জলধি / পাঠ-পর্যালোচনা / ‘দেশের কথা’ ও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম: একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনা
Share:
‘দেশের কথা’ ও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম: একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনা

ভূমিকা

বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শোষক রূপকে প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতে জনসমক্ষে উন্মোচিত করার ক্ষেত্রে যে কয়েকটি রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক সৃষ্টি কালজয়ী মর্যাদা লাভ করেছে, তার মধ্যে সখারাম গণেশ দেউস্করের ‘দেশের কথা’ (১৯০৪) সর্বাগ্রে গণ্য। একটি গ্রন্থ কীভাবে পুরো জাতির চেতনার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়ে উঠতে পারে এবং কীভাবে একটি লেখা ব্রিটিশ রাজশক্তিকে কাঁপিয়ে তুলতে পারে, ‘দেশের কথা’ তার এক অনবদ্য ঐতিহাসিক উদাহরণ। পেশায় শিক্ষক ও সাংবাদিক দেউস্কর এই বইটিতে রাজনৈতিক আবেগের পাশাপাশি ব্রিটিশ ভারতের অর্থনৈতিক শোষণের এমন এক চুলচেরা ও নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরেছিলেন, যা তৎকালীন বাঙালি বুদ্ধিজীবী, সাধারণ পাঠক এবং অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের মনে এক অভাবনীয় নবজাগরণ ঘটিয়েছিল।

সখারাম গণেশ দেউস্কর: সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও জীবনী

বাংলা ভাষা ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে সখারাম গণেশ দেউস্কর (১৮৬৯ – ১৯১২) এক অনন্য ও বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব। জাত্যাংশে তিনি ছিলেন একজন মারাঠি ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান, কিন্তু কর্মে, লেখায় এবং ভাবনায় ছিলেন খাঁটি বাঙালি।

  • জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন: ১৮৬৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর বিহারের (বর্তমান ঝাড়খণ্ড) দেওঘরের কাছে করোঁ গ্রামে সখারামের জন্ম হয়। তাঁর পূর্বপুরুষরা মহারাষ্ট্রের রত্নাগিরি অঞ্চল থেকে বাংলায় এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। ফলে মারাঠি পরিবারের সন্তান হয়েও তাঁর শৈশব, শিক্ষাজীবন ও চিন্তা গড়ে ওঠে বাংলার সাহিত্যিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে।
  • কর্মজীবন ও সাহিত্যচর্চা: দেওঘর স্কুলে শিক্ষকতা দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। পরবর্তীকালে তিনি কলকাতার সংবাদজগতে প্রবেশ করেন এবং বিখ্যাত পত্রিকা ‘হিতবাদী’-র সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন। পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী, রবীন্দ্র-বান্ধব রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী এবং যোগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণের মতো বরেণ্য ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এসে তাঁর চিন্তা আরও ধারালো হয়।
  • রাজনৈতিক গুরু ও আদর্শ: সখারাম লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলককে তাঁর রাজনৈতিক গুরু মনে করতেন। তিলকের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ১৯০২ থেকে ১৯০৬ সালের মধ্যে বাংলায় ঐতিহাসিক ‘শিবাজী উৎসব’ উদযাপনের অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে ভূমিকা পালন করেন।
  • শ্রী অরবিন্দ ও বিপ্লবীদের সাথে যোগাযোগ: কলকাতায় অবস্থানকালে সখারাম শ্রী অরবিন্দ ঘোষ এবং তাঁর বিপ্লবী অনুগামীদের খুব কাছে আসেন। অরবিন্দ ঘোষের ‘অনুশীলন সমিতি’ এবং বিপ্লবী রাজনীতিতে তাঁর সরাসরি অবদান ছিল।
  • জীবনাবসান: জীবনের শেষভাগে ব্রিটিশ সরকারের ক্রমাগত নির্যাতন, নজরদারি এবং মানসিক চাপে তিনি শারীরিক অসুস্থতায় ভোগেন। অবশেষে ১৯১২ সালের ২৩ নভেম্বর মাত্র ৪২ বছর বয়সে এই মহৎ রাষ্ট্রচিন্তক ও বিপ্লবী লেখক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

‘দেশের কথা’ বইটিতে কী কি আছে: মূল বিষয়বস্তু

১৯০৪ সালে প্রকাশিত ‘দেশের কথা’ বইটি মূলত দাদাভাই নওরোজির ‘Poverty and Un-British Rule in India’ এবং মহাদেব গোবিন্দ রানাডের অর্থনীতি বিষয়ক গবেষণার তথ্যগুলোকে অতি সহজ, প্রাঞ্জল ও হৃদয়স্পর্শী বাংলায় সাধারণ পাঠকের সামনে উপস্থাপন করে।

