জলধি / পাঠ-পর্যালোচনা / নাসরীন জাহানের উপন্যাসের ভাষা : শব্দশৈলীতে কবি ও কথকের অভিজ্ঞান
Share:
নাসরীন জাহানের উপন্যাসের ভাষা : শব্দশৈলীতে কবি ও কথকের অভিজ্ঞান

নাসরীন জাহান (১৯৬৪) তাঁর প্রথম উপন্যাস উড়ুক্কু থেকেই লেখার জাদুকরী প্রতিভার সাক্ষর রেখেছেন বৈশ্বিক আবহে তৃতীয় বিশ্বের নিরন্তর সংগ্রামরত মানুষের জীবন যাপনের ক্লেদ, গ্লানি, দ্বিধা, ভয়, আর্থসামাজিক টানাপড়েন তাঁর লেখায় গভীর সংবেদনে সৃষ্টি করেছে পরাবাস্তব আবহ যে জীবন আমাদের সামনে বীভৎস সত্য অথচ সেই সত্যকে দেখা মাত্র আমরা চোখ বন্ধ করে ফেলি সেই জীবন অসামান্য ভাষা শৈলীর ডিটেইলসে নাসরীন জাহান উন্মোচন করেছেন বাংলা ফিকশনে যে কজন কথাসাহিত্যিক ল্যাতিনীয় জাদুবাস্তবতার প্রয়োগ ঘটিয়েছেন তিনি তাঁদের একজন তাঁর জীবন শিল্প একসূত্রে গাঁথা জাদুবাস্তবতার মাধ্যমে তিনি উপন্যাসের কাহিনি অতীতে, অতীত থেকে বর্তমানে কিংবা বর্তমান থেকে ভবিষ্যতে এগিয়ে নিয়ে যান এক্ষেত্রে তিনি মার্কেজের অনুসারী, তবে মৌল সমস্যাকে একস্থানে রেখে তিনি কাহিনিতে পরিভ্রমন করেন ফলে একটি ঘটনা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবার সুযোগ পায় পাঠক যেটি তাঁর নিজস্বতা

মার্কেজ ম্যাজিক ফ্যান্টাসীকে বর্ণনা করেছেন সময়ের মধ্যে একবার এগিয়ে একবার পিছিয়ে, অতীতকে পুনরাবিস্কার করে, মসৃণভাবে সাংবাদিকতা উপন্যাসকে একসঙ্গে বয়ান করে (বেলাল চৌধুরী ১৯৯৮ : ) সাংবাদিকতার নির্মোহ ভঙ্গি নাসরীন জাহানের লেখারও একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য কারণ ব্যক্তি জীবনে পেশায় তিনি সাংবাদিক নাসরীন জাহানের উপন্যাসে লেখক কিংবা সাংবাদিক চরিত্র নিজের প্রতিচ্ছায়া হিসেবে এসেছে কাহিনিগুলো মনে হয় একটি আরেকটির সঙ্গে সম্পর্কিত ধারাবাহিক চন্দ্রলেখার জাদুবিস্তার উপন্যাসে যে লেখক এম.আলী স্বর্গলোকের ঘোড়াতে তিনি মি.এম দৈশিক কিংবা বৈশ্বিক বোধেও নাসরীন জাহান আর্ন্তজাতিক মননের অধিকারী সাদ্দামের কুয়েত দখল কিংবা ঈদের দিনে তার ফাঁসি জনতার এই অস্থির সময়কে উপন্যাসের চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্বের অস্থিরতার সঙ্গে নিপুন হাতে এক করে দেন বুঝিয়ে দেন তুমুল নৈরাজ্যিক সময় এখন অঘটন ঘটন পটিয়সী বাস্তব এখানে কল্পনাকেও অনায়াসে অতিক্রম করতে পারে শাসক শ্রেণীর ভোগবাদ, জনতাকে নিস্ক্রিয় করে রাখার প্রক্রিয়া স্রষ্টার সৃষ্টিকে করে তোলে প্রতীকী কারণ তখন মানুষের বাক স্বাধীনতা রহিত, ইতিহাস চাপা দেবার সংকটপূর্ণ সময় লেখক এই সময়কে মূর্ত করেন অভিনব কাহিনির মাধ্যমে এমন একটি অঞ্চল বেছে নেন যার চারদিকে নদী-পাহাড়বেষ্টিত, সেই জনপদের মানুষ খাদ্যহীন, বস্ত্রহীন, চেতনাহীন নাসরীন জাহানের যাদুকরী উপস্থাপনায় চন্দ্রলেখার জাদুবিস্তার উপন্যাসটিতে চন্দ্রলেখার উত্থান আমাদের চমকিত করে, বিস্ময়াবিষ্ট করে, অভিভূত করে তবু এক সময় সেটিকেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় শুধু ভাষিক দক্ষতার কারণেই নদী থেকে জন্ম নেয়া চন্দ্রলেখা- এই নারী শেকড়বিহীন, পরিচয়হীন তবু অত্যাচারী রাজাকে সে পরাভূত করে কৌশলে এই নারীর খোপার তাবিজের ভিতরে রক্ষিত আছে বিষধর সাপ ক্ষমতার রাজনীতি দখলদারিত্বের রাজনীতিকে প্রতীকায়িত করে, প্রতিষ্ঠিত করে, সৃষ্টিশীল মানুষের বাকস্বাধীনতা রোধ করে, স্বৈরাচারী শাসক জনতার রোষমুক্ত হতে পারে নাচন্দ্রলেখারপ্রতীকে লেখক দেশীয় রাজনীতিকে মূর্ত করে তুলেছেন এবং ক্ষুধিত জনতাকেই শক্তিশালী ঘোষণা করেছেন

