যে বই আমাকে পড়ে ফেলেছিল।
কিছু বই আমরা পড়ি। আর কিছু বই আমাদের পড়ে ফেলে। এসএসসির পরের দিনগুলো, পরীক্ষার চাপ নেই। সামনে লম্বা অবসর। বয়সটাও এমন যে মনের ভেতর অকারণে জানালা খুলে যায়। ঠিক সেই সময় আমার হাতে এল জুল ভার্নের কার্পেথিয়ান দুর্গ। ভেবেছিলাম একটা রহস্যের বই পড়ছি। কয়েক পাতা পেরোতেই টের পেলাম আমি আর আমার ঘরে নেই।
হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের এক পাহাড়ি গ্রাম। পাহাড়ের মাথায় এক পরিত্যক্ত দুর্গ। সেই দুর্গের চিমনি থেকে উঠছে সরু এক ধোঁয়ার রেখা। বইয়ের পাতায় উবু হয়ে আমি যেন গ্রামের সরাইখানায় বসে আছি। বাইরে হিম হাওয়া বইছে। ভেতরে মানুষ ফিসফিস করে বলছে ওই দুর্গে কেউ একজন আছে।
সবচেয়ে বেশি হারিয়ে যেতাম লা স্টিল্লার সৌন্দর্যে। তাঁকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ উপন্যাসে খুব কম। তবু পুরো বইজুড়ে তিনি আছেন বাতাসের মতো। চোখে পড়ে না কিন্তু বুকের ভেতর টের পাওয়া যায়। আর হারিয়ে যেতাম তাঁর প্রেমিকদের কাণ্ডকারখানায়। একজনের ভালোবাসা শোক হয়ে ঝরে পড়ে। আরেকজনের ভালোবাসা কখন যে ভয়ের চেহারা নেয় বুঝে ওঠার আগেই পাতা উল্টে ফেলতাম। এভাবেই একদিন জুল ভার্নের গভীর অনুরাগী হয়ে উঠলাম। এত বছর পরেও সেই টান আমার ভেতর থেকে যায়নি।
কুয়াশার ওপারে এক লেখক
জুল ভার্ন জন্মেছিলেন ১৮২৮ সালে ফ্রান্সের নান্ত শহরে। শহরটা নদীর ধারে সেখানে জাহাজ আসত আর জাহাজ যেত। দূরের দেশের টান হয়তো ছোটবেলাতেই তাঁর রক্তে ঢুকে গিয়েছিল। পরে তিনি আমাদের নিয়ে গেলেন পৃথিবীর কেন্দ্রে। নামালেন সমুদ্রের তলায়। চাঁদের দিকে ছুড়ে দিলেন কামানের গোলা। আর আশি দিনে ঘুরিয়ে আনলেন সারা বিশ্ব। প্রকাশক পিয়ের জুল হেটজেলের সঙ্গে মিলে তিনি গড়ে তুললেন ‘অসাধারণ ভ্রমণ’ নামের এক বিশাল ধারাবাহিক। পঞ্চাশটিরও বেশি উপন্যাস ঢুকেছে সেই মালার ভেতর। বিজ্ঞান আর অভিযান সেখানে হাত ধরাধরি করে হেঁটেছে।
কার্পেথিয়ান দুর্গ সেই চেনা ভার্নের চেয়ে একটু আলাদা। লেখা শেষ হয়েছিল ১৮৮৯ সালে। বই হয়ে বেরোয় ১৮৯২ সালে। এখানে সমুদ্রযান নেই, মহাকাশের কামান নেই। আছে কুয়াশা, কুসংস্কার আর ভয়। ভার্ন এবার বিজ্ঞানকে পরিয়ে দিয়েছেন গথিক রহস্যের পোশাক। পাঠক ভাবে ভূতের গল্প পড়ছে। শেষে এসে দ্যাখে ভূত নয়। মানুষের