জলধি / সাক্ষাৎকার-এবং-অন্যান্য / মাইকেল ওন্দাৎজের সাক্ষাৎকার- ভাষান্তর : এমদাদ রহমান
Share:
মাইকেল ওন্দাৎজের সাক্ষাৎকার- ভাষান্তর : এমদাদ রহমান

আপনি  যখন একই লেখাকে দ্বিতীয়বার লিখছেন, কিংবা লেখাটিকে আবারও পড়ছেন, তখনই বুঝতে পারবেন আশ্চর্য কিছু একটা ঘটে গেছে

ফিকশনের আর্ট এবং ক্রাফট নিয়ে মাইকেল ওন্দাৎজের সাক্ষাৎকার

কবি ও ঔপন্যাসিক মাইকেল ওন্দাৎজের জন্ম ১৯৪৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর, শ্রীলঙ্কায়; ১৯৫৪ সালে ১১ বছর বয়সে চলে যান ইংল্যান্ড, তারপর, ‘৬২ থেকে কানাডায়, স্থায়ীভাবে। ১৯৮২ সালে প্রকাশ হয় তাঁর স্মৃতিলেখা ‘রানিং ইন দ্য ফ্যামেলি’, ১৯৮১-তে বের হয় কবিতার বই ‘দ্য কালেক্টেড ওয়ার্কস অভ বিলি দ্য কিড : লেফট হ্যান্ডেড পোয়েমস’, বইটি কানাডার গভর্নর জেনারেল এওয়ার্ড লাভ করে; তাঁর অন্যান্য কবিতাবই- ‘দ্য সিনামন পিলার : কালেক্টেড পোয়েমস’, ‘হ্যান্ডরাইটিং’, দ্য ম্যান উইদ সেভেন টয়’স, দ্য স্টোরি। ‘কামিঙ থ্রু স্লটার’ বইটি বের হয় ১৯৭৬ সালে, যা ছিল জ্যাজ সঙ্গীতজ্ঞ চার্লস বাডি বোল্ডেনের জীবনকে উপজীব্য করে লেখা উপন্যাস; তবে, তাঁর সবচে আলোচিত এবং পাঠকপ্রিয় উপন্যাস ‘দি ইংলিশ পেইশ্‌ন্‌ট্‌’ (১৯৯২); ইতালির পটভূমিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লিখিত এ উপন্যাস সে বছর ম্যান বুকার পায়, আবার- ২০১৮ সালে এ উপন্যাস জিতে নেয় গোল্ডেন ম্যান বুকার, পাঠকের ভোটে পাঁচ দশকের বুকারপ্রাপ্ত উপন্যাসের মধ্যে ‘দি ইংলিশ পেইশ্‌ন্‌ট্‌’ শ্রেষ্ঠ নির্বাচিত হয়। ওন্দাৎজের উপন্যাস সম্পর্কে বুকার ফাউন্ডেশন যা বলেছে, তা তাৎপর্যপূর্ণ- ‘দি ইংলিশ পেইশ্‌ন্‌ট্‌’ উপন্যাসটি কবিতা ও দর্শনের মিশ্রণে রচিত কথাসাহিত্যের এক অসামান্য কাজ, যা কয়েক দশকের ব্যবধানে আবারও শ্রেষ্ঠ রচনা হিসবে নির্বাচিত হয়েছে, বইটি বহুদিন তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখবে এবং আগামী বছরগুলোয় সাহিত্যের নতুন পাঠকদেরও আনন্দিত করবে।’ ভি এস নাইপলের ‘ইন আ ফ্রি স্টেট’ (১৯৭১), পেনেলোপ লাইভলির ‘মুন টাইগার’ (১৯৮৭), মাইকেল ওন্দাৎজের ‘দি ইংলিশ পেইশ্‌ন্‌ট্‌’ (১৯৯২), হিলারি ম্যান্টেলের ‘উল্‌ফ হল’ (২০০৯) এবং জর্জ সন্ডার্সের ‘লিঙ্কন ইন দ্য বার্দো’ (২০১৭)- বুকারজয়ী এই পাঁচ উপন্যাসের মধ্যে পাঠকের ভোটে পুরস্কার পেল ওন্দাৎজের ‘দি ইংলিশ পেইশ্‌ন্‌ট্‌’। তাঁর আরও একটি আলোচিত উপন্যাস, ২০০০ সালে প্রকাশিত- অনিল’স ঘোস্ট; শ্রীলঙ্কার পটভূমিতে রচিত উপন্যাসটিতে তিনি বলেন এমন এক তরুণী নৃতাত্ত্বিকের গল্প যে একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে যুদ্ধাপরাধের তদন্ত করছে। ওন্দাৎজে স্ত্রী লিন্ডা স্প্যাল্ডিঙের সঙ্গে কানাডার টরন্টোয় বসবাস করছেন, স্ত্রীর সঙ্গে সম্পাদনা করছেন সাহিত্যের জার্নাল ‘ব্রিক’। ২০০৭-এ প্রকাশ পেয়েছে তাঁর উপন্যাস ‘দিভিসাদেরো’, ২০১১’য় ‘দ্য ক্যাটস টেইবল’ এবং ২০১৮’য় ‘ওয়ারলাইট’। তিনি সম্পাদনা করেছেন- এন্থলজি অভ কানাডিয়ান শর্ট স্টোরিজ, পার্সোনাল ফিকশন : স্টোরিজ বাই মুনরো, দ্য লঙ পোয়েম এন্তলজি, দ্য ফেবার বুক অভ কনটেম্পোরারি কানাডিয়ান শর্ট স্টোরিজ।   

অনূদিত সাক্ষাৎকারটি টিনহাউজ, দ্য ভিলিভার্স ম্যাগ, ওয়াসাফিরি, নিউইয়র্ক টাইমস, সেন্ট লুইস ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরি ম্যাগ, গোয়ার্নিকা এবং ইউটিউবের লুইজিয়ানা চ্যানেলে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশের সমন্বয়।    


সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: শার্ল বোদল্যের বলেছিলেন, ‘সবসময়ই কবি থাকুন, এমনকি গদ্যেও’ (Sois toujours poète, même en prose)। কবিতা কীভাবে আপনার গদ্যে নিখুঁতভাবে মিলে যায়?
ওন্দাৎসে : বোদল্যোরের একটি দুর্দান্ত মন্তব্য, আমি আগে জানতাম না; আমি মনে করি- হ্যাঁ, দীর্ঘ দিন কবিতা লিখবার পর, আমি যখন গদ্য লিখতে শুরু করি, তখন আমি কথাসাহিত্যের জগতে সেই মেজাজেই লিখতে চেষ্টা করেছি। গদ্যভাষায় গল্পের টান থেকে শুরু করে পাঠকের জন্য এমন একটি স্পেস তৈরি করে রাখতে চেয়েছি যেন পাঠকও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে, যেন তারাও লেখকের সঙ্গে লেখায় শামিল হয়ে আছে। গদ্য লেখকের দায়িত্ব হচ্ছে- পাঠকের জন্য এমন কিছু স্পেস রাখা যাতে সেও নিজেকে লেখায় আত্মমগ্ন করতে পারে। আর, এ জন্য সম্পাদনার কারুকাজ বা শৈলীও (দ্য ক্র্যাফট অভ এডিটিং) অত্যন্ত গরুত্বপূর্ণ। গদ্য, একই সঙ্গে একেবারেই ভিন্ন একটি ভাষা ও স্থানিক অবস্থানকে ধরতে চায়, কবিতা থেকে দূরত্ব সৃষ্টি করে।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: শ্রীলঙ্কা থেকে ইংল্যান্ড, সেখান থেকে কানাডা... জীবনবৃত্তান্ত দেখলে বুঝতে পারি- আপনার জীবনে বেশ জোরালো এক যাযাবর ব্যাপার রয়েছে; তো, আপনার লেখার বিষয়েও কি একই কথা বলা যাবে? যেমন এক ঘরানা থেকে অন্য ঘরানায় চলে যাওয়া, যেন এক সত্যিকার ভ্রমণ, উদাহরণস্বরূপ ‘দ্য ক্যাট’স টেইবল’-এর কাল্পনিক চরিত্রের কথা বলতে পারি যেখানে চরিত্রদের সঙ্গে স্মৃতিকথা এবং আত্মজীবনী একাকার হয়ে গেছে? 
ওন্দাৎসে : দেখুন, আমি সব সময়ই এমন লেখকদের বেছে নিয়েছি, পছন্দের তালিকায় রেখেছি যাদের লেখালেখির একটা বিশেষ বিস্তার, ব্যপ্তি কিংবা পরিসর রয়েছে—যারা গল্প থেকে কবিতায়, নন ফিকশনে ঘুরে বেড়ান, অথবা এমন কিছু লিখে ফেলেন যাকে আমরা হয়তো দূর দিকচক্রবালে ঝলকাতে দেখি, তাঁরা সে ঝলকানি দেখেন, উপলব্ধি করেন এবং লেখে। লরেন্স, বারগার, কারভার— এরাই সেইসব নমস্য লেখক। আমি মনে করি, লেখকদের মধ্যে যাযাবরি আকাঙ্ক্ষা থাকাটা জরুরি। বারগার এবং লরেন্স হচ্ছেন সেই গোত্রের লেখক যারা বাস্তব-ভ্রমণকারী। ফলে লেখকের এমন এক কণ্ঠস্বর তৈরি হয় যাকে আমি পছন্দ করি, যে-কণ্ঠস্বর বারে বারে বদলে যাচ্ছে, লেখার মধ্যে স্মৃতি, সত্য আর ফিকশন মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। 
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: গল্পের কাছে কী আশা করেন? 