ডিটেইলের নিপুন ব্যবহার নাসরীন জাহানের উপন্যাসে ইন্দ্রিয়গাহ্য একটি প্রখর সংবেদনা সৃষ্টি করে কখনো তা বিবমিষা জাগায়, কখনো রঙ রূপ নিয়ে আমাদের তীব্র অনুভূতি জাগিয়ে তোলে, কখনো আমরা দৃষ্টি বিমুখ হয়ে যাই কয়েকটি উদাহরণ বিষয়টিকে সুষ্পষ্ট করবে:

         . উল্টা পথে হাঁটছে অট্টালিকা ঊর্ধ্বাকাশে কুণ্ডলী পাকানো সদ্য ওঠা সূর্য     এবং দ্রুত ধাবমান ট্রাক, বাস, উচ্ছৃঙ্খল রিক্সাগুলো হুড ফেলে মিহি রোদে      মাথা স্থাপন করি সেই অগ্নিশিখার তাপ, বিস্তৃত রাস্তা, ট্রাফিক জ্যাম....     লালবাতি জ্বলছে, হলুদ নিভে যাচ্ছে, জ্বলে উঠছে সবুজ.... এই সবের মধ্যেই রিক্সা মেহেরুন্নেসা মার্কেট পার হয় ডানপাশে সারিবদ্ধ জুতোর দোকান   চমকপ্রদ সব জুতোর ডিজাইন বায়ে মোড় নিয়ে এক সময় রিকশা হাঁপ       ছাড়ে (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ২৮)

         . কি অল্পেই ভেঙে পড়ি আজকালকি সহজেই ফুরিয়ে আসছি অল্প পাওয়ার বাল্বের আলোয় বাথরুম ফ্যাকাশে, হলদেটে দেয়ালের চারপাশে চুন সুরকি উঠে গেছে এক চিলতে ভেন্টিলেটার, তাও মাকড়সা ঢেকে রেখেছেএত ক্ষুদ্র জায়গা, দম নেয়া যায় না চলিষ্ণু পিঁপড়ের ঝাঁক, মুখে খাদ্য(নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৪৬)

         . উফ্! দুঃসহ এক পরিবেশ মানুষের আর্ত গোঙ্গানি, বিষাক্ত স্যাভলনের গন্ধ একেক জনের হাত-পা ওপর দিকে খাড়া করে বাঁধা মল, মূত্র, থুথু ব্যান্ডেজ দিয়ে শরীরের ফুটো বন্ধ (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৮৪)

         . আমার পায়ে, মাথায় সর্বত্র তেলাপোকা অসংখ্য তেলাপোকা বাড়িময়ভাঙ্গা মিটসেফের উপর একটি বিস্কুটের মধ্যে কীটনাশক মিশিয়ে মা রেখে দিয়েছে পরীক্ষার জন্য এটা খেয়ে তেলাপোকা মরে কী না আমার স্পষ্ট মনে     আছে, সেই বিস্কুট দেখেও আমার জিভে জল এসেছিলো বিষ মাখানো বিস্কুটের টুকরোটি পাশের বাসা থেকে নিয়ে এসেছিল মা তার ভাষ্য যদি মরে, তাহলে সেই প্যাকেট সে নিজেও একটি কিনবে আসলে যথার্থই আমরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলাম শত শত তেলাপোকা ঘরে, বিছানায়, রান্না ঘরে, মিটসেফের ড্রয়ারে রাতে ঘুমালে গায়ের ওপর দিয়ে হাঁটতো আলনার কাপড়গুলো পর্যন্ত কাটতে শুরু করেছিলো (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৬০)