হাতে গড়া এক অদ্ভুত কৌশল। ব্রাম স্টোকারের ড্রাকুলা বেরোয় ১৮৯৭ সালে। তার পাঁচ বছর আগেই ইউরোপের পাঠক ট্রানসিলভেনিয়ার পাহাড়ি দুর্গের ছায়ায় ঘুরে এসেছিল ভার্নের হাত ধরে। অনেক সমালোচক মনে করেন স্টোকারের ওপর এই বইয়ের প্রভাব ছিল। এর পাকা প্রমাণ নেই। তবু দুটি বই পাশাপাশি রাখলে একটা চেনা আবহ নাকে এসে লাগে। রোমানিয়ায় আরেকটা গল্প চালু আছে। কোলৎস নামের এক পুরোনো পাহাড়ি দুর্গের কথা নাকি ভার্ন মনে রেখেছিলেন। এটাও লোকমুখের কথা। তবু গল্পটা শুনতে ভালো লাগে।
ওয়ের্স্ট গ্রামের ভয়
কাহিনি শুরু হয় কার্পেথিয়ান পর্বতমালার কোলে ছোট এক গ্রামে, নাম ওয়ের্স্ট। তখন ট্রানসিলভেনিয়া ছিল অস্ট্রিয়া হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের অংশ। গ্রামের মানুষ সরল আর পরিশ্রমী। সন্ধ্যা নামলে তারা ঘরে ফেরে। তারপর আগুনের পাশে বসে নিচু গলায় গল্প করে। তাদের মাথার ওপর পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে এক পুরোনো দুর্গ। বহু বছর কেউ সেখানে থাকে না। ভাঙা প্রাচীর। ফাঁকা জানালা। গ্রামবাসী বিশ্বাস করে ওই দুর্গে বাস করে চোর্ট। তাদের ভাষায় চোর্ট মানে শয়তান।
তারপর একদিন এমন এক ঘটনা ঘটে যা কেউ ভাবেনি। পরিত্যক্ত দুর্গের চিমনি থেকে ধোঁয়া উঠছে।
ভার্ন দৃশ্যটা সাজিয়েছেন আশ্চর্য সংযমে। কোনো চিৎকার নেই, কোনো বজ্রপাতও নেই। শুধু আকাশের গায়ে একটা সরু রেখা। অথচ পুরো গ্রাম নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে যায়। এখানেই তাঁর কলমের জোর। ভয়কে তিনি ঘাড়ে চাপিয়ে দেন না। ভয় এসে বসে ধীরে ধীরে। সুতোর পর সুতো বুনে বুনে।
'ধোঁয়া উঠছে পাহাড়ের চূড়ায়
কেউ কি আছে ওখানে-
নাকি আমাদের ভয়ই জ্বেলে দিয়েছে আগুন।'
যাঁরা সত্য খুঁজতে চেয়েছিলেন
গ্রামের তরুণ ডাক্তার প্যাটাক আর বনরক্ষক নিক ডেক ঠিক করেন ব্যাপারটা নিজের চোখে দেখবেন। পাহাড়ি পথ ধরে তাঁরা দুর্গের দিকে এগোন। ভয় যে ছিল না তা নয়। কিন্তু কৌতূহল ছিল ভয়ের চেয়ে বড়। দুর্গের কাছে পৌঁছে ঘটে অদ্ভুত ঘটনা। নিক ডেক হঠাৎ অবশ হয়ে পড়েন। চোখের সামনে কোনো শত্রু নেই। কোনো আঘাতও নেই। শুধু এক অদৃশ্য ধাক্কা। গ্রামে ফিরে এই খবর ছড়াতেই মানুষের বিশ্বাস আরও পাকা হয়। দুর্গে সত্যিই কিছু আছে। এই জায়গায় একটু থামা দরকার। ভার্ন একবারও পাঠককে