জলধি / প্রবন্ধ / পুণ্ড্ররাজ্যের পূণ্যভূমি বগুড়া ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহের প্রবাদ-প্রবচ
Share:
পুণ্ড্ররাজ্যের পূণ্যভূমি বগুড়া ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহের প্রবাদ-প্রবচ

প্রবাদ-প্রবচন এবং ছড়া সাহিত্য-স্থাপত্যের  প্রত্নশীলা। এই শীলাকে আবর্তন করেই নানাবর্ণে লতায়িত এবং সম্প্রসারিত হয়েছে সাহিত্যের বিস্তীর্ণ জগত। ইতিহাসখ্যাত প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন বা পৌণ্ড্রবর্ধন রাজ্যের প্রশাসনিক কেন্দ্রস্থল প্রত্ন-ঐতিহ্যের মহাস্থানগড় তথা আধুনিক বগুড়া জেলাসহ পুণ্ড্রের অনান্য অঞ্চলগুলিতেও   সাহিত্য-সংস্কৃতির আকরিক অধ্যায় হিসেবে বহমান রয়েছে ‘প্রবাদ-প্রবচন এবং আধুনিক ও লৌকিক ছড়া’। বক্ষমান লেখাটি বগুড়া ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহে প্রচলিত ও চর্চিত  প্রবাদ-প্রবচন এবং আধুনিক ও লৌকিক ছড়া বা লোকছড়া সম্পর্কিত একটি অপাদ্ধতিক ও  অসান্দর্ভিক তথ্য এবং দৃকচিত্র উপস্থাপনার মননগত প্রয়াস।

 

প্রবাদঃ সুদূর অতীতে মানুষ প্রথম যখন নিজের মানবীয় অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়, কথা বলা শেখে, সমাজবদ্ধ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয় এবং একে-অপরের সঙ্গে ভাব বিনিময়ের বাঙকৌশল রপ্ত করে; অর্থাৎ আবেগ, চিন্তা, বুদ্ধি ও জ্ঞানের পথে অগ্রসর হতে থাকে; বলা চলে, তখন থেকেই মানবসমাজে প্রবাদ-প্রবচন ও ছড়ার প্রচলন শুরু হয়। ফলে আদিকাল থেকেই  পৃথিবীর সকল ভূখণ্ডে সকল জাতিগোষ্ঠীর মাঝে প্রবাদ-প্রবচন ও ছড়াকেন্দ্রিক বাচ্য প্রয়োগের সংস্কৃতি চালু হয়। মানব-সভ্যতার এই প্রত্ন-স্তরিক বিকাশ-সূত্রে বলা যায় - প্রবাদ-প্রবচন মূলত প্রাকৃত তথা লৌকিক-জীবনের সামষ্টিক অভিজ্ঞতা-উপলব্ধির ফলিত উচ্চারণ;  সমাজভুক্ত সচেতন  মানুষের বাস্তব-প্রত্যক্ষণ সঞ্জাত অভিব্যক্তির সরল ও সংক্ষিপ্ত প্রকাশ।  প্রবাদ-প্রবচনের শব্দবন্ধে অন্য যেকোনো কথার চাইতে অধিক জোর ও ধ্বনিগত দ্যোতনা থাকে। একারণে উক্তিমূলক এই বচনশিল্পটি খুব সহজেই মানুষের মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম হয়। প্রবাদ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ proverb যা ল্যাটিন শব্দ proverbium থেকে এসেছে। এছাড়া maxim, adage, parole, gnome শব্দগুলিও proverb-এর বিকল্প শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বাংলায় প্রবাদ শব্দটির উৎপত্তি  'প্রকৃষ্ট বাদ' কথাবন্ধ বা অভিধা থেকে। বাদ শব্দটির অর্থ কথা, উক্তি বা ধারণা, আর প্রকৃষ্টের অর্থ উৎকৃষ্ট, শ্রেষ্ঠ, সেরা বা প্রশস্ত। সুতরাং 'প্রকৃষ্ট বাদ' শব্দবন্ধের অর্থ উৎকৃষ্ট বা শ্রেষ্ঠ বা সেরা উক্তি। Oxford Advanced Learners' Dictionary মোতাবেক প্রবাদ বা Proverb-এর সংজ্ঞা  -   “Proverb is a short well-known pithy saying that states a general truth or a piece of advice." Chamber's Dictionary-তে প্রবাদকে বলা হয়েছে - "A short familiar sentence expressing a supposed truth or moral lesson: a byword, a saying that requires explanation." Cambridge Dictionary মোতাবেক -  "A short statement, usually known by many people for a long time, that gives advice, or expresses some common truth." প্রবাদের আমেরিকান সংজ্ঞা - "A proverb is a short sentence that people often quote, because it gives advice, or tells you something about life." এবং "A short, traditional saying that expresses some obvious truth or familiar experience ; adage, maxim." প্রবাদের বৃটিশ  সংজ্ঞা - "A short, memorable,  and often highly condensed saying embodying, with bold imagery, some commonplace fact or experience." এবং "A proverb or an adage is a simple, traditional saying that expresses a perceived truth based on common sense or experience." প্রবাদের বিবলিক্যাল সংজ্ঞা - "An enigmatic saying in which a profound truth is cloaked." এবং এক্লেসিয়াসটিক্যাল সংজ্ঞা - "A wise saying or admonition providing guidance."  সমর পাল রচিত 'প্রবাদের উৎসসন্ধান' গ্রন্থ থেকে জানা যায়   বাংলাভাষার খ্যাতিমান লোকসাহিত্য-বিশেষজ্ঞ আশুতোষ ভট্টাচার্য (১৯০৯-১৯৮৪ খ্রি.) প্রবাদ সম্পর্কিত একটি স্প্যানিশ উক্তির বাংলা ও ইংরেজি অনুবাদ করেছেন নিম্নরূপে--

*'প্রবাদ হলো দীর্ঘ অভিজ্ঞতার একটি সংক্ষিপ্ত অভিব্যক্তি।'

*'A proverb is a short sentence based on long experience.' উল্লিখিত সংজ্ঞাগুলির সমন্বিত ভাব-সাধারণীর আলোকে বলা যায়, প্রবাদ হলো মানুষের জৈবনিক অভিজ্ঞতা-প্রসূত উপলব্ধি ও অভিব্যক্তির সাত্যিক ও জ্ঞনার্দ্রিক, অথচ সরল ও সংক্ষিপ্ত, ভাষিক বচন, যার ভিতরে চিত্র-প্রতীকের দ্যোতনা ও বিদ্রুপাত্মক বিরোধাভাসসমৃদ্ধ উপদেশনার ইঙ্গিত থাকে। 

