জলধি / প্রবন্ধ / হুমায়ুন আজাদের কবিতায় প্রেম
Share:
হুমায়ুন আজাদের কবিতায় প্রেম

হুমায়ুন আজাদ (জন্ম- ২৮ এপ্রিল, ১৯৪৭ খ্রি: মৃত্যু- ১২ আগস্ট, ২০০৪)-এর অনেক পরিচয় আছে। একাধারে তিনি শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, গবেষক, ঔপন্যাসিক ও ভাষাবিদ। তবে এতোসব পরিচয় পেছনে ফেলে তিনি তাঁর কবি পরিচয়টাকেই প্রধান মনে করতেন। তিনি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিলেন, সেই সময় থেকেই কবিতার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়েন এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে। কালের বিচারে তিনি ষাটের দশকের কবি। এ-দশকে একঝাঁক মেধাবী কবির আবির্ভাব হয়যেমন, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, সিকদার আমিনুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী, মহাদেব সাহা, হেলাল হাফিজ প্রমুখ। ষাটের দশকের কবি হলেও এদের মধ্যে একমাত্র আব্দুল মান্নান সৈয়দ ছাড়া এই দশকে আর কারো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। সৈয়দের প্রথম বই জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছপ্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে। বাকি সবার কবিতা গ্রন্থবদ্ধ হয়ে আত্মপ্রকাশ করে সত্তরের দশকে এসে। ষাটের কবিগণের একটা সৌভাগ্য হলো, আধুনিক বাংলা কবিতার একেবারে তৈরি করা জমিনে এসে তাঁরা কবিতা লিখতে শুরু করেন। এছাড়া বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, স্বাধিকারের চেতনা, সর্বোপরি মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে তাঁরা ধারণ করেছেন। ফলে তাঁদের কবিতা যেমন বিষয়-বৈভবে এবং প্রকরণগতভাবে সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, তেমনি কবিতায় উঠে এসেছে মানুষের মুক্তি এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও গৌরব। সমকালীন এই প্রেক্ষাপটে হুমায়ুন আজাদের আবির্ভাব। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের একজন কৃতী ছাত্র ছিলেন। ছাত্র অবস্থায়ই কবিতাসহ সাহিত্যের নানা বিষয়ে তাঁর লেখালেখির সূচনা হয়।

 

দেশপ্রেম, সমকালীন দ্রোহ, প্রেম, সৌন্দর্যের প্রতি আকাঙ্ক্ষা এবং স্মৃতিকাতরতা তাঁর কবিতায় ঘুরেফিরে এসেছে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে প্রেমই তাঁর কবিতার প্রধান অন্বিষ্ট। শুধু তিনি নন, ষাটের দশকের সব কবিই প্রেমের কবিতা লিখেছেন। তবে তাঁদের মধ্যে আবুল হাসান, হেলাল হাফিজ এবং মহাদেব সাহার প্রেমবিষয়ক কবিতা ব্যাপক পাঠকনন্দিত হয়। এছাড়া নির্মলেন্দু গুণ এবং রফিক আজাদও প্রেমের কবিতা লিখে পাঠকচিত্ত জয় করেছেন। বিষয়ে উল্লিখিত পাঠে প্রবেশের পূর্বে ষাটের দশকের কবিদের লেখা প্রেমের কবিতা নিয়ে সামান্য আলোকপাত করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

 

প্রথমেই বলব আবুল হাসানের কথা। সাতাশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তাঁর রেখে যাওয়া তিনটি কাব্যগ্রন্থ— ‘রাজা আসে রাজা যায়’ (১৯৭২), ‘যে তুমি হরণ করো’ (১৯৭৪), ‘পৃথক পালঙ্ক’ (১৯৭৫) তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে। তাঁর কবিতার প্রবহমান মূল সুর বিষণ্ণতা এবং পরাজিত প্রেমের জন্য হাহাকার। তাঁর লেখা একটি প্রেমের কবিতার অংশবিশেষ আমরা পাঠ করি

এ ভ্রমণ আর কিছু নয়, কেবল তোমার কাছে

যাওয়া

তোমার ওখানে যাব, তোমার ভিতরে এক অসম্পূর্ণ যাতনা

আছেন,

তিনি যদি আমাকে বলেন, তুই শুদ্ধ হ’, শুদ্ধ হব

কালিমা রাখব না!

