আশির দশকের শুরুর দিকে বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে নাসরীন জাহানের আবির্ভাব। ‘উড়ুক্কু’ উপন্যাসের মাধ্যমে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। এই উপন্যাসের জন্য নাসরীন জাহান অর্জন করেন ‘ফিলিপ্স সাহিত্য পুরস্কার’। এছাড়া বাংলা সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য লাভ করেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। ২০২৫ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘পালকের চিহ্নগুলো’।
এ গ্রন্থে ব্যক্তি, লেখক, মানুষ সব একাকার। লেখক কখনও পীড়িত; কখনও যন্ত্রণাকাতর একজন মানুষের অবয়ব। ‘পালকের চিহ্নগুলো’ তাঁর জীবনের অনাবৃত সত্যের অক্ষরযাত্রা। এতে আছে শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে প্রাপ্তবয়স্কজীবনের প্রতিটি ধাপে তাঁর সেই স্রোতের প্রতিধ্বনি। এটি নিছক কোনো স্মৃতিচারণ নয়; এটি তাঁর জীবনের বিভিন্ন আঘাত, অর্জন, স্বপ্ন ও সংগ্রামের প্রতিফলন। এতে পাঠক শুধু একজন লেখকের জীবনের ছায়া নয়; বরং বিভিন্ন সামাজিক প্রেক্ষাপটে একজন মানুষের গড়ে ওঠাও দেখতে পাবেন। শৈশবের ক্ষত, প্রেমের উন্মাদনা, দাম্পত্যের ঢেউ, মৃত্যুর সঙ্গে বোঝাপড়া- সবকিছু এসেছে অবলীলায়। পাঠকের কাছে কিছু পর্ব রোমাঞ্চকর ও শ্বাসরুদ্ধকরও মনে হতে পারে। রূঢ়, যন্ত্রণাকাতর সব বিষয় অনায়াসে উঠে এসেছে এখানে।
গ্রন্থটির নাম সম্পর্কে নাসরীন জাহান এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি যখন নাম খুঁজছিলাম তখন আশরাফ (কবি আশরাফ আহমদ) হঠাৎ করে বললো বইয়ের নাম ‘পালকের চিহ্নগুলো’ রাখো। তুমি তো বুঝতেই পারছো ‘পালকের চিহ্নগুলো’ কেমন অনুভব দেয়- পাখি উড়ে যায়, ছায়া পড়ে থাকে এরকম আরকি।’
কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহান তাঁর এই স্মৃতিকথা ধারবাহিকভাবে লিখেছেন ফেসবুকে। আজীবন কাগজ-কলমে লেখা এই লেখক এ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে নিজের শিল্প প্রকাশের মাধ্যম করেছেন এক দুর্ঘটনায় পড়ার পর থেকে।
জীবনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়গুলো অনায়াসে তুলে ধরেছেন শৈল্পিকভাবে। বাদ পড়েনি শৈশবে লাঞ্ছিত হওয়া থেকে শুরু করে যৌবনের প্রেম- জীবনের একটা পর্যায় পাড়ি দিয়ে এসে জুজুবুড়ি মৃত্যুর সাথে কথা-বার্তার তীব্র অনুভূতিগুলো। এসেছে প্রথম প্রেম, কাবিনের পরে জীবনে আসা উন্মাতাল ঝড়। দাম্পত্য শান্তি-অশান্তির নানা স্তরের মধ্যেই জীবনউজাড় করে সাহিত্য রচনা করে গেছেন তিনি। এ লেখার মূল শক্তি লেখনীর অকপট সারল্য। বিশ্বের নানা জায়গায় ঘুরেছেন বলে এ গদ্যে আছে ভ্রমণকাহিনির স্বাদও।