         . সামনের ছায়া ভেদ করে আচমকা চোখ অন্ধকার করে দিয়ে প্রাইভেট কারের তীক্ষ্ম রশ্মি রিকশা ব্রেক কষে নিশি টের পায় মুহূর্তে কেউ তার হাতের শিরা কেটে দিয়েছে শরীর শিথিল করে সেই জায়গা থেকে গড়িয়ে পড়ছে অজস্র রক্ত সেই রক্তের মাঝখানে বিদ্যুতের মত ঝিলিক দেয় একটি দৃশ্য একটা করুণ কাতর মুখের উপর জমছে দলা দলা থুথু (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৪৮৭)

         . সারারাত জেগে থাকে ইদ্রিস সবাই যখন নিস্তব্ধ ঘুমে অচেতন, ইদ্রিসের পেটে লুকিয়ে থাকা হা-হা খিদে তখন বিকট আকৃতি নিয়ে জেগে ওঠে খিদের সাথে যুদ্ধ করতে করতে তার রাত পার হয় পরাজিত ইদ্রিস বিছানায় অবসন্ন দেহে শুয়ে শুয়ে গোল চাকতির মতো আসমান দেখে এক সময় সে উঠে আসে সারিবদ্ধভাবে সানকি বিছিয়ে বসে আছে পঙ্গপাল, ততধিক কৃশকায়   মা যার পরণে ঠিক শাড়ি নয়, কলাগাছের পাতলা আঁশ, কোটরে নিস্প্রভ চোখ- ঝাঁকুনি দিলে সর্বাঙ্গে হাড়ের শব্দ, সে উনুনে জ্বাল দিচ্ছে (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৪৯১)

         . কাছেই বেনুবালাদের বস্তি ভাড়া মিটিয়ে দাঁড়াতেই পাট পঁচার মতো আজানা এক গন্ধ এসে নাক রুদ্ধ করে দেয় পাশেই সুবিশাল ড্রেন তার পাশে হামাগুড়ি খাচ্ছে, এক অবোধ শিশু ওকে একা ফেলে উৎসবে মেতেছে      কালো কাকের মতোন ন্যাংটা শিশুগুলো দৃশ্যটা ঠায় দাঁড়িয়ে দেখি ওইটুকুন হামাগুড়ি শিশুও নিজের গতির সীমারেখা জেনে গেছে ড্রেনের কাছে এসে সে বাঁক ঘুরে অন্যদিকে চলতে থাকে ঘরে ঘরে চুলো জ্বলছে চাটাই চট আর          ভাঙ্গা টিন দিয়ে তৈরি করা ঘরগুলো দেখলে মনে হয় ওগুলো পাখিরা তৈরি করেছে স্তুপ করা কাগজের টুকরো, পচা টায়ার এইসব ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে আগুনের মধ্যে মুরগির ভুঁড়ি নিয়ে গুলতানি মারছে কাক পাখিগুলো আর      ওপারেই স্তুপ স্তুপ আবর্জনার ওপর ঘুমোচ্ছে কয়েকটা রোয়া উঠে যাওয়া কুকুর সামনে সার বেঁধে পাঁচজন মহিলা একজন আরেকজনের উকুন বাছছে (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৬২৮)

         . সুমন চট্টেপাধ্যয়ের দশফিট বাই দশফিন গানটা মনে পড়ে ঘরের আকৃতি এমনই পাশে একটা চৌকি বিছানো গাদাগাদি করে বসে আছে শামীমার পাঁচ ভাইবোন এর মধ্যে এক বোনের আবার বিয়ে হয়েছে... লাগোয়া ছোট্ট একটা রান্নাঘর আর একটা বদ্ধ বাথরুম যার ভেতর থেকে ভুসভুস করে ঘরে গন্ধ ঢুকছে (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৬৭৮)

বয়ানের এমন ডিটেইলসেহাংরি আন্দোলনে কথা স্মরণ হতে পারে শক্তি চট্টোপাধ্যায় সম্প্রতি নামক একটি সাহিত্যপত্রের তৃতীয় সংখ্যায় ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের হাংরি সাহিত্য আন্দোলন সম্পর্কে বলেন :

