জলধি / পাঠ-পর্যালোচনা / ‘মোকাম সদরঘাট ‘- প্রেম, অভিঘাত, স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের যাত্রা
Share:
‘মোকাম সদরঘাট ‘- প্রেম, অভিঘাত, স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের যাত্রা

মোকাম সদরঘাটউপন্যাস মূলত আবির হাসান নামক এক স্বপ্নবাজ তরুণের জীবনের জার্নি ছাড়া উপন্যাসটিতে রয়েছে প্রেম, অভিঘাত, সমাজের নানা অসংগতি জীবন যন্ত্রণার বুনন  বহু বছর ধরে প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্ত থেকে হাজারো মানুষ লঞ্চে সদরঘাট আসে রাজধানীর বৈচিত্রময় নগরে প্রতিষ্ঠিত হতে চায় কেউ পথ খুঁজে পায় কেউ পায় না দেশেরে দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষের প্রায় শত বছরের যাত্রা এই নদী পথ এইসব যাত্রীদের হাসি, গান, স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন প্রতিকী হেয়ে এসেছে মোকাম সদরঘাটউপন্যাসে

আপনে মোর গায়ে হাত দেলেন ক্যা আব্বা কী কইছিল আপনেরে আর আপনে মোরে অপমান হরলেন হাসেম মিয়া ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চোখ বড় বড় করে তাকায় চামেলির দিকে চামেলির গায়ের রং ফর্সা কিন্তু আকারে একটু মোটা …‘হাসেম মিয়ার চোখে ঘুম নেই পাতলা একটা শাড়ির ওই পাশে একটা তেলেতেলে মেয়ে শুয়ে আছে চেষ্টা করছে সেই বিকেল থেকে বাগে আনার কিন্তু চামেলি যে ফোঁস করে উঠবে বুঝতে পারেনি হাসেম মিয়া

উপন্যাসের চরিত্র অবিকল জীবন নয় তবে কখনো কখনো এরা জীবনের মতো হয়ে ওঠে কথাসহিত্যিক মনি হায়দারেরমোকাম সদরঘাটউপন্যাসে চরিত্র-আবির, শিমুল-মিলি, চামেলি, রিফাত, মজনু, রাতুল, পারুলেরা, জীবনের মতো হয়ে উঠেছে

লঞ্চে হাসেম মিয়া চামেলীকে অপমান করে তার বুকে হাত দেয় অথচ সম্পর্কে চাচা মনি হায়দার উপন্যাসে, সম্পর্কের আড়ালে চরিত্রের অন্ধকার রূপ দেখিয়েছেন সম্পর্কের মুখোশ খুলে দিয়েছেন তিনি দেখাতে চেয়েছেন কিছু মানুষের আচরণ  নৈতিক সীমা ভুলে যায় তখন সামনে আসে আসল লোলুপ রূপ

মোকাম সদরঘাটউপন্যাসে রিফাত ময়না নামে দুজনের ঘটনাও পাঠকদের প্রবলভাবে নাড়া দেয় স্বামী-স্ত্রী দুজনে সদরঘাট থেকে রিভার এক্সপ্রেস লঞ্চে বাড়ি ফিরছিল অনেক স্বপ্ন ছিল মনে

রিভার এক্সপ্রেসের আনসার মোহন মিয়া, বদরুদ্দিন নিজামুদ্দিন  রিফাতকে হত্যা করে ময়নাকে ধর্ষণ করে ধর্ষণের পর ময়নাকেও তারা হত্য করে শেষে দুজনকেই নদীতে ফেলে দেয়

অথচ  লঞ্চে যাদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা তারাই গভীর রাতে স্বামীকে হত্যা করে স্ত্রীকে ধর্ষণ করে কি নিষ্ঠুর? কি মধ্যযুগীয় বর্বরতা! এই হত্যার মধ্য দিয়ে সমাজের এক কঠিন প্রশ্ন সামনে আসে আর সেটা হলো মানুষকে যাদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, তাদের হাতেই কি মানুষ নিরাপদ? ক্ষমতা কি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে?

উপন্যাসিক মনি হায়দার প্রমাণ রাখেন- যেখানে নৈতিকতা দুর্বল সেখানে মানুষ নির্যাতনের শিকার হয় মোকাম সদরঘাটউপন্যাসে পাঠক যেমন গল্প পড়ে তেমন নিজেকে প্রশ্ন করে উপন্যাস নদীর গল্পের আড়ালে মূলত মানুষের গল্প এখানে নদী আছে আসা-যাওয়া আছে কিন্তু সবচেয়ে বেশি আছে মানুষ প্রতিদিন হাজারো মানুষের উপস্থিতি কেউ  স্বপ্ন গড়ে কারও স্বপ্ন ভাঙে কেউ শুরু করে জীবন আবার কেউ শেষ করে এই ঘাট জীবনের ভাঙা-গড়ার সোপান প্রতিটি পৃষ্ঠা ভিজে থাকে আশার আলো আর নিরাশার নোনাজলে

উপন্যাস শেখায় যেকোনো পরিস্থিতিতে মানবিকতা রক্ষা করা প্রয়োজন কারণ সভ্যতা গড়ে ওঠে মানুষের আচরণ, সম্মানবোধ নৈতিকতার ওপর তাই এটা এক জীবন ঘনিষ্ট দ্রুপদী উপন্যাস

 

এক নিঃশব্দ স্বপ্নযাত্রা:  

মোকাম সদরঘাটউপন্যাসের প্রধান চরিত্র আবির হাসান এক লড়াকু তরুণ পিরোজপুরের এক নিভৃত গ্রামের নাম উজানগাঁও চারদিকে সবুজ নদীর মৃদু স্রোত আর আকাশভরা জোছনা নির্জনতা সেই গ্রামেই জন্ম আবির হাসানের ছোটবেলা থেকেই চোখে ছিল অন্যরকম স্বপ্ন লেখক হবে মানুষের গল্প লিখবে জীবনের গল্প লিখবে নদীর ভাষা লিখবে গ্রামের মানুষ তখনও জানে না এই ছেলেটার মধ্যে এক অন্য জগৎ জন্ম নিচ্ছে

এসএসসি পরীক্ষা শেষ হতেই আবির বুঝে যায়, এই আনন্দ-বেদনার গ্রামের মায়া তাকে ছাড়তে হবে এখানে স্বপ্ন পূরণ হবে না যেতে হবে ঢাকা নামে অনেক দূরের এক শহরে যা হবে  স্বপ্ন বাস্তবায়নের শহর সংগ্রামের শহর অচেনা, অজানা, অথচ সম্ভাবনাময় এক নগর

একদিন ভোরে তেলিখালি লঞ্চঘাট কুয়াশা ভেজা বাতাস বুকের ভেতর চাপা উত্তেজনা আবার কিছুটা ভয় পূবালী লঞ্চের ডেকে দাঁড়িয়ে জীবনে প্রথম বারের মতো অনুভব করে, সে সত্যিই ঘর ছাড়ছে

লঞ্চ ছেড়ে দেয় ধীরে ধীরে পেছনে পড়তে থাকে উজানগাঁও, তেলিখালি, দারুল হুদা, তুষখালি, বালিপাড়া, জুনিয়াসহ তাঁর শৈশবের স্মৃতিমাখা, চিরচেনা প্রিয় গ্রামগুলি ভান্ডারিয়া, পিরোজপুর- সবকিছু যেন দূরে সরে যায় কচা, পোনা, বালেশ্বর পানগুছিসহ অনেক নদীর পানি ভেঙে এগিয়ে যায় আবিরের লঞ্চ নদীর সাথে সমান্তরাল চলতে থাকে  স্বপ্ন

লঞ্চ এক ভাসমান জীবন কেবিনগুলো ঘর খাবারের দোকান রান্নাঘর মানুষের ভিড় জীবনের প্রতিচ্ছবি কেউ ছাগল নিয়ে উঠেছে কেউ মুরগি কেউ ঝগড়া করছে আবার কেউ গল্প করছে এখানে নান বৈচিত্র্য কোলাহলপূর্ণ এক জীবনের প্রতিচ্ছবি এগিয়ে যায় অথচ থামে না নদীর পর নদী পেরিয়ে লঞ্চ যায়

জল কেটে এগিয়ে চলে লঞ্চ আর আবিরের মনে ভীড় করে স্মৃতি লঞ্চে এক সুন্দরী নারী দেখে তার প্রথম সিনেমা দেখার কথা মনে পড়ে অজপাড়াগাঁও গ্রাম জেনারেটরের আলো সাদা পর্দা আর এক অপরূপ নায়িকা সুচন্দা সেই মুখের মায়া, সৈন্দর্য আজও তার মনে গেথে আছে লঞ্চের ভিড়ে এক অচেনা সুন্দরীকে দেখে হঠাৎই সেই স্মৃতি ফিরে আসে জীবন  আসলে এমনই বর্তমানের ভেতর বাস করে অতীত

ডেকের কোণে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে  আবির ঢেউ আসছে যাচ্ছে জেলেরা জাল ফেলছে

আকাশের নিচে জল আর জল তার মনে হয়, সে যেন চেনা পৃথিবী ছেড়ে এক অন্য জগতে এসেছে এই নতুন পৃথিবীতেও তার মনে পড়ে যায় ফেলে আসা কিছু সম্পর্ক রিক্তা ভাবি রাশিদাদের সাথে গ্রামের নির্জনতায় জন্ম নেওয়া কিছু গোপন সম্পর্ক কিছু আবেগ কিছু আকাঙ্ক্ষা  বুঝতে পারেজীবন শুধু পবিত্রতায় গড়া নয় মানুষ এমন এক প্রাণী যার মধ্যে থাকে আলো, থাকে অন্ধকার

লঞ্চ এগিয়ে চলে হুলারহাট, কাউখালী, ইন্দিরহাট কত অজানা স্টেশনে ভীড়ে মানুষ ওঠে মানুষ নামে জীবন বদলে যায় আবির শুধু নির্নিমেষ দেখে যায় হঠাত তার মনে ভয় কাজ করে কোথায় যাচ্ছে কী করবে এই  পৃথিবীর কে তাকে চেনে জীবনের স্বপ্ন পূরণ হবে তো?

