জলধি / ভ্রমণ / গ্রানাডায় তাপাস ভোজন
Share:
গ্রানাডায় তাপাস ভোজন

পথ ধরে নিচু কমলাবিথির

দিকসীমায়,

শোকার্ত শত ঘোড়সওয়ারেরা

যাবে কোথায়?

যেতে পারবে না তারা সেভিয়ায়

কর্দোবায়,

গ্রানাদায়ও নয় সিন্ধুকাতর

যে দিনমান।

ক্রুশচিহ্নের গোলকধাঁধায়

যেখানে গান

কেঁপে কেঁপে ওঠে, তন্দ্রাবিধুর

ঘোড়ারা তাদের নেবে তত দূর।

কমলাবিথির আন্দালুসীয়

শত ঘোড়ায়

কাঁটাগাঁথা সাত শোক নিয়ে তারা

যাবে কোথায়?

(ফেদেরিকা গারসিয়া লোরকা, অনুবাদঃ সাজ্জাদ  শরিফ ) 

দক্ষিণ স্পেনের শহর গ্রানাডার প্রধান রেল স্টেশনের খুব কাছেই লিওনার্দো হোটেলে এসে উঠেছি। স্টেশন থেকে পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ। হোটেলের সামনের রাস্তার সড়কদ্বীপে কেয়ারি করা গাছের সারি। মাঝে মাঝে কিছু বেঞ্চ পাতা। সেখানে মূর্ত নানা ভাস্কর্য। দ্বীপ টপকে রাস্তা পেরুবার সময়ে এই ভাস্কর্যগুলোর সাথে চোখাচখি হলে কয়েক মুহূর্তের জন্যে থমকে দাঁড়াতে হয়।

হোটেলটি বহুতল। সৌভাগ্যবশত আমি ঘর পেয়েছি চতুর্দশ তলের কোণের দিকে। সেখানে জানালার পর্দা সরালেই পুরো শহরটি ভেসে ওঠে। এমন একটি ঘরে আশ্রয় পেয়ে বেশ আমোদে ছিলাম। কিন্তু সেই আমোদ কিছুটা টুটে গেল পরদিন রাতে।

সেদিন সারাদিন সারা শহরে টইটই করে ঘুরে বিছানায় এসে ক্র্যাশ ল্যান্ড করেছি। ঠিক কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না। হটাৎ শুনি– পাশের ঘর থেকে গোঙানির শব্দ। কারুর পেটে অতর্কিতে ছুড়ি বসিয়ে দিলে যেমন গোঙানির শব্দ হয়, তেমন। প্রথমে ভাবলাম, এ আমার ভ্রান্তি। তন্দ্রার মাঝে অলীক কোন শব্দের উপস্থিতির পিছু ধাওয়া করা। কিন্তু সেই একই শব্দ ভেসে আসে আবার। তারপর আবার। মাঝ পুকুরে ঢিল ফেললে যেমন ভাবে একের পর এক নিস্তেজ ঢেউ এগিয়ে আসে তীরের দিকে, তেমনিভাবে সেই শব্দ এগিয়ে এসে বিলীয়মান হয়ে যায় আমার ঘরে। একটু উৎকর্ণ হয়ে শুনতে পাই, এই শব্দের মাঝে আরও একটি বিশেষ শব্দ যুক্ত হয়েছে, সেটি ওধারের পালঙ্কের অভিঘাতের শব্দ। পালঙ্কের একদিক খুব সম্ভবত দেয়ালের সাথে লাগোয়া। এই দুইয়ের ঘর্ষণে টেলিগ্রাফের টরেটক্কা শব্দের মত সেটিও ছন্দময় এক শব্দ তৈরি করে– টকাটক, টকাটক।

অন্যদিন হলে এসব নানামুখী শব্দের উৎস কিংবা বিস্তার নিয়ে আমি চিন্তিত হতাম না। ওধারের ওরা সঙ্গমে মাতুক, অথবা শ্যাম্পেনে মাতুক, তাতে আমার কী? কিন্তু সেদিনের সমস্যা হল, আমার আইফোনের হেলথ এপটি নির্দেশ করছে– আমি হেঁটেছি মোট আট মাইল, আর সিঁড়ি বেয়েছি প্রায় তেইশ তলের মত। শরীরে রাজ্যের ক্লান্তি। ওদিকে বেড সাইড টেবিলে রাখা হাতঘড়ির সবুজাভ রেডিয়াম ডায়াল নির্দেশ করছে– তখন রাত বারোটা বেজে বিশ। পরদিন বেশ সকাল বেলায় উঠতে হবে। সারা দিন বেশ কয়েকটা জায়গায় ঢুঁ মেরে রাতে স্প্যানিশ বুলেট ট্রেন রেনফে ধরে যেতে হবে ভিন্ন এক শহরে। স্প্যানিশ এই বুলেট ট্রেনটি একেবারে ঘড়ি মেপে চলে, এক মিনিটও এদিক-ওদিক হবার জো নেই। তাই রাত দুপুরে এই প্রণয়লীলা-উদ্ভূত শব্দের কাছে পরাভূত হয়ে ঘুমখানিকে বিসর্জন দিলে আগামীকালের পরিকল্পনায় গড়বড় হবার সম্ভাবনা প্রবল। আমি তাই কিছুটা অনন্যোপায় হয়েই দেয়ালে দুটো কিল মেরে ওদেরকে সিগন্যাল দিয়ে দিলাম– 'যা করবার কর, তবে স্বতঃস্ফূর্ততার মাত্রাটা খানিক কমিয়ে করলে এই অধমের ঘুমের খানিকটা সুবিধে হয়!’

পরদিন খানিকটা বেলা করেই ঘুম ভাঙে। হাতে মুখে জল দিয়ে আমি এভেনিডা দ্যা লা কন্সতেতিসিওন সড়কটি ধরে হাঁটতে থাকি। কিছুদূর পরই একটা ক্যাফের দেখা পেয়ে যাই। নাম– এল সল, মানে সূর্য। সেখানে একটু চা পেস্ট্রি খাবো হয়তো। দরজা খুলে ভেতরে দেখি, সামনের ডান দিকে বিশাল এক কুকুরকে মাটিতে বসিয়ে মনিব ভদ্রলোক আয়েস করে কফির পেয়ালায় চুমুক দিচ্ছেন। আমাকে দেখে কুকুর খানিকটা মাথা উঁচু করে তাকালেও পরমুহূর্তে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে মনিবের পায়ের কাছে লেপটে যায়। ওদিকে ট্রে হাতে ছুটে যাওয়া ওয়েট্রেস ‘ওলা’  বলেই একফালি হাসি ছুঁড়ে দিয়ে আমাকে বাঁ ধারের টেবিলখানা দেখিয়ে দেন। এই ওয়েট্রেসের পরনে নীল শার্ট। পাতলা ঠোঁটে হালকা করে দেয়া লাল লিপস্টিক। স্পেনের এ-অঞ্চলে এই একটি ব্যাপার খেয়াল করলাম। এখানকার কফি শপের ওয়েট্রেসরা দুখি-দুখি মুখ করে থাকেন না, বরং বেশ পরিপাটি টিপটপ হয়ে সেজে থেকে কফির পেয়ালাখানি এগিয়ে দেন।