বলেন না যে গ্রামবাসীর ভয় অমূলক। তিনি শুধু দেখান একটা ভয় কীভাবে পুরো সমাজকে আঁকড়ে ধরে। বিজ্ঞানের যুগে বসেও মানুষ অন্ধকারকে কত সহজে বিশ্বাস করে ফেলে। কাহিনির নিচের স্তরে এই প্রশ্নটাই চুপ করে বসে থাকে। ওই অদৃশ্য ধাক্কার আসল ব্যাখ্যা পাঠক জানতে পারে অনেক পরে। দুর্গের ভেতরে বসে যাঁরা খেলা খেলছিলেন তাঁদের যন্ত্রপাতির কারসাজি ছিল এর পেছনে।
কাউন্ট ফ্রাঞ্জ আর তাঁর শোক
এরপর গ্রামে এসে পৌঁছান কাউন্ট ফ্রাঞ্জ অব টেলেক। সঙ্গে তাঁর বিশ্বস্ত সৈনিক রটজকো। ফ্রাঞ্জের বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। চেহারায় ক্লান্তি। চোখে এমন এক দূরত্ব যা শুধু শোকই দিতে পারে। ফ্রাঞ্জ বীরের মতো ঘোড়া ছুটিয়ে আসেননি। তিনি এসেছেন একজন ভাঙা মানুষ হয়ে। ভেতরটা তাঁর অনেক আগেই চুরমার হয়ে গেছে। সরাইখানায় বসে তিনি শোনেন দুর্গের কথা। শোনেন দুর্গের মালিক এখন রডলফ অব গোর্টজ নামের এক ব্যারন। নামটা কানে যেতেই ফ্রাঞ্জের ভেতর কিছু একটা কেঁপে ওঠে। কারণ ওই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গভীর ক্ষত। উপন্যাসের চেহারা বদলে যায় এই মোড়ে। যা ছিল ভূতুড়ে রহস্য তা হয়ে ওঠে এক পুরোনো প্রেমের ভার।
লা স্টিল্লার থেমে না যাওয়া কণ্ঠ
ইতালির মঞ্চে তিনি ছিলেন কিংবদন্তি। নাম লা স্টিল্লা। ইতালীয় ভাষায় স্টিল্লা শব্দের একটা অর্থ ফোঁটা। এক ফোঁটা জল। এক ফোঁটা আলো। নামটার ভেতরেই একটা কবিতা লুকিয়ে আছে। তাঁর কণ্ঠ শ্রোতাকে স্তব্ধ করে দিত। নাপোলির সান কার্লো থিয়েটারে তিনি যখন গাইতেন হলের ভেতর কারও নিঃশ্বাস শোনা যেত না। ফ্রাঞ্জ তাঁকে ভালোবাসতেন। স্টিল্লাও ভালোবাসতেন ফ্রাঞ্জকে। রটে গিয়েছিল তিনি মঞ্চ ছেড়ে দেবেন। কাউন্টেস অব টেলেক হয়ে ঘর বাঁধবেন। আরেকজন ছিলেন যিনি স্টিল্লাকে ভালোবাসতেন না। চাইতেন নিজের করে নিতে। তাঁর নাম রডলফ অব গোর্টজ। সঙ্গী বিজ্ঞানী অরফানিককে নিয়ে তিনি ইতালির এক শহর থেকে আরেক শহরে ছুটে বেড়াতেন স্টিল্লার পেছনে। স্টিল্লার কণ্ঠে তিনি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলেন। আর সেই হারানোকে নাম দিয়েছিলেন প্রেম। তারপর এল বিদায়ের রাত। মঞ্চে গাইছেন স্টিল্লা। গান গাইতে গাইতে তাঁর চোখ গিয়ে পড়ল দর্শকসারির এক মুখের ওপর। রডলফের মুখ। সেই চাহনিতে ভালোবাসা ছিল না। ছিল এমন এক আগুন যা ভালোবাসার ছদ্মবেশ পরে আছে। কণ্ঠ থেমে গেল। স্টিল্লা মঞ্চের ওপর লুটিয়ে পড়লেন। আর উঠলেন না।