এ ভ্রমণ আর কিছু নয়, কেবল তোমার কাছে যাওয়া

তোমার ওখানে যাব; তোমার পায়ের নিচে পাহাড়

আছেন

তিনি যদি আমাকে বলেন, তুই স্নান কর

পাথর সরিয়ে আমি ঝর্নার প্রথম জলে স্নান করব

কালিমা রাখব না!

(তোমার চিবুক ছোঁবো, কালিমা ছোঁবোনা)।

 

মহাদেব সাহা এবং হেলাল হাফিজের কবিতায় ঝরে পড়েছে প্রেমের তীব্র আকুলতা। যেমন

এখন তুমি,কোথায় আছো,কেমন আছো,পত্র দিও

এক বিকেলে মেলায় কেনা খামখেয়ালি তালপাখাটা

খুব নিশিতে তোমার হাতে কেমন আছে,পত্র দিও

ক্যালেন্ডারের কোন পাতাটা আমার মত খুব ব্যথিত

ডাগর চোখে তাকিয়ে থাকে তোমার দিকে,পত্র দিও।

(পত্র দিও, হেলাল হাফিজ)।

করুণা করে হলেও চিঠি দিও,খামে ভরে তুলে দিও

আঙুলের মিহি সেলাই।

ভুল বানানেও লিখো প্রিয়,বেশি হলে কেটে ফেলো তাও /একটুক মান্য দাবি,চিঠি দিও তোমার শাড়ির মতো/অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি।

(চিঠি দিও, মহাদেব সাহা)।

ষাটের তুমুল জনপ্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণ। প্রকাশের পর থেকেই তাঁর রাজনৈতিক এবং প্রেমের কবিতা অভূতপূর্ব পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৭০ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রেমাংশুর রক্ত চাইপ্রকাশিত হলে বিপুল পাঠকনন্দিত হয়। সেই গ্রন্থের একটি কবিতার প্রথম কয়েক লাইন

আমাকে কি মাল্য দেবে,দাও

তোমার পায়ের নিচে আমিও অমর হব

আমাকে কি মাল্য দেবে, দাও।

এই নাও আমার যৌতুক, এক বুক রক্তের প্রতিজ্ঞা।

ধুয়েছি অস্থির আত্মা শ্রাবণের জলে,আমিও প্লাবন

হব

শুধু চন্দন চর্বিত হাত একবার বোলাও কপালে।

(আমাকে কি মাল্য দেবে, দাও, নির্মলেন্দু গুণ)।

ষাটের দশকের আরেকজন কবির উল্লেখ না করলে এই পাঠ অপূর্ণ থাকবে। তিনি হলেন রফিক আজাদ। সমসাময়িক কালে তাঁর কবিতাও তরুণ সমাজে প্রবল গ্রহণযোগ্যতা পায়। তাঁর ভাত দে হারামজাদা নইলে মানচিত্র খাব' কবিতাটি বাংলা সাহিত্যে কিংবদন্তি হয়ে আছে। তাঁর একটি স্মরণীয় প্রেমের কবিতা দুঃখ কষ্ট। ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত চুনিয়া আমার আর্কেডিয়াকাব্যের অন্তর্ভুক্ত কবিতাটি

পাখি উড়ে চলে গেলে পাখির পালক পড়ে থাকে।

পাখি উড়ে গেলে তার নরম পালক

কঠিন মাটিতে পড়ে থাকা ঠিক নয়-

এই ভেবে কষ্ট পেয়েছিলে;

তুমি চলে গেলে দূরে-

নিঃস্ব, রিক্ত,পাখির পালকসম একা পড়ে থাকি।

(দুঃখ কষ্ট, রফিক আজাদ)।

 

