জলধি / পাঠ-পর্যালোচনা / নাসরীন জাহানের ‘নির্বাচিত গল্প’ ॥ বিচিত্র অনুভবের গল্প সম্ভার
Share:
নাসরীন জাহানের ‘নির্বাচিত গল্প’ ॥ বিচিত্র অনুভবের গল্প সম্ভার

এক

সময়টা আশির দশক তখন বয়ে যাচ্ছিল তারুণ্যের উচ্চারণে টাল-মাটাল সময় আর ওই রকম সময়ে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ‘...গ্রামের দূর মাঠের পাড়ে বসে ভাবছেন, ‘দুঃখ কী? কেমন রঙ তার? দুঃখের রঙ খুঁজতে খুঁজতে জীবনের অন্তর্জগতের স্বরূপ অন্বেষায় নেমে পড়েন শব্দ আর বোধের ইট-সুরকিতে স্বপ্ন-সৌধ নির্মাণ করতে শিল্পের প্রত্ন-তাত্ত্বিক বলেই যাপনযোগ্য জীবন-ভূমির ধারাপাতের প্রতিটি পৃষ্ঠায়, শিরা-উপশিরায় মনোজগতের মাইক্রোস্কোপের মাধ্যমে- অন্তগূঢ় রহস্য ভেদ করে তুলে আনেন মানবের স্বপ্ন আর বাস্তবতার বহুমাত্রিকতাকে...আর যিনি সুচারুরূপে কাজটি করেছেন তিনি নাসরীন জাহান, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, কবি, ছড়াকার নাট্যকার নাসরীন জাহান

আশির দশকে একটি বিশেষ সাহিত্য-প্রসারের কালে নাসরীন জাহানের আবির্ভাব ঘটে এরপর তিরিশ বছরের অধিক সময় ধরে কথাসাহিত্য-পরিসরে অবাধ অগাধ বিচরণ করে তিনি কুড়িয়েছেন অনেক সম্মান-মর্যাদা-গ্রহণযোগ্যতা; পার করেছেন উৎকর্ষের পথে আত্ম-অতিক্রমের বিভিন্ন বাঁক প্রতিকূলতা

অনেকেই বলে থাকেন, নাসরীন জাহান বাংলা সাহিত্য-পাড়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আসন দখল করেছেন মতবাদে আমার কিঞ্চিত দ্বিমত আছে নাসরীন জাহান সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি আসনের মালিক বটে; তবে তিনি তা দখল করেননি আসন তিনি অর্জন করেছেন তবে অর্জন করার পর আসনটিতে বসে থাকেননি বসে থাকলে কি আর তিনি এতটা পথ অতিক্রম করতে পারতেন? সাহিত্যপাড়ার প্রতিটি অলিতে-গলিতে তিনি  অবিরাম হেঁটে বেড়িয়েছেন, বেড়াচ্ছেনসেই হাঁটা কখনো প্রথাবদ্ধ, কখনো সুররিয়ালিজম, কখনো যাদুবাস্তবতা...!’

