জলধি / পাঠ-পর্যালোচনা / রাজনীতি ও সমাজ সচেতনতার কবি জয়গোপাল মন্ডল
Share:
রাজনীতি ও সমাজ সচেতনতার কবি জয়গোপাল মন্ডল

উত্তর-আধুনিক সমাজবাস্তবতা, প্রান্তিক মানুষের অস্তিত্বের সংকট এবং শ্রেণীবৈষম্যের তীব্র ও মননশীল দলিল জয়গোপাল মন্ডলের কবিতা। সহজ সরল শব্দের বিন্যাসে জটিল ও বহুমাত্রিক সামাজিক আখ্যান তৈরি করেন তিনি, যা একই সাথে রাজনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং দার্শনিক স্তরে পাঠককে আলোড়িত করে। শিশুর নরম হাতে অমোঘ শূন্যতা-র কথা লিখতে লিখতে জীবন ও অস্তিত্বের সংকটের মধ্য দিয়ে আসলে সভ্যতার নির্মম সত্যের ছবি আঁকেন কবি। তাই তাঁর কবিতায় ক্রমান্বয়ে বেড়ে যায় চিতাহীন জীবন যা এক অর্থে জীবনের পরিসমাপ্তি ও অন্তিম সংস্কারের প্রতীক হয়ে ওঠে, যা নিঃশব্দে মানুষকে মুক্তি বা পূর্ণতার দিকে এগিয়ে দেয়। কিন্তু প্রান্তিক মানুষের জীবনে এই শেষ অধিকারটুকুও যেন আজ অপহৃত। তাদের বেঁচে থাকা যেমন ধুঁকে ধুঁকে, তাদের মৃত্যুও তেমনই জাঁকজমকহীন, অলক্ষিত এবং অন্ত্যেষ্টিহীন। এই অবক্ষয় ও অস্তিত্বহীনতার ব্যাপ্তি ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে, যা নিঃসন্দেহে আধুনিক পুঁজিবাদের আগ্রাসনে প্রান্তিক শ্রেণির ক্রমশ নিঃস্ব হয়ে পড়ার ইঙ্গিত বয়ে আনে। স্থানিক রাজনীতির প্রেক্ষিতে শ্রেণীবৈষম্যের ভূগোল প্রতিভাত হয়। নিখুঁত শ্রেণিরূপরেখা অঙ্কন করেন কবি,

কোনো প্রকারে নদীর ধারে 

একটা ঘর হয়েছিল তার‌ ‌

‍নদীভাঙন কবলিত বা ভাঙনের মুখে থাকা এই অস্থায়ী ঘরটিই প্রান্তিক মানুষের একমাত্র আশ্রয়। কোনো প্রকারে শব্দবন্ধটি তাদের চরম অনিশ্চয়তাকে নির্দেশ করে। গণতন্ত্রের প্রতি বিদ্রূপ উচ্চারিত হয়েছে জয়গোপালের কন্ঠে, 

গণতান্ত্রিক ক্ষমতা, ভুখা পেটে তবু অসংখ্য দ্বীপ-গ্রাম

এই উচ্চারণ আসলে তীব্র রাজনৈতিক শ্লেষ ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে কি! তত্ত্বের খাতিরে যে গণতন্ত্র প্রান্তিক মানুষকে ‘ক্ষমতা’ দেওয়ার কথা বলে, বাস্তবে তা ক্ষুধার্ত পেট আর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ-গ্রাম-এর জন্ম দেয়। কাজেই জয়গোপালের কবিতায় চিহ্নিত হওয়া দ্বীপ-গ্রামগুলো কেবল ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং মূলধারার উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার প্রতীক হয়ে ওঠে। পুঁজির একাধিপত্য ও চরম দারিদ্র্যের বিপরীতেই দাঁড়িয়ে থাকে, 

