জলধি / Translation / রবিবারের পাঠ - এরনান্দো তেইয়েথ
Share:
রবিবারের পাঠ - এরনান্দো তেইয়েথ

Lección de domingo

Hernando Tellez

লোক তিনটে যেন ঘূর্ণিঝড়ের মত ঢুকে পড়েছিল, আমাদের দিদিমনি সেনিওরিতা মারতা আমাইয়া তখন পড়ছিলেন, “এক ব্যক্তি আঙুরলতার বাগিচা তৈরি করেছিল, সেটা ঘিরেছিল বেড়া দিয়ে, একটা চৌবাচ্চা খুঁড়েছিল আঙুর পেষার জন্য, আর গড়েছিল একটা মিনার, আর তারপর চাষিদের সব কিছু ভাড়া দিয়ে নিজে চলে গেল দূরে…” ছন্দময় একটানা স্বর হঠাৎ থেমে গেল। “কী চান আপনারা?”, বলে উঠলেন। মুখটা নিমেষে রক্তশূন্য হয়ে গিয়েছিল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, উনি প্রায় কেঁদেই ফেলেছিলেন। কিন্তু ইতিমধ্যেই আমাদের মধ্যে একজন- সব মিলিয়ে আমরা ছিলাম মোট এগারটা বাচ্চা- কাঁদছিল: পাবলিতো মানসেরা, ন বছরের একটা প্রাণী, ঝোলাগুড়ের মত চুলের রঙ, মুখভর্তি  মেচেতা আর সবসময় নোংরা।  লোকগুলোর মধ্যে একজন দরজায় রয়ে গেল পাহারা দিতে, অন্যদুজন একটু যেন অন্যমনস্কভাবে আমাদের দেখছিল। হাল্কা রঙের স্যুট পরা, আর পাতলা কাপড়ের ব্যাগের নীচে- ওই মাসগুলোতে আবহাওয়া একটু দমবন্ধ করা- ঝকঝক করছিল বেল্টের বকলস, উঁকি দিচ্ছিল রিভলবারের বাঁট।  বিপ্লবী? নাকি সরকার পক্ষ? কেই বা জানতে চাইবে? সেনিওরিতা মারতা ওঁর মত করে ব্যাপারটা আমাদের বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন, বলতেন,  “আমাদের ভরসা রাখতে হবে, যাতে এইসব তাড়াতাড়ি শেষ হয়”।  কিন্তু শেষ হচ্ছিল না। বিপ্লব আর শান্তির ব্যাপারগুলো এত বাজে দিকে যাচ্ছিল যে আমাদের পাঠশালার সবচেয়ে প্রবীণ, পাদ্রি খুয়ান ফেলিপে গুতিএররেথকে ওরা খুন করেছে, সেনিওরিতা মারতা রবিবার বিকেলে  ছাড়া আর কোনদিন আমাদের ক্লাস নিতে পারেন না তাও শুধু ক্রিশ্চান ধর্মমত । সেইজন্যই, লোকগুলো ঢোকার মুহূর্তে  আমাদের পড়ে শোনাচ্ছিলেন সেন্ট মার্কসের বাণী- “ এক ব্যক্তি  এক আঙুরলতার বাগিচা তৈরি করেছিল…ইত্যাদি। “ আমরা আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই”, সেনিওরিতা মারতার দিকে এগিয়ে একজন বলল। “সময় নষ্ট না করে”, বলল অন্য দুজনের একজন, দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা।