বাংলা সাহিত্যে সুররিয়ালিজম যাদুবাস্তবতার রাজকুমারী নাসরীন জাহানের প্রথম বই যখন পড়ি তখন আমি মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর রেজাল্ট আসতে যে তিন মাস সময় পাওয়া যায় সেই সময়টাতে কিছু ভালো বই পড়ার নিমিত্তে আমি এলাকার লাইব্রেরিতে যাই সেখানে দেশি-বিদেশি অনেক লেখকের বইয়ের ভিড়ে নাসরীন জাহানেরএ্যালেনপোর বিড়ালনামের একটা গল্পের বই পেয়ে যাই বইটি বাসায় নিয়ে এসে মলাট উলটাতেই প্রথম ফ্ল্যাপে আমার চোখ আটকে যায় নাসরীন জাহান ফ্ল্যাপে লিখেছেন, ‘আমেরিকার প্রাচীন লেখক এডগার এ্যালেনপো নানা বিষয়ে লেখালেখি করলেও মূলত গল্পস্রষ্টা হিসেবে তিনি পৃথিবী বিখ্যাত তাঁর লেখা প্রচণ্ড ছায়াময় এবং রহস্যে আবৃত এক সময় বোদলেয়ার এবং পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত লেখকের ওপর তাঁর লেখার খুব প্রভাব পড়েছিল জীবনানন্দ দাশেরবনলতা সেনকবিতাটি ছিল এ্যালেনপোর লেখা দ্বারা আচ্ছন্ন তাঁর বিখ্যাত গল্পের নামকালো বিড়াল’, যেখানে রূপকভাবে একটি বিড়ালের পতনের বিষয় এসেছে এই গল্পটি এক সময় সারা বিশ্বের সাহিত্যমহলে তুমুল আলোড়ন তুলেছিল অনেকে ভুল বুঝে তাঁর গল্পকে হরর, অথবা ভুতুরে গল্প হিসেবে আখ্যায়িত করত এ্যালেনপো আমার গল্প লেখার প্রারম্ভে চৈতন্যকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল এবং সেই বিস্ময়ের জগৎ থেকে আমার মুক্তি মেলে নি বলেই আমি লিখতে শুরু করি এ্যালেনপোর গল্পের সাথে আমার গল্পের আর কোনো সম্পর্ক না থাকলেও চেতনা জগতের অন্তরালে আমার অজান্তেই তাঁর লেখার সাথে একটি যোগাযোগ ঘটে গেছে এই গ্রন্থের প্রতিটির গল্পের বিষয় আলাদা মিল শুধু একটিই- প্রতিটি গল্পের একটিকমনশেষ লাইন-একটি রক্তাক্ত কালো বিড়াল মরে পড়ে আছে

পুরো বইটা পড়ার পর আমার বোধের গহনে একধরনের অসম্পূর্ণতা থেকে যায় কী সেই অসম্পূর্ণতা? আমি তা অনুভব করতে পারতাম; কিন্তু ওই বয়সে তা প্রকাশ করতে পারতাম না তাই বইটা না পড়েই রেখে দিয়েছিলাম নাসরীন জাহানের বই পাঠ তখন আমার কাছে দুর্বোধ্য ঠেকছিল এবং তা ছিল আমার বোধের অক্ষমতার জন্য কলেজে ওঠার পর আরেকবার বইটা হাতে নিই কিশোর অনুত্তীর্ণ প্রাক-মাধ্যমিক অবস্থায় পড়া বইটার নিগূঢ়তা বুঝতে কিশোর উত্তীর্ণ হয়ে যখন বইটা আবার পড়া শুরু করি তখন বুঝতে পারি, নাসরীন জাহানের গল্পের ভাষা, প্লট, চরিত্র এবং শব্দের ব্যবহার এতটাই উচ্চমার্গিয় যে কেবল পাঠ করলেই চলবে না, পাঠের সাথে সাথে মনের সংযোগ থাকা আবশ্যক অর্থ্যাৎ নাসরীন জাহানের গল্প কিংবা উপন্যাস পড়তে হলে নির্জন ঘরে একা একা নিরিবিলি বসতে হবে অবশ্য তখন ঘরে কলিংবেল অথবা মোবাইলের রিংটোন না বাজার নিশ্চয়তা থাকতে হবে আর যেহেতু আমি লেখালেখি করি- রকম পরিবেশে বই পড়া আমার অভ্যাস সেই যেএ্যালেনপোর বিড়ালদিয়ে শুরু এর পর পড়েছি নাসরীন জাহানের প্রায় সব বই তার গল্প কিংবা উপন্যাস পড়তে পড়তে নিজের অজান্তেই কী এক ঘোরে তৈরি হয় সেই ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে কেটে যায় প্রহরের পর প্রহর তবু পড়ার তৃষ্ণা মেটে না

 