নলিনী মুখুজ্যে, একমাত্র দোতলা বাড়ি যার

এই নলিনী মুখুজ্যেরাই গ্রামীণ বুর্জোয়া বা সামন্ততান্ত্রিক অবশেষের প্রতিনিধিত্ব করে। পুরো গ্রামের দারিদ্র্যের মাঝে তাঁর একক দোতলা বাড়িআদতেই যে, ক্ষমতার একচ্ছত্র কেন্দ্রীভবন এবং প্রকট শ্রেণীবৈষম্যকে নগ্ন করে তোলে, তা বুঝতে কোথাও কোনও দ্বিধার অবকাশ থাকে না আমাদের। তবু লিঙ্গরাজনীতি, শরীর এবং আদিম আকাঙ্ক্ষায় কবি গ্রামীণ নারীর অবদমন ও বেঁচে থাকার ন্যূনতম লড়াইকে তুলে ধরতে ভোলেন না,

গীতিকাব্যের সুরে কাঁদছিল সরলা মণ্ডল 

নাকি অন্য কেউ আরও

সরলা মণ্ডল কোনও একক ব্যক্তি নন, তিনি গ্রামীণ শোষিত নারীত্বের এক সামষ্টিক অবয়ব। তাঁদের কান্নাকে সমাজ প্রায়শই গীতিকাব্য বা শিল্পের মোড়কে রোমান্টিক করে দেখতে চায়, কিন্তু তার অন্তরালের ক্ষুধা ও বঞ্চনাকে আড়াল করে। জয়গোপাল তাঁদের কথা লেখেন,

একটু নুন একটু ভাত  

চুম্বন চায়নি কখনো

এ পংক্তি তো চরম বাস্তবতারই পরিচায়ক। যেখানে চুম্বন বা রোমান্টিক প্রেমের চেয়েও উদরপূর্তির একটু নুন একটু ভাতের আদিম ও মৌলিক প্রয়োজনটি বহুগুণ বড়ো হয়ে দাঁড়ায়। জয়গোপালের কবিতায় নারীর শরীর আর তার দারিদ্র্য একাকার হয়ে গেছে। 

খোলা আকাশের নিচে সমথ শরীর 

জানে গাঁয়ের পাঁচ জনে স্পর্শপ্রবণ

খোলা আকাশ যেমন ছাদহীনতার প্রতীক, তেমনই তা নারীর নিরাপত্তাহীনতারও সমার্থক। আমরা জানি গ্রামীণ পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বা গাঁয়ের পাঁচ জন এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিতে সদা তৎপর, যা নারীর শরীরকে যৌথ ভোগের বা লালসার বস্তুতে পরিণত করে। আবার দুলাল ও দুলালীর আখ্যানে নিয়তি, যৌনতা এবং উপনিবেশের মনস্তাত্ত্বিক ও রূপক মাত্রায়িত হতে দেখি আমরা। কবি লেখেন,

যেভাবে সমুদ্র ছোঁয় নদী 

সেভাবেই নিত্য যাওয়া আসা দুলালের

দুলালের এই আসা-যাওয়া প্রাকৃতিক নিয়মের মতো সহজ হলেও তার উদ্দেশ্য ভিন্ন। মধুর লোভ তার আঙুলের ডগায় এবং গাট্টাগোট্টা সে হাজারো মেঘ মজুত করে ঘোরে। দুলালেরা আসলে, শক্তির দম্ভ এবং লৈঙ্গিক ও অর্থনৈতিক শোষণের ছদ্মবেশ ধারণ করে থাকে, যার ভেতরে অদ্ভুত অন্ধকার ও গভীর আগ্রাসন লুকিয়ে থাকে নিঃশব্দে। আর সর্বহারা শ্রেণির প্রতিভূ চূড়ান্ত প্রতারণা সহ্য করতে করতে 