এই জায়গাটা পড়তে পড়তে ভেতরে একটা কথা জেগেছিল। কিছু ভালোবাসা মানুষকে বাঁচায়। কিছু ভালোবাসা মানুষকে নিঃশেষ করে দেয়। যে ভালোবাসা অধিকার দাবি করে সে আসলে ভালোবাসা নয়। সে একধরনের আগ্রাসন।
'মঞ্চ ফাঁকা হয়ে গেছে অনেক আগেই
তবু সুরটা ঘুরে বেড়ায় পাথরের দেয়ালে
যে মানুষ চলে যায় সে কি সত্যিই যায়
নাকি রেখে যায় একটা ডাক একটা ছায়া।'
ভালোবাসার ভয়ংকর চেহারা
ভার্ন রডলফকে সরাসরি দানব বানাননি। এটাই এই চরিত্রের আসল শক্তি। তিনি ধনী ব্যারন, গানের অনুরাগী। স্টিল্লার প্রতিটা অনুষ্ঠানে তিনি হাজির থাকতেন। সবার চোখে তিনি এক নিবেদিত ভক্ত। শুধু ভক্তির সীমাটা তিনি কোনোদিন চিনতে পারেননি। স্টিল্লার কণ্ঠ তাঁর কাছে ছিল নেশার মতো। সেই কণ্ঠ তিনি হারাতে চাননি। তাই স্টিল্লা যখন মঞ্চ ছেড়ে বিদায় নিতে চাইলেন রডলফের কাছে সেটা একজন মানুষের চলে যাওয়া হয়ে রইল না। তাঁর মনে হলো কেউ জীবনের একমাত্র আলোটা নিভিয়ে দিচ্ছে। এই জায়গায় ভার্ন আমাদের একটা অস্বস্তিকর সত্যের সামনে দাঁড় করান। সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষটা অনেক সময় দেখতে ভয়ংকর হয় না। তাঁর মুখে থাকে ভালোবাসার ভাষা। আর ভেতরে চলে দখলের হিসেব। স্টিল্লা চলে যাওয়ার পরেও রডলফ তাঁকে ছাড়তে পারেননি। একটা থেমে যাওয়া কণ্ঠকে বাঁচিয়ে রাখতে তিনি পাহাড়ের চূড়ায় দুর্গ সাজালেন, যন্ত্র বানালেন, গ্রামজুড়ে ভয় ছড়ালেন। এই সবকিছুর নিচে ছিল একটাই ইচ্ছা। আরও একবার ওই গান শোনা।
দুর্গের ভেতরে
পাঁচ বছর কেটে গেছে। ফ্রাঞ্জ ভেবেছিলেন সব শেষ। তারপর একদিন দুর্গের বুরুজে তিনি দেখেন এক নারীমূর্তি- সাদা পোশাক, খোলা চুল। দুই হাত বাড়ানো। তিনি চিনতে ভুল করেননি। এ তো স্টিল্লা! সেই মুহূর্তে যুক্তি বলে আর কিছু থাকে না। ফ্রাঞ্জ ধরে নেন স্টিল্লা মরেননি। পাঁচ বছর ধরে ওই ব্যারন তাঁকে বন্দী করে রেখেছে। যেভাবেই হোক সেই রাতেই দুর্গে ঢুকতে হবে। পাঠক এই ভ্রমের ভেতর ফ্রাঞ্জের সঙ্গেই ঢুকে পড়ে। আমি নিজেও পড়তে পড়তে ভেবেছি হয়তো সত্যিই কিছু একটা অলৌকিক ঘটছে। ভার্নের সবচেয়ে বড় দক্ষতা এখানেই। তিনি পাঠককে এমন জায়গায় এনে দাঁড় করান যেখানে বিজ্ঞান আর অলৌকিকের সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়।