এ্যালেনপোর বিড়ালএর পর নাসরীন জাহানেরকাঠপেঁচানামের একটা গল্পবই পড়েছিলাম বইটি পড়ার পর সেই যে তাঁর গল্পের গুণমুগ্ধ বুঁদ-ধ্যানমগ্ন পাঠক হয়েছিলাম একে একে তাঁর প্রায় সব বই পড়ে ফেলেছি অতি সম্প্রতি পড়ে শেষ করেছি তারনির্বাচিত গল্পবইটি বইটি প্রকাশ করেছে তাঁর সবচেয়ে বেশি বই প্রকাশ করার প্রকাশনী সংস্থা অন্যপ্রকাশ বইটিতে মোট গল্প আছে ৪২ টি এই বইয়ের গল্প অথবা সাধারণত তাঁর গল্প নিয়ে বলতে গেলে প্রথমে বলতে হবে গল্পের ভাষা ভাষা নিয়ে তাঁর গল্পের ভাষা কাব্যিকতায় ভরা, বর্ণনায় মেদহীনতা আর বিষয়বস্তু যেমন অভিনব তেমনি বলার ভঙ্গি, নির্মাণ কৌশল এবং শব্দের বুনন কাঁথার সেলাইয়ের মতো ভরাট থাকে কোনও কোনও গল্পে কাহিনি থাকে না; কিন্তু তরতর করে শেষ লাইন অবধি পড়া যায় কবিতার মতোসন্দংশতেমনই একটি গল্প এই গল্প থেকে পাঠ করা যাক, ‘...দরজার ওপাশের জামরুল গাছটা পাতার ভারে ঘেমে উঠেছে তারই বুক চিরে একচিলতে বাতাস আসে মিহি শীতে শিশু হামাগুড়ি দেয়; ঠাণ্ডার মেঝের ওপর আলুথালু চক্কর খায়...’ [কাঠপেঁচা, পৃ : ৫২]

স্নায়ু দিয়ে চেনাগল্পটিতে সোনালি নামের একজন সাধারণ মেয়ে যে কিনা ‘...কখনও মঞ্চে কথা বলতে পারে না, যুক্তির পেছনে জোরালো পাল্টা যুক্তি দিতে জানে না এই মেয়েকে রেশমগুটির ভাঁজ থেকে বের করার স্বপ্নেই মা ভার্সিটিতে ঢোকাতে চেয়েছেন- সোনালি বাইরের পৃথিবীটা চিনুক, একটু চালাক চুর হোক...’ [কাঠপেঁচা : পৃ : ৪৫]

সোনালি অনার্সে পড়াকালে একটি পত্রিকায় পার্টটাইম চাকরি নেয় তার ওপর দায়িত্ব পড়ে জাঁহাবাজ লেখক খান মুনতাসীরের সাক্ষাতকার নেওয়ার আদতে খান মুনতাসীর একজন রাজনীতিক প্লাস কবি সোনালি যদি তাকে সাক্ষাতকার দিতে রাজি করাতে পারে তার চাকরির ক্ষেত্রে স্থায়িত্বের ব্যাপারে নিশ্চয়তা পাবে সোনালি তা করতে সক্ষমও হয় জাঁহাবাজ লেখক প্লাস রাজনীতিক কবি খান মুনতাসীরের সাক্ষাতকার নিতে গিয়ে গতানুগতিক সেই ঘটনা ঘটে খান মুনতাসীরের দৃষ্টি আকর্ষক হয়ে ওঠে সোনালি ‘...পাইপে টান দিয়ে দীর্ঘ নীরবতা টেনে তিনি বলেন, তোমাকে আমার ভীষণ ভালো লেগেছে তোমার সরলতা... যুগে অকল্পনীয়, ফোনে মনে হচ্ছিলো কানের পাশ দিয়ে মিহি সুন্দর বাতাস বইছে ...বুঝলে, আমি খুব নিঃসঙ্গ, আমি তোমার কথার বলার পর থেকেই অনুভব করছি...’ [কাঠপেঁচা : পৃ : ৪৬]

নাসরীন জাহান গল্প কিংবা উপন্যাসে কিছু টেড্রমার্ক শব্দ আছে তিনিরাতনা লিখেরাত্তিরলেখেন, ‘আকাঙ্ক্ষাবদলেকাঙ্ক্ষাএবংফিনফিনে’ ‘দুর্মরশব্দগুলোর ব্যবহার প্রায়ই দেখা যা এই শব্দগুলো তার লেখার কাব্যিকতা আরও প্রসার করেছে এমনিতে তাঁর গল্পের নিজস্ব ধরন ভাষা-সৌকর্য তাকে আলাদা করে চিনতে সাহায্য করে তিনি শুধু কাহিনি বয়ান করেন না অথবা শুধু চরিত্র সৃষ্টি করেন না, সেখানে গভীর জীবনবোধ মানবচেতনার বিচিত্র অনুভব স্পষ্ঠ হয়ে ফুটে ওঠে তার গল্পের উপমা, দৃশ্যকল্প পাঠকের মনে অন্যরকম এক শিহরণ তৈরি করে

