জলধি
/ প্রবন্ধ
/ আশাপূর্ণা দেবী : জ্ঞানপীঠ পুরস্কার প্রাপ্ত লেখিকা
আশাপূর্ণা দেবী : জ্ঞানপীঠ পুরস্কার প্রাপ্ত লেখিকা
ব্যক্তিজীবনে আশাপূর্ণা দেবী ছিলেন নিতান্তই এক আটপৌরে মা ও গৃহবধূ। যিনি পাশ্চাত্য সাহিত্য ও দর্শন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞা ছিলেন। বাংলা ছাড়া দ্বিতীয় কোনও ভাষায় তার জ্ঞান ছিল না। বঞ্চিত হয়েছিলেন প্রথাগত শিক্ষালাভেও। যে নারীদের, আমাদের তথাকথিত সমাজ যুগ-যুগান্ত থেকে উপেক্ষিত করে আসছে তাদের মনের অন্দরের কথাই লেখিকা মহাশয়া নিজ রচিত নানান কাহিনীতে তুলে ধরেন। একাধারে তিনি ছিলেন ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার এবং শিশুসাহিত্যিক। বিভিন্ন ধরণের ঘটনার সমাবেশকে অঙ্গীকার করে, তিনি যে ভাবে নিজ প্রতিবাদী সত্তার বহিঃপ্রকাশ করেন তার তুলনা কোনো ভাবেই চলেনা। তিনি নিজ লেখনীর জোড়ে স্বতন্ত্রতার বিশেষ সতন্ত্রতার দাবিদার। একজন গৃহবধূ হয়েই তাঁর সাহিত্যের যাত্রার আরম্ভন হয়। পাশ্চাত্য সভ্যতা অথবা পাশ্চাত্যের বিষয় সম্মন্ধে আশাপূর্ণা দেবী ছিলেন নিতান্তই অনভিজ্ঞা কিন্তু তবুও তাঁর চিন্তন শক্তি ছিল প্রখর। এই চিন্তন শক্তিকে কাজে লাগিয়েই তিনি,নিজের নানান ধরণের গৃহকর্মের মাঝে সময় বের করে সাহিত্য রচনায় প্রবৃত্ত হন।
লেখিকার অন্তরদৃষ্টি ও পর্যবেক্ষণ শক্তি ছিল অতুলনীয়। প্রথম প্রতিশ্রুতি – সুবর্ণলতা – বকুল কথা এই তিনটি উপন্যাস হলো তাঁর রচিত ত্রয়ী উপন্যাস যার জনপ্রিয়তা আজও অটুট রয়ে গিয়েছে। বলাবাহুল্য বাংলা সাহিত্যে এই রচনা তিনটিকে বিশ শতকের প্রেক্ষিতে শ্রেষ্ঠ হিসেবে গন্য করা হয়। উত্তর কলকাতার মাতুললয়ে আশাপূর্ণা দেবীর জন্ম হয় ১৯০৯ সালের ৮ ই জানুয়ারি। মৃত্যু বরণ করেন ১৩ জুলাই ১৯৯৫ সনে।তাঁর পিতা ছিলেন হরেন্দ্রনাথ গুপ্ত এবং মাতা ছিলেন সরলাসুন্দরী দেবী। তাদের আদিনিবাস ছিল হুগলী জেলার বেগমপুরে। এবং ১৯২৪ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয় কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা কালিদাস গুপ্তের সাথে। সে যুগে তাঁর পিতা বিভিন্ন জনপ্রিয় পত্রিকায় ছবি আঁকতেন, তিনি ছিলেন প্রফেশানাল কমার্শিয়াল আর্টিস্ট। আশাপূর্ণা দেবীর ছেলেবেলাটা কেটেছে উত্তর কলকাতাতেই। তাঁর ঠাকুমা নিস্তারিণী দেবীর ছিল পাঁচ পুত্র। আশাপূর্ণা দেবী নিজ ঠাকুমার একান্নবর্তী পরিবারেই বড়ো হয়ে উঠতে থাকেন। তবে আনুমানিক পাঁচ বছর বয়সে লেখিকার বাস-ভিটের পরিবর্তন হয়। তাঁর পিতা হরেন্দ্রনাথ আপার সার্কুলার রোডে নিজস্ব বাস ভবন যখন বানান তখনই তাঁর বাসস্থানের পরিবর্তন ঘটে। তবে এতো কম বয়সেও শৈশবের নানান স্মৃতি তাঁর স্মৃতিপটে অক্ষুন্ন ভাবে রয়ে। যার প্রতিফলন আমরা তাঁর বিভিন্ন রচনার মধ্যে প্রত্যক্ষ করি। তাঁর