এল সল ক্যাফেতে আমি অর্ডার করি এক পেয়ালা চা আর ব্রাসিতো কেকের একটি টুকরো। ব্রাসিতো এখানকার স্থানীয় কেক। উপরিভাগে চিনির সিরার প্রলেপ, ভেতরে ক্রিম। মুখে দিলে হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো গলে যায়।

এখান থেকে ইসাবেল প্লাজায় কী করে যেতে হবে জিজ্ঞেস করলে ক্যাশিয়ার মহিলা আমাকে হাত নেড়ে পূর্বে চলে যাওয়া পিচঢালা পথটির দিকে নির্দেশ করেন।

সকালের সময় যেহেতু, তাই পথেঘাটে সদ্য ঘুম ভেঙে অফিস আদালতে দৌড়ুনো লোকেদের মন্থর পদচারনা। চাইলে হয়তো আমি বাসেও যেতেও পারতাম। কিন্তু এই সকালের হাওয়া খাওয়া থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে দেড় মাইল পথের জন্যে বাস দাবড়াতে ইচ্ছে হচ্ছে না। তাতে অবশ্য একদিকে ভালোই হল। পথে যেতে যেতে দু একটি ছোট্ট পার্ক পেরিয়ে গেলাম। খানিক থেমে পার্কের নিকটবর্তী হতেই দেখি, প্রাচীরের কাছটায় উপচে আছে আতা ফল। বঙ্গদেশে বহুল প্রচলিত এই ফলটির আদি জন্মভূমি কিন্তু ল্যাটিন আমেরিকায়। সেখানে একে বলে আতে। স্প্যানিয়ারডরা ল্যাটিন আমেরিকা বিজয় করার পরই খুব সম্ভবত তাদের জাহাজে চড়ে আতে পাড়ি জমায় স্পেনে, তারপর সেখানে থেকে আবারও কোনো বণিকের জাহাজে করে যাত্রা করে উপমহাদেশে। শুধু যে এই আতা ফল দেখেই চমকে গেছি, তা-ই নয়। গতকাল এখানকার এক পার্কে হাঁটতে গিয়ে দেখি, একপাশে সারি বেঁধে ফুটে আছে মোরগ ফুল। এর আগে ইউরোপ-আমেরিকার আর কোথাও এই ফুলটি চোখে পড়েনি। আতা ফলের মত মোরগফুলের-ও আদিবাসস্থল স্পেনে নয়, আফ্রিকায়। দুঃসাহসী নাবিকের হাত ধরে সেও হয়তো পরে পৌঁছে যায় এশিয় ভূমিতে।  

পার্ক পেরিয়ে মাইলখানেক হেঁটে পৌঁছাই ইসাবেল প্লাজায়। এটাই যে ইসাবেল প্লাজা, সেটি আমি বুঝে নিই সুউচ্চ পাথরের বেদিতে থাকা রানি ইসাবেলার একটি ভাস্কর্য আবিষ্কার করে। ইসাবেলার সামনে শ্রদ্ধায় নুয়ে কলম্বাস পেশ করছেন তার ভারত-অভিযানের নকশা।

কলম্বাসকে কিন্তু রানি প্রথমেই এই যাত্রার জন্যে অর্থ দানে সম্মত হননি। রানি তখন নানা দিকে যুদ্ধ জয়ে ছুটছেন। তাঁর কোষাগার ফাঁকা। এমন অবস্থায় কলম্বাসকে সমুদ্র অভিযানের জন্যে পয়সা দেয়া যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। ওদিকে কলম্বাসও ছাড়বার পাত্র নন। তিনি রানির পেছনে লেগেই রইলেন। পাঁচ পাঁচবার আবেদন করার পর অবশেষে রানি তাঁকে গ্রানাডার পশ্চিমের শহর সান্তা ফে-তে দেখা করতে বললেন। রানির মত পরিবর্তিত হল। তবে কোষাগার থেকে অর্থ নয়, রানি আদেশ দিলেন– দক্ষিণের ক্রীতদাস শ্রেণিকে কর দিতে হবে কলম্বাসের এই সম্ভাব্য ব্যর্থ অভিযানের জন্য। অবশেষে তাই হল। সেভাবেই অর্থ সংগ্রহ হল, কলম্বাস ভারত আবিষ্কার করতে গিয়ে খুঁজে পেলেন বাহামা উপকূল বা আজকের আমেরিকা মহাদেশ।

ইসাবেল প্লাজার ডান দিকে ঘুপচি গলির মার্কেট। এর মধ্যেই সেটি ধীরে ধীরে জেগে উঠতে শুরু করেছে। আমি মার্কেটে ঢোকার মুখে মিষ্টি মুখ করবার আমন্ত্রণ পাই। ওখানে ছিল স্পেনের প্রখ্যাত মিষ্টি বানাবার কোম্পানি ভিসেন্স তোরন-এর দোকান। সকালে বউনির সময় বলে ওরা থালায় করে মিষ্টির স্যাম্পল এনে পথচারীদের সাধছে। আরে খেয়েই দেখুন না, পছন্দ হলে নেবেন, নইলে নেই– এই বলে প্রলুব্ধ করছে। আরটিসান নুগাট নামক এ মিষ্টিকে দূর থেকে দেখে মনে হয়, যেন আমাদের শন পাপড়ির টুকরো, ভেতরে কিছু বাদামের টুকরো ঢুকিয়ে দেয়া। আমি কিছুটা আকৃষ্ট হয়ে দু তিন পদের  স্যাম্পল মুখে দিলাম। উফফ, যেন অমৃত। মূলত মিশ্রিত বাদামের ভিন্নতার উপর নির্ভর একেক পদের মিষ্টির একেকটি নাম। কোনটি হয়তো তৈরি হয়েছে পেস্তা বাদাম দিয়ে, তো কোনটি আবার কাঠবাদাম দিয়ে। তুরস্কের টার্কিশ দিলাইটের সাথে এই নুগাটের কোথায় যেন মিল। সেই সেলসম্যানকে জিজ্ঞেস করাতে জানলাম, স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলে এই মিষ্টির উদ্ভব হয়েছিল সাত-আটশ বছর আগে স্প্যানিশ মুসলিমদের হাত ধরে। তাই অনুমান করি, কেন এই দু অঞ্চলের মিষ্টির মাঝে সাযুজ্য থাকাটা বিচিত্র নয়।

উঁচু সিলিঙয়ের চারতলা বাড়িগুলোর নিচতলায় নানা পদের দোকান। বাড়িগুলোর জানালা কিছুটা অদ্ভুত। অনেকটা যেন দরজার মত লম্বাটে, দীর্ঘ। রোদের তেজ থেকে বাঁচার জন্যে প্রতিটি জানালার সামনেই ঝুলছে মাদুর। কয়েকটি জানালার সামনে এক চিলতে বারান্দা। তার সবটুকু জায়গা দখল করে আছে গৃহস্থের শখের টবগুলো। আর ওই নিচের দোকানগুলো, ওদের মাঝে হস্তশিল্পের দোকানেরই প্রাধান্য। কিংবা আরও সহজ করে হয়তো বলা যায়, টুকিটাকি জিনিসের দোকান। এমনই একটি দোকানে ঢুঁকে পোড়ামাটি দিয়ে বানানো কাপ হোল্ডার দেখছিলাম। বাংলাদেশী জেনে মরোক্কান বিক্রেতা খুশি হয়ে বললেন, ‘ওটার গায়ে দাম লেখা চৌদ্দ ইউরো। কিন্তু তুমি নিলে দশে ছেড়ে দেব। তোমরা বহু রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছ। আমাদের দেশে সেটা নিয়ে আমরা আলাপ আলোচনা করি। উই লাভ বাংলাদেশ।’

