রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ সত্তরের দশকের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি। এই দশক ছিলো ইতিহাসের মোড় ঘোরানো একটা সময়। এ দশকের শুরুতে প্রথমবারের মতো অবিভক্ত পাকিস্তানে সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং ঐ নির্বাচনে বিজয়ী বাঙালি নেতৃত্বের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে নির্বিচার গণহত্যা চালিয়ে বাঙালিদের দমন করার পথ বেছে নেয় পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। অতঃপর নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জন্মলাভ করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ এবং আরও অনেক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের সাক্ষী হয় এই দশক।
সময়ের এই অভিঘাতকে ধারণ করে সত্তরের দশকের কবিগণের আবির্ভাব। কিন্তু পঞ্চাশ বা ষাটের দশকের মতো কালোত্তীর্ণ কবিতা এ দশকে রচিত হয়নি। এছাড়া উৎকর্ষ ও বৈচিত্র্য বিচারে পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকের কবিতা যে চূড়া স্পর্শ করেছিলো, সত্তরের কবিতা সেই স্তরে পৌঁছাতে পারেনি। এই দশকের কবিতার শনাক্তযোগ্য স্বরও সুস্পষ্ট নয়। পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে কবিতার তৈরি করা উর্বর মাটিতে আধুনিক বাংলা কবিতা সত্তরের দশকে এসে ফুলে-ফসলে শোভিত হওয়ার সুযোগ ছিলো, কিন্তু সেটা হয়নি। বরং কবিতার সুষমা ম্লান হয়েছে এই দশকে এসে। এ-সময় যেসব কবির দেখা মেলে তাদের মধ্যে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ স্বমহিমায় উদ্ভাসিত।তাঁর কাব্যস্বরের স্বাতন্ত্র্য সহজেই শনাক্ত করা যায়।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতায় প্রধানত দুইটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। একদিকে তাঁর কবিতা সমাজ ও রাষ্ট্রের বিদ্যমান বৈষম্য, অবিচার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর। অন্যদিকে তার কবিতায় প্রকাশ ঘটেছে বেদনাহত প্রেমের আবেগ-মথিত বিস্তার।
তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উপদ্রুত উপকূলে’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৯ সালে। প্রথম গ্রন্থেই চারদিকে সাড়া পড়ে যায় এবং তিনি পেয়ে যান বিপুল কবিখ্যাতি। এই গ্রন্থের ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ কবিতাটি তুমুল জনপ্রিয় হয় যার কিছু পঙ্ক্তি একসময় দেয়ালে দেয়ালে উৎকীর্ণ হতো। কবিতার স্বর এখানে উচ্চকিত ও শ্লোগানধর্মী।রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর যৌবনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা ছিলো ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ। চারদিকে শুধু হতাশা।যৌবনের স্বপ্নগুলো সব মুখ থুবড়ে পড়েছিলো । কোথাও কোনো আশা ছিলো না।একদিকে বিত্তের পাহাড়,অন্যদিকে নিরন্ন মানুষের দীর্ঘ মিছিল। ন্যায্য প্রতিবাদগুলোও বুলেটের মুখে স্তব্ধ। সর্বগ্রাসী এই হতাশাই ব্যক্ত হয়েছে তাঁর “স্বপ্নগুলো” কবিতায় ।
“শাদা একটি গোলাপ আমাদের অন্তর্গত স্বপ্ন,
