উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, দরিদ্র, হতদরিদ্র অসহায় মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে গল্প/উপন্যাস রচিত হয়েছে অনেক। কিন্তু নিম্নমধ্যবিত্ত স্বল্প বেতনে চাকরি করা সংগ্রামী জীবন নিয়ে বাংলাদেশে গল্প/উপন্যাস রচিত হয়েছে কম। তার ওপর চরিত্রটি যদি হয় রুচিশীল, নিজ অধিকার আদায়ে প্রতিবাদী, অস্তিত্ব রক্ষায় সচেতন, শিল্পমনা-তো সবগুলো বৈশিষ্ট্য মিলে নব্বই দশকের নিম্নমধ্যবিত্ত সমাজের এমন একটি নারী চরিত্র কালো কালির অক্ষরে ঠিকঠাক প্রাণ দিয়ে উপস্থাপন করা খুবই কঠিন কাজ। কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহান ‘উড়ুক্কু’ উপন্যাসে এমনই একটি জীবনচিত্র তুলে ধরার চ্যালেঞ্জিং কাজটি করেছিলেন। পুরো উপ্যাসটি আবর্তিত হয়েছে কেন্দ্রীয় চরিত্র নীনাকে ঘিরে। উপন্যাসে সেই ছোটোবেলা থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক নীনার জীবন পাঠ করে আমরা অনুধাবন করতে পারি - উপন্যাসের নামকরণটি সম্পূর্ণ সার্থক। সারাদিন অনাহারে অর্ধাহারে থেকে নোংরা, কীটপতঙ্গঘেরা বিছানায় শুয়ে শুয়ে যে মেয়ে ছবি আঁকার জন্য ইজেল কেনার পরিকল্পনা করে, আবৃত্তি চর্চা সংগঠনের সাথে জড়িত হতে পারে, সমস্ত প্রতিকূলতার মাঝে কষ্ট পায়ে দলে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে- তাকে আমরা ‘উড়ুক্কু’ ছাড়া অন্য কোনো বিশেষণে বিশেষিত করতে পারি না- ঠিক যেন ডানাওয়ালা পাখির মতো নীনা- কষ্ট চিড়ে চিড়ে সম্মুখপানে উড়ে যায় স্বপ্ন বাস্তবায়ণে।
কেন্দ্রীয় চরিত্র নীনাকে ঘিরে আবর্তিত হলেও উপন্যাসটির কাহিনী একরৈখিক নয় বরং বহুমাত্রিক ভাবনার দিক আছে এর। কাহিনী উপস্থাপনে কথাসাহিত্যিকের মুন্সিয়ানা অসাধারণ ছিল। কাহিনীর বর্ণনা বিন্যাস চেতনা প্রবাহরীতি নির্ভর বা বর্ণনামূলক। মূলত নীনার বেড়ে ওঠা, মনস্তাত্ত্বিক জগত ও কর্মকাণ্ড বর্ণনা করতে গিয়ে নীনার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চিন্তা, সংগ্রামী নারীদের চলার পথের প্রতিবন্ধকতা, সমাজ কর্তৃক চাপিয়ে দেয়া নানা অনিয়ম, সমাজের নানা অসংঙ্গতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও প্রতিবন্ধকতা, রাজনৈতিক সচেতনতা ও মতাদর্শের পদস্খলন ইত্যাদি বিষয়গুলো এত চমৎকার করে লেখক নীনার মনস্তাত্ত্বিক জগতের পাশাপাশি বর্ণনায় এনেছেন তা পাঠকমাত্রকে মুগ্ধ করবে। এ কারণেই সমস্ত বই জুড়ে নীনার সংগ্রামী জীবনের দুঃখগাঁথা পড়তে পড়তে পাঠককে একঘেয়েমিতে ধরেনি কিংবা কাহিনী হতে মনোযোগ বিচ্ছিন্ন করেনি। বইয়ের সমস্ত কালো কালির অক্ষরগুলো জড়ো হয়ে কখনও বিষাদের কালো মেঘ, কখনও বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন, কখনও আশার একখন্ড কালো হীরক হয়ে জ্বলে- এমন কষ্টকর অবাস্থায়ও নীনা স্বপ্ন দেখতে পারে, জ্বলে উঠতে পারে? তো আমরা কেন নয়? পাঠক নীনার কাছ থেকে এহেন অনুপ্রেরণা পেতেই পারে। সাহিত্যের শক্তিই এমন- পাঠকের মনোজগতে অবচেতনভাবে বোধের জায়গাটিতে নাড়া দিয়ে যায়, সম্মৃদ্ধ করে। কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহান এখানেও সার্থক। উড়ুক্কুর পাঠকেরা নীনা চরিত্রটিকে কখনও ভুলতে পারবে না। নীনা চরিত্রটির গ্রহণযোগ্যতা ও অনুপ্রেরণা সর্বযুগেই থাকবে- কারণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে নানা উন্নতির শিখরে পৌঁছলেও মানুষের অসহায়ত্ব/দুঃখ কষ্ট নিয়ে সংগ্রাম থাকবে চিরকাল- দুঃখ কষ্টের কারণ ও ধরণ বদলাতে থাকবে কেবল। সুখ মানুষকে ছেড়ে যায় কিন্তু দুঃখ কখনও ছেড়ে যায় না।
উপন্যাসটির বাকি চরিত্র চিত্রণ ও যথা সময়ে চরিত্রগুলো উপস্থাপন কথাসাহিত্যিকের আরেকটি অসাধারণ মুন্সিয়ানা। নীনার মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণের এক ফাঁকে আলতো করে একটি করে নতুন চরিত্র এনেছেন এমনভাবে- উপন্যাসের ঝকঝকে নীল আকাশে হঠাৎ একখণ্ড মেঘ দেখে যেন পাঠকের মোহভঙ্গ না হয় বরঞ্চ ভেসে আসা এক খণ্ড তুলতুলে সাদা মেঘকে আদরে গ্রহণ করে নেয়। বাস্তব ও বৈচিত্র্যপূর্ণ চরিত্রের সন্নিবেশ উপন্যাসের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক। তেমনি একটি চরিত্র হলো- মজুমদার। পরাবাস্তব ও বাস্তবতার মিশেলে রহস্যময় এক চরিত্র। এমন চরিত্র সমাজে অহরহ দেখা না গেলেও, এদের অস্তিত্ব আছে। নেতিবাচক চরিত্রের হলেও চারিত্রিক রহস্যময়তার ধুম্রজালে আটকে মানুষকে বশে আনার আশ্চর্য এক ক্ষমতা থাকে এদের- যে ক্ষমতার বলী নীনার সুন্দরী ছোটো বোন রানু ও নীনার পিতার অন্ধবিশ্বাস। সুদখোর, নির্দয়, অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড, ভয়ংকর শারীরিক গঠন ও বিভৎস চেহারার মজুমদারকে কী করে রানুর মতো একটি মেয়ে ভালোবাসতে পারে ও নীনার পিতা ভক্তি করতে পারে তার যে পরাবাস্তব ও বাস্তব যুক্তিযুক্ত বর্ণনা লেখক দিয়েছেন তা পড়ে পাঠক লেখকের চোখ দিয়ে অচেনা এক ভুবনের সন্ধান পাবেন।
শিল্প সাহিত্য যে মানুষের মনকে সম্মৃদ্ধি, শান্তি ও স্বস্তি দিতে পারে তার যেন জীবন্ত এক উদাহরণ দিয়েছেন লেখক নীনার মাধ্যমে। শৈল্পিক মনটির কারণে শত কষ্ট পায়ে দলে ‘উড়ুক্কু’ হবার পথটি সুগম হয়েছিল নীনার। পেটে দানাপানি নেই অথচ আবৃত্তি সংগঠনের সাথে জড়িয়ে, অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করে নিজেকে ব্যস্ত রেখে, অশান্তিময় পরিবারের গন্ডি পেরিয়ে আলাদা একটি জগত তৈরি করে দুদণ্ড শান্তি খুঁজে পেয়েছিল নীনা- ডিভোর্স পরবর্তী জীবনেও যখন অশান্তি ও সংগ্রামের যাঁতাকলে পড়ে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছিল; ঠিক তখন এক মহান শিল্পপ্রেমি মানুষ ও মায়ের প্রাক্তন প্রেমিক ইরফানুল কবির তাঁর শিল্পের জগত ও শৈল্পিক চিন্তাধারা দিয়ে নীনাকে নতুনভাবে বাঁচতে শেখান। চমৎকার এক চরিত্র চিত্রণ ‘ইরফানুল কবির’।