ছেলেটির বাড়ি মরক্কোর তাঞ্জিয়ের শহরে। প্রতি দু সপ্তাহ অন্তর বাড়ি যায়। এখান থেকে প্রথমে বাসে করে যায় আলজেসিরাস শহরে। তারপর সেখান থেকে ফেরিতে করে মরক্কোর তাঞ্জিয়ের। পাশের দেশ হওয়ায় স্পেনের অভিবাসীদের মাঝে একটা বড় অংশই মরক্কোর লোকজন। অন্তত এ শহরে তেমনটাই মনে হল। মাদ্রিদ কিংবা বার্সেলোনার মত বড় শহরে অবশ্য বহু বাংলাদেশী কিংবা পাকিস্তানির-ও দেখা মেলে। বার্সেলোনায় পিকাসো মিউজিয়াম দেখতে গিয়ে দেখি, সে পাড়ার কয়েকটা বাড়ির দোতলায় ঝুলছে ঢাকার বাবুপুরা মার্কেটের গামছা। অতএব, এর বাসিন্দারা যে কোন দেশ থেকে আগত, সেটা তো সহজেই অনুমেয়! পরে সে পাড়ার-ই এক দোকানির কাছে জানলাম, সস্তা ভাড়া হওয়ায় ও-অঞ্চলে বহু বাংলাদেশীর বাস।

ভদ্রলোকের বাড়ি সিলেটে। প্রথমে টুরিস্ট ভিসা নিয়ে গিয়েছিলেন লন্ডনে। সেখান থেকে ভাগ্নি জামাইয়ের আমন্ত্রণে এই স্পেনে। এখানে এক ভারতীয় মালিকের দোকান সামলান। একাই সামলান। বললেন– থাকার বৈধ কাগজ এখনো হয়নি, তবে হবে হয়তো খুব শীঘ্রই। তারপর দেশে বেড়াতে যাবেন।

পরে বার্সিলোনার ক্যাথেড্রালে গিয়ে দেখলাম, বহু পাকিস্তানি ফেরিওয়ালা। খেলনা ঝুনঝুনি বিক্রি করছে। দেখেই বোঝা যায়, সদ্য এসেছে। ’১৫ সালের দিকে ইউরোপে শরণার্থীদের ঢল নামার পর মানব পাচারকারীদের ব্যাবসা আরও ফুলেফেপে ওঠে। আগে থেকে তুরস্কের মাঝ দিয়ে রুট তো ছিলই, সেই সাথে এরা নতুন রুট বানায় উত্তর লিবিয়ার মাঝ দিয়ে। আর এই লিবিয়া হয়ে যারা আসে, তারা যুদ্ধতাড়িত আফঘান, সিরিয় বা ইরাকি নয়। এরা মূলত দারিদ্রতাড়িত বাংলাদেশী, পাকিস্তানি কিংবা উত্তর আফ্রিকান। তাদের মূল গন্তব্য থাকে ইটালি কিংবা স্পেন। সেভাবেই হয়তো এই অর্থনৈতিক অভিবাসী পাকিস্তানিদের এদেশে আগমন।

ইসাবেল-প্লাজা সংলগ্ন মার্কেট চত্বরে বেশ কয়েকবার ঘুরপাক খাবার পর যে স্থানে এসে উপস্থিত হই, সেখানটায় মানুষের দীর্ঘ লাইন। দণ্ডায়মান সবাই খানিকটা অধৈর্য, বিরক্ত, ক্লান্ত। অনেকটা যেন রেশনের দোকানের সামনে লাইন দিয়ে থাকা চাল-কেরোসিনের ক্রেতাদের মত। কেনো তারা দাঁড়িয়ে আছে, সেটি অনুসন্ধানে সময় ব্যয় না করে আমি আগে গিয়ে ওই লাইনে একখানা স্থান দখল করি। তারপর একে-ওকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি– এটি নাকি রয়্যাল চ্যাপেলে ঢোকার লাইন। প্রতিদিন খুব স্বল্প সংখ্যক মানুষকে এর ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেয়া হয়। তাই এখানে যারা দাঁড়িয়ে আছেন, তারা এখনো নিশ্চিত নন শেষ অবধি ভেতরে ঢোকার সৌভাগ্য হবে কিনা।

এই চ্যাপেলের কথা আগেই শুনেছি। এখানেই আছে রানি ইসাবেলা আর তার স্বামী রাজা ফারদিনাদের সমাধি। তবে আমার পূর্ব অনুমান ছিল, চ্যাপেলেটি হয়তো হবে খোলামেলা কোনো জায়গায়। এখানে এই মার্কেটের কোণে, মূল সড়কের আড়ালে একধারে এটি চুপিসারে দাঁড়িয়ে থাকবে, তেমনটি ভাবিনি। তাই প্রথমে এখানকার এই জটলার হেতু বুঝতে ব্যর্থ হয়েছি। এখন ভালোয় ভালোয় ভেতরে ঢুকতে পারলে হয়!