ঘরহীন চৌকাঠে মাথা কুটে মরে দুলালী

ঘরহীন চৌকাঠ আসলে চমৎকার একটি Oxymoron বা বৈপরীত্য— যার ঘর নেই, তার আবার চৌকাঠ কিসের! অর্থাৎ, ঘরের অবর্তমানেও যে অদৃশ্য সামাজিক ও মানসিক বন্ধন তাকে আটকে রেখেছে, সেখানেই সে আত্মাহুতি দিচ্ছে। তাই এবার আর ফিরল না বাঘা / একলা উপনিবেশে একটা চড়ুই। বাঘা হয়তো কোনও বিশ্বস্ত পোষ্য বা রক্ষক, যার অনুপস্থিতি নিরাপত্তাহীনতাকে চূড়ান্ত রূপ দেয়। আর এই পুরো বন্দিদশাকেই কবি বলছেন একলা উপনিবেশ। Post-colonial Theory বা উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বে যা শাসন ও শোষণের প্রতীক, কবি জয়গোপাল মন্ডল তাঁর কবিতায় প্রান্তিক মানুষের সেই শোষিত বলয়টিকে চড়ুইয়ের নিঃসঙ্গতার সাথে তুলনা করেন। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ ও নৈতিক স্খলন ফুটিয়ে তোলেন সরাসরি। মানুষের স্বভাবজাত প্রবৃত্তি ও বৈরী সমাজের তুলনামূলক খতিয়ান তুলে ধরেন চমৎকারভাবে,

মানুষ চায় মানুষের মধ্যে বাঁচতে 

কেউ চায় ঘোলা জলে মাছ ধরতে...

বাঁচতে চাওয়া বনাম সুযোগ নেওয়া, চিনে চলা বনাম প্রতারণা করা, ভালোবাসতে চাওয়া বনাম পায়ে দলে মারা-র সমান্তরাল বৈপরীত্যগুলো মানুষের চিরন্তন শুভ ও অশুভের লড়াইকে নির্দেশ করে। এটি আসলে কার্ল মার্ক্সের সেই তত্ত্বকে স্মরণ করায়, যেখানে মানুষের চেতনা তার সামাজিক অস্তিত্ব দ্বারা নির্ধারিত হয় নিরন্তর। এই সমাজব্যবস্থা মানুষকে মানুষ হিসেবে বাঁচতে দেয় না, বরং তাকে শিকারী অথবা শিকারে পরিণত করে অনায়াসে। কাজেই বাস্তবতা এত নিষ্ঠুর যে, সেই বাস্তবকে অলীক বলে ভ্রম হয় কবির। আর এই বাস্তবতায় টিকে থাকার একমাত্র চাবিকাঠি হল স্তব বা চাটুকারিতা। ক্ষমতার তোষামোদ না করলে, নলিনী মুখুজ্যেদের পায়ে মাথা না নোয়ালে এই সমাজে প্রান্তিক মানুষের কোনও ঠাঁইনেই, স্থান নেই কোনও।

জয়গোপালের কবিতা আসলে আধুনিক সমাজ ও রাজনীতির এক নিরাসক্ত ব্যবচ্ছেদের মতো। কোনো সস্তা আবেগের আশ্রয় না নিয়ে, বরং অত্যন্ত কঠিন ও মননশীল ভাষায় দেখিয়েছেন কীভাবে পুঁজিবাদ, সামন্তবাদ এবং পুরুষতন্ত্র সমবেতভাবে প্রান্তিক মানুষকে নিঃশব্দে একটি চিতাহীন জীবন-এর দিকে ঠেলে দেয়। ভাষার পরিমিতিবোধ এবং রূপকের সূক্ষ্ম প্রয়োগ উত্তর-আধুনিক পরাবাস্তবতা, খণ্ডবিখণ্ডিত চেতনা এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থার প্রতি এক তীব্র জ্ঞানতাত্ত্বিক আক্রমণের দলিল হয়ে ওঠে তাঁর কবিতা। প্রথম নজরে জয়গোপালের কবিতাকে বিচ্ছিন্ন কিছু পংক্তির কোলাজ মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে থাকে চরম সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, লিঙ্গ রাজনীতি এবং তথাকথিত উন্নয়ন-এর ফাঁদে বন্দি মানুষের আত্মিক রক্তক্ষরণ। একাকীত্বের মহাজাগতিক রূপকের চিরন্তন আকুতি এবং অপূর্ণতার বোধ থেকে কবি লিখে যান,

তুমি কত দূর? 