         "বিদেশে সাহিত্য কেন্দ্রে যেসব আন্দোলন বর্তমানে আছে, কোনটি বীট জেনারেশন কোনটি এ্যাংরি বা সোভিয়েট রাশিয়াতেও সমপর্যায়ী    আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে যদি বাংলাদেশেও কোন অনুক্ত আন্দোলন ঘটে     গিয়ে থাকে তবে তা আমাদের রাষ্ট্রনৈতিক বা সামাজিক পরিবেশে ক্ষুধা সংক্রান্ত আন্দোলন হওয়াই সম্ভব ওদিকে ওদেশে সামাজিক পরিবেশ   এ্যাফ্লুয়েন্ট, ওরা বীট বা এ্যাংরি হতে পারে আমরা কিন্তু ক্ষুধার্ত ... জীবন চিবিয়ে যতটুকু অখাদ্য তার বমনই হলো গদ্য পদ্য ছবি ইত্যাদি গু-গোবরের সামিল" ... (শক্তি চট্টোপাধ্যায় ১৯৯৮ : ১১)

হাংরিদের গদ্য আড়াল- সৌন্দর্য- ভব্যতাহীন, ভদ্রলোকের মেনে নিতে কষ্ট হয় নাসরীন জাহানের গদ্যও তাই তাঁর প্রায় প্রতিটি উপন্যাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করেছেক্ষুধা সভ্যতার আবরণে মানবীয় ক্ষুধার রূপ বদল হয় কিন্তু তার সর্বগ্রাসী প্রবণতা সবকিছুকেই চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য- পেয় মনে করে :

কী আশ্চর্য মানুষের আগ্রাসী প্রবণতা আমি গলি-ঘুপচি হেঁটে দিনের পর দিন দেখেছি আস্ত গরু, ঠোঁট, রঙ, দেহ, সুন্দর, প্রাণ.. সব মানুষের খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে হয় ফলে যৌথ বিষয়ের প্রতিই কেমন ঘৃনা এসে গেল দুজন হলেও          পারস্পরিকভাবে অনুভূতি আদান-প্রদানের প্রশ্ন দুজন হলেই সেই   উপমাগুলো, তোর গাল আপেলের, ঠোঁট কমলার কোয়া, দাঁত ডালিমের দানা, মানুষকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখে জাগতিক খাদ্যগুলো প্রবল প্রেমের উপমার ক্ষেত্রেও মানুষ এরই মধ্যে আবর্তিত থাকে

এই খেয়ে ফেলার প্রবণতা থেকেই মানুষ দাম্পত্য জীবনের প্রথম দিকে একজন আরেক জনকে বুভুক্ষের মতন খায় নিজের সম্পত্তি ভেবে একে অন্যকে ভেঙ্গে নিংড়ে অশিল্পিত করে তোলে, শেষে ঘর্মাক্ত দেহে জীবনের    প্রথম পর্যায় অতিক্রম করে দেখে, সব তরঙ্গ গিলে দুজন অসাড় আর ম্রিয়মান হয়ে উঠেছে (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৬৪৮)

একজন নারী ঔপন্যাসিক হিসেবে নাসরীন জাহানের উপন্যাসে সমাজগর্হিত এমন কিছু বিষয় বর্ণিত হয়েছে পাঠককে যা রুদ্ধশ্বাস বিবমিষায় আটকে রাখে যেমন, সোনালী মুখোশ উপন্যাসে মমতা চরিত্রটি নিজের সন্তানের শারীরিক সক্ষমতার পরিচয় দিতে নিজের মা স্টেরিওটাইপের বাইরে অবস্থান নিয়েছে :

         -কথা শুনে আমি টানতে টানতে ওকে সাকিবের ঘরে নিয়ে গিয়ে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিই আমার ছেলের সমস্ত পোশাক, লুঙ্গি, গেঞ্জি টেনে খুলে ওর ঝাঁকড়া চুল চেপে চুমু খাই মুখে পাগলের মত ওর শরীরের সমস্ত জায়গা স্পর্শ করতে থাকি আর প্রায় চিৎকার করে চলি, এইভাবে, এইভাবে একজন পুরুষকেও জাগাতে হয়, তুমি হয়তো তা জানো না (নাসরীন জাহান ২০০৩ :৪৮০)

আপাতদৃষ্টিতে এই বর্ণনা অশ্লীল না শিল্পিত সেটি পাঠক মনে প্রশ্নের উদ্রেক জাগাতে পারে একই উপন্যাসে লেখক শিল্প সম্পর্কে নিশির কণ্ঠে যে বক্তব্য রেখেছেন তা লেখকের অভিমত বলে ধরে নিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেতে পারে :