তখন তার মনে পড়ে স্কুলের এক শিক্ষকের কথা যিনি এক উপন্যাসের গল্প বলেছিলেনউপন্যাস লেখকের নাম আবিরের মনে নেই শিক্ষকের নাম গল্পের কথা মনে আছে সেই গল্পে ছিল সান্তিয়াগে নামে এক কিশোর ইউরোপের এক দেশে মেষ চরাত সে  স্বপ্ন পুরনের জন্য সাগর পাড়ি দিয়ে অন্য এক মহাদেশে এসেছিল ভয়ঙ্কর সব প্রতিকুলতা পেরিয়ে বিশাল মরুভুমি পাড়ি দিয়ে উদ্দেশ্য অর্জন করেছিল গল্প মনে পড়ার পর আবির আলোকিত হয় চারপাশের দুনিয়া আপন লাগে নতুন শক্তি, নতুন সাহস জেগে ওঠে তার মনে সে ঘুরে দাঁড়ায় প্রতিজ্ঞায় দৃঢ় হয়- আমাকে সফল হতেই হবে 

অবশেষে বুড়িগঙ্গা নদী কিন্তু এই নদী আনন্দ দেয় না পচা পানি দূষণ গন্ধ মনটা খারাপ এটাই কি তার স্বপ্নের শহরের দরজা? সদরঘাটে এসে দেখে আরেক পৃথিবী অসংখ্য মানুষ কোলাহল হইচই অনেক লঞ্চ-পূবালী, নাবিক, সাঁতারু, রিভার এক্সপ্রেসসব যেন জীবনের স্রোতে ভাসছে কিন্তু এই ভিড়ের মাঝেও আবির একা কোনো কিছুই তার নয় কোনো আশ্রয় নেই শুধু এক ঠিকানা ১০বি সেগুনবাগিচা জানে না, ওখানে কে আছে

শুধু এটুকু জানে যে ওখানে থেকেই তার স্বপ্নের শুরু সদরঘাটে নামে রাস্তা দিয়ে হাঁটে এই রঙিন শহর যেন তার কাছে এক বিভ্র্রম বাহাদুর শাহ পার্কের সামনে এসে মনে পড়ে সম্রাট বাহদুর শাহকে যাকে ইংরেজরা গ্রেপ্তার করে রেঙ্গুনে নির্বাসন দিয়েছিল আবির ভাবেমানুষের জীবনও কি এমন? একদিন শিখর, একদিন পতন? নবাবপুর রোড দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে আরেক অন্ধকার মুখ দেখে যেখানে নারীরা বেঁচে থাকার জন্য জীবনের একান্ত সময় বিক্রি করে বুঝতে পারে, এই শহর শুধু স্বপ্নের নয় এখানে আছে অন্ধকার, বঞ্চনা, অপমান শহর বাস্তব, কঠিন, নির্মম, নির্দয় 

আবীরের শুরু হয় এক কঠিন জীবন থাকার জায়গা নেই খাওয়ার নিশ্চয়তা নেই কখনো টিউশনি কখনো লজিং কখনো ছোট চাকরি চাকরি হারানো শঙ্কা প্রতিদিন যেন এক যুদ্ধ কিন্তু আবির থামে না  জানে স্বপ্নের মূল্য আছে আর সেই মুল্য দিতে হয় কষ্ট দিয়ে ধীরে ধীরে যুক্ত হয় নানা সাহিত্য সংগঠনের সঙ্গে মানুষের সাথে মেশে গল্প শোনে গল্প লেখে রাত জেগে, জেগে লেখে দিনে কাজ করে অনেকবার ভেঙে পড়ে আবার উঠে দাঁড়ায়  জানে সব কষ্টই তাকে মেনে নিতে হবে আর এই মেনে নেওয়াই জীবন

আবির সহসী, উদ্যমী, ভাঙবে, আবার উঠে দাঁড়াবে  বিপ্লবী চেগুয়েভারের মতো চে উচ্চারণ ছিল, ‘আস্তা লা ভিক্তোরিয়া সিয়েম্প্রেসংগ্রাম করো, বিজয় না হওয়া পর্যন্ত আবিরও প্রতিজ্ঞা করেছে বিজয় না হওয়া পর্যন্ত  সংগ্রাম করতে হবে কষ্টে থাকতে থাকতে এই রঙিন শহরের  অলিগলি এখন পরিচিত একদিন যে শহর ছিল অজানা, অচেনা, অপরিচিত  আর আজ সেই শহরই  চিরচেনা চির আপন বেঁচে থাকার ঠিকানা 

