জলধি / পাঠ-পর্যালোচনা / 'দস্তইয়েভস্কির সঙ্গে দ্বিমত' অস্তিত্বের সংকট ও স্বপ্নের ব্যবচ্ছেদ
Share:
'দস্তইয়েভস্কির সঙ্গে দ্বিমত' অস্তিত্বের সংকট ও স্বপ্নের ব্যবচ্ছেদ

গ্রন্থ: দস্তইয়েভস্কির সঙ্গে দ্বিমত

লেখক: হামিম কামাল

প্রচ্ছদ: দেওয়ান আতিকুর রহমান

 

বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায় ফিয়োদর দস্তইয়েভস্কি এমন এক অতিকায় বৃক্ষ, যার ছায়া এড়িয়ে মানুষের মনস্তত্ত্বের অন্ধকার গলিতে হাঁটা প্রায় অসম্ভব। মানুষের ভেতরের পাপবোধ, হীনম্মন্যতা, আত্মধ্বংসের প্রবৃত্তি এবং খণ্ডিত সত্তার যে নিখুঁত ব্যবচ্ছেদ দস্তইয়েভস্কি করেছেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের সমকালীন কথাসাহিত্যের অন্যতম মননশীল লেখক হামিম কামাল তাঁর ‘দস্তইয়েভস্কির সঙ্গে দ্বিমত’ উপন্যাসে সেই ধ্রুপদী রুশ আবহকে কেবল বাংলা ভাষায় ফিরিয়েই আনেননি; বরং দস্তইয়েভস্কির নির্মিত মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোর সঙ্গে এক অভিনব বোঝাপড়ায় লিপ্ত হয়েছেন।

এটি কোনো গতানুগতিক আখ্যান নয়। এটি ১৮৪০ সালের সেন্ট পিটার্সবার্গের (পেতেবুর্গ) পটভূমিতে রচিত এমন এক আখ্যান, যেখানে মানুষের অস্তিত্বের সংকট, স্বপ্নের মোহভঙ্গ এবং চরম নৈরাশ্যের মুখে দাঁড়িয়েও বেঁচে থাকার নিরর্থক অথচ অনিবার্য লড়াইয়ের চিত্র আঁকা হয়েছে। লেখকের নিজস্ব জবানিতে উপন্যাসের শুরুতেই যে দার্শনিক প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয়েছে, তা পুরো উপন্যাসের সুর বেঁধে দেয়।

হামিম কামাল উপন্যাসের শুরুতেই নিজের জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং ব্যক্তিপরিচয়কে ‘নিছক খড়কুটো’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে জীবন কোনো পূর্বনির্ধারিত ছকে বাঁধা নয়, বরং এটি অন্ধভাবে ঘটছে। ফরাসি দার্শনিক রেনে দেকার্তের বিখ্যাত উক্তি I think, therefore I am. (আমি ভাবছি, অতএব আমি আছি)—এই চূড়ান্ত যৌক্তিক অস্তিত্ববাদকে লেখক যেন এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, জগৎ এক ‘সুচারু অন্ধ’। এই অন্ধত্ব যে অনুধাবন করতে পারে, তার কাছে বেঁচে থাকাটা ‘বেড়ালকাঁটা’ বা চরম অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়ায়।

তবুও মানুষ বাঁচে। ‘ভালোবাসার সাধ জাগে’ বলেই সে লজ্জাহীনভাবে বেঁচে থাকে। লেখক এখানে মানবজীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিকে চিহ্নিত করেছেন—জগৎ সরলে জটিল, আর এই জটিলতার কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। নিয়তির এই অন্ধপথে মানুষের বিশ্বাস, অবিশ্বাস, অনুতাপ বা প্রার্থনার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই জেনেও মানুষ তাতে আস্থা রাখে। এই দ্বিচারিতাই মানুষের অস্তিত্বের মূল সংকট। আর এই সংকটেরই মূর্ত প্রতীক উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র দিমিত্রি।

 