ওন্দাৎজে : তা যদি জানতাম! তবু বলি, একটি অসাধারণ গল্পের মধ্যে আমি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি জগতে ঢুকে পড়তে এবং বেশ কিছু সময়ের জন্য সেখানে থাকতে পছন্দ করি; গল্পের একজন বর্ণনাকারীর মাধ্যমেই তা যেন ঘটে! বর্ণনাকারীর দৃষ্টিতেই যেন তা ধরা পড়ে।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: আপনি কেন লেখেন?
ওন্দাৎসে : একমাত্র এই লেখার কাজটিই আমি ধ্যানমগ্ন হয়ে শতভাগ সততার সঙ্গে করতে চেষ্টা করি। লেখালেখি আমার কাছে চরম আনন্দের ব্যাপার। লিখতে গিয়ে আমি কেবল নিজেকেই আবিষ্কার করি না, চারপাশের জগতকেও খুঁটিয়ে দেখতে পারি, নানাভাবে দেখতে সক্ষম হই। দেখতে পেলেই চারপাশ থেকে অবিরাম শিখতে পারি। নিজের সম্পর্কেও জেনে নিতে পারি। আমি যদি কোনও কিছু সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে থাকি, তাহলে তাদের নিয়ে লিখবই- এটাই আমি। টরন্টোর অভিবাসীদের সম্পর্কে আগ্রহী ছিলাম বলেই আমি ‘ইন দ্য স্কিন অভ দ্য লায়ন’ বইটি লিখতে পেরেছিলাম। বইটি চরিত্রগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, আবিষ্কার করেছিল, কিন্তু এটাও সত্য যে- বইটি সেই সময়কেও ধরতে পেরেছে, এটা দেখাতে পেরেছে যে সেই সময়টা কেমন ছিল। বইটি পুরোনো সময়কে কালগর্ভ খুঁড়ে বের করেছিল। 
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: আপনি সময় ও চরিত্র নিয়ে কীভাবে কাজ করেন?
ওন্দাৎসে : চরিত্র আগে নয়, কোনও ভাবেই নয়; বইয়ের শুরুতে, চরিত্রদের আমি চিনি না, তাদের সঙ্গে আমার পূর্ব পরিচয় থাকে না। নির্দিষ্ট কোনও ব্যক্তির জন্য আমার পরিকল্পনাও থাকে না। লিখতে লিখতেই তারা বিকশিত হয়, তখন তাদের খানিকটা চিনতে পারি; কেবল তখন থেকেই, পরিচয়ের সেই অদ্ভুত মুহূর্তটি থেকেই আমি মূলত তাদের সঙ্গে বাস করতে থাকি, যেন একসঙ্গে থাকতে না পারলে আমার আর রেহাই নেই। তারপর এক সময় আবিষ্কার করি- তারা দুধ কিংবা অন্যকোনও জিনিসের মতো নয়, তারা মানুষ! 
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: আপনার স্মৃতিকথা ‘রানিং ইন দ্য ফ্যামেলি’তে, এই অসম্ভব সুন্দর বাক্যটি লিখেছেন— ‘দাদিমা মারা গিয়েছিলেন জাকারান্দা গাছের বেগুনি ডালে। তিনি বজ্রপাত পড়তে পারতেন।’ শ্রীলঙ্কায় আপনার শৈশবের জগতটি কি সত্যিই এমন চমকপ্রদ ছিল? বহু পাঠকও এমন কথা বলেন। 
ওন্দাৎজে : আমার মনে হয়, কিছু ক্ষেত্রে আমি ভাগ্যবানই ছিলাম। একটা দেশে এই ভেবে বড় হয়েছি যে কেবল এখানেই আমাকে থাকতে হবে, কিন্তু হঠাৎ করেই ১১ বছর বয়সে, এমন একটি দেশে চলে যেতে হয়েছিল যাকে আমার নিস্তেজ, নিরাসক্ত দেশই মনে হয়েছিল— ইংল্যান্ড। এদিকে, শ্রীলঙ্কার চমৎকারিত্ব সম্পর্কেও খুব একটা সচেতন ছিলাম না, এমনকি বইটি যখন লিখতে শুরু করি, তখনও এর চমৎকারিত্ব নিয়ে ভাবিত হইনি; তবে, হ্যাঁ, ভিন্ন ধরণের বিধি-ব্যবস্থা, জীবনধারা ও রসবোধের দিক থেকে দেখলে এ-কথা বলতেই হবে যে শ্রীলঙ্কা সত্যিকার অর্থেই অদ্ভুত এক দেশ। 
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: আর এসব চমৎকারিত্বই আপনার স্মৃতিকথা- ‘রানিং ইন দ্য ফ্যামেলি’কে ঋদ্ধ করেছে, যা আমাদের জন্য অসাধারণ এক পাঠ অভিজ্ঞতা।
ওন্দাৎজে : স্মৃতিকথাটি এমন এক ধরণের লেখা, যাকে, সত্যিকার অর্থেই, লেখার দরকার ছিল। ভেবেছিলাম- ঠিক আছে; লেখাটি শ্রীলঙ্কায় একটি পরিবারের প্রায় পনেরো সদস্যের দারুণ একটি কাহিনি হতে চলেছে। লিখে শেষ করার পর এর পাঠ-প্রতিক্রিয়া দেখে তো আমি অবাক! এবং, এখনও, সত্যি বলতে-  এখনও অবাক হয়েই আছি। ওয়াশিংটনে একটি রেডিও সাক্ষাৎকার দিয়েছিলাম, সে সময় টেক্সাস থেকে অনেকে ফোন করছিলেন, বলছিলেন- এ তো হুবহু আমাদের পরিবারের কথা। আমাদের মতোই সব! ভেবে দেখুন, টেক্সাস হোক কি শ্রীলঙ্কা, সর্বত্রই সেই একই বৈশিষ্ট্যের মানুষ, মানুষ নামের ক্ষুদ্র সৃষ্টি; এই ক্ষুদ্র সৃষ্টির বিচরণ সর্বত্র। সবার জীবনধারাও প্রায় কাছাকাছি। সেই একই দুঃখ, একই বেদনা। কেউ যদি দূরবীনের অন্য প্রান্তে পরিবারের সদস্যদের দিকে তাকাতে শুরু করে, তাহলে যা দেখবে, তাতে তার মনে হবে- সবই উদ্ভট, বিচিত্র এবং অদ্ভুত, এবং একই রকম। 
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: লেখায় আপনি এক মহৎ সংযমের জন্ম দেন, অনুশীলন করেন— গদ্যে আপনি পরিমিত; তবুও, লেখার মধ্যে লিরিক্যাল এমন কিছু ঝলক থাকে, যা পাঠকের কাছে শ্বাসরুদ্ধকর আনন্দের জন্ম দেয়। এটা কীভাবে করেন? 
ওন্দাৎজে : লেখা শেষ হলে আবার যখন খুঁটিয়ে পড়ি, তখনই এমন কিছু হয়ে যায়। এক একটি বইয়ের একাধিক খসড়া করতে হয় আমাকে। অনেক খসড়া করি। বারবার লিখি। প্রথম খসড়াটি একদম নতুন  আবিষ্কারের মতো, তারপরে আরও ১০ থেকে ১২টি খসড়া, কখনও আরও বেশি; এবং, পুনর্লিখনের সেই সময়কালে, আপনি নিজেই এক সময় বলে উঠবেন- ‘এখানে বাড়াবাড়ি হয়েছে; এ-অংশটি বিরক্তিকর; খুব সম্ভবত আমাদেরকে এ-জায়গাটি ফেলে দেওয়া উচিত।’ কিন্তু তখন নিজেকে একবারও  এ-কথা বলি না- ‘লেখাটিকে আরও লিরিক্যাল করা দরকার’। 
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: আপনি কখন প্রথম লিখতে শুরু করেন? 
ওন্দাৎজে : আমি মনে করি, লেখকজীবনের শুরুতেই এমন কিছু করার পক্ষে একটা বিন্যাস কিংবা বলা যায় একটা শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করেছিলাম। উনিশ বছর বয়সে, প্রথম আমি কানাডায় যাই। কানাডা তখন আমার জন্য নতুন দেশ। সেখানে এমন এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লাম যেখানে এমন একজন দুর্দান্ত ইংরেজি শিক্ষক ছিলেন, যিনি আমাকে ঋদ্ধ করলেন তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্যে, স্নেহে আর মায়ায়। লেখক হওয়ার পক্ষে সব কিছু আমাকে উস্কানি দিচ্ছিল। বহুকিছুর সংস্পর্শ আর সংমিশ্রণে আমি যেন পূর্ণ হচ্ছিলাম আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে, আর ছিল কেবল লেখার আনন্দ। কৈশোরপ্রাপ্ত বয়সে আমি এক দুর্দান্ত পাঠকে পরিণত হলাম।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: তখন কি এমন কোনও বই বা লেখককে পড়েছিলেন যিনি  আপনাকে লিখতে আগ্রহী করেছিলেন?