নির্বাচিত গল্পবইয়ের বেশির ভাগ গল্পে জীবন সমাজ-সত্যের নানাপ্রান্ত অনবদ্য কাহিনীতে বিধৃত হয়েছে সহজ ভাষার মধ্য দিয়ে ক্লেদজ, কখনো বর্ণাঢ্য, কখনো কর্কশ জটিল জীবনকে গভীরভাবে উপস্থাপন করেছেনশূন্যপতনএই গন্থের একটি অন্যতম গল্প গল্পটি উপস্থাপনের ভঙ্গি বেশ অভিনব মনে হয়েছে তিনি গল্পটি শুরু করেছেন এভাবে: ‘আপনারা বিশ্বাস করুন আমার কথা... বিশ্বাস করুন... সুলেখার মতোন আমার একটা মেয়ে ছিল, হুবহু সেই চেহারা, আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখুন, গত বছর মারা গেছে- বলতে বলতে হুহু কান্নায় ভেঙে পড়েন বয়স্ক অধ্যাপক...ছাত্রী অধ্যাপকের যৌননিপীড়নের ঘটনা নিয়ে গল্প ধরনের কাহিনি নিয়ে আমরা ভিন্ন ভিন্ন লেখকের আরও অনেক গল্প পড়েছি কিন্তু অন্য লেখকদের চেয়ে নাসরীন জাহানের গল্পের বিশেষত্ব হলো, তিনি ঘটনা বর্ণনার ঘনঘটা নিয়েও কেমন কাব্যিক বর্ণনায় গল্প তৈরি করেন গল্প সম্পর্কে আরেকটু ধারণা দেওয়া যাক, ‘জীবনের প্রথম এক মুহূর্তের জন্য এক বেহিসেবি অনুভব, শরীরের মধ্যে এমন একটা আগুন জ্বলে উঠল, যা তিনি নিজে জ্বালাননি... মেয়েটা এরপর ছিটকে বেরিয়ে গেল সুলেখার মাথা থেকে পিঠের দিকে যেতে থাকা...’ (শূন্যপতন,  নির্বাচিত গল্প, পৃ: ১২১)

অধ্যাপকেরতরঙ্গিত হাতযে লেখক দেখতে পেয়েছেন তা তিনি শিল্পের মোড়কে পেঁচিয়ে উপস্থাপন করেছেন

এই বইয়ের আরেকটি উল্লেখযোগ্য গল্পখোঁড়া দৌড়বিদ গল্পটিতে একজন তেজি অহংকারী মানুষের পতনের কাহিনি বর্ণনা করেছেন গ্রামের এক লোক সবার চেয়ে বেশি দৌড়াতে পারত আর নিয়ে ছিল তার অহংকার নাসরীন জাহান অহংকারীর বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে : ‘...বউকে ভাত খেতে খেতে বলত, অত কিসের ফষ্টিনষ্টি গপ্পো পাশের বাড়ির বৌ-ঝিগোর লগে? দূরত্ব রাখবি, ওরা তোর সমান?... বেবাকের লগে গা মিশায়া চললে ওরা আমারে সাধারণ মনে করব তুই মানুষরে চিনস না’ (খোঁড়া দৌড়বিদ, নির্বাচিত গল্প, পৃ: ৮৩)