ভেতরে ঢুকে ফ্রাঞ্জ আটকা পড়েন দুর্গের গোপন পথ আর মাটির নিচের কক্ষের গোলক ধাঁধায়। এক সময় এক পুরোনো উপাসনা ঘরের আড়াল থেকে তিনি দেখতে পান অরফানিককে, হাতে লণ্ঠন। কিছুক্ষণ পরে সেখানে আসেন রডলফ অব গোর্টজ নিজে। ফ্রাঞ্জ কান পেতে শোনেন তাঁদের কথা। শুনে রক্ত হিম হয়ে যায়। ব্যারন ঠিক করেছেন দুর্গ উড়িয়ে দেবেন। সেই ধ্বংসের নিচে চাপা পড়বে ফ্রাঞ্জ আর তাঁর পাশে যারা দাঁড়াবে তারা সবাই। কিন্তু তার আগে ব্যারনের একটা সাধ বাকি। শেষবারের মতো তিনি স্টিল্লার গান শুনবেন এই দুর্গের ভেতরেই। ফ্রাঞ্জ নিঃশব্দে এগোন। একটা ঘরের দরজা আস্তে খুলে দেখেন সেখানে একা বসে আছেন রডলফ। আর তখনই আলোয় ভরা এক মঞ্চের মতো জায়গায় দেখা দেন স্টিল্লা আলুলায়িত চুল, দুই বাহু প্রসারিত। পরনে সেই সাদা পোশাক যা পরে তিনি একদিন মঞ্চে ‘অরল্যান্ডো’র অ্যাঞ্জেলিকা হয়েছিলেন। তিনি গাইতে শুরু করেন। চেয়ার থেকে না উঠেই রডলফ ঝুঁকে পড়েন শুনতে। ফ্রাঞ্জ নিঃশ্বাস চেপে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাঁর সামনে তাঁর হারানো ভালোবাসার কণ্ঠ। এক মুহূর্তের জন্য সময় থেমে যায়।
ফোনোগ্রাফ আয়না আর বিদ্যুতের রহস্য
তারপর আসে সেই ব্যাখ্যা ভূত নয়, প্রেত নয়। মানুষের হাতে গড়া কৌশল। রডলফ আর অরফানিক বহু বছর ধরে একসঙ্গে ছিলেন। অরফানিক ছিলেন দারিদ্র্যের চাপে বেঁকে যাওয়া এক অদ্ভুত আবিষ্কারক। বিদ্যুতের ব্যবহারে তাঁর জুড়ি ছিল না। দুর্গে বসে তিনি এমন সব যন্ত্র সাজালেন যা দেখে মনে হয় শয়তানের কাজ। আর ব্যারন চাইছিলেন গোটা অঞ্চলকে ভয় দেখিয়ে দূরে সরিয়ে রাখতে। স্টিল্লার শেষ গান ধরা ছিল ফোনোগ্রাফের ভেতর। তাঁর বিখ্যাত প্রতিকৃতি আয়না আর আলোর কৌশলে ফুটিয়ে তোলা হতো বুরুজের ওপর। কণ্ঠ আর ছবি মিলে তৈরি হতো এক জীবন্ত নারীর ভ্রম। আরও ছিল টেলিফোনের লাইন। দুর্গ থেকে সেই লাইন গিয়েছিল গ্রাম পর্যন্ত। গ্রামে যে কথা হতো ব্যারন তা আগেভাগেই শুনে ফেলতেন। এখানে একটা কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার। অনেকেই এই কৌশলকে হলোগ্রাম বলেন। কিন্তু ১৮৯২ সালে হলোগ্রাফি বলে কিছু ছিল না। ভার্ন লিখেছিলেন ফোনোগ্রাফ আর আলোর খেলার কথা। ফোনোগ্রাফ তৈরি করেছিলেন এডিসন ১৮৭৭ সালে। ভার্ন সেই নতুন