নিজস্বী একটি বয়ান থেকে জানা যায় শৈশবকালে তিনি বেশ ডাকাবুকো ছিলেন। দাদাদের সাথে ক্যারাম খেলা, ঘুড়ি ওড়ানো, মার্বেল খেলা এ সবই তিনি শৈশবকালে করেন। এক সময় লেখিকার ভাগ্যের পট পরিবর্তন ঘটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি চিঠির মাধ্যমে। দুঃসাহসীকতার বসে লেখিকার, রবীন্দ্রনাথের প্রতি লেখা এক চিঠির প্রতিউত্তর পাওয়ার পরেই মূলত তাঁর লেখক সত্তার বিশেষ জাগরণ হয়। আশাপূর্ণা দেবী ছেলেবেলা থেকেই ছিলেন সমস্ত রকম রক্ষণশীলতার উর্দ্ধে। এছাড়া নিজ মাতার আনুকূল্য সাহিত্য পাঠেও ছিল তাঁর বিশেষ আগ্রহ। তবে ছেলেবেলায় খুবই দুঃখজনক ভাবে তাঁর প্রথাগত ভাবে শিক্ষা লাভ করা হয়ে ওঠেনি। তৎকালীন সমজের ন্যায় তাঁর ঠাকুমাও স্ত্রী শিক্ষার বিশেষ বিরোধি ছিলেন, তিনি মনে করতেন বাড়ির কন্যারা স্কুলে পড়তে গেলেই তাদের চারিত্রিক পতন অবসম্ভাবি। সে যুগে যেহেতু যেকোনো কন্যা সন্তানের জীবনের মোক্ষম লক্ষ্য ছিল বিবাহ, সেহেতু তাদের চরিত্রে কোনো রকম কোনো অনাকাঙ্খিত কালিমা থাকা বাঞ্ছণীয় ছিলনা। ফলত নারী শিক্ষার চল সেই সময় বলা বাহুল্য নগন্যই ছিল। অন্যদিকে লেখিকার মাতাভক্ত পিতাও, মাতার সম্মানের কথা মাথায় রেখে নিজ কন্যাকে প্রথাগত শিক্ষা প্রদানে ছিল অপারগ। তাঁর পড়াশোনা যা শেখার সব তাঁর দাদাদের কাছে বিভিন্ন পড়া শুনে আর পত্র-পত্রিকা পড়ে।বাইশ-তেইশ বছরের ছেলের মৃত্যুও তাঁকে সইতে হয়েছিলো! শোক তাঁকে বহু দিন বিপর্যস্ত করে রেখেছিল। কিন্তু তখন ও তাঁর কলম চলেছে। লিখে গেছেন তখনো। লেখালেখির এক জিদ তাঁকে আজীবন তাড়িত করেছে। খুবই অল্প বয়সে নিজ আত্মসংকল্পের জোড়ে নিজের দাদার কাছে পড়া শুনেই তিনি নিজ জ্ঞানের বিস্তার করা শুরু করেন। অন্যদিকে বর্ণপরিচয়ও ছিল তাঁর শিক্ষা গ্রহণের আর এক সঙ্গী। তাঁর মাতা সরলাদেবী ছিলেন সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠিকা এই কারণে নিজ সাহিত্য পাঠের গুন তিনি নিজের সন্তানদেরও প্রদান করেন। এছাড়াও সরলাসুন্দরী দেবী ছিলেন চৈতন্য লাইব্রেরি, জ্ঞানপ্রকাশ লাইব্রেরি ও বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সদস্য সেই সুবাদেই আশাপূর্ণা দেবীর গৃহে গ্রন্থ সম্ভারের অভাব ছিলোনা এবং তাঁর গৃহে সাধনা, প্রবাসী, সবুজপত্র, বঙ্গদর্শন, সন্দেশ ইত্যাদি পত্রিকা সকলের আনাগোনাও ছিল অবাধ। এই কারণেই প্রথাগত শিক্ষার আবেশ তাঁর জীবনে না ঘটলেও,এ সমস্ত পুস্তিকা গুলি পঠন করে তাঁর মাঝে সাহিত্যিক সত্তার বিকাশ ঘটে সার্থকভাবে । আশাপূর্ণা দেবী নিজের সারাটা সাহিত্য জীবন জুড়ে, নানান ধরণের সাহিত্য প্রকরণের আশ্রয় নিয়ে নানান প্রকারের রচনার করে যান। কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস এ সবই তাঁর রচনা সম্ভারের অঙ্গবিশেষ, তবে এ সকল