চারদিকের কোলাহল, ধ্বংস আর ধ্বসের মাঝ থেকে বেরিয়ে আসার পথদর্শ হচ্ছে একমাত্র বই। বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে বই পড়ার অভ্যাস ফিরিয়ে আনলে নিজের জ্ঞান এবং চিন্তাশক্তিকে বিশ্বাস করার শিল্প শেখায়। আমার কাছে সাহিত্য স্রষ্টা নাসরীন জাহানের ‘উড়ুক্কু’ উপন্যাসটি ভালো লাগার কারণে কয়েকটি লাইন লেখার দুঃসাহস দেখালাম। সাহিত্যের বিশাল শাখা-প্রশাখার মধ্যে উপন্যাস অন্যতম। শুধু তাই নয়, উপন্যাসের জনক কমালাকান্ত (বঙ্কিমচন্দ্র) থেকে শুরু করে বর্তমান সময় ধরে এখনো পাঠক-সমাজে উপন্যাসই সর্বাধিক বহুল পঠিত ও জনপ্রিয়তার শীর্ষে। নাসরীন জাহানের ‘উড়ুক্কু’ উপন্যাসটি আমি ১৯৯৫ সালে পড়েছি। আমার মনে হলো আজও ‘নীনা’ নামের চরিত্রটিতে হৃৎস্পন্দন শুনতে পাই। নিজস্বতার ভেন্টিকেলের পিছন থেকে বাউন্স করে নীনা। যেখানে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার নারীদের কথা উচ্চারিত হয়েছে বারেবারে।
‘উড়ুক্কু’ উপন্যাসটি নীনা নামের এক শ্রমজীবী সংগ্রামী ডিভোর্স নারীর গল্পের থেকে শুরু। ঔপন্যাসিক পুরো সমাজ-দেশে ঘটে যাওয়া নারীকেই নিয়ে সংস্করণ দেখিয়েছেন।
এইটা এমন একটি উপন্যাস। পাঠকের পড়তে ক্লান্তি লাগবে না। একজন পাঠকের মনে হবে উপন্যাসটি এক নিমিষেই পাঠ শেষ করতে পারবেন। আমার নিজস্ব মতামত, পড়তে পড়তে আবেগে সামান্যতম সঁচরণ ফেলার জন্য মন বিচলিত হয়ে উঠবে। মনে হবে এরই মাঝেই নীনার জীবনের কোন আখ্যান ফেলে এসেছি কি-না? আমি কিন্তু মাকড়সার জালের মতো আটকে গিয়েছিলাম চল্লিশ-থেকে পঁয়তাল্লিশ পৃষ্ঠার মধ্যেই। অনেকক্ষন বোধে আচ্ছন্ন ছিলাম। নীনার মতো এক জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছিলাম ওলি-গলি ভুলে। শাদা শাড়ির মতো শ্বেত শুভ্র বৃষ্টির কারণে গলি খুঁজে নিতে পারছিলাম না। লেখক নিজেই এই বৃষ্টিকে বিধবার ধবধবে শাদা শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছেন। লেখকের শব্দচয়নে এবং ভূয়োদর্শনে পাঠককে পূর্ণাঙ্গ শৈল্পিক কৌশল রপ্ত করতে হবে। বিদগ্ধ সাহিত্যস্রষ্টা নাসরীন জাহান পাঠক এবং লেখককে গদ্যের মধ্যে নতুন প্লাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছেন এই ‘উড়ুক্কু’ উপন্যাসের মাধ্যমে। বইটি পড়তে পড়তে আমার মনে হলো নীনার চরিত্রে মধ্যে ঔপন্যাসিক নিজে চষে বেড়িয়েছেন অসহায়ের মতো। নীনা প্রেম করে রেজাউলকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু, কোন এক অদৃশ্য ছায়ায় রেজাউল থেকে অনেক দূরে সরে আসেন তিনি। নীনার সন্তান এই পৃথিবীর আলোর মুখ দেখে না...।