দিমিত্রি মিখাইলোভিচ দস্তইয়েভস্কি: এক খণ্ডিত আত্মার আখ্যান

উপন্যাসের প্রধান চরিত্র দিমিত্রির নামকরণেই একটি বড় চমক রয়েছে। সে দস্তইয়েভস্কি পদবির অধিকারী এবং তার মনস্তত্ত্ব ফিয়োদর দস্তইয়েভস্কির ‘নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড’-এর নামহীন প্রধান চরিত্র ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যান’-এর সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।

দিমিত্রি এক দরিদ্র, কেরানি স্তরের চাকরিজীবী। কিন্তু তার মূল সংকট দারিদ্র্য নয়, তার সংকট আদর্শিক এবং মনস্তাত্ত্বিক। দিমিত্রি বই পড়তে ভালোবাসত, লেখকদের মহৎ জীবনের স্বপ্নে বিভোর ছিল। কিন্তু যখন বাস্তবতার ‘ক্ষাত্র যাঁতাকলে’ পড়ে তার স্বপ্ন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়, তখন সে চরম প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে। তার প্রতিশোধ কার ওপর? সেইসব মহৎ লেখকদের ওপর, যারা তাকে ‘মিথ্যা’ স্বপ্ন দেখিয়েছিল। দিমিত্রির ভাষায়ওদের সবচেয়ে বড় পাপ ওরা আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছে। যে স্বপ্ন সত্য নয়, ভেঙে যাবে, সে স্বপ্ন ওরা আমাকে কেন দেখাল? ওদের আমি কোনোদিন ক্ষমা করব না। শাস্তি দেব।

কিন্তু সে লেখকদের কীভাবে শাস্তি দেবে? সে শাস্তি দেয় নিজেকে ধ্বংস করে এবং যারা তাকে ভালোবাসে তাদের ধ্বংস করে। এটি একটি চরম স্যাডোম্যাসোকিস্টিক প্রবৃত্তি। সে যখন পতিতালয়ে লিসার সঙ্গে পরিচিত হয়, তখন লিসাকে সে স্বপ্ন দেখায় নতুন জীবনের, ভালোবাসার, এমনকি একটি অনাগত শিশুর। কিন্তু যখন লিসা সেই স্বপ্নকে সত্যি ভেবে তার কাছে ছুটে আসে, দিমিত্রি অত্যন্ত শীতল ও নিষ্ঠুরভাবে তাকে প্রত্যাখ্যান করে। সে লিসাকে বলে যে সে কেবল তার সঙ্গে ‘খেলেছে’। এই নিষ্ঠুরতার কারণ লিসার প্রতি তার ঘৃণা নয়, বরং ‘আশা’ বা ‘স্বপ্নের’ প্রতি তার ঘৃণা। লিসাকে সে একটি ‘বিশুদ্ধ ইউনিকর্ন’ হিসেবে কল্পনা করেছে। লিসার পবিত্রতা ও আশাবাদ দিমিত্রির নিজস্ব নৈরাশ্যকে আঘাত করে। তাই সে লিসার স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে মূলত সেই লেখকদের বিরুদ্ধেই প্রতিশোধ নেয়, যারা একদিন দিমিত্রিকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল। নিজের ওপর নিজের এই প্রতিশোধের চিত্র সাহিত্যে খুব বিরল।

 

পঙ্কিলতায় ফোটা এক শোকাবহ পদ্ম

লিসা চরিত্রটি উপন্যাসের অন্যতম শক্তিশালী দিক। মাত্র কুড়ি বছরের এক তরুণী, যাকে তার পরিবার ঋণের দায়ে বিক্রি করে দিয়েছে। সে এখন সেন্ট পিটার্সবার্গের এক পতিতালয়ের (ওব্রাস) ‘শ্বেতাঙ্গ দাসী’। কিন্তু এত নিগ্রহ ও পঙ্কিলতার পরও লিসার ভেতরের মানুষটি মরে যায়নি। সে স্বপ্ন দেখতে ভোলে না। তার দাদা ইগর স্ত্রাভিনস্কির ভাষায়—আশা ধরে রাখাই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।

