জলধি / পাঠ-পর্যালোচনা / সংকেত দেয়, দেখা দেয় না ‘একজন কেবল তালিয়া বাজায়’
Share:
সংকেত দেয়, দেখা দেয় না ‘একজন কেবল তালিয়া বাজায়’

বইয়ের নামই এখানে বইয়ের প্রথম ধাঁধা। ‘একজন কেবল তালিয়া বাজায়’—বাক্যটি কোনো ঘোষণা নয়, একটি লক্ষ করা। কেউ একজন হাততালি দিচ্ছে, বাকিরা দিচ্ছে না; অথবা বাকিরা পারফর্ম করছে আর দর্শক একজনই। কবিতাগুলোর ভেতর দিয়ে যেতে যেতে দেখা যায়, পঙ্ক্তিটি বইজুড়ে প্রায় প্রতিটি কবিতার শেষে ধুয়ার মতো ফিরে ফিরে আসছে—গানের ‘স্থায়ী’র মতো, কিংবা যাত্রাপালার বিবেকের মতো। শেষ কবিতায় গিয়ে ধুয়াটি নিজেই একটি কবিতা হয়ে ওঠে এবং তখন বোঝা যায় লোকটি কে নয়, বরং লোকটি কী করে: ‘সে সংকেত দেয়, সে দেখা দেয় না, কথাও কয় না।’

 

এই একটি লাইনে গোটা বইয়ের স্নায়ু। এখানে ঈশ্বর, নিয়তি, ক্ষমতা, এমনকি পাঠক—সবাইকেই বসানো যায়; কেউই মেলে না পুরোপুরি। যে সংকেত দেয় অথচ দেখা দেয় না, তার সঙ্গে সম্পর্কটা প্রার্থনার নয়, অপেক্ষার। আর অপেক্ষাই এই বইয়ের প্রধান কাল। কবিতাগুলো ভবিষ্যতে কম যায়, অতীতে বেশি যায়, আর বর্তমানে থাকে অস্বস্তিতে—‘কি হবে আমার’ কবিতায় যেমন সিঁড়ি বেয়ে নামা যায় কিন্তু ওঠা যায় না, ‘আমার বেলা যে যায়’—এ যেমন ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার পরেও ওয়েটিংরুমে বসে থাকা।

 

দুই

বইয়ের কণ্ঠস্বর একটি এবং স্পষ্ট: একজন নারী, বয়স যাঁর একটা মোড় পেরিয়ে এসেছে, যিনি নিজের সম্পর্কে নির্মম রকমের সচেতন। ‘বেছে নেবো কাকে’ কবিতায় তিনি নিজের সামাজিক স্থানটিও বলে দেন—‘মধ্যবিত্তের ঘেরাটোপে আবদ্ধ আমি এক মানবী’। এই আত্মপরিচয়টুকু গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই বইয়ের দুঃখ কোনো বিমূর্ত বিষাদ নয়; তার একটা শ্রেণি আছে, একটা লিঙ্গ আছে, একটা ঘর আছে, এবং একটা শহর আছে যেখানে জ্যাম হয় আর হকার ঘামে।

কণ্ঠস্বরটির সবচেয়ে চেনা ভঙ্গি হলো নিজেকে থামানো। ‘গিয়ারটা চেপে ধরো’ কবিতায় সে নিজেকে নাম ধরে ডাকে—সামিনা, জাকিয়া—এবং ধমক দেয়: হাসিটা থামাও, জীবনের গিয়ারটা চেপে ধরো। ‘আত্ম-সমালোচনা’য় সেই ধমক ভেতরের দিকে ঘুরে যায়: ‘আজ আমি নিজেকে চিনি না নিজেই।’ আবার ‘ভাবনা’ কবিতায় সেই একই কণ্ঠ শান্ত হয়ে স্বীকার করে, ‘আমিও এক অদৃশ্য আগুন / নীরবে পুড়ি’—এবং জানিয়ে দেয় যে এই যাতনার ভাষা জলও বোঝে না, পাথরও বোঝে না। জল আর পাথর—অর্থাৎ, তরল আর কঠিন, দুই প্রান্তই; কবিতাটি নিজেই তার অবস্থান বলে দেয়: ‘না তরল না বরফ’। এই মধ্যবর্তিতা, এই কোনো এক প্রান্তে পৌঁছাতে না-পারা, বইয়ের অনেক কবিতার আসল বিষয়।