হুমায়ুন আজাদ সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে লিখেছেন, গবেষণা করেছেন। কিন্তু তাঁর হৃদয়ে যে একটা সতেজ, কোমল এবং তীব্র অনুভূতিশীল প্রেমিক সত্তার বাস ছিল, তার খোঁজ কেউ রাখেনি। ষাটের দশকের যাঁরা প্রেমিক কবি, তাঁরা ছিলেন ভবঘুরে-বোহেমিয়ান। তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে প্রেমের দরজা কখনো বন্ধ হয়নি। কিন্তু হুমায়ুন আজাদ ছিলেন নাগরিক রুচির এক রোমান্টিক প্রেমিক কবি। তাঁর কবিতায় প্রেমের তীব্রতা ছিল, কিন্তু পরাজিত প্রেমের জন্য হাহাকার ছিল না। প্রেমিকাকে পাওয়ার জন্য আকুলতা ছিল, তবে না পাওয়ার বেদনার উদ্‌যাপন ছিল না। তাঁর তুমি যদি আসোকবিতায় দেখি প্রবল ভালোবাসায় প্রেমিকাকে তিনি নিজ শহরে আসার আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। শুধু আমন্ত্রণই নয়, প্রিয় মানুষ শহরে আসলে কী প্রতিক্রিয়া হবে সেটাও বলে দিচ্ছেন শব্দের মাধুরী দিয়ে

যদি তুমি আসো তবে এ-শহর ধন্য হবে

একটি তুচ্ছ যান

আবার রাস্তা খুঁজে পাবে

প্রতিটি ট্রাফিক সিগনাল নির্ভুল সংকেত দেবে

রাস্তায় ঘরে ঘুমে স্বপ্নে পুস্তকে

গোলাপ পাপড়িতে যদি তুমি আসো।

(যদি তুমি আসো, অলৌকিক স্টিমার)।

 

প্রেমিকার সন্তুষ্টির জন্য যেকোনো অসাধ্য সাধন করতে কবি প্রস্তুত। তার কিছু উদাহরণ আমরা পেয়েছি তোমার পায়ের নিচেকবিতায়। যেমন, কোথাও কোনো কোনো সোনার খনি থাকলে তিনি মুঠো ভরে সোনা এনে প্রেমিকার হাঁটার রাস্তায় বিছিয়ে দিতেন। উপসাগর থাকলে সেখান থেকে আনতেন মুঠোভরা মুক্তা। যদি পদ্মদিঘি থাকত কোথাও, সেখান থেকে মধ্যরাতে মুখে করে শুভ্র পদ্মের কেশর এনে প্রেমিকার দরজায় রেখে দিতেন। অথবা পৃথিবীর শেষ প্রান্তেও তাঁর একটি গোলাপ বাগান থাকলে সেখান থেকে লাল টকটকে গোলাপের পাপড়ি চোখের মণিতে গেঁথে নিয়ে এসে প্রেমিকার পথে ছড়িয়ে দিতেন। কিন্তু কবির সেসব কিছুই নেই। তাঁর যা আছে তার সর্বস্ব প্রেমিকার পদতলে সমর্পণ করতে চান।

কবিহৃদয়ের গহনতলে যে প্রেম বয়ে চলে, তার মধ্যে কোনো খাদ নেই। এই প্রেম অপার ঐশ্বর্যমণ্ডিত, যার ঔজ্জ্বল্যে চারদিক আলোকিত হয়। প্রেমের ছোঁয়ায় কবির হৃদয় অপার্থিব সৌন্দর্যের আধার হয়ে ওঠে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ যে অনুভবে উচ্চারণ করেছিলেন, ‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ, চুনি উঠল রাঙা হয়ে’— সেই একই অনুভবের অনুরণন দেখি তরুণী সন্তকবিতায়, যেখানে কবি বলছেন

যেখানে দাঁড়াও তুমি সেখানেই অপার্থি আলো।

তুমি হেঁটে যাচ্ছো,আমি বহুদূর থেকে দেখছি,তোমার স্যান্ডল

থেকে পুঞ্জপুঞ্জ জোনাকিশিখার মতো গলে পড়ছে আলো,

কংক্রিট,ধুলোবালি,ঝরা পাতা রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে অলৌকিক হীরে মুক্তো