বইটির প্রধান বিষয়বস্তুগুলোকে সংক্ষেপে কয়েকটি অংশে বিভক্ত করা যায়:

১. অর্থনৈতিক নিস্কাশন বা ‘ড্রেন অব ওয়েলথ’ (Drain of Wealth)

সখারাম অত্যন্ত তথ্যনিষ্ঠভাবে প্রমাণ করেন যে, ব্রিটিশ শাসন ভারতে কোনো আশীর্বাদ নয়, বরং এটি সম্পদের অবাধ লুণ্ঠন। কীভাবে রাজস্ব, বেতন, পেনশন এবং বাণিজ্যের নামে ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও অর্থ ইংল্যান্ডে পাচার হয়ে যাচ্ছে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব তিনি তুলে ধরেন।

২. দেশীয় কুটির শিল্প ও বস্ত্রশিল্পের বিনাশ

বইটিতে দেখানো হয় কীভাবে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার এবং লিভারপুলের কল-কারখানার সস্তা পণ্য ভারতে কাটানোর জন্য চক্রান্ত করে ভারতের সমৃদ্ধ তাঁতশিল্প, রেশম শিল্প ও কুটির শিল্পকে ধুলিসাৎ করে দেওয়া হয়। লাখ লাখ কারিগর কাজ হারিয়ে দিনমজুরে পরিণত হন।

৩. কৃষি খাতের ওপর অস্বাভাবিক চাপ ও দুর্ভিক্ষ

শিল্প ধ্বংস হওয়ায় কোটি কোটি মানুষ কৃষির ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়। এর ওপর চড়া ভূমিরাজস্ব ও জমিদার-মহাজনদের শোষণে ভারতীয় কৃষককুল ঋণের জালে পিষে যায়। ব্রিটিশ আমলে বারবার সংঘটিত ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের প্রকৃত কারণ যে প্রকৃতির নিষ্ঠুরতা নয়, বরং ব্রিটিশ সরকারের কৃত্রিম ও শোষক নীতি—তা দেউস্কর পরিসংখ্যানে প্রমাণ করেন।

৪. মানসিক পরাধীনতা ও ‘হিপনোটিক কনকোয়েস্ট’ (Hypnotic Conquest of the Mind)

‘দেশের কথা’র অন্যতম প্রধান ও যুগান্তকারী অংশ ছিল ব্রিটিশদের মনস্তাত্ত্বিক উপনিবেশবাদের বিশ্লেষণ। দেউস্কর সতর্ক করে বলেছিলেন যে, ব্রিটিশ রাজত্ব কেবল আমাদের জমি বা অর্থ দখল করেনি, তারা ভারতীয়দের মগজধোলাই করেছে। তারা আমাদের শিখিয়েছে যে ভারতীয় সংস্কৃতি অনগ্রসর এবং ইউরোপীয় শাসনই ভারতের জন্য কল্যাণকর। দেউস্কর একে "Hypnotic conquest of the mind" বা মনের সম্মোহনী পরাভব বলে অভিহিত করেন এবং এই মানসিক পরাধীনতা ভাঙার জন্য তীব্র আহ্বান জানান।

স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ওপর প্রভাব ও অনুপ্রেরণা

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলন এবং পরবর্তীতে সমগ্র ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ‘দেশের কথা’ বইটি যে স্ফুলিঙ্গের কাজ করেছিল, তা রূপকথার মতো।

  • রাজনৈতিক চেতনাবৃদ্ধি: বইটির প্রকাশের পর থেকে তৎকালীন যুবসমাজ শুধু আবেগ দিয়ে নয়, বরং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক যুক্তির ভিত্তিতে ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা করতে শুরু করে।
  • ‘স্বদেশী’ ও বয়কটের ভিত্তি: বিদেশী কাপড় বর্জন এবং দেশী বস্ত্র, সাবান, কাগজ ইত্যাদি ব্যবহারের যে গণজাগরণ ১৯০৫ সালে বাংলায় শুরু হয়েছিল, তার তাত্ত্বিক ভিত্তি জোগান দিয়েছিল ‘দেশের কথা’।
  • যাত্রাপালা ও লোকসংগীতে প্রভাব: দেউস্করের এই বইটির ভাবনা গ্রাম-বাংলার যাত্রাপালা, বাউল গান এবং স্বদেশী পথনাটকে স্থান পেয়েছিল, যা নিরক্ষর ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও দেশপ্রেমের বীজ বুনে দিয়েছিল।
  • বিপ্লবীদের দীক্ষাগ্ৰন্থ: অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দলের মতো গোপন বিপ্লবী সংগঠনগুলোর তরুণ সদস্যদের জন্য এই বইটি পড়া বাধ্যতামূলক ছিল। শ্রী অরবিন্দ ঘোষ ও বাঘা যতীনের (যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়) মতো বিপ্লবীরা এই গ্রন্থটিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের অনন্য অনুপ্রেরণাদায়ী সম্পদ হিসেবে গণ্য করতেন।