         ... আমরা শিল্প জিনিসটাকে বড় হেলাফেলায় যত্রতত্র ব্যবহার করি, বাজার-গরম-করা ছবিতে অর্ধনগ্ন হয়ে একজন নারী বলে, শিল্পের জন্য করছি অথচ   সত্যিকার শিল্পের জন্য যে নগ্নতা সেটাকে তখন আর নগ্নতা বলা যায় না, সেটা দেখে আমরা স্তব্ধ, অভিভূত হই (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৩৪৮)

 

নাসরীন জাহান কাহিনির প্রয়োজনে যৌন দৃশ্যের যেসব বর্ণনা দিয়েছেন নিঃসন্দেহে তা শিল্পোত্তীর্ণ তার চরিত্ররা ক্ষুধার কাছে বন্দি জীব সে ক্ষুধা পেটের অথবা পেটের নীচের অঙ্গের এইসব চরিত্রদের ভাষাও ক্ষুধার্ত, ব্যাকরণের নিয়ম, ভাষিক সৌন্দর্য কোনকিছুকেই তারা মানে না গলঃধকরণ করতে চায় তথাকথিত ভাষিক শুদ্ধতাকে এই ভাষা পাঠকের জন্য স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতার :

         . আমার মাথায় দাউদাউ দাবাগ্নি ঘৃণায়, ক্রোধে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে কোমরে আঁচল জড়াই, গলা টিপে মেরেই ফেলব তোকে নিজের ভাতারকে সামলাতে পার না, দোষ আমার? আমি ওই বেটিকে না ডাকলেও তোর ভাতার        ধোয়া তুলসী পাতা হয়ে থাকত ভেবেছিস? সে ওই বেটির বস্তি চেনে না? (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ১৪৭)

         . এদিকে খাঁচার মধ্যে বৃদ্ধের হৃদপিণ্ড ধড়ফড় করে রক্তের মধ্যে ভীত কনিকার কিলবিল নাচন ছায়াগুলো আঁধার ভেদ করে টর্চ-আলোর টুসকি মারে গঞ্জিকায় আসক্ত কোনো এক কণ্ঠের টানা উচ্চারণ, শালা হাওয়া হয়া   গেল?

         এর পরেই ধুপ শব্দ

         টাল খেয়ে পড়ে গেছে কেউ ছায়া ভেদ করে কিছু ছায়া মানুষ হা - হা হেসে ওঠে

         বিহবল বৃদ্ধের চোখে ভর করে চৈত্রসংক্রান্তির মেলা অকস্মাৎ তারার মত চোখ ধুকপুক করে ওঠে ঊর্ধ্বাংশে লুঙ্গি তুলে একজন খাড়া মানুষের ছরছর শব্দে পেশাব করছে এবং এটা এমনই সংক্রামক, টর্চ নিভিয়ে বাকি       ছায়াগুলোও সমান্তরাল দাঁড়িয়ে একই কার্যে লিপ্ত হয়ে পড়ে (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৪৯৭)

         . বৃদ্ধের ইচ্ছে করে শালাগুলোর পোঁদ বরাবর দড়াম লাত্থি দেয় শালার চামচা, দুদিন আগে অত্যাচারী রাজার মল খেয়েছ এখন খাচ্ছ চন্দ্রলেখার খা-  খা-, একশ বিশ বছরে কত দেখলাম! (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৫০০)

         . মল-মূত্র এঁদো গন্ধের মাঝখানে কুকুরের মতো মানুষের বাস হাড়মাংস খুলে পড়তে থাকা কালচে বেড়াগুলোর ফাঁকে ফাঁকে স্তুপ স্তুপ মানুষ! উফ! এরা মানুষ জঘন্য অস্বাস্থ্যকর মেঝের মধ্যে রাত্তির কাটিয়ে মাস মাস নারীগুলো পেট বড় করে, আশ্চর্য এর মধ্যে শব্দ করে হাসেও (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৭১৯)

নাসরীন জাহানের উপন্যাসে তিনি অকপটে ইতর শ্রেণির ভাষা প্রয়োগ করেছেন দাবাগ্নির পাশে ভাতার, গঞ্জিকার পাশে শালা, ছরছর শব্দের পেশাব করা, পোঁদ, চামড়ার পাশে মল সুসভ্য ইতর শ্রেণিকে তিনি এক করে শ্রেণিহীন ভাষা ব্যবহার করেছেন এমনকি দীর্ঘ বিবৃতির ফাঁকে ফাঁকেও তিনি কথ্য শব্দের আকস্মিক ব্যবহার ঘটিয়েছেন যা পাঠকভেদে ঔচিত্যবোধের প্রশ্নে জিজ্ঞাসু করে তোলে :

