একজন সাহিত্যিক সমাজের অসঙ্গতির শৈল্পিক রূপায়ণ করেন। মেলে ধরেন অদেখা অসঙ্গতির পরিচিত ভাঁজ। বিন্যাস করেন সঙ্গতির কথামালা। ‘সেই সাপ জ্যান্ত’ নাসরীন জাহানের তেমনি এক অসঙ্গতির সঙ্গত বিন্যাস। এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী উপন্যাস। জীবনের মোড়কে মোড়ানো চলমান যুদ্ধের বস্তুকথা। লেখক এ উপন্যাসে নস্টালজিকের সার্থক রূপায়ণ করেছেন। অতীত আর বর্তমানকে আশ্চর্য দক্ষতায় মিলিয়েছেন সময়ের প্লাটফর্মে। মগজের অনেক গভীরে পাক খেয়েছে চেতনার গন্ধ। আধুনিক মানুষের জীবন জিজ্ঞাসা, নাগরিক জীবনের ক্লান্তি, নিরন্তর বেঁচে থাকার তৃষ্ণা এবং প্রেম এ উপন্যাসে পুঞ্জীভূত হয়েছে। বর্তমান সময় অতীতে ঘূর্ণায়মান। আর এ ঘূর্ণি থেকেই ওঠে আসে জীবনের নতুন চমক। অতঃপর ভবিষ্যতের অপেক্ষায় বিলীন বাসর সাজাতে হয় সময়ের ইলাস্টেশনে। এ উপন্যাসে তার সার্থক ছবি ফুটে ওঠেছে। উপন্যাসের প্রধান দুটি চরিত্র নাজিয়া ও নাসিম। তাদের জীবন প্রবাহের ভেতর দিয়েই ওঠে এসেছে কালিক বিন্যাস। উপন্যাস শুরু হয়েছে নাজিয়ার চৈতন্যের অতীত বর্তমানের ডুবসাঁতারের মধ্য দিয়ে। নাজিয়া একটা ইন্টারভিউ দিতে যাবে। হাতে সময় নিয়েই বাসা থেকে বের হয়। তবু সময় মতো সে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না। রাস্তায় জ্যাম। গাড়ি চাপা পড়ে কলেজছাত্র মারা গেছে। এ মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে ধ্বংসযজ্ঞের উৎসব। আর এ ধ্বংসযজ্ঞই নাজিয়াকে নিয়ে যায় স্মৃতির বনবাতাসী প্রান্তরে। দুঃসময়ের শৈশবে।
দেশে তখন যুদ্ধ শুরু হয়েছে। যুদ্ধ কী দুটি শিশু তখন জানে না। তাদের নিরাপত্তার জন্য দাদা তাদের পাঠিয়ে দেন চাচার শ্বশুরবাড়ি। সেখানে যাওয়ার সময় প্রথম তারা দেখে, যুদ্ধের (জীবাশ্মতা) খণ্ডরূপ। রাস্তার পাশে ছড়িয়ে থাকা লাশ। চাচার শ্বশুরবাড়ি প্রথম সময় ভালোই কাটছিলো। কিন্তু দ্রুত প্রেক্ষাপট বদলে যায়। চাচারা রাজাকার হন। নাজিয়াদের সম্পত্তি আত্মসাৎ করেন। এ দুটি শিশুর উপর থেকে তারা তাদের স্নেহের ছায়া উঠিয়ে নেন। অসহায় শিশু দুটি দেখতে থাকে মুখোশ পরা মানুষের দানবীয় রূপ। তুচ্ছ কারণে শিশু দুটির খাবার বন্ধ করে দেয়া হয়। ঘর ছাড়া করা হয়। ক্ষুধায় তারা যখন মৃয়মাণ, তখন পাশেই চলছে রান্নার মহোৎসব। পাকসেনাদের জন্য তৈরি হচ্ছে লোভনীয় খাবার। এ খাবারের জন্যই নাজিয়া ব্যাকুল হয়ে ওঠে। নাজিয়াকে সামলাতে নাসিম তাকে গাছের সঙ্গে বাঁধে। খাবার আনতে যায়। আর তখনই ঘটে জীবনের চরম বিপর্যয়। আর জীবনের এই কঠিন মুহূর্তের পর লেখক ছড়িয়েছেন বস্তুগত সত্যের তীর্যক আলো। নাজিয়ার আত্মকথনে বলেছেন, “নাসিম সেই যে যায়... চন্দ্র ওঠে অরণ্যকে ভাসিয়ে ফেলে পোড়া জোছনায়... বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে সেই লোভনীয় ঘ্রাণ যেন গাছেদের দেহে পাতায় আঠার মতো মিশে যেতে থাকে। পিঁপড়ে কামড়ায় পায়ে, শরীরের বাঁধন কষ্ট... সব ভুলে কেবল সেই খাদ্য গন্ধের দিকে আমার জিহ্বা প্রসারিত হতে থাকে। এরপর কখন নাসিম কাঁপতে কাঁপতে ফেরে...
