নাসরীন জাহান আমাদের কথাসাহিত্যে স্বমহিমায় উজ্জ্বল ও ভাস্বর। গল্প বলার ঢঙে অপার সাহসিকতা তার প্রতিটি উপন্যাসে সংযোজন করে ভিন্ন - ভিন্ন মাত্রার দ্যোতনা। উড়ুক্কু, ক্রুশকাঠে কন্যা, উড়ে যায় নিশি পক্ষী প্রভৃতি উপন্যাসে স্বামীর সমকাম প্রীতি, মায়ের অবৈধ প্রেম সাক্ষ্য, ভাই কর্তৃক ধর্ষিত হওয়া সমাজ ও পারিবারিক সমাজ কাঠামোর ভেতরকার ইত্যকার ঘটনার অকপট প্রকাশ দেখা যায়। নাসরীন জাহান নিকুম্ভিলা উপন্যাসের মা ও মেয়ের অন্তর্গত রহস্যের উন্মোচন এবং সম্পর্কের সীমারেখা নির্দেশ করেন।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র নিকুম্ভিলা। অর্থাৎ নিকুম্ভিলার প্রথম দিন স্কুলে যাওয়ার বিড়ম্বনা থেকেই উপন্যাসের সূচনা হয়। পরবর্তী প্রতিটি ধাপে ধাপে নাসরীন জাহান তার নিকুম্ভিলা উপন্যাসে একজন বালিকা কন্যার বেড়ে ওঠার পর্যায়ে অনালোচিত বিষয়কে সামনে মেলে ধরেছেন। পাশাপাশি দাম্পত্য সম্পর্কে প্রেম ভালোবাসা, টানাপোড়েন ও সমঝোতা উপন্যাসের একটি বৃহৎ পরিসর জুড়ে আছে।
উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত নির্বিশেষে বাবা-মা সার্বজনীনভাবে সন্তানদের বন্ধু হিসাবে এখনো আবির্ভূত হতে পারে নি। কিন্তু উপন্যাসটিতে নিকুম্ভিলার মা একজন বন্ধু হিসেবে মূর্ত হয়। তাই বালিকা পর্যায় থেকে মা নিকু সোনাকে আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়। নিকুম্ভিলাও মায়ের গড়ন বুঝতে পেরে তাকে অবিরত প্রশ্ন করে রহস্য অতল স্পর্শ করতে চায়। এই যে অতল রহস্যকে স্পর্শ করার তার তীব্র আকুতি। তার বীজ মূলত মা নিতু নিকুম্ভিলার মনোজগতে রোপণ করে। সময়ের ধাপে ধাপে নিকুম্ভিলা অনুশীলনের মাধ্যমে এই চর্চাকে আরও দূর্মর এবং কৌতুহল-উদ্দীপক করে তুলেছে। জীবনের প্রথম যখন কাজিনের প্ররোচনায় নিকুম্ভিলা প্যান্ট খোলার প্রশ্নে দ্বিধান্বিত হয়ে ঘটনাকে মায়ের কাছ থেকে আড়াল করে। পাঠক তার মায়ের কন্ঠে শুনতে পায়- “আমি তোর অপরাধের জন্য তোকে মারি নি! মেরেছি, এই অপরাধ আমার কাছে লুকানোর জন্য। আমি তো তোকে বলেছিই তক্কে তক্কে, মৃত্যু অবধি খুন পর্যন্ত, আমি জানলে তোর সামনে বুক আগলে দাঁড়াব।” নিকুম্ভিলা মায়ের কাছে সহজ হওয়ার পথ পেয়ে যায়। বুকের ভেতর প্রশ্ন জমাট বাধতে না বাধতেই নিজের ভেতর রহস্যের অর্গল ভাঙার প্রস্তুতি তৈরি হয়। মায়ের সাথে গল্পের এক পর্যায়ে শান্তনু মামার মুখ থেকে শোনা প্রস্টিটিউটের অর্থ জানতে উদগ্রীব হয়ে ওঠে। যেমন সে জানতে চায় মায়ের পেটে নিকুর দাপাদাপির ধরন কেমন ছিল। ফলে উপন্যাসটি তার যাত্রাপথের শুরু থেকেই প্রচলিত বিশ্বাস- মূল্যবোধ সর্ববিধ মানদণ্ডের বিপরীতে প্রতি মূল্যবোধ স্থাপিত হয়। উপন্যাসের বিভিন্ন বাক-ভঙ্গিতে তার নানামাত্রিক প্রকাশভঙ্গি দেখা যায়। এর উল্লেখযোগ্য অংশ বিশেষ “এরপর ঠিক মনে নেই, কোন জঙ্গলে নিয়ে দেখিয়েছিল শিবলিঙ্গ। কী ভয়ানক! এটা কী মা?” মূলত পাশ্চাত্য ধারণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ পথে নিকুম্ভিলা জীবনের বিভিন্ন পর্যায় ও বাঁক অতিক্রম করে যেতে থাকে। সেখানে তার বাবা ও মা ব্যক্তিগত অধ্যায়গুলোতে সাহায্যের হাত প্রসারিত করে। দ্বিধান্বিত মুহূর্তে সুনির্দিষ্ট গতিপথ তৈরিতে সাহায্য করে। এক্ষেত্রে মার ভূমিকা অগ্রণী। লেখকের ভাষ্যে, “মোমের মতো গলতে থাকে সে... আর মাকে কেন্দ্র করে তার গান- তুমি একজনই শুধু বন্ধু আমার, শত্রুও একজন তাই।”
নিকুম্ভিলার বেড়ে ওঠা খুব সরলরেখায়, তা কিন্তু নয়। বাবা-মায়ের সম্পর্ক, মায়ের সাথে শান্তনু মামার সম্পর্ক, ক্লাস বন্ধু বিজন, বিন্দুর সহযোগিতার সম্পর্ক প্রভৃতির সাথে নিকুম্ভিলার টানাপোড়েন, অবিশ্বাস- সন্দেহ, আস্থাহীনতা। এই বিষয়গুলি একদিকে যেমন নিকুম্ভিলার মনের বহুমাত্রিক উপস্থিতি, বিচারবোধ ও মানদণ্ডকে চিহ্নিত করেছে। লেখক নাসরীন জাহান উপন্যাসকে শিল্পসম্মত মাত্রা দিয়েছেন। পাশাপাশি নিকুম্ভিলার মাধ্যমে এই সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মানুষ তার মনের চূড়ান্ত অর্গল ভাঙ্গার পরেও তার প্রকাশ হার খুবই সামান্য। যেমন নিকুম্ভিলা তার বিদেশ ফেরত কাজিনের প্রতি মোহগ্রস্ত হয়ে শারীরিক সম্পর্কে মিলিত হয়। মৃত্যু অবধি নিকুম্ভিলা তার এই প্রথম শারীরিক সম্পর্কের অনুভূতিকে লালন করেছে নিজের অন্তর্গত গোপনে। বস্তুত এভাবেই নিকুম্ভিলা উপন্যাস বিশেষ স্বাতন্ত্র্য পায়। জানাশোনা ও পারিবারিক সিদ্ধান্তের যৌথ প্রয়াসে রেজওয়ানকে বিয়ে করে নিকুম্ভিলার দাম্পত্য ও সংসার পর্ব আপেক্ষিক মানদণ্ডে সুখেই ছিল। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই সনাতন আনুষ্ঠানিকতা পর্ব থেকে শুরু করে রেজওয়ানকে ঘিরে তার পরিবারের নির্ভরতা নিকুম্ভিলাকে দ্বিধান্বিত করে। বস্তুত এভাবেই ব্যক্তি মানুষের সামাজিক, পারিবারিক এবং ব্যক্তি মানসের স্বাতন্ত্র্য দ্বন্দ্বের প্রকট রূপ উপন্যাসে অনন্য ভঙ্গিতে জায়গা করে নেয়। কিন্তু তিক্ত অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে নিকুর সবচেয়ে যন্ত্রণাকর অধ্যায় আকতার কাকুর পাশবিক চেহারা। লেখকের ভাষায়- “বাকরুদ্ধ বিমূঢ় নিকুম্ভিলা চোখ গোল করে দেখে চিরদিনের চেনা আপন মানুষটার বদলে যেতে থাকা পাষণ্ড চেহারা।... ওকে কষে চুমু