         . তার সারাদিনের উদ্দীপনার কালো রস গা থেকে দরদর শব্দে নিচে গড়াতে থাকে আৎকা পায়ের তল দিয়ে কী একটা প্রাণী ছুটে গেল ধড়মড় করে     চন্দ্রানী চেতনালোকে ফিরে আসে সে শকুনির চোখে শেষ জিভ দেখিয়ে        সটকে পড়া সূর্যটাকে দেখে (নাসরীন জাহান ১৯৯৯ : ১৮)

         . যেন কলজের মধ্যে কেউ খোন্তার ঘা দেয়- ফজলু! - এতোকাল পর মনে পড়লো তাকে? বড়ো আজব লাগে, এই জীবনটা এতোকাল একটা ছায়াচিত্রের মতো তার ভেতরে স্থির হয়েছিল, এখন কখনও ঘা লেগে, কখনও       বাতাস লেগে সেই বিশাল অধ্যায়ের একেকটা দিক উদোম হয়ে তার বুকে রক্তের প্লাবন বইয়ে দিচ্ছে (নাসরীন জাহান ১৯৯৯ : ২৩)

         . পেট কেমন ফেঁপে উঠছে এত মজার হুইস্কির গন্ধ নীলা ভাবীর ভাষ্যমতে    মুতের গন্ধে রূপান্তরিত হয়ে পেট থেকে সশব্দে মাথাচাড়া দিয়ে গলার দিকে ধাবিত হচ্ছে ধুর! এই অবস্থায় বাড়ি না ফিরলেই পারতো! (নাসরীন জাহান   ২০০২ : ২৩)

নাসরীন জাহান (১৯৬৪) সচেতনভাবে তাঁর উপন্যাসে অবচেতন মনের ভাষা-নির্মাণ করেছেন তাঁর উপন্যাসে বাস্তবতার জগতে মানবমনের ভাবনাগুলো গতিশীল, চলচ্চিত্রের মতো একটির পর একটি দৃশ্য টুকরো টুকরো করে জোড়া লাগানো প্রথম উপন্যাস উড়ুক্কু থেকে এই ভাষাশৈলী তাঁকে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে প্রসঙ্গে সমালোচকের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য :

         বর্তমানের টানা অভিজ্ঞতার সরল রৈখিকতা ভেঙে বার বার স্মৃতিচারণে ফিরে   গেছে নীনা শৈশব বা কৈশোরের, বয়ঃসন্ধির প্রথম যৌবনের নানা মুহূর্তের     উদ্ভাস, সেই সব এলোমেলো যন্ত্রণা আর আনন্দ স্তুপের মধ্যে গভীর একটি          আন্তঃযোগাযোগ এবং নীনার চৈতন্যলোকে অতীতের সঙ্গে বর্তমানের দুর্মোচ্য গ্রন্থিগুলো চিনে নিতে পারে পাঠক [...] সমস্ত উপন্যাস জুড়ে এইভাবে কখনো স্মৃতির গলিপথ ধরে পিছিয়ে আবার এগিয়ে একটি দিনের মধ্যে          অনেক অনেক দিনের মালা, একটি মাসের মধ্যে অনেকগুলি মাসের, একটি বৎসরের মধ্যে নীনার গোটা জীবনের বৎসর সমূহ  গাঁথা হয় [...] (গোপা দত্ত      ভৌমিক ২০০২ : ২২০)

চেতন জগতের বিষয়বস্তুর আঘাত- প্রত্যাঘাতে অবচেতন মনের দন্দ্ব এসব বোঝানোর জন্য লেখক তাঁর উপন্যাসে একাধিকবার স্বপ্নদৃশ্যেরও সৃষ্টি করেছেন উদাহরণস্বরূপ :