অপেক্ষা করে করে রাত হলো

এই তুমি কোনও ব্যক্তিমানুষ হতে পারে, আবার তা হতে পারে কোনও অধরা মুক্তি বা সামাজিক রূপান্তর। অপেক্ষার পরিণতিতে যে রাত নেমে আসে, তা কেবল সময়ের আবর্তন নয়, বরং তা জমাটবদ্ধ হতাশার প্রতিচ্ছবি। যে হতাশা থেকে কবির জিজ্ঞাসা,

কেউ কি শুনছ কথা? 

... শুনতে পাচ্ছ না নক্ষত্রের পতনশব্দ?

এই অবক্ষয়ের যুগে মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ কতটা বিচ্ছিন্ন, তা কেউ কি শুনছ কথা?এই প্রশ্নের মাধ্যমেই প্রকট। আর নক্ষত্রের পতনশব্দহল এক বিশাল সামষ্টিক বা আদর্শিক পতনের রূপক। কোনও বড় মূল্যবোধ, কোনও প্রাচীন বিশ্বাস যখন ভেঙে পড়ে, সমাজ তখন বধির হয়ে থাকে। সেই মহাজাগতিক পতনের শব্দ শোনার মতো সংবেদনশীলতা আধুনিক মানুষের অবলুপ্ত। আপাত-অসংলগ্নতা ও কলোনিয়াল পুঁজিবাদ প্রদর্শনীর রাজনীতি থেকে গ্রামীণ ও নাগরিক অনুষঙ্গ পাশাপাশি তুলে ধরেন কবি, যা আসলে গভীর সমাজতাত্ত্বিক সত্যকে উন্মোচন করে। ভৌগোলিক ও সামাজিক বিভ্রম তৈরি হয়, 

ফুটিফাটা মাঠ দূর থেকে মনে হয় বাঁকা। সমান। সমাজ।

দূর থেকে যা সমান বা সুষম মনে হয়, কাছে এলে দেখা যায় তা ফুটিফাটা বা দীর্ণ। এটি আমাদের সমাজ-এর নিখুঁত রূপক। কারণ রাষ্ট্র বা সমাজ দূর থেকে সাম্যের কথা বললেও ভেতরে তা শোষণ ও বৈষম্যে চৌচির। যেখানে সস্তা বা লৌকিক জিনিসের কদর এবং ভোগের স্থূল মানসিকতা ইঙ্গিত করে, সমাজ এখন সারবত্তার চেয়ে অগভীর সস্তা স্বাদ বা চমককে বেশি গুরুত্ব দেয়। যে সমাজের বুকে প্রদর্শনীর সূক্ষ্ম ফাঁদ পাতা আছে, 