আর এভাবেই স্বামী-ছাড়া এক ডিভোর্স নারী নীনাকে নিয়ে ঔপন্যাসিক পাঠকের হৃদয়ে পৌঁছাতে পেরেছেন।
“ভীষণ অস্বস্তিকর সব ব্যাপার-স্যাপার! আগে এসব ছিল না। জীবন যে সহজ সুন্দর একতালে চলে না, আমাকে ঘিরে চলা এসব ঘটনাই তার প্রমাণ। চায়ের গাঢ় লিকারে ভাবনার গ্রন্থিগুলো ডুবে য়ায়। খয়েরি জল ছিঁড়ে খুঁড়ে ধোঁয়া উড়তে থাকে। সত্যি করে বলো তো, পরশু তোমার সঙ্গে বসের দেখা হয়নি, সুলতানা চেয়ার টেনে আমার টেবিলের ওপাশে এসে বসেছে। অবচেতনেই টাটকা পেপারটা সশব্দে দোমড়ানো আঙুলের তলায় ঠেসে দিই। ফের মুখ নেমে য়ায়। বুকের ভেতর অবিরাম শব্দ। কেমন যেন ফুলে উঠেছে ধমনি ও শিরা। টিপটিপ কাঁপছে মাথার দুপাশের রগ। শীর্ণ ধূসর একটা বিড়াল অস্তিত্বের বাক্স থেকে লাফ দেয়। এই সব ছায়া গাঢ়তা থেকে মুখ তুলি। সামনে চিৎপাত পড়ে আছে ফাইল, প্যাড, কলম। তৈরি হও, নিজেকে বলি, তৈরি হও জঘন্য কৈফিয়তের জন্য। কিন্তু গলার মাঝপথে এসে কী আটকে যায়! বেশি কিছু বলতে পারি না। ভেবেছিলাম, মুখ ফুঁড়ে জঘন্য কিছু শব্দ বেরোবে, বদলে ভিজে আসছে কন্ঠ, সেই স্বর নিজের কাছেই কী যে অচেনা ঠেকছে! ফলে আমি এইভাবে শুরু করি, এই সামান্য পয়সার একটা চাকরির জন্য অফিসে না এসে বসের সঙ্গে ডেটিং করতে হবে? তুমিও একজন মেয়ে, আমি আশা করেছিলাম, তুমি অন্তত আমার সম্মানটা বুঝবে... বলতে বলতে আচমকা থেমে যাই। তারপর যা বলি তার জন্য আমার নিজেরই কোনো প্রস্তুতি থাকে না। কেমন একটা ক্রোধ, ক্ষিপ্ততা আমাকে বিহ্বল করে তোলে, এর চাইতে তো বেশ্যাবৃত্তিই ভালো। ওসব লাইনে পয়সা টয়সা আরো বেশি। বলেই টের পাই, এই ঝাঁঝের ভেতর দিয়ে নিজের দুর্বলতা যেন আরো গাঢ় হলো। অপমানে লাল সুলতানা এবার প্রায় ছিটকে দাঁড়ায়, আমার এই সহজ কথাটার তুমি এই রকম মানে করলে?... ছি, তুমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছ? তার এই তীক্ষ্ণ শ্লেষের মুখে নিজেকে ঝাঁঝালো করে তুলতে আর অসুবিধে হয় না। ঠোঁটে বিষ মাখানো হাসি ঝরিয়ে বলি বস আজকেও আসেনি, খোঁজ নিয়ে দেখবেন আজকে তিনি কার সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছেন? দেখুন না, অফিসে অন্য কোনো মহিলা স্টাফ অনুপস্থিত কিনা!”