আপনাদের মনে করিয়ে দিচ্ছি, এসব ঘটেছিল বহু বছর আগে, আমি এখন বৃদ্ধ, আর আমি পাঠশালায় যাই না। সেই রবিবার বিকেলে ক্লাসের বাইরে যা ঘটেছিল, তা আমার বোধগম্য হয়েছিল অনেকদিন পর। ততদিনে আমি যাকে বলে ‘বড়’ হয়ে গেছি। এতদিনে হয়ত সব ভুলেই যেতাম, যদি না আজ হঠাত বাইবেলের পাতা ওলটাতে গিয়ে বার নম্বর চ্যাপ্টারে সেন্ট মার্কসের বাণীর শব্দগুলো চোখে না পড়ত। হ্যাঁ, এগুলোই ছিল সেনিওরা মারতার বলা কথা, আমি নিজেকেই বললাম। এরপরই তাঁকে দেখেছিলাম ক্লাস থেকে বেরিয়ে যেতে, মুখের চেহারা পাল্টে গেছে, আমাদের দিকে  উদ্বিগ্ন ভাবে তাকিয়ে বললেন,  “সবাই সভ্য ভদ্র হয়ে  থাকবে। আমি এখনি ফিরে আসব”। ওরা চলে গেল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা সাবধানে দরজাটা বন্ধ করল। ঠিক যেন একটা বই বন্ধ করছে, তারপর এগিয়ে এসে দাঁড়াল ঘরের ঠিক মাঝখানে। সেনিওরা মারতার টেবিল আর চেয়ার রাখা ছিল কাঠের ডেইসের ওপর, একটা সিংহাসনের মত। ডেইসের সিঁড়ির ধাপদুটোর সামনে এসে লোকটা একটু থমকালো। আমরা খুব শান্ত হয়ে বসেছিলাম, দুজন দুজন করে বসার বেঞ্চে। আমার কোনো সঙ্গী ছিল না, আমরা ছিলাম এগারজন। এগার একটা বেজোড় সংখ্যা। লোকটার সাহস হল না সেনিওরিতা মারতার চেয়ারে বসার। সেইরকমই দেখাচ্ছিল , অন্তত আমি সেরকমই ভেবেছিলাম । হয়ত নিজের দুর্বলতার জন্য ওর লজ্জা করছিল কিম্বা  বোকামির জন্য ভয় করছিল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ও ক খুঁটিয়ে দেখছিল কাগজপত্র -আর  খাতা- যেগুলো টেবিলের ওপরেই পড়েছিল। একটা  তুললো, পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে কোনো একটা পাতায় থেমে , হাসার চেষ্টা করল। খাতার মালিকের নামটা, মলাটে সেনিওরিতা মারতার হাতের সুন্দর অক্ষরে যত্ন করে লেখা, সেটা ওকে পড়তেই হল। “ রবেরতো কোইয়াথোস কে”? খাতাটা তখনও দুহাতের মাঝে। আমরা সবাই কোইয়াথোসের দিকে তাকালাম, কোইয়াথোস বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াল, বলল, “আমি”। কোনো একটা জানলা দিয়ে ঘরে ঢোকা সূর্যের যে আলোটা  কোইয়াথোসের  কালো মাথায় , আমাকে হিসাব করেছিলাম , তখন বিকেল সাড়ে চারটার কছাকাছি, হ্যাঁ আমি খেয়াল করেছিলাম, ওইসময়, সবসময়, যেদিন ভালো করে রোদ ওঠে, ধূলো আর আলোয় মেশা একটা পট্টি দেখা যায়, আকাশ থেকে পড়ে, রিফ্লেক্টরের মত। “ তুইই কোইয়াথোস?” “হ্যাঁ, সেনিওর”। “ঠিক আছে। বসে পড়”। লোকটা খাতাগুলো দেখতেই থাকল।  “সেপেদা কে?” সেপেদা উঠে দাঁড়াল, ঠিক যেমনটা করেছিল কোইয়াথোস। “ আর গ্রেগরীয় ভিইয়াররেয়াল?” গ্রেগরীয় তেমনটাই করল যেমনটা করেছিল কোইয়াথোস আর সেপেদা। “ আর ইনোসেন্সিও সিফুএন্তেস কে?” আমি সাড়া দিলাম।বুঝতে পারছিলাম আমার মুখটা গরম হয়ে উঠেছে । আমি কিছু বললাম না। অন্যদের মতো , “ আমি সেনিওর” বলিনি। লোকটা বন্ধুর মতো  আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “আমিও সিফুয়েন্তেস”। আমরা সবাই হাসলাম, এমনকি পাবলিতো মান্সেরাও, ততক্ষণে হয়ত ওর ভয় কেটে গিয়েছিল। লোকটা খেলাটা চালিয়ে গেল।  ওর যে ভালো লাগছে, সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। আমাদেরও  ভালো লাগছিল। এক এক জন করে আমরা ও নাম ধরে ডাকলে সাড়া দিচ্ছিলাম। বেনিতো দিয়াজের পালা এলে আবার কয়েকজনের হাসির শব্দ শোনা গেল, ও একটু তোতলাচ্ছিল। আমরা সেনিওরিতা মারতার কথা ভুলে যাচ্ছিলাম। ভুলে যাচ্ছিলাম যে, অন্য দুজন তাকে নিয়ে গেছে। আর হ্যাঁ,  এই তিনজন ঢুকেছিল, চোরের মতো। আমরা ভুলে যাচ্ছিলাম যে, ওদের ব্যাগের নীচে, বেল্ট থেকে ঝুলছে রিভলবারগুলো। আমরা ভুলে যাচ্ছিলাম বিপ্লবী আর সরকারপক্ষের লড়াইয়ের কথা।              