প্রদর্শনী তো কাতারে কাতারে দেখে প্রবীণও। 

চেলুনির অজস্র ফাঁকা। 

ছোট্ট কাপড়ে ঢাকা সুস্বাদু পিঠে সাজানো। 

ভানুমতীর খেল তোমরাই তো দেখো।

চেলুনি বা চালুনী যার অজস্র ফুটো বা ফাঁকা, তা দিয়ে যেমন কোনওকিছু ধরে রাখা যায় না, তেমনি আমাদের ফাঁপা ব্যবস্থাকেও ঢাকা দিয়ে রাখা যায় না কোনোভাবেই। অথচ, সেই শূন্যতাকে আড়াল করতেই ছোট্ট কাপড়ে ঢাকা সুস্বাদু পিঠে চটকদার প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। কবির দৃষ্টিতে যা ভানুমতীর খেল— যা মূলত শাসকশ্রেণি বা পুঁজিপতিদের দ্বারা উৎপাদিত এক ভ্রম বা Illusion, যা দেখে প্রবীণরাও অর্থাৎ আভিজ্ঞ সমাজও মন্ত্রমুগ্ধের মতো লাইন লাগায়। আবার নারীর বহুমুখী রূপাবয়বের প্রসঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন নামোল্লেখের মাধ্যমে সামাজিক অবয়বে নারীর ভিন্ন ভিন্ন অস্তিত্ব, লড়াই এবং মনস্তাত্ত্বিক অবস্থানকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন কবি। পার্বতীর কথা বলতে গিয়ে শূণ্যতা ও সাহসের কথা বলেছেন তিনি, পার্বতীর একটুও ভয় নেই / হাতযশ আছে। আর শূন্যতা। পার্বতী এখানে সেই প্রান্তিক বা শ্রমজীবী নারী, যার জীবন চূড়ান্ত শূণ্যতায় ভরা, অথচ নিজের কর্মদক্ষতা বা হাতযশ-এর জোরে সে ভয়হীনভাবে বেঁচে থাকে। স্মৃতি ও অতীতের প্রচ্ছায়ায় ষষ্ঠী, সে দেখেছে আনন্দ-সকাল। ষষ্ঠী নামের সাথে মাতৃত্ব ও উৎসবের অনুষঙ্গ জড়িয়ে আছে। সে অতীত বা ঐতিহ্যের সেই আনন্দ-সকাল বা সোনালী সময়ের সাক্ষী, যা বর্তমানের অন্ধকারে হারিয়ে গেছে। স্পর্ধা ও সচ্ছলতার প্রতিমূর্তি সুপর্ণা। কবির কথায়, সুপর্ণার স্পর্ধা ভয়ঙ্কর। / যে কোনো রূপেই সে সচ্ছ্বল। সুপর্ণা আধুনিক, আপসহীন এবং স্পর্ধিত নারীত্বের প্রতীক। পুঁজিবাদী বা পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোকে তোয়াক্কা না করে যেকোনও উপায়েই হোক, সে নিজের সচ্ছলতা ও স্বাধিকার কায়েম করতে জানে। তার এই স্বনির্ভরতা সমাজের চোখে ভয়ঙ্কর

মানুষের বেঁচে থাকা আজ আত্মিক বা মানবিক স্তরে নেই, তা নেমে এসেছে কেবল শরীর হিসেব করেটিকে থাকার লড়াইয়ে—কতটুকু পুষ্টি, কতটুকু ক্যালরি প্রয়োজন, তার যান্ত্রিক হিসাবে। বায়োপলিটিক্স বা জৈব-রাজনীতির এক অনবদ্য প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর কবিতায়। রাষ্ট্র কীভাবে একজন নাগরিককে কেবল একটি শরীর এবং কিছু সংখ্যার সমাহারে পরিণত করে, তা এখানে স্পষ্ট। কবির কথায়, রেশন কার্ড এখনও অক্ষত আছে উন্নয়ন ফাঁদ। আমরা প্রত্যেকেই জানি, রেশন কার্ড হল নাগরিকের ন্যূনতম বেঁচে থাকার জন্য রাষ্ট্রের দেওয়া দাক্ষিণ্য। কিন্তু কবি একে বলছেন উন্নয়ন ফাঁদ। কল্যাণকামী রাষ্ট্র বা Welfare State, জনগণকে মৌলিক অধিকার দেওয়ার বদলে কিছু সস্তা সুযোগ-সুবিধা বা চাল-গমের টোপ দিয়ে তাদের রাজনৈতিক চেতনাকে নিষ্ক্রিয় করে রাখে। যতক্ষণ মানুষের রেশন কার্ড অক্ষত আছে, ততক্ষণ সে রাষ্ট্রের দাসত্ব মেনে নেয় এবং এইভাবেই সে উন্নয়নের এক অন্তহীন ফাঁদে আটকা পড়ে যায়। কাজেই সস্তা ভাবালুতার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর সৃষ্টি তাঁর কবিতা। অত্যন্ত নির্মমভাবে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে আধুনিক সমাজব্যবস্থা ভানুমতীর খেল বা প্রদর্শনীর আড়ালে নিজের শূন্যতাকে ঢেকে রাখে এবং রেশন কার্ড-এর মতো অনুদানের রাজনীতি দিয়ে মানুষের স্পর্ধাকে গৃহপালিত করে তোলে অনবরত। খণ্ড খণ্ড চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে আসলে অখণ্ড সামাজিক অবক্ষয় ও রাজনৈতিক প্রতারণা ফুটিয়ে তোলার প্রশ্নে কঠিন, মননশীল এবং উচ্চমানের বৌদ্ধিক সৃষ্টি হিসেবে পরিগণিত হওয়ার দাবি রাখে জয়গোপালের কবিতা।