কোনো জায়গায় একটু লোক সমাগম হলেই যেমন আমাদের দেশে জুটে যায় দু একজন ঝালমুড়িওয়ালা, তেমনি  এখানেও জুটেছেন একজন। তবে ইনি কোনো ফেরিওয়ালা বা ভিকিরি নন। বিশেষ এক কেরামতি দেখিয়ে সামনে থাকা টিনের কৌটায় পয়সা রেখে যাবার আহবান করছেন। তার কেরামতিটি এমন– স্প্যানিশ ফুটবল দলের গোলকিপারের জার্সি-বুট পরে এমনভাবে শূন্যের মাঝে বেঁকে রয়েছেন, যেন এই বুঝি ছুটে আসা বল-কে দু হাতের দস্তানার মাঝে বন্দি করবেন। হুট করে দেখলে ভ্রম হয়– মানুষটি বুঝি সত্যিই হাওয়ায় ঝুলে রয়েছেন। কৌতূহলী মানুষ থম মেরে তাকিয়ে ব্যাপারটার গুপ্ত কৌশল সম্পর্কে দু দণ্ড ভাবতে বসে। যাদের অতো সময় নেই, তারা ভাবাভাবি বাদ দিয়ে কৌটোয় দু চারটা পয়সা ফেলে সামনে এগিয়ে যায়। ঠিক একই ধরণের ব্যাপার দেখেছিলাম একবার রোমে। ওখানে যিনি দেখাচ্ছিলেন, তিনি রূপ নিয়েছেন একজন ভারতীয় সন্ন্যাসীর। গায়ে উজ্জ্বল গৌর বসন। তার ভেলকিটা ছিল– যেন বাতাসে ভেসে আছেন কেবল একটি শীর্ণ লাঠিতে ভর দিয়ে। কেও ছবি তুলতে চাইলে আগে পয়সা ফেলে তারপর ছবি নেবার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন। এখানকার ইনি অবশ্য তেমন কোনো ইশারা-ইঙ্গিত না করে একেবারে প্রস্তর মূর্তির মত জড় হয়ে আছেন। মিনিট পাঁচেক পরেই অবশ্য দেখি, খানিকটা দুলে উঠলেন। তারপর বেরিয়ে এলেন আসল গুমোড়টি ফাঁস করে। দেখলাম– মাটিতে পেতে রাখা কার্পেটের নিচে লুকনো আছে একটি লোহার পাত। সেই পাতের সাথে আরও বেশ কয়েকটি লোহার ধাতব পাত জোড়া লাগিয়ে সেটিকে পিঠের অবলম্বন হিসেবে ব্যাবহার করে লোকটি এতক্ষণ ঝুলে ছিলেন। সেই পাতটি তার জামার নিচে লুকনো থাকায় দূর থেকে দেখলে বোঝা যায় না। তবে এই কাজটি করতে তাকে যে অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়, সেটি সহজেই অনুমেয়। লোকটি সামনে থাকা কৌটোটি দুবার ঝাঁকিয়ে ভেতরে জমা হওয়া ইউরো’র কয়েনের আধিক্য সম্পর্কে একটা নেবার চেষ্টা করেন। তারপর পাশে রাখা ব্যাগ থেকে সিগারেটের প্যাকেট বার করে আয়েশ করে সিগারেট ধরান। ইনি কি আবারও সেই ধড়াচূড়া পরে কসরত দেখাবেন, নাকি আজকের দিনের মত যথেষ্ট উপার্জন হয়ে যাওয়ায় বাড়ি ফিরে যাবেন? সেটা দেখার আগেই দেখতে পাই, লাইনে আমার সামনে দাঁড়ানো লোকটি চ্যাপেলের চৌকাঠ পেরিয়ে ভেতরে ঢুকছেন। অর্থাৎ, চ্যাপেল দর্শনের সৌভাগ্য আমারও হল তাহলে। 

চ্যাপেলের মূল আকর্ষণ স্থলে পৌঁছে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতে হয়। যেন শ্বেতবর্ণা বস্ত্রখণ্ড পরিধান করে ইসাবেলা আর ফার্দিনান্দ নিদ্রায় এলিয়ে আছেন। তাদের ঘুমন্ত মুখ সামনের প্রার্থনা বেদিতে অধিষ্ঠিত যিশুর কাষ্ঠনির্মিত রিলিফের দিকে আনত। রিলিফের সেই প্যানেলে যিশুর জীবনের নানা ঘটনা উপস্থাপিত। স্বর্গীয় সেই দৃশ্য অবলোকনকারী রাজা-রানির পরনে বহুমূল্য বেশবাস, মাথায় মাণিক্যখচিত মুকুট। পদপ্রান্তে ঘুমিয়ে থাকা দুটি সিংহ শাবক। যে পালঙ্কে তারা শায়িত, সেটিও শ্বেতশুভ্র বর্ণের। কে বলবে, এই যে শয়নভঙ্গিমা, এ কোনো জীবন্ত দৃশ্যের অভিরূপ নয়। বরং পাঁচ শতাধিক বছর পূর্বের একটি দৃশ্যকে ইটালি থেকে আনা কারারা মার্বেল পাথরের সাহায্যে বন্দি করা শৈল্পিক নিদর্শন। এই ভাস্কর্যের কাপড়ের ভাঁজ, হাতের ত্বকে ফুটে থাকা ধমনী, চোখের দৃষ্টি থেকে ঠিকরে আসা বিষণ্ণ বিভাস– এসকলই কেনো যেন এক প্রখ্যাত শিল্পীর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এই ভাস্কর্যের নানা জঙ্গমে যেন তারই আভাস। কিন্তু না, তিনি নন, বরং বয়সে তার চেয়ে ছ বছরের বড় দমিচিন ফানেচিলি নাকি এই অন্তিম শয়ানের স্রষ্টা। তাহলে আমি তাঁর কথা প্রথমে ভাবলাম কেন? একটা যোগসূত্র কিন্তু আছেই আছে। মাইকেল এঞ্জেলো আর ফানেচিলি– দুজনেই ফ্লরেন্সের মানুষ। মোটামুটি একই সময়কালের। তাই ভাস্কর্য গড়ার ক্ষেত্রে ফ্লরেন্সিয় ঘরানার প্রতিচ্ছায়া হয়তো ঘুরেফিরে দুজনের কাজের মাঝেই এসেছে। নিকটবর্তী একই শিক্ষা গুরুর কাছ থেকে হয়তো তারা শিখেছেন, কী করে মর্মর পাথরকে মোমের মত গলিয়ে মানবরূপ দান করতে হয়, নয়তো তাদের কাজের মাঝে এতো সাযুজ্য এল কী করে? 

ইসাবেলার মৃত্যুর প্রায় একযুগ বাদে রাজা ফার্দিনান্দ দেহ রাখেন। তারও প্রায় পাঁচ বছর পর এই চ্যাপেলটি হাতুড়ি ছেনির হাত থেকে মুক্তি পেয়ে পূর্ণাঙ্গ রূপ নেয়। ঠিক ওই সময়েই ইটালিতে বইছে রেনেসাঁর দামাল হাওয়া। চিমাবুয়ে, জত্ত, বতিচেল্লির মত শিল্পীরা বাইবেলের নানা কাহিনি অনুসরণ করে এঁকে চলেছেন নানা অমর চিত্রকর্ম। তাদের অনেকগুলোই পরে আশেপাশের দেশের ধনী বণিক কিংবা রাজাদের চ্যাপেলের দেয়ালে ঝুলে থেকে আধ্যাত্মিকতার অদৃশ্য সুবাস ছড়ায়। এই চ্যাপেলটিও তেমনই একটি। ইসাবেলা-ফার্দিনান্দ-এর সমাধিস্থলের পাশের একটি বড় হলঘরে এদের ভাণ্ডারে থাকা কিছু অমূল্য চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হচ্ছে। সেসবের সবগুলো সম্পর্কে যদি বলতে যাই, তবে পাঠকের ধৈয্যচ্যুতি ঘটতে পারে। তাই আমি বরং একটি ছবির কথা বলেই ক্ষান্ত হচ্ছি।