যখন লোকটা ঠিক করল সেনিওরিতা মারতার চেয়ারে বসবে, তখন ও আমাদের বিশ্বাস অর্জন করে ফেলেছে। কেউ ফিসফিস করে কিছু বলল না।  কেউ কোনো হাসি চাপলো না। ওই জায়গায় ওর বসাটা আমাদের খুব স্বাভাবিক বলেই মনে হল। এতক্ষণ ওর মাথাটা টুপিতে ঢাকা ছিল। বসার পর ফেল্টের টুপিটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল। মনে হল  ক্লান্ত , ভালো একটা মানুষ । সাদামাটা সাধারণ একটা  মুখ। গায়ের চামড়া আমাদের মতোই হলদেটে। চুলগুলো এলোমেলো। এক দীর্ঘ নীরবতা। লোকটা দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে শূন্যে তাকিয়েছিল বেশ কয়েক মিনিট।

কোইয়াথোস বলে উঠল, “ সেনিওর, আমি বাড়ি চলে যেতে পারি?” লোকটা যেন অবাক হয়ে গেল। “কী বলছিস? এখান থেকে এখন কেউ বেরোবে না। বুঝলি? সবাই বুঝেছিস?”  কোইয়াথোস  আবার বসে পড়ল। অখন্ড নীরবতা। ক্লাসে আবার আতঙ্কটা ফিরে এসেছে এবং ঢুকে যাচ্ছে আমাদের বুকের ভেতর। খুব চাপা একটা কান্নার সুর ভেসে আসছিল আমার পেছন থেকে, ওটা , একেবারে নিশ্চিত, পাবলিতো মানসেরা।