সমকালীন ক্ষমতার রাজনীতি, ভোটাধিকারের নামে চলা লোকপ্রহসন এবং শারীরিক বা কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতাকে হাতিয়ার করে তৈরি করা সহানুভূতির রাজনীতির নির্মম ও মননশীল ব্যবচ্ছেদ করেন জয়গোপাল। সরল ছন্দের আবরণে জটিল ও সংবেদনশীল রাজনৈতিক বাস্তবতাকেই তুলে ধরেন। বাহ্যিক চটুলতার অন্তরালে তাঁর কবিতা আধুনিক গণতন্ত্রের নৈতিক স্খলন এবং শাসক ও শাসিতের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের গভীর তাত্ত্বিক দলিল হয়ে ওঠে। প্রতীকী রাজনীতির কথা লিখতে বসে অত্যন্ত শ্লেষাত্মকভাবে হুইলচেয়ারের মাহাত্ম্য লিখেছেন তিনি। চিকিৎসা শাস্ত্রে হুইলচেয়ার শারীরিক অক্ষমতা দূর করে মানুষের গতিশীলতা ফিরিয়ে দেওয়ার একটি মাধ্যম। কিন্তু আধুনিক ক্ষমতার অলিন্দে, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের নির্বাচনী রাজনীতিতে, হুইলচেয়ার কেবল একটি চিকিৎসার সরঞ্জাম নয়; এটি জনমানসে কৃত্রিম ট্র্যাজেডি এবং রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের এক পরম হাতিয়ার। কবি এই ক্ষমতার মঞ্চে চতুর রাজনৈতিক কুশীলবদের দ্বারা তৈরি করা আহত বা নিপীড়িত অবয়বের মিথ ভেঙে দিতে চেয়েছেন। নির্বাচনকে একটি উৎসব বা খেলার সাথে তুলনা করে তার পেছনের বীভৎসতাকে উন্মোচন করতে ভোলেননি,

হয়তো কোনও খেলা 

কিংবা শুরু মেলা

এক্ষেত্রে তাঁর স্পষ্ট ইঙ্গিত, আধুনিক গণতন্ত্রে নির্বাচন আজ কোনও আদর্শের লড়াই নয়, তা এক প্রকারের চটুল খেলা বা তামাশার মেলায় পরিণত হয়েছে। তাই কোন দোষে কার মাথা / সত্যি কি আছে ব্যথা!— এই প্রশ্নচিহ্ন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। নেতার বা নেত্রীর শারীরিক আঘাত কতটা বাস্তব আর কতটা রাজনৈতিক ফন্দি, তা নিয়ে কবি সংশয় প্রকাশ করছেন। কারণ, এই আঘাতের সত্যতার চেয়েও তার রাজনৈতিক উপযোগিতা অনেক বেশি। আসলে,

ভোটের আগে ভোটের পরে 

জোট নয় ভাই চলছে ঘোঁট 

শ্মশানের কাঠ যে ঘরে ঘরে...

কবি মনে করেন, ভোটের সমীকরণ মেলাতে কোনও আদর্শ জোট হয় না, যা হয় তা হল ক্ষমতার ঘোঁট বা চক্রান্ত। আর এই ক্ষমতার কাড়াকাড়ির বলি হয় সাধারণ মানুষ। শ্মশানের কাঠ যে ঘরে ঘরে এ পঙ্ক্তি তো রাজনৈতিক হিংসা, মহামারী বা তীব্র দারিদ্র্যে সাধারণ মানুষের ক্রমাগত মৃত্যুর হাড়হিম করা বাস্তবতাকেই প্রকাশ করে যায়। শাসকের সাজানো আঘাতের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় সাধারণ মানুষের গণ-মৃত্যুর ট্র্যাজেডি। এ সবকিছুর মধ্যে আধিপত্যবাদ ভীষণ জোরালো। সেই আধিপত্য বা আগ্ৰাসনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শন থেকেই কবির উচ্চারণ,

অধীন করা তার কাজ 

তোমরা হবে ভিকিরি 

বুক যদি হয়ও পাহাড় 

চলতে থাকে ফন্দি-ফিকিরি...