ছড়াঃ ইংরেজিতে ছড়াকে বলা হয় nonsense rhymes; অর্থাৎ ছড়া হলো হালকা ভাব ও সহজ ভাষার ছন্দকথা, যার ভিতরে মননজাত মনস্বিতা তথা চিন্তার গহনচারীতা থাকবে না। থাকবে সরস আনন্দরসের সহজ প্রবাহন, চিত্তে বিনোদন সঞ্চারী সুবোধ্য, প্রাঞ্জল ও মৃদু শব্দছন্দের সাঙ্গীতিক  তরঙ্গ-দোলা। এখানে তত্বকথা, তথ্যবার্তা ও দার্শনিকতার সংকর্ষণ অনাবশ্যক। আর লৌকিক ছড়া বা লোকছড়া বলতে সেই ছড়াকে বুঝানো হয় যার রচয়িতা, রচনাকাল ও উৎপত্তিস্থল সম্পর্কে কোনো ঐতিহাসিক ও প্রামাণিক তথ্য পাওয়া যায় না; কিন্তু তা কোনো বিশেষ জনসমাজের বা বৃহত্তর জনসমাজের চিরায়ত সাংস্কৃতিক সম্পদ ও ঐতিহ্যরূপে মানুষের মুখেমুখে চড়ে বেড়ায় এবং মানব-মনকে, বিশেষত শিশু-মনকে অপার আনন্দে আপ্লুত করে। ছড়া প্রসঙ্গে বিশিষ্ট ছড়া-গবেষক মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী বলেছেন - "ছড়ার রাজ্যে বুদ্ধি ও বিচারের অধিকার নেই। শিশুদের কাছে বুদ্ধি ও বিচার অপেক্ষা রসের মূল্য বেশি, মস্তিষ্ক অপেক্ষা হৃদয় বড় (কাসিমপুরী, ১৯৬২: ৬)।"  সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ তাঁর “ছড়ায় বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি গ্রন্থে (১৯৮৮)” ছড়ার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন “ছড়া হলো লঘু ভাষায় ও প্রাকৃত ছন্দেবদ্ধ আনুপূর্বিক ভাব ও কাহিনিবিহীন ধ্বনি, রস বা চিত্র-প্রধান সুরাশ্রয়ী সংক্ষিপ্ত সমিল পদ্য”। ছড়ার সংজ্ঞা সম্পর্কে ওয়াকিল আহমদের মত - "সমাজের সাধারণ মানুষের আবেগ, কল্পনা,  স্বপ্ন, স্মৃতি  ও অভিজ্ঞতার কথা পদ্যের ভাষায় ছন্দের বন্ধনে ক্ষুদ্র অবয়বে যে বাঙময় রূপ লাভ করে তা-ই ছড়া (ওয়াকিল আহমদ, ১৯৯৮: ২)।"  লোকসংস্কৃতিবিদ অধ্যাপক ড. বরুণ কুমার চক্রবর্তী ছড়ার সংজ্ঞায় লিখেছেন - "ব্যষ্টি রচিত হয়েও স্বল্পায়তন বিশিষ্ট ছন্দবদ্ধ পদসমূহ যা নাকি সমষ্টি কর্তৃক গৃহীত হয়ে সমষ্টির সম্পদরূপে পরিচিতি অর্জন করে, যেখানে ছন্দ, নির্মিতি, কৌশল এবং অসংলগ্ন চিত্রের সমাবেশই মুখ্য, মূলত শিশু ভোলানাথদের মনোরঞ্জনের জন্য যা মুখে মুখে রচিত এবং মূলত নারীকর্তৃক ব্যবহৃত, তাকেই আমরা ছড়া বলে অভিহিত করতে পারি।" তিনি আরও বলেছেন- "আদিমযুগে মানুষ যখন ছিল শিশুর মতো সহজ, তখন সৃষ্টি হয়েছিল ছড়া।" এক্ষেত্রে একজন বিদেশি লেখকের অভিমত নিম্নরুপ - "The popular rhyme is a striking example of poetic primitivity, going back in its construction and psychological essence almost to the primitive archaic times ---".  লোকসংস্কৃতি অভিধান 'Standard Dictionary of Folklore Mythology and Legend"- এ উপস্থাপিত Bloomfield-এর অভিমত হলো ছড়া মূলত "attract the notice of children and children-like   man."  লোকশ্রুতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মযহারুল ইসলাম মনে করেন - "ছন্দ, গান ও সুরের প্রতি মানুষের আকর্ষণ সহজাত বলেই তা আদিকাল থেকেই ভাষার মাধ্যমে অভিব্যক্তি খুঁজেছে।  ছড়া এই আকর্ষণের ফসল। শিশুসন্তানকে ঘুম পাড়ানোর জন্য মা যখন ছন্দে ছন্দে সহজ-সরল বাক্যের ক্ষুদ্র মালা গাঁথেন, তা ছড়া হয় ----। কোন কোন সময় ছড়ার ছন্দও বাক্যে বিন্যস্ত হয় কেবল মিল দিয়ে বক্তব্য প্রকাশের জন্য, অর্থ খুঁজতে গেলে তা অর্থহীন মনে হতে পারে ----।"  ছড়া সম্পর্কে বাঙালি-মননের বিশ্ব-স্মারক কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মত - "ছড়াকে আমি মেঘের সহিত তুলনা করিয়াছি। উভয়ই পরিবর্তনশীল, বিবিধ বর্ণে রঞ্জিত, বায়ুস্রোতে যদৃচ্ছাভাসমান। দেখিয়া মনে হয় নিরর্থক। ছড়াও কলা-বিচারে শাস্ত্রের বাহির, মেঘ-বিজ্ঞানও শাস্ত্র-নিয়মের মধ্যে ভালো করিয়া ধরা দেয় নাই। অথচ জড়জগতে এবং মানব-জগতে এই দুই উচ্ছৃঙ্খল অদ্ভূত পদার্থ চিরকাল মহৎ উদ্দেশ্য সাধন করিয়া আসিতেছে। মেঘ বারিধারায় নামিয়া আসিয়া শিশুশস্যকে প্রাণদান করিতেছে এবং ছড়াগুলিও স্নেহরসে বিগলিত হইয়া কল্পনাবৃষ্টিতে শিশুহৃদয়কে উর্বর করিয়া তুলিতেছে। লঘুকায় বন্ধনহীন মেঘ আপন লঘুত্ব এবং বন্ধনহীনতা গুণেই জগদ্ব্যাপী হিতসাধনে স্বভাবতই উপযোগী হইয়া উঠিয়াছে,  এবং ছড়াগুলিও ভাবহীনতা, অর্থবন্ধশূন্যতা এবং বৈচিত্র্যবশত চিরকাল ধরিয়া শিশুদের মনোরঞ্জন করিয়া আসিতেছে--।” কিন্তু কালধারার নানাকৌণিক অভিঘাতে ছড়া এখন সেই শিশুতোষনী বা শিশুর মনোরঞ্জনী লঘু ছন্দদ্যোতনার ভাব ও ভঙ্গিসারল্যের লৌকিক স্তরে স্থিত নেই। সে এখন বোধিস্বাত্তিক শিল্পনৈপুণ্যের সফিস্টিক স্তরে উন্নীত হয়েছে। গঠনরীতি, বিষয়বস্তু এবং কারু-নন্দনের দিক থেকে ছড়া এখন রীতিমতো আধুনিক শিল্প। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মতাত্ত্বিক, জৈবজাগতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক - সবধরনের বিষয় নিয়েই রচিত হচ্ছে ছড়া। পাশাপাশি একথাও সত্য যে এখনও ছড়াকারগণ তাঁদের  অধিকাংশ ছড়ায় শিশুভুলানো, ছেলেভুলানো এবং ঘুমপাড়ানি ভাব ও স্বরাবহ সৃষ্টিতেই অধিক মনোযোগী। স্বনামধন্য সাহিত্যপত্রিকা "কালি ও কলমে" প্রকাশিত বিশ্বজিৎ ঘোষের ছড়াবিষয়ক প্রবন্ধ "বাংলাদেশের ছড়ায় গণসচেতনতা" থেকে জানা যায় বাংলা ছড়া তার প্রাচীন লোকচারিত্র ছেড়ে আধুনিকতায় প্রথম অভিষিক্ত হয় মনস্বী অন্নদাশঙ্কর রায়ের হাত ধ'রে। ছড়া শব্দটির উৎস সম্পর্কে প্রফেসর ড.বেলাল হোসেন তাঁর "লোকসাহিত্যের কাঠামোগত স্বাতন্ত্র্য পূর্ববগুড়া" গ্রন্থে বলেছেন - "যোগেশচন্দ্র রায়, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজশেখর বসু প্রমুখ আভিধানিক ছড়া শব্দটির উৎস সন্ধান করেছেন সংস্কৃত 'ছটা' শব্দে। যোগেশচন্দ্র রায় শব্দটির অর্থ বলেছেন 'সমূহ পরম্পরা' বা 'শ্লোক পরম্পরা' (যোগেশচন্দ্র রায় ১৩২০ : ৩০)।"  তবে ছড়া শব্দের উৎস অন্যভাবেও অনুমিত হত পারে। যেমন - ছড়া মুখেমুখে সৃষ্টি হয়ে সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তো। এই ছড়ানো স্বভাবের জন্যই হয়তো ছন্দবদ্ধ এই রসাস্বাদী কথাবন্ধের নাম হয়ে থাকতে পারে ছড়া। এছাড়া বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত 'বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান(২০০০)'-কে উদ্ধৃত ক'রে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত 'ছড়া' শব্দটির নানারকম লৌকিকরূপ সম্পর্কে ড. বেলাল বলেছেন - " সিলেটে 'শিলখ বা শিল্ল, ময়মনসিংহে 'শিলুক বা শিলকি বা সিলহি, কুমিল্লায় 'শললুক', রংপুর ও রাজশাহীতে 'ছিলকা বা ছিলকি এবং পূর্ববগুড়ায় 'শিল্লোক বা শিল্লুক'। উল্লেখ্য - বর্তমান বগুড়া শহরের পশ্চিম উপকণ্ঠে 'ছিলকিবান্ধা' নামে একটি প্রাচীন মহল্লা রয়েছে। এখানে অনুমান করা যেতেই পারে যে, হয়তো এই মহল্লায় এক বা একাধিক শিল্লোক বা শিলকি বান্ধা লোক বা ছড়াকারের  বসবাস ছিল । ছড়া-গবেষকদের অনেকেই ছড়া-সাহিত্যের বিভিন্ন শ্রেণিকরণ করেছেন। একজন থেকে আরেকজনের শ্রেণি-বিভাজনে বেশকিছু পার্থক্য পরিদৃষ্ট হয়, যদিও কিছুকিছু বিভাগ প্রায় সকলের তালিকাতেই কমনরূপে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আশুতোষ ভট্টাচার্য, সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ, শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী, সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী, আশরাফ সিদ্দিকী, নির্মলেন্দু ভৌমিক, আলমগীর জলীল প্রমুখ বিভিন্নভাবে ছড়ার বিষয় ও বৈশিষ্ট্যগত বিভাজন বা শ্রেণিকরণ করেছেন। এইসব শ্রেণিবিভাজনের আলোকে এখানে ছড়ার একটি সমন্বিত বিভাজন-তালিকা প্রদর্শন করা হলো।--

ক. শিশুবিষয়ক ছড়া

খ. নারীবিষয়ক বা মেয়েলী ছড়া

গ. বিয়েবিষয়ক ছড়া

ঘ. জামাই বা জামাতাবিষয়ক চড়া 

ঙ৷ খেলাধুলা বিষয়ক ছড়া 

চ. কর্মপ্রেরণামূলক ছড়া

ছ. অভ্যাস গঠনমূলক ছড়া

জ. নীতিকথামূলক ছড়া

ঝ. প্রার্থনামূলক ছড়া

ঙ. আচার- প্রথামূলক ছড়া

প. প্রকৃতিবিষয়ক ছড়া

ফ. পশুপাখি বিষয়ক ছড়া

ব. কৃষি বা ফসলবিষয়ক ছড়া

ভ. নিন্দা বা তিরস্কারমূলক ছড়া

ম. সমসাময়িক ঘটনাবিষয়ক ছড়া, ইত্যাদি। 

 

লোকপ্রবাদ এবং লোকছড়া -  দু'টোই আদিম মানুষদের মনের ভাব ও স্বর-ব্যঞ্জনার সুরাশ্রয়ে সৃষ্ট ধ্বনিভাষ্যের শিল্প। সুতরাং  জন্মগত ঐতিহ্যের দিক থেকে দু'টো শিল্পই সুপ্রাচীন। প্রখ্যাত লোক-ঐতিহ্য গবেষক সমর পাল তাঁর "প্রবাদের উৎসসন্ধান" গ্রন্ধের ভূমিকায় বলেছেন - "পূর্বকাল থেকে ধারাবাহিকভাবে চলে আসা বাক্য, জনশ্রুতি কিংবা লোক-সমাজের যুগসঞ্চিত অভিজ্ঞতালব্ধ বোধের সংক্ষিপ্ততম প্রকাশ হলো প্রবাদ।"  অন্যদিকে আরেক লোক-সংস্কৃতিবিদ বিশ্বজিৎ ঘোষ তাঁর "বাংলাদেশের ছড়ায় গতচেতনা" শিরোনামীয় নিবন্ধে বলেছেন - "ছড়াসাহিত্যের ইতিহাস সুপ্রাচীন। বাংলা ছড়ার সুদীর্ঘ ইতিহাসের পথ ধরেই বাংলাদেশের ছড়াসাহিত্যের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ।" একইভাবে স্বনামখ্যাত লোকসাহিত্য বিশারদ অধ্যাপক ড. পল্লব সেনগুপ্ত তাঁর 'লোকসংস্কৃতির সীমানা ও স্বরূপ" গ্রন্থে 'লৌকিক ছড়ার স্বরূপ সন্ধান' অংশে লিখেছেন - "কালগতভাবে বিচার করলে, ছড়াকে সম্ভবত মানুষের আদিমতম সাহিত্য-প্রয়াসগুলির একটি বলেই ধার্য করতে হয়। সভ্যতার প্রদোষলগ্নে আমাদের প্রাচীন পিতামহরা যখন বহুবিচিত্র দেবতাদের অস্তিত্ব কল্পনা ক'রে নিয়ে তাঁদের উদ্দেশ্যে স্তবস্তুতি ইত্যাদি নিবেদন করতেন ছন্দ ও সুরের মাধ্যমে,  তখন থেকেই ছড়ার উৎসারণের পথ খুলে যায়। -----------------। সেদিক থেকে ছড়াকেই প্রাচীনতরের শিরোপা দিতে হয় (লৌকিক ছড়া প্রসঙ্গে : ড.মন্টু বিশ্বাস) ।"  সৃষ্টি-উৎসের প্রাচীনত্বের কারণে এই লৌকিক শিল্প দু'টির সৃষ্টিকাল ও স্রষ্টার পরিচয় উদ্ধার করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম খনা। জনশ্রুতি আছে যে,খনার নিবাস ছিল আধুনিক পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার বারাসাত মহকুমার দেউলিয়া গ্রামে ( বর্তমানে চন্দ্রকেতুগড় প্রত্নস্থল যেটি খনামিহিরের ঢিবি নামে পরিচিত)। তিনি ছিলেন বৈদ্য বংশজাত বিদুষী এবং জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী একজন বাঙালি নারী। মনে করা হয় - তাঁর বচনগুলি আনুমানিক ৮ম থেকে ১২শ শতাব্দীর মধ্যে কোনোএক সময়ে রচিত হয়েছে। খনার বচনের মতোই তুমুল জনপ্রিয় ডাকের বচনের কোনো নির্দিষ্ট রচয়িতা নেই। ডাকের অর্থ বুদ্ধিবস্তু বা জ্ঞানগর্ভ উক্তি। ডাকের বচনের প্রথম সংকলনের নাম 'ডাকার্ণবে'। এটি সম্ভবত অষ্টম শতকে প্রকাশিত হয়। খনার বচনগুলি মূলতই কৃষি ও পারিবারিক বিষয়সংশ্লিষ্ট ; কিন্তু ডাকের বচনগুলি বিচিত্র এবং সর্ববিষয়মুখী। অনেক ক্ষেত্রে আবার বৌদ্ধধর্মীয় নীতিবাক্যেরও অস্তিত্ব পাওয়া যায়।   আসল কথা হলো -  ইতিহাসের প্রচলিত ধারায়  আদিমত্ব এবং সর্বজনিন ও শাশ্বত মানবিক আবেদন সৃষ্টির সক্ষমতার কারণে পুরাকালের লৌকিক প্রবাদ ও লৌকিক ছড়াগুলি বাংলাবিশ্বের কোনো বিশেষ অঞ্চলে স্থবির, স্থিত বা সীমিত হয়ে থাকেনি বা থাকতে পারেনি। বরং এগুলি গৌড় বরেন্দ্র পুণ্ড্র থেকে চন্দ্রদ্বীপ নবদ্বীপ এবং রাঢ় তাম্রলিপ্তি বঙ্গ সমতট ও হরিকেল পর্যন্ত সমগ্র বাংলাভাষী ভূখণ্ডের সকল জনগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পদে পরিনত হয়েছে। সুতরাং পুণ্ড্র-অঞ্চল বা অন্য যেকোনো অঞ্চলের একান্ত নিজস্ব ধাচের পুরাকালিক লোকপ্রবাদ এবং লোকছড়া থাকার বিষয়টি খানিকটা এ্যবসার্ড। কারণ যে প্রবাদ-ছড়া পুণ্ড্রে জনপ্রিয় তা গৌড় রাঢ সমতট হরিকেলসহ পুরো বাংলার সর্বত্র জনপ্রিয়। ইতিহাসখ্যাত পুণ্ড্র বর্ধন বা পৌণ্ড্রবর্ধন রাজ্যের ভৌগোলিক সীমানা ছিল ব্যপক বিস্তৃত। এর তৎকালীন রাজধানী ছিল পৌণ্ড্রনগর বা পেণ্ড্রুনগর যা বর্তমান বগুড়া জেলাশহর থেকে  চৌদ্দ কিলোমিটার উত্তরে মহাস্থানগড় নামে ইতিহাসের সাক্ষী  হয়ে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। এ রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রাজা বাসুদেব এবং শেষ রাজা ছিলেন পরশুরাম। রাজা পরশুরাম একজন লেখক ছিলেন। সংস্কৃত ভাষায় রচিত তাঁর গ্রন্থের নাম ছিল 'উত্তর পৌণ্ড্র খণ্ড'। এ অঞ্চলের রূপকথা থেকে জানা যায় রাজার ভগিনী শীলাদেবীও একজন কবি ছিলেন। ইতিহাসঘনিষ্ঠ ইতিকাহিনী মোতাবেক আফগানিস্তানের বলখ শহর থেকে আগত মুসলিম দরবেশ হযরত ইব্রাহীম শাহ সুলতান বলখী মাহিসাওয়ারের সঙ্গে এক যুদ্ধে রাজা পরশুরাম পরাজিত হন; এবং তাঁর পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক পুণ্ড্ররাজ্যের পরিসমাপ্তি ঘটে। বর্তমান সময়ে পুণ্ড্রভূমি বলতে সাধারণভাবে বগুড়া এবং এর আশপাশের অঞ্চলসমূহকেই বুঝানো হয়ে থাকে। সুতরাং এই লেখায়  লোকপ্রবাদ ও লোকছড়া সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনার ক্ষেত্রে পুণ্ড্র-অঞ্চলের শিল্প-স্বাতন্ত্র্য শনাক্তির একটি বিশেষ প্রয়াস বর্তমান। 