আবির সব সময় উচ্ছল, উজ্জল হাসি-খুশি  বিশ্বখ্যাত উপন্যাসিক তলস্তয় লিখেছিলেন, ‘আনন্দ সবার দুঃখগুলো যার যার মতো করে আলাদাআবির তলস্তয়ের বাণী  জানে না কিন্তু সেই দর্শন বোধ তার মধ্যে আছে সে তার গোপন বেদনাগুলো কখনো মানুষে সামনে আনে না অনেক কষ্টের মধ্যেও  লিখে যায় প্রতিদিন লেখে

লেখায় আসে, গ্রামের নদী লঞ্চের যাত্রা শহর গ্রামের মানুষের বৈচিত্র মানুষের গোপন বেদনা  যারা মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি হয়ে মনের ঘটনা লেখেন তারাই বড় লেখক আবিরও মধ্যবিত্তের  সুখ-দঃখ, আনন্দ-বেদনার চলচিত্র লেখে পাঠক  গ্রহণ করে চারদিকে নাম ছড়িয়ে পড়ে এখন এক প্রতিষ্ঠিত লেখক অনেক ভীড়ের মধ্যেও-আলাদ করে চেনা যায়

কিন্তু আবিরের ভেতরে এখনো সেই ছেলেটা বেঁচে থাকে একদিন যে তেললিখালি ঘাট থেকে লঞ্চে উঠেছিল

যে প্রথমবার নদীর ঢেউ দেখে বিস্মিত হয়েছিল যে ভেবেছিল, লঞ্চটা যেন জীবনের মঞ্চ মঞ্চে কেউ  নামেকেউ ওঠে কেউ হারিয়ে যায় কেউ ঠিকানা পায় আর মাঝখানে থাকে গল্প আবির এখনো সেই গল্প লেখে কারণ সে জানে, মানুষ বেঁচে থাকে না বেঁচে থাকে তার গল্প আর এই গল্পটাই মোকাম সদরঘাট

 

মানুষ:

একজন  প্রকৃত উপন্যাসিককে ভালো মানুষও হতে হয় মনি হায়দারকে দূর থেকে চিনি দীর্ঘ বছর কাছ থেকে চিনি কম দীর্ঘ বছর সে দিকে থেকে মনে হয়েছে তিনি একজন উদার, হাসি-খুশি, প্রাণবন্ত মানুষ কথাশিল্পী মনি হায়দারের জিনে রয়েছে লেখক সত্ত্বা হৃদয়ের গভীর ভালোবাসা থেকে তিনি লেখেন মনে হয় শুধু লেখক হতেই তিনি গ্রহে এসেছেন

একটি সত্যিকারের ভালো লেখা মোটেই সহজ নয় এক অর্থে একজন লেখকের জীবন অভিশপ্ত রক্তক্ষরণ খনিজ শ্রমিকের জীবন একটি ভালো লেখার জন্য রাত-দিন একাকার হয়ে যায় লেখকের জীবনে স্ত্রী-সন্তানসহ আপনজনেরা দূরে সরে যায়

আর একজন মানুষ শুধু লেখক হওয়ার জন্য সেই কয়েক দশক আগে গ্রাম ছেড়েছিলেন বছরের পর বছর তিল তিলি করে পুড়েছেন পুড়ে পুড়ে নিজেকে তৈরি করেছেন সেই মানুষটি উপন্যাসিক মনি হায়দার তাঁর যেকোনো গল্প উপন্যাস পাঠককে ভাবায়, মোহিত করে মোকাম সদঘাটএকটি সৃষ্টিশীল, নান্দনিক ইতিহাসে টিকে থাকার  উপন্যাস

উপন্যাসে যেমন রোদ, বৃষ্টি, জোছনা ঢেউয়ের ছন্দ আছে তেমনি ঝড়ের কবলে পড়ে জীবন-মৃত্যুর অনিশ্চয়তাও উপন্যাসটি নদীপথে জীবনযাত্রার এক প্রতিকী মহা উপাখ্যান উপন্যাসিক মনি হায়দারের লেখায় জীবনের কঠিন বাস্তবতা, কল্পনা রোমাঞ্চ পরিপূর্ণ

ঢেউয়ের মতোই এখানে জীবনের স্বপ্ন ওঠা-নামা করে দরিদ্র মানুষের সংগ্রাম, শহরে টিকে থাকার যুদ্ধ, আর সমাজের নানা টানা পোড়েনের গল্প এই উপন্যাস কেন্দ্রে রয়েছে সাধারণ মানুষ ইতিহাসে যাদের নাম লেখা থাকবে না যাদের কেউ মনেও রাখবে না আবার তারাই দেশের নানা প্রান্ত থেকে এসে তৈরি করে ঢাকার প্রাণ মোকাম সদরঘাটউপন্যাসের চরিত্রগুলো শুধু এক একজন ব্যক্তি নয়, তারা এক একটি সময়, সমাজ শ্রেণীর প্রতিনিধি 

