নারী শিক্ষার অগ্রদূত ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। সমাজের অর্ধেক অংশ নারীকে বাদ দিয়ে সমাজের উন্নতি করা যায়। —এই ছিল তার বিশ্বাস । তাই কেবল ছেলেদের শিক্ষাই নয় মেয়েদের শিক্ষার জন্য বিদ্যাসাগরের চেষ্টা ছিল প্রবল। ভারতীয় উপমহাদেশে এক সময সমাজপতিদের প্রচলিত বক্তব্য ছিল যে, মেয়েরা লেখাপড়া শিখলে বিধবা হয়। আসল কথা হল যে, মেয়েরা লেখাপড়া শিখলে তাদের নিয়ম, নীতি, শাস্ত্রবিধান ইত্যাদি দিয়ে তাঁদেরকে বোকা বানিয়ে রাখা যাবেনা। ফলে তাদের অজ্ঞান ও মূর্খ রাখাটাই বুদ্ধির কাজ বিবেচনা করতেন সেই সময়ের সমাজফতরা । অথচ খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০-৩০০তে রচিত পাণিনীর ব্যাকরণেও স্ত্রীশিক্ষার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া “উপাধ্যায়া, “আচার্যা” শব্দদুটি প্রমাণ করে সেকালে নারীরা শিক্ষকতাও করতেন। প্রাচীন ভারতে গার্গী, মৈত্রেয়ী, অপালা এদের মতো বিদুষী নারীদের নামও সমুজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। বৌদ্ধযুগেও নারীশিক্ষার প্রসার ঘটে। শীল ভট্টারিকা কর্ণাটের মহিলা কবি বিজংকারের প্রতিভার কথা বলেছেন । মধ্যযুগে মুসলমান সমাজে মেয়েদের প্রথম স্তরে আরবি ফার্সি শিক্ষা দেওয়া হত। আবুল ফজলের রচনায় মহিলা কবিদের কথা পাওয়া গেছে। বাবরকন্যা গুলবদন লিখেছিলেন “হুমায়ূন নামা”। মধ্যযুগে হিন্দুসমাজের উল্লেখযোগ্য শিক্ষিত নারী ছিলেন চাঁদবিবি। এছাড়া মঙ্গলকাব্যে ও ময়মনসিংহ গীতিকাতেও শিক্ষিত মেয়েদের তথ্য পাওয়া গেছে। কবি চন্দ্রাবতী সেই সময়ের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য কবি । অর্থাৎ ভারতবর্ষে মেয়েদের, বিশেষ করে উচ্চবর্ণের সমাজের মেয়েদের শিক্ষার বিষয়টি দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে বিদেশি শাসনগ্রস্ত হিন্দুসমাজ ধর্মের নামে নানা সংস্কারের বেড়াজালে নিজেদের সুরক্ষিত করার জন্যে যেভাবে অনুশাসন আরোপ করা শুরু করে, তাতে প্রথমেই কোপ পড়ে মেয়েদের স্বাধীনতায় এবং অনিবার্যভাবে তাদের শিক্ষায়। তারা হয়ে পড়ে অন্তঃপুরবাসিনী। এরপর একে একে বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, সতীদাহের মতো অভিশাপ নেমে আসে মেয়েদের জীবনে। ১৯ শতকের নবজাগরণ যখন যুক্তিবাদ ও সংস্কারমুক্তির পথে পা বাড়াল রামমোহন, বিদ্যাসাগর তখন অবশ্যম্ভাবী হয়ে স্ত্রীশিক্ষার প্রয়োজনটিও।
বিদ্যাসাগরকে শাস্ত্র ঘেঁটে প্রমাণ করেছিলেন বিধবার পুনর্বিবাহ অশাস্ত্রীয় নয়, ঠিক তেমন ভাবেই আবারও মহানির্বাণ তন্ত্রের একটি শ্লোক তুলে নারীশিক্ষা বিষয়টিরও শাস্ত্রীয় বিধান দেখিয়ে দিলেন। ১৭৬০ সালে মিসেস হোজেস নামে এক বিদেশিনী মিশনারীদের সহায়তায় প্রথম একটি বালিকা বিদ্যালয় গড়ে তোলেন। তারপরে ১৭৮৯ সালে ও ১৭৯২ সালেও বিদেশিনীদের দ্বারা আরো দুটি স্কুল স্থাপিত হয় মেয়েদের জন্যে। তবে এই স্কুলগুলিতে মূলতঃ বিদেশী বালিকারাই পড়াশনা করত। বাঙালি বাড়িতে অভিজাত পরিবারে মেয়েদের বাড়ির ভেতরেই লেখাপড়ার চল ছিল অবশ্য। কিন্তু বাঙালি সাধারণ ঘরের মেয়েদের পড়াশোনার জন্যে কোনো স্কুল তখনো গড়ে ওঠেনি।
১৮১৪ সালে ব্যাপটিস্ট মিশনের অধীনে উল্টোডাঙায় অবৈতনিক বালিকা বিদ্যালয় স্থাপিত হল বাঙালি মেয়েদের জন্যে। ১৮১৭ সালে রাজা রাধাকান্ত দেব প্রতিষ্ঠিত “Calcutta School Society”র অধীনে কয়েকটি স্কুলেও ছোট ছোট মেয়েদের শিক্ষা দেওয়া হত ছেলেদের সঙ্গে।
