, সেই খানেই গোসল কাপড় পরানো, জানাজা, পাশেই কবরস্থান, কোনো অসুবিধা নাই।
ঝা চকচকে মসজিদ থাকায় জানাজাসহ সব কিছুই গোছানো, আগে এত সুবন্দোবস্ত ছিল না, বর্ষায় শুকনা জমি খুঁজে কবর রচনা করাই ছিল দুরূহ। মারি ও মড়কে গরীব তো মাটি পেতই না, পেত জল, বিলের কিনারায় মাটি খুঁড়লেই জল। মড়কের কথা তো বলাই লাগে, কলেরা ছিল প্রতি বছর মানুষ কমানোর বড়ো হাতিয়ার, স্পিডবোটে আর কয়জনের কপালে মতলব হাসপাতাল জুটত! কোথায় কাফনের কাপড়, কোথায় কবর রচনা করার মাটি! ভাসায় দেও গো মিয়ারা আল্লার নামে!
এখন পারিবারিক কবরস্থান ছাড়াও ব্যবস্থা হয়েছে। বাড়ি বরাবর বিল ভরাট করে কতকি, চাইলে নদী পর্যন্ত ভরাট করে ফেলতে পারে, হাতে দেদার পয়সা জনে জনে!
খালের উপর ব্রিজ থেকে নেমে দরোজায় আসতে থাকবে অটো, কারা কারা আসবে আনাতুলের মা জানে, দুই ভাই বেঁচে নাই তার, বউগুলো বাইল্যাকান্দি থেকে আসতেও পারে, নাও পারে। আনাতুল আসবে পয়লা ট্রিপে রিজার্ভ অটো নিয়ে, রাস্তা চওড়া হলে সে নাকি বাড়িতে গাড়ি নিয়ে আসত!
আলো ফুটলে লাশ যায় মসজিদে, ইতিমধ্যে আনাতুল বউবাচ্চা নিয়ে চলে এসেছে, আনাতুলের ছেলেমেয়েরা যুবকযুবতী, ভালো খেতে পেয়ে চকচকে চেহারা। তাদের দেখেই ঢেউ খেলে যায় কানাঘুষার, কোথায় যাবে আনাতুলের মা এবার, বেচারি!
৩.
এই সব শোকসমগ্র আসলে কতটা সময় বিরাজ করতে পারে ঘরের ভিতর কি উঠানজুড়ে! সন্ধ্যায় শেষপ্রহরের আলো ঝিলিক দিয়ে উঠলে অন্যগল্প। গাঁয়ের সাবেক চেয়ারম্যান, সদ্য বিপত্নীক ইরাজউদ্দিনের তো একটা বউ লাগে সেবার জন্য! এত এত সম্পদ কিছুই ভোগ না করে জীবন পার করে দেয়া কোনো কাজের কথা! ইরাজউদ্দিনের বয়স হলেও সুঠাম এবং সুন্দর। বিয়ের প্রস্তাব আসে মৃতের জানাজার পরপরই, জানা আছে তো এ গাঁয়ের ভাত উঠে গেল আনাতুলের মায়ের। চার দিনের দিন কোরান খতম আর গোড়খোদকদের দুটো মাংসভাত রেঁধে খাওয়ানো পর্যন্তই আয়ুস্কাল এই বাড়িতে, এটাও আবালবৃদ্ধবণিতা সকলের জানা!