এছাড়া সাহিত্যপাঠ দিয়েই নীনার পরিচয় সালাহদিন, সত্যজিৎ এর মতো কিছু বন্ধুদের সাথে। যাদের সঙ্গও মানসিক যন্ত্রণা থেকে খানিক মুক্তি দিয়েছিল নীনাকে সেই সাথে চিন্তাধারা পরিপক্কতাও লাভ করেছিল।
নীনার পর অসাধারণ আরেকটি চরিত্র চিত্রণ করেছেন লেখক ‘রেজাউল’ নামে। বিবাহোত্তর জীবনে জৈবিক চাহিদা পূরণে অধিকাংশ নারী-পুরুষের মাঝে যে জটিল জৈবিক সংকট দেখা দেয় তার একদম মূলোৎপাটন করেছেন কথাসাহিত্যিক নাসরন জাহান। ভুলে বা বুঝে বা না বুঝে বা অসৎ সঙ্গে পড়ে রেজাউলরা যে বিকৃত ও অবাস্তব যৌন শিক্ষা ও ধারণা লাভ করে তার মাশুল দেয় নীনার মতো রুচিশীল নারীরা- যাদের কাছে যৌনতা একটি শিল্প ও গভীর ভালোবাসার চরম আদর আস্বাদন। রেজাউলের বিকৃত চিন্তার বহিঃপ্রকাশ বর্ণনা করতে গিয়ে উঠে এসেছে এ সংক্রান্ত সমাজের মানুষের মনে যুগ যুগের লালন করা কুসংস্কার ও কুনিয়ম লালনের বিষয়গুলোও। নীনা-রেজাউল দম্পতির পাশাপাশি শানু ও কামাল দম্পতির জৈবিক জীবন তুলে ধরে- সমাজের বৃহৎ একটি অংশের মানসিকতার প্রতিনিধিত্ব করা হয়েছে- যারা মনে করে স্বামী যেমনই হোক তার কাছে বাসর ঘর থেকে শুরু করে সতী সক্ষম নারী প্রমাণ করা ও মাথার ওপর স্বামীর ছায়া ধরে রাখাই জীবনের পরম ধর্ম। এখানে কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহানের কল্পনাশক্তির গভীরতা ও দক্ষতা অনুধাবন করে স্তম্ভিত হয়েছি। এ বিষয়ে পরবর্তী অংশে আলোচনা করছি।
উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রের মাধ্যমে ঔপন্যাসিক সমাজের বিভিন্ন মানসিকতার মানুষ ও অসংগতির প্রতিনিধিত্ব করিয়েছেন। তাই ছোটো বড় সব চরিত্রই এখানে গুরুত্ব পেয়েছে। উপন্যাসের প্রায় শেষের দিকে ‘ওমর’ নামের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রটি এসেছে। যাকে আমাদের সমাজ হয়তো মানুষ বলেই গণ্য করে না। লোকে ভাবে ওমরের আত্মসম্মানবোধ নেই কারণ রাগ-ঘৃণা-আনন্দ-বেদনা কিছুই তাকে স্পর্শ করে না- আসলেই কি তাই? নিম্নবিত্ত ওমরেরা নির্মম বাস্তব মেনে নিয়ে বেঁচে থাকার উপায় বের করে নেয় নিজের মতো করে- টাকা যেখানে নেই সেখানে একটি ভালো জুতা বা জামা পরতে না পারার লজ্জা ধারণ করে লাভ আছে কি?- নিজ জীবনের অসহায়ত্ব নিয়ে লজ্জা না পেয়ে বরঞ্চ নির্বিকারভাবে হাসিমুখে চলাই কি ওমরের মর্মস্পর্শী প্রতিবাদ নয় সমাজের প্রতি বা ইশ্বরের প্রতি? ডিভোর্সী ও প্রাক্তন স্বামীর ঔরসে ভুলক্রমে গর্ভধারণ করা নীনাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে সহাস্যে গ্রহণটা কি ওমরের উদারতা, সমাজের প্রতি গভীর নিন্দা ও অন্যায়ের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনই প্রকাশ পায় না? এই ওমররাই নীনাদের মতো নিম্নবিত্ত, গভীর আত্মসম্মান বোধ সম্পন্ন সংগ্রামী নারীদের পাশে দাঁড়ায়, হাত ধরে একসাথে পথ চলার সাহস দেখায়। জয় হোক ওমরদের।