১৮৪৭ সালে কলকাতার উপকণ্ঠে বারাসাতে তৈরি হল বাঙালি পরিচালিত প্রথম বালিকা বিদ্যালয়। তার পুরোভাগে ছিলেন কালীকৃষ্ণ মিত্র, নবীনকৃষ্ণ মিত্র ও প্যারীচরণ সরকার। এই কাজে সক্রিয় যোগদান না থাকলেও পূর্ণ সমর্থন ছিল যুবক বিদ্যাসাগরের। এই বিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রীও তাঁর স্নেহভাজন কুন্তীবালা। ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে বেথুন সাহেব যখন শিক্ষাপরিষদের সভাপতি ছিলেন তখন থেকেই বিদ্যাসাগর তার সহকর্মী হিসাবে কাজ করেন। ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে মে মাসে বেথুন সাহেব কয়েকজন বাঙালি নেতাদের সাহায্যে মেয়েদের শিক্ষার জন্য অবৈতনিক স্কুল স্থাপন করেন। পরবর্তীকালে তা বেথুন স্কুল নামে পরিচিত। ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে বিদ্যাসাগর এই স্কুলের দায়িত্ব নেন। এই বিদ্যালয়ের দায়িত্ব পেয়ে তিনি বন্ধুবান্ধব ও পরিচিত ভদ্রলােকদের বেথুন স্কুলে নিজ নিজ কন্যাদের পাঠাতে অনুরােধ করেন। তার অনুরােধের ফলে পণ্ডিত তারানাথ বাচস্পতি, শম্ভুনাথ পণ্ডিত, হরদেব চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ অভিজাত ব্যক্তিগণের কন্যারা এখানে ভর্তি হয়। বেথুন স্কুল পরিচালনায় যােগ্যতা ও কৃতিত্বের পরিচয় দেন বিদ্যাসাগর।
তিনি বিশ্বাস করতেন স্ত্রীরা শিক্ষিত ও জ্ঞানসম্পন্ন হলে শিশু সন্তানগণকে শিক্ষা দিতে পারবেন। স্ত্রী ও কন্যাগণের মনােবৃত্তি প্রকৃতরূপে মার্জিত হলে সকল কার্যের অনুষ্ঠান সুচারুরূপে সম্পাদিত হবে নারীশিক্ষার বিস্তার। বিদ্যাসাগর শুধু বাংলা তথা ভারতের কলকাতায় নারীশিক্ষার প্রতি গভীর আগ্রহ সৃষ্টি করেছিলেন তা নয়। বাংলার পল্লী অঞ্চলে নারীশিক্ষার ক্ষেত্র প্রস্তুত ও বিস্তার করেছিলেন। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে বিদ্যাসাগর নিজে জৌন গ্রামে একটি বিদ্যালয় স্থাপন করেন। বিদ্যাসাগর আশা করেছিলেন যে, বিদ্যালয়গুলি ভারত সরকারের আর্থিক সহায়তা পাবে। কিন্তু ভারত সরকার জানিয়েছিল যে—বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত বালিকা বিদ্যালয়গুলির জন্য কোনাে স্থায়ী অর্থসাহায্য দিতে পারবে না। তখন বিদ্যাসাগর বিদ্যালয়গুলির আর্থিক সমস্যা সমাধানের জন্য নিজেই জনসাধারণের কাছ থেকে অর্থসাহায্য নিয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়গুলি চালানাের চেষ্টা করেন। এক সময় বিদ্যাসাগর স্থির করেন, যে গ্রামের অধিবাসীরা বিদ্যালয়ের জন্য স্থান দিতে পারবেন, সেই গ্রামে বিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে মেদিনীপুর জেলায় ৩টি, বর্ধমান জেলায় ৪টি, হুগলি জেলায় ২০টি, নদিয়া জেলায় ১১টি, মােট ৩৫টি বিদ্যালয় স্থাপিত হয় যেখান মােট ছাত্রীসংখ্যা ছিল ৩৫০০।
উপরােক্ত আলােচনা থেকে বলা যায়, সমাজসংস্কারক হিসাবে বিধবাবিবাহ আইন পাশ, বহুবিবাহ রােধ, বাল্যবিবাহ বিরােধিতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারীদের যা মুক্তি ঘটিয়েছিলেন, তেমনি তিনি নারীশিক্ষার উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন জেলায় মেয়েদের বিদ্যালয় স্থাপন করেছেন, গঠন করেছেন নারীশিক্ষা ভাণ্ডার। তাই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে নির্দ্বিধায় বলা যায় নারীশিক্ষা প্রসারের অগ্রদূত।
অলংকরণঃ তাইফ আদনান