ওন্দাৎজে : না, এমন কিছু তখনও পড়িনি; আসলে, কৈশোরে আমার সাহিত্যের পাঠ খুব এলোমেলো ছিল, যা পেয়েছি, যাকে পেয়েছি- পড়েছি। একদম পপুলার থ্রিলার থেকে ফরস্টার পর্যন্ত। কানাডায় আসার পর থেকে কবিতা পড়তে শুরু করি- টেড হিউজ, টম গান...তাঁদের কবিতা এবং সমসাময়িক অন্য কবিদের; কিছু পরে, গ্যারি স্নাইডারের অসাধারণ লেখা ‘আর্থ হাউসহোল্ড’ বইটি আবিষ্কার করি, যা ছিল জার্নাল এবং কবিতার মিশ্রণ; তো, আমি এই বইয়ের আঙ্গিকের প্রেমে পড়ে গেলাম। এ এমন একটি বই যেখানে ইচ্ছেমত যে কোনও কথা অনায়াসে বলা যায়। বইটি আমাকে এটা কল্পনা করতে সাহায্য করে যে কীভাবে আমিও এমন একটি বই লিখতে পারি, যাকে মনে হবে লেখকের প্রতিকৃতি (পোট্রেট), বইটিকে কেউ দুর্বল ভাববে না, আর বইটি হবে অনেক ঘরানার (জনরা) মিশ্রণ। এভাবে, ‘দ্য কালেক্টেড ওয়ার্কস অভ বিলি দ্য কিড’ কাব্যোপন্যাসটি লেখা হয়ে গেল।  
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: লেখার প্রথম প্রচেষ্টা কীরকম ছিল? লিখে কাউকে দেখাতেন?
ওন্দাৎজে : শুরুর দিকের লেখাগুলোর দিকে তাকালে আমি এখন বিব্রতবোধ করব। সেইসব লেখাকে আমি কোথাও কবর দিয়েছি। কিন্তু সেই লেখাগুলি যে সাহায্যটি আমাকে করেছে, তা অত্যন্ত মূল্যবান; আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাগাজিনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে সাহায্য করেছে, আর ধীরে ধীরে আমাকে এমন এক গোষ্ঠীর সংস্পর্শে নিয়ে এসেছে যারা বিভিন্ন বই, কবিতা এবং শিল্প সাহিত্য নিয়ে লিখত, তর্ক করতো।  
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: তখন তো কেবল কবিতা নিয়েই ছিলেন, গল্প লেখার কথা ভাবেন নি?
ওন্দাৎজে : না। আমি কখনও নিজেকে গদ্যলেখক হিসেবে কল্পনা করিনি, গদ্যে কিছু লিখতেও চাইনি।  কবিতা লিখেছি। পরে যখন আমার সঙ্গে টরন্টো’র ‘কোচ হাউস প্রেস’ থেকে যোগাযোগ করা হলো...তারা আমার বই করতে চাইলো! ব্যাপারটা দারুণ আনন্দের মনে হল আমার, তাদের সঙ্গে মিশে আরও একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে পরিচয় হল; তখনই, কীভাবে একটি বই গড়ে ওঠে, তার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি আমার দেখা হলো। বই করার ক্ষেত্রে, শুধু বিচ্ছিন্নভাবে লেখাই নয়, লেখাগুলোকে কীভাবে সূচিভূক্ত করবেন, কীভাবে বইয়ের বিন্যাস করবেন, বাঁধাই করবেন, এবং বইয়ের ভেতর নিজের কণ্ঠটিকে পুরে দেবেন, কীচাবে আপনি নিজে একটি স্বতন্ত্র স্বর হয়ে উঠবেন— এই আর্ট আমি বুঝতে পেরেছিলাম। পুরো প্রক্রিয়াটি আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এখনও সমান গুরুত্বপূর্ণ; এমনকি, যখন প্রখ্যাত নফ পাবলিশিং হাউজ থেকেও কোনও একটি বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ করা হয়, তখন বুঝতে পারি—শিল্পিত রুচির একটি বইয়ের প্রস্তুতির কাজটিও এমন এক শিল্প যা একই সঙ্গে লেখক এবং লেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। 
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: কবিতা ও গদ্যের মধ্যে কোনটিকে আপনি কঠিন মনে করেন?
ওন্দাৎজে : এদের দু'জনকেই আমি কঠিন মনে করি। আমি যখন ‘‘দি ইংলিশ পেইশ্‌ন্‌ট্‌’ শেষ করলাম, তখন মনে হলো- আসলে কবিতাই লিখতে চেয়েছিলাম; তারপর আমি খুঁজে দেখতে শুরু করলাম যে কীভাবে এই বইটি আমি লিখতে চেয়েছিলাম, বইটিকে নানাভাবে, নানা দিক থেকে মূল্যায়ন করতে শুরু করলাম। এভাবে দেখাটা দরকার ছিল। উপন্যাস আমার কাছে এমন একটা কিছু, যা ধারণ করে বহুকিছু, সে তার ভেতরে সমগ্রকে নিতে চায়; উপন্যাস হচ্ছে এমন এক চটের ব্যাগ, যার মধ্যে সে পুরো দুনিয়াকে ধারণ করতে চায়, সব কিছু নিতে পারে। কিন্তু কবিতায় কী হয়? কবিতায় সাধারণত একটি নিয়ন্ত্রক স্বর বা কণ্ঠ থাকে, এবং সেই কণ্ঠটি থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লিরিকের মধ্যে একক একটি স্বর থাকাটা, তৈরি করাটা এখনও আমার কাছে কবিতা লেখার সবচে কঠিন দিক। তারপরও, আমি যখন ফিকশন লিখি, তখনও, গদ্যকে আমার সহজ কিছু মনে হয় না; গদ্যও সমান কঠিন ব্যাপার। কবিতা থেকে আমি যা কিছু শিখি না কেন, আমি গদ্যেও সেই কৌশল প্রয়োগ করি, এবং এর ঠিক বিপরীত অবস্থাকেও গদ্যে ধরতে চাই।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: ‘দিভিসাদেরো’ (দূর থেকে কোনও কিছুকে দেখার জন্য)- এই নামটি কোথায় পেয়েছেন? 
ওন্দাৎজে : স্রেফ লেখার একটি নাম হিসেবেই শব্দটিকে গ্রহণ করেছিলাম। যতোবার আমি সান ফ্রান্সিসকোয় গাড়ি চালিয়েছি, ততোবার আমাকে ‘দিভিসাদেরো’ স্ট্রিট অতিক্রম করে অন্য স্ট্রিটে যেতে হয়েছে…  শব্দটির সৌন্দর্যে আমি বার বার মুগ্ধ হয়েছি, না হয়ে পারিনি; উচ্চারণে শব্দটি এতো সুন্দর! লিখতে থাকা বইটিতে এই জায়গাটি কিছু অংশ জুড়ে রয়েছে, আমি ব্যবহার করেছি। উপন্যাসে একটা জায়গা আছে, আনা যেখানে ‘দিভিসাদেরো’ দিয়ে আসলে কী বোঝায় সে নিয়ে কথা বলছে : 'এক মহান দূরত্ব থেকে কিছুকে পৃথক করে ফেলা কিংবা এমন কিছুকে দেখা।' আমার মনে হয়েছে এ শুধু কথা নয়, আনার ভেতরেই যেন এমন একটা অনুভূতির জন্ম হয়েছে যার কারণে গল্পে তার একটা ভিন্নতর অবস্থান তৈরি হয়েছে।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: কীভাবে দূরত্বের ধারণাটি উপন্যাসে মূর্ত হলো?
ওন্দাৎজে : কিছুটা ধরতে পেরেছি বলে মনে হয়। ‘রানিং ইন দ্য ফ্যামেলি’ বইয়ে আমি একটি বাক্য লিখেছি, বাক্যটি ডেনিস লিভরটোভের মুখ থেকে এসেছে— দূরত্বের করুণা। এ ব্যাপারটি পুরো বইয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে, যার অর্থ দাঁড়ায়— নিজেকে ক্ষমা করে দাও, নিজেকে স্বীকৃতি দাও কিংবা নিজেকে উপলব্ধি করো যাতে অন্য একজনের জীবনের গল্পকে নানাভাবে দেখা যায়, যাপিত জীবন তখন বর্ণিল হয়ে ওঠে। বইটি যখন লিখছিলাম, লিখতে লিখতে আমার কাছে এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে- আমি একই সঙ্গে একটি বাস্তব এবং কাল্পনিক জীবনকে যাপন করছি। 
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: উপন্যাসের একটি চরিত্র- লুসিয়ান সেগুরা, যিনি একজন কবি; তাঁকে কোথায় পেয়েছেন? তিনি কি বাস্তব জীবনের কেউ? 
ওন্দাৎজে : আসলে তা নয়, ফরাসি কবিকে আমি আবিষ্কার করেছিলাম এবং একটি বাড়ি খুঁজে পেয়েছিলাম যেখানে তিনি বসবাস করে থাকতে পারেন। লুসিয়ান সেগুরা সম্পর্কে একটি গল্প আবিষ্কারের উপায় হয়ে যায় বাড়িটি।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: ‘দি ইংলিশ পেইশ্‌ন্‌ট্‌’-এ আপনি যে বর্ণনা দিয়েছেন, আপনি কি আসলেই সেই বাড়িতে গিয়েছিলেন?