সেই ছবিখানা এঁকেছেন বতিচেল্লি। ভিঞ্চি বলতে অনেকে যেমন বোঝে কেবল মোনালিসা, তেমনি বতিচেল্লি বলতেও অনেকে কেবলই বোঝে তার প্রিমাভেরা বা বসন্তপাখ্যান ছবিটি। অথচ এর বাইরেও তো বতিচেল্লি এঁকেছেন কত সব অনবদ্য ছবি। তাঁর সমসাময়িককালে বাকিরা বাকিরা মূলত বাইবেলের কাহিনি-নির্ভর ছবি আঁকলেও বতিচেল্লি সেই ক্ষুদ্রগণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে এঁকেছেন গ্রীক দেবদেবীদের। সে-কারণে তাঁকে বেশ অপমানও সইতে হয়েছে। যাকগে, তো এখানে যে ছবিটি দেখে থমকে দাঁড়ালাম, সেটি কিন্তু তাঁর আঁকা স্বল্পসংখ্যক বাইবেল-ভিত্তিক ছবির একটি। ছবির নাম– উদ্যানে অন্তর্দাহ। ছবির কাহিনীটি এমন– শেষ নৈশভোজনের পর যিশু তিন শিষ্যসহ হাঁটতে বেরিয়েছেন জেরুসালেমের এক জলপাই বাগানে। সেখানে যিশু শিষ্যদের ফেলে এগিয়ে যান একটু সামনে। হটাৎ পেছনে ফিরে দেখতে পান– শিষ্যরা সব এলিয়ে পড়েছে সিয়েস্তায়। তাঁর মন তখন বেদনাক্লিষ্ট; হয়তো অনিবার্য বিশ্বাসভঙ্গতা আর ধরাধামের সাথে বন্ধনচ্যুতির কথা আঁচ করতে পেরেই। এ-সময়ে সে-বাগানে স্বর্গলোক থেকে নেমে আসে দেবদূত, যিশুকে সে আসন্ন নির্বাণপ্রাপ্তির কথা জানিয়ে চিত্তস্নান ঘটায়। 

সেই ইসাবেল প্লাজার বাঁ দিকে এগুলে প্লাজা নুয়েভা। চ্যাপেল দর্শন শেষ হলে আমাকে এবারে ও দিকটায় পা রাখতে হয়। তার মূল কারণটা পরে বলছি।

এ-পথে কয়েক কদম হাঁটলেই বেশ জমজমাট এক চত্বর। পিচ্ছিল গ্রানাইট পাথরে ঢাকা। এর একদিকে ওদের জাস্টিস ভবন আর উল্টোদিকে বেশ কিছু রেস্তোরাঁ। সামনে পার্ক করে রাখা জনা বিশেক মোটর সাইকেল। এই মোটর সাইকেল যানটি এ শহরে বেশ জনপ্রিয়। সেটা অবশ্য হবারই কথা। কারণ, এই মূল সড়কের আশেপাশে যে অলিগলিগুলো গাছের বাকলের মত ছুটে গেছে পাহাড়ের গায়ে চেপে থাকা মহল্লায়, সেখানে গাড়ি যাবার প্রশস্ততা নেই। যুগ যুগ ধরে ওখানকার বাড়িগুলোয় যাদের বাস, হাল জমানায় তাদের অনেকেই গাড়ির অধিকারী হলেও সেগুলো রেখে আসতে হয় অন্তত মাইলখানেক দূরে, সমতলের কোনো গ্যারেজে। তারপর বাজার কিংবা অফিসের ব্যাগ হাতে নিয়ে বাকি সবাইয়ের মতই কবল স্টোনে মোড়া ঢালু পথ বেয়ে মেলা ক্যালরি ঝড়িয়ে বাড়িতে পৌঁছাও। এই দুর্লঙ্ঘ্য শারীরিক অনুশীলনের দণ্ড থেকে রেহাই পায় কেবল তারা, যারা একটি মোটর সাইকেলের অধিকারী। সরু সেই ঢালু পথ বেয়ে ওয়ান সিলিন্ডার মোটরের সর্বোচ্চ শক্তিকে দাবড়ে দিয়ে তারা বাড়ির দরজায় এসে পৌঁছান। এটাই এ-শহরের এক প্রাত্যহিক চিত্র।

এই যে বাড়িগুলো, এদের নিয়ে আরেকটি গল্প আছে। পাহাড়ের গায়ে-গায়ে সোনা রোদ মেখে দাঁড়িয়ে থাকা এই বাড়িগুলোর সামনে দাঁড়ালে দেখা যায়, অনেকগুলোর সামনেই শ্বেতপাথরের ফলকে লিখে রাখা– ‘কারমেন দেল …’। শেষ অংশুটুকু কেবল বাড়ির মালিকের নামানুযায়ী ভিন্ন হয়। মালিক বলতে হয়তো বর্তমান মালিক নন, বরং বহু শতাব্দী পূর্বে যিনি এ-বাড়ির প্রথম বা মূল মালিক ছিলেন তিনি। তারপর হয়তো বংশের লতিকা অনুযায়ী পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বাড়ির দলিল হস্তান্তর হয়েছে, কিন্তু বাড়ির নাম কিংবা নকশা কোনটিরই খুব একটা পরিবর্তন ঘটেনি।

আল্বাসাইন নামক অঞ্চলে হেঁটে বেড়াতে গিয়ে দেখেছিলাম, অনেক কারমেনের শেষ অংশে আরবি পদবী। এর পেছনেও ওই একই কারণ। আরবদের হটিয়ে দিয়ে স্প্যানিশরা যখন এই বাড়িগুলো দখল করে পঞ্চদশ শতকে, তখনও অনেকেই বাড়ির নাম বদলে ফেলেনি। একই রেখেছে। আর যে নামগুলো বদলে গেছে তাদের মাঝেও কিন্তু সেই আরবদের ছায়া ভিন্নভাবে রয়েই গেছে। কারণ ওই কারমেন শব্দটাই তো এসেছে আরবি শব্দ কারমা থেকে। কারমা মানে আঙুরের বাগান। সে সময়ে গ্রানাডার মুসলিমরা প্রায় সকলেই বাড়ির সামনের উঠোনে আঙুরের বাগান করতেন। উদ্দেশ্য ছিল, ওয়াইন উৎপাদন। ধর্মমতে সুরাপান নিষিদ্ধ হলেও তাঁদের সেই সমাজে ওয়াইন পান ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। দু’কূল  রক্ষা করতে গিয়ে তাঁরা অনেক সময়ে পানের আগে ওয়াইনে ঢেলে দিতেন খানিকটা জল। নিজেকে প্রবোধ দিতেন– ওয়াইন নয়, আমি আসলে খাচ্ছি– আঙুরের দ্রবণ। এতে পাপ নেই।

আর এভাবেই ‘কারমেন দেল অমুক’ লেখা নামফলকগুলো প্রায় ছশ বছর পূর্বের এক বিস্মৃতপ্রায় ইতিহাসের অধিকারী হয়ে ঝকঝকে সাদা চুনকামে মোড়া বাড়িগুলোয় লুকিয়ে আছে।

আজ অবশ্য এই কারমেনগুলোয় কেবল আঙুর বাগান-ই নয়, আছে জলপাই, লেবু, আপেল, পিচ, খুবানি, ডালিম ইত্যাদি নানা ফলদ গাছের সমাহার। আছে জেসমিন, গোলাপ, কারনেশনের মত ফুলের ঝলমলে উদ্যান। যার বাড়ির উঠোনে  যত ফুলের সমাহার, তার গর্ব তত বেশি। কিছু কিছু বাড়িতে আবার এই ফুল গাছের বাগান পাহাড়ে জুম চাষের মত করেই ধাপে ধাপে সাজানো। সে না করে উপায়ই-বা কী! বাড়িগুলো তো আর সমতল জায়গায় নয়। এমন কিছু ফুলশোভিত বাড়ি অনেক সময়েই ভিনদেশী পথিকের জন্যে দ্বার খুলে রাখে। যার ইচ্ছে ভেতরের আঙিনায় ঢুঁকে ফুলের পাপড়িতে হাত বুলিয়ে আসবে। ভাগ্য আরও প্রসন্ন হলে বাড়ির মালিকের কাছ থেকে দু একটা কমলালেবুও উপহার হিসেবে পাওয়া যেতে পারে বৈকি। 