বইটিকে কেন্দ্র করে বিশেষ ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলী

১. চার মাসে চার সংস্করণ ও বিপুল জনপ্রিয়তা

১৯০৪ সালে প্রথম প্রকাশের পর বইটি এতটাই জনপ্রিয়তা লাভ করে যে মাত্র চার মাসের মধ্যে এর চারটি সংস্করণ প্রকাশ করতে হয়েছিল। দেউস্কর নিজে বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে অত্যন্ত সুলভ মূল্যে (কখনও কখনও বিনামূল্যে) বইটি ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন, যাতে সাধারণ মানুষ দেশের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে সচেতন হতে পারে।

২. ব্রিটিশ সরকারের নিষেধাজ্ঞা জারি (১৯১০)

বইটির জনপ্রিয়তা ও বৈপ্লবিক প্রভাব দেখে ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিভাগ আঁতকে ওঠে। সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয় যে, দেউস্করের এই বইটি বাংলায় সশস্ত্র বিপ্লব ও ব্রিটিশ বিরোধী গণজাগরণের সবচেয়ে বড় অনুঘটক। ১৯১০ সালে প্রেস অ্যাক্ট অনুযায়ী ব্রিটিশ সরকার ‘দেশের কথা’ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং এর সমস্ত কপি বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেয়।

৩. গোপন মুদ্রণ ও ‘নিষিদ্ধ ফল’-এর আকর্ষণ

নিষিদ্ধ হওয়ার পর বইটির আকর্ষণ সাধারণ মানুষের কাছে বহুগুণ বেড়ে যায়। বিপ্লবীরা অত্যন্ত গোপনে হস্তলিখিত কপি করে কিংবা গোপন ছাপাখানায় বইটির নতুন সংস্করণ ছাপিয়ে এক হাত থেকে অন্য হাতে পৌঁছে দিতেন। পকেটে বা ব্যাগে ‘দেশের কথা’ রাখা সেকালে স্বদেশী বিপ্লবীদের এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ অথচ গর্বের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও অন্যান্য মনীষীদের মূল্যায়ন

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ‘দেশের কথা’ বইটির ঐতিহাসিক প্রভাব সম্পর্কে অত্যন্ত উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন। নেতাজি তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘দি ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল’ (The Indian Struggle) এবং বিভিন্ন প্রবন্ধ ও বক্তৃতায় স্বীকার করেছেন যে, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ভারতীয়দের জাতীয়তাবাদী ভাবনায় যে জোয়ার এসেছিল, তার অন্যতম প্রধান বাহক ছিল এই বইটি।

  • নেতাজির দৃষ্টিভঙ্গি: নেতাজির মতে, দেউস্করের বইটি ভারতীয়দের কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার কথাই বলেনি, এটি ব্রিটিশদের দ্বারা ভারতীয় মানসিকতার যে "সম্মোহনী পরাভব" (Hypnotic conquest) ঘটেছিল, তা থেকে জাতিকে মুক্ত করেছিল। অর্থনৈতিক শোষণের প্রকৃত সত্য উন্মোচিত না হলে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন এতটা তীব্র ও সর্বাত্মক রূপ নিতে পারতো না বলে নেতাজি বিশ্বাস করতেন।
  • শ্রী অরবিন্দের মূল্যায়ন: শ্রী অরবিন্দ স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন যে, স্বদেশী আন্দোলনের সময়ে ‘দেশের কথা’ বইটির মতো এত শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রচারপত্র ও জাতীয় ভাবাদর্শের বই বাংলায় আর একটিও লেখা হয়নি।

সখারাম গণেশ দেউস্করের ‘দেশের কথা’ কেবল একটি ঐতিহাসিক বই নয়, এটি পরাধীন ভারতের রক্তে লেখা এক বিপ্লবের দলিল। মারাঠি  সন্তান হয়েও বাংলাকে নিজের মাতৃভূমি এবং সারা ভারতকে নিজের ‘দেশ’ জ্ঞান করে তিনি যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তা ভারতের জাতীয় সংহতির এক অভূতপূর্ব নজির।

ব্রিটিশ সরকারের নিষেধাজ্ঞা কিংবা শত বছরের সময় প্রবাহ এই বইটির গুরুত্বকে মলিন করতে পারেনি। ভারতের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা, আত্মমর্যাদা এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাস বুঝতে আজও ‘দেশের কথা’ একটি মাইলফলক গ্রন্থ হিসেবে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।



অলংকরণঃ তাইফ আদনান