যন্ত্রকে কল্পনার এমন উঁচুতে তুলে নিয়ে গেলেন যে আজকের পাঠকের মনে হয় এ বুঝি হলোগ্রাম। হলোগ্রামের মতো বললে ভুল হয় না। কিন্তু হলোগ্রাম বললে ইতিহাস ঝাপসা হয়ে যায়। ভার্নের আসল প্রশ্ন যন্ত্র নিয়ে নয়। প্রশ্নটা ছিল এই যে বিজ্ঞান যদি এক উন্মাদ ভালোবাসার হাতে পড়ে তাহলে সে কী করে। রডলফ স্টিল্লাকে ফিরিয়ে আনতে পারেননি। তিনি বানিয়েছিলেন একটা ছায়া আর একটা প্রতিধ্বনি। আর সেই ছায়ার পেছনেই ছুটে এসেছিলেন ফ্রাঞ্জ।
শেষ পর্যন্ত দুর্গ বিস্ফোরণে ভেঙে পড়ে। কথা ছিল ব্যারন দুর্গ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পরেই ঘটবে সেই বিস্ফোরণ। কিন্তু সম্ভবত শোক আর হতাশার ঘোরে তিনি সময়ের হিসেব রাখেননি। পালানোর সুযোগ আর পাননি। যে দুর্গ তিনি অন্যের জন্য সাজিয়েছিলেন সেটাই হলো তাঁর সমাধি। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ফ্রাঞ্জকে খুঁজে পান রটজকো আর নিক ডেক। ফ্রাঞ্জের চোখ খোলে। কিন্তু সেই দৃষ্টিতে কোনো চেনা মানুষ নেই। তাঁর ঠোঁটে শুধু স্টিল্লার শেষ গানের কয়েকটা কলি।
আর অরফানিক? তিনি বেঁচে ছিলেন। বিস্ট্রিৎস শহরে চার দিন অপেক্ষা করেছিলেন ব্যারনের জন্য। যখন ব্যারন এলেন না তখন বুঝলেন হয়তো বিস্ফোরণেই সব শেষ। ভার্ন লিখেছেন এই বিজ্ঞানীর মনে বন্ধুর মৃত্যু তেমন দাগ কাটেনি। তাঁর হৃদয় পড়ে ছিল নিজের আবিষ্কারে। এ এক নিষ্ঠুর ছবি। একজন মানুষ ভালোবাসার জন্য ধ্বংস হলেন। আরেকজন ফিরে গেলেন নিজের যন্ত্রের কাছে। ভার্ন এই দুজনকে পাশাপাশি রেখে নীরবে একটা প্রশ্ন ছুড়ে দেন পাঠকের দিকে।
ভয়ের মুখোশে বিজ্ঞানের কারুকাজ
বইটা আজ পড়লে একটা জিনিস বেশি করে চোখে পড়ে। ভয়ের উৎস এখানে অলৌকিক কিছু নয়। ভয়ের উৎস প্রযুক্তি। আর সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে মানুষের বিশ্বাসকে ঠকাতে। ভার্নের কলমে একটা হালকা বিদ্রূপও আছে। গ্রামের মানুষ কিছু না বুঝেই ধরে নেয় শয়তান নেমে এসেছে। ফ্রাঞ্জ ভালোবাসার টানে ধরে নেন প্রিয়তমা বেঁচে আছেন। দুজনের ভ্রমই এক জায়গায় গিয়ে মেলে। মানুষ যা বিশ্বাস করতে চায় তাই দেখতে পায়। আজ আমরা এমন এক সময়ে বাস করি যখন কোনো প্রয়াত শিল্পীর কণ্ঠ কম্পিউটার দিয়ে আবার শোনা যায়। তাঁর মুখ পর্দায় নতুন করে জেগে ওঠে। ভার্ন এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন একশো তিরিশ বছরেরও আগে। যে কণ্ঠ হারিয়ে গেছে তাকে যন্ত্র দিয়ে ফিরিয়ে আনলে কি সত্যিই ফিরে আসে। নাকি শুধু শূন্যতাটা আরও স্পষ্ট হয়।