লক্ষণীয়, এই বিষাদ কখনো আত্মকরুণায় গলে পড়ে না। ‘বিষণ্ন মনের ভাবনা’ কবিতায় বক্তা নিজেই সাফ বলে দেন—নিঃস্ব নন, রিক্ত নন, নিজের ভেতরেই তাঁর মৌতাত। এই আত্মমর্যাদাবোধ পুরো বইয়ের সুরটাকে বাঁচিয়ে দেয়।

 

তিন

বইয়ের সবচেয়ে ঘন থাকা বিষয় সময়। কিন্তু কবিতাগুলো সময়কে এক রকম করে ধরে না—এবং এখানেই সংকলনটির প্রকৃত বৈচিত্র্য।

‘আমার বেলা যে যায়’ সময়কে ধরে যাত্রার রূপকে। স্মৃতি এখানে ডাইনোসর—বিলুপ্ত, বিশাল, তবু হাসছে। মহাকাশে কারফিউ, অর্থাৎ যাওয়ার পথও বন্ধ। বক্তা শেষ ট্রেনের টিকিট কাটতে চান, কিন্তু স্টেশনমাস্টারকে পাওয়া যাচ্ছে না। রবীন্দ্রসংগীতের চরণটি (‘আমার বেলা যে যায় সাঁঝবেলাতে’) কবিতার ভেতরে বসে গিয়ে ব্যক্তিগত হাহাকারকে একটা চেনা সুরে তুলে দেয়। মৃত্যু বা প্রস্থান এখানে ভয়ের বিষয় নয়, অনিশ্চয়তার বিষয়—যাত্রার অনুমতি দেবে কে, সেটাই জানা নেই।

‘কি হবে আমার’ সময়কে ধরে শরীরের ভাষায়। সিঁড়ি বেয়ে নামা যায়, ওঠা যায় না; পা অসাড় হয়ে আসে। কবিতাটি এক লাইনে গিয়ে বড় হয়ে ওঠে—‘জীবন একটা ছকের ভেতর আবদ্ধ হয়ে যায়’। শারীরিক অক্ষমতা এখানে সামাজিক অচলায়তনের রূপক হয়ে দাঁড়ায় এবং শেষে থাকে ‘এক ভুল থেকে আর এক ভুলে পা’।

‘আমার মান নির্ণয়’ সময়কে ছেড়ে দিয়ে সোজা শূন্যতায় গিয়ে দাঁড়ায় এবং এটি বইয়ের অন্যতম নিখুঁত কবিতা। দৌড়াতে দৌড়াতে বক্তা এমন এক জায়গায় পৌঁছান যেখানে ‘না মাটি, না বসতি, না বাজার, না অফিস, না স্কুল’—অর্থাৎ, যে যে প্রতিষ্ঠান দিয়ে মানুষের ‘মান’ নির্ণয় হয়, তার একটাও নেই। উপরে আধা ফিরোজা আধা ধূসর আকাশ, নিচে সবুজ জল, আর মাঝখানে একজন মানুষ যে উড়তেও পারে না (ডানা নেই), ডুবতেও পারে না (সাঁতার জানা নেই)। পরিচয়হীনতার এই ছবিটি নেতিবাচক নয়, বরং এক ধরনের মুক্তির কাছাকাছি—কবিতাটি শেষ হয় ‘শূন্য এবং একের ভেতরে’ আত্মবিসর্জনে, যা আত্মহনন নয়, হিসাব থেকে বেরিয়ে যাওয়া।

এই তিনটি কবিতা একই বিষয়ে, অথচ তিন রকম কারিগরিতে—একটি গানে ভর করে, একটি শরীরে, একটি জ্যামিতিতে। সংকলনটির শক্তি বুঝতে হলে এই পার্থক্যগুলোই দেখতে হবে।

 

চার

স্মৃতির কবিতাগুলোকেও এক করে ফেলা যাবে না, যদিও ওপর-ওপর দেখলে তিনটিই ‘পুরোনো দিনের’ কবিতা।