 

প্রবাদঃ এই লেখায় আগেই বলা হয়েছে নিখিলবাংলার প্রায় সকল প্রান্তেই আঞ্চলিক প্রবাদের অস্তিত্ব সদর্থেই বিরল ও দুর্লভ। কারণ কোনো বিশেষ একটি এলাকায় কোনো প্রবাদের জন্ম হলে এবং তার অর্থগত তাৎপর্য, ধ্বনিগত দ্যোতনা ও বাস্তবানুগ প্রয়োগ সর্বজনগ্রাহ্য হয়ে উঠলে  অতিদ্রুত তা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে, জনপ্রিয় হয়। এবং বৃহত্তর পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ার ফলে তার জন্মস্থল ও জন্মকাল হারিয়ে যায়। সুতরাং প্রাচীন পুণ্ড্র-অঞ্চল এবং  আধুনিককালের বৃহত্তর বগুড়া ও এর আশপাশের অঞ্চলসমূহের প্রবাদ হিসেবে যেসকল প্রবাদ এখানে তুলে ধরা হয়েছে  সেসব হয়তো দেশের অনান্য অঞ্চলেও যথারীতি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু আমাদের যুক্তি ও দাবী হলো এগুলি আমাদের নির্বাচিত অঞ্চলে সর্বমহলে প্রচলিত এবং  জনপ্রিয়। এরকম অতি-সুবিদিত কিছু প্রবাদের একটি সংক্ষিপ্ত সূচী-পর্যাণ এখানে উপস্থাপন করা হলো। স্মর্তব্য, লেখার কলেবরগত সীমাবদ্ধতা হেতু উপস্থাপিত প্রবাদগুলির  অর্থগত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ পরিবেশন করা সম্ভব নয়। ক্ষেত্রবিশেষে শুধু ভাবার্থের ইঙ্গিত প্রদান করা হলো। 

 

* চ্যাঙ উজায় ব্যাঙ উজায় খইলসা কয় আমিও উজাই।

> চ্যাঙ এবং খইলসা বিশেষ শ্রেণির মাছ। এরা কেউই স্রোতের উল্টোদিকে উজাতে পার না। এই প্রবাদটি   সারিয়াকান্দি উপজেলার যমুনাবর্তী মানুষদের মাঝে বেশি প্রচলিত। এর ভাবার্থ হলো কিছু কিছু অযোগ্য বা অক্ষম মানুষ হাস্যকররূপে নিজেকে সক্ষম হিসেবে প্রদর্শনের ভাব দেখায়। 

ভাও বুঝে নাও বাও।

>ভাও শব্দের অর্থ দামদর বা অবস্থা। এখানে বলা হয়েছে আবহাওয়া এবং নদীর স্রোত ও ঢেউ বুঝে নৌকা চালাতে হয়। তবে এই অর্থ প্রতীকী।

সাঁতারের উপর পানি নাই।

> অর্থাৎ বিপদ বা সংকট চরম আকার ধারণ করলে তাকে সাথে নিয়েই চলতে হয়।

বুঝলে মধু না বুঝলে কদু।

> কোনো ব্যক্তি বা জিনিসের গুরুত্ব বুঝতে পারা না পারার বিষয় ইঙ্গিত করা হয়েছে।

বেলা থাকতে হাঁইটা যাইও, হাতে থাকতে রাইখা খাইও।

*আয় বুইঝা ব্যয়, কভু না অভাবে পড়ে।

> সময়ানুবর্তিতা ও মিতব্যয়ীতা বিষয়ক উপদেশনা।

ল্যাংটার কোনো বেসামাল নাই।

> লজ্জাহীন বা ভয়হীন লোকের লজ্জিত বা ভীতু হওয়ার চিন্তা থাকে না।

মাইগের কথায় চলে, পড়ে সবার তলে।

> মাইগ কথাটি স্ত্রী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। চিরায়ত গ্রামীন সমাজে কোনো পুরুষ মানুষ স্ত্রীর পরামর্শে চললে অন্যরা তাকে অবজ্ঞা এবং উপেক্ষা করতো।

* শক্ত মর্দের দক্ষিণ দুয়ারি ঘর।

> মর্দ পুরুষবাচক শব্দ। এখানে পুরুষের পৌরুষকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। 

* আন্ধার ঘরে সাপ, সারা ঘরেই সাপ।

> কোনো উৎসহীন শঙ্কা বা সন্দেহ মানুষকে সর্বতভাবে উদ্বিগ্ন রাখে।

* প্যাটের ছৈলের আশে, কোলের ছৈল পেষে।

> ভবিষ্যতের কোনো কল্পিত বড়র আশায় বর্তমানের সাধারণকে ত্যাগ করা। 

* নাইয়ার এক নাও নি-নাইয়ার শত নাও।

> এই প্রবাদটিও নদীর্বর্তী অঞ্চলেই বেশি চলে। এর অর্থ প্রতীকী ও ব্যঙ্গার্থক - দু'রকমেরই হতে পারে এবং তা বহুমুখী। 

* আঁড়া মোচরাতে না পেরে বাড়া মোচরায়।

> আঁড়া হলো ঝোপঝাড়ের মধ্যেকার একধরনের খাগড়া জাতীয় প্ল্যান্ট। বাড়া শব্দটির দ্বারা পুরুষের যৌনাঙ্গকে বুঝানো হয়। লৌকিক ভাষায় একে ধোন, চ্যাট বা হোল নামেও অভিহিত করা হয়ে থাকে। এই প্রবাদের অর্থ প্রতীকাশ্রিত। সামাজিকভাবে শক্তি বা ক্ষমতাহীন কোনো মানুষ যদি ক্ষমতাবান কারোর দ্বারা অপমানিত, লাঞ্ছিত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয় সে তার প্রতিকার করতে পারে না, প্রতিশোধ নিতে পারে না। কিন্তু সে রাগান্বিত এবং ক্ষুব্ধ হয়। তখন অতি তুচ্ছ কোনো কারণে বা অকারণেই সে তার সঞ্চিত ক্ষোভটি তার থেকে দুর্বল কোনো মানুষের উপরে ঝেরে দেয়।

* যার মনে যা ফালদে ওঠে তা।

> এর অর্থ হলো কোনো কোনো মানুষ নিজের মনের কোনো সংশয় বা আকাঙ্খা অন্যের মনে সন্ধান করে।

* ছ্যাড়ার বুদ্ধি গলাত বুড়ার বুদ্ধি তলাত। 

> অর্থ - অভিজ্ঞতার অভাব বশত কমবয়সী তরুণ-যুবকদের বুদ্ধি থাকে হালকা। পক্ষান্তরে জীবন সম্পর্কিত অভিজ্ঞতার কারণে বয়সী মানুষদের বুদ্ধি হয় পাকা ও ভারি।

* ঠোসা ঢেকির বাইজ বেশি। 

> মানে নির্বোধ ও অপদার্থ মানুষের চাপার জোর বেশি হয়।

* ভরা কলসি নড়ে কম,খালি কলসি নড়ে বেশি। 

> অর্থ - অভিজ্ঞ,জ্ঞানী ও ব্যক্তিত্ববান মানুষ বলে কম, চটে কম কিন্তু ভাবে বেশি। অন্যদিকে জ্ঞানহীন, বুদ্ধিহীন মানুষ বকে বেশি, চটে বেশি। 

* দড়িছেঁড়া গরু।

> অনিয়ন্ত্রিত, উচ্ছৃঙ্খল মানুষ। 

* হাউসে বিদ্যা কৃপণে ধন।

> একসময় কৃষক পরিবারের সন্তানকে কৃষিকাজে নিয়োজিত করা হতো সংসারের আয় বাড়ানোর জন্য। তবে বিদ্যার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে সক্ষম কোনো কোনো পিতা বা অভিভাবক সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাতেন। এই বিষয়টিকে তখনকার সমাজে হাউস বা শখ ব'লে বিবেচনা করা হতো।