জানি না, কতক্ষণ আমরা এভাবে ছিলাম; লোকটা ডেইসে, আমাদের দিকে তাকিয়ে, মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে জানালার কাচের ওপারে গরম কালের পরিষ্কার আকাশের দিকে, আর আমরা চুপচাপ, শান্ত, আতঙ্কিত, এর   ওর  মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি অথবা লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। জানি না কতক্ষণ। কিন্তু ওভাবে বসে থাকা অসম্ভব ছিল। অস্বস্তি এড়াতে আমি একশ পর্যন্ত গোনার চেষ্টা করলাম ( মা বলেছিল রাতে তাড়াতাড়ি ঘুম আসার জন্য খুব ভালো উপায়)। শুরু করলাম - এক,দুই,তিন,চার…কিন্তু কী চায় এই লোকগুলো? পাঁচ,ছয়,সাত…আমাদের কি এইভাবেই রেখে দেবে রাত পর্যন্ত? শিগগিরই পাঁচটা বাজবে, এই সময় সেনিওরিতা মারতা খুব যত্নে তাঁর বাইবেলের পাতাগুলোর মধ্যে একটুকরো কাগজ রেখে দেন, যাতে  তার পরের রবিবার ওইখান থেকেই পাঠ শুরু করা যেতে পারে, আআর তাছাড়া এটাই একটা সঙ্কেত যে আজ এখানেই শেষ, তার মানে আমরা এবার আমাদের বেঞ্চ থেকে উঠতে পারি, বাইরে বেরিয়ে যেতে পারি,  দল বেঁধে, নীচের রাস্তায়, আর তারপর ছড়িয়ে পড়তে পারি গ্রামের মধ্যে। ওই জানালাটার পেছনে, চুনকাম করা ওই দেওয়ালটা থেকে আরো দূরে, সেনিওরিতা মারতার চেয়ারে বসে থাকা ওই লোকটার পিঠের দিকে, আমাদের গ্রাম, আর গ্রামের গন্ধ, আমাদের বাড়িগুলো,আমার অপেক্ষায় থাকা মা, “ বেনান্সিও, অনেক কিছু শিখেছিস...?” কী হচ্ছে এসব? সাত, আট, নয়, দশ, এগারো, বারো...হঠাত পরিবেশটা ভেঙে খানখান হয়ে গেল একটা চীৎকারে, দুটো চীৎকারে, তিনটে চিৎকারে। ওটা সেনিওরিতা মারতা। “ বাঁচাও”, “বাঁচাও”, “বাঁচাও”। আপনাদের কাচ্ছে স্বীকার করছি, আমার চোখ দিয়ে জল গড়াতে শুরু করেছিল। আমার মনে আছে, বেঞ্চগুলো কেঁপে উঠেছিল। লোকটা উঠে দাঁড়াল, উত্তেজিত। এতক্ষণ দেখা প্রায় বন্ধুর মত , প্রশান্ত মুখটায় হিংস্রতার ছায়া নেমে এল। বলল, “একদম চুপ!” তারপর দ্রুত এক ঝটকায় রিভলবারটা বার করল। তবে এবার ও মাঝপথে থেমে গেল, অস্ত্রটা আমাদের দিকে তাক না করে ওটা টেবিলের ওপর রাখল। “ যে একটাও কথা বলবে…”  কথা শেষ করল না , কারণ আর একটা চিৎকার, এবার চাপা, হাওয়ায় ভেসে এল। আমি আপনাদের বলতে পারব না আমার বন্ধুরা তখন কী করছিল, কারণ আমি মাথা নিচু করে দুহাতে মুখ ঢেকে রেখেছিলাম। টের পাচ্ছিলাম, আমার কপাল আর গালদুটো ভিজে উঠেছে, ঠোঁটের কোনায় চোখের জলের স্বাদ, নুনের বিচ্ছিরি স্বাদ। আমি কাঁপছিলাম, যেন আমার জ্বর আসছিল, গলা শুকিয়ে কাঠ। পাবলিত মান্সেরার একটানা, হতাশ ফোঁপানি পরিষ্কার ভেসে আসছিল আমার কানে।   

আপনারা কি জানতে চান, কতক্ষন পর অন্য লোকদুটো ক্লাসঘরের দরজার সামনে দেখা দিল? আমার পক্ষে সেটা যথেষ্টই বাড়াবাড়ি। তাছাড়া আমি নিশ্চিত যে যদি কখনো আপনাদের সঙ্গে কোইয়াথোস বা বিইয়াররেয়াল বা সেপাদা বা পাবলিতো মানসেরার দেখাও হয়,  আমি যতটুকু বললাম, তার চেয়ে বেশি আপনারা জানতে পারবেন না। সময় ব্যাপারটা খুব আবছা এবং এলোমেলো।  এমন এক জিনিষ যে কখনো কখনো একটা ট্রেনের মত থমে যায়, আবার কখনো বা মসৃণ ভাবে চলতেই থাকে, এক বাধাহীন নদীর মত। একটা কথাই শুধু আপনাদের বলতে পারব, এই পুরো সময়টা আমি ডুবে গিয়েছিলাম, হৃৎপিণ্ডটা ভয়ে ধুকপুক করছিল। ভাবছিলাম যদি আমি নড়াচড়া করি, লোকটা আমাকে মেরে ফেলতে পারে। অস্ত্রটা উঁচিয়ে আমার দিকে তাক করলেই হবে। খুব সহজ,স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। তাই না? তার চেয়ে শান্ত থাকাই ভালো। মাংসপেশির চাপে আমার হাত ব্যাথা করছিল। “ও আমাদের সবাইকে মেরে ফেলতে পারে, মেরে ফেলতে পারে সব্বাইকে,” আমি ভাবছিলাম। তারপর ভুল শুধরে নিলামঃ “ সবাইকে নয়, কারণ ওর রিভলবারে পাঁচটা গুলি কম পড়বে”। “পাঁচটা না ছটা গুলি থাকে চেম্বারে?” ভয়টা আবার ফিরে এল, আমার বুকে  ঢেউয়ের মত ধাক্কা দিতে। পাবলিতো মানসেরা কেঁদেই যাচ্ছিল, দুর্বল স্বরে, নরম সুরে, ওর যেন মরণের ঘোর লেগেছিল। এ ছাড়া এই গোটা ক্লাসের নৈশব্দের মাঝে, গোটা বাড়িটার নৈশব্দের মাঝে, হয়ত বা গোটা গ্রামটা ও ফসল ক্ষেতের নৈশব্দের মাঝে, কষ্টের ফিসফিসানি ছাড়া আর কিছু শুনতে পাওয়া যাচ্ছিল না।