এখানে চামেলি, রিফাত, মজনু, ময়নারা নির্যাতনের প্রতীক শিমুল-মিলি আবহমান বাংলার চিরন্তন প্রেমের প্রতীক আবির হাসানরা এই মহানগরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার নিরন্তর সংগ্রামের পতাকা

নানা চরিত্র প্রয়োজনে এসেছে আবার স্রোতের টানে চলে গেছে দূরে, বহু দূরে কিন্তু প্রত্যেক চরিত্রের মধ্যেই আছে অন্তর দ্বন্দ্ব, বেঁচে থাকার সংগ্রাম  মোকাম সদরঘাটউপন্যাসের চরিত্রগুলো নদীর মতোই বহমান, স্বচ্ছ নারী চরিত্রের মধ্যেও আছে টিকে থাকার সংগ্রাম অস্তিত্বের ঘোষণা চামেলীরা দেখিয়েছে কীভাবে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়ী হতে হয়

 

প্রেম-অভিঘাত:

গ্রাম নদী শহর মানুষের ভিড় প্রেম হত্যা, ধর্ষণ এই সব নিয়েই গড়ে উঠেছে মোকাম সদরঘাটউপন্যাসের আখ্যান উপন্যাসের শরীর জুড়ে গঠিত হয়েছে গভীর মানবিক জগৎ এই জগতে আছে এক অপূর্ব প্রেম কিন্ত উপন্যাসিক এই প্রেমের আখ্যানে দেখিয়েছেন সমাজ, শ্রেণি-বৈষম্য, পরিবার, প্রতিবাদ এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের জয়

ঢাকার আকাশে স্বপ্ন ওড়ে সেই স্বপ্নের শহরেই পড়াশোনা করছিল দুই তরুণ-তরুণী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শিমুল হাসান মিলি মাহজাবিন মিলি ধনীর মেয়ে বাবার কোটি টাকা শহরের বিলাসী জীবন সামাজিক মর্যাদা সবই আছে চারপাশে অন্যদিকে শিমুল পিরোজপুরের দরিদ্র গ্রামের সন্তান সম্পদ বলতে ছিল তার স্বপ্ন, সততা আর এক আবেগপ্রবণ হৃদয়

কিন্তু প্রেম কখনো হিসেব মানে না বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে জন্ম নেয় মিলি আবিরের গভীর প্রেম

ভালোবাসা ধন-সম্পদ দেখে না দেখে হৃদয় মিলি মা-বাবার ভীষণ অনুগত কিন্তু প্রেম মানুষকে বদলে দেয় সাহসী করে তোলে যখন তার বাবা-মা এই সম্পর্ক মানতে অস্বীকার করেন, তখন মিলি জীবনে প্রথমবারের মতো সিদ্ধান্ত নেয় হৃদয়ের পক্ষে দাঁড়ায় গোপনে শিমুলকে বিয়ে করে এই সিদ্ধান্ত শুধু প্রেমের নয় এটি ছিল  আত্মার স্বাধীনতার ঘোষণা

মিলি পরিবারের বিত্ত বৈভব থেকে বেরিয়ে য়ায় শিমুলের হাত ধরে চলে যায় গ্রাম  উজানগাঁও মিলির কাছে যেন এক অন্য পৃথিবী কাঁচা রাস্তা সবুজ ধানক্ষেত নদীর বাতাস মানুষের সরলতায় দারুণ মুগ্ধ শিমুলের সহজ সরল মা নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসে ভাই-বোনেরা ভরিয়ে দেয় হাসি-আনন্দে অতিথি থেকে গ্রামের মানুষের কাছে হয়ে যায় নিজের মানুষ মিলির মধ্যে জন্ম নেয় অন্য অনুভূতি  ভাবে শহরের বিলাসী জীবনে কি এত সুখ আছে?