শাসকের মূল লক্ষ্য জনগণকে আত্মনির্ভরশীল করা নয়, বরং তাদের ভিক্ষুক বানিয়ে রাখা। রাষ্ট্র যখন জনগণকে অধিকার দেওয়ার বদলে সস্তা অনুদান বা দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে, তখন জনগণ নিজের অজান্তেই শাসকের অধীন হয়ে যায়। জনগণের ক্ষোভ যদি পাহাড়ের মতো দৃঢ় ও অটলও হয়, শাসকের ফন্দি-ফিকিরি বা চতুর রাজনৈতিক চালের কাছে তা অনেক সময় পরাস্ত হয়। এই চক্রান্তেরই একটি অংশ হল সাময়িক সহানুভূতি অর্জনের জন্য নিজেদের দুর্বল বা আক্রান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা। যদিও এসব থেকে উত্তরণ কাঙ্খিত আমাদের। আর সেই উত্তরণের ভাবনা থেকেই কবি দার্শনিক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন পাঠককে। কাজেই শেষ অবধি জয়গোপালের কবিতার সমস্ত সুর নেতিবাচক রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে শ্রম ও প্রকৃত লড়াইয়ের জয়গান গায়,

দুপা আঁকড়ে যারা উত্তীর্ণ হয় 

তাদের কবিতায় ভুলো না 

ওরা ঈশ্বরের সমধর্মিতায়...

প্রকৃত লড়াইয়ের নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে কবি এখানে সেইসব খাঁটি মানুষকে কুর্নিশ জানাচ্ছেন, যারা কোনও চাতুরি, কোনও রাজনৈতিক নাটক বা সহানুভূতির কার্ড না খেলে, কেবল নিজেদের দুপা আঁকড়েঅর্থাৎ নিজস্ব শ্রম, সততা ও লড়াইয়ের জোরে জীবনে উত্তীর্ণ হয়। তারা কোনও কৃত্রিম হুইলচেয়ারের আশ্রয় নেয় না। সুতরাং যারা নিজের শক্তিতে লড়াই করে, কবি তাদের ঈশ্বরের সমধর্মী বা সৃষ্টির সমতুল্য বলে সম্মান জানিয়েছেন নির্দ্বিধায়। কারণ, ঈশ্বর যেমন কারোর করুণার পাত্র নন, তেমনই এই স্বনির্ভর মানুষগুলোও সমাজের বা শাসকের করুণা ভিক্ষা করে না। তারা হুইল চেয়ারের মাহাত্ম জানো না! ফলে, কবি যেন সেইসব সাধারণ মানুষকে সচেতন করছেন, যারা শাসকের সাজানো অক্ষমতা বা হুইলচেয়ারের নাটকের মোহে অন্ধ হয়ে থাকে। কবি মানব সমাজের কাছে বার্তা দিয়ে যেতে চান, মানুষ আসলে ক্ষমতার নির্মম কৌতুক বা হুইলচেয়ারের মাহাত্ম্য বোঝো না বলেই বারবার প্রতারিত হয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই একথা বলা যায় যে, জয়গোপালের কবিতাটি কেবল রাজনৈতিক ছড়া বা পদ্য নয়, তা সমকালীন ইতিহাসের একেকটি সাহসী এবং সমাজ সচেতন পদক্ষেপ। কবি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ক্ষমতার রূপান্তরকে ধরতে পেরেছেন— যেখানে ক্ষমতা নিজেকে অহংকারী রূপে প্রকাশ না করে, অনেক সময় দুর্বল বা আহত রূপে প্রকাশ করে জনগণকে আবেগগতভাবে ব্ল্যাকমেইল করতে চায়। সুতরাং চাটুকারিতা এবং হুজুগের বিপরীতে দাঁড়িয়ে প্রকৃত মানুষের সততা ও আত্মমর্যাদাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার কারণে তাঁর কবিতা সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিকভাবে এক গভীর মননশীল সৃষ্টি।



অলংকরণঃ তাইফ আদনান