ওন্দাৎজে : অবশ্যই সেখানে গিয়েছিলাম। দেখেছিলাম বলেই জায়গাটি আমাকে দিয়ে অনেক কিছুই লিখিয়ে নিয়েছে। ‘অনিল’স ঘোস্ট’-এ এমন একটি বাড়ির কথা আছে, যাকে আমি সত্যিকার অর্থেই খুঁজে পেয়েছি এবং উপন্যাসে ব্যবহার করেছি। গল্পটি লেখার আগে মনে হচ্ছিল এ বাড়িটি দেখা আমার খুব দরকার।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: যখন আপনি এই বাড়িগুলোতে যান, তখন তো উপন্যাসের প্লট (পরিকল্পনা বা রূপরেখা) তৈরির প্রক্রিয়াটি অনেকটাই সহজ হয়ে যায়, কারণ, স্বচক্ষে দেখার আইডিয়াটি সব সময়ই তাৎপর্যপূর্ণ। আপনার সৃজন-কল্পনাকে আরও দূর প্রসারিত করতে বাড়ির প্রতিটি কক্ষে গিয়েছিলেন?
ওন্দাৎজে : মাথায় যদি বাড়িটি থাকে, তাহলে মনে মনেই আমি কক্ষ থেকে কক্ষে হাঁটতে পারবো। দেখুন, বইয়ের বাড়িটি কিন্তু কোনওভাবেই আসল বাড়ির অবিকল প্রতিরূপ নয়। বাড়িটি যেখানে ছিল বা আছে, তা-ই গুরুত্বপূর্ণ, আশপাশে কী আছে তা গুরুত্বপূর্ণ : উদ্যানটি কত বড়, সেখানে কি প্রবাহিত নদী আছে না কি পুকুর কিংবা পাহাড়? একবার যদি এই ব্যাপারগুলো আমার চেতনায় চলে আসে, তাহলে আমি লিখতে পারি, নিজেকে লেখার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত মনে হয়, লিখতে লিখতে সেখানে দু-একটি কাঠবাদামের গাছ কিংবা অন্য কিছু অনায়াসে বসিয়ে দিতে পারি।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: উপন্যাসটিতে এমন কয়েকটি মুহূর্ত রয়েছে, যেখানে— একটি চরিত্র এমন কিছু ভাববে বা বলবে যা সরাসরি লিখন-প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। আমি লুসিয়ান সেগুরার কথাগুলি নিয়ে ভাবছি : ‘‘লেখার দক্ষতা ‘দর্শক’কে খুব সামান্য কিছু ইঙ্গিত দেয়। এখানে আপনার চোখ আর কলমের মধ্যকার দূরত্ব মাত্র পাঁচ সেন্টিমিটার, সেখানে জীবনযাপন কিংবা স্বপ্ন দেখার ক্ষমতাটি একদমই অদৃশ্য থেকে যায়…’’
ওন্দাৎজে : আপনি যখন লিখছেন, লেখার মধ্যে আছেন তখন আপনি কিন্তু একটা নাজুক অবস্থায় পড়ে আছেন, যাকে অন্তর্জলী অবস্থা বলা যেতে পারে। কেউই বুঝতে পারবে না কেন আপনি— দাঁড়ি-কমা-সেমিকোলন ইত্যাদি যতিচিহ্ন দিয়ে কিংবা না দিয়ে দৃশ্য কিংবা মুহূর্তকে গড়ে তুলছেন। আপনার লেখার হাত চলমান। সিনেমা ইন্টারেস্টিং কারণ যে-উপাদানগুলি লেখায় ব্যবহার করা হয়, তা সেখানে অনেকটাই ‘ফিজিক্যাল; শব্দ রেকর্ডকারী, আলোক-সঞ্চালক, সম্পাদনা, অভিনয় এবং গল্প— সিনেমা নির্মাণের পেছনে কতো বড় আয়োজন, কিন্তু লেখার বেলায়? সবকিছু লেখকই করছেন। লেখক একাই দৃশ্য-কারিগর, তার ভেতরে সবাই; লেখকই কেবল ভাবছেন— কেউ কিছু বললে তার স্বর কতটা উচ্চতায় পৌঁছবে,  কে ফিসফিস করবে, কে চিৎকার করবে। এই ব্যাপারগুলো কিন্তু টেক্সটে অব্যক্ত, সমস্তই লেখকের মনের ভেতরের কারুকাজ। এ ব্যাপারগুলো কেউই দেখতে পায় না, কিন্তু পাঠককে এসব প্রভাবিত করে, গভীরভাবে আক্রান্ত করে। লেখা ব্যাপারটা এমনই কিন্তু সিনেমায় অন্যকিছু ঘটে, অন্যভাবে ঘটাতে হয়; দৃশ্যের সঙ্গে ফিতায় শব্দ ধারণ করতে হয় কিংবা প্রস্ফুরিত সঙ্গীতের মাধ্যমে দৃশ্যের মনোভূমি গড়ে নিতে হয়, কিন্তু লেখায়— অনুচ্ছেদটিকে যেখানে শেষ করা হলো, লেখক তা নিয়ে চিন্তায় পড়বেন। ব্যাপারটি এমনই জটিল যা শুধু সম্পাদনাকালীন সময়েই ঘটে থাকে। আমি কুন্ডেরা’র ‘দ্য কার্টেন’ পড়ছিলাম। গুস্তাভ ফ্ল্যবা কীভাবে এবং কখন তাঁর একটি বই পুনর্লিখনের সময় কয়েকটি অনুচ্ছেদকে আরও দীর্ঘ করেছিলেন, কুন্ডেরা সে সম্পর্কে বলেছেন। কীভাবে তিনটি অনুচ্ছেদ এক হয়ে গিয়েছিল! এই যে অনুচ্ছেদে অনুচ্ছেদে একাকার হয়ে যাওয়া, এই যে মিলন, তাতে কী ঘটলো? নতুন অর্থ তৈরি হলো। সম্পূর্ণ নতুন কিছু হয়ে উঠলো। ব্যাপারটি সত্যিই অন্যরকম, এবং আকর্ষণীয়। লেখক ছাড়া কে আর এ সমস্ত ভাঙাগড়া নিয়ে কথা বলবেন? 
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: সংলাপ নিয়ে কি কোনও সমস্যায় পড়েন?
ওন্দাৎজে : সংলাপের পেছনে অবশ্যই প্রচুর সময় ব্যয় করি। ভয়াবহ সংলাপ লেখার অভিযোগে অভিযুক্ত লেখক আমি, অনেকেই আমার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ এনেছেন; হ্যাঁ, লিখতে গেলে সংলাপের পেছনেই প্রচুর সময় ব্যয় করি। আমি যখন সত্যিকার অর্থেই ‘দৃশ্য’ লিখি, তখন তা প্রায়শই বিশেষ কোনও অভিপ্রায় ছাড়াই লিখিত হয়ে যায়, তন্ময় হয়ে লিখতে থাকি, পরে কিন্তু আবারও এখানে ফিরে আসব, অর্থাৎ— এই দৃশ্যের কাছে।  ‘দিভিসাদেরো’য় যে-কথোপকথনটি লিখতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়েছিল, লিখে ওঠাটাও খুব জটিল ছিল, সেটা ছিল— রেস্তোঁরায়, বহু বছর পর, কোপের সঙ্গে ক্লেরের সাক্ষাৎ। এই জায়গাটিতে, কী বলব— শুধু তা খুঁজে বের করার চেষ্টায় কমপক্ষে ছয়বার লিখেছি আর কেটেছি; প্রতিবারই বদলে গেছে! লেখক খুব বেশিও বলতে পারবেন না, আবার কমও পারবেন না, আবার একেবারে খাপছাড়া, এলোমেলোও কিছু লেখা যাবে না, যা পড়ে মনে হবে খুব সাধারণ বা আটপৌরে কিছু পড়ছি। এমনভাবে লিখতে হবে যেন সবই দেওয়া হয়েছে, একদম ভরপুর যদিও বোঝা যাবে না আসলে সব দিয়ে দেওয়া হয়েছে কি না। এটাই দৃশ্যের জন্মের কিংবা কথোপকথনের ক্র্যাফট। এই ‘ইফেক্‌ট্‌’ আনার জন্য সময় দিতে হয়, সে সময় আমি দিইও, আর, এ জন্যই খুব সাধারণ কিংবা পুরোপুরি নির্দোষ-দৃশ্যও বিশেষ কিছু হয়ে ওঠে। দৃশ্য প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি বোঝাতে পারে। কিন্তু আপনি যখন পড়ছেন তখন আপনি হয়তো বিশেষ অর্থবোধক এবং বিস্ময়কর কিছু অনুভব করতে চাচ্ছেন না।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: লেখার তাৎপর্যময় অংশগুলিতে আপনি খুব দ্রুত অত্যন্ত সংবেদনশীল মনস্তাত্ত্বিক মুহূর্ত এবং গতি তৈরি করার দক্ষতা দেখাতে পারেন...