কিন্তু  পথ সহজ নয় মিলির  আমলা বাবা এই সম্পর্ক মেনে নিতে পারেননি শিমুলের বিরুদ্ধে মামলা করেন শিমুলের গ্রামে পুলিশ যায় তাকে ধরতে কিন্তু মিলি তখন ববার বিরুদ্ধে দাঁড়ায় সে হয়ে ওঠে প্রতিবাদী শিমুলের ঢাল হয় প্রেম সব সময়ই সমাজের দেয়ালের বিরুদ্ধে লড়েছে

শিমুলের গ্রামে এসে মিলির বাবা-মা যখন দেখেন  মেয়ে কষ্টে নেই সুখে আছে শুধু শিমুলের পরিবার নয় সারা গ্রামের মানুষ মেয়েকে  ভালোবাসে শিমুলও তাকে জীবন দিয়ে আগলে রাখে তখন তাদের মন গলে মানুষের হৃদয় শেষ পর্যন্ত ভালোবাসার কাছে ফিরে যায় এই সম্পর্ক মেনে নেয়

 এটি উপন্যাসের এক মানবিক বিজয় প্রেমের দর্শন

নদীর মতো জীবনও বহমান কখনো ঝড় আসে কখনো শান্ত জল শিমুল মিলির প্রেম সেই নদীর মতো সংগ্রাম পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত পৌঁছেছে স্বীকৃতির তীরে এই গল্প মনে করিয়ে দেয়, মানুষের পরিচয় তার হৃদয় যখন প্রেম সত্য হয়, তখন সমাজ, ক্ষমতা, বাধা সব পরাজিত

 

আয়না:

নদী লঞ্চ মানুষের ভিড় আর সেই ভিড়ের মধ্যেই মানুষের চরিত্রের উন্মোচন এই বাস্তবতায় মোকাম সদরঘাট এক শক্তিশালী কথাসাহিত্য এই উপন্যাস শুধু নদীপথের গল্প নয় এটি সমাজ, নৈতিকতা, ক্ষমতা, ভয়, লজ্জা মানুষের অন্তর্গত অন্ধকার দেখার আয়না

দেশের নদীপথ যেন জীবনের এক চলমান মঞ্চ সদরঘাটঘাট থেকে লঞ্চ যায়: বরিশাল, ভোলা, লালমোহন, ভান্ডারিয়া, বাগেরহাটসহ নানা প্রান্তে লঞ্চ যাত্রায় নানা শ্রেণির মানুষের স্বপ্ন, ভয়, লোভ আর সম্পর্কের গল্প মিশে যায় এই চলমান জীবনের মধ্যেই উপন্যাসিক মনি হায়দার  তুলে ধরেছেন মানুষের চরিত্রের জটিলতা যেখানে কখনও আত্মীয়তা ভেঙে পড়ে কখনও ক্ষমতা দুর্বলকে আঘাত করে আবার কখনও সমাজ নীরব দর্শকমোকাম সদরঘাটউপন্যাসের চরিত্রগুলো সমাজের কোনো না কোনো চরিত্রের নগ্ন প্রকাশও বটে

 

নদী যাত্রায় মৃত্যূর ছায়া:

মোকাম সদরঘাটউপন্যাসে মনি হায়দার নদী যাত্রায় এক ভয়ঙ্কর ঝড়ের ঘটনা লিখেছেন মোবারক হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তিনি যুক্তিবাদী গবেষক  সদরঘাটের ইতিহাস জানতে চান কাগজ, নথি মানুষের স্মৃতিসহ নানাভাবে জানার চেষ্টা করেছেন কিন্তু কোনোভাবেই জানতে পারছেন না মন্ত্রী, সচিব, পরিচিতজন সব জায়গায় খোঁজ করে ব্যর্থ হয়েছেন তাঁর কাছ থেকে ইতিহাস যেন দূরে সরে যাচ্ছে তিনি ক্লান্ত বিরক্ত

অন্যদিকে  স্ত্রী জয়িতা রহমানের জীবনের আরেক বাস্তবতা অভিযোগ ইতিহাস নয়, দৈনন্দিন জীবনকাজের মানুষ নাইএই এক বাক্যে আটকে আছে তার ক্লান্তি একজন খুঁজছেন অতীত আরেকজন বর্তমান দ্বন্দ্বই জীবন

প্রায় ষোলো বছর আগের ঘটনা তখন মোবারক হোসনের নদী পথে বরিশাল যাওয়ার এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার হয়েছে তিনি অস্টেলিয়া, কানাডা, দুবাই, সিঙ্গাপুরসহ পৃথিবীর নানা দেশ ঘুরেছেন কিন্তু নদী পথের অভিজ্ঞতা নেই অমলেন্দু ঘোষ নামে তাঁর এক প্র্রিয় ছাত্র ছিল ছাত্রের বাড়ি বরিশাল তখন এই ছাত্রের বিয়েতে বরিশাল গিয়েছিলেন তিনি  স্ত্রী জয়িতা রহমান   অমলেন্দুর অন্য শিক্ষক, বন্ধু মিলে ১০/১২ জনের এক দল মোবারক হোসেন ছিলেন দলনেতা

লঞ্চের নাম, ‘এমভি সামাদবড় লঞ্চ আরামদায়ক কেবিন খালাসিরা সুরে ডাকে-‘ আগে যাবি সামাদে, ‘আগে বাড়ি সামাদেএটা নিয়ে সবাই মজা করে লঞ্চ থেকে চার পাশের প্রকৃতি, দূরের আকাশ, পাখি, গ্রাম সবকিছু দেখা যায় যেন এক চিত্রকর্ম  জীবন কত সুন্দর!