‘স্মৃতিচারণ’ একটি শোকের কবিতা এবং আশ্চর্য রকম সংযত। সতেরো বছর আগের এক চৈত্রে ঘরের মানুষ আর ফেরেনি। বক্তা তখন কী করছিলেন? স্বরলিপি দেখে গান তুলছিলেন, সংসার সুন্দর করার মন্ত্র পড়ছিলেন, পাতাবাহারের যত্ন করছিলেন—অর্থাৎ ঘরকন্নার নিখুঁত ব্যাকরণ মেনে চলছিলেন। আর ঠিক সেই সময়েই ‘ঘরের মানুষ বৃক্ষের মতো পোষাক পাল্টেছিল’। উপমাটি চমৎকার: গাছের পাতা ঝরা যেমন নিঃশব্দ ও ঋতুর নিয়মে ঘটে, মানুষটির বদলে যাওয়াও তেমনই—কেউ টের পায় না। শেষে এসে সবচেয়ে ধারালো চরণ: ‘প্রতিবাদের ভাষা হৃদে গেঁথেছিল, চোখে ছিল না কো জল’। কান্না নয়, প্রতিবাদ; কিন্তু সেই প্রতিবাদ উচ্চারিতও হয়নি। শোককে এখানে বলা হয়েছে অভ্যাসের ভাষায়—সতেরো বছর ধরে যা ‘স্মৃতির সাথে শয়ন’ হয়ে গেছে।

‘একটি বোশেখ দুপুরে’ একই ঘরানার নয়। এখানে ঘটনা নেই, আছে আধোঘুম, ঘুঘুর ডাক, কাঁচা আমের ঘ্রাণ আর রবীন্দ্রনাথের একটি গানের চরণ মাথায় ঘুরতে থাকা। কবিতাটির প্রাণ আছে শেষ দিকে—‘মেয়েবেলার নিষিদ্ধ খেরোখাতা পুড়ছে ধীরে ধীরে’। পুড়ছে, ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে না; আর পোড়ার পরেই নতুন খাতার সম্ভাবনা। এটি ক্ষতির কবিতা নয়, ক্ষয়ের ভেতর দিয়ে নতুন করে শুরু করার কবিতা।

‘দহন’ আবার সম্পূর্ণ অন্য জাত—এটি প্রায় একটি ছোটগল্প। বৈশাখের নির্জন দুপুরে ডোরবেল বাজে, কেউ একজন আসে, ঘর্মাক্ত ও ক্লান্ত। সংলাপ শুরু হয়: কেন এসেছ এমন নীরস দুপুরে? উত্তর: আমিও নীরস, তাই এই দুপুর পছন্দ। তারপর কাঁচা আমের শরবতের আবদার, আর সেই অনিবার্য প্রশ্ন—‘সেই ঝড়ের রাতের কথা মনে আছে?’ বক্তার জবাবটিই কবিতাটিকে বাঁচায়: অতীত মনের শোকেসে থাক, ঘাঁটাঘাঁটি কোরো না। এখানে স্মৃতি কোনো সম্পদ নয়, ঝুঁকি। আর শেষ চরণ—‘বেঁচে তো আছি। যতই গ্লানি থাক’—গোটা বইয়ের ভেতর সবচেয়ে শুকনো, সবচেয়ে সৎ স্বরের একটি।

তিনটি কবিতার দুটিতেই বৈশাখ-দুপুর, দুটিতেই পুরোনো মানুষ। তবু একটির বিষয় নিখোঁজ হয়ে যাওয়া, একটির বিষয় নিজের কৈশোর, আর একটির বিষয় ফিরে-আসা মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়া। মিলিয়ে ফেললে তিনটিরই ক্ষতি।

 

পাঁচ

এই বইয়ের সবচেয়ে সাহসী কবিতাগুলো নারীর অবস্থান থেকে লেখা এবং তাদের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষুরধার সম্ভবত ‘ভগবান তোমাদের’। কবিতাটি ছোট, প্রায় ব্যঙ্গ-শ্লোকের মতো। শুরু হয় বিদ্রূপাত্মক প্রশংসায়—হে পুরুষ, এমন মোহন ভঙ্গিমা তোমায় কে শেখাল, প্রকৃতি কি তোমার কাছে পাঠ নেয়? তারপর আসল কোপ: বাজার থেকে কেনা ফুলে পুজো হচ্ছে, তবু সেই পুজো সিদ্ধ, কারণ ‘তোমাদের প্রার্থনায় সতত থাকেন এক অবিচল ভগবান’। ধর্মীয় বৈধতা কীভাবে লিঙ্গভেদে বণ্টিত হয়, তা এখানে তত্ত্ব দিয়ে নয়, একটি পুজোর দৃশ্য দিয়ে বলা হয়েছে। নারীর প্রার্থনায় ভগবান কেন ‘অবিচল’ নন—প্রশ্নটি কবিতা করে না, পাঠকের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়।