         . ঘুমোও নীনা ঘুমোও, দেয়াল বেয়ে টিকটিকি উঠছে বাতি জ্বলছে ঘরময় একটি টিকটিকি... দুটো টিকটিকি... তিনটে টিকটিকি টিকটিকির হাট বাল্বের চারপাশে অসংখ্য পোকা একটি পোকা, দুইটি পোকা... ধূৎ মেঝের       ওপর হামাগুড়ি দিয়ে কে যেন আসছে অন্ত্রজাল ফুঁড়ে মাথায় শিং ঘাড়   উঠাই, ধীরে ধীরে সরে যায় সব সব স্মৃতি পুরো ফাঁকা মগজের ওপর একটি শিশু হামাগুড়ি দেয় ক্রমশ বড় হতে হতে ঘর জুড়ে দাঁড়ায় একটি শিশু... একটি শিশু... একটিই... তাকে আমি কোলে তুলে নেই মাড়ি দিয়ে স্তন চেপে ধরে যন্ত্রণায় ছটফট করে ছাড়িয়ে নিই এবং তারপরই সেই অবিনাশী চিৎকার দুধের ভারে স্ফীত স্তন টনটনে যন্ত্রণায় কাতর যেনো বিষফোঁড়া...সেফটিপিনের ডগা দিয়ে মুখ ছুটিয়ে দিই -ওফ্ রানু তোর যখন বিয়ে হবে, কতো পোলাও ... ওইতো আটামিল ... আরেকটু ... কি অসম্ভব চিৎকার বিছনায় ছটফট করি, শিশুটিকে ছুড়ে দিই শূন্যে ওর কপালে শাদা শিং?    আশ্চর্য (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৭৫)

উড়ুক্কু উপন্যাসের উপর্যুক্ত দৃশ্যে নীনা বাবার মৃত্যুশয্যায় আধোঘুমে স্বপ্ন দেখছে স্বপ্নে একের পর এক দৃশ্য বদল ঘটছে নীনার মৃত শিশুটি, অবচেতন মনে রয়ে যাওয়া অতীত, স্বপ্নে এসে তাকে হানা দিচ্ছে অবচেতনের ভাষা-নির্মাণ বাংলা সাহিত্যে একটি পুরনো রীতি, আমাদের সাহিত্যে এই রীতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে পাশ্চাত্য রীতির প্রভাবে কিন্তু নাসরীন জাহান অবচেতনের ভাষা-নির্মাণে লোকজ উপাদান গ্রহণ করেছেন তিনি এটিকেবায়োস্কোপের দৃশ্য বদলেরসঙ্গে তুলনা করেছেন (ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার) প্রসঙ্গত উড়ুক্কু উপন্যাসের আর একটি দৃশ্য উপস্থাপন করা হলো :

         . পঞ্চপ্রদীপের ভাঁজ খুলে নিচে নেমে আসি চারপাশে দাউদাউ মরুবালির ঝড় [...] কিন্তু -কী সমুখে বানর কেন? কোথায় সেই সুপুত্র রাজকুমার? মহিম একাগ্র চিত্তে কার মুখ আঁকছে? আমার চরণের আলতা স্পর্শ করে যে       পুরুষ ... তার সারা দেহে সুঁচ কেন? পরনের লুঙ্গি খুলে ঝাঁপ দেয় রেজাউল কুড়মুড় করে খাই অজিতের মুণ্ডু কুড়মুড় করে খাই কুসুমের পিণ্ডি -কী      কুসুমের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে মানব শিশু হায়! ডিম ভেবে আমি তাকে খেয়ে ফেলেছি! ছিদ্র দিয়ে উঁকি দেয় কে? মাগো কী বিশাল শঙ্খচূড়... (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ১১০)

আলোচ্য অংশে নীনার চেতনায় বায়োস্কোপের মত একের পর এক দৃশ্যের বদল ঘটছে রূপকথার গল্পের চরিত্রগুলোর সঙ্গে বাস্তবের চেনা চরিত্রগুলোর গোলমাল হয়ে যাচ্ছে নীনার প্রেমিক পুরুষ মহিম কিংবা স্বামী রেজাউল অথবা নীনার মৃত শিশু- অতীত স্বপ্নভঙ্গের ইতিহাস তার স্বপ্নে এলোমেলোভাবে আসা-যাওয়া করছে আলোচ্য অংশটিতে ঠাকুরমার ঝুলি, ময়মনসিংহ গীতিকার কাজলরেখার কাহিনি ব্যবহার করেছেন লেখক রেজাউলের অবহেলার কারণে সন্তানের মৃত্যু দেখতে হয়েছে নীনাকে, তাই রেজাউল চরিত্রটি শৈশবের গল্পে শোনা রাক্ষসের রূপ ধারণ করেছে, ‘কুড়মুড় করে খাই অজিতের মুণ্ডু কুড়মুড় করে খাই কুসুমের পিণ্ডিকখনো বা সে শঙ্খচূড় সাপ হয়ে মানবশিশুকে গিলে ফেলছে