একটু যশ-খ্যাতি অথবা অর্থ-বিত্ত হয়ে গেলে মানুষ অহংকার হজম করতে পারে না তারা অহংকারী হয়ে ওঠে তখন সেই অহংকারী নিজেকে সবার থেকে আলাদা ভেবে আসলে নিজেই যে আলাদা হয়ে যায় তার একটা উদাহরণ হিসেবে গল্পে প্রকাশ পেয়েছে শুধু আলাদা করেই লেখক ক্ষ্যান্ত দেননি অহংকারীর পতনও নিশ্চিত করেছেন লোকটির পা কাটিয়েছেন আর তার অহংকারী সব ভার-বোঝা পরিবারের লোকদের ওপর তুলে দিয়েছেন অবশ্য গল্প বলার সাথে সাথে একটি মানবিক বিশ্লেষণ তিনি উপস্থাপন করেছেন গল্পে

যে অন্ধ লোকটি রং দেখতে জানতনামের গল্পটিতে নাসরীন জাহান স্বপ্ন-বাস্তব, ব্যক্তির অস্তিত্ববোধ আর আপন ভুবন তৈরি করেছেন রূপকথার ভঙ্গি আছে তবে রূপকথার গল্পের আড়ালে আছে সমাজিক বাস্তবতা   মানসিক চিন্তার সংযোগ এক অন্ধ ভিখিরির স্বপ্নকে আর তার রং-প্রীতিকে ব্যক্তিগত অনুভবের আলোয় আখ্যানরূপ দিয়েছেন তিনি গল্পটি তিনি ইতি টেনেছেন ব্যক্তির নিঃস্বতাকে প্রকাশের মাধ্যমে তবে এতে তিনি শোষক আর শোষণের বাস্তবতা বোঝাতে রূপকের আশ্রয় নিয়েছেন, যা অভিনব মনে হয়েছে আমার কাছে

আমাকে আসলে কেমন দেখায় গল্পটিতে দারিদ্যপীড়িত এক মেয়ের কথা এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যে, বর্তমান সমাজের নিন্মবিত্ত অনেকের সাথে মিলে যেতে পারে তবে নাসরীন জাহানের ট্রেডমার্ক, অভিনব ভাষাশৈলীতে গল্পটার আকার ছোট হলেও অনুভূতির প্রসার ব্যাপক হয়েছে গল্পের প্রধান চরিত্র দরিদ্রপীড়িত হলেও নিজেকে ভদ্রতার আবরণে ঢেকে রাখতে চায় কিন্তু তার মানসকি চিন্তা-চেতনা বড় অদ্ভুত হওয়ার কারণে সুস্থিরমতো কোনো গন্তব্য তৈরি করতে পারেনি লেখকের বর্ণনায়, ‘... শেষমেষ খুঁজেছি এমন একটা হ্যাবলা মার্কা ছেলে, যে একই সাথে হবে দুর্দান্ত কুৎসিত ওর ঘাড়ে চড়ে বনবন লাঠি ঘোরাব ছুঁচোর কেত্তন ভরা ঘর থেকে পালাব...’ [নির্বাচিত গল্প, পৃ : ১৯ ] এই লাইনটিতে মেয়েটির দরিদ্রতা মনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়েছে লেখক আরও সুচারু রূপে বর্ণনা করেছেন, ‘...আমি গাঢ় রং পরি যাতে বারবার ধুলেও উজ্জ্বলতা থাকে একজন গরিব মেয়েকে অবশ্য হালকা রঙেই মানায় আয়নায় মুখ ফেলে দেখেছি, কোথায় অসঙ্গতি? কোথায় আমার রুচির সমস্যা? ভুরু প্ল্যাক করা ঠিক হয়নি? একপাল ভাইবোনের সংসারে এটা সম্ভবত মানানসই নয় কিন্তু আমি যখন রাস্তায়, তখনো কি আমার পিঠে আমার সংসারের লেবেল আঁটা থাকে? তবে যে পদে পদে ধরা খাচ্ছি...?’ [নির্বাচিত গল্প, পৃ : ১৬ ]

দরিদ্র জীবনের চাপে নেতিয়ে পড়া বাসে চড়া সহযাত্রীর ব্যাগ থেকে সুচতুরভাবে মোবাইল চুরি করে ধরা পড়ে যায় গল্পের শেষ লাইনে লেখক বর্ণনা করেন, ‘...আমাকে ভদ্র দেখায় না, রুচিবান দেখায় না, ঠিক আছে, দুই নম্বরি মেয়ের মতোই দেখায় তাই বলে চোরের মতো? তা নিশ্চয়ই দেখায় না’ [নির্বাচিত গল্প, পৃ : ২০ ]