দরজায় জোরে আওয়াজ হলো, লোকদুটো ভেতরে ঢুকলে আমি মাথাটা ওঠাতে বাধ্য হলাম। যে লোকটা ডেইসে ছিল সে অস্ত্রটা হাতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল। “চলো,চলো” বলল একজন। যে আমাদের সঙ্গ দিচ্ছিল, সে রিভলবারটা বেল্টে গুঁজে নীচু গলায় বলল, “আর আমি কী করব?” “চুপ কর, আমরা বাইরে গিয়ে কথা বলব। বাচ্চাদের এসব জানার দরকার নেই”। “খুব কঠিন?” যাকে প্রশ্ন করা হল, সে ক্ষ্যাপার মত হাসল। সঙ্গীর কানের কাছে গিয়ে নিশ্চই কোনো মজার কথা বলেছিল, কারণ দুজনেই হাসিতে ভেঙে পড়ল। অন্যজন আবার আমাদের দিকে তাকালো, গোটা ক্লাসটায় নজর বুলালো, আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চাইল, কিন্তু হয়ত যে কথাগুলো বলতে চায় সেগুল খুঁজে পেলো না, তাই আমাদের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে, সঙ্গীদের সবার আগে বেরিয়ে গেল। আমি ওদের পায়ের শব্দ অনুসরণ করেছিলাম করিডোরের শেষপ্রান্তে , রাস্তার ঘাসের মধ্যে, অবিস্মরণীয় সেই রবিবারের বিকেলের সেই আলোমাখা সময়ের দমবন্ধ করা নীরবতার মাঝে হারিয়ে যাওয়া  পর্যন্ত।  বিকেলের সে সময়টা যখন আমাদের দিদিমনি সেনিওরিতা মারতা , আমাদের, ছোট্ট গ্রামের  এগারটা দস্যি ছোঁড়াকে ক্রিশ্চান ধর্মমতের পাঠ দিতেন। ক্লাসঘরের পাশের দুটো ঘরের একটা ছিল খাবার ঘর আর অন্যটা দিদিমনির শোবার ঘর। এরপর ছিল একটা ছোট্ট রান্নাঘর। আর তারপর সবজির ক্ষেত।  আর কিছু না। আমাদের স্কুলটা গরীব। আমাদের গ্রামের মতো, আমাদের মতো, আমাদের দিদিমনি সেনিওরিতা মারতা আমাইয়ার মতো, যিনি গভর্নরের ডাক  পেয়ে দুবছর আগে এখানে পা রেখেছিলেন, একা, সঙ্গে  তার স্ট্র হ্যাট ,হাল্কা রঙের স্কারট আর চামড়ার স্যুটকেস যেটা কিনা হারমোনিয়ামের বেলোর মত খুলতো। সেনিওরিতা মারতা সত্যিই সুন্দরী ছিলেন। আর সবসময়ই ওঁকে আমার ভাল মনে হতো।। আর এখন, এখন সেনিওরিতা মারতা মড়ার মত পড়ে আছেন, কিন্তু মারা যাননি। পড়ে আছেন ওঁর বিছানায়, ব্লাউজটা ছেঁড়া ,বুকদুটো খোলা হাওয়ায় আর স্কারটটা মেঝেতে পড়ে, একটা পা পেন্ডুলামের মত খাটের কিনারায় ঝুলছে। যদিও চোখ দুটো বোজা, তাও  উনি মারা যাননি , কারণ আমি দেখেছিলাম কীভাবে ঢেউয়ে দুলছে ওই নগ্ন বুকদুটো।



অলংকরণঃ তাইফ আদনান