* না পায়া নাতি ভাতার নাতি দেয় গাঙ্গে সাঁতার। 

> এই প্রবাদের ভাষা খানিকটা অশ্লীল শোনালেও এর মর্মার্থ বেদনাদায়ক। 

* কথার বেলা ঝনঝন কাজের বেলা ঠনঠন। 

> বাকোয়াজ বা বাচাল মানুষ, যারা কথায় টনটনা কিন্তু কাজে শূন্য।

* যে কথাই কও পাছে বেড়ারও কান আছে। 

> অর্থাৎ কোনো গোপনতাই গোপন থাকে না।

* কয়লা ধুইলে ময়লা যায় না। 

> যে মানুষ অস্থিমজ্জায় মন্দ কোনো উপদেশ-পরামর্শই তাকে শোধরাতে পারে না।

* আছিলাম ধান হইলাম খই, দিনে দিনে আরো যে কী হই।

> মানব জীবনের অনিবার্য অথচ অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। 

* লাইত্থানো গাইয়েরর দুধ মিঠা।

> কিছু কিছু বদরাগী মানুষ খুব পরোপকারী হয়ে থাকে।

* মিষ্টি কথায় চিড়া ভেজে না।

> কথা মিঠা হলেও তা দিয়ে কখনো কখনো উদ্দিষ্ট মানুষের মন গলানো যায় না। বরং তাকে খুশি করার জন্য বাড়তি কিছু করার প্রয়োজন হয়।

* জলে না নামিলে কেহ শেখে না সাঁতার, হাঁটিতে শেখে না কেহ না খেয়ে আছাড়। 

> অনুপ্রেরণা বা উৎসাহব্যঞ্জক কথা।

* অর্ধেক কইলে মর্দ্দে বোঝে, ভাইঙ্গা কইলে মাইগও বোঝে।

> কোনো রহস্যঘেরা কথা বুদ্ধিমানেরা ইঙ্গিতেই বুঝতে পারেন। কিন্তু অমি মানুষকে বুঝানোর জন্য তা পুরোটা খুলে বলতে হয়। 

* ভাবেতে মজিল মন কী-বা হাড়ি কী-বা ডোম। 

> মানুষের আবেগজাত প্রেম কোনো জাতপাত মানে না।

* ভিক্ষা চাই না মা কুত্তা ঠেকাও। 

> মানে উপকার করতে না পারলেও বিপদের দিকে ঠেলে না দেওয়ার আকুতি।

*দশের লাঠি একের বোঝা। 

*দশে মিলে করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ।

*দশের ডাকে ভগবান অস্থির। 

> এখানে দশ বলতে সমস্ত বা সকলকে বুঝানো হয়েছে, এবং সম্মিলিত কাজকে অধিকতর কল্যাণকর হিসেবে ইঙ্গিত করা হয়েছে। 

* জামির (লেবু) বেশি চিপলে তিতা হয়।

> অর্থাৎ কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা বারংবার আওড়াতে থাকলে  সেবিষয়ে জনমনে বিতৃষ্ণা সৃষ্টি হয়। 

*বিল নষ্ট করে পানা, দিল নষ্ট করে কানা।

> আবর্জনা যেমন পরিবেশ নষ্ট করে, অর্বাচিন মানুষ তেমন সমাজ-মানস এবং মানব-পরিবেশ নষ্ট করে। 

 

এরকম আরও অসংখ্য প্রবাদ বৃহত্তর বগুড়া ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহে মানুষের মুখে মুখে চলে। যেমন - খুদকুঁড়া যে না বাছে তার কপালে ভাত আছে, তোলা ভাতে পোলা বাঁচে না, ফল পাকলে মিঠা মানুষ পাকলে তিতা, যৎমৎ দুই ভাই যৎমৎ দুই গাই, হাঁ করলেই বত্রিশ নাড়ী গোণা যায়, পরের জন্য গাত খোড়ে সেই গাতে নিজেই পড়ে, দশদিন চোরের একদিন সাবুদের, বল বল নিজের বল ভাইয়ের বল পাছে ঘরে যদি ভাত থাকে তো বউয়ের বলও আছে, কলিকালের পোলাপান মায়েরে কয় কুটনি বুড়ি বউরে কয় সোনার চাঁন, এক দুলালির সাত শাড়ি তাও দুলালির মন ভারি, একেতো নাচুনি বুড়ী তার উপরে ঢোলে বারি, বউ আসার  আগকালে মা-ই সেরা নারী বউ আসলে মায়ের কথা অতি বাড়াবাড়ি, খাইলে জাত যায় না কইলে জাত যায়, ঘাসে বলদ ভাতে মরদ, যদি থাকে মনে থাকনা সে রাজ্যের কোণে, যা পাই তা-ই খাই আমার কোনো খিদা নাই, দুই নায়ে পাও দেয় কোনো কূল নাহি পায়, এক মজলিস খায় না দুই মজলিস পায় না, পেটে খাইলে পিঠে সয়, জাত যায় না মরলে খাসলত যায় না ধুইলে, কাঠ খাইলে অঙ্গার হাগতে হয়, অতি বড় সুন্দরী না পায় বর অতি বড় ঘরনি না পায় ঘর,  আগে গেলে বাঘে খায় পিছে গেলে সোনা পায়, চাম নাই কুত্তার নাম বাঘা, যার বিয়া তার খবর নাই পাড়াপড়শির নিন নাই,  ভাত দেওয়ার মুরোদ নাই কিলের বেলা গোসাই, হাতিঘোড়া গেলো তল মশা বলে কত জল, মজা মারে ফজা ভাই আমরা শুধু নাও বাই, লোম বাছতে কম্বল উজাড়, অতি চালাকের গলায় দড়ি, অতি ভক্তি চোরের লক্ষ্মণ, অতি লোভে তাঁতি নষ্ট, নিজে বাঁচল বাপের নাম, চাচা আপন প্রাণ বাঁচন, উলু বনে মুক্তা ছড়ানো - ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আমাদের বক্তব্য আগের মতোই। ইঙ্গিতি উপদেশনা, ব্যঙ্গ-ভর্ৎসনা তথা সমাজ-বাস্তবিক ভাবচেতনামূলক এই প্রবাদ-প্রবচনগুলি অখণ্ড বাঙালি সংস্কৃতির চিরায়ত-লোকায়ত ঐতিহ্য। খনা ও ডাকের বচনের মতো এইসব  প্রবাদ-প্রবচনও নিখিল-বাংলার সর্বসমাজে সমভাবে প্রচলিত, জনপ্রিয় এবং জনমানসে ভাবচৈন্তিক প্রভাব সঞ্চারে সক্রিয়। সুতরাং অমীয় স্বাদ-আস্বাদ ও প্রতীকার্থিক ধ্বনি-দ্যোতানায় সমৃদ্ধ এই প্রবাদ-প্রবচনগুলিকে সংকীর্ণ স্থানিকতা ও কালিকতায় আবদ্ধ করা সমীচীন নয়, সম্ভবও নয়। 

 

ছড়াঃ বৃহত্তর বগুড়া অঞ্চলে আধুনিক  ছড়াসাহিত্যের ইতিহাস সমীহযোগ্য ঐতিহ্যের স্মরণপাঠ। বগুড়ায় ছড়াচর্চা আন্দোলনে নতুন বাঁক সৃষ্টির ক্ষেত্রে "বগুড়া ছড়া সংসদ"-এর মুখপত্র 'ছররা ছুট্''-এর ভূমিকা মাইলফলকস্বরূপ। এই সংসদের সভাপতি ছিলেন বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের সেইসময়কার বাংলার অধ্যাপক মোস্তফা নূরউল ইসলাম। ১৯৭৫ সাল থেকে প্রতিবছর একটি ক'রে 'ছররা ছুট্'-এর মোট চারটি সংখ্যা বেরিয়েছিল। সংখ্যাগুলির পর্যায়ক্রমিক সম্পাদক ছিলেন - মোস্তফা নূরউল ইসলাম ও মাহমুদ হাসান, আফরূজ জাহান ও আইনুন নাহার জেবু এবং মনজু রহমান ও রায়হান রাহমান। তবে 'ছররা ছুট্' প্রকাশনার মূলে একান্তভাবে জড়িত ছিলেন মাহমুদ হাসান ও নিলুফার বেগম নীলা। 'ছররা ছুট্'-এ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের অনেক প্রবীণ-নবীন ছড়াকারের লেখা ছাপা হতো। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন - মযহারুল ইসলাম, রফিকুল হক, তপংকর চক্রবর্তী, আব্দুর রহমান,  মসউদ উস শহীদ, রেজা রায়হান বুলবুল, হানিফ সংকেত, কামরুন নাহার বাবলী, আসুরা মজিদ, শংকর মিত্র, মোস্তফা নূরউল ইসলাম, আবু সালেহ, আব্দুর রাজ্জাক, ফারুক ফয়সল, আফরূজ জাহান, নিরঞ্জন দেব, শাহাবুদ্দীন নাগরী, আলতাফ আলী হাসু, জহুরুল আলম ঝরা, আইউব সৈয়দ, মাহমুদ হাসান, এনায়েত রসুল, স্বপ্নুল ইসলাম রাহা, মোসলেহ্ উদ্দিন বাবুল, সূর্য,  সরোদ রহমান, নিলুফার বেগম নীলা, মাহবুব কবীর, শ্যামল চক্রবর্তী, আইনুন নাহার জেবু, রোসতম আলী মনজু(মনজু রহমান), মোসতাফিজার রহমান মোসতা, আইভী চৌধুরী, আ.খ.ম. শাহজান বাচ্চু, সৈয়দ আমির আলী প্রমুখ। এই তালিকার ছড়াকারদের মধ্যে যাঁরা বগুড়ার তাঁদের কয়েকজনের একটি ক'রে ছড়া নিম্নে উল্লেখ করা  হলো। 

*মোস্তফা নূরউল ইসলাম (১৯৪৩--)

 

চশমা নিলো কানা ছুঁচো

লাঠি নিলো শেয়াল

বুড়াবুড়ির ভারী ভাব

মধ্যিখানে দেয়াল। 

কলার ঘরে ঠাকুর থাকে 

পুরোহিত রাঁধে পোলাও

খোকার হাতে এ্যাটমবোম

শহর ছেড়ে পালাও।

 

*আব্দুর রাজ্জাক (১৯৫৪--)

 

আমড়াকাঠের ঢেঁকি যেন

সিদ্ধ পুরুষ সবাই

নিজের ছেলে বোকা বানায়

বিদ্যা করে জবাই। 

কাগজ কাগজ পাশা খেলা

লবণ মরিচ তেলে;

এসব কথা বলতে গেলেই

দেয় যে পুরে জেলে।

 

*ফারুক ফয়সল

 

এই যে শুনুন রাজা মশাই এই

পা চাটবো গাধা ঘোড়ার এমন বোকা নই

মারবে নাকি লাঠির ঘায়ে, তাতেও আছি সই

পিষবে তুমি এই নগরী এমন রোলার কই?

 

*আফরূজ জাহান 

 

গিয়েছিলুম একদিন হাইকোর্ট মাজারে 

কল্কেতে বেসামাল ওহ ডিয়ার গাঁজারে!