ওন্দাৎজে : লেখার প্রথম বাক্য থেকে শুরু করে তৃতীয় বাক্যে, তারপর পঞ্চম বাক্যে কীভাবে একজন লেখক তার ন্যারেটিভ তৈরি করবেন, বাক্যগুলির মধ্যকার নীরবতায় কী কী ঘটবে, এবং পাঠককে লেখকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে হবে— এ ব্যাপারে আমি ববাবরই আগ্রহী। এটা কোনও ইচ্ছাকৃত ব্যাপার নয়, কিন্তু যখনই আপনি একই লেখাকে দ্বিতীয়বার লিখছেন, কিংবা লেখাটিকে আবারও পড়ছেন, তখনই বুঝতে পারবেন লেখায় আশ্চর্য কিছু একটা ঘটে গেছে, এবং লেখক হিসেবে আপনি আর রিয়েল টাইমে নেই। আমি মনে করি, এই কাজটি লেখকের এ্যাকশনকে আরও বেশি উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলতে পারে, আরও বেশি প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে। প্রথম বাক্য থেকে তৃতীয় বাক্য পর্যন্ত, আপনি দেওয়ালের ওপর থেকে নিচের দিকে তাকিয়ে আছেন, একই সঙ্গে একই অবস্থানের ঠিক বিপরীতে, নিচ থেকে ওপরের দিকে তাকিয়ে আছেন।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: লেখার সময় এ বইয়ের কোন দিকটি আপনাকে অবাক করেছিল?
ওন্দাৎজে : রোমান চরিত্রটি আমাকে বিস্মিত করেছে। লিখতে লিখতে এই চরিত্রটি আমার কাছে ইন্টারেস্টিং হয়ে উঠলো, কিন্তু আমি জানতাম না যে সে এত গুরুত্বপূর্ণ হবে; এবং কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠবে। আমার খুব ভাল করেই মনে আছে, আমার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না তার সঙ্গে কোথায় যাচ্ছি, কিন্তু একটি দৃশ্যে, যে-দৃশ্যে তার মা বলছেন, ‘কুকুরটিকে গুলি করো, গুলি করো’, কিন্তু সে কিছুতেই গুলি করবে না— কুকুরটিকে সে গুলি করবে না বলে অনড়, ঠিক সেই মুহূর্তে যেন আমার সামনে একটি বন্ধ দরোজা খুলে গেল আর রোমান তখন আরও আকর্ষণীয় এক চরিত্র হয়ে উঠলো, আর মায়ার চরিত্র হয়ে উঠলো; আর বইয়ের ফরাসি অধ্যায়টি ছিল একটি সারপ্রাইজ, সত্যিকার অবাক করে দেওয়ার মতো। অধ্যায়টি লিখতে শুরু করেছি কিন্তু তখনও আমি নিশ্চিত ছিলাম না যে তাকে আমি গল্পের অংশ করে তুলতে পারব কি না। মনে হচ্ছিল, এই অংশটি অন্য কোনও লেখার অংশ কিংবা একই বইয়ের এমন একটা অংশ যাকে আমি শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করতে পারছি। লেখা শেষে মনে হচ্ছিল- ঠিকই লিখেছি, এই অধ্যায়টির দরকার ছিল; তবে, লেখার শুরুতে আমি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ কিছু মনে করিনি। ফরাসি অধ্যায়টি যখন লিখছিলাম তখন এটা জানা ছিল যে কোনও একটি বইয়ের প্রথম অংশটি লিখে ফেলার পক্ষে এ হচ্ছে একটি অপরিহার্য পদ্ধতি।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: আপনার লেখায় বিভিন্ন দেশ পটভূমি হিসেবে এসেছে, লেখক হিসেবে ব্যাপারটা কি খুব আনন্দদায়ক? আগে কখনও ফ্রান্স নিয়ে লিখেছেন?
ওন্দাৎজে : হ্যাঁ, আমার জন্য ব্যাপারটা সত্যিকার আনন্দের, কারণ এর পেছনে আছে এক ধরণের যাযাবর উদ্দেশ্য। আপনি যখন লেখক, ঠিক তখন আপনি কিন্তু মোটামুটি নির্জন একটি কক্ষে খুব একা এবং নিঃসঙ্গ, সত্যিকার অর্থেই; আর তখন ঘরের দেয়ালগুলোর দিকে তাকানোর সময় আপনার অন্যরকম রোমাঞ্চ হবে, আপনি আনন্দিত হবেন, কারণ আপনি তো এখন একা, অবশ্য আপনি যদি দেওয়ালের দিকে তাকানোর ইচ্ছা করেন! ‘অনিল’স ঘোস্ট’-এর পরে, আমি ভেবেছিলাম শ্রীলঙ্কার পটভূমিতে আরও একটি উপন্যাস লিখব। কিছু একটা লিখতেও শুরু করেছিলাম, তখন আমার বুঝতে দেরি হলো না যে, আমি এখনও আগের বইয়ের ঘোরের মধ্যেই আছি! বুঝতে পারলাম, এ ঘোর থেকে বের হতে পারছি না। তখন, উপলব্ধি হলো- আমাকে এখন কেবল নতুন শব্দ, নতুন ভাষা খুঁজে পেলে চলবে না, খুঁজে পেতে হবে নতুন জায়গা, নতুন সুর, স্বরলিপি, যা আগের বইয়ের চেয়ে একদম আলাদা।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: নিজের উপন্যাসের রীতি কেমন হবে, তা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে আয়ত্ব করেছেন। গল্প কোথায় শেষ হবে— সেই বিস্ময়কর বিপন্নতা কিংবা অস্থিরতার সঙ্গে কীভাবে আপনি লড়াই করেন? কীভাবে ভাবেন যে ঠিক এখানেই শেষ করবেন? লেখা শেষ করবার পদ্ধতিটি কীরকম? 
ওন্দাৎজে : [হাসতে হাসতে] এটাই আমার গল্পের অন্ধকার দিক। এই এক টানাপোড়েনে আমি ঘুরে ফিরে পড়তে থাকি, প্রতিটি লেখায়। মনে হয়, যদি আমি সবকিছু জানতাম, সব কিছুই আগে থেকে জানা থাকতো— গল্প, গল্পের কাঠামো (স্ট্রাকচার), কীভাবে গল্পে টেনশনের সমাধান হবে- তাহলে কিছুতেই আমি গল্পটি লিখতে বসবো না, লেখার তো দরকারই নেই। লেখা আমার কাছে নতুন আবিষ্কারের চেয়েও অনেক বড় কিছু, অতি বিশিষ্ট একটি প্রক্রিয়া।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: প্রতিটি বই শুরু করার আগে বইয়ের সেটিং (বিন্যাস, গল্পের গতি, আধান, পারিপার্শ্বিকতা) আপনার কাছে কতটা জরুরি?
ওন্দাৎজে : হ্যাঁ, গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেছেন; সেটিং আমার কাছে লেখার খুব জরুরি একটি দিক। সেটিঙয়ে কেবল স্থানই নয়, সময়কালটি আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা ১৯৩৮ সালের মানবতাবিরোধী অবস্থা কিংবা যুদ্ধশেষের ইতালি, বা একটি নির্দিষ্ট সময়ের নিউ অরলিন্স কিংবা শতবছর আগের টরন্টো, যাই হোক, সময়ের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থান ও সময়ের একটা নির্দিষ্টতা আমার খুবই জরুরি হয়ে পড়ে, না হলেই কেবল মনে হতে থাকে— বইটি নিছক এক বেলুন কিংবা জলে ভাসমান এমন কিছু যা অর্থহীন ভেসে আছে। আমার একটি ল্যান্ডস্কেপ দরকার হয়— হয়তো আমি নিজের মতো করে একটা জায়গাকে কিছুটা বদলে দেব কিংবা একটু বেশি করে গড়ে নেব কিন্তু রাস্তাগুলোর সত্যিকার নাম এবং অন্যান্য উপাদানগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে বাস্তব থেকেই আমাকে নিতে হবে।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: এসব করতে গিয়ে গিয়ে কি আপনি মানচিত্র এবং ফটোগ্রাফ ব্যবহার করেন?
ওন্দাৎজে : হ্যাঁ, মানচিত্র, ফটোগ্রাফ এসব তো দেখবোই, তবে আমি ঠিক জায়গাটিতে অবশ্যই যাব। লিখতে বসার আগেই আমি একটা জায়গা খুঁজে বের করি, ল্যান্ডস্ক্যাপটা দেখতে হয় আমাকে; না দেখলে লিখতে পারি না। ‘দি ইংলিশ পেইশ্‌ন্‌ট্‌’ যখন লিখতে শুরু করি, তখন আমি মনের ভেতর বাড়িটিকে তৈরি করে নিয়েছিলাম, যে বাড়িতে ঘটনাবলী বর্ণিত হবে। স্রেফ কল্পনায় বাড়িটি নির্মিত হয়েছিল, বাস্তবের কোথাও ছিল না; তারপরে, বইটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ’র মতো লেখা হয়েছে, তখন একবার ইতালি যেতে হয়েছিল, সেখানে আমি প্রকৃত বাড়িটিকে খুঁজে পেয়েছিলাম যেখানে চরিত্র এবং পরিস্থিতিকে যথাযথ বর্ণনা করা যাবে।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: আপনি সে বাড়িতে সত্যিই গিয়েছিলেন। 
ওন্দাৎজে : আমার মূল প্রবনতাই হলো স্থানটিকে জানালা দিয়ে হলেও এক ঝলক দেখা। আমি যদি ফটোতে কাউকে দেখি, যাকে অর্ধেকটা দেখা যাচ্ছে, তাহলেও সমস্যা নেই, লোকটি আমার বইয়ের কেন্দ্রিয় চরিত্র হয়ে যেতে পারে। আবার যদি এমন হয়, যদি খুব বেশি তথ্য জড়ো হয়ে যায়, যদি কেউ সেই জায়গাটি সম্পর্কে আস্ত একটি বই উপহার দেয়, তাহলেই শেষ, আর হবে না, আমার তো আর নতুন কিছু আবিষ্কারের নেই, লিখলে লেখাটি নষ্ট হয়ে যাবে; উপহারের বইয়েই তো ইতিমধ্যে কয়েক পরত রঙ দিয়ে দেওয়া হয়েছে!