ছোটো একটি চরিত্র নীনার ভাই ‘আরেফিন’- যাকে উপস্থাপন করা হয়েছে ছাত্ররাজনীতির প্রতিনিধিত্বকারী চরিত্র হিসেবে। আরেফিনের মাধ্যমে এদেশে ছাত্ররাজনীতির কুটিল, জটিল দিক যেমন তুলে ধরা হয়েছে তেমনি তুলে ধরা হয়েছে জনমানুষের জন্য কাজ করতে চাওয়া রাজনৈতিক মতাদর্শ ধারণ করা ছাত্রগুলোর পরিণতি। বাদ যায়নি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক কুটচাল এবং যুদ্ধের পরিবেশ তৈরি ও দূর্বলের প্রতি আধিপত্য বিস্তার ও দমিয়ে রাখার নিন্দনীয় কুটকৌশল নিয়ে আলোচনাও। ভাইকে ঘিরে নীনার রাজনীতি সংক্রান্ত উদ্বিগ্নতা ও সচেতন চিন্তাধারা এদেশের কোটি কোটি ভুক্তভোগী মানুষের মনের কথাই বলে।
নীনার মা’কে উপস্থাপন করা হয়েছে নিম্নবিত্ত পরিবারের অর্থকষ্টের যাঁতাকলে পিষ্ট এক নারীর বিদ্ধস্ত ধ্বংসাবশেষ হিসেবে- যারা কেবল সংসার নামক সঙ- সারটিকে নামমাত্র টিকিয়ে রাখতে ব্যস্ত- যে সঙ-সারটিকে আমরা কংকাল-সারও বলতে পারি- সমাজ যাকে ডাস্টবিনের বাতিলযোগ্য আবর্জনা ছাড়া আর কিছু ভাবে না। অন্যদিকে নীনার পিতা ভালো মানুষ হয়েও কুসংস্কার, গোঁড়ামি ও মজুমদারের প্রতি অন্ধবিশ্বাসের কাছে পরাজিত এক মানুষ- যার বলী নীনা বাদে পরিবারের বাকি সবাই এমনকি একটি সময় সে নিজেও।
ছোটোখাট চাকুরে নীনার চাকরিস্থলের সহকর্মী, বস ও পরিবেশ তুলে ধরে নারীদের চাকরি জীবনের নানা অর্থ-মনস্তাত্ত্বিক সংকট, অফিশিয়াল অনিয়ম ও হয়রানির বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। আবার নীতি নৈতিকতার বিসর্জন দিয়ে কিছু মানুষের সাবলীল টিকে থাকার চিত্রও আছে। আছে অফিশিয়াল নোংরা রাজনীতির চিত্রও। ঘরের ভেতর দুঃসহ যন্ত্রণার মোকাবিলা করে অফিসে এসে এহেন পরিস্থিতি সামলে নীনারা তবু টিকে থাকে, থাকতে হয়।
মাতৃত্ব যে নারীর চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা ও স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য তার বাস্তবচিত্র অংকিত হয়েছে বস্তির শিশু কাল্লুর প্রতি নীনার স্নেহ ও মায়া মমতাশীল হৃদয় দিয়ে। অর্থকষ্ট ও রেজাউলের অবহেলায় হারানো নিজ মৃত সন্তানের কষ্ট ভুলতে নীনাকে একা যুদ্ধ করতে হয় নিজ মনের সাথে- মরে যাবার আগে রোগে কাতর পুত্রসন্তানের আর্তচিৎকার প্রায়শই বিপর্যস্ত করে তোলে নীনাকে- আবার ডিভোর্সের বহুদিন পর রেজাউলের তৈরি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির ঘোলাটে জালে পড়ে পুনরায় সেই পীড়াদায়ক গর্ভধারণ করে বসে সে- এখানে এসে নিদারুণ জটিল এক অসহায়তা ও মনস্তাত্ত্বিক মাতৃত্ব সংকটে পড়ে যায় নীনা- এত সংগ্রাম করে এসে ফের সেই রেজাউল নামক অশান্তির চোরাবালিতে আটকে আঁধারে তলিয়ে যাবার আশংকা দেখা দিলে নীনা কি শেষ হয়ে গিয়েছিল? পুরো উপন্যাসে নীনাকে বুদ্ধিমতী, দৃঢ় মনোবলের অধিকারী, আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন সংগ্রামী নারী হিসেবে উপস্থাপন করে শেষে এসে তরী ডুবাল কি ঔপন্যাসিক? না। এখানে এসেও এত চমৎকার দৃশ্যপট রচনা করে উপন্যাসের ইতি টেনেছেন লেখক, যা প্রশংসার দাবীদার। এক কথায় চমৎকার সমাপ্তি।