ইরাজউদ্দিনের তিন ছেলে শহরে থাকে, তারা শিক্ষিত এবং প্রতিষ্ঠিত। বাপের সৎ অসৎ পয়সায় রীতিমত বিশাল সাম্রাজ্যে তাদের যাতায়ত থাকলেও সে সবে তাদের মাথা ব্যথা নাই দৃশ্যত। সন্ধ্যায় পাওয়া প্রস্তাবটা আনাতুলের মায়ের কাছে খারাপ লাগে নাই, নিজের পোক্ত বাঁধন শরীরে তার আস্থা আছে বটে, দেখতেও তো সে রূপসীই। কিন্তু ব্যাপারটা এত সহজে সবাই মেনে নিবে তা কি হয়! বাপের বাড়িতে গিয়ে উঠবে, আগের মতো ভাইরা না থাকলেও ভাবিরা একবেলা একটু মাংসভাত জোগাড় করে বিয়ে দিয়ে দিবে প্রাক্তন চেয়ারম্যানের সাথে! চেয়ারম্যান খবর দিয়েছে খরচ সেই দিবে শুধু আয়োজনটা তারা করবে, এইটুকু তো পারবে! পারবে, কিন্তু সদ্য স্বামীহারাকে একটু সময় দিতে হবে না! গ্রামবাসীই তার অভিভাবক হয়ে বলে! কতটা সময়! গ্রামবাসীই ঠিক করে ছয় মাস। চল্লিশ দিন কি দুই মাস হলেই যথেষ্ট ছিল যদিও। এই ছয় মাস আনাতুল তাকে উচ্ছেদ করতে পারবে না, এটা গ্রামবাসীর ষড়যন্ত্র কিনা কে জানে; নতুন পয়সাওয়ালা আনাতুলের বিরুদ্ধে!
অসুবিধা নাই, চেয়ারম্যানও এই সময়ে নতুন শহরে একটা নতুন আবাস গড়ে নিতে পারে মনের মতো। আদি বাড়িতে ভাইদের কাছাকাছি থাকা এক্ষণে তার অপছন্দ, জীবনটা একটু অন্য রকম করে উল্টেপাল্টে উপভোগ করবে, জীবন সুন্দর তো! সময় চাইলে প্রাক্তন চেয়ারম্যান আর দু’চারটা পাত্রী খুঁজতে পারেন, এই আশংকা সত্ত্বেও চেয়ারম্যানের উপর আস্থা হারায় না গ্রামবাসী। চেয়ারম্যানগিরিতে সীমাহীন কামানো কি নয়ছয় ইতিহাস এত দিন মনে রাখার কোনো মানে হয়! একটা ভালো কাজে সে নিজেকে যুক্ত করতে চাইলে তাকে তো বিশ্বাস করাই লাগে! ধনী মানুষ বলে তো মানিও হয়েছেন, তার কথার একটা দাম আছে না!
মাস দুই না ঘুরতে পৃথিবী বেতাল করোনায়, আতঙ্ক আর ত্রাসের পৃথিবীতে সবাই সাবধানে চলে। যাবতীয় সতর্কতা সত্ত্বেও বিপদ এলো, শহর আর গ্রাম যাতায়াত তো বন্ধ হয়নি শত কাজের মানুষ চেয়ারম্যানের, বাড়িটা শেষ করতে হবে না! ভাগ্য ঝুলে গেল, উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন হাসপাতালে উচ্চ অম্লজানও ফুসফুসকে স্বস্তি দিতে না পারলে কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রের স্মরণাপন্ন। তাও রক্ষা করতে না পারলে আনাতুলের মায়ের চতুর্থঘর অনিশ্চিত হয়ে পড়ল।
আনাতুলের মায়ের ভবিষ্যত নিয়ে কোন পরিকল্পনা করেছেন বিধাতা কে জানে, আপাতত কোনো বিয়ের খবর আমাদের জানা নাই, মানে আমাদের গ্রামবাসীর। ষাট ছোঁয়া জীবন নিয়ে অপার বেদনা কি শিকড় না গজানো জীবন নিয়ে সে কী করবে সেটা বরং তার চার গ্রামের স্বজন আত্মীয় পরমাত্মীয় কি প্রতিবেশিদের উপর ছেড়ে দিন, ধীরে সুস্থে তারা ঠিক করবে! ছয় মাসের এখনও ক’মাস বাকি আছে তো, এই ভয়াবহ মহামারিতে।
তারপর অদূর ভবিষ্যতে কে আনাতুলের মা, কে তার খবর রাখে বলেন!
অলংকরণঃ তাইফ আদনান