খেয়ে মানুষটা বলে, আমি তোমাকে একদম কষ্ট দেব না... প্লিজ নিকু...।” ফলে সদ্য উড়তে শেখা কিশোরী নিকুম্ভিলার পৃথিবী হয়ে ওঠে বিষাদময়। অনেক সময় সে তার বাবাকেও আকতার কাকুর মতো মনে করতে থাকে। অর্থাৎ এ ধরনের ঘটনা একজন কিশোরীর মনে কী ধরনের প্রভাব ফেলে নিকু তার উদাহরণ। এরকম সন্দেহবাতিক থেকে মা’ই তাকে সহজ হতে সাহায্য করে। লেখকের ভাষায়- “নিকুম্ভিলাকে মা বলেছে, প্রতিটি পুরুষের প্রবণতা, চরিত্র আলাদা, একজনের পতনের জন্য অন্যের প্রতি অবিচার করার কোনো অর্থ হয় না।” বস্তুত এটি হচ্ছে সামাজিক ও ব্যক্তিক ধ্যান ধারণা উন্নয়নে উপন্যাসের আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি।
যদিও উপন্যাসের নাম নিকুম্ভিলা, তদুপরি উপন্যাসের আর একটি বৃহৎ পরিসর নিকুম্ভিলার সমান্তরালে আবর্তিত হয়েছে তার মা নিতুকে কেন্দ্র করে। মূলত নিতুর গতি- প্রকৃতি, কল্পনা প্রবণতা, জীবনের অনেক টুকরো স্মৃতির পুনরাবৃত্তি, বাবা, শান্তনু মামা ও জুবায়েরের প্রতি ত্রিমাত্রিক আকর্ষণ। এসব বিষয়ে নিকুম্ভিলার পর্যবেক্ষণ, উপলব্ধি ও মনোবিশ্লেষণের লেখ্যভঙ্গিই নিকুম্ভিলা উপন্যাস। নিকুম্ভিলাকে কেন্দ্র করে নয় বরং নিকুম্ভিলার মা নিতুকে ঘিরেই উপন্যাসের পার্শ্ব বিস্তার ঘটেছে বেশি।
বিয়ে-পূর্ব নিতুর পারিবারিক পরিবেশ আর দশটা সাধারণ পরিবারের মতো ছিল না। পারিবারিক, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় তার ভেতর নেশা আসক্তির চর্চা শুরু হয়। মানসিক বিপর্যয়ের এই ক্রান্তিলগ্নে জুবায়ের এর সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু দাম্পত্য পর্বে নিতুর একনায়ক সূলভ প্রত্যাশা এবং জুবায়ের এর পরিমিতি সূচক নির্লিপ্ততা দুজনকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। অপরদিকে নিতু তার দ্বিতীয় স্বামী অর্থাৎ নিকুর বাবার সঙ্গে পরিমিত ভালোবাসা চর্চায় রত। তারা যতনা স্বামী-স্ত্রী তারচেয়ে বেশী বন্ধু। দুজন দুজনের একান্ত কষ্ট, স্বপ্নগুলোকে লালন-প্রশ্রয় ও শ্রদ্ধা করতে পেরেছে। আবার শান্তনু ও নিতুর সম্পর্ক-পরিণতি অদ্ভুত। শান্তনু দিনের পর দিন নিতুকে ভালোবেসে নিজের ভেতর লালন করেছে। কিন্তু তার বহিঃপ্রকাশের সুযোগ হয় নি। পরবর্তী সময় নিতু শান্তনুর এই অনুভূতিকে উপলব্ধি করতে পারলে পাঠক তার কন্ঠে শুনতে পায়- “কিন্তু শান্তনু হয়তো আমার জীবনের প্রথম মানুষ হওয়ার স্বপ্নই দেখেছিল, ফলে সে কারও বিকল্প হতে ভয় পেয়েছে। বস্তুত নিতু শান্তনু, নিকুম্ভিলার বাবা এবং জুবায়ের এর মধ্যকার সম্পর্কের দূরত্ব-ঘনিষ্ঠতা নির্মাণ করতে যেয়ে মানবমনের বহুমাত্রিকতাকে চিহ্নিত করেছেন। অর্থাৎ একজন মানুষ চেতনে-অবচেতনে আরেকজনকে লালন করতে পারে। লেখক যার স্বীকারোক্তি দিয়েছেন নিতুর কন্ঠে এভাবে- “মানুষের মনে অনেক প্রকোষ্ঠ। একেকটা প্রকোষ্ঠ একেকজনে তার নিজের মমতা দিয়ে প্রেম দিয়ে কখন যে দখল করে ফেলে।”