কিন্তু সৌন্দর্যের গভীরে লুকানো থকে কঠিন বিপদ, লঞ্চ চলতে থাকে চলতে চলতে এক সময় আসে চাঁদপুরের মোহনায় সেখানে পদ্মা, মেঘনা, ডাকাতিয়া এই তিন নদীর অভিসার অসীম বিস্তৃতি জলের  অনন্ত দিগন্ত দলের সদস্য অধ্যাপক মতিন বলেন, ‘জীবনে  অনেক দূরে অনেক জায়গায় যাওয়া হবে কিন্তু প্রকৃতির এই দৃশ্য হয়তো কোনোদিন দেখা হবে নামুহূর্তটা স্মরণীয় করে রাখতে সবাই লঞ্চের ছাদে যায় চা পান করতে করতে শুরু হয়  গল্প, কবিতা, গান শেষে বরীন্দ্রনাথের শৈশব সন্ধ্যাকবিতার আবৃত্তি অশেষ আনন্দের মুহূর্ত

হঠাৎ বদলে যায় আকাশ গতি বাড়ে বাতাসের  একের পর এক বিশাল ঝাঁকুনি তাণ্ডব কেঁপে ওঠে লঞ্চ মানুষ ছিটকে পড়ে একে অন্যের গায়ে ভেঙে যায় কাপ-পিরিচ নদী আর নদী থাকে না যেন এক দানব!

ঢেউ একবার লঞ্চকে অনেক ওপরে নেয় আবার নিচে ফেলে দেয় চারদিকে শুধু চিৎকার! ভয়! অসহায়ত্ব! কেউ আজান দেয় কেউ প্রার্থনা করে কেউ কাঁপতে থাকে জ্ঞান, যুক্তি, শিক্ষা সব এক মুহূর্তে অর্থহীন মানুষ তখন শুধুই মানুষ সবাই মৃত্যুর খুব কাছে অধ্যাপক মুজাফফর হোসেন বন্ধু মতিনের হাত ধরে বলে, ‘যদি মরে যাই, লাশটা বাসায় পৌঁছে দিও এক উচ্চারণে পুরো জীবনের ভয়, ভালোবাসা, সম্পর্ক, সব আছে ঢেউ এসে ভিজিয়ে দেয় সবাইকে জল ঢুকে পড়ে কেবিনে

মতিন স্যার  ছুটে যায় গোবিন্দ হালদারের রুমে দেখে সব ভেসে গেছে গোবিন্দ, হালদার, তাঁর স্ত্রী কন্যা সবই  জলে ভাসছে, প্রায় অচেতন এই দৃশ্য একজন মানুষের জন্য কষ্টের এতকিছুর পরও জীবন থামে না এক সময় ঝড় থেমে যায় ঝড়ের পর এক গভীর নীরবতা আকাশ পরিষ্কার হলে তারা উঠে

একটু আগের ভয়ঙ্কর রুদ্রমূর্তির নদী এখন শান্ত, নীরব, নিস্তব্ধ কিছুক্ষণ আগে যেখানে মৃত্যু ছিল সেখানে এখন সৌন্দর্য এটাই প্রকৃতি এটাই জীবন  লঞ্চের ভেতর এখনো লন্ডভন্ড বমি, ভয়, চারদিক এলোমেলো মানুষের ভেঙে পড়া চেহারা তবুও বেঁচে আছে

জীবন কত বৈচিত্র্য এক সময় লঞ্চ পৌঁছে বরিশাল স্টেশনে ফুল হাতে অপেক্ষা করছে মানুষ অমলেন্দু, তার বাবা সবাই আনন্দে কিছুক্ষণ আগে যারা মৃত্যুর মুখে তারা এখন সম্মানিত অতিথি সবার গলায় ফুলের মালা জীবন আসলে এমনই এক মুহূর্তে মৃত্যু পর মুহূর্তে উৎসব

পুরো ঘটনাটি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয় এক চিরচেনা প্রতীক নদী পথে এমন পরিস্থিতিও হয় মনি হায়দারের উপন্যাসমোকাম সদরঘাট নদী জীবন্ত চরিত্রগুলো বাস্তব তাদের হাসি, কান্না, মৃত্যুভয় সব স্পর্শ করে গভীরভাবে পাঠকদের তিনি দেখিয়েছেন, মানুষ যত বড়ই হোক, প্রকৃতির কাছে কত ক্ষুদ্র! জীবন কখনো স্থির নয় প্রতিনিয়ত জীবনের গতি বদলায়