অনেক সাহিত্যিকের মতে, আত্মজীবনীর আরেকটা সংস্করণ হলো স্মৃতিকথা, ইংরেজি মেমোয়ার। স্মৃতিকথায় আত্মজীবনীর মতো এত সবিস্তারে থাকে না। কিছু ঘটনা ও বিষয় আসে। যিনি লিখছেন তাঁর ব্যক্তিগত অভিমত আসে। সেখানে জীবনের সমস্তই আসবে এমন আশা করা যায় না। অর্থাৎ স্মৃতিকথা আংশিক আর আত্মজীবনী সার্বিক। এ ক্ষেত্রে ‘পালকের চিহ্নগুলো’ স্মৃতিকথা ও আত্মজীবনীর মাঝামাঝি বলা যেতে পারে।
আত্মজীবনী একজন মানুষের শৈশব থেকে শুরু করে বার্ধক্য পর্যন্ত অথবা জীবনের কোনো বিশেষ পর্বে যা যা ঘটেছে তার স্মৃতির ওপর ভিত্তিকৃত রচনা। আত্মজীবনীতে একজন মানুষের জীবনের সব অভিজ্ঞতা আসার কথা থাকলেও আমরা জানি প্রকৃতপক্ষে একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়গুলো সাধারণত অব্যক্ত থেকে যায়। যেমন- অপ্রকাশিত প্রেম, যৌনতা বা দাম্পত্য জীবন বিষয়ে কেউ কেউ বলতে চান না। ‘পালকের চিহ্নগুলো’ গ্রন্থে নাসরীন জাহান জীবনের এমন অনেক গল্পই তুলে ধরেছেন।
ছোটবেলার গ্রাম, সরষে-মাঠে পড়ে থাকা, প্রকৃতির সঙ্গে প্রথম আলাপ- এগুলো কেবল দৃশ্যের বর্ণনা নয়; এতে শিল্পীর দৃষ্টি, কল্পনা এবং মননশীলতা ফুটে ওঠে। নাসরীন শিশু বয়স থেকেই প্রকৃতিপ্রেমী, কৌতূহলী এবং জীবনের সাধারণ বিষয়গুলোকে গভীরভাবে অনুভব করার ক্ষমতা রাখতেন। তিনি দেখান কীভাবে শিশুর নির্দোষতা ও অনুভূতির সরলতা পরবর্তী সাহিত্যিক প্রতিভার ভিত্তি গড়ে তোলে।
স্মৃতিকথায় নাসরীন জাহান লিখেছেন, ‘যুদ্ধের পরে রূপকথার গ্রাম ছেড়ে ইটপাথরের মফস্বলের বাড়িতে আসা যেন একেবারে বিপরীত অভিজ্ঞতা। সেখানে বাতাসে জড়তা, চারপাশে ঘরের দেওয়ালে ঘনত্ব- সবকিছু যেন দম আটকে দেয়। ময়মনসিংহ শহরে এসে সানকিপাড়া প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস টু-তে ভর্তি হলা। নতুন শহর, নতুন পরিবেশ, এবং নতুন মানুষ- সবকিছুই প্রথম দেখার মতো। কিন্তু এই নতুন অভিজ্ঞতার মধ্যেও আমার প্রকৃতিপ্রেম, আমার লেখা, আমার প্রথম কল্পনা- সবই থেমে থাকেনি। বরং শহরের ইটপাথরের নীরবতা আমাকে আরও গভীরভাবে আমার অভ্যন্তরীণ ভাবনার দিকে চালিত করেছে।
‘এভাবেই আমার ছোট্ট জীবন, প্রকৃতি এবং লেখার প্রথম স্পর্শ এক ধারাহিসেবে প্রবাহিত হতে থাকে। প্রত্যেক ছোট মুহূর্ত, প্রতিটি ঘ্রাণ, প্রতিটিবন্ধুত্বের হাসি- সবকিছুই তখন থেকে লেখা এবং স্মৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে।’ (পৃ.৯)
শৈশবের প্রথম প্রেম নিয়ে নাসরীন জাহান লিখেছেন, ‘আমার প্রথম প্রেম ক্লাস থ্রিতে থাকতেই। মেয়েদের শরীরে কোন বয়সে কী তরঙ্গ হয়, আমি শৈশব থেকেই জানি। প্রায়ই নানা বাড়ি যেতাম। শহর থেকে তালুকদার বাড়িতে আসা সদ্য গোঁফ ওঠা সুন্দর এক ছেলে (আমাদের খাঁ বাড়ির রাস্তার অপজিটে তালুকদার বাড়ি ছিল) খুব চক্কর খাচ্ছিল। সেই প্রথম কাঁঠালপাতায় কুপি জ্বালিয়ে কাজল বানিয়ে প্রথম আমার চোখে মাখা। কিন্তু আমি তার মুখোমুখি হলেই উলটো দিকে হাঁটা দিতাম। কিন্তু সেই ছেলে আমার মতো পিচ্চি মেয়ের সাথেও কিন্তু টাংকি মারত। এরপর এরচেয়ে মহা গভীর প্রেম এসেছে জীবনে, ভেতরে বিষের বালি নিয়ে উলটো দিকে আমার হাঁটার কারণে সেসব প্রেম পরিণতি পায়নি।’ (পৃ.২২)