সেই প্লাজা নুয়েভা রোডের কথায় ফিরে আসি। ওখানকার যে ক’টি রেস্তোরাঁর সামনে উপচে পড়া ভিড়, তাদের মাঝে লস দিয়ামান্তেস অন্যতম। এটা একটা স্ন্যাক বার। আর স্ন্যাক বলতে যা বিক্রি হয়, সেটা মূলত নানা পদের মাছের ভাজাভুজি। দোকানের ভেতরে রীতিমত জনস্রোত। তুমুল হুল্লোড়। চেঁচিয়ে অর্ডার দিতে হচ্ছে। কোনো ওয়েটার যখন এগিয়ে আসছে, তখন তাকে বাগে পাবার জন্যে দু তিনজন একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।

বারটির ভেতরে ডানদিকে লম্বা কয়েকটি বেঞ্চ পাতা। ওখানেই সবাই ঠেলে ঠুলে বসে যাচ্ছেন। ফলে কেও বিয়ারের গ্লাস তোলার জন্যে হাত তুললেও তার কনুইয়ের গুঁতো লাগছে পাশের জনের গায়ে। সেটা সানন্দচিত্তে মেনে নিয়ে সবাই খাবার সাঁটছে, নয়তো অপেক্ষা করছে।

এই বার-টি এতোটা কোলাহলময় হবার পেছনে আরও একটি কারণ খুব সম্ভবত এখানকার একটি বিশেষ অফার। অফারটি হল, কেও যদি ড্রিঙ্কসের অর্ডার দেয়, তবে তার সাথে ছোট এক প্লেট তাপাস ফ্রি। সেই ড্রিঙ্কস যে কেবল এলকোহল-ই হতে হবে, তেমন নয়। কোক-পেপসি হলেও চলবে। আর এই তাপাস কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো পদ নয়। রেস্তোরাঁ তার ইচ্ছেনুযায়ী যেকোনো হালকা ভাজাভুজির পদকে তাপাস হিসেবে চালিয়ে দিতে পারে। এখানে যেমন দেয়া হচ্ছে জলপাই তেলে হালকা করে ভাজা ঝিনুক, ক্যালামারি, স্কুইড কিংবা খোলসে মাছ সদৃশ আনকোভি। তবে কোন পদটি কে পাবেন, সেটা একান্তই নির্ভর করবে পরিবেশনকারীর উপর। তিনি হেঁসেলে ঢুঁকে ওই মুহূর্তে যা পাবেন, সেটাই এনে পানীয়ের সাথে পরিবেশন করবেন। আর সেভাবেই আমার কপালে পেপসির গ্লাসের সাথে জুটে গেল এক প্লেট ঝিনুক। শক্ত খোলসের ভেতরে লুকিয়ে থাকা তুকতুকে নরম অংশটি খুলে খাবার জন্যে সাথে দেয়া হল একটি টুথপিক।

লস দিয়ামান্তেস থেকে বেরিয়ে আসার পর ভাবতে থাকি, আমি আসলে কী খেলাম? ড্রিঙ্কস সহযোগে তাপাস? নাকি তাপাস সহযোগে ড্রিঙ্কস? আমার তো মনে হয় দ্বিতীয়টি। কারণ একপ্লেট সাবাড় করার পর যখন আরও খানিকটা খেতে মন চাইছিল, তখন ওয়েটারকে ডেকে আরও এক গ্লাস কোক অর্ডার করেছিলাম। ওটা আসলে ছিল আমার বাহানা; মুফতে আরও তাপাস পাবার জন্যে। সেসব খেয়ে নিজেকে আরও খানিকটা হাইড্রেট আর ক্যালরিসমৃদ্ধ করার পর শরীরে আবারও বেশ ফুর্তি ফিরে এসেছে। এবারে হয়তো এই চণ্ড রোদের মাঝে ঢালু পথ বেয়ে ওঠাই যায়।

সেই প্লাজা নুয়েভোর একেবারে শেষপ্রান্তে একটি চার্চ। চার্চের পেছনেই শুরু হয়েছে শীর্ণ খাল। খালের ওধারে দুর্গের প্রাকার। এককালে নাকি ঝুলন্ত সেতুর মাধ্যমে দুর্গ থেকে এপারে আসার ব্যবস্থাছিল, এখন আর নেই।

সান্তা মনিকা নামক এই চার্চটি খানিকটা লম্বাটে ধরণের। ভেতরে ঢোকার মুখে দুটি আকাশচুম্বী সাইপ্রেস গাছ। ভেতরটা গুমোট। তেমন কোনো দর্শনার্থী নেই। মেরি আর যিশুর লাইফ সাইজ ছবি চার্চের নানা দেয়ালে টানানো। ঘাড় উঁচু করে সিলিঙের দিকে তাকাতে একটা বেশ চমকপ্রদ ব্যাপার ধরতে পারি। পুরো সিলিংটাই মেহগনি কাঠের নকশায় ঢাকা। আর সেই নকশায় মূর্ত– মুরিশ কেতার নানা জ্যামিতিক বিন্যাস। ত্রিভুজ, পঞ্চভুজের সমন্বয়ে সেখানে ফুটে আছে অর্ধফুটিত ফুলের পাপড়ি। এই মুরিশ শব্দটির আদিমূল গ্রন্থিত মৌরিতানিয়া নামক  উত্তর আফ্রিকার দেশটির সাথে। ওই অঞ্চলের মুসলিমরা প্রায় সপ্তম শতকের দিকে দক্ষিণ স্পেন বিজয় করে প্রায় ছ শ বছর রাজত্ব করেন। তারপর ১৪৯২ সালে, অর্থাৎ যে বছরে ইসাবেলা কলম্বাসকে আমেরিকা অভিযানের অর্থ যোগান, ওই একই বছরে স্প্যানিশরা আবারও এ অঞ্চল পুনর্দখল করে। দখলের পরই শুরু হয় লুটপাট, বিতারণ। রাজার ধর্মই হয় প্রজাদের ধর্ম– এ ব্যাপারটিকে স্মরণ করিয়ে দেবার জন্যে গ্রানাডা শহরের প্রায় নব্বই ভাগ মসজিদকেই রূপান্তর করা হয় চার্চে। সেই রূপান্তর যে খুব জটিল, কষ্টসাধ্য ছিল তেমন নয়। কেবল ভালোকরে চুনকাম করে আরবি ক্যালিগ্রাফিগুলো মুছে ফেলে দেয়ালে টানানো হয় সাধুসন্তদের ছবি। ব্যাস, হয়ে গেল চার্চ। এই সান্তা মনিকা চার্চটির জন্মও নির্ঘাত ওইভাবেই। অন্তত সিলিং-এর নকশা তো সেই গুপ্তকথাই আমাকে চুপিচুপি বলে দেয়।