দম মেরে মনে হয় যেন আমি জমিদার 

যা খুশি ভেবে যাই পাত্র নই দমিবার

মুড নিয়ে হেঁকে বলি পাল্কিটা সাজারে।

 

*নিরঞ্জন দেব

 

ফেস্টুনেতে কেষ্ট বাবুর

চিত্র ছিল আঁকা 

লম্বা ঠোঁট লম্বা নাক

চোখটা কিছু বাঁকা। 

তুড়ি মেরে ভুঁড়ি নাচান

নাচান পুলিশ দারোগা 

কালো টাকা ছিটিয়ে বলেন

যা খুশি তা করেগা। 

ফেস্টুনেতে কেষ্ট বাবুর 

সবকিছু আজ ফাস্

এখন বুড়ো কেষ্ট বাবুর

জেলখানাতে বাস।

 

*আলতাফ আলী হাসু (১৯৫০--২০০০)

 

শত্রুদের শত্রুতার কোথায় উৎপত্তি 

মহাজনী কায়দা দেখো দরদ একরত্তি। 

বন্ধু সেজে ছুরি হানো দেশটা উৎকর্ণ

ধর্ম বিভেদ বাইরে শুধু রক্ত একই বর্ণ।

রক্ত ঝরায় বিভেদ নীতি সমাজ করে খণ্ড 

ফাঁকা বুলির গোত্রটানে কূপমণ্ডূক ভণ্ড। 

আতঙ্কিত সভ্যতা, শিল্প আর কৃষ্টি 

সাধারণকে করতে হবে এর প্রতিরোধ সৃষ্টি। 

 

*জহুরুল আলম ঝরা

 

বর্গি এলো বর্গি এলো 

আগল তুলে দে

দেখ্ চেয়ে দেখ্ ভরা গোলায়

আগুন জ্বলেছে। 

ছোট্ট খোকন বললো হেঁকে 

আগুন লাগায় কে

তোরা সবাই ঘরে ঘরে 

শান্তি এনে দে।

 

*মাহমুদ হাসান ১৯৫৫--)

 

সাবাস দালাল সাবাস

লোক দেখানো দেখাস

তোরাই ভাষার প্রেমিক

দেশ গড়ানোর শ্রমিক

আর কতদিন করবি

মরবি এবার মরবি।

শোনরে দালার শোন

কান পেতেরে শোন

মায়ের ভাষা ছাড়া

কইবে কথা যারা

ইংরেজি সব বুলি

উড়িয়ে দেবো খুলি

ছাড়রে দালাল ছাড়

সখের ভাষা ছাড়

ধররে দালাল ধর

মায়ের ভাষা ধর

ভাঙবো নইলে ঘাড়

কণ্ঠনালীর হাড়।

 

 

*সরোদ রহমান 

 

লাল ফুলটা যখন শেখায়

দেশকে ভালোবাসতে 

নতুন ভোরের সূর্যালোকে 

সবার কাছে আসতে। 

লাল ফুলটা ছোট্ট শিশুর 

সবুজ অবুঝ ভাষা 

দু'চোখেতে শিমুল ডালে

আগুন দেখার আশা।

লাল ফুলটা একুশ ভোর

উজ্জ্বল প্রদীপ জ্বালায় 

রক্ত দেবার শপথ ভাসে

স্মৃতির আলোর মালায়।

 

নিলুফার বেগম নীলা

 

ছুট্ ছুট্ ছররা

দশ হাঁড়ি ভররা

ছররার তেজেতে 

গড়াগড়ি মেঝেতে 

 

 

রোসমত আলী মনজু (মনজু রহমান, ১৯৫৬--)

 

চম্পা বনে কনকচাঁপা 

শিউলি বনের সনে

ঊষার বনে দমকা হাওয়া

এলোমেলো বইছে মনে।

চড়ুই পাখির ছোট্ট নীড়ে 

বাবুইপাখির নিত্য আসা

কিচিরমিচির শব্দ ক'রে

বোঝায় তাদের মনের ভাষা।

 

 

আইভি চৌধুরী 

 

তাক ধিন্ ধিনতা

নেই কোনো চিন্তা

পেট ভরে বাতাসে

নয়তো গো যা-তা সে

গা ঢাকি যে বাকলে

গরু ভেড়া ছাগলে 

সকলের এক রা

নেই কোনো ফ্যাকড়া।

 

 

আ.খ.ম. শাহজাহান বাচ্চু

 

তোমার আমার এই জীবন 

সবচে প্রিয় সবচে আপন

বলতে পারো কিসে?

সূর্য সেথায় ঝলমলিয়ে 

চাঁদের আলো কলকলিয়ে 

নদীর জলে মিশে।

কি অপরূপ পাগল করা

তার দেহেরই শ্যামল বেশ

জন্মভূমি বাংলা সে যে

মাতৃভূমি বাংলাদেশ। 

 

উল্লিখিত ছড়াগুলিতে শিশু মনোরঞ্জনের প্রয়াস আছে। তবে প্রায় সবগুলি ছড়াই বিষয়বস্তুর দিক থেকে ৫২'র ভাষা আন্দোলন, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতা ও দেশপ্রেম তথা রাজনৈতিক ইস্যুকেই মূখ্য হিসেবে ধারণ করেছে। 'ছররা ছুট্' কেন্দ্রিক ছড়াচর্চা ছাড়াও বগুড়ার কোনো কোনো ছড়াকারের নিজস্ব ছড়াগ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায়। 

 

বিংশশতাব্দীর শুরুর দিককার বিশিষ্ট ছড়াকার সুজ্জাত আলী। ১৮৮০ সালে তিনি বগুড়া জেলার তেলীহারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর একমাত্র ছড়ার বই 'চাঁদের হাট'। আবদুল মান্নান সৈয়দ, আবিদ আজাদ ও শাহাবুদ্দীন নাগরী সম্পাদিত "বাংলাদেশের ছড়া"(১৯৮৮) গ্রন্থের দীর্ঘ ভূমিকায় এই 'চাঁদের হাট'-এর কথা বেশ গুরুত্বসহকারে উল্লেখ করা হয়েছে।

বগুড়া জেলায় জন্মগ্রহণ করা আরেক ছড়া রচয়িতা সুলতানা রাহমান (১৯২৪)। ১৯৭৭ সালে মুক্তধারা (স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ),ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর ছড়াগ্রন্থ " কাকের ছা বকের ছা"। সুলতানা রাহমানের এই বইয়ের দু'টি ছড়াংশ নিম্নরূপ - 

কাকের ছা, বকের ছা

কঁচি ঠোঁটে ফাঁক 

সেই ফাঁকে উড়ে বেড়ায় 

টিয়াপাখির ঝাক।

টিয়াপাখির মুখেমুখে 

তোমরা শিখাও বোল,

বোল শিখাতে মায়ের ভাষা

মিষ্টি কলরোল। (মায়ের ভাষা ১)

 

ইলশেগুঁড়ি, ইলশেগুঁড়ি 

বৃষ্টি কেমন ঝরছে 

খোকার পাতে একটা দু'টো 

ইলিশ ভাজা পড়ছে। 

ইলশেগুঁড়ি সরষে বুড়ি

হলুদ বরণ রঙখানা

খুকুর মুখে সুড়সুড়ি দেয়

চুমকুড়িতে নেই মানা।

 

কবি, ছড়াকার, গল্পকার, ঔপন্যাসিক ও শিশু নাট্যকার হাসনা আকরাম (১৯৩৩--)-এর বিখ্যাত ছড়াগ্রন্থ 'ছবি দেখে ছড়া'র প্রথম প্রকাশ ১৯৭৮, দ্বিতীয় প্রকাশ ১৯৮২ এবং তৃতীয় প্রকাশ ১৯৮৯ সালে। বইটির দ্বিতীয় সংস্করণের প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জা করেছিলেন বগুড়ার প্রখ্যাত ভাস্কর খন্দকার আমিনুল করিম দুলাল। 'ছবি দেখে ছড়া' থেকে একটি ছড়া। 

 

অবুঝ শিশুর সবুজ মন

খেলছে খুকু সারাক্ষণ 

আমের বোঝা দুলছে ডালে

মনটা নাচে নেবার তালে

ইলিশ মাছের গন্ধে

মন ভরে আনন্দে 

 

ঈগল পাখি উড়ে যায় 

মেঘের ডাকে ভয় পায়।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর ও বিশিষ্ট রম্যলেখক লুৎফর রহমান সরকার (১৯৩৪--২০১৩)-এর জন্ম বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার ডেমাজানি এলাকায়। বাংলা ছড়াসাহিত্যে তাঁর অবদান অসামান্য। সালেম সুলেরী, আবদুল মান্নান সৈয়দ-আবিদ আজাদ-শাহাবুদ্দীন নাগরী, আহমদ মতিউর রহমান, গোলাম কিবরিয়া, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, আহমদ সাকী, রাশেদ হোসেন, এখলাস উদ্দিন আহমদ ও লুৎফর রহমান রিটন সম্পাদিত বিভিন্ন ছড়া-পত্রিকা ও সংকলনে লুৎফর রহমান সরকারের অনেক ছড়া প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয় ছড়াগ্রন্থ 'টিয়ে পাখির বিয়ে' থেকে এখানে একটি ছড়া তুলে ধরা হলো।

 

টিয়ে পাখির বিয়ে 

 

টিয়ে পাখির বিয়ে হবে 

সাজতে বসেছে 

লাল টুক্ টুক্ গায়ে অনেক 

গয়না পড়েছে। 

আলতা দিয়ে পা দু'টি তার

রাঙা করেছে, 

তাইনা দেখে ময়না পাখি 

গান যে ধরেছে। 

গাছের ডালে কাঠবিড়ালি 

নাচতে লেগেছে, 

নিচে ব'সে নেংটি ইঁদুর 

ঢোলক ধরেছে। 

হুতুম পেঁচা চোখটি বুজে

ভাবতে লেগেছে, 

কনে যে তার টিয়ে পাখি

বড়ই সেজেছে। 

 

বগুড়ায় জন্মগ্রহণকারী বৃটেন প্রবাসী কবি, গাল্পিক, ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক সালেহা চৌধুরীর (১৯৪৩ --) ছড়ার বই 'জুডাস এবং তৃতীয় পক্ষ'। বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে। এই বইয়ের একটি ছড়া--

 

সমব্যথা

 

রহিম মিয়ার একজোড়া বউ

মাঠে লাঙ্গল টানে

দুপুর রাতে রহিম মিয়া

মাঠের কাজে নামে।

দিনের বেলা বন্ধ বাড়ি 

শরিয়তি শিক্ষা করে রহিম মিয়ার নারী। 

হঠাৎ হঠাৎ চেলা কাঠে

পিঠে কালশিরা 

মাথার ব্যথা রক্তবমি 

হায়রে আল্লার কিরা।

দুই নারীতে যখনতখন 

গলা ধ'রে কাঁদে

দুই সতীনে এমন ভাব

বিশ্বলোকে ভাবে।

 

* বিংশ-শতাব্দীর সত্তর দশকের উল্লেখযোগ্য ছড়াকবি আলতাফ আলী হাসু (১৯৫০ -- ২০০০)। তাঁর প্রথম প্রকাশিত ছড়া সংকলন 'নির্বাচিত ছড়া'(২০০০) এবং দ্বিতীয় ছড়াগ্রন্থ 'নড়নচড়ন হালকা গড়ন'(বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, ঢাকা-২০০৪)। আ.খ.ম. শাহজাহান বাচ্চু, আহমদ মতিউর রহমান, জোবেদা খানমসহ অনেক সম্পাদকের পত্রিকায় তাঁর ছড়া প্রকাশ পেয়েছে। আলতাফ আলী হাসুর ছড়া নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন উদয়ন চৌধুরী, বেলাল চৌধুরী, আমিনুল ইসলাম বেদু, আহমদ ছফা, আখতার হুসেন, মুনতাসীর মামুন, নূহ-উল-আলম লেনিন, মোরশেদ শফিউল হাসান, সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ, ফরিদুর রহমান, খালেদ বিন জয়েন উদ্দিন এবং মাহমুদ উল্লাহর মতো গুণী মানুষেরা। তাঁর একটি ছড়া পড়ে নেয়া যাক--

 

রাজকন্যে কমলাবতী

 

রাজকন্যে কমলাবতী 

কখন কী তার হয় যে মতি

চাঁদ তারাদের আদর করে

সূর্যকে কয় বাড়াও গতি।

দেখতে বেজায় চমৎকার 

সেই কন্যের গলার হার

সেই কন্যে যখন কাঁদে

থামায় তাকে সাধ্য কার?