সমতার এক নীল আকাশের স্বপ্ন আমাদের,
আমাদের স্বপ্ন শ্রমময় একটি দিনের,
সম্মিলিত নৃত্য আর গানে উন্মাতাল
একটি সন্ধ্যার স্বপ্ন আমাদের,
আমাদের স্বপ্ন এক প্রশান্ত নিদ্রার রাত-
অথচ কোথাও তার কনামাত্র ছায়া নেই,চিহ্ন নেই,
স্বপ্নের সূচনা নেই এখনো কোথাও।
আমাদের স্বপ্নগুলো ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে কাক ও
শকুন।”
(স্বপ্নগুলো, উপদ্রুত উপকূলে)।
রুদ্র জন্মগ্রহণ করেন চিকিৎসক পিতার কর্মস্থল, বরিশালে। কিন্তু উচ্চতর পড়াশোনা করেছেন ঢাকা শহরে। এই শহরেই ছিলো তাঁর সকল পদচারণা।তাঁর জীবন ছিলো বেহিসেবী,এলোমেল এবং বেদনাদীর্ণ।জীবনের মত তাঁর কবিতার মধ্যেও বেদনার সুর ধ্বনিত হয়েছে।রুদ্র'র জীবনে প্রেম এসেছে এবং সেই প্রেম পরিনয়েও গড়িয়েছিলো।কিন্তু সেই সম্পর্ক সুখকর হয়নি। ফলে রুদ্র’র ব্যক্তিগত জীবনে কষ্টের একটা প্রবাহ ছিলো যার ছায়া তাঁর কবিতায় দেখা যায়। যেমন-
“পরাজিত প্রেম তোমাকে দেবো না প্রিয়,
কষ্ট আমাতে বাড়ুক নদীর ভাঙ্গনের মত শোকে
অসুখি বাতাস অন্ধ করুক হৃদয়ের খোলা আঁখি,
ধংশ আমার মজ্জায় এসে জ্বলুক শ্মশানে চিতা-
তবু এই প্রেম,পরাজিত প্রেম তোমাকে দেবো না স্বাতি,
রুগ্ন সকাল তোমাকে দেবোনা প্রিয়।”(পরাজিত প্রেম,ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম)।
‘ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম’ কাব্যের বেশকিছু কবিতায় গ্রামীণ জীবনের প্রতি কবির ভালোবাসা ফুটে উঠেছে। গ্রামীণ নিসর্গের নানা অনুষঙ্গে তিনি জীবনকে উপলব্ধি করতে চেয়েছেন।তবে তাঁর স্বভাবগত যে দ্রোহ,অন্তর্গত বেদনার যে বিস্তার,এইসব কবিতায় তার প্রতিফলন ঘটেছে। উদাহরণ -
“আমার গ্রামের নদীটির মতো তোমার দু চোখে
কেন বালুচর জেগে ওঠে স্বাতি,কেন শুন্যতা?
সুস্থতা চাও-কোথায় স্বস্তি,কোথায় সলিল?”
(কাচের গ্লাসে উপচানো মদ,ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম)।
অথবা
বদলে যাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে-
রুপশালি ধান গ্রামটিরে আমি বাঁচাতে পারি না,
আঙুলের ফাঁক গলে নেমে যায় বাসনার জল
রাখতে পারি না করপুটে প্রিয় স্বপ্ন আমার।
কষ্ট আমার বুকের পাঁজরে,রোমকূপে,নোখে
কষ্ট আমার নিদ্রাবিহীন চোখের তারায়।”(প্রাগুক্ত)।
রুদ্র'র তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘মানুষের মানচিত্র’ (১৯৮৫)। এই কাব্যের উপজীব্য গ্রামের প্রান্তিক মানুষের সুখ, দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, ভালোবাসা, হতাশা ও বেদনার অনুপুঙ্খ জীবনচিত্র। বিশেষ করে অসহায় ও অবহেলিত নারীর ব্যর্থ জীবনের স্বপ্ন এবং আকুতির মর্মস্পর্শী চিত্র অঙ্কন করেছেন তিনি। মানুষের মানচিত্রে কবি গ্রামের কৃষক, জেলে, নৌকার মাঝিসহ খেটে খাওয়া নারী-পুরুষের অতৃপ্ত জীবনের আখ্যান রচনা করেছেন। নারী ও পুরুষ উভয়ই এখানে অকপট। ভাত ও যৌবনের অতৃপ্ত ক্ষুধায় কাতর তাদের জীবন। তবুও বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে তারা। বঞ্চনার অবসান-আকাঙ্ক্ষায় বিদ্রোহী হয়ে ওঠে তাদের মন। উদাহরণ—
“কেতাব কোরান যদি সত্য হয় তয় কেন এমন আজাব?