সেই খালের পাশের প্রস্তর নির্মিত সড়কটি এতো সংকীর্ণ যে দুটো গাড়ি একসাথে পাশাপাশি হুড়মুরিয়ে চলতে পারে না। একটি এগিয়ে এলে অপরটিকে কিছুটা দম ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। পথের পাশে পাথরের অনুচ্চ দেয়াল। চাইলে ওখানে বসে কিংবা ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে খালে প্রবাহিত ঝিরিঝিরি জলের দিকে তাকিয়ে থাকা যায়। অনেকে সেটা করছেনও। তাতে করে এ-পথে গাড়ির গতি হয়েছে আরও শ্লথ। আমি সেটি না করে পথের উল্টোদিক ধরে হেঁটে লা ফন্তানা ক্যাফের সামনে এসে দাঁড়াই। যতদূর মনে পড়ে, গতকাল এর কাছেপিঠেই ফ্লেমেঙ্ক নাচের একটা ব্যবস্থা দেখেছিলাম। সিঁড়ির ধারে চক বোর্ডে লেখা ছিল– ‘আমাদের দুটি শো, ছটায় ও আটটায়। জলদি আসুন। টিকিট সীমিত।’ টিকেট কী সত্যিই সীমিত না অফুরান, সেটি যাচাই করার সুযোগ আর গতকাল হয়নি। সময়ের অভাবে। তবে আজকের পরিকল্পনা হচ্ছে– সন্ধ্যে ছটার টিকিট বাগানো। দেখি, ভাগ্যে কী আছে!

ফ্লেমেঙ্ক নাচটি মূলত দক্ষিণ স্পেনের নাচ। মুরিশ আর জিপসি– এই দু গোত্রের মানুষরাই ছিলেন এককালে এ নাচের প্রধান কলাকুশলী, পৃষ্ঠপোষক। আজকাল অবশ্য মূল স্পেনীয়রাও এ নাচের কদর বুঝতে পেরে শিখে নিয়েছে কলা কৌশল, খুলে বসেছে নাচের মঞ্চ। এ ধরণের মঞ্চকে ওরা বলে– তাব্লাও ফ্লেমেঙ্ক, যেখানে নাচ দর্শনের সাথে থাকে বিনে পয়সায় গলা ভেজাবার সুযোগ। তো আল্বাসাইন মহল্লার যে স্থানে আমি তেমন একটি ফ্লেমেঙ্ক-ঠেকের সন্ধান পাই, সেটি বেজায় সঙ্কীর্ণ। পথ চলবার সময়ে মনে হয় যেন দুদিকের দেয়াল পিষে ফেলতে চাইছে। সে দেয়ালে নানান লিখন। সেগুলো কী রাজনৈতিক নাকি কৌতুকাশ্রয়ী, সেটা বলতে পারবো না। এই এস্পানিওল ভাষাটা বহুবার শেখার উদ্যোগ নিলেও শেষ অবধি আর হয়ে ওঠেনি। বহুবার ভেবেছি, এইতো আগামী মাস কিংবা আগামী বছরে শুরু করবো। কিন্তু সেই আগামী আর আসেনি। পালিয়ে গেছে। অথচ যে শহরে থাকি, তার ঠিক বিশ মাইল দক্ষিণেই মেহিকোর সীমান্ত। ইংরেজি সেখানে অচল। আমার শহরেও অনেক পাড়া আছে, যেখানে অনর্গল এস্পানিওলে কথা চলে। ভাষাটা না জেনে ওখানে গেলে নিজেকে রীতিমত উজবুক মনে হয়।

সেই তাব্লাও ফ্লেমেঙ্কর সামনে টুল পেতে বসে আছে এক রমণী। মুখে চড়া প্রসাধনী। অঙ্গে ফ্লেমেঙ্ক নর্তকীদের উজ্জ্বল পোশাক। এই মেয়েটি ওখানে বসে না থাকলে জায়গাটা চিনে নিতে হয়তো আমাকে আরও খানিকটা বেগ পেতে হত। ওর পেছনে ঝুলতে থাকা ভারী কালো পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখি– গ্যাব্রিয়েলা দাঁড়িয়ে। নিশ্চয়ই নাচের টিকেটের খোঁজে এসেছে। এই মেয়েটির সাথে গতকাল দেখা হয়েছিল আল হাম্ব্রায়। এই আল হাম্ব্রা-ই বলা চলে গ্রানাডার মুখ্য আকর্ষণ। মুরিশ সুলতানের দুর্গ, শেষ রক্ষাবুহ্য। জলপাই বনানী ঘেরা পাহাড়ের চুড়োয় অটল ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে থাকা এই দুর্গটি স্প্যানিশদের কাছে তাই আবার শৌর্যয়ের প্রতীক। এমন একটি কাঙ্ক্ষিত স্থানে ঢোকার টিকেট না পেয়ে যখন মুখ কালো করে দাঁড়িয়েছিলাম, তখন আবিষ্কার করি– গ্যাব্রিয়েলার ভাগ্যও আমারই মত। এই মেয়েটিও আমার মতোই খোঁজ খবর না নিয়েই হুট করে এসে উপস্থিত হয়েছে। পৃথিবীর পরিস্থিতি যে দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে, সেটা আমরা ধর্তব্যের মধ্যেই আনিনি। এখানে এসে শুনলাম– বেশ কয়েকবার নিরাপত্তা হুমকি পাবার পর এখন নিয়ম করা হয়েছে, যারা ভেতরে ঢুকতে চাইবে, তাদেরকে বহু আগে থেকে অনলাইনে পাসপোর্টের তথ্য দিয়ে টিকেট কাটতে হবে। তল্লাশি চৌকির পুলিশ খানিকটা অসহায়ভাবে বলল, শুধু তুমি নও, এমন বহু লোকই এসে ফিরে যায়। নতুন কানুন না জানা থাকার কারণে। 

‘তারপর, কাল কি মাঝরাত অবধি জেগে ছিলে? পেলে টিকেট?’– ফ্লেমেঙ্কর টিকেট কেটে বাইরে এসে গ্যাব্রিয়েলা’কে জিজ্ঞেস করি। হতাশভাবে মাথা নাড়ে ও। কালই ফেরার বাসে বাদুড় ঝোলা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সময়ে বলছিল, অনেক সময়ে নাকি মাঝ রাতের দিকে কিছু টিকেট অবমুক্ত করা হয়। ভাগ্য ভালো হলে মিলেও যেতে পারে। তবে সেই টিকেট হয়তো হতে পারে বেশ কদিন পরের। সে নিয়ে ওর আপত্তি নেই। কারণ, গ্রানাডায় যদি দু চার দিন বেশিও থাকতে হয়, তবুও নাকি ওর তেমন কোনো সমস্যা নেই। আমার অবশ্য সে সুযোগ নেই। এমনকি মাঝরাত অবধি জেগে চতুর ধীবরের মতো টিকেট শিকার করার মতো  ধৈর্য্যও আমার আছে বলে মনে হয় না। আমি তাই আল হাম্ব্রাকে মনের খাতা থেকে মুছে দেবার চেষ্টা করি।