নাসরীন জাহানর প্রায় লেখাতে অপরিচ্ছন্ন, নোংরা, জীর্ণদশা এক পুরাতন জেলা শহরের কথা ভেসে ওঠে। যার সাথে নিজের বাল্যকালের একটি নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। বস্তুত স্মৃতিকাতরতা তার উপন্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। দূর্গাপুজার ঘ্রাণ, ব্রহ্মপুত্র নদ, রেললাইন ধরে হেঁটে যাওয়া পূর্ববর্তী উপন্যাসের ধারাবাহিকতায় এখানেও জায়গা করে নিয়েছে। উপন্যাসে উঠে এসেছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি দুর্গাপুর এবং সোমেশ্বরী নদী কেন্দ্রীক বিভিন্ন মিথ ও আঞ্চলিক উপকথা। এসব বিচারবোধ থেকে নাসরীন জাহানের নিকুম্ভিলা পূর্ববর্তী উপন্যাস থেকে মুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ স্বাতন্ত্র্য অর্জন করতে পারে নি। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে কল্পনা বিলাস দাবি করলেও কখনো মাত্রার তুলনায় অতিরিক্ত মনে হয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত কল্পনা প্রবণতা উপন্যাসের আর একটি বড়ো বিচ্যুতি হিসাবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
নিতুর ইংরেজি ক্লাসিক সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ। শান্তনুদের গ্রামের আর্থ- সামাজিক, রাজনৈতিক প্রসঙ্গ, চলচ্চিত্র, শিল্প মাধ্যম সম্পর্কে জুবায়ের এর দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি প্রাসঙ্গিক উপস্থাপন উপন্যাসটিকে একঘেয়ে একরৈখিক গতি রেখা থেকে মুক্তি দিয়েছে। উপন্যাসে ওঠে এসেছে উচ্চ বিত্ত পরিবারের ছবি, পার্টি সংস্কৃতি ও বেলেল্লাপনার দৃশ্য। অর্থাৎ ছোটো-বড়ো বিষয় ও অনুসঙ্গ চিহ্নিত করতে পারার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়, একজন ঔপন্যাসিক সময়কে কতটুকু অতিক্রম করতে পারবেন। এদিক থেকে নাসরীন জাহানের উপন্যাস শিল্পের দাবিকে পূরণ করতে সক্ষম হয়েছেন। নিকুম্ভিলা উপন্যাস সম্পর্কে নির্দ্বিধায় বলা যায়, উপন্যাসটি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত উচ্চবিত্ত পরিবারের উপাখ্যান। অন্যভাবে বললে বলা যায়, উপন্যাসটি উচ্চবিত্ত পারিবারিক কাঠামোতে পরিবারের সদস্যদের অর্গল ভাঙার কথ্য ভাষা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
অলংকরণঃ তাইফ আদনান