বিচূর্ণ ছায়া’ (১৯৮৮), ‘পথ, হে পথ’ (১৯৮৯), ‘সূর্য তামসী’ (১৯৮৯) আশির দশকে প্রকাশিত এসব গ্রন্থে নাসরীন জাহানের প্রকরণ-নিরীক্ষা আঙ্গিক সচেতনতার পাশাপাশি গল্পকার প্রথাগত আঙ্গিকেও জীবনসংটের বিচিত্র রূপ উন্মোচন করেছেন তার ছোটগল্পে সমাজের ব্যক্তি আর মানুষের চেয়ে তার অনুভূতি প্রকাশিত হয়েছে সুচারুরূপেঅভ্যাস’, ‘দাহ’ (বিচূর্ণ ছায়া), ‘পাখিওয়ালা’, ‘পথ, হে পথ’ (পথ, হে পথ), ‘বিলীয়মান হলুদ নীল স্বপ্নগুলো,’ ‘কাঁটাতার’, ‘প্রেতাত্মা’, ‘খোলস’, ‘নিশাচর’ (সূর্যতামসী) ইত্যাদি গল্পে বর্ণনামূলক ভাষা বিশ্লেষণের মাধ্যমে নাসরীন জাহানের নিজস্বতা শুরু হয়েছে এবংপুরুষ রাজকুমারী’ (১৯৯৬), ‘সম্ভ্রম যখন অশ্লীল হয়ে ওঠে’ (১৯৯৭) নব্বইয়ের দশকে এসে এসব গ্রন্থে আমরা অন্য এক নাসরীন জাহানকে পেয়েছি এই দশকে তার গল্পে শিল্পরীতি ভিন্ন দিকে বাঁক নিয়েছে আশির দশকে রচিত গল্পে পরাবাস্তববাদী আবহ প্রধান শিল্পলক্ষ হয়ে উঠেছিল, ফলে অনেক ক্ষেত্রেই গল্পে কাহিনী ছিল না আর নব্বইয়ের দশকে লেখা গল্পে নাসরীন জাহান এ্যান্টিরোমান্টিকতা, আত্মপীড়ন, নারীবাদী চিন্তা প্রভৃতিতে স্থিত হয়েছেন, নিজের অবস্থান খুঁজে পেয়েছেন তবে পাঠকপ্রিয়তা বা জনপ্রিয়তা এসব শব্দকে নাসরীন জাহান সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন প্রকাশকের বা সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদকদের চাপে পড়ে লেখা থেকে বিরত ছিলেন, এখনও আছেন

দুই

নাসরীন জাহানের গল্পের দ্বিতীয় যে বিষয়টা অবধারিতভাবে আলোচ্য তা হলো যাদুবাস্তবতা বা পরাবাস্তববাদ বিষয়টি নিয়ে লেখক চঞ্চল বোসনাসরীন জাহান : তাঁর পরাবাস্তববাদী গল্পপ্রবন্ধে লিখেছেন, ‘নাসরীন জাহান মানবজীবনের আভ্যন্তর-বাস্তবতার (Inner Reality) শিল্পী মানবচৈতন্যের নিগূঢ় অস্তিত্ববাদী বোধ, ফ্রয়েডীয় মনোবিকলনবাদী চিন্তা এবং ব্যক্তি-মানুষের অস্তিত্বকেন্দ্রিক জীবনাভিজ্ঞতা, তার ভয়, উৎকণ্ঠা, মনস্তাপ নাসরীন জাহানের গল্পে শিল্পস্বাতন্ত্র্য লাভ করেছে নিরন্তর দ্বন্দ্বক্ষ ব্যক্তি-মানসের পুনরাবৃত্তিময় চেতনা, ক্লেদ, ক্ষ বিবমিষা নাসরীন জাহানের গল্পে মানব-অস্তিত্বের স্বতন্ত্র মাত্রা নির্ধারণ করেছে মানবচৈতন্যের নিগূঢ় অন্তর্বাস্তবতা উন্মোচনে তাঁর গল্পে প্রবল হয়ে উঠেছে নারীবাদী আদর্শের তীব্র প্রভাব সামন্ত মূল্যবোধশাসিত সমাজে নারীর স্বাবলম্ব সত্তার শনাক্তকরণে (Identification) গল্পকার নারীবাদী দৃষ্টিকোণকে জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছেন গল্পে; পরিণামে এই নারীবাদী চেতনা মূলত মানবতাবাদী জীবনজিজ্ঞাসারই সমার্থক হয়ে উঠেছে