 

*বগুড়ার সত্তর দশকের আরেক শক্তিমান ছড়াকার ও ছড়াপত্রিকা-সম্পাদক জি. এম. হারূন (১৯৫০ --)। তাঁর সম্পাদিত ছড়াপত্রিকা 'ছড়াবাজ'-এর এপ্রিল ২০০২ থেকে জুলাই ২০০২ পর্যন্ত মোট তিনটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। জি. এম. হারূনের ছড়াগ্রন্থগুলি - 'হেই সামালো'(১৯৯১), 'ছড়া বোল'(১৯৯১) ও 'বত্রিশ ভাজা'(২০০২)। তাঁর একটি ছড়া - 

 

নতুন দিনের পাঠ

 

সোনা ধানে ভরা ক্ষেত

সবুজ ঘাসে মাঠ

খুকুর হাতে দিলেম তুলে 

নতুন দিনের পাঠ। 

 

পরবর্তীতে আশি ও নব্বই দশক থেকে বর্তমান সময় নাগাদ বগুড়ায় আরও অনেকেই ছড়াসাহিত্য নিয়ে কাজ করেছেন এবং করছেন। সাজ্জাদ বিপ্লব বের করতেন 'লিমেরিক', আরিফ বখতিয়ার সম্পাদনা করতেন 'ছড়াড্ডা' এবং এ কে আজাদ, রফিক রইচ ও মাহফুজুর রহমান আখন্দের ছড়া নিয়ে এ কে আজাদ সম্পাদনা করেছেন ছড়াসংকলন "ছড়া মাইট"(২০১০) ও "কাঁটাতার" (২০১১)। এছাড়াও আজাদের নিজের লেখা চারটি ছড়ার বই রয়েছে এবং সুগুলি - 'মায়ের আঁচল গাঁয়ের ছায়া"(২০০৯), "ইষ্টি ছড়া মিষ্টি ছড়া"(২০১১), "রক্তে লেখা সূর্য-হাসি"(২০১২), ও "টিন টিনা টিন" (২০১৩)। সাজ্জাদ বিপ্লব ও এ কে আজাদের  একটি ক'রে ছড়া --

 

সাজ্জাদ বিপ্লব (১৯৭১ -) 

 

টোপনের ভাবী

করে নাকি দাবী 

আঁচলে বাঁধা তার

আদরের চাবী।

রিনিদের ভাই

সাহসী যে তাই

পাপ পথ ছেড়ে বলে

সৎ পথে যাই

সুমনের বাবা

খেলে ভালো দাবা

চেক দিতে রাজাকে সে

মেলে দেয় থাবা।

 

এ কে আজাদ (১৯৭৮--)

 

এই শহরে বিগ বহরে

কত্ত কিছু ঘটে যায়,

কখন দেখি সময় পাগল

যত্ত কিছু রটে যায়।

কেউ বা ঘোরে সাতমাথাতে 

কেউ বা ঘোরে খান্দারে,

পিস্তলেরই ডগায় ডগায় 

কেউ বা তোলে চান্দারে।

কার হাঁকিয়ে কেউ বা চলে

ফুলিয়ে বুকের ছাতি

পয়সাভাবে কারোর আবার 

দিবসটা হয় রাতি।

 

নব্বই-দশকের কবি খৈয়াম কাদের-এর (১৯৬৩) ছড়াগ্রন্থ "ছড়া ছড়া ছড়া"। তাঁর দু'টি ক্ষুদ্র ছড়া–

 

একুশ সেরা গল্প 

 

একুশ নিয়ে অনেক কথা, একুশ সেরা গল্প

একুশ হলো সুর-লহরী তবু যেনো অল্প

একুশ আমার শিল্পকলা, একুশ মহাকাব্য 

একুশ হলো মূল অভিধান সবার কাছে শ্রাব্য।

 

দ্বন্দ্ব বড় মন্দ কাজ

 

দ্বন্দ্ব বড় মন্দ কাজ আর করো না ভাই

জাতপাত ভুলে এসো এক সুরে গান গাই,

সব মানুষই সমান রে ভাই জগত-সেরা সৃষ্টি 

তাদের নিয়ে করো না আর কোনো অনাসৃষ্টি। 

 

বগুড়ায় হালকালের জনপ্রিয় ছড়াকার আমির খসরু সেলিম। সেলিম খুব পরিশ্রমী সাহিত্য সংগঠকও বটে। সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের অসংখ্য মানুষের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এসময়ের বাংলা-ছড়া জগতে সেলিমের পরিচিতি বেশ বিস্তৃত। তাঁর ছড়াগ্রন্থের নাম " এইটা ছড়ার বই"। সেলিমের একটি ছড়া -- 

 

আমি যদি হাতি এঁকে 

জুড়ে দেই ডানা

সেই হাতি উড়ে যাক 

নেই কোনো মানা।

আমি যদি ফুল এঁকে 

জুড়ে দেই পা

ফুল তুই হেঁটে হেঁটে 

বেড়াতেই যা।

বড়দের কথা শুনি 

কতো কড়া কড়া 

আঁকবার খাতা থাক

স্বাধীনতা ভরা।

 

পরিশ্রমী শিশু সংগঠক আব্দুল খালেক। একুশ শতকের গোড়ার দিক থেকে তিনি 'কুঁড়ি' নামে একটি শিশু-পত্রিকা প্রকাশ করছেন। এতে ছড়াই বেশি ছাপা হয়। তাঁর একটি ছড়া-- 

 

বিল্লি হলো বাঘ

 

বিল্লি নাকি জেদ ধরেছে 

মিঁয়ো মিঁয়ো ব'লে

সারা পাড়া বেড়াতে চায় 

চড়ে খুকির কোলে। 

ধমক দিলে রাগ করে না

মিটিমিটি হাসে

বকা দিলে অভিমানে 

খুকখুক্ কাশে।

তার ভাষা যে কেউ বোঝে না

ওই খোকারা ছাড়া 

পথের বিল্লি নিলো ঘরে

দুষ্টু ছেলে যারা।

 

আজিজার রহমান তাজ একজন নিবেদিতপ্রাণ সাহিত্যসেবী। প্রায় তিন যুগ ধ'রে তিনি ‘মল্লিকা’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা ক’রে চলেছেন। কবি তাজ অনেক ছড়াও লিখেছেন।  তাঁর একটি ছড়া - 

 

চকোলেট 

 

যত জল দাও মাথায় 

ঠাণ্ডা হবে না,

কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা দাও

একটুও ছোঁবে না।

গোস্বা বাড়বেই 

যত হবে লিট

নিমিষেই মিটমাট 

পেলে চকোলেট। 

 

বগুড়ায় আরও অনেক ছড়াকার রয়েছেন যাঁদের কারোর কারোর ছড়ার বই আছে, কারোর কারোর নেই। কিন্তু বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাঁদের ছড়া প্রকাশিত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। এঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্যরা হলেন -- ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়া কবি কে. এম. শমশের আলী (১৯০৭-১৯৯৮), শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ডা. কসির তালুকদারের কন্যা জেব-উন-নেসা জামাল (১৯২৬-১৯৮৫), মনোজ দাশগুপ্ত (১৯৪৯-১৯৯৭), আব্দুর রশীদ, আবদুস সাত্তার বগুড়ী(১৯৫১--), দেওয়ান সায়েদুর রহমান ভিটু, কাজী রব, রায়হান রাহমান, খন্দকার বজলুর রহীম, রতন খান, কমল কুমার সরকার, স্বভাবকবি আব্দুর রউফ, শেখ ফিরোজ আহমদ বাবু, এফ. শাহজাহান,  মাহমুদ শাওন, কমল লোদী, আফরোজা মুজিব ঝর্ণা, রুমা রহমান, প্রতত সিদ্দিক, মাসুদ কামাল, রাহমান তাওহীদ প্রমুখ। এই তালিকা থেকে কয়েকজনের একটি ক'রে ছড়া বা ছড়াংশ উপস্থাপন করা হলো।

১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত "এসো ছড়া পড়ি"-তে মুদ্রিত কে. এম. শমশের আলীর একটি ছড়ার অংশবিশেষ –

 

>খুকুমণি 

 

নানান রকম খেলনা নিয়ে 

খেলা করে খানিক

ঘুমিয়ে গেছে সোনা আমার 

ঘুমিয়ে গেছে মানিক।

 

১৯৯৪ সালের জানুয়ারিতে বাংলা একাডেমি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত " ধানশালিকের দেশ"-এ ছাপানো জেব-উন-নেসা জামালের একটি দীর্ঘ ছড়ার কয়েকটি লাইন –

 

>শিংওয়ালা জানোয়ার নাম তার গণ্ডার

ভাবতে পারো কি সে-ই সিটে বসে হোন্ডার, 

চশমাটা চোখে দিয়ে, হাতে প'রে হাত ঘড়ি 

সব্জি-বাজার-পানে ছুট্ দেয় তড়িঘড়ি? 

 

মনোজ দাশগুপ্ত (১৯৪৯-১৯৯৭)

>ডামাডোলের তুলকালামে

যতই ঢাকো পথ

ফাঁদের মন্ত্র ফাঁস হলেই

বেজায় মুসিবত।

 

আবদুস সাত্তার বগুড়ী

 

> বাঘ ভয়

বাঘ এসেছে বাঘ

ভাগ রে সবাই ভাগ

দিচ্ছে ঘাড়ে লাফ

ওরে বাপরে বাপ।

করছো কিসের ভয়

বাঘ তো সেটা নয়

বাঘডাসা নাম ওর

নেই যে তত জোর।

 

রায়হান রাহমান (১৯৫৬--)

 

>স্বর ঝুমঝুম ভাষার ডাক

দিচ্ছে একুশ দিচ্ছে হাঁক

উৎসব নয় আর লড়বো

ভাষার ছড়া গরবো।

 

কাজী রব (১৯৪৭--১৯৯৬)

 

>এইতো আমি তোমার কাছে 

তোমার কাছে জ্যোস্না বুকে

পদ্মাপাড়ের দামাল ছেলে

অবাক ভ্রমর তোমার চোখে।

কাস্তে হাতে মাথাল মাথে

শর্ষে ক্ষেতের লাজুক আলে

দীপ্ত মাঝি এইতো আমি 

নৌকা ডুবির মরণখালে।

 

খন্দকার বজলুর রহীমের (১৯৪৩--) একটি ছড়াংশ

 

>ধাপার মাঠের কাক

ছাড়লো বক বক ডাক

পড়লো সে প্যান্ট কোট

বেঁকিয়ে নিজের ঠোঁট 

দেমাক করে জোর

অহংকারে ওর

অন্য কাকের দল

করবে কী আর বল।

 

আফরোজা মুজিব ঝর্ণা

 

>জাত কুল বংশ নেই জানা প্রয়োজন

মানুষ হবার গুণ যদি করো অর্জন

জানের চেয়ে মান বড় মনে রেখো কথা 

কোনো ভাবেই কারো প্রাণে দিও না ব্যথা।

 

রতন খান (১৯৫৫--)

 

>শান্তি নামের বস্তুটাকে

খুঁজছি আমি অনেকদিন

পেলে তারে হাতের মুঠোয় 

নেচে যেতাম তাধিন্ ধিন্।

তোমরা কি কেউ বলতে পারো

শান্তি বিকায় কোন্ হাটে

খুঁজছি তারে বন-বাদারে

খুঁজছি মাঠে ঘাটে।

 

প্রতত সিদ্দিক 

 

>দুষ্টু ছেলে মিষ্টি মুখে 

যখন তখন ওঠে ক্ষেপে

দাদার মতো মেজাজ তার

কথা বলে মেপে।

মুখখানি তার চিকন চাকন

কচি বাঁশের পাতার মতন

চুল যেনো তার মেঘ-বাগিচা

মুখের কথা টক করমচা!