অদ্ভুত রহস্যময় এক মুখোশধারী চক্র সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে আছে। এর মাঝেই বেঁচে থাকার নামই জীবন? নীনা! এই ঢাকা শহরের একটি বেসরকারি অফিসে কেরানির চাকরি করেন। সামান্য বেতন দিয়ে কোন রকমে দিন কাটায়। থাকেন সাবলেটে শানু ও তার স্বামী কামালের সাথে। সাবলেট থাকার অন্য রকমের কষ্ট-ধৈর্য এবং স্বামী-স্ত্রীর গোপনীয় বিষয় নীনার মাঝে অসহনীয় হয়ে আসে। ভালো-খারাপ চেনার উপায় নেই। সত্যজিৎ নীনার প্রাক্তন স্বামীর বন্ধু। ওর সাথে নীনার সুন্দর সম্পর্ক। সত্যজিৎ নীনার সাথে দেখা করে।
কথা সাহিত্যের দুর্লভ রমণী নাসরীন জাহানকে আমরা ঔপন্যাসিক হিসাবে চিনলেও তিনি একজন লিটলম্যাগ, ছোটগল্প এবং নাটকের মানুষ। তিনি ‘উড়ুক্কু’র নীনা চরিত্রটিতে নিজস্বতার গন্ডি থেকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন মানুষের একাকীত্ব এবং এর বহুমাত্রিক অনুভূতি। এই কারণে এই উপন্যাসে উঠে এসেছে প্রেম, বিরহ বৈচিত্র্যময় মানুষও তাঁর চিন্তাজগতের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। তিনি এই উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন ‘ফিলিপস সাহিত্য পুরুস্কার’। নাসরীন জাহানের সৃজনভাবনায় গভীর মানবতার ছোঁয়া পায়। উনার লেখা শুধু উড়ুক্কু না, ছেলেটি যে মেয়ে, মেয়েটি তা জানত না/ নারীর প্রেম তার বিচিত্র অনুভব/ পালকের চিহ্নগুলো/ নারীবাদী গল্প/ বিচূর্ণ ছায়া, এসব গুলো যতবার পাঠ করবেন ততবার মনে হবে নাসরীন জাহান পাঠকের জন্য প্রবল আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে গেছেন।
“দুপাশে গাছ। সুপরিসর তকতকে পথ। সোডিয়ামের কাঁপা কাঁপা আলো। হু-হু জলের বাতাস। আমার ঘুম পাচ্ছে। আসলে এসব কথা বলতেই কি আমি এখানে এসেছি? ওর গা ঘঁষে হাঁটি। মোটর সাইকেল ঠেলে এগোচ্ছে সত্যজিৎ। এই আলো, এই হাওয়া ওকে অচেনা, চমৎকার করে তুলেছে। এই সত্যজিৎকে আমি চিনি? ঘুম ঘুম দৃষ্টি মেলে দিই সামনের দিকে। ঝাউগাছের ঝিরঝির হাওয়া... অদ্ভুত মাদকতা...। ও যদি আমাকে জডিয়ে ধরে? হঠাৎ কেমন থির থির কেঁপে উঠে শরীর। ও যদি আমার হাতটা স্পর্শ করত? তোর সাথে রেজাউল দেখা করতে চায়, সত্যজিৎ আচমকা বলে। মনে হলো সিরিয়াস কোনো কিছু নিয়ে কথা বলবে।”
রেজাউল এর সাথে নীনার ছাড়াছাড়ির পর আবারও বন্ধুর মাধ্যমে রেজাউল আবার নীনার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়। অফিসে-বাসায় নিজে গিয়ে এবং বন্ধু দিয়ে নীনার মন জয় করার চেষ্টা করে। একদিন এক বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় আবার নীনার সাথে রেজাউলের শারীরিক সম্পর্ক হয়। নীনা রেজাউলের সাথে দৈহিক মিলনের ব্যাপারে অমত ছিল। নীনার শরীরে যখন নতুন অস্থিত্ব হানা দেয়, প্রিয় বন্ধুদের পরামর্শেও গর্ভের সন্তানকে নষ্ট করতে রাজি হয় না সে।