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: ‘দি ইংলিশ পেইশ্‌ন্‌ট্‌’ থেকে ‘ইন দ্য স্কিন অভ এ লায়ন’-এ যেতে মাঝখানে কত সময় লেগেছে?
ওন্দাৎজে : আমার কমপক্ষে বছরখানেক সময় লেগে যায় একটি বইয়ের পর, নিজেকে প্রস্তুত করতে- এ প্রস্তুতি সম্পর্কে আমি আসলে যা বলতে চাচ্ছি তা হচ্ছে, একটি বই শেষ হতে না হতেই আরেকটি বইয়ের ওপর আমি ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি না, ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইও না। এ উপন্যাসের পর কিছুদিন কবিতা লিখেছি, তবে পরের বইটি নিয়েও চিন্তাভাবনা চলছিল। ছয় মাস পরেও আমার কোনও ধারণা ছিল না- ঠিক কী করতে যাচ্ছি, এই ভাবনার ঠিক তিন দিন আগেই ‘দি ইংলিশ পেইশ্‌ন্‌ট্‌’ লিখতে শুরু করে দিয়েছিলাম! তখনও আমি অন্ধকারে। কে সেই রোগী, আমি তাকেও চিনতে পারছি না, ধারণাও করতে পারছি না। কারাভাজ্জো কিংবা অন্য চরিত্রগুলো নতুন লেখাতেও ফিরে আসছে কি না, বুঝতে পারছিলাম না। তখন ঠিক করলাম- আমাকে যথাযথ চেষ্টা করতে হবে যাতে চরিত্রদের একদম চোখের সামনে নিয়ে আসতে পারি, স্পষ্ট যেন দেখতে পারি। তখন দুটো জিনিস আবিষ্কার করলাম : কেউ একজন বিছানায় পড়ে আছে; দ্বিতীয়টি হচ্ছে : একটি ফটোগ্রাফে কাউকে দেখা যাচ্ছে। 

সেই দিনটির কথা স্মরণে এলো, আমি যেদিন বিমানবন্দরে উড়ানের অপেক্ষা করছিলাম, তখন আমি এমন একজনকে নিয়ে লিখতে শুরু করেছিলাম যে খুব কসরত করে ছবি তুলছিল, মনে হচ্ছিল দৃশ্য শিকার করছে লোকটি; যাদের ছবি সে নিচ্ছিল তারা কেউ বুঝতে পারছিল না। আমি এই লোকটিকে বেছে নিলাম, রোগীর কণ্ঠস্বর আরও পরে শুনতে পেয়েছিলাম আমি। তারপর, উপন্যাসটি নিজেই তার পথ খুঁজে পায়, চারটি বিচিত্র চরিত্র দাঁড়িয়ে যায়, আচমকাই; বিশ্বযুদ্ধ শেষের কিছুদিন আগে ইতালির এক বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া চার ব্যক্তির দ্বান্দ্বিক জীবন নিয়েই আখ্যান গড়ে ওঠে। ব্যাপারটা ঠিক এমন যেন আমি একটি স্প্রিং-কে আঘাত করেছি, আর চরিত্ররা নিজেকের এগিয়ে নিয়ে গেছে! আমি কখনও ভাবিনি এমন কিছু হবে, কিন্তু আপনি যদি এভাবে কিছুক্ষণ লিখতে পারেন, তাহলে মহৎ কিছু ঘটবেই; সত্যিই কোনও বাড়িতে যুদ্ধের শিকার তিন চার জন লোক থাকলে, কিছু একটা ঘটবার জন্য অপেক্ষায় থাকতেই হবে! 

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: আপনি সচেতনভাবে, এমন কিছু চরিত্র এঁকেছেন, যেমন— বোমা নিষ্ক্রিয়কারী এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞ চরিত্র, যাদেরকে আপনি নিখুঁতভাবে একেঁছেন, প্রাণ দিয়েছেন; তারা যা করতে চেয়েছে, তা করতে কোনও সমস্যায় পড়েনি, যাকে বলে পারফেক্ট। 
ওন্দাৎজে : লেখালেখির আসল আনন্দ তো এখানেই! উপন্যাস লেখককে অনেক কিছু করতে হয়, অন্যদের থেকে যা একদমই আলাদা। লোকে যেভাবে কোনও কিছু বলে, বর্ণনা করে, আমি তো সেভাবে বলতে পারবো না, লেখক হিসেবে আমাকে আগামেমননের মুখোশ পরে থাকতে হবে কিংবা অন্য কোনও পোশাকে নিজেকে ঢেকে রাখতে হবে, পাঠক যাতে লেখককে বিশ্বাস করতে পারে। 
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: বিভিন্ন সময়ে আপনার লেখায় শব্দের ব্যবহার এমন হয় যেন আপনি সময়ের ভিন্ন ভিন্ন পর্বকে ধরে রাখছেন, এটা কীভাবে করেন? 
ওন্দাৎজে : আমি মনে করি এক বছর বা তারও বেশি অপেক্ষার পর আমার ভেতর যে শব্দ-ভাণ্ডারটি গড়ে ওঠে, তাকেই আমি পরবর্তী লেখায় কাজে লাগাই, তারপর সে-ভাণ্ডার থেকে বেরিয়ে আসি; কারণ, আমি মনে করি- প্রতিটি বইয়ের জন্য আলাদা একটি শব্দভাণ্ডার রয়েছে, একদমই স্বতন্ত্র। আমি এমন এক ভাষাকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করি, যা আমার নিজের ভাষা নয় কিংবা একদমই নতুন এক ভাষা, যা দিয়ে আগে আর কখনওই লিখিনি; যে-বাক্যটিকে আমি আগে কখনওই লিখিনি। আমি বলবো, হে ঈশ্বর, এই শব্দটিকে আমি আগে কখনও ব্যবহার করি নি। নতুন শব্দ-ভাণ্ডারের ধারণাটি আমার কাছে আকর্ষণীয়।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: আপনার গদ্যে, আমরা এমন একটা কিছু খুঁজে পাই, যাকে বলবো- সঙ্গীত; আপনি নিজেও যদি নিজের লেখাকে উচ্চস্বরে পড়েন, তাহলে গদ্যের সঙ্গীত আপনাকে মুগ্ধ করবে। গদ্যের ভেতরকার সঙ্গীতের এই অদ্ভুত ব্যাপারটি কি আপনি লেখার সময় শুনতে পান?
ওন্দাৎজে : হ্যাঁ, শুনতে পাই, যদিও কখনওই নিজের লেখাকে উচ্চস্বরে পড়ি না, ব্যাপারটা কল্পনা করি। লিখবার সময় আমি সঙ্গীত শুনতে পাই, টের পাই স্বরগ্রামের পরিবর্তন। সঙ্গীত নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে, বলতে পারি যে আমি তাতে নিমজ্জিত তবে লিখবার সময় সঙ্গীত শুনতে শুনতে লিখতে পারি না; সঙ্গীতের কিছুটা সম্ভবত কবিতা লেখার সময় ভেতরে তৈরি হয়…সঙ্গীত আমার কাছে অনেক কিছু। সেই কিশোর বয়সে, যখন থেকে ইংল্যান্ডে থাকতে শুরু করেছি, প্রতিদিন জ্যাজ ক্লাবে যেতাম, আমি বলবো ‘রিদম অভ মিউজিক’-এর কথা, কীভাবে যেন আমার লেখালেখিতে সে ছাপ ফেলে, ভীষণ প্রভাবিত করে। ওয়ার্ডসওয়ার্থ নয়, আমাকে প্রভাবিত করেন রে চার্লস। আমার পুরো জীবন বলতে গেলে সুরে নিমজ্জিত। লেখায় এক একটি অনুচ্ছেদ কিংবা দীর্ঘ দীর্ঘ বাক্য, যা কখনও এক পৃষ্ঠাতেও শেষ হয় না, তার পেছনে সঙ্গীত ভূমিকা রাখে, আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় যেন আমি সুর লিখছি, শব্দে বাক্যে সুরকে ধরছি, যে-সুর আমাদের জীবনে প্রবাহিত হচ্ছে, আমাদের আন্দোলিত করছে! শব্দের পর শব্দ বসিয়ে আমি কেবলই যেন ছন্দোময় বাক্য তৈরি করছি। এভাবেই একজন লেখক তাঁর লেখায় সঙ্গীতের ব্যবহার করেন, সুর সৃষ্টি করেন।   
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: কেমন পরিবেশে আপনি লিখতে পছন্দ করেন? চারপাশটাকে দেখতে দেখতে  বা কোনও সুন্দর জায়গায় বসে লিখতে চান, না কি, বাইরের জগত থেকে একদম বিচ্ছিন্ন হয়ে লিখতে চান?