দশজনে পোড়ে আর একজন খোয়াবের বেহেশত বানায়,
এই যদি বিচার বিধান তয় মানি না, না-ভুখা দুনিয়ায়
জুলুম চালায় যারা কেড়ে নেবো তাগো সব সুখের খোয়াব।”
(মানুষের মানচিত্র-৩২)
রুদ্র’র শৈশব এবং কৈশোর কেটেছে বাগেরহাটের মোংলা থানার মিঠেখালি গ্রামের নানাবাড়িতে। ১৯৭২ সালে তিনি ঢাকায় চলে আসেন। এর আগে মোংলার একটি হাইস্কুলে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। ১৯৭৩ সালে ঢাকার ‘ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুল’ থেকে তিনি এসএসসি পাস করেন। এরপরে কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে শুরু করে মৃত্যু অবধি ঢাকাতেই কেটেছে তাঁর জীবন।
সচ্ছল পরিবারে জন্ম হলও রুদ্রর ব্যক্তিগত জীবন ছিলো দুঃখময়।এর কারণ, প্রথমতঃবেকারত্ব ছিলো তাঁর নিত্য সঙ্গী।এছাড়া মানুষের অধিকারহীনতা তাঁকে বিষন্ন করেছে। সর্বোপরি প্রেম এবং পরিনয়ও তাঁর জীবনে দুঃখ বয়ে নিয়ে এসেছিলো।রুদ্র'র কবিতায় সেই বিষন্নতা ঝরে পড়েছে। যেমন-
“আমি সেই অবহেলা,আমি সেই নতমুখ,
নিরবে ফিরে যাওয়া অভিমান- ভেজা চোখ,
আমাকে গ্রহণ করো।
উৎসব থেকে ফিরে যাওয়া আমি সেই প্রত্যাখ্যান,
আমি সেই অনিচ্ছা নির্বাসন বুকে নেয়া ঘোলাটে চাঁদ।
আমাকে আর কী বেদনা দেখাবে?”
(আমি সেই অভিমান,উপদ্রুত উপকূলে)।
এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কৃষিজীবী। কৃষকের নিদারুণ বঞ্চনা সত্ত্বেও কৃষিই আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। রুদ্র’র কবিতায় তাই দেখি বিভিন্ন উপলক্ষে গ্রামের কৃষকের কথা, কৃষির কথা উঠে আসে।আবহমান বাংলার গ্রামীণ জীবনাচারের প্রতি একটা ভালোবাসার প্রকাশ দেখা যায় তাঁর কবিতায়।উদাহরণ -
“সত্যের লাঙ্গলে চিরে এই পোড়া বুকের জমিন
আমিও ফসল হবো,হবো আমি শস্য ভরা ক্ষেত,
সোনালি অঘনে তুমি আঁটি আঁটি ধান তুলে নিও।
আবার নবান্ন কোরো,অতিথিরে নারায়ণ জেনে
শাকান্ন,শিঙির-ঝোল সমসত্ব,খেজুর-পাটালি
কাঁসার থালায় এনে খেতে দিও শীতল পাটিতে।”(নিখিলের অনন্ত অঙ্গন,ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম)।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ স্বপ্ন দেখতেন তাঁর প্রিয় স্বদেশে মানুষ অধিকার পাবে। তাদের বঞ্চনার অবসান হবে। বিদেশি প্রভুদের স্বার্থের ক্রীড়াক্ষেত্র হবে না এই ভূমি। দেশের সম্পদে ভিনদেশি বণিকের থাকবে না কোনো অধিকার। একদা পরাধীন ছিলো এই দেশ। বহিরাগত মানুষের দখলে ছিলো দেশের জমি ও সম্পদ। বহু রক্তের বিনিময়ে এদেশ মুক্ত হয়েছে। তাঁর স্বপ্ন ছিলো একদিন তিনি গ্রামীণ নিসর্গের কাছে ফিরে যাবেন। বয়ে চলা নদীর ধারে বটের ছায়ায় বসে বাউলের একতারার সুরে নিমগ্ন হবেন। কবি-মনের এই বাসনাই প্রতিধ্বনিত হয়, যখন তিনি বলেন।