পাঠ আলোচনার এক অংশে আমি কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহানের কল্পনাশক্তির গভীরতার স্তুতিগান গেয়েছি তবে বিস্তারিত লিখিনি। এখন আসছি সে প্রসঙ্গে। বইটির ভুমিকায় লেখক পরিস্কার বলেছেন- তিনি নিম্নবিত্ত পরিবারের নন তবে এ জীবন দেখেছেন তিনি দরিদ্র বাংলাদেশের সর্বত্র। নিজে কষ্ট না সয়ে এতোটা দেখলেন কী করে? এখানেই বাজিমাত করেছেন তিনি। একজন লেখকের অন্তরচক্ষু দিয়ে ঘটনা বা চরিত্রের গভীর পর্যন্ত পৌঁছানোর ক্ষমতা বা এক শব্দে বললে ‘কল্পনাশক্তি’- কে সবচেয়ে শক্তিশালী যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হয় গোটা বিশ্বের সাহিত্য জগতে। নাসরীন জাহানের সেই যোগ্যতার সবটুকু দেখতে পেয়েছি এ উপন্যাসে। গোটা উপন্যাসে বাস্তবতার রূঢ়তার এত নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছেন যে যারা এসব ভোগান্তি বাস্তবে সয়েছেন তারাও থমকে যাবেন। বর্ণনা এতোটা জীবন্ত যে, পড়তে পড়তে মনে হয় বই নয় সিনেমা দেখছি বা আমিই নীনা। হাতে একটি টাকাও নেই, অন্য কোনো জুতোও নেই- এমন সময় রিক্সাভাড়া বাঁচাতে, পথিমধ্যে হাঁটতে হাঁটতে কর্দমাক্ত রাস্তায় নিম্নবিত্ত নীনার জোড়াতালি দেয়া জুতোটি যখন ছিঁড়ে যায়- পায়ের নীচে সেই নোংরা কাদা পাঠক হিসেবে আমিও অনুভব করেছি- প্রতিটি রূঢ় বাস্তবতা এমনি করে উপলব্ধি করিয়েছেন তিনি। উপন্যাসের সর্বোত্তম দিক এটাই।
এত গুণগান করে পরিশেষে বলতে চাই সবই কি ভালো ছিল উপন্যাসটির? এখানে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো প্রদীপের ঠিক নিচের আলোর খুঁতটুকুর মতোই উপন্যাসটি যেখানে আলোকিত তার নিচেই আঁধার- অর্থাৎ যে বাস্তব বর্ণনাকে উপন্যাসের সর্বোত্তম দিক বললাম ঠিক সে কারণেই উপন্যাসের কোথাও কোথাও লেখক পাঠক দূরত্ব তৈরি হতে পারে। নীনার জীবনের দুঃখ, কষ্ট বা রূঢ় দিকগুলো কোথাও কোথাও পুংখানুপুংখ জীবন্ত বাস্তব বর্ণনা দেয়া হয়েছে- যা পাঠকের মনে খানিকটা বিব্রতকর জটিল সংকট তৈরি করে; কারণ গা ঘিনঘিনে সে বর্ণনা না পড়ে এড়ানোও যায় না আবার এড়িয়ে বাকি অংশ পড়তে গেলে উপন্যাসের মর্মার্থও সঠিক উপলব্ধি করা যায় না। এখানে যদি বর্ণনাটুকু একটু ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে বা বিকল্প শব্দে উপস্থাপিত হতো তো পাঠক এহেন দ্বন্দ্ব ও সংকট থেকে মুক্তি পেত। তবু এ সংকট ছাপিয়েই বইটিকে অসাধারণ আখ্যা না দিয়ে পারা যাবে না। প্রথম প্রকাশের পর বইটির এত এত সংস্করণই পাঠকের কাছে বইটির গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে।
অসীম শ্রদ্ধা ‘নীনা’ বা ‘উড়ুক্কু’র কারিগর কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহানের প্রতি।
অলংকরণঃ তাইফ আদনান