সোনা প্রবল পান্নায়।তোমার স্যান্ডলের ছোঁয়ায় সোনা-হয়ে- যাওয়া

এক টুকরো মাটি আমি সেই কবে থেকে বুকে বয়ে বেড়াচ্ছে দিনরাত।

যে-দিকে তাকাও তুমি সেদিকেই গুচ্ছগুচ্ছ আশ্চর্য গোলাপ।

(তরুণী সন্ত, আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়)।

 

প্রেম জীবনের এক অনন্য অনুভব। যুগ যুগ ধরে মানুষ যা আকাঙ্ক্ষা করে, যা স্বপ্ন দেখে, যার জন্য অনন্ত প্রতীক্ষা, তা হলো প্রেম। মানুষের সকল সাধনা, সকল অধ্যবসায় প্রেমের জন্য। তোমার দিকে আসছিকবিতায় প্রেমিকার জন্য, প্রেমের জন্য কবি আজন্ম লালিত সেই প্রতীক্ষার কথাই বলতে চেয়েছেন। কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর কাঙ্ক্ষিত নারীর কাছে দু-দণ্ড শান্তি পেতে হাজার বছর ধরে পথ হেঁটেছেন। উপরিউক্ত কবিতায় কবি হুমায়ুন আজাদকেও অজস্র জন্ম ধরে তাঁর প্রেমিকার দিকে যাত্রা করতে দেখি। কবির পুরো একটা জন্ম কেটেছে শুধু প্রিয়তমার স্বপ্ন দেখে দেখে।

 

আজাদের কবিতায় নানা বৈচিত্র্য এবং বৈভবে প্রেম ধরা দিয়েছে। তিনি প্রথাগত প্রেমের কবিতা লেখেননি, যে কবিতায় না পাওয়ার বেদনায় শুধু হাহাকার ধ্বনিত হয়। প্রিয়তমা নারী ছেড়ে চলে গেলে, প্রেমিকের হৃদয় বিধ্বস্ত হয়। জীবন হয়ে পড়ে অর্থহীন। কিন্তু আজাদ সেই বিরল প্রেমিক, প্রেমের বিরহকে যিনি শিল্পের তুলিতে মহিমান্বিত করেন। তুমি তো যাচ্ছো চলেকবিতায় আমরা এমন এক মহৎ, সৌন্দর্যপিয়াসী প্রেমিককে খুঁজে পাই, যিনি ছেড়ে যাওয়া প্রেমিকাকে ঘৃণা করার পরিবর্তে তার কাছেই ঘৃণার প্রত্যাশা করেন। প্রত্যাশা করেন জ্যোৎস্নার

তুমি তো যাচ্ছো চলে আমাকে কিছু দাও।

দাও ঘৃণা তীব্রতম, মর্মে 'শে জীর্ণ করি

সব পুষ্প,শিল্পকলা-সভ্যতার হস্তশিল্প-অব্যয় মাধুরী।

তুমি তো যাচ্ছে চলে আমাকে কিছু দাও।

যদি পারো দাও জোসনা ব্যালকনিতে,

জীবনের মাংসকোষে,কালের বিরুদ্ধে স্থির ধ্রুবতারা

করে রাখি অমৃতা তোমাকে।

(তুমি তো যাচ্ছ চলে, জ্বলো চিতাবাঘ)।

 

হুমায়ুন আজাদ জীবনের শেষদিন পর্যন্ত মুক্তবুদ্ধি এবং সৌন্দর্যের চর্চা করেছেন। সকল প্রকার কূপমণ্ডূকতা এবং পশ্চাৎপদতার বিপক্ষে ছিলেন তিনি। তাঁর নাম উঠলেই নানা গুরুগম্ভীর বিষয়ের কথা চলে আসে। কিন্তু তিনি যে একজন প্রবল কবি ছিলেন, যার কবিতার ছত্রে ছত্রে প্রেম এবং সৌন্দর্যের সহাবস্থান, তা যেন অনাবিষ্কৃতই থেকে গেছে।



অলংকরণঃ তাইফ আদনান