লিসার জীবন ট্র্যাজেডিতে মোড়ানো। প্রথমবার বিক্রি হওয়ার পর সে দেখেছে কীভাবে তার সমবয়সী ইনেসাকে বিদ্রোহ করার অপরাধে মাঝসমুদ্রে ছুড়ে ফেলে হত্যা করা হয়েছিল। এই বিভীষিকা লিসাকে অবদমিত করলেও তার ভেতরের আলো নেভাতে পারেনি। দিমিত্রি যখন তাকে নতুন জীবনের আশা দেখায়, লিসা তার অতীত অভিজ্ঞতা এবং চারপাশের মানুষের (যেমন লোলা পেত্রোভা বা ক্রাসনি) সতর্কতা সত্ত্বেও সেই আশাকে আঁকড়ে ধরে।

সবচেয়ে মর্মান্তিক অথচ মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিস্ময়কর দিকটি উন্মোচিত হয় লিসার একটি নিজস্ব দর্শনের মাধ্যমে। দিমিত্রির দেওয়া স্বপ্নকে সম্বল করে লিসা পতিতালয়ের পৈশাচিকতা জয় করার এক অদ্ভুত উপায় বের করে। সে তার ‘মন’কে ‘শরীর’ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে শেখে। খদ্দেররা যখন তার শরীর ভোগ করে, লিসা তার মনকে দিমিত্রির কাছে গচ্ছিত রাখে। শরীর লাঞ্ছিত হলেও তার আত্মা যেন অক্ষত থাকে দিমিত্রির ভালোবাসার মোড়কে। এই যে চরম আত্মিক শক্তি, এটি লিসাকে দস্তইয়েভস্কির ‘সোনিয়া’ (ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট) চরিত্রটির সমকক্ষ এক ঐশ্বরিক উচ্চতায় নিয়ে যায়। কিন্তু লিসার এই অসীম অভিমান ও বিশ্বাসের বিপরীতে যখন দিমিত্রির নিষ্ঠুর প্রত্যাখ্যান এসে দাঁড়ায়, তখন পাঠকের হৃদয়ও যেন লিসার মতোই খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যায়।

 

চেরনিশিয়েস্কি, রাষ্ট্রযন্ত্র এবং নিহিলিজম

উপন্যাসে কেবল মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বই নেই, সমকালীন রাশিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতার নিখুঁত চিত্রও রয়েছে। এখানে ঐতিহাসিক চরিত্র নিকোলাই ফিওদরোভিচ চেরনিশিয়েভস্কির উপস্থিতি উপন্যাসের মাত্রাকে আরও বিস্তৃত করেছে। বাস্তবে চেরনিশিয়েস্কি ছিলেন রুশ নিহিলিস্ট বা নৈরাশ্যবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা এবং বিখ্যাত ‘হোয়াট ইজ টু বি ডান?’ উপন্যাসের রচয়িতা।

উপন্যাসে চেরনিশিয়েভস্কি একজন বিপ্লবী, যে রাষ্ট্রযন্ত্রের চোখে ফেরারি। দিমিত্রির সঙ্গে তার আদর্শিক বিরোধ থাকলেও তারা একে অপরকে প্রচ্ছন্ন শ্রদ্ধা করে। দিমিত্রি যেখানে চরম নৈরাশ্যবাদী ও আত্মবিধ্বংসী, চেরনিশিয়েভস্কি সেখানে রাষ্ট্রের কাঠামো ভাঙতে উদ্যত এক প্রথাগত বিপ্লবী। তাদের কথোপকথনগুলো বুদ্ধিবৃত্তিক তর্কে ভরপুর। চেরনিশিয়েভস্কির মতে, শিল্প হবে জীবনের নির্দেশক পাঠ্যগ্রন্থ। কিন্তু দিমিত্রি এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে; তার মতে শিল্পকে নির্দিষ্ট কোনো ফ্রেমে বাঁধা যায় না।

অন্যদিকে রয়েছে জার শাসিত রাশিয়ার গুপ্তচর ও আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা। ভ্লাদিমির স্পিরিদোনোভিচ (যিনি ছদ্মবেশে সেমিওন ম্যালকোভিচ) এবং আলেক্সেই জেড্রকভের মতো চরিত্রগুলো রাষ্ট্রের সেই অন্ধ ও নিষ্ঠুর চোখকে তুলে ধরে, যারা যেকোনো বিদ্রোহকে অঙ্কুরে বিনাশ করতে চায়। ভ্লাদিমিরের কাছে চেরনিশিয়েভস্কি যেমন নিকটবর্তী হুমকি, তেমনি দিমিত্রিও তার নিহিলিস্টিক দর্শনের কারণে রাষ্ট্রের জন্য এক দূরবর্তী হুমকি। রাষ্ট্রের এই নজরদারি উপন্যাসের ক্লাস্ট্রোফোবিক (বদ্ধ শ্বাসরুদ্ধকর) পরিবেশকে আরও গাঢ় করে তোলে।