 

পুণ্ড্র ও বঙ্গ জনপদের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত আরও ক'টি লোকছড়া। -- 

 

লালমনিরহাট 

 

> ঢ্যাঙ্গা ঢ্যাঙ্গা গুয়ার গাছ

   তারো আগাল সরু,

   কয়জন আছেন বরের বংনাই

   আগা হালের গোরু। 

   হালত না নুটুরে পুটুর

   মাইয়াতে না শোতে,

   ভ্যাকরা নাটির গুতা খ্যায়া

   তরতর করি ওঠে। 

 

চাপাইনবয়াবগঞ্জ

 

> আম ধরে থোকা থোকা 

   কলা ধরে কাদি,

   গয়না বেচে বাগান লাগায়

   খেদির বড় দাদি।

   পোতা আসে লাতিন আসে 

   আসে বেটির ব্যাটা,

   কলা বেচে রান্দে বুড়ী 

   তিলভরা পিঠা।

 

পাবনা

 

> আকাশেতে তিন তারা

   আমার নাম শুকতারা। 

   আমি কি কিছু জানি?

   ঠাণ্ডা লেবুর পানি।

   পানির মইধ্যে পোকা

   মণ্ডলবাবু বোকা।

 

টাঙ্গাইল 

 

> আমগাছ তলে ক্যারা গো

   আমি এ্যাডা বেডি গো।

   হাতে কী?

   আম চুক্কা।

   খাও না ক্যা?

   দাঁত চুক্কা।

   হাসো না ক্যা?

   হি হি হি।

 

ময়মনসিংহ 

 

> আবু আমার লক্ষীটি গো

   কোন না বিলে চরে,

   আবু কইরা ডাক দিলে

   উইড়্যা আইয়া পড়ে।

   আয় চান্দ লইড়া

   ভাত দিবাম বাইড়া,

   সোনার কপালে আমার 

   টুক দিয়া যা রে।

 

নেত্রকোনা 

 

> ইছোন বিছোন দর্গা পড়ে 

   মায়ে-ঝিয়ে চাইল কাঁড়ে।

   চাইল কাঁড়োনির ঝি গো

   কার চাইল কাঁড়ো গো?

   জামাই আইছে ঘামাইয়া

   ছাতি ধর নামাইয়া।

   ছাতির উপরে সাপটা

   বুইড়া বেডির বাপটা।

 

ব্রাহ্মণবাড়িয়া

 

> উত্তরে ধমধম দক্ষিণে বিয়া

   ধরছে নারকেল ঝরকি দিয়া।

   ভাঙমু নারকেল মুরা দিয়া

   খাইমু নারকেল চিড়া দিয়া।

শেরপুর (জেলা)

 

> হলদি গাছের জলদি ফুল 

   মামাগো বাড়ি কতদূর? 

   মামা আইলো ঘাইমে

   ছাতি ধইরলাম টাইনে।

   ছাতের মইধ্যে গামছা 

   তিনও মামির তামশা। 

   ছোট মামি রান্দে-বাড়ে

   বড় মামি খায়,

   মাইজলা মামি গাল ফুলাইয়া

   বাপের বাড়ি যায়।

   বাপ করে দূরদূর

   মাও কয় থাইক,

   আমার বেটি বাইচ্যা থাইকা

   ভিক্ষা কইরা খাইক।

 

*চাঁদপুর 

 

> আয় আয় ওরে হাঁস 

   থই থই থই,

   মোড়া দিব, মুড়ি দিব

   আরও দিব খই।

 

এই লোকছড়াগুলি সংগ্রহ করেছেন তারিক মনজুর। প্রকাশিত হয়েছে ১৬ এপ্রিল, ২০২৩ তারিখের দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার সংস্কৃতি-পাতা 'অন্য আলোতে'। তবে ছড়াগুলি এই লেখায় সংযোজন কালে সংশ্লিষ্ট এলাকাসমুহের ভাষা ও উচ্চারণ ভঙির আলোকে কোনোকোনো শব্দে কিছুটা পরিমার্জন ঘটানো হয়েছে।  

 

বগুড়া-অঞ্চলে প্রচলিত ক'টি লৌকিক ছড়া বা লোকছড়া 

 

> গ্যান্দা (গ্যাদা) গেলো মাছ ধইরবার

মাইরা আইনলো পুটি

আয় বুবুরা সবাই মিলা

বটিত বইসা কুটি

মাছ কুটি মাছ কুটি 

গীত গান গাই

রান্ধা হইলে পাটিত বইসা

মজা কইরা খাই।

 

> কলসি নিয়া বউ গেলো

ধইঞ্চা বনের বিলে

মাথার আঁচল তুইলা নিল

মধ্যপাড়ার চিলে

ভয় পাইয়া নতুন বউ

চিল্লা ওঠে জোরে

কলসি থুইয়া ঢুইকা পড়ে 

মামা শ্বইশ্বের ঘরে। 


> ঘুঘু মইলো ঘুঘু মইলো

আলাচাইল খাইয়্যা

ঘুঘুর বিয়াত যামু আমি 

লাল পিরান পইড়া

মায়ে দিলো ত্যাল সেন্দুর 

বাপে দিলো বিয়া

রাজার ব্যাটা নিবার আইলো

নূপুর পায়ে দিয়া।

 

> আইগনা টুনি বাইগনা টুনি টুইনটা টুনির ছাও

যে টুনি পাইদ্যা থাকো আইগ্যা কথা কও

হামি তো কথা কমু না ভাঙ্গা নাও বমু না

মাইচ তলা হাঁড়িডো ফুইট্যা উঠলো নাড়িডো।

 

> ওয়ান টু থ্রি পইড়া প্যালাম বিড়ি 

বিড়িত নাই আগুন পইড়া প্যালাম বাগুন

বাগুনত নাই বিচি পইড়া প্যালাম কেঁচি 

কেঁচিত নাই ধার পইড়া প্যালা হার

হারত নাই লকেট প্যালাম একখান পকেট

পকেটত নাই ট্যাকা চইলা গেলাম ঢাকা

ঢাকাত নাই গাড়ি চইলা আলাম বাড়ি 

বাড়িত নাই ভাত দিলাম একখান পাদ

পাদত নাই গন্ধ হাইস্কুল বন্ধ।

 

> ইচ্চনবিচ্চন দাইড়কা মাছ

পাতে পইলো মাগুর মাছ 

মাগুর মাছ নড়েচড়ে

কাক্কা আইসা ডাক পাড়ে

চলো কাক্কা বাড়িত যাই 

গাইয়ের দুধ দ্যা ভাত 

গাইয়ের নাম হামলা

তুইলা ফালাইলাম চামলা।

 

> আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে

ঢাক ঢোল ঝাঁঝর বাজে

বাজতে বাজতে চললো ঢুলি

ঢুলি গেলো কমলাফুলি

কমলাফুলির টিয়েটা

সূয্যি মামার বিয়েটা। 

 

> মেঘ গুড়গুড় মেঘলা দিনে

ময়ূর ডাকে কেকা,

সবাই লুকায় ঘরের কোণে

ময়ূর নাচে একা।

রংধনু রং ছড়িয়ে 

রঙের লহর তুলে,

মনের সুখে নাচে ময়ূর 

নাচে পেখম মেলে। 

 

>আয় বিষ্টি ঝেঁপে 

ধান দেব মেপে

যা বিষ্টি থেমে যা

লেবুর পাতা করমচা।

 

> খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো

বর্গী এলো দেশে

বুলবুলিতে ধান খেয়েছে 

খাজনা দেব কিসে?

ধান ফুরালো পান ফুরালো 

খাজনার উপায় কি?

আর ক'টা দিন সবুর করো

রসুন বুনেছি। 

 