নাসরীন জাহানের বেশির ভাগ গল্পের বিষয়বস্তুতে বিস্ময়ের উপাদান, চেতনা এবং অবচেতনের মাঝে অপ্রত্যাশিত সংযোগ এবং ঘটনার অসংলগ্ন সমন্বয় ঘটে যাকে আমরা পরাবাস্তব বা সুরিয়ালিজম বলে চিহ্নিত করি পরাবাস্তবতা বা সুরিয়ালিজম হলো স্বপ্ন জাগরণ বা বাস্তবতার মধ্যে যে বিরোধ তার একটি সমন্বয় চেষ্টা এখানে এমন সব চিত্রকল্প সৃষ্টি করা হয় যা বাস্তবের সঙ্গে মেলে না অনেকটা অবচেতন মনের প্রভাবে দেখা স্বপ্ন যার প্রতিটি উপাদানই বাস্তবিক, তবে অসঙ্গতিপূর্ণ সেখানে চিন্তায় প্রবাহ যুক্তির পথে চলে না কিন্তু একটা সময় এই স্বপ্নকে বাস্তবে সঙ্গে যুক্ত করতে হয় নাসরীন জাহানেরবিচূর্ণ ছায়াগ্রন্থেরসুন্দর লাশ’, ‘কুকুর’, ‘বিকারএবংসূর্য তামসীগ্রন্থেরল্যাম্পপোস্টের নিচে’, ‘সারারাত বিড়ালের শব্দ’, ‘অস্পষ্ট আলোর ছবিগল্পগুলোতে ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, সংঘাত-সংঘর্ষের প্রতিফলন ঘটেছে আলো-আঁধার, বাস্তব পরাবাস্তবের মিশ্র আবহে ফ্রয়েডীয় মনোবিকলন এবং ব্যক্তির ক্ষ, বিকার বৈকল্যের বিশ্লেষণাত্মক রূপ অঙ্কিত হওয়ায় -গল্পগুলিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রথাগত কোনো কাহিনী নেই ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া, আচরণ, মনোভাব মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার চিত্রণে এবং চরিত্রের অবচেতনতা বর্ণিত হয়েছে

সুন্দর লাশগল্পের ঘটনাবৃত্ত বর্ণনায় নাসরীন জাহান নির্মাণ করেছেন এক রহস্যঘেরা স্বপ্ন-বাস্তবময় পরিবেশবিকারগল্পে মতির মস্তিষ্ককোষে ক্রিয়াশীল শৈশবের মৃত একটি লোকের রক্তাক্ত স্মৃতি এবং তারই সাইকেলের আঘাতে নিহত এক বৃদ্ধার বীভৎস দৃশ্য মতিকে নিক্ষে করে ভীতিকর পরিবেশে, যা তাকে স্তম্ভিত করে দেয়

ল্যাম্পপোস্টের নিচেএকটা অন্যতম জাদুবাস্তবতার গল্প মানুষ আর পশুর সমন্বয়ে গল্পের আদল তৈরি

পাপবোধগল্পে কথক সকালে অমলেন্দুর বাড়িতে উপস্থিত হলে তার স্ত্রী জানায়, সে রাতে বাড়ি ফেরেনি, স্টেশনে গিয়েছিল তখন কথক অনেকটাই নিশ্চিত হন প্ল্যাটফর্মে পড়ে থাকা লাশটি অমলেন্দুরই সেই মুহূর্তে কেবল প্রাণ খুলে কান্না ছাড়া তার আর কিছুই করার থাকে না একটি দীর্ঘশ্বাসপূর্ণ আবহ পাওয়া যায় এই গল্পে