 

এপোলন ও অন্যান্য চরিত্র

দিমিত্রির পরিচারক এপোলন চরিত্রটি রাশিয়ার সাধারণ, অভাবী ও ধর্মভীরু শোষিত শ্রেণির প্রতিনিধি। তার ঈশ্বরনিষ্ঠা তার অস্তিত্ব রক্ষার এক হাতিয়ার। মাসের পর মাস দিমিত্রি তাকে বেতন দেয় না কেবল তাকে দিয়ে অনুনয় করানোর বিকৃত মানসিকতা থেকে। এপোলনের মায়ের তুষারপাতে মৃত্যুর স্মৃতি এবং দীর্ঘকাল আগে হারিয়ে যাওয়া বোনদের কথা উপন্যাসের বিষাদময়তাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। রাস্তায় পতিতাদের দেখে তার মনে যে এক ধরনের ঘৃণা মিশ্রিত করুণার জন্ম নেয়, তা তৎকালীন সমাজের সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন।

পাশাপাশি দিমিত্রির নতুন বস আনাতোলি ভাসিলিয়েভ এবং শৈশবের সহপাঠী ফেরফিচকিন সমাজের সুবিধাবাদী, ক্ষমতালিপ্সু ও চাটুকার শ্রেণির প্রতিনিধি। ফেরফিচকিন এমন এক চরিত্র, যে শৈশবে দিমিত্রিকে নির্যাতন করত এবং আজও ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে। এই চরিত্রগুলো প্রমাণ করে যে, দিমিত্রির চারপাশের পৃথিবীটা আসলেই কত রূঢ় ও অসংবেদনশীল, যা দিমিত্রির ক্ষোভকে এক ধরনের যৌক্তিকতা প্রদান করে।

 

রূপক ও প্রতীকী ব্যঞ্জনা

হামিম কামাল উপন্যাসে চমৎকার সব রূপক ব্যবহার করেছেন। সবচেয়ে শক্তিশালী রূপকটি হলো ‘নীল স্টার্জন’ মাছ। লিসাদের পরিবারের কাছে স্টার্জন একটি প্রাচীন মিথ বা পুরাণের মতো। লিসা যখন দিমিত্রির প্রত্যাখ্যানের ঝুঁকি নিয়েও তার বাড়ির দিকে পা বাড়ায়, তখন রাতের আকাশে সে এক নীল স্টার্জন কল্পনা করে। এই মন্থর, রাজসিক অথচ বিষণ্ণ স্টার্জন যেন লিসারই নিয়তির প্রতীক।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হলো দিমিত্রির কেনা ‘লেখক পরমানন্দের চেয়ার’। নিলামে কেনা এই চেয়ারটি মৃত লেখকদের জগতের প্রতিনিধি, যা দিমিত্রির কাছে বাস্তবের চেয়েও বেশি জীবন্ত মনে হয়। এই চেয়ারে বসেই সে লেখকদের বিরুদ্ধে তার প্রতিশোধের খসড়া তৈরি করে।

 

লেখকের গদ্যশৈলী ও নির্মাণকুশলতা

হামিম কামালের ভাষা অত্যন্ত প্রাঞ্জল, কাব্যিক এবং একইসঙ্গে দার্শনিক ভারে সমৃদ্ধ। বাক্যগঠনের ক্ষেত্রে তিনি যে প্রজ্ঞা দেখিয়েছেন, তা বাংলা উপন্যাসে বিরল। উদাহরণস্বরূপ

দিমিত্রি তার নিজ ঘরে দাঁড়িয়ে থাকলেও, যেন নিজ ঘরে নেই। তবে নিজ স্বরে আছে। এখনো তার মন বিদ্রোহ করে যাচ্ছে... তার হাসি নিজ হৃদয়ের কাছে কান্নার মতন। আর কান্নাগুলো ভিত্তিহীন।