মোকাম সদরঘাটউপন্যাসে আতঙ্ক দেখি অহংকার ভাঙতে দেখি ভালোবাসা দেখি আবার হারানোর কষ্ট দেখি উপন্যাস পড়লে মনে হয়, আমরা সবাই একটা লঞ্চে  যাত্রী হয়ে আছি জীবন নদীতে ভাসছি কখন ঝড় আসবে জানি না কিন্তু যাত্রা থামবে না কারণ, জীবন মানেই চলা জীবন মানেই অনিশ্চয়তা  জীবন মানেই, ঝড় ঝড় পেরিয়ে আকাশের তারা দেখা আর জীবনের আলোয় অবগাহন

 

মোকাম সদরঘাটের ভাষা :  

উপন্যাসের সরল সংবেদনশীল পাঠ করতে গেলে স্রোতের মতো ভাষা এগিয়ে নেয় পাঠককে রবিশাল অঞ্চলের কয়েকটি চরিত্র স্থানীয় ভাষায় কথা বরল ফলে, উপন্যানটি স্থানীয় সময় জীবনেরও প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে প্রকাশ করে  জীবনের তীব্রতা স্থানীয় সংলাপ শ্রমজীবী মানুষের ভাষার বর্ণনায় এক ধরনের কবিত্ব সৃষ্টি করেছেন মনি হায়দার মোকাম সদরঘাটশহর সভ্যতার বিবর্তন, গ্রামীণ মানুষের জীবন মানবিক সংকটের অনুপ্খুক  দলিল যেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ এসে ভিড় করে আবার প্রয়োজনে চলে যায় নদীর মতোই এক বোহেমিয়ান জীবন মোকাম সদরঘাট

উপন্যাসটির অসাধারণ গল্প দারুণ সব চরিত্র, সংলাপ এক কথায়  মোকাম সদরঘাট’ ‍উপন্যাসটি বাংলা কথাসাহিত্যের ধারায় অনন্য এক কথাসাহিত্য

 

নতুন দৃষ্টান্ত :

মনি হায়দারের মোকাম সদরঘাট উপন্যাস লিখবার জন্য অনেক প্রস্তুতি নিয়েছেন, পাঠ করলে অনায়াসে বোঝা যায় তিনি মোকাম সদরঘাট বাংলা সাহিত্য নতুন একটা ধারা সৃষ্টি করেছেন, উপন্যাস একটি কিন্তু চেতনা প্রবাহদুটি শিমুল- মিলি একটা ধারা, দ্বিতীয় ধারা আবিরতারিন একইসঙ্গে দুটি তরঙ্গ- একটি নদীতে চলছে পাশাপাশি কিন্তু কারো সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই আবার চারটি চরিত্র মিলে একটা নদী, পাচঁশত পৃষ্ঠার বিশাল উপন্যাস বিশাল ক্যানভাসে যুক্ত করে দিয়েছেন উপন্যাসিক মনি হায়দার আমার জানা নেই, পৃথিবীর আর ভাষার কোনো উপন্যাসিক এমন পরীক্ষা বা নিরীক্ষা করেছেন কি না!

 

কিছু প্রশ্ন কিছু কথা:

যেকোনো পাঠক উপন্যাসটি একবার পড়া শুরু করলে শেষে করতে ইচ্ছে করবে মোকামবলতে সাধারণত যা বোঝায় সেই অর্থে এই উপন্যাসের নাম মোকাম সদরঘাটহয়েছে মনে হয়নি উপন্যাসের চরিত্র-হাসেম মিয়া-চামেলি, রিফাত-ময়নাকে নিয়ে আলাদা আলাদা উপন্যাস হতে পারত সবচেয়ে যেটি বেশি মনে হয়েছে সেটি হলো উপন্যাস এত  দীর্ঘ নাও হতে পারত দূরের কোনো গ্র্রাম থেকে উঠে আসা এসএসসি পাস আবির শহরে এসেই বুড়ি গঙ্গা নদী, বাহদুর শাহ্পার্ক, মুঘল সম্রাটসহ নানা বিষয় ভারি ভারি কথা বলা শুরু করেছে যা আরও ধীরে ধীরে করলে হয়তো ভালো হতো সেই পিরোজপুরের উজানগাঁও থেকে শুরু করে ঢাকা মেট্রেপলিটন শহর পযর্ন্ত আবিরের যে বর্ণাঢ্য যৌন সম্পর্ক সেটা আরেকটু রক্ষণশীল হতে পারত

 নির্নিমেষশব্দটি এতো বার এসেছে যে চেখে লেগেছে বিকল্প শব্দ-পলকহীনঅপলক, এক দৃষ্টিতে, নিমেষহীন, ইত্যাদি দেওয়া যেত

 

যখন শেষের দিকে :

সবকিছু সর্বাঙ্গীণ সুন্দর হলেও মানুষের প্রবণতা হলো দোষ খোঁজা রবীন্দ্রনাথ বলেছেন মানুষেরযখন আর কিছু সমালোচনার থাকে না তখন সে বলে-‘আরও ভালো হলে আরও ভালো হতো 



অলংকরণঃ তাইফ আদনান