ধরণের প্রকরণের মাঝে আশাপূর্ণা দেবীর রচিত উপন্যাসগুলি বিশেষ স্বতন্ত্রতার অধিকারী। ১৯৪৪ সালে লেখিকা তাঁর প্রথম উপন্যাস লেখেন। কমলা পাবলিসিং এর সম্পাদক বিশু মুখোপাধ্যায়ের তাগিদে তিনি ” প্রেম ও প্রয়োজন “ নামক উপন্যাসটি লেখেন। অল্প পরিসর ও সুতীক্ষ্ণ প্রেক্ষাপট যুক্ত ছোট গল্প লেখার জন্য লেখিকা প্রথম থেকেই বিশেষ জনপ্রিয় ছিলেন । তাঁর প্রত্যেক উপন্যাসেরই মূলে ছিল তৎকালীন সময়ের বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ এবং সেই সমাজেরই মানুষের জীবনযাত্রা। এছাড়া নারীদের কথাও তাঁর উপন্যাসে উপেক্ষিত হয়নি।
এ সব কিছু মিলিয়েই তাঁর রচিত উপন্যাস গুলির মাধ্যমে আমরা এই বিষয়টি খুবই ভালো ভাবে জানতে পারি যে তৎকালীন যুগের সাপেক্ষে,কালের সাথে বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের বাইরের রূপ পরবর্তীত হলেও এর ভিতরের রূপ সেই অদ্দিকালের মতনই রক্ষনশীল রয়ে যায়, এর পরিবর্তন কোনো ভাবেই হয় না। লেখিকা এই রক্ষণশীল মনোভাবের উপর আঘাত হানতেই, নিজ রচিত উপন্যাস গুলিতে এমন কিছু চরিত্রের নির্মাণ করেন যাদের মধ্যে ছিল অতীপ্রাসঙ্গিক প্রতিবাদীভাবের বাহুল্যতা। বাংলা সাহিত্য জগতে আশাপূর্ণা দেবীর প্রায় ২৪২ টির মতন উপন্যাসের অস্তিত্ব বিদ্যমান। এবং এই উপন্যাসগুলি রচনার ক্ষেত্রে লেখিকার লেখনীর কিছু বিশেষ বিচিত্রতা তথা স্বকীয়তা পরিস্ফুট হতে লক্ষ্য করা যায়। তিনি একাই লিখেছেন ২৫০'র বেশী উপন্যাস, ১৫০০ র বেশী ছোট গল্প মতান্তরে ৪ হাজারের বেশী গল্প লিখেছিলেন । শিশু সাহিত্যের উপরেও ৬০টির বেশী বই। তিনি হলেন আশাপূর্ণা দেবী যে আশাপূর্ণা দেবী জীবনে স্কুলে পড়তে যাননি, লেখালেখির জন্য সেই আশাপূর্ণা দেবীকেই চারটি বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রিতে ভূষিত করেছিলো। পেয়েছিলেন ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার জ্ঞানপীঠ । আত্মকথায় লিখেছিলেন, 'ইস্কুলে পড়লেই যে মেয়েরা বাচাল হয়ে উঠবে এই তথ্য আর কেউ না জানুক আমার ঠাকুমা ভালোভাবেই জানতেন, এবং তাঁর মাতৃভক্ত পুত্রদের পক্ষে ঐ জানার বিরুদ্ধে কিছু করার শক্তি ছিলোনা।' অন্য জায়গায় তিনি লিখেছিলেষ, 'ছোটবেলা থেকেই আমার অনুভূতির ব্যাকুলতা আমাকে ভাবিয়েছে, যন্ত্রণা দিয়েছে, আমাকে লিখিয়ে ছেড়েছে…. আমি লিখেছি ঘরোয়া মেয়েদের নিয়ে…. চিরদিনই মনের ভিতরে একটা আপোষহীন বিদ্রোহ ছিল, তাকে যদি নারী মুক্তির পিপাসা বলতে হয়, তাহলে তাই। যদি কিছু বিদ্রোহিণী চরিত্র সৃষ্টি করে থাকি, সেটা করেছি প্রতিবাদ করার মাধ্যম হিসাবেই…।' তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও পর্যবেক্ষণশক্তি তাকে দান করে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখকের আসন।
অলংকরণঃ তাইফ আদনান