“কথা ছিলো, রক্ত-প্লাবনের পর মুক্ত হবে শস্যক্ষেত,
রাখালেরা পুনর্বার বাঁশিতে আঙুল রেখে
রাখালিয়া বাজাবে বিশদ।
কথা ছিলো, বৃক্ষের সমাজে কেউ কাঠের বিপণি খুলে বসবে না,
চিত্রল তরুণ হরিণেরা সহসাই হয়ে উঠবে না
রপ্তানিযোগ্য চামড়ার প্যাকেট।”
(কথা ছিল সুবিনয়, এক গ্লাস অন্ধকার)
অথবা,
“কথা ছিলো, আর্য বা মোগল নয়, এ জমিন অনার্যের হবে।
অথচ এখনো আদিবাসী পিতাদের শৃঙ্খলিত জীবনের
ধারাবাহিকতা
কৃষকের রন্ধ্রে রক্তে বুনে যায় বন্দিত্বের বীজ।”
(প্রাগুক্ত)
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে (১৯৯১ খ্রি.) মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর কাব্যজীবনও ছিলো সংক্ষিপ্ত। প্রথম গ্রন্থ (১৯৭৯ খ্রি.)-এর হিসেবে মাত্র এগারো বছর। তবে সত্তরের দশকের শুরু থেকেই তাঁর কবিতা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছাপা হতে থাকে। মৃত্যুর পূর্বে তাঁর আটটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। বিপুল পাঠক নন্দিত হয় তাঁর কবিতা।
রুদ্র কৃষক, জেলে ও শ্রমজীবী মানুষের মুখের ভাষা কবিতায় তুলে এনেছেন। এছাড়া কবিতায় ভাষার ব্যবহারে তিনি নিজস্ব একটা ধারার জন্ম দিয়েছিলেন। শব্দ-শ্রমিক অভিধায় তিনি নিজের পরিচয় তুলে ধরতে চেয়েছেন। তাঁর কবিতায় ব্যবহৃত চিত্রকল্প ও উপমাগুলো প্রকৃতি ও লোকজ অনুষঙ্গ থেকে উৎসারিত। ঋজু এবং আবেগময় ভাষায় নির্মিত তাঁর কবিতার শরীর। নাগরিক বিদ্রোহ ও বিরহের পাশাপাশি আবহমান বাংলার মাটি, নদনদী, শস্যক্ষেত এবং সাধারণ মানুষের নিরাভরণ জীবন ছিলো তাঁর আরাধ্য।কবি মনে করেন এদেশের মাটির সাথে রয়েছে তাঁর অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। কিন্তু কবির চারদিকে এখন অন্ধকার। ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে স্বপ্ন সাধ।অনিশ্চিত গন্তব্যে চলমান জীবন।কোথাও কোনো আশা নেই।
“দুচোখ বেয়ে রাত্রি ঝরে,,পাংশুটে রাত,
রক্তমাখা চাঁদের দেহে জোসনা উধাও,
উল্টে পড়ে রোদের বাটি,
আমার এখন আকাশ জুড়ে দুঃস্বপ্নের দালান কোঠা।
উঠোনে সাপ
অবিশ্বাসের ভীষণ কালো রক্তজবা,
লকলকে জিভ,
এখন আমার সমস্তটাই লখিন্দরের লোহার বাসর।”
(দুঃস্বপ্নের দালানকোঠা,দিয়েছিলে সকল আকাশ)।
নিসর্গের অনুষঙ্গে জীবনকে মেলানোর একটা নান্দনিক প্রয়াস রুদ্রর কবিতায় দেখা যায় । শুধু এখানেই নয়, একটু লক্ষ্য করলেই অনুধাবন করা যায়, রুদ্রর স্বর যখন নরম হয়ে নিসর্গের কাছে ফিরে এসেছে, তখন তাঁর কবিতা শিল্প-সুষমায় সমৃদ্ধ হয়েছে।