আমার রশি খুলতেই কলাপাতায় করে তার নিয়ে আসা সেই লোভনীয় খাদ্যে আমি রীতিমতো বুভুক্ষু হিংস্র কুকুরের মতো কীভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ি... কিছুই জানি না। খাওয়া শেষে নিস্তেজ চোখে দেখি নাসিমের হাফপ্যান্ট গড়িয়ে রক্ত পড়ছে।”
আজীবন যারা যুদ্ধ করে- যুদ্ধ দেখে নাজিয়া তাদের একজন। শৈশবে তার ক্ষুধা মিটাতে গিয়ে ভাই নাসিম পাকসেনাদের নির্যাতনের শিকার। নাজিয়া নিরন্তর চেষ্টা করেছে নিজেকে ভেঙে ভেঙে নাসিমের ঋণ শোধ করতে। নিজেকেও ঠেলে দিয়েছে স্বাভাবিক জীবনের বাইরে এক যান্ত্রিক জীবনের দিকে। প্রত্যাখ্যান করেছে প্রেমিকের আহ্বান। লেখকের বর্ণনায় : “কিন্তু রাকায়েত তো কেবল আমাকেই চেয়েছিল। এত বড় একটা অপ্রকৃতিস্থ ছেলের ভার বহন করার কথা ভাবা তার জন্য দুঃসাধ্য ছিল। কিন্তু আমার অস্তিত্বে নাসিম যে এক্কেবারে আমার সঙ্গে মিশে মিলে যাওয়া এক সত্তা...।”
বাবা-মা মারা গেলে নাজিয়ার ওপর নাসিমের দায়িত্ব পড়ে। অনেক টানাপোড়েনের ভেতর দিয়ে পড়া লেখা শেষ করে। চাকরি নেয় একটা এনজিওতে। একদিকে প্রেম, একদিকে দায়িত্ব, আর সব ছাপিয়ে জীবনসংগ্রাম নাজিয়াকে করে তুলে তীব্র কঠোর এক মানুষে। তবু আদিম সত্তা সে এড়াতে পারে না। কামনার তৃষ্ণা নিয়ে ঝাঁপ দেয় রাকায়েতের বাহুডোরে। লেখকের বর্ণনায় ধরা পড়ে এর বস্তুনিষ্ঠতা : “... নিজেকে কঠিন টানে সেজন্যই সরাতে চায় রাকায়েত... আমি সেই বেদনার অর্গল ভেঙে ওকে নিজের দিকে উত্থাপনের মতো ধাবিত করি... সম্পর্ক শেষে আমার নেতিয়ে যাওয়া দেহের রক্তপাত দেখে আমার সামনে জীবনে প্রথম কাঁদে রাকায়েত।”
নিঃসন্দেহে রাকায়েতের এ কান্না ভালোবাসার দুর্লভ ফসল, তবু প্রশ্ন ওঠে রাকায়াতের প্রেম নিয়ে। সে একজন প্রেমিক। যোদ্ধা। তবু কেন সে একজন যুদ্ধাহতের ভার বহন করতে ব্যর্থ হলো? কেন সে শুধু প্রেমিকার একার দায়িত্ব নিতে চাইল?
এ উপন্যাসে সুরাইয়া আপা একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। যুদ্ধের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন। আদর্শগত আলোতে পছন্দ করতেন রাজনৈতিক নেতা নইমকে। কিন্তু বিয়ে হয় পরিবারের পছন্দে। খালাতো ভাই রওনকের সঙ্গে। রওনক সুরাইয়া আপার পছন্দের ব্যাপারটি জানতেন। বিয়ে করতে গিয়ে যখন শুনলেন ২৬ মার্চ গণ্ডগোলের পর সুরাইয়া নইমকে দেখতে গিয়েছিল, তখন অদ্ভুত এক ঈর্ষায় স্ত্রীকে তুলে দেন পাক সৈন্যদের হাতে।
সুরাইয়া আপার মতো অসংখ্য মা-বোন মুক্তিযুদ্ধে অনেক বড় ত্যাগ স্বীকার করেছেন। শাব্দিক পরিসরে আমরা তাদের সন্ধান দিচ্ছি ‘বীরাঙ্গনা’। কিন্তু বাস্তবিক কেমন কাটছে এই বীরাঙ্গনাদের জীবন? কেমন আছেন তারা? তার জীবন্ত ছবি লেখক এ উপন্যাসে তুলে ধরেছেন। লেখকের বর্ণনায় : “কখনও নইমও যখন স্ত্রীর শয্যায় পরমভাবে তাকে কাছে চাইতো দিন-রাত শরীরটাকে খুব খাওয়া তার ওপর হিংস্র ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়া মানুষগুলোকে মনে পড়লে সে এক ঘোর আতংক থেকে ছিটকে যেত...।”
এ ছাড়াও এ উপন্যাসে ঘুদিয়া আপা, শেফালী, দোলন চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে সমকালীন জীবন প্রবাহের বিন্যস্ত রূপ।
জাদুবাস্তবতা, সুরিয়ালিজম, নাসরীন জাহানের কথাসাহিত্যের অন্যতম চরিত্র লক্ষণ। এ উপন্যাসেও তার সার্থক প্রয়োগ ঘটেছে। উপন্যাসে কাঁঠালচাঁপা ও মার্বেল বিশেষ মাত্রা সংযোজন করেছে।
কয়েকটি উদ্ধৃতি :
ক. সে চোখ বুঝে পুরো নিঃশ্বাসে কাঁঠালিচাপা ফুলের গন্ধ টেনে নিয়েছিল। কোন ফুলে ঘ্রাণ মানুষকে কী করে এমন জাগতিক শক্তি দিতে পারে?