‘রাত্রি ও মর্তনারী’ কাজ করে অন্যভাবে—পুরাণ ভেঙে। রাধিকার বাগানে ফণা তোলে বিষধর, আর মর্তের নারী তার ‘বেঁচে থাকার পাসপোর্ট’ ও ‘স্বর্গে যাবার সোনালি ভিসা’—দুটোই খোয়ায়। আধুনিক আমলাতান্ত্রিক শব্দ (পাসপোর্ট, ভিসা) পৌরাণিক কাঠামোয় ঢুকিয়ে দেওয়ায় একটা তীক্ষ্ণ শ্লেষ তৈরি হয়: নারীর মুক্তিও এখন কাগজপত্রের ব্যাপার। শেষ স্তবকে রাত্রিকে ডাকা হয় ‘নগ্নিকা বারবণিতা’ বলে এবং তারপর রাধিকা ও গণিকা-রাত্রি একাত্ম হয়ে যায়। পূজ্য নারী আর পতিত নারী—সমাজ যে দুই খোপ বানিয়ে রেখেছে, কবিতাটি রাত্রির অন্ধকারে সেই দুই খোপ মিলিয়ে দেয়।

‘সত্যি কী চেয়েছিলে’ এই একই জিজ্ঞাসাকে ঘরোয়া ও নির্মম করে তোলে। প্রশ্নের তালিকাটি খেয়াল করার মতো: ভালোবাসা, নাকি দেহ, নাকি ‘কালো মোহর’, নাকি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠা, নাকি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে পুষ্পবন্দনা? প্রেমের প্রশ্ন থেকে শুরু করে কবিতাটি অনায়াসে ক্ষমতার আর সামাজিক স্বীকৃতির প্রশ্নে চলে যায়—এবং সেটাই এর কৃতিত্ব।

আর ‘দিন আসবে’ এই পর্বের সবচেয়ে নরম, সবচেয়ে আশাবাদী কবিতা। বক্তা নিজেকে বলেন ‘শবরী’—যে অপেক্ষা করে, যে ফল চেখে রাখে অন্যের জন্য। কিন্তু কবিতাটি অপেক্ষায় থেমে থাকে না: সরষেফুলের পোশাক, গাঁদার গহনা এবং শেষে ‘আমার ও কথা বলার দিন আসবে’। বইয়ের যে কণ্ঠস্বর বারবার চুপ করে থাকে, এখানে সে ভবিষ্যৎ কাল ব্যবহার করে।

 

ছয়

সংকলনটির দ্বিতীয় বড় ধারা ব্যক্তির বাইরে—সভ্যতা, বাজার, রাষ্ট্র, প্রকৃতি। এখানে কবির স্বর পাল্টে যায়: প্রথম পুরুষের বদলে সম্বোধন, বিলাপের বদলে অভিযোগ।

‘কেবল দৌড়’ কবিতাটি ছোট, কিন্তু এর ভেতরে একটা পুরো অর্থনীতি আছে। ‘গোলাপ ফুটুক না ফুটুক যেকোনো ফুল হলেই হলো’—গুণের বদলে পরিমাণ; ত্রিশ দিনে মাস হোক বা একত্রিশে, কিছু যায় আসে না। আর শেষ দুটি চরণে সেই যুক্তি চূড়ান্ত: ‘মুদ্রার কোনো জাতকূল থাকে না / আগুন আর জলের এখন একই বাজার দর।’ সবকিছু যখন বিনিময়যোগ্য হয়ে যায়, তখন পার্থক্য—অর্থাৎ চরিত্র, স্বাদ, গুণ—মুছে যায়। বাংলা কবিতায় পণ্যায়নের এত ছোট ও এত কাজের একটি সূত্র সহজে মেলে না।