ভার্নের অন্য বইয়ের পাশে
ভার্নের বেশির ভাগ নায়ক জানে সে কী খুঁজছে। ক্যাপ্টেন নেমো সমুদ্রের গভীরে নিজের এক রাজ্য গড়ে নেন। ফিলিয়াস ফগ ঘড়ি ধরে পৃথিবী ঘোরেন। পৃথিবীর কেন্দ্রের যাত্রীরা মানচিত্র হাতে নিচে নামেন। কার্পেথিয়ান দুর্গের ফ্রাঞ্জ কিছু খুঁজতে বেরোননি। তিনি শুধু এক হারিয়ে যাওয়া মানুষের কাছে ফিরে যেতে চান। এই কারণেই বইটা ভার্নের অন্য উপন্যাসের চেয়ে ঘরোয়া। এখানে দূরত্ব মাপা হয় ভালোবাসার মাপে। অন্য বইয়ে প্রযুক্তি মানুষের ক্ষমতা বাড়ায়। এই বইয়ে প্রযুক্তি মানুষের দুর্বলতা খুঁড়ে বের করে। নটিলাসে চড়ে মানুষ সমুদ্র জয় করে। ফোনোগ্রাফের সামনে বসে মানুষ শুধু নিজের হারানো দিনের কান্না শোনে। এই তফাতটাই বইটাকে আলাদা করে রেখেছে।
কেন এই বই আজও টিকে আছে
প্রথম কারণ বইয়ের গঠন ও বর্ণনা ভঙ্গি। ভার্ন পাঠককে একটু একটু করে দুর্গের কাছে নিয়ে যান। আগে গ্রাম, তারপর পাহাড়। তারপর প্রাচীর শেষে ভেতরের কক্ষ। প্রতিটা ধাপে ভয় আরেক পরত গাঢ় হয়। পাঠক বুঝতেও পারে না কখন সে ফেরার পথ হারিয়ে ফেলেছে। দ্বিতীয় কারণ বইয়ের দুই চেহারা। একই পাতায় আছে গা ছমছমে আবহ আর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। আছে প্রেমের হাহাকার আর প্রযুক্তির বিস্ময়। খুব কম লেখকই এই দুই মেরুকে এত সহজে এক সুতোয় বাঁধতে পারেন। তৃতীয় কারণ মানুষের কথা। রহস্য যখন খুলে যায় তখন পাঠক ভয় পায় না। পাঠক কাঁদে। কারণ সে বুঝে যায় পুরো কাহিনির কেন্দ্রে বসে ছিলেন একজন নারী যাঁর জীবন অসম্পূর্ণ থেকে গেছে। আর একজন পুরুষ যাঁর শোক কোনোদিন শেষ হয়নি। বই তাকে সাজানো হয় বিজ্ঞান-কল্প-কাহিনির খাতায়। কিন্তু আমার কাছে এ এক শোককাব্য।
বাংলার পাঠকের হাতে
বাংলাদেশের পাঠকের কাছে কার্পেথিয়ান দুর্গ পৌঁছেছে মূলত সেবা প্রকাশনীর অনুবাদে। অনুবাদক শামসুদ্দিন নওয়াব। বইটি প্রকাশ পায় ১৯৮৩ সালে। সেবার অনুবাদের ভাষা সহজ। সেই সহজ ভাষার জোরেই কিশোর পাঠক অনায়াসে কাহিনির স্রোতে ভেসে যেতে পারে। আমি নিজেও এভাবেই এই বইয়ের কাছে এসেছিলাম।