এই অংশ থেকে বোঝা যায় যে শৈশবের প্রথম প্রেম ছিল একটি সরল, নির্দোষ আবেগময় অভিজ্ঞতা, যা কৌতূহল, লাজ এবং শিশুসুলভপ্রেমের মিশ্রণে রূপ পেয়েছে। এই ছোট ছোট ঘটনা শুধুমাত্র শৈশবের স্মৃতি নয়; এগুলো নাসরীন জাহানের অনুভূতির সূক্ষতা এবং কৌতূহলের নাজুক ও জীবন্ত প্রতিফলন। শিক্ষাজীবনও তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঠনপাঠন, গ্রন্থাগার থেকে বই ধার করা, স্কুলের পাঠ্যক্রমের বাইরে নিজেকে সময় দেওয়া- এসব অভিজ্ঞতা তাকে শৈশব থেকেই জ্ঞানচর্চায়ও সাহিত্যিক মননে প্রবৃদ্ধ করে। প্রথম কবিতা ও ছোটগল্প রচনা তাকে সাহিত্যিক পরিপক্কতার দিকে ধাবিত করে। এসব স্মৃতি শুধু শিক্ষাগত নয়; বরং পাঠককে দেখায় কীভাবে ছোট ছোট অনুপ্রেরণা বিকশিত করতে পারে সাহিত্যিক প্রতিভা।
বিয়ের পর তাঁর জীবনে অনেক কিছু পাল্টে গেল। হঠাৎ করেই তিনি হয়ে গেলেন সংসারের বড় বউ। আশরাফ তাঁর বয়সে আট বছরের বড়; এমনকি সংসারে থাকা আট দেবর-ননদ প্রায় সবারই বয়স তার চেয়ে বেশি। তবু বয়সের হিসাবে ছোট হওয়া নাসরীন জাহান কোনো ছাড় পাননি; বড় ভাবির দায়িত্ব পালন করতেই হয়েছে।
আত্মীয়স্বজনদের দেখাশোনার দায়িত্বও তার কাঁধে এসে পড়ল। বাবা ছিলেন বোহেমিয়ান ধাঁচের মানুষ, তাই মা সবসময়ই মেয়ের ওপর নির্ভর করতেন। ফলে যখন-তখন আত্মীয়স্বজন তাদের বাড়িতে বেড়াতে এলে সামলাতে হতো তাকেই। দিনভর কাজের ভিড়ে ক্লান্ত শরীর, অথচ রাত জেগে তিনি লিখে যেতেন। চোখে ঘুম ভর করত, কিন্তু ঘুম তাড়াতে কত কৌশলই না করতেন। রাতই ছিল তার লেখার সময়- শব্দ কম, চারপাশ শান্ত। ধীরে ধীরে সেই রাতের অভ্যাস জায়গা করে নিল তার ভেতরে; যখনই অবসর পেতেন, তখনই লিখতে বসতেন।
বিয়ের পরেও পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন, চাকরিও করেছেন। তবে কোনোদিন ‘ফুলটাইম জব’-এর বাঁধনে নিজেকে জড়াননি। ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময় বিয়ে, তারপর এমএ পর্যন্ত পড়াশোনা- সবকিছু পাশাপাশি চলেছে লেখালিখির সঙ্গে। তবে তার মনের ভেতর একটা স্বপ্ন ছিল- নিজস্ব একটি পড়ার ঘর বা স্টাডি রুম। সেই ঘর হওয়ার আগেই তিনি লিখে ফেললেন ‘উডুক্কু’। ইতোমধ্যেই পেয়েছেন চার-পাঁচটি পুরস্কার। ভার্জিনিয়া উলফের ‘আ রুম অব ওয়ান’স ওন’-এর মতোই, নাসরীন জাহানের লেখায় ব্যক্তিগত ও সামাজিক ইতিহাসের মিলন স্পষ্ট। এখানেও একটা ব্যক্তিগত পড়ার ঘরের আকুতি দৃশ্যমান!
বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়ার পর অবশেষে বর্তমান বাড়িতে তার সেই কাঙ্ক্ষিত স্টাডি রুম হলো। কিন্তু ঘরে ঢুকেই এক অদ্ভুত অস্বস্তি গ্রাস করল। দমবন্ধ লাগল। তবে এর মধ্যেই বাইরে লেখার অভ্যাস গড়ে উঠেছে তাঁর। ঘরের চার দেয়ালের ভেতর আর তিনি বসতে পারেননি। সাধের পড়ার ঘর আর তাঁর তেমন কোনো কাজে আসেনি।
পরিবার ও সমাজচেতনার প্রভাবও অসীম। বাবা-মায়ের শিক্ষাগত ও নৈতিক দিকনির্দেশনা নাসরীনকে মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং জীবনদর্শন শিখিয়েছে। লেখক নাসরীন দেখান কীভাবে পরিবার, পরিচিতজন ও সমাজের ছোট ছোট ঘটনা নারীর স্বাধীনতা, ক্ষমতা এবং সামাজিক ভূমিকার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করে। এমনকি শৈশবের প্রথম প্রেম, বাড়ির প্রতিবেশী, স্কুলজীবন, ছোটগল্পের চরিত্র—সবই সামাজিক ও ব্যক্তিগত শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
‘পালকের চিহ্নগুলো’তে নাসরীন জাহানের সাহিত্যিক যাত্রার প্রতিটি পদক্ষেপ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। প্রথম প্রকাশনা, পরবর্তী পাঁচটি বই এবং পুরস্কারপ্রাপ্ত কাজগুলো কেবল ব্যক্তিগত গৌরব নয়; এটি বাংলাসাহিত্যের চলমান ধারার প্রতিফলন বলে আখ্যায়িত করেছেন এ কথাসাহিত্যিক। দেখিয়েছেন, প্রকাশক ও পাঠকের প্রতিক্রিয়া লেখকের শৈলী ও লেখা তৈরিতে প্রভাব ফেলে। তিনি আরও উপস্থাপন করেন যে, সাহিত্যকর্ম কখনোই শূন্য থেকে তৈরি হয় না; এর পেছনে থাকে সময়, সংগ্রাম, সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং ব্যক্তিগত মননশীলতা।
সাহিত্যিক প্রেরণা ও সহযাত্রা নাসরীন জাহান লিখেছেন, ‘তখন লেখালিখি করত, এখন পুরোদস্তুর টিভি রিপোর্টার। যুবদার সঙ্গে যখন পরিচয় হয়নি, তারও আগে থেকে নজরুল বেশিরভাগ সময় আমাদের বাসায় এসে কাটাত। তার সাথে দিন-রাত্রির সাহিত্য আড্ডা ছিল তুলনাহীন। হঠাৎ হঠাৎ কাঁধে একটা ঝোলা নিয়ে চলে আসত। আমার জীবনের এমন কোনো গল্প নেই তাঁর সঙ্গে আমি করতাম না। তার সবচেয়ে যে ব্যাপারটা তীব্র ছিল, নিরন্তর আমাকে দিয়ে লিখিয়ে যেত। কোনো একটা বিষয় উচ্চারণ করলেই বলত, লিখে ফ্যালেন। যদি বলতাম, আমার দ্বারা আর সাহিত্য হবে না, সে প্রেরণাদায়ক বই আমার সামনে তুলে ধরে বলত, এটা আগে পড়েন, পরে মনে যা হয় লিখে ফ্যালেন। পত্রিকা অফিস প্রণোদনা থেকে আমার লেখা নিতে এসে সেরীন ফেরদৌস, যে আমার জীবনের মধুরতর লেখা, ভ্রমণ- নানারকম-সঙ্গী হয়ে উঠেছিল, সেটা আমি কল্পনা করেছিলাম? স্বপ্নবাজ-এর সাথে সেরীনও জড়িয়ে গিয়েছিল। এই দুজনেই একসময় যুবদার অনেক প্রিয়জন হয়ে উঠেছিল।’ (পৃ.১১৯)
নাসরীন জাহান আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নিজেকে আরও মেলে ধরেছেন। কিছু লেখা তখনকার অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও, পরবর্তী উপলব্ধি ও সাহিত্যিক পরিপক্কতার সঙ্গে তা মেলানো যায়। এটি প্রমাণ করে- তিনি শুধু নিজের গৌরব দেখাননি, সীমাবদ্ধতাকেও স্বীকার করেছেন। পাঠক এবং সাহিত্যিক উভয়ের জন্য এটি শিক্ষণীয়, কারণ এটি দেখায় কীভাবে একজন লেখক নিজের কাজের ওপর নিরপেক্ষ হতে পারে।
জীবনের নাটকীয়তা ও বাস্তবের টানাপড়েন নিয়ে নাসরীন জাহান লিখেছেন, ‘আমরা বাইরের ঘরে ঘুমিয়েছিলাম। কিছুক্ষণ পর আমাদের দরজায় ধুমধুম শব্দ! প্রচণ্ড! কাঁচা ঘুম ভেঙে আমরা চোখ কচলে দরজা খুলি। হাঁপাতে হাঁপাতে একজন এসে জানায়, নানা তার সমস্ত সন্তানদের নিয়ে গতরাতে বিষ খেয়ে মারা গিয়েছেন!