‘বৈপরীত্য’ ও ‘শীতকাব্য’ একই অসাম্যকে দেখায় দুই ঋতুর ছবিতে। প্রথমটিতে কিছু ঘরে কমলা আগুন জ্বলে, আর কিছু আঙুল বিনা ভালোবাসায় কুঁকড়ে যায়। দ্বিতীয়টিতে ছবিটি আরও কড়া: নিরন্ন মানুষ আগুনের তাপে শরীর সেঁকছে, আর মোড়লবাড়ি থেকে ভেসে আসছে নতুন গুড় আর পিঠার ঘ্রাণ। ঘ্রাণ দিয়ে শ্রেণিবিভাজন বোঝানো—এটি নিছক কৌশল নয়, দেখার ক্ষমতা।

‘যদিও সাঁতার জানি না’ বইয়ের সবচেয়ে সরাসরি রাজনৈতিক কবিতা এবং সম্ভবত সবচেয়ে জরুরি। মাঝখানে এসে ছবিটি হঠাৎ ভয়ংকর হয়ে ওঠে—শিশুরা মায়ের কোলে ফিরছে রক্তস্নাত হয়ে, আর ‘ভাষাহীন জননীরা বিচার চাইতে ভুলে গেছে’। তারপর প্রশ্ন: এ গ্রহ কাদের, ঈশ্বর কাদের। শেষে ডুবে যাওয়ার আগে একবার চেষ্টা করার আহ্বান—‘যদিও সাঁতার জানিনে’। অক্ষমতা স্বীকার করেও হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত—এই বইয়ের নৈতিক শীর্ষবিন্দু এটিই। খেয়াল করার মতো, ‘আমার মান নির্ণয়’-এ সাঁতার না-জানা ছিল অসহায়তার চিহ্ন; এখানে সেটাই সাহসের শর্ত হয়ে গেছে। একই চিত্রকল্পের এই উল্টে যাওয়া আকস্মিক নয় এবং এটি কবির সচেতন কারিগরির প্রমাণ।

‘আশঙ্কার বালুচর’ এর পাশে রাখলে পাঠ আরও পূর্ণ হয়। এখানে ভয়টা সহিংসতার নয়, নিস্তব্ধতার—‘কোথাও কোনো বিলাপ নেই কিম্বা প্রতিবাদের ঢল’। সমাজ ভেঙে গেছে বিচ্ছিন্ন কিছু দ্বীপে, যেখানে কোনো জাহাজ নোঙর করে না, আর মানুষ এতটাই বেহুঁশ যে নালিশও করে না। প্রতিবাদহীনতাই এখানে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়; ভোজ আর উপবাসের পার্থক্য ভুলে যাওয়াই দুর্ভিক্ষ।

‘সভ্যতার বয়ান’-এ পাওয়া যায় বইয়ের সবচেয়ে উদ্ধৃতিযোগ্য নির্ণয়: ‘চেতনায় একবিংশ কিন্তু মননে উনবিংশ’। আর ‘প্রকৃতি কথা’য় কবি প্রকৃতিকে দিয়ে কথা বলান—সাগর ফুঁপিয়ে কাঁদে, পাহাড়ের শরীরে ক্ষত, বনানী নিজেকে আগুনে সঁপে দেয়—এবং সবচেয়ে মোক্ষম চরণটি হলো, ঘাস এখনো প্রতিবাদের ভাষা আয়ত্ত করেনি। প্রকৃতি এখানে নিরীহ পটভূমি নয়, ভাষা-না-জানা এক ভুক্তভোগী।

 

সাত

সংকলনের একটি ছোট কিন্তু স্বতন্ত্র দল হলো সেইসব কবিতা যেখানে নাম-ধরা চরিত্র আছে এবং কবিতা প্রায় নাটকের দৃশ্য হয়ে ওঠে।

‘ফিউশন’ শুরু হয় কবিতা নিয়েই বিরক্তি দিয়ে—‘আমগন্ধী’ আর ‘পরাশ্রিত ভাবকল্প’-এর প্রতি বিবমিষা। তারপর মিশ্রণের প্রশ্ন: বাস্তব আর মিথ মিলিয়ে কি কোলাজ হয়, নাকি চাইনিজ-মোগলাইয়ের ফিউশন? সবশেষে ম্যাপলগ্রোভের রায়ান নামের এক তরুণের রায়—সময় ও প্রযুক্তি জমজ বোন এবং তুমি এই দুনিয়া ধরার পক্ষে বড় বেশি বুড়ো। প্রজন্মের ব্যবধানকে ভাষার ব্যবধান হিসেবে দেখানো—বাংলা ও ইংরেজি, দেশ ও প্রবাস, পুরোনো কাব্যরুচি ও নতুন গতির ভাষা এক কবিতায়।