মফস্বলের গরিব ঘরের মেয়ে নীনা। ভাই-বোন-মা-এর দারিদ্র জর্জরিত সংসার থেকে আসা। নীনা, রানুর মজুমদার নামে বিভ্রান্ত কারী মোহ সৃষ্টিকারী এক শয়তানের খপ্পরে পড়া ইত্যাদি অনেক কিছু চলে আসে সাহিত্যস্রষ্টা নাসরীন জাহানের কলমে। খোঁচায় খোঁচায় দগ্ধ হয়ে উঠে চলার পথ। দুর্গোৎসবের দিনে নীনা রানুকে খুঁজতে গেলে অজয় তাকে চুমু খেতে হাতে পয়সা দিয়েছিল সে প্রসঙ্গটিও ওঠে আসে এই উপন্যাসে।
আমি নাসরীন জাহানের গল্পের চরিত্র চিন্তাচেতনায় গভীর জীবনবোধ এবং মানবতা দৃম্যমান দেখতে পায়।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কষ্ট পিতা-মাতার সামনে সন্তানের মৃত্যু। সদ্যোজাত সন্তানের জন্ডিসে মৃত্যুতে নীনা শোকে মুহ্যমান। তাঁর হাসপাতালে তোলপাড় করা চিৎকারে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি। ইতিমধ্যে ওমরের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ছেলেটি ভারী অদ্ভুত। রাগ-ঘৃণা-আনন্দ-বেদনা কিছুই যেন তাকে ছুঁতে পারে না। সমাজের চোখে আত্মসম্মান বোধ বিবর্জিত ছেলেটির সহমর্মিতায় নীনা আপ্লুত হয়। গর্ভে আবার সন্তানের উপস্থিতি টের পায় সে। প্রথম সন্তানের মৃত্যু সে ভুলতে পারে না। অথচ এই নতুন ভ্রুণকে নষ্ট করে দিতেও মন চায় না। কী করবে নীনা? বড় নাজুক প্রসঙ্গ। ওমর বলে, এসব আমি বিশেষ বুঝি না। আপনার প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি কেমন, সেটা বলে বুঝাতে পারবো না। আপনার অনাগত সন্তানের প্রতিও আমার মমতা... না, না আমি তার মৃত্যুর কথা ভাবতে পারি না। এ সন্তানের বাবা হওয়াটাও ভাগ্যের ব্যাপার। নীনা একদিন বিক্ষিপ্ততার ভেতরে ওমরের মুখোমুখি হয়। আপনি কি আমার বাচ্চার দায়িত্ব নেবেন? এই শব্দতরঙ্গ তাকে স্পষ্টতই চমকে দেয়। সে বিহ্বল চোখে তাকায় নীনার দিকে। ওমর বলে, আপনি বাচ্চাটার পিতৃত্ব সংকটে পড়েছেন তো? আপনি যদি সমাজকে ভয় পেয়ে থাকেন, তাহলে আমি রাজি এর পিতৃত্বের দায়িত্ব নেবার জন্য। সন্তানের ব্যবস্থা না হয় হলো। আপনি কোথায় থাকবেন? এই গল্পের মাঝে উঠে আসে নীনার মায়ের বিবাহপূর্ব প্রেমিক ইরফান চাচার কথা। এই অসাধারণ মানুষটি চেয়েছিলেন নীনা ভালো থাকুক সাথে রেজাউলের সম্পর্কের পূণঃ প্রতিস্থাপন।
নীনার যে সংকটের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সেটা নীনার একার সংকট না। আমাদের দেশের ও সমাজেরই সংকট। লেখক এইখানে নীনার উপর দিয়ে সংকটকে একা দেখায়নি। এইটা একটা পুরো সমাজের মনস্তাত্ত্বিকও সংকীর্ণতার চিত্র। সমাজের অতুগ্র মানসিকতার এক দৃশ্যকল্প। এসব দৃশ্যপটকে ধরেই নীনার নির্মাণ ও ‘উড়ুক্কু’ উপন্যাসের এগিয়ে চলা।
মানসিক প্রশান্তি এবং উদ্দেশ্যমুখি জীবনযাপনের দিক নির্ণয়কারী হিসাবে পদ দেখাবে এই উপন্যাস।
অলংকরণঃ তাইফ আদনান