আমি আশরাফের হাত কষে চেপে ধরলাম! আমি কিছু ভাবতে পারছিলাম না। এই তো রাতে এলেন, শিপন ভাইয়ের হাতে চিঠি দিয়ে তাড়া দিলেন, কিচ্ছু বোঝা যায়নি, কী সুন্দর অবলীলায় আমাদের দাম্পত্য সমঝোতার কথা বলে গেলেন। তারপরই? এ যে আমার কল্পনার বাইরের ব্যাপার! আমার কেবল আঙ্কেলের হাত ধরে ছুটতে থাকা মাথায় জরি টুপি পরা সেই ছোট রাজপুত্রের কথা মনে পড়ছিল, আহা কীভাবে পারলেন নানা?
‘ধীরে ধীরে জানতে পারি, বড় মেয়েটা বেঁচে গেছে। হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়ছে। আরও ক’বছর পরে জানতে পারি, মেয়েটার চিকিৎসা করতে করতেই এক ডাক্তার প্রেমে পড়ে তাঁকে বিয়ে করেছে। এখনকার মতো তখনো অনেক আজেবাজে কথা রটেছিল। প্রযুক্তি ছিল না, তাই সেসব স্ফুলিঙ্গ হতে পারেনি। এই যে আমার লেখা স্থির সমান্তরালে চলতে চলতে নাটকীয়ভাবে টার্ন নেয়, এ আমার জীবনের এমন নাটকীয় অভিজ্ঞতাগুলোর কারণেই হয়তো।’ (পৃ.১৪৭)
এই অংশে তিনি জীবনের নাটকীয়তা এবং অনিশ্চয়তার সঙ্গে তার সম্পর্ক তুলে ধরেছেন। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ঘটনার মাধ্যমে জীবন কীভাবে আকস্মিক পরিবর্তন এনে দেয় তা তিনি স্পষ্ট করেছেন। ঘটনাগুলো শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়, বরং জীবনের বাস্তবতা এবং সাহিত্যে নাটকীয় টানাপোড়েনের প্রতিফলন। এটি পাঠককে শেখায়, জীবনের স্থিরতা কখনো ভ্রান্ত প্রতিশ্রুতি, এবং লেখা কখনো জীবনের অবিচ্ছেদ্য ধারার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
নারীচেতনাসম্পন্ন চিন্তাভাবনাও তাঁর আত্মজীবনীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সমাজে নারীর শিক্ষাগত, সামাজিক এবং সাহিত্যিক সীমাবদ্ধতা তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন এ গ্রন্থে। তিনি দেখান, কীভাবে নিজে সেই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করেন এবং পাঠককে মনে করিয়ে দেন, নারীর স্বাধীনতা কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অংশ।
লেখক তাঁর সাহিত্যিক জীবনকালে বিভিন্ন পুরস্কার ও স্বীকৃতি পেয়েছেন। এই পুরস্কার কেবল গৌরবের প্রতীক নয়; এটি তার কাজের সামাজিক প্রভাব এবং পাঠকের স্বীকৃতিও নির্দেশ করে। তিনি লিখেছেন, কীভাবে স্বীকৃতি তাঁর সাহিত্যচর্চার দায়বোধ আরও বাড়িয়েছে। পুরস্কার বা পরিচিতি লেখকের দায়িত্ববোধকে প্রভাবিত করতে পারে না, বরং লেখার মৌলিক দায়িত্ব ব্যক্তিগত থাকে।