ওন্দাৎজে : আমি যে কোনও জায়গায় লিখতে পারি, একটানা, যতক্ষণ না আশপাশে আর কাউকে দেখতে পাই। ঘরে যদি বন্ধুদের সঙ্গে থাকি, তখন বুঝতে পারি- এ অবস্থায় লেখা সম্ভব নয়। পৃথিবীর সবচে সুন্দর জায়গায় বসে আমি লিখতে পারি, জায়গাটির সমস্ত সৌন্দর্যের কথা ভুলে গিয়ে। ‘ইন দ্য স্কিন অভ এ লায়ন’-এর একটি দৃশ্য লিখেছিলাম এক সুড়ঙ্গের ভেতর বসে, কথাটা প্রায়ই আমার মনে পড়ে। পাতালের অন্ধকারের পুরোটা লেখায় ধরতে বেশ কয়েকদিন আমাকে সুড়ঙ্গের ভেতর কাটাতে হয়, শুধুমাত্র দৃশ্যের গভীরতার জন্য, কিন্তু কোথায় ছিলাম, তা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছিলাম, মনে করেছিলাম জানালার সামনের উজ্জ্বল আলোয় বসে লিখছি সুড়ঙ্গের কথা, সে-সুড়ঙ্গটি উপন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ, লেখার সময়ের গভীর ধ্যানে মাথায় কেবলমাত্র সুড়ঙ্গটি আমার একমাত্র ফোকাস ছিল।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: লেখক হিসেবে নিজের উপলব্ধি ও প্রত্যাশার বিপরীতে পাঠকের প্রত্যাশার দিকটি কি আপনাকে আরও গভীর অন্তর্দৃষ্টিতে দেখতে সাহায্য করেছে, আর পাঠক-প্রত্যাশা কি সব সময় ভালো ছিল?
ওন্দাৎজে : লেখকজীবনের শুরুতেই উপলব্ধি করেছিলাম যে- যদি সত্যিই কেউ লেখালেখি করতে চায়, তাহলে সব কিছুর পরে তাঁকে পাঠকের কথাi ভাবতে হবে; অন্যথায়- লেখক যা পাঠককে দিতে যাচ্ছেন বা আবিষ্কার করতে চাইছেন আর পাঠক যা চাইছেন, তা প্রত্যাশার বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। লেখক যা লিখছেন, দেখা গেল, পাঠক তা চাইছেন না; ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লেখকের অন্তর্দৃষ্টি আর পাঠক প্রত্যাশা বিপরীতমুখী অবস্থানে চলে যেতে পারে। যেভাবেই হোক, লেখার কাজটি কিন্তু অত্যন্ত কঠিন, যেখানে আপনি ধরুন, থিয়েটার দেখতে আসা পাঁচশ দর্শকের প্রত্যেকে যা শুনতে চাইছেন, কিংবা দেখতে চাইছেন কিংবা দেখবার অপেক্ষা করছেন- এখন আপনি কী করবেন? আপনি কী লিখছেন কী করছেন, তা ঠিক তাদের প্রত্যাশামতো হতে হবে- ব্যাপারটা ভীষণ কঠিন; ব্যাপারটা অনেকটা এরকম, বিখ্যাত মন্টি পাইথন সার্কাস দলের কাজ দেখতে আসা দর্শকদের মতো যারা টমাস হার্ডির একাদশ উপন্যাসের অভিনয় দেখতে এসেছেন। পাঠক কিংবা দর্শকের প্রত্যাশা বড় অদ্ভুত।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: লিখতে লিখতেই কি লেখার সম্পাদনা, সংশোধন এসব করতে থাকেন, না কি খসড়া শেষ হবার পর একসঙ্গে সংশোধনের কাজ করেন? 
ওন্দাৎজে : দুটোই করি। লেখার প্রথম খসড়ায় গল্পটিকে আমি আবিষ্কার করি। তারপর, লেখাটিকে বারবার পড়ি, তারপর আবার লিখি; এভাবে লেখার চার থেকে পাঁচটি খসড়া হয়ে যায়, যার পুরোটাই হাতে লেখা। এর মধ্যে যদি এমন কিছু পেয়ে যাই, যা খুব দরকারি কিছু নয় বা আমার কাছে ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে না,  তা বাদ দিয়ে দিই; বারবার পড়লেই বুঝতে পারি- লেখাটার কোথায় বিরাট গর্ত তৈরি হয়েছে, কোথায় আমাকে আরও কাজ করতে হবে। আমি তখন গর্ত ভরাটের কাজে লেগে যাই, দরকারি শব্দগুলো গর্তে ঢেলে দিই। খসড়ার পর খসড়ায় আমার কাজ কেবল যুক্ত করা, বাদ দেওয়া, যেন- খুঁড়তে খুঁড়তে মাটির আরও গভীরে চলে যাওয়া, যাতে লেখাটি পাঠককে স্পর্শ করতে পারে।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: উপন্যাসের ঠিক মাঝামাঝি আছেন, সে অবস্থায় কাউকে কি লিখিত অংশটুকু পড়তে বলেন?
ওন্দাৎজে : ততোক্ষণ কাউকেই পড়তে দিই না যতক্ষণ না কারও সাহায্য ছাড়া এগোতে পারি, কারণ, লেখার খসড়াটি তখনও জটিলতার মধ্যে পড়ে রয়েছে; অনেক অনেক খসড়া, তাতে অনেক জোড়াতালি দেওয়া অংশ, আমার নিজেরও কোনও ধারণাই নেই লেখাটা ঠিক কোথায় যাচ্ছে; আদৌ কিছু হচ্ছে কি না কিংবা হলেও মর্মস্পর্শী কিংবা উত্তেজনাকর কিছু হয়ে উঠছে কি না—এসব নিয়ে আমি গোলকধাঁধায় থাকি। পরে একসময় অবশ্য পড়তে আগ্রহী এমন তিন চারজনকে দেখাই, তাদের পাঠকৃতি শুনি।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: কী খুঁজতে লেখেন? লেখক হিসেবে আপনার আকাঙ্ক্ষা কী থাকে?

ওন্দাৎজে : যে কোনও কিছু… আসলে আমি চাই পাঠকের সতর্ক প্রশংসা অথবা সতর্ক অভিযোগ। লিখতে গিয়ে যে সমস্যাটা হয়, তা হলো— ধীরে ধীরে চরিত্রগুলি আপনার কাছে এতোটাই বাস্তব হয়ে উঠেছে যে এখন তাদের আপনি এতো ভালভাবে জানেন, কিন্তু তাদের সম্পর্কে আরও কী কী বলা দরকার তা কিছুতেই বুঝতে পারছেন না। এখন আপনাকে এমন কিছু স্পষ্ট কথা বলতে হবে যা বলবেন বলে মনে হয়েছিল, কারণ— বলার সেই পরিস্থিতি আপনিই তৈরি করেছেন।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: বোধ কিংবা অর্থের দিক দিয়ে, লেখায় কি আপনি নির্দিষ্ট কিছু বলতে চান? আপনার গল্প কী বলতে চাচ্ছে, বা কী হতে চাচ্ছে, তা কি আপনি আগে থেকেই বুঝতে পারেন?
ওন্দাৎজে : গল্পে কী হতে চলেছে- সে সম্পর্কে সত্যিই আমার কাছে কোনও ক্লু যে থাকে না, এটা আমি বেশ পরে আবিষ্কার করেছি। আমি চরিত্র এবং চরিত্রদের সঙ্গে নিয়ে চলতে থাকা গল্পের ব্যাপারে অনেক বেশি সচেতন থাকা লেখক। গল্পের চরিত্র নিয়ে আমি প্রচণ্ড টেনশনে থাকি- পারফেক্ট হচ্ছে তো? তাঁকে যথাযথ পূর্ণতায় ধরতে পারছি তো? আমি চাই চরিত্রগুলি যতটা সম্ভব বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠুক, জটিল হয়ে উঠুক; এই জটিলতায় কী হচ্ছে, তা নিয়ে আমি আগ্রহী থাকি না, জটিলতার তাৎপর্য নিয়েও ভাবি না। আমি প্রথম যখন কানাডায় আসি, তখন ভেবেছি- এখন একটি বই লিখব যে-বইয়ে কানাডা থাকবে, তখন আমি ‘বিলি দ্য কিড’ এবং ‘কামিঙ থ্রু স্লটার’ লিখলাম। এই দুটো বই লেখার পর, ঠিক করলাম- এবার শ্রীলংকা নিয়ে লিখব; তখনও আমি শ্রীলঙ্কার পটভূমিতে লিখিনি, অনুভব করতে লাগলাম যে শ্রীলঙ্কাকে পটভূমিতে রেখে আমি বই লিখতে সক্ষম হবো, এবং সফলও হবো। লেখক কী লিখবেন, তাঁকে কী লিখতে হবে আর কী লিখতে হবে না- এটা বলা সত্যিই কঠিন। আমি সব সময়ই এমন কিছু লিখতে আগ্রহী, যা আমি লিখতে পারব না বলে ভেবেছি! 