খ. ...সত্যি নাসিম কাঁদছে, চোখের সামনে মার্বেল ঘোরাচ্ছে... নাজ্জু... চলো আমরা ওই কাঁঠালিচাপা গাছের নিচে যাই... নাজ্জু এই গ্লাসের মধ্যে কত ফুল কত পরী... ওরা আমাদের ডাকছে তোমার কিচ্ছু হবে না।
গ. পেছনে একটা চিৎকার... কুত্তার বাচ্চা... এরপরই নাসিমের স্বপ্নের ব্যাপক মার্বেলটার নিঁখুত নিশানা ঠিক ইনসান চাচার মাথা বরাবর লাগে।
এখানে কাঁঠালিচাপা এবং মার্বেল বিশেষ অর্থ নিয়ে এসেছে।
মুক্তিযুদ্ধে নারীদের পাশাপাশি অনেক শিশু-কিশোর বলৎকারের শিকার হয়েছে। জীবনের এই রূঢ় দিকটি কোন এক অদ্ভুত কারণে আমাদের সাহিত্যে উপেক্ষিত। কিন্তু এমনটি ঘটেছে। কিংবা ঘটছে না, তা তো নয়। এক্ষেত্রে লেখকের সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি প্রশংসার দাবিদার। এ দেশকে এদেশের মানুষকে যারা পণ্য করতে চেয়েছিল তারা এখনও জ্যান্ত। সময় পেলেই ছোবল মারছে, মারবে। এ উপন্যাসের শেষে তাই দেখি নাজিয়ার চাচা আবার ফণা তুলে দাঁড়িয়েছে। আর তাকে রুখতে অথর্ব নাসিম যেন সুস্থ হয়ে ওঠেছে। নাজিয়ার স্বপ্নের ভেতর লেখকের বিন্যাস। “আমি যেন দেখি নাসিমের নাটকা দু’পা গজিয়ে গেছে... আমার এই নতজানু মাথাকে টান দিয়ে তুলে সে যেন মাঠ-ঘাট-প্রান্তর পেরিয়ে আমাকে নিয়ে যেতে থাকে বছরের শেষ মাসটাতে, যে তারিখে যুদ্ধ শেষে নিজ আশ্রয়ে ফিরছিল যোদ্ধারা, তাদের পাশ দিয়ে ছুটতে ছুটতে একসময় সেই কাঁঠালিচাপা গাছটির নিচে আমাকে নিয়ে দাঁড় করায় যুদ্ধের শুরুতে একটি ভিতু শিশুকে কুৎসিত বাস্তবতা রক্ত পুঁতি গন্ধময় অবস্থায় মরতে বসার আগে সেখানে অপার্থিব পুষ্পগন্ধের আবহে আমাকে ভাসিয়ে নাসিম একজন দায়িত্ববান পুরুষ হয়েছিল।”
উপন্যাসে বহুমাত্রিক ঘটনা একটি বিন্দুতে এসে মিলেছে। ঔপন্যাসিক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কালিক পরিসরে বিন্যস্ত করেছেন জীবনের প্যারাডক্স। সময়ের খুলনলচে খুলে দেখিয়েছেন বর্ণচোরার বর্ণিল তাণ্ডব। যারা প্রজন্মের প্রজন্মে ছড়িয়ে দিচ্ছে নপুংসকতার বীজ। আর ঔপন্যাসিক নাসরীন জাহান এ উপন্যাসে সেসব বর্নচোরার পেছনে ছুটেছেন দৃঢ় পদক্ষেপে। কামনায় বাসনা আলো হাতে আঁধার খনন করার প্রচেষ্টা।
অলংকরণঃ তাইফ আদনান