নাসরীন জাহান দেখিয়েছেন যে, সাহিত্যিক স্বীকৃতি এবং পুরস্কার কেবল প্রাপ্তি বা পরিচিতির প্রতীক নয়। তিনি বিশ্বাস করেন যে লেখকের দায়, পরিশ্রম ও অভিজ্ঞতা সবসময় তার ব্যক্তিগত এবং অন্তর্নিহিত বিষয়, যা কোনো পুরস্কার দ্বারা বড় বা ছোট হয় না। পুরস্কার সম্মান ও প্রেরণা দিতে পারে, তবে লেখার মৌলিকতা এবং দায়বোধ লেখকের নিজস্ব। এই অংশটি পাঠককে শেখায়, সত্যিকারের সাহিত্যিকতার মূল উদ্দীপনা সবসময় ব্যক্তিগত প্রতিশ্রুতি, অনুপ্রেরণা এবং নিজের সৃষ্টি-প্রক্রিয়ার প্রতি দায়িত্ববোধ।
এ প্রসঙ্গে নাসরীন জাহান লিখেছেন, ‘একটা জায়গায় পৌঁছানোর স্বপ্ন অবশ্যই দেখেছি। কিন্তু এ যেন লটারি পাওয়ার মতো অবস্থা হচ্ছে। আমি এত জনপ্রিয় কোনোদিন হতে চাইনি যে, অটোগ্রাফ দিতে দিতে আমাকে ক্লান্ত হতে হবে? এসব স্থায়ী নয়, এ চক্র থেকে আমাকে বেরোতে হবে।
‘‘হোটেল শেরাটনে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান হলো। সেখানে আমি তীব্রভাবে বললাম, অনেকে প্রশ্ন করেছেন এই প্রাপ্তি আমার লেখার প্রতি দায়িত্ববোধ বাড়িয়ে দিচ্ছে কিনা? উত্তরে আমি বলব, অবশ্যই না। পুরস্কার কখনো লেখকের চেয়ে বড় হতে পারে না। পুরস্কার যে লেখকের দায়িত্ববোধ বাড়ায়, তিনি কখনোই মৌলিক লেখক নন। নিরপেক্ষভাবে পাওয়া এই পুরস্কার আমাকে সম্মানিত করেছে। তাতে আমি আনন্দিত। লেখার দায় একেবারেই লেখকের ব্যক্তিগত বিষয়। আমি সবসময় বলি, লেখক টেবিলে একা। আজও আমি তাই বলব। আমি যখন লেখি পাঠকের মুখ, প্রাপ্তি সব ভুলে যাই। কারণ আমি এখনো মনে করি, ‘উড়ুক্কু’ প্রথম প্রকাশের সময় জলভরা চোখে যতই আমি ভেবে থাকি, আর বই করব না, একসময় আমি বই করতাম।’’ (পৃ.৯৯)
পালকের চিহ্নগুলোতে জীবনের ছোট ছোট দৃশ্য, ভ্রমণ, সাহিত্য-আড্ডা এবং বন্ধুত্বের গল্পগুলোও বর্ণিত হয়েছে। ঢাকায় বইমেলা, শহরজীবনের ঝঞ্ঝাট, পাহাড়ের ভ্রমণ- সবকিছুই জীবনের শিক্ষা এবং অনুভূতির সমৃদ্ধ একটি চিত্র। তিনি খুব সাবলীলভাবে প্রতিটি অভিজ্ঞতা সাহিত্যিক মননের পুষ্টি দিয়েছেন। তিনি স্মরণ করান, যাদের সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন, যাদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়েছেন- এসব সম্পর্ক এবং ঘটনাগুলো তাঁর লেখার অন্তর্দৃষ্টি গঠনে অপরিহার্য।
জীবনের দর্শন ও মানবিকতার দিক থেকেও এই স্মৃতিকথাটি ভীষণ সমৃদ্ধ। সংগ্রাম, প্রত্যাশা, আশা এবং মানবিক মূল্যবোধ মিলিত হয়ে তাঁর জীবন গঠন করেছে। এখানে বিশেষভাবে ফুটে ওঠে- সাহিত্য শুধু নিজের জন্য নয়, সমাজের জন্যও করা যায়। প্রতিটি অংশ যেন পাঠককে ভাবতে, উপলব্ধি করতে এবং সহানুভূতিশীল হতে শেখায়।