উপসংহারের সন্নিকটে এসে আবারও বলতে হয় যেকোনো সংস্কৃতির ধ্রুপদী উপকরণ ও অংশগুলি কোনো একক সময় ও একক অঞ্চলে আবদ্ধ থাকে না, থাকতে পারে না। বাস্তবাশ্রিত প্রয়োগ ও প্রযোজ্যতার কারণে এরা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এবং সর্বমহলের সম্পত্তিতে পরিনত হয়। প্রবাদ-প্রবচন ও লোকছড়ার ক্ষেত্রেও বিষয়টি একইরকমের সত্য। খনা ও ডাকের বচন নিখিলবাংলার সর্বাংশে এবং সর্বসমাজে মানুষের মুখে মুখে চলে। ঠিক তেমনই "ধর্মের কল বাতাসে নড়ে, যত গর্জে তত বর্ষে না, সৎসঙ্গে স্বর্গেবাস অসৎসঙ্গে সর্বনাশ, মরণকালে মকরধ্বজ খাইলেও কাজ হয় না, নদীর জল ঘোলাও ভালো জাতের মেয়ে কালোও ভালো, বাইরে ফিটফাট ভিতরে সদরঘাট, বজ্র আঁটুনি ফসকা গিরো, ঢাল নাই তলোয়ার নাই নিধিরাম সরদার, চাল নাই চুলা নাই মুখে বড় কথা, ভাত খাও ভাতারের গীত গাও নাঙের, অল্পবিদ্যায় ভয়ঙ্করী কথায় কথায় ডিকশনারি, সময়ের একফোঁড় অসময়ের নয় ফোঁড়, সাবধানের মাইর নাই, মাইরের উপর ওষুধ নাই, পুঁথিগত বিদ্যা পরহস্তে ধন নহে বিদ্যা নহে ধন হলে প্রয়োজন এবং এরকম আরও অসংখ্য জনশ্রুত প্রবাদ তাম্রলিপ্তি, রাঢ়, গৌড়, পুণ্ড্র, বরেন্দ্র, বঙ্গ, নবদ্বীপ, চন্দ্রদ্বীপ, সমতট, হরিকেল ও কামরূপ থেকে শুরু ক'রে ত্রিপুরা, আসাম, বিহার, ঝাড়খণ্ড ও উড়িষ্যা পর্যন্ত সকল বাঙালির যাপিত জীবনে নিত্য উচ্চারিত উক্তি। লোকছড়ার বেলাতেও বিষয়টি ভিন্ন কিছু নয়। সাজ্জাদ বিপ্লব রচিত 'বগুড়ার ছড়া: চর্চার অর্ধশতক' গ্রন্থে বলা হয়েছে, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরামর্শে গ্রামেগঞ্জে মানুষের মুখেমুখে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রচলিত ছড়াসমূহ সংগ্রহ ক'রে ১৮৯৯ সালে যোগীন্দ্রনাথ সরকার (১৮৬৬- ১৯৩৭) 'খুকুমণির ছড়া' নামে একটি সংকলন প্রকাশ করেন। গ্রন্থটির ভূমিকা লেখেন স্বনামধন্য সাহিত্য-ব্যক্তিত্ব শ্রীরামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে 'সিটি বুক সোসাইটির' পক্ষে কলকাতার 'ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড' থেকে বের হয় এর ষোড়শ সংস্করণ। এই সংস্করণ প্রসঙ্গে প্রকাশক সলিলকুমার গাঙ্গুলি বলেন - "আতাগাছে তোতাপাখি বা হাট্টিমাটিম টিম চেনেন না এমন বাঙালি পাওয়া যাবে না।" তাঁর কথার সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমরাও বলতে চাই - "রবীন্দ্রনাথের 'আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে' বা 'তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে উঁকি মারে আকাশে', নজরুলের 'ভোর হলো দ্বোর খোলো খুকুমণি ওঠরে', জসিমউদদীনের 'আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা আম কুড়োতে যাই', হোসনে আরার 'সফদার ডাক্তার মাথা ভরা টাক তার', সুকুমার রায়ের 'বাবুরাম সাপুড়ে কোথা যাস বাপুরে', মদনমোহন তর্কালঙ্কারের 'সকালে উঠিয়া আমি মনেমনে বলি সারাদিন আমি যেনো ভালোভাবে চলি', 'ঘুম পাড়ানি মাসি-পিসি মোদের বাড়ি এসো' এবং 'আমপাতা জোড়া জোড়া মারবো চাবুক চলবে ঘোড়া', আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা, 'খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এলো দেশে'-এর মতো ছড়াগুলি পুরো বাংলাবিশ্বের কোন্ বাঙালির ঘরে আবৃত্ত হয় না? এমনকি বৃহত্তর বাংলা-ভূখণ্ডের বাইরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেসকল অভিবাসী বাঙালি রয়েছেন তাঁদের ঘরেও এসব প্রবাদ-ছড়ার চর্চা চলে নিয়মিত। বাঙালি সংস্কৃতির এই চিরায়ত এবং শাশ্বত বাস্তবতাকে মনে রেখেই আমরা প্রবাদ-প্রবচন ও লোকছড়া বিষয়ক এই লেখায় বিস্তৃত পুণ্ড্র জনপদের কেন্দ্রভূমি বগুড়া অঞ্চলের কৃষ্টির দিকেই মনোযোগ নিবিষ্ট রাখার চেষ্টা করা হয়েছে; এবং খানিকটা জোরের সাথেই দাবী করা যায় যে, এখানে উপস্থাপিত বেশকিছু প্রবাদ ও ছড়ার আদি উৎসারণ ভূমি বা জন্মস্থল মূলতই পুণ্ড্রঅঞ্চল তথা বগুড়া ও এর আশপাশের অঞ্চলসমূহ। সেসবের মধ্যে নিম্নে উদ্ধৃত লোকপ্রবাদ ও  লোকছড়া ক'টি আমাদের এ দাবীর অনুকূলে বিশেষ নমুনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। 

প্রবাদ --

> যে দ্যাশে যে বাও উবুত কইরা বয় নাও।

> কুইটকার কথা কুটি গ্যান্দা মারে পুটি।

> মুখভরা খলবলানি ঘাই, কোনো কথার আইল-বাতর নাই।

> ও গাঁয়ের দেওয়ান এ গাঁয়ের কী আনছোস ঘোড়া বাতর দ্যা নি।

> ঘ্যাগা নিন্দা করে গলাফুলার, ঝাইঞ্জর নিন্দা করে চালুনের।

> পালের গরু পালানের ঘাস কায় না।

> কে কতো ধনী এক পাতাতেই চিনি।

> সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে। 

> খুটির ভরে খাইটা ডোবে না খাইটার ভরে খুটি ডোবে।

> যত গুড় তত মিঠা, অধিক গুড়ে হয় তিতা।

> বইসা খাইলে রাজার ভাণ্ডারও টুইটা যায়।

> লাভে লোহা বয়, বিনা লাভে তুলাও বয় না।

> ভাত দিয়া মারে, বুদ্ধি দিয়া বাঁচায়।

> আমি কি নাচন জানি না, মাঞ্জার বিষে পারি না।

> কইলে মা মাইর খায়,না কইলে বাবা কুত্তা খায়।

> দরদীর গিলা, আমডা খায়া কুইডা দিলা।

> রান্ধন সয় বাড়ন সয় না।

> এ কথা না ও কথা, দেছে বু এল্যা আলা পাতা।

> উমানি গুমানি সব বুবু সমানই।

> যে আমার কাউনের ভাত, তার আবার ডাইন হাত।

> মাঞ্জার বিষে বইসা বুড়ি ছ্যাচা গুয়া খায়, নিকার কথা শুইনা বুড়ি দৌড় দিয়া যায়।

> পানিত পাদ মাইরা কুমিরেক ভয় দেখাও।

> কম ট্যাকা যার ঘ্যাগা বাগুন তার।

> ভাত নাই প্যাটে সোনার আংটি হাতে।

> ঘোড়া আলার ঘোড়া নাই, চ্যারাগদারের ঘোড়া।

> বাপ দাদার নাম নাই, বাইশ্যা মন্ডলের শালা।

> ছোনের ক্ষ্যাতে বিয়াইছে গাই, সেই সম্বন্ধে খালাতো ভাই।

> আমিও ফকির হইলাম দ্যাশেও আকাল পইলো।

> চ্যাঙরা কালের ব্যাটা বুড়া কালের ট্যাকা।

> সারাদিন আলেডালে রাইত হইলে কার্পাস ঢলে।

> নরম মাটি পাইয়া ঘুগরা ওঠে ধাইয়া।

> নাপিত দেখলে নরুল বাড়ে।

> ভাতার গেছে পাবনা, আমার কিসের ভাবনা।

> সারা রাত সাপ মাইরা ব্যানা দেখে কলার ছ্যাতর।

> আছে গরু না বয় হাল, তার দুঃখ চিরকাল।

> কলা চোরের মাথায় ফাতরা ওড়ে।

> দুই দিনের বৈরাগী ভাতেক কয় অন্ন।

> সোনার আংটি ব্যাঁকাও ভালো।

> কাঙ্গালের কথা বাসি হইলে ফলে।

> বান্দির হাতেপায়ে ধরি, নিজের কাম হাসিল করি।

> ম্যাম্বর কচে চাচি হামি কী আর আছি।

 

ছড়া --

> ও-লো লো কালবাদুরের ছাও

কালের পানি খাইও না কলসি আইনা দেও;

কলসির মধ্যে গোমা সাপ গমগম করে

তাই দেইখা বুড়া-ব্যাটা দাঁড়ি মোচর পারে।

 

> যায় বাঘা বনে

খায় আপন মনে

খায় আর কামড়ায়

দুই চোখ করমড়ায়।

দুই কানে দুই মুলা

ধান বাইর কর কুলা কুলা।

(হরগোপাল দাসকুণ্ডু)

 

> ছিকা লড়ে ছিকা চড়ে দুদ্দুরাতে ট্যাকা পড়ে

একটা ট্যাকা পাল্যাম নারে ব্যান্যার বাড়িত গেলাম নারে,

ব্যান্যার বাড়িত ঘুঘুর ভাঁসা একেক ভাঁসা নও নও ট্যাকা

নও ট্যাকা দিয়া কিনলাম গাই

গাইয়ের নাম মোনামুনি 

দুধ দেয় আঠারো হাঁড়ি। 

রাজা খায় প্রজা খায়

কত্ত দুধ ঢেইয়ে যায়।

(হরগোপাল দাসকুণ্ডু)

 

> মাও লক্ষ্ণী দিলো বর

ধান কুলা-দুই বার কর।

ধান দ্যায় না দ্যায় কড়ি

তাক করি লড়িঝড়ি

লড়িঝড়ি রাম রে

সোনার কড়ি বাম রে।

(খোদেজা খাতুন : ১৯৭০:১২৭-১২৮)

 

> সাত বামনের সাত ন্যাট

বুড়া বামনের হাঁড়া প্যাট

হাঁড়া প্যাটত মারমু গুঁড়ি 

ছেলে বাড়ালো আড়াই কুড়ি 

ছেলের নাম আখাল গোপাল

বুড়ার নাম বুড়া গোপাল

বুড়ির নাম ল্যাজকাটা ডোমরি।

(হরগোপাল দাসকুণ্ডু:১৩১৮:৩৯০-৩৯১)।

 

পুরো লেখাটি জুড়ে যেসকল তথ্য, তত্ত্ব, উপাত্ত, উদ্ধৃতি এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়েছে সেসবের নির্যাসরূপে সবশেষে বলা যায়, বগুড়া ও বৃহত্তর পুণ্ড্রঅঞ্চলের একান্ত সম্পদের নমুনা হিসেবে উপসংহারের উপান্তে প্রদর্শিত লোকপ্রবাদ ও লোকছড়াগুলিরও কোনো কোনোটি হয়তো বাংলাবিশ্বের অন্যকোনো অঞ্চলেও প্রচলিত থাকতে পারে। সুতরাং বাংলাভাষা ও বাংলা সংস্কৃতির সকল ঐতিহ্য পুরো বাংলা-ভূবণের যৌথ এবং সমন্বিত সম্পদ বলেই আমাদের চূড়ান্ত বিশ্বাস। 

                      ------

রচনাকালঃ মে, জুন - ২০২৫

 

তথ্য, তত্ব ও ভাবোৎস:

> প্রবাদের উৎসসন্ধান: সমর পাল: শোভা প্রকাশ, ঢাকা: ২০১১

> লোকসাহিত্যের কাঠামোগত স্বাতন্ত্র্য পূর্ব বগুড়া: বেলাল হোসেন: বাংলা একাডেমি, ঢাকা: জুন- ২০০৮

> বগুড়ার ছড়া: চর্চার অর্ধশতক: সাজ্জাদ বিপ্লব: পাতা প্রকাশ, তোপখানা রোড, ঢাকা: ২১শে বইমেলা - ২০১৭

> বাংলাদেশের ছড়ায় গণচেতনা (প্রবন্ধ): বিশ্বজিৎ ঘোষ: কালি ও কলম

> লৌকিক ছড়া প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ): ড. মন্টু বিশ্বাস

> সমৃদ্ধ জনপদ ধ্রুপদি ধুনট, প্রকাশক: উপজেলা নির্বাহী অফিসার, ধুনট, বগুড়া-২০২৫

> কাজিপুর উপজেলা ডায়েরী-২০১৯

> দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার সংস্কৃতি-পাতা: ১৬ এপ্রিল, ২০২৩: লোকছড়া সংগ্রাহক-তারিক মনজুর

> ইন্টারনেট 

> লেখকের নিজস্ব প্রাথমিক অনুসন্ধান, পর্যবেক্ষণ ও ভাব-চিন্তন।।



অলংকরণঃ তাইফ আদনান