জলধি
/ Translation
/ মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেলের পাঁচটি অনুবাদ কবিতা
মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেলের পাঁচটি অনুবাদ কবিতা
নিঃসঙ্গতার প্রতি
অনুপস্থিতি
কবি: পাবলো নেরুদা
আমি সবেমাত্র তোমাকে ছেড়ে এসেছি
তুমি যখন আমার ভিতরে প্রবেশ করো,
স্ফটিকের মত,
না হয় কম্পিত হয়ে,
কিংবা অস্বস্তিতে, আমার দ্বারা আহত হয়ে
নয়তো প্রেমে অভিভূত হয়ে,
ঠিক যখন তোমার চোখ বন্ধ হয়
জীবনের সেই উপহারের উপর
যা আমি তোমাকে নিরন্তর দিয়ে যাই ।
আমার ভালোবাসা,
আমরা একে অপরকে খুঁজে পেয়েছি
তৃষ্ণার্ত হয়ে আমরা
সমস্ত জল আর রক্ত পান করেছি,
আমরা পরস্পরের দেখা পেয়েছি
ক্ষুধার্ত হয়ে আমরা
একে অপরকে দংশন করেছি
আগুনের দংশনের মত,
আমাদের মধ্যে ক্ষত রেখে যাচ্ছে ।
কিন্তু আমার জন্য অপেক্ষা করো,
তোমার মাধুর্য আমার জন্য রেখে দিও ।
আমিও তোমাকে দেবো
একটি গোলাপ ।
কিং লিয়ার পুনরায় পড়ার আগে লেখা
কবি: জন কিটস
হে সুমধুর কল্পকাহিনী, সাথে বীণার শান্ত সুর!
সুন্দর পালকযুক্ত জলপরী! দূর দেশের রাণী!
এই শীতের দিনে সুর তৈরি করা ছেড়ে দাও,
তোমার পুরোনো পৃষ্ঠাগুলো বন্ধ করো এবং নীরব থাকো ।
বিদায়! কারণ অভিশাপ ও উদ্দীপ্ত কাদামাটির মধ্যকার তীব্র দ্বন্দ্বে আমাকে আরো একবার পুড়তে হবে;
আবারো বিনম্রভাবে পরীক্ষা করতে হবে
এই শেক্সপীয়রীয় ফলের তিক্ত-মধুরতা ।
হে শ্রেষ্ঠ কবি! এবং অ্যালবিয়নের মেঘমালা,
আমাদের গভীর শাশ্বত মূলভাবের জন্মদাতাগণ,
যখন আমি প্রাচীন ওক অরণ্যের মধ্য দিয়ে চলে যাবো,
আমাকে যেন এক ঊষর স্বপ্নে ঘুরে বেড়াতে না হয়,
কিন্তু যখন আমি আগুনে দগ্ধ হই,
আমার ইচ্ছেমত উড়ার জন্য আমাকে নতুন ফিনিক্সের ডানা দিও ।
চাঁদের আলো
কবি: উইলিয়াম শেক্সপিয়ার
কি মধুর চাঁদের আলো এই তীরের উপর ঘুমিয়ে আছে!
এখানে আমরা বসব,
এবং সঙ্গীতের সুর আমাদের কানে ধীরে প্রবেশ করতে দাও:
মৃদু নিস্তব্ধতা আর রাত্রি,
হয়ে ওঠে মধুর ঐকতানের স্পর্শ ।
বসো, জেসিকা ।
চেয়ে দেখো, স্বর্গের মেঝে কেমন প্রাচুর্যপূর্ণভাবে খচিত যেন এক উজ্জ্বল স্বর্ণ চাকতি ।
তুমি যে ক্ষুদ্রতম গোলকটিই দেখো না কেন
এটি তার গতিতে এক দেবদূতের মত গান গায়,
এখনো তরুণ-চোখবিশিষ্ট স্বর্গীয় দূতদের জন্য সুর সৃষ্টি করছে ।
এমন ঐকতান অমর আত্মাদের মধ্যে থাকে;
কিন্তু ক্ষয়শীল এই কর্দমাক্ত আবরণ যখন তাকে একেবারেই রুদ্ধ করে রাখে,
আমরা তা শুনতে পাই না ।
প্রত্যাখ্যান
কবি: মায়া অ্যাঞ্জেলো
প্রিয়তম,
অন্য কোনো জীবনে বা দেশে
আমি কি তোমার অধরের স্পর্শ অনুভব করেছি
তোমার হাত
তোমার নির্ভীক হাসি
বিদ্রূপাত্মক ।
সেই সব মধুর বাড়াবাড়ি
যা আমি খুব পছন্দ করি ।
কি নিশ্চয়তা আছে
যে আমাদের আবার দেখা হবে,
অন্য কোনো জগতে
ভবিষ্যতের কোনো অনির্ধারিত সময়ে ।
আমি আমার দেহের তাড়নাকে উপেক্ষা করি ।
আরো একটি মধুর সাক্ষাতের
প্রতিশ্রুতি ছাড়া
আমি মরতে রাজি নই ।
নিঃসঙ্গতার প্রতি
কবি: জন কিটস
হে নিঃসঙ্গতা!
যদি আমাকে তোমার সাথেই বাস করতে হয়,
তা যেন ঝাপসা দালানকোঠার জটলাপূর্ণ স্তূপের মধ্যে না থাকে;
আমার সাথে চড়ো সেই খাড়া পথে,
প্রকৃতির মানমন্দিরে— যেখান থেকে উপত্যকা,
এর পুষ্পময় ঢাল, এর নদীর অচ্ছ ঢেউ,
মনে হতে পারে এক বিঘত;
আমি তোমার প্রহরা পালন করি
বৃক্ষশাখায় ঘেরা চাঁদোয়ার মধ্যে,
যেখানে হরিণের ক্ষিপ্র লাফে
শেয়াল মোজা ঘণ্টা ফুল থেকে বুনো মৌমাছি চমকে ওঠে ।
কিন্তু যাই হোক আমি সানন্দে তোমার সাথে এই দৃশ্যগুলো খুঁজে বের করব,
তবুও এক নিষ্পাপ মনের মিষ্টি আলাপ,
যার কথাগুলো পরিশীলিত চিন্তার প্রতিচ্ছবি,
এটিই আমার আত্মার তৃপ্তি;
আর নিশ্চয়ই তা হবে মানবজাতির প্রায় সর্বোৎকৃষ্ট পরমানন্দ,
যখন দুটি সমমনা আত্মা তোমার সান্নিধ্যে চলে যায় ।
অলংকরণঃ তাইফ আদনান