নাসরীন জাহানের মতে, মৃত্যুই সব। জীবন তো এক ক্ষণমুহূর্ত মাত্র। জীবন আসলেই একটিমাত্র মুহূর্ত, বাকিটা অনন্ত অন্ধকার। ফলে মানুষ যখন হাঁটতে থাকে, শেষে গিয়ে তাকেই দাঁড়াতে হয় অন্ধকারের মুখোমুখি- অর্থাৎ মৃত্যুর কাছে। কাব্যিকভাবে মৃত্যুকে সুন্দর, জৌলুসপূর্ণ বলে সাজানো হলেও মৃত্যুর মতো দিগন্তব্যাপী হাহাকার আর কিছুতে নেই।
ঘটনাবহুল পরিক্রমার মধ্য দিয়ে তাঁর এক শক্তিশালী জীবনবোধ গড়ে ওঠেছে। জীবন শেষে এই বাড়ি-ঘর বা মায়ার কোনো কিছুর কাছে আর কোনোদিন ফেরা হবে না। একশো শতাব্দী, দুইশো শতাব্দী, কোটি শতাব্দী চলে যাবে, তবু আর ফেরা হবে না। এই যে বিশাল না-ফেরার সত্যকেই আমরা ‘অনায়াস’ ভেবে নিই; যা লেখকের কাছে এক বিশাল বিস্ময়। তিনি ভাবেন, মানুষের মনোবল যদি এত প্রবল না হতো, তবে কীভাবে এ সত্য সামলে এত হাসিখুশি থাকা সম্ভব! হয়তো সৃষ্টিশীল মানুষের ভেতরে এই হাহাকারই নিরন্তর তাড়না হিসেবে কাজ করে। তাদের মনে হয়, কিছু না কিছু রেখে যাই। হয়তো তাঁর মনে হতে থাকে- যদি কেউ তাঁকে মনে রাখে। একজন লেখকের মনে হতে থাকে- যদি কেউ তাঁর লেখা পড়ে স্মরণ করে। সমাজের সব মানুষের ভেতরেও এই তাড়না আছে। তারা ছেলে সন্তান চায়, ভাবে ছেলে হলে বংশের পরিচয় থাকবে, বংশের বাতি জ্বলতে থাকবে। অথচ মরে গেলে জীবনের সঙ্গে তার আর কোনো লেনদেন থাকে না। স্মৃতিকথাটির প্রতিটি অধ্যায় পাঠককে একটি সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা দেয়। লেখার গঠন, ভাষা, আবেগ, তথ্য এবং জীবনচিত্রের সমন্বয় পাঠকের মনে এক গভীর ছাপ ফেলে। এটি কেবল পড়ার জন্য নয়, চিন্তা করার জন্য ভীষণ জরুরি। নাসরীন জাহান পাঠককে তাঁর জীবন ও সাহিত্যিক পথচলায় নিমজ্জিত করেন, যেন আমরা তাঁর সঙ্গে হাঁটছি, অনুভব করছি এবং শিখছি।
‘পালকের চিহ্নগুলো’ বাংলা সাহিত্যের, সমাজচেতনার, নারীবাদের এবং মানবিকতার বহুমাত্রিক প্রতিচ্ছবি। এটি পাঠককে তথ্য, জীবনের শিক্ষা, সাহিত্যিক অন্তর্দৃষ্টি এবং মানবিক মূল্যবোধ প্রদান করে। পাঠক বুঝতে পারবেন- কীভাবে জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, সম্পর্ক এবং সংগ্রাম একজন লেখককে পরিপক্ক করে।
স্মৃতিকথাটির শেষ দৃশ্য এঁকেছেন এভাবে- ‘‘বারবার মনে হয়, ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা, সিলেট পৃথিবীর নানা প্রান্তর, ঘুরে ঘুরে আনন্দে উড়ে উড়ে জীবনযুদ্ধ সাহিত্য জীবনের সাথে একাকারে জুড়ে জুড়ে আদাবরের বুনোপাখি নামের বাড়ির মধ্যে এসে কত রকম স্মৃতিকেই না হাতড়াই! কখনো আনন্দে ভাসি, শরীর মন ভালো থাকলে ছুটে যাই এদিক-সেদিক। কিন্তু প্রায়ই নিজের মধ্যে ন্যুব্জ হয়ে যায়, ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন’ মনে পড়ে। এই গানটা প্রথম জীবনে ‘দ্য ফাদার’ নামের একটা ছবিতে দেখে বুক হুহু করে উঠেছিল। মোচড় দেওয়া বুক তখন অনুভব করত, একজন বয়স্ক মানুষের হাহাকারের কথা। এখন আমি সেই বয়স্ক মানুষ।’’