যে-পথে এ-পাড়ায় এসেছি, সেই একই পথে ফিরছি না। ফিরছি খানিকটা ঘুর পথে। মূলত গ্যাব্রিয়েলার সাথে কথোপকথনের মাঝেই মনের বেখেয়ালে এই ভিন্ন পথে আগমন। উদ্বাহু হয়ে ছুটে আসা রৌদ্রালোক থেকে নিজেকে বাঁচাবার জন্যে হাঁটছি দেয়ালের ছায়ায় ছায়ায়। তাতে করে চাঁদিটাকে কোনোক্রমে বাঁচানো গেলেও শুষ্ক হয়ে আসা কণ্ঠনালীকে রক্ষে করা যাচ্ছে না। আমি তাই এদিক-ওদিক জলের প্রসবণ খুঁজি। আগেই খেয়াল করেছি, এ শহরের আনাচে-কানাচে জলের কল। আন্দালুসিয়ার দিগন্তে সাদা মেঘের মত জেগে থাকা পর্বত থেকে ধেয়ে আসা তুষার গলা জল এই প্রসবণগুলোর উৎস। জলের মান নিয়ে তাই প্রশ্ন নেই। যার ইচ্ছে হচ্ছে, দাঁড়িয়ে আঁজলা ভরে খাচ্ছে।

অল্প একফালি খোলা জায়গার সন্ধান পেয়ে সেখানে থামি। পাহাড়ি বসতগুলোর মাঝে ছোট্ট এক টুকরো সমতল জমিন। পুরোটাই পাথরে ঢাকা। সমদূরত্বে বপিত চারটি এল্ম গাছ। গাছগুলোর গগনবিসর্পী ডালপালা আর ঝেঁপে আসা সবুজ পাতা স্থানটির উপর তৈরি করেছে প্রাকৃতিক আচ্ছাদন। সেটিকে কাজে লাগিয়ে নিচে পেতে রাখা বেঞ্চে বেশ কজন একটু জিরিয়ে নিচ্ছে। গাছগুলোর একেবারে পেছনে পাহাড়ের ঢাল। লোহার রেলিং দিয়ে সে জায়গাটা ঘেরা। ওখানে দাঁড়ালে কমলালেবুর বিথিতে আচ্ছাদিত দূরের পাহাড় দেখা যায়। সেই সাথে রেলিং-এর পাশে থাকা প্রসবণ থেকে জল তুলে গলা ভেজানো যায়। আমরা তাই এখানে এসে কয়েকটা মুহূর্ত থামি। গ্যাব্রিয়েলা’কে বসতে বলে আমি ব্যাকপ্যাকে থাকা জলের বোতল ভরে নিই।

বোতল থেকে জল খাবার সময়ে খেয়াল করি, গ্যাব্রিয়েলা হাতের চেটো দিয়ে কপালের কাছে লেপটে থাকা ঘাম মুছে নেয়। আজ ওর পরনে খাকি রঙের কার্গো শর্টস, আর সেই সাথে স্নিগ্ধ নীল রঙের সুতী টপস। গায়ের চামড়া পুড়ে খানিকটা যেন তামাটে বর্ণের রূপ নেবার পথে। খানিক আগে যদি সেই কথোপকথন না হত, তাহলে হয়তো এই বর্ণ পরিবর্তনের পেছনে সৈকতে সূর্যস্নানকে দায়ী বলে ধরে নিতাম। কিন্তু না, মেয়েটির কাহিনী ভিন্ন।

ফ্রান্স আর বেলজিয়ামের সীমান্তে লিলে নামক এক ক্ষুদ্র শহরে ওর বাস। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। সামারের ছুটি শুরু হলে ফরাসি এক দাতব্য সংস্থার সাথে যোগাযোগ করে চলে যায় সেনেগালে। উদ্দেশ্য ছিল– ওখানকার এক অনাথালয়ে স্বেচ্ছাশ্রম দেয়া। যাতায়াত, আর থাকা-খাওয়ার যাবতীয় খরচও ওকেই বহন করতে হয়েছে। এভাবে তিন মাস কাটাবার পর দেশে ফিরে যাবার সময় ঘনিয়ে এলে ঠিক করে– ফ্রান্সে সরাসরি না ফিরে তার আগে কয়েকটা দিন একটু স্পেনে ঘুরে নেবে। এখানে উঠেছে একটা সস্তা হোস্টেলে। বাঙ্ক বেডে থাকছে। দিনে দশ ইউরো ভাড়া।

আমি ওর সেনেগালবাসের গল্পের খেই ধরে বলি, ‘তো গ্যাব্রিয়েলা। এই যে তুমি একা একটা মেয়ে হয়ে সেনেগালে তিনটা মাস কাটিয়ে এলে, তোমাকে কোনো বিপদে পড়তে হয়নি?

‘নো, নট রিয়েলি।’– খানিকটা কাঁধ ঝাঁকিয়ে ও বলে। কাঁধে ঝুলে থাকা ব্যাকপ্যাকটি বেঞ্চে নামিয়ে রেখে যোগ করে, ‘মাঝে মাঝে এমন হত যে বাড়ি ফেরার পথে কিছু কৌতূহলী মানুষ হেঁটে হেঁটে আমার পিছু নিত। প্রথম কয়েকদিন খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম– হয়তো ওরা ছিনতাইকারী কিংবা…… ইউ নো হোয়াট আই মিন। কিন্তু কয়েকদিন পরই বুঝতে পারলাম, এসবের কিছুই নয়। একটা শ্বেতাঙ্গ একা মেয়ে কালো পাড়ায় হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরছে, এটাই ছিল ওদের কাছে পরম কৌতূহলের বিষয়। উৎসুক হয়ে তাই ওরা আমার পিছু নিত। কিন্তু কেও কোনো ক্ষতি করেনি। আসলে দূর থেকে আমরা অনেক সময়েই ভিনদেশ, ভিন জনপদ সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভ্রান্তধারণা নিয়ে বসে থাকি।’

সেই ছায়াতরু কুঞ্জস্থল থেকে আমি আর গ্যাব্রিয়েলা ভিন্ন পথে হাঁটি। গতকাল ও এখানে এক ফরাসি পুরনো বন্ধুর খোঁজ পেয়েছে। তার সাথে একসাথে লাঞ্চ করবার কথা। ‘আশা করি বিকেলের শো-তে আবার দেখা হচ্ছে’– বলে ও ভিন্ন গলির বাঁকে হারিয়ে যায়।

লাঞ্চের কথাটি উল্লেখ করায় আমার নিজেরও খেয়াল হয়, তাপাস খেয়ে খানিক আগে শরীরে বল ফিরিয়েছি বটে, কিন্তু ও দিয়ে কি আর গ্রীষ্মকালীন দীর্ঘায়িত দিনের রসদ মেটানো সম্ভব? এ-পাড়ায় আসার সময়ে বড় রাস্তার মোড়ে এক মরোক্কান রেস্তোরাঁর সাইনবোর্ড দেখেছিলাম। দোকানের নামের পাশে উত্তর আফ্রিকান বিরিয়ানির লোভনীয় ছবি।  ছবিটির কথা মানসপটে ভেসে আসায় ভাবি– এবারে সেখানে গেলে বোধহয় মন্দ হয় না।



অলংকরণঃ তাইফ আদনান