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: আমি ভেবেছিলাম সিনেমার প্রতি আপনার আগ্রহ এবং সিনেমা-নির্মাণের শিল্প সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করব।
ওন্দাৎজে : সিনেমার প্রতি প্রেম আমার জীবনের প্রথম থেকে, আমি তার চোখধাঁধানো উজ্জ্বল্যে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম; আর এখনও সে প্রকৃত ম্যাজিক, একদমই খাঁটি, এমনকি অর্থহীন একটি সিনেমাও এক ম্যাজিক। জোর দিয়ে বলছি- সিনেমা আমার কাছে প্রকৃত ম্যাজিক ছাড়া আর কিছুই নয়, ঠিক যখন পরম বিস্ময়ে করম্যাক ম্যাককার্থি বা রাসেল বাংক্‌স্‌ কিংবা অন্য কারো লেখা বিস্ময়কর বইটি পড়ছিলাম, তখনও ম্যাজিকের ব্যাপারটি উপলব্ধি করেছি আরও ভালো করে; বুঝতে পেরেছি কীভাবে সিনেমা তার দৃশ্যগুলোর মধ্যে জীবনকে ধরতে চায়, জীবন উন্মোচন করতে চায়, ঠিক কীভাবে সিমেনা সব সময়ই সাহিত্যের সঙ্গে চলতে চায়, সাহিত্য থেকে নিজেকে আলাদা করতে পারে না। সম্পাদনার ক্ষেত্রে- সিনেমা এবং বইয়ের মধ্যে দারুণ মিল খুঁজে পাই বলেও এই মাধ্যমটিকে প্রচণ্ড ভালোবাসি। লেখক যখন তার বইটি পুনর্পাঠ করছেন, পুনর্বার লিখছেন, কাটাকাটি করছেন, অর্থাৎ তিনি যে তার বইটিকে সম্পাদনার টেবিলে নিয়ে এসেছেন, তখন সম্পাদনার কৌশলগুলো জানা থাকাটা সবচে জরুরি, ‘ক্র্যাফট’ জরুরি। ওয়াল্টার মার্চের— প্রখ্যাত সিনেমা সম্পাদক— সঙ্গে আমার দীর্ঘ আলাপ নিয়ে যে-বইটি বেরিয়েছে, তাতে আমরা এসব নিয়েই কথা বলেছি; কথা বলেছি— কীভাবে একজন লেখক তার লেখাকে সম্পাদনা করেন, কীভাবে নৃত্য সম্পাদনা হবে, কীভাবে একটি ‘অপেরা’ সম্পাদিত হবে, কীভাবে গানের রেকর্ড হবে। গানের শুরুর দিকের এক স্বর কীভাবে ধীরে ধীরে বহুল স্বরে পরিণত হয়, সেই স্বর ধারণ করবে যে-যন্ত্র, তাকে ব্যবহারের ক্র্যাফটও জানতে হবে, নির্মাতাকে। আমি এই নৈপুণ্য কিংবা ক্র্যাফটকে পছন্দ করি। ক্র্যাফট আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: আপনার প্রিয় সিনেমাগুলো সম্পর্কে কিছু বলুন। 
ওন্দাৎজে : ‘দ্য লাইভস অভ আদার্স’ নতুন সিনেমা হিসেবে দুর্দান্ত, এবং ‘দ্য বেস্ট অভ ইয়ুথ’ নামের ইতালিও সিনেমাটির কথাও আমি বলব— অসামান্য। আত্মজীবনীতে ওয়াল্টার মার্শ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে আমি মাত্র দশটি সিনেমার কথা বলেছি, যাদের আমি আমৃত্যু পছন্দ করব। আমি মনে করি, সিনেমা হচ্ছে একধরনের সীমিত শিল্প রূপ (লিমিটেড আর্ট ফর্ম), যা এখনও পশ্চিমে পড়ে রয়েছে। সিনেমার ব্যাপ্তি দু-ঘণ্টা বা দেড় ঘণ্টা, সে এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সিনেমায় আপনি কখনওই চরম মাত্রায় যেতে পারবেন না এর দর্শক না হারিয়ে, যেখানে, আমি মনে করি— বইয়ে আপনি চরম কিছু করে ফেলতে পারবেন। আশা করি— বইয়ে সেই কঠিন কাজটি করে ফেলা সম্ভব! 
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: এখনও সমান সচল উপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, স্মৃতিচারণকারী এবং কবিদের মধ্যে আপনি কার কার কাজকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন? 
ওন্দাৎজে : এটা একটা দারুণ ব্যাপার যে, বই কখনও মরে না; তাই- উইলা ক্যাথার, জোসেফ রথ, মাভিস গ্যালান্ট, রবার্ট ক্রিলে, টমাস ট্রান্সট্রোমার, পেনেলোপ ফিটজিরাল্ড, লোরিন নিদেকার এবং ডেরেক ওয়ালকোট এখনও, প্রতি মহূর্তেই আমার সঙ্গে আছেন, বর্তমান সময়ের এতো এতো প্রকাশনার ভিড়ে তারা উজ্জ্বল হয়েই আছেন। প্রিয় সব সমসাময়িকদের নাম এখানে বলে শেষ করতে পারব না, তবে তাদের কিছু বইয়ের নাম বলছি : গ্রাহাম সুইফটের ‘ওয়াটারল্যান্ড’ ডেভিড মলুফের ‘অ্যান ইমাজিনারি লাইফ’, ডন ডি’লিলোর ‘দ্য নেইমস’, ‘লিব্রা’; লিওনার্ড গার্ডনার ‘ফ্যাট সিটি’, লুইস এরদিকের ‘দ্য রাউন্ড হাউস’, ডেনিস জনসনের ‘ট্রেন ড্রিমস’, জন এহলের ‘দ্য ল্যান্ড ব্রেকার্স’; এর সঙ্গে যুক্ত হবে অ্যানি ডিলার্ড ও ডোনাল্ড রিচির প্রবন্ধ। এছাড়াও কবি ডন প্যাটারসন, ফিলিস ওয়েব, ক্যারেন সলি, কো উন, ব্রেন্ডা হিলম্যান ও অ্যালিস ওসওয়াল্ডের দীর্ঘ কবিতা ‘স্মৃতিচিহ্ন, যা লিখিত হয়েছে ট্রয় যুদ্ধের অজ্ঞাতনামা মৃতদের নিয়ে।
 সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: আপনার পাঠের প্রিয় বিষয় কী?  
ওন্দাৎজে : আমি সেসব স্মৃতিকথা পড়তে চাই যেখানে লেখকের জীবনের সঙ্গে সম্পূর্ণ অচেনা অদ্ভুত কোনও জগতের দেখা পাওয়া যায়, যে-জগতের কথা কোনওদিন কেউ বলেনি, যেমন- সি. এল. আর. জেমসের ‘বিওন্ড এ বাউন্ডারি’, মিখাইল বুলগাকভের ‘এ কান্ট্রি ডক্টরস নোটবুক’, কিংবা রাজা শেহাদের ‘প্যালেস্টাইনিয়ান ওয়াক’। আমি আসলে বিচিত্র বিষয়ের পাঠক। একটা বইয়ের কথা বিশেষভাবে বলতে হয়- ১৯৯২-এ প্রকাশিত অমিতাভ ঘোষের ‘ইন অ্যান এন্টিক ল্যান্ড’; স্মৃতিকথার সঙ্গে ইতিহাস খুঁড়ে দেখবার এ এমন এক বই, যাকে সব সময় আমাদের সময়ের একটি অবশ্যপাঠ্য মনে হয়েছে।  
সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: এমন সুনির্দিষ্ট কিছু আছে কি যা আপনি উপন্যাসে খুঁজেন? একটি আর্ট ফর্ম হিসেবে উপন্যাস আপনাকে এমন কিছু দেয় কি, যার কারণে বারবার আপনি উপন্যাসের কাছেই ফিরে আসতে চান?
ওন্দাৎজে : আপনি তো ভালো করেই জানেন— লোকে যখনই সু্নির্মিত উপন্যাসের কথা ভাবে তখন তারা কিন্তু জেন অস্টেন কিংবা রবার্টসন ডেভিস বা এদের মতো অন্য কাউকে ভাবেন, তা ঠিক আছে, তাদের উপন্যাস সুনির্মিত, সুলিখিত; কিন্তু উপন্যাসের প্রতি আমার আগ্রহের জায়গাটি কী, তা হলো—  উপন্যাসটি যদি অত্যন্ত সুলিখিত হয়, তবে তাকে কমপক্ষে দু'শ পৃষ্ঠার হতে হবে, এবং যা লিখিত হওয়ার সময় থেকে এখন পর্যন্ত সমকালীন এবং জীবনের সমস্ত কিছুকে ধরে আছে; অথবা হতে পারে— উপন্যাসটি বিশাল, বিস্তৃত কিছু। আমি মনে করি, উপন্যাসে এক বিস্ময়কর স্বাধীনতা রয়েছে, এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উপন্যাস নির্দিষ্ট করা কোনও পদ্ধতিতে লিখতে হয় না; আপনি একই উপন্যাসে বিভিন্ন ধরণের স্বর ব্যবহার করতে পারেন; আপনি উপন্যাসের গতি, সুর এবং ঘটনাবলীর দিক পরিবর্তন করতে পারেন। আমি প্রথম যখন ফকনার পড়লাম ঠিক তখনই উপন্যাস লিখতে চাইলাম। ফকনার পড়ার আগে ভাবতাম- উপন্যাসে আমি সেই স্বাধীনতা পাবো না যে-স্বাধীনতা কবিতায় পাই, কিন্তু তাঁর ‘আবসালোম, আবসালোম!’ পড়বার পর দেখলাম, উপন্যাসেও সে স্বাধীনতা আছে, বিস্ময়করভাবেই আছে।



অলংকরণঃ আশিকুর রহমান প্লাবন