এখানে তিনি জীবনের দ্রুত অতিক্রম, স্মৃতির গভীরতা এবং আত্মজিজ্ঞাসার মাধ্যমে পাঠককে তার অভিজ্ঞতার ভেতরে নিমজ্জিত করেন। এখানে প্রতিটি বাক্যই জীবন ও সাহিত্যকে একত্রিত করে। লেখক শুধুমাত্র নিজের ভেতরের অনুভূতি প্রকাশ করেননি, বরং পাঠককে ভাবতে এবং জীবন ও মৃত্যুর সম্পর্ক, স্থায়িত্ব এবং মানুষের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন উপলব্ধি করতে বাধ্য করেছেন।
‘পালকের চিহ্নগুলো’ কেবল ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা নয়; এটি সমাজ, সাহিত্য এবং মানব জীবনের একটি বহুমাত্রিক প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি অধ্যায় পাঠককে তার ভেতরের অনুভূতি, সংগ্রাম, আনন্দ ও হতাশার সঙ্গে সংযুক্ত করে।
নাসরীন জাহানের ভাষা সরল, অথচ গভীর। বাক্যগুলো প্রাঞ্জল, সংবেদনশীল এবং আবেগপ্রবণ। শব্দচয়ন, ছন্দ এবং বাক্যগঠন পাঠককে প্রবাহমান অনুভূতি দেয়। সরল কথার মধ্যে তিনি জটিল জীবনবোধ, শৈশবের উচ্ছ্বাস, প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের দমবন্ধ করা বাস্তবতা এবং সাহিত্যচর্চার দৃষ্টিভঙ্গি নিখুঁতভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন।
এই আত্মজীবনী পাঠককে ভাবতে, অনুভব করতে এবং সাহিত্যের গভীরে নিমজ্জিত হতে শেখায়। লেখকও তার জীবনের প্রতিটি দিক থেকে স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পেরেছেন। ফলে পাঠক ও লেখক উভয়ই একসাথে আনন্দ এবং উপলব্ধি অর্জন করেন।
যদিও কোনো সাহিত্যিক বা কবি পুরোমাত্রায় সক্রিয় থাকা অবস্থায় আত্মজীবনী লিখলে তাকে ওই ব্যক্তির ‘সম্পূর্ণ’ বা পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী বলা যাবে না। তবে আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথার ভেতর দিয়ে আমরা একজন মানুষকে যতটা সম্ভব সম্পূর্ণ করে দেখতে চাই। তাঁর চোখে দেখা পৃথিবী, তার চেনাশোনা মানুষ সম্বন্ধে বিবরণ তাঁর মুখের ভাষায় পড়তে ও জানতে চাই। সেখানে সমসাময়িক সাহিত্য বা সামাজিক পরিবর্তনও ওঠে আসে। আর এখানেই জীবন্ত হয়ে ওঠে কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহানের ‘পালকের চিহ্নগুলো’।
[ত্রুটি-বিচ্যুতি : যদিও ভাষার সাবলীলতা পাঠককে আকৃষ্ট করে; কিন্তু অনেক বানান ভুল ও সমাসবদ্ধ শব্দের বিচ্ছিন্নতা পড়ার অভিজ্ঞতাকে কিছুটা বিঘ্নিত করেছে।]
অলংকরণঃ তাইফ আদনান