‘গিয়ারটা চেপে ধরো’ এর জোড়া কবিতা নয়, বরং এর উত্তর। এখানে বক্তা নিজেকেই ধমকান এবং যুক্তি দেন বদলের—মোড়ের দোকানের মতিন এখন হবু শিল্পপতি, ব্যবসাটা সে বুঝে ফেলেছে; তাহলে তুমি কেন শমীবৃক্ষের মতো একই রকম থেকে যাবে? মাঝখানে আশ্চর্য একটি চরণ ঢুকে পড়ে—শিলালিপির বয়স বাড়ছে, ওজোন স্তর ক্ষয়ে যাচ্ছে, ‘আমাদের বদরাগী বাবার নিশ্বাসে কষ্ট হচ্ছে’। ব্যক্তিগত পিতৃতন্ত্র আর গ্রহের সংকট এক নিশ্বাসে জুড়ে যায়। টিকে থাকার জন্য বদলে যাওয়ার তাগিদ—কিন্তু কবিতাটি জানে, সেই বদলের মডেলও বাজারই সরবরাহ করছে।

 

আট

ঋতুর কবিতাগুলো বইয়ে ভারসাম্য আনে। ‘হেমন্ত আমার’ সবচেয়ে সম্পূর্ণ—কুয়াশা, নবান্ন, পিঠা, নাইওরি, আর তারই মধ্যে ‘ভাদ্রের বানে সব হারানো খালেক চাচার মুখে স্মিত হাসি’। একটি মাত্র চরণে গোটা একটি জীবিকা-ধ্বংসের ইতিহাস, তবু বিলাপ ছাড়া। কবিতাটি শেষ হয় নিজের দিকে ফিরে—হেমন্তের আয়ু ঘনিয়ে আসছে, অর্থাৎ বক্তারও। ‘শীত কড়চা’ ছোট এবং প্রায় নিখুঁত: শীত পায়ের পাতায় নাচছে, শরীরের ওপরের অংশ ঢাকা, উষ্ণতা ধার করা—আর মাঝখানে সেই প্রশ্ন যেটি বইয়ের অনেক কবিতার নিচে চাপা আছে: সময়ের কাজ সময়ে না করলে ভেতরের ফুল কি ফোটে? ‘আবার বসন্ত আসবে’ এই ধারার আশাবাদী প্রান্ত, তবে তার আশাটাও শর্তসহ: আকাশ হাত বাড়িয়ে আছে, মানুষই করমর্দন করতে চাইছে না। 

কবিতা নিয়ে লেখা কবিতাগুলোর মধ্যে ‘কবিতা কোথায় তুমি’ সবচেয়ে অন্ধকার—শব্দেরা সব কফিন, চারদিকে ‘শব্দলাশ’, আর কবি সম্পর্কে সন্দেহ: সে কি ঈশ্বর, নাকি বানিয়ে বানিয়ে ঈশপের গল্প বলে? এর ঠিক উল্টো মেরুতে ‘বন্ধুত্ব’, যা এই বইয়ের একমাত্র হালকা-চালের কবিতা এবং আমার বিচারে সবচেয়ে মৌলিক কল্পনার কবিতা। ঘুম আর দুঃখ—দুই বিমূর্ত ধারণাকে দুই বন্ধু বানিয়ে এক পেয়ালায় চা খাওয়ানো হয়েছে; বর্ষায় দুজনেই কালিদাস, গুগলে দুজনেই সিলভিয়া প্লাথ পড়ে, হেমন্তে দুজনে জীবনানন্দ আওড়ায়। নিঃসঙ্গতাকে সঙ্গ বানিয়ে ফেলার এই কৌতুক বইয়ের ভারী সুরের মধ্যে একটা জানালা খুলে দেয়। এমন কবিতা আরও কয়েকটি থাকলে সংকলনটি আরও শক্ত হতো।

 