দেশের জন্য রুদ্রর ছিলো তীব্র আকুলতা। এর প্রমাণ মেলে তাঁর কৈশোরেই। মাত্র তেরো বছর বয়সে তিনি ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের কর্মসূচি সফল করতে হরতাল মিছিল মিটিংয়ে অংশ নিয়েছেন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি নবম শ্রেণির ছাত্র। যুদ্ধে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠেন। কিন্তু তাঁর বাবাকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে গেলে পারিবারিক বাধায় তাঁর যুদ্ধে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উপদ্রুত উপকূলে’ যখন প্রকাশিত হয়, তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। দেশের ক্ষতবিক্ষত চেহারা, হত্যাকাণ্ড, রক্তপাত তাঁকে ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ করে।তাঁর আজন্ম লালিত স্বপ্ন ছিলো শান্তিময় এক স্বদেশ। নাগরিক সব উন্মত্ততা কে পেছনে ফেলে একদিন তিনি প্রিয় স্বদেশের নিসর্গের কাছে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন।কিন্তু তাঁর শান্তিময় সেই স্বদেশের স্বপ্ন অধরাই থেকে গেছে।
“যে পথে ফিরেছে সব, সেই পথে আমার হবে না ফেরা,
ভাঙনের রুগ্ন গান শুনতে শুনতে, বৃষ্টিতে আমুণ্ড ভিজে
বেহুলার ভাঙা ভেলা ফিরে যাবে জন্মের বিশ্বাসে।”
(ক্লান্ত ইতিহাস, উপদ্রুত উপকূলে)
অথবা,
“ট্রেনের জানালা দিয়ে ধানক্ষেত দেখতে দেখতে আমার ফেরা হবে না।
ট্রানজিস্টারে ভাটিয়ালি, লালন শুনতে শুনতে আমার ফেরা হবে না,
বুক ভরা ভালবাসা মৌন মুগ্ধ গান আমার হবে না ফেরা—”
(প্রাগুক্ত)
প্রথম কাব্যে রুদ্র’র মধ্যে যে বিক্ষোভ এবং হতাশা ঝরে পড়েছিলো,দ্বিতীয় কাব্যেও তার রেশ থেকে যায়।তিনি সব সময় অন্যায় এবং অসাম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মুখর ছিলেন । তিনি স্বপ্ন দেখতেন প্রত্যেক মানুষ তার ন্যায্য অধিকার পাবে। থাকবে না কোনো বৈষম্য ।কৃষক প্রতিদান পাবে তার শ্রম আর ঘামের।কিন্তু তিনি দেখেন, হাড়ভাঙা শ্রমের বিনিময়ে কৃষকের জীবন আরও ভঙ্গুর হয়ে যায়।
“যে ফসল ক্ষেতে করেছি লালন কষ্টে, রক্তে, ঘামে
আমার অঙ্গনে সে ধান ওঠেনা
ওঠে শস্যের ঋণ
বুকের রক্ত কষ্টের দামে আমি কিনে নেই শোক
আমি কিনে নেই ক্ষুধার্ত দেশ নিরন্ন লোকালয়।”
(গহিন গাঙ্গের জল, ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম)।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ইচ্ছে করলে শান্তিময়, সুস্থির একটা জীবন যাপন করতে পারতেন।সেই পারবারিক স্বচ্ছলতা তাঁর ছিলো। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অধিকারহীনতা,বিদ্যমান রাস্ট্রীয় অনাচারও বৈষম্য এবং সর্বোপরি একান্ত ব্যক্তিগত জীবনের অপ্রাপ্তি তাঁকে ব্যথিত ও বিপন্ন করে তুলেছিলো।খুবই সংক্ষিপ্ত ছিলো তাঁর জীবনের আয়ু।তা সত্ত্বেও
স্বল্প পরিসরের কাব্যযাত্রায় তিনি বাংলা সাহিত্যে অমোচনীয় স্বাক্ষর রেখে গেছেন।তাঁর কবিতা বাংলা সাহিত্যে বেঁচে থাকবে যুগ যুগ ধরে।
অলংকরণঃ তাইফ আদনান