এই ধরনের অন্তর্ভেদী বাক্য চরিত্রের মনস্তত্ত্বকে পাঠকের সামনে নগ্ন করে দেয়। উপন্যাসের দৃশ্যপট নির্মাণ—যেমন, পেতেবুর্গের তুষারঝরা রাত, ইসাবেল নদীর তীরের মৃত কাশবন, কিংবা গ্যাসবাতির আলোয় ফিকে হওয়া অন্ধকার—সবকিছুই এমন নিখুঁতভাবে চিত্রিত হয়েছে যে পাঠক অনায়াসেই ১৮৪০ সালের রাশিয়ায় নিজেকে আবিষ্কার করতে পারেন। গদ্যের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে এক ধরনের বিষণ্ণ মেলানকলি, যা উপন্যাসের থিমের সঙ্গে একদম মানানসই।

 

দস্তইয়েভস্কির সঙ্গে কোথায় এই দ্বিমত

উপন্যাসটির শিরোনাম ‘দস্তইয়েভস্কির সঙ্গে দ্বিমত’ একটি গভীর জিজ্ঞাসার জন্ম দেয়। দস্তইয়েভস্কি তাঁর সাহিত্যে পাপ ও পতনের ভেতর দিয়েও ঈশ্বর, প্রেম এবং আধ্যাত্মিক মুক্তির এক প্রচ্ছন্ন পথ খোলা রেখেছিলেন। ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’-এর রাস্কলনিকভ পাপ করার পরও সোনিয়ার প্রেমের মাধ্যমে পুনর্জন্ম লাভ করে।

কিন্তু হামিম কামালের দিমিত্রি কি সেই মুক্তি পাবে? দিমিত্রি লিসাকে প্রত্যাখ্যান করে যে চরম পাপে নিমজ্জিত হলো, সেখান থেকে উত্তরণের কোনো উপায় কি সে আর খুঁজবে? লেখক হামিম কামাল তাঁর উপক্রমণিকাতেই বলেছেন, এই জগত অন্ধভাবে ঘটছে এবং এখানে অনুতাপ বা প্রার্থনার কোনো ভূমিকা নেই। সম্ভবত এখানেই তিনি দস্তইয়েভস্কির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। দস্তইয়েভস্কির জগতে প্রায়শ্চিত্তের সুযোগ আছে, কিন্তু হামিম কামালের এই বিনির্মিত জগতে দিমিত্রিরা হয়তো চিরকাল তাদের পাতালঘরে নিজেদের সৃষ্ট নরকেই আবদ্ধ থেকে যায়।

লিসার মতো চরিত্ররা যখন সমস্ত অপমান ও বঞ্চনার পরও মনকে শরীর থেকে আলাদা করে বিশুদ্ধ ভালোবাসার এক নতুন সংজ্ঞা তৈরি করে, তখন পাঠকের মনে হয়—সম্ভবত লিসারাই জয়ী। দিমিত্রির মতো তথাকথিত বুদ্ধিবৃত্তিক বিদ্রোহীরা আসলে নিজেদের অহমের কাছেই পরাজিত। দিমিত্রির ভাষায়, সে একশৃঙ্গ বা ইউনিকর্ন হত্যা করেছে। এই নিষ্পাপ একশৃঙ্গ হত্যাই দিমিত্রির চূড়ান্ত আত্মিক মৃত্যু।

হামিম কামালের ‘দস্তইয়েভস্কির সঙ্গে দ্বিমত’ বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সংযোজন। এটি কেবল একটি গল্প নয়, এটি মানবাত্মার এক জটিল ময়নাতদন্ত। যারা দর্শন, মনস্তত্ত্ব এবং ধ্রুপদী সাহিত্যের ছায়া অবলম্বনে রচিত গভীর সাহিত্যপাঠে আগ্রহী, এই উপন্যাসটি তাদের জন্য এক অবশ্যপাঠ্য দলিল। মানুষের ভেতরের শয়তান এবং ঈশ্বরের যে চিরন্তন লড়াই, তা এত নিপুণভাবে খুব কম সাহিত্যেই ফুটে উঠেছে।



অলংকরণঃ তাইফ আদনান