নয়

‘মহাকবির আগমন’ কবিতাটি বইয়ের বাকি অংশ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা স্বরে লেখা। ১৯৭২-এর জানুয়ারিতে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনটিকে ঘিরে লেখা এই কবিতায় নেতাকে দেখা হয়েছে কবি হিসেবে, তাঁর ভাষণকে কবিতা হিসেবে এবং জনতাকে পাঠক হিসেবে—রূপকটি সুচিন্তিত। কিন্তু কবিতাটির ভঙ্গি স্তুতিমূলক ও উচ্চকিত, আর এই বইয়ের প্রধান কণ্ঠস্বর ঠিক এর বিপরীত: সংশয়ী, নিচুস্বর, প্রশ্নপ্রবণ। একটি সংকলনে ভিন্ন সুরের কবিতা থাকতেই পারে; কিন্তু ‘যদিও সাঁতার জানি না’ বা ‘আশঙ্কার বালুচর’-এর মতো কবিতা যে ধরনের রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করে—যেখানে ক্ষমতার প্রতি প্রশ্নই মূল—তার পাশে এই স্তুতিভঙ্গি স্বরভঙ্গের মতো শোনায়। বিষয়ের সঙ্গে দ্বিমতের প্রশ্ন এখানে অবান্তর; প্রশ্নটি সম্পূর্ণ কারিগরির—বইয়ের ভেতরে কবিতাটি কোথায় বসবে, তা আরেকবার ভাবা যেতে পারে।

 

দশ

সব মিলিয়ে ‘একজন কেবল তালিয়া বাজায়’ এমন একটি বই, যা নিজের সীমা সম্পর্কে সচেতন এবং সেই সচেতনতাকেই বিষয় বানিয়েছে। এর কবি বড় দাবি করেন না। বইয়ের গোড়ার দিকেই তিনি লিখে রাখেন—সবাই সবকিছু পারে না, তবু কিছু হাততালি চাই। এই স্বীকারোক্তি বিনয় নয়, বরং এই বইয়ের কেন্দ্রীয় ভাবনার সূত্র: স্বীকৃতির অর্থনীতি। কে হাততালি পায়, কে পায় না; কে মঞ্চে, কে দর্শকসারিতে; কে বেশি উড়তে পারে বলে আরও উড়তে চায়, আর কারা ‘মাটির সাথে মিশে যায়’— ‘উদ্বাস্তুর বয়ান’-এর এই চরণটিই বইয়ের সামাজিক থিসিস।

আর নামকবিতার শেষ ছবিটি সেই থিসিসের সবচেয়ে ঠান্ডা রূপ: বেঁচে থাকা আর ভালো থাকা দুটি সমান্তরাল রেখা, যারা কোনোদিন মিলবে না; একটি গোলাপও ফুটবে না, একটিও ঝরবে না; সবাই যে যার জায়গায় অনড়। এই স্থবিরতার মধ্যে একজন কেবল হাততালি দিয়ে যাচ্ছে—সংকেত দিচ্ছে, কিন্তু দেখা দিচ্ছে না, কথাও বলছে না।

বাংলাদেশের কবিতায় ব্যক্তিগত বিষাদ ও সামাজিক ক্ষোভ প্রায়ই আলাদা তাকে থাকে। এই বইয়ের কৃতিত্ব হলো, সে দুটিকে একই দমে বলার চেষ্টা করেছে—শোকের কবিতা থেকে বাজারের কবিতায়, রান্নাঘর থেকে ওজোন স্তরে যেতে তার সময় লাগে না। যেখানে সেই যাতায়াত দৃশ্যের ভেতর দিয়ে ঘটে, সেখানে কবিতা মনে রাখার মতো হয়ে ওঠে; যেখানে ঘটে ঘোষণার ভেতর দিয়ে, সেখানে ফিকে হয়ে আসে। পরের বইয়ে এই তফাতটুকুর দিকে নজর দিলে কবির কাছ থেকে আরও শক্ত কাজ পাওয়া যাবে বলেই মনে হয়।

আপাতত এটুকু বলা যায়—যে-লোকটি কেবল তালিয়া বাজায়, তাকে চিনতে না পারলেও, এই বই পড়ে ফেরার পর তার হাততালির শব্দটা কানে থেকে যায়।

 

গ্রন্থ- একজন কেবল তালিয়া বাজায়

লেখক- জাকিয়া এস আরা

প্রকাশনা সংস্থা- জলধি

গ্রন্থের ধরণ- কবিতা

প্রকাশকাল- ২০২৩

মূল্য- ২৫০ 



অলংকরণঃ তাইফ আদনান