আজ ফিরে তাকালে মনে হয় এই অনুবাদগুলো আমাদের পাঠ সংস্কৃতিতে অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশ্বসাহিত্যের অনেক দরজা প্রথম আমাদের সামনে খুলে দিয়েছিল ওই সহজ ভাষার বইগুলোই। জুল ভার্ন, কোনান ডয়েল আর আলেকজান্দ্র দুমা বাংলার কিশোর পাঠকের ঘরের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন।
আমার প্রিয় তিনটি বই
জীবনের হাজারো কর্মব্যস্ততার মাঝখানে একটু সময় পেলেই অতীতের নস্টালজিয়া ভেসে ওঠে। যে কয়টি বইয়ের নাম তখন মনে পড়ে তার একটি কার্পেথিয়ান দুর্গ। সাথে আছে শরৎচন্দ্রের দেবদাস ও বিরাজ বৌ। আরও কিছু বই আছে। কিন্তু এই তিনটি ট্র্যাজেডির কথা আজও সবার আগে মনে আসে। দেবদাস পার্বতীকে হারাল কারণ সময়মতো সাহস করে হিন্দু ধর্মীয় প্রথা ভেঙে পার্বতীকে ঘরে উঠাতে পারেনি। বিরাজ বৌ ভুল বোঝাবুঝির দাম দিল নিজের জীবন দিয়ে। ফ্রাঞ্জ হারালেন স্টিল্লাকে এক উন্মাদ প্রেমিকের হাতে। তিনজনের তিন রকম গল্প। কিন্তু তিনটি গল্পের শেষে একই জিনিস পড়ে থাকে। এক ধরনের নীরব শূন্যতা। পাঠক তার সামনে দাঁড়িয়ে চুপ করে যায়।
এখনো এই তিনটি বই আর এদের চরিত্রের কথা ভাবলে চোখ জলে ভিজে আসে। মনে হয় সেই কিশোর আমি এখনো কোথাও বসে আছি। হাতে একটা বই, চোখে জল। মনের ভেতর এক অচেনা, উদ্ভ্রান্ত, বেহুলা রঙের জগৎ। আর কবিতা? কবিতার দুর্বোধ্য রহস্যের পথে আমার পদচারণা সেই ছোটবেলা থেকেই। হয়তো সেজন্যই কার্পেথিয়ান দুর্গ আমার এত কাছের। কারণ এই বইও আসলে একটা অপূর্ণ কবিতা। যার অর্থ পুরোটা খোলে না। যার সুর পাঠকের ভেতরে রয়ে যায়।
'বইয়ের ভেতর হারিয়েছি কতবার
প্রতিবার ফিরেছি একটু অন্যরকম হয়ে
যে চরিত্র কেঁদেছিল পাতার আড়ালে
তার জল আজও আমার চোখে'
অন্তিম উচ্চারণ
কার্পেথিয়ান দুর্গ আমাদের শেখায় ভালোবাসার নামে কাউকে দখল করা যায় না। শেখায় প্রযুক্তি যত এগিয়ে যাক মানুষের হৃদয়ের ক্ষত সারাতে পারে না। আর শেখায় কিছু কণ্ঠ থেমে গেলেও সুর রয়ে যায়। জুল ভার্ন চলে গেছেন ১৯০৫ সালে। কিন্তু তাঁর দুর্গ আজও দাঁড়িয়ে আছে পাঠকের মনের পাহাড়ে- কুয়াশা ঢাকা, নির্জন। আর তার চিমনি থেকে এখনো উঠছে সরু এক ধোঁয়ার রেখা। বইটা যদি কখনো আপনার হাতের নাগালে আসে পড়ে নেবেন রাতে, চারপাশ যখন নিরিবিলি। আর শেষ পাতায় পৌঁছে চোখ যদি শুকনো থাকে তাহলে বুঝব আপনি লা স্টিল্লার গান শোনেননি।
অলংকরণঃ তাইফ আদনান