সান্ধ্যমুখোশগল্পের লোকটি শূন্যবাড়িতে কিশোরী গৃহপরিচারিকাকে ধর্ষণ করে আক্রান্ত মেয়েটি যখন বলে সে সবাইকে বলে দেবে, তখন লোকটি মেয়েটিকে বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করে বাড়ির পেছনে পুঁতে রাখে কিন্তু এই হত্যাকাণ্ড তাকে অনেকটা বিকারগ্রস্ত করে তোলে ধর্ষিতা কিশোরীর জায়গায় নিজের কন্যার কথা ভেবে সে বিমর্ষ হয়ে পড়ে হত্যার পাপ তাকে প্রকৃতিস্থ করে তোলে মূলত পাপবোধ নিয়ে গল্পের কাহিনি

নাসরীন জাহানের লেখায় সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টা আমাকে মুগ্ধ করেছে তা হলো- আর দশজন নারী লেখকের মতো তার লেখা মেয়েলিপনায় দুষ্ট নয় অবশ্য লেখকদের লিঙ্গভেদ নিয়ে তিনি সবসময় আপত্তি করে এসেছেননারীর প্রেম তার বিচিত্র অনুভবনামের নিবন্ধ গ্রন্থেনারীদের রচিত সাহিত্যগদ্যে তিনি লিখেছেন, ‘মেয়েদের সাহিত্য মেয়েলিপনায় দুষ্ট- আমি যেদিন থেকে সাহিত্যচর্চা শুরু করেছি সেইদিন থেকে এই বাক্যটির সাথে গভীর পরিচিত বিষয়ের অন্তর্নিহিত অর্থের সঙ্গে আমি কখনই খুব একটা দ্বিমত পোষণ করি নি, কিন্তু মেয়েলিপনা- এই শব্দের ব্যাপারে আমার ঘোর আপত্তি ...আমাদের এখানে একটা বিষয় খুব প্রচলিত- মেয়েদের আলাদা সাহিত্যের বিভাগ আলাদা সাহিত্যের ম্যাগাজিন শুরু থেকে আমি এই বিষয়টির বিরোধীতা করে এসেছি এর একটি বিশেষ কারণ আছে যখন লেখালেখি শুরু করেছি, তখন মহিলা বিষয়ক একটি ম্যাগাজিনবেগমএর ঘরে ঘরে খুব গ্রহণযোগ্যতা ছিলো যথারীতি মেয়ে পাঠকরা সেটা পড়তেন পুরুষদেরবেগমবিষয়ে প্রশ্ন করে জেনেছি, তাঁরা এই পত্রিকায় প্রকাশিত মহিলা লেখকদের ছবি দেখার জন্য এই কাগজ ওল্টান আমার প্রশ্ন হলো, মেয়েদের বিষয়গুলো যদি একটি মহিলাপাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, পুরুষরা যদি সেই লেখা না- পড়েন, তবে এর কার্যকারিতা কতখানি? যেখানে পুরুষদের আলাদা কোনো কাগজ নেই, সাহিত্যের কাগজে পুরুষ-মহিলা উভয়ের লেখাই প্রকাশিত হয়, সেখানে সাহিত্য প্রকাশের জন্য মেয়েদের কোনো আলাদা কাগজের গুরুত্বপূর্ণতাকে আমি অস্বীকার করি...’ [নারীর প্রেম তার বিচিত্র অনুভব, পৃ : ৪৭-৬৮]

পরিশেষে বলা চলে, নাসরীন জাহান বাংলাভাষী লেখক হয়েও বিশ্বসাহিত্যের দরবারে তার একটি নিজস্ব অবস্থান তৈরি করতে পেরেছেন একটি দীর্ঘশ্বাসের ডালপালা, আমার জন্ম, বিশ্বাস খুনী, গরঠিকানিয়া, পূর্বপুরুষ আর সোনর মাকড়সার গল্প, পুরুষ রাজকুমারী, দাহ, রূপকথার পাখি, প্রতিপক্ষ শকুনেরা শিবমন্দির, ল্যাম্পপোস্টের নিচে ইত্যাদি গল্প তাকে বাংলাভাষার গল্পভুবনে চির ভাস্বর করে রাখবে 



অলংকরণঃ তাইফ আদনান