মানবমনকে উন্মোচন করতে স্বপ্নদৃশ্যের পাশাপাশি নাসরীন জাহান সংলাপে বয়ানে বিচিত্রধর্মী নিরীক্ষা করেছেন বৈদেহী উপন্যাসে নিরালা থেকে নীরা হয়ে ওঠার ক্রমবিবর্তমান কাহিনির জট খুলতে কখনো হাসান কখনো নীরার অন্তর্বয়ানে উন্মোচিত হয়েছে জটিল মনস্তাত্ত্বিক সংকট মনোজাগতিক এই উত্থান-পতনের নির্মাণে উপন্যাসে নীরা হাসানের অনুচ্চ বচন, স্বগতোক্তি, অনুচ্চারিত আত্মকথন পাওয়া যায় :

         . স্থবির হয়ে বসে থাকি আজ একটা সময়ের জন্য আমি হাসানকে বিস্মৃত হয়েছিলাম গ্লানি আর ধিক্কারে মন ভরে ওঠে তবে কি আমি পরীক্ষায় হেরে    যাচ্ছি (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৪৫)

         . ফের ছায়া, অপসৃয়মান সবকিছু লাল, নীল নুড়ী কেবল, চাঁদমন বিবির মেঘডম্বুর বস্ত্র, সেই ডিঙ্গা, সেই মাঝি, যার মুখ কখনও দেখি নি, দাসীকে চিড়েমুড়ি দিচ্ছে, খাও, আর দুরাত উধাও হওয়া চাঁদমন বিবিকে তার বাপ- ভাইয়েরা ঘরের মধ্যে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছে তার ভাত বন্ধ, কাপড় বন্ধ- এরপর আমি বোরকা খুলে আছড়ে পড়েছিলাম আবুল হকের পায়ের ওপর- আমি এভাবে পারবো না (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৫৪)

         . আমার কেবলই ভয় হচ্ছিল, এই পৃথিবীতে নীরা একাকী মানুষ ওরা যদি ওর ক্ষতি করে? কিভাবে পরবর্তী জীবনগুলো যাবে, ভাবতে ভাবতে মাথার রগ ছিঁড়ে যেত সেই মেয়েটা, আমার স্পর্শ যাকে কুঁকড়ে দিতো- সে এইভাবে         নিজেকে ভেঙে এসেছে? (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৮২)

উপন্যাসে পিতৃতন্ত্রের নিরেট পাঠ ব্যতিরেকে নারীর বিকল্প পাঠ বিকল্প বাস্তবতার অন্বেষণে নারীবাদীরা মিখাইল বাখতিনের উপন্যাসের নন্দন ভাবনাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন বাখতিন উপন্যাসের ভাষাকে অন্যান্য শিল্পমাধ্যম থেকে পৃথক করার ক্ষেত্রে বলেছেন :

         উপন্যাসে ঔপন্যাসিক অত্যন্ত সচেতনভাবে শব্দসংকর ঘটিয়ে একটা সংগঠন তৈরি করেন শব্দের সেখানে জন্মান্তর বা অর্থান্তর ঘটে না বরং শব্দকে অনেক পরিত্রাণহীনভাবে অর্থের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয় তারপর সেই         অর্থান্তরহীন শব্দকে তার মূল অর্থসহই একটা ভিন্নতর উদ্দেশ্যে বা বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয় (তপোধীর ভট্টাচার্য  ১৯৯৬ : ৪৭)

নাসরীন জাহান তাঁর উপন্যাসে সুচিন্তিতভাবে একটি নির্দিষ্ট শব্দকে একাধিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন তিনি একই শব্দের ভিতর বহুস্বর বাপলিফনিসৃষ্টি উপন্যাসের গদ্যকে নিরীক্ষাধর্মী করেছে যেমন, ‘অগ্নিপরীক্ষাশব্দবন্ধটি সীতার সতীত্ব প্রমাণে ব্যবহৃত এই শব্দটি প্রতিটি নারীর জীবনে বর্তমানেও সমান অর্থবহ উড়ুক্কু উপন্যাসে রেজাউল নীনার সাথে প্রথম রাতে মিলিত হবার পর নীনাকে প্রচলিত অর্থে সতী জেনে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে রেজাউলের সেই বিকৃত উচ্ছ্বাসে নীনার প্রতিক্রিয়া :

         [...] প্রথম রাত থেকেই কী অপরিসীম ঘৃণা নিয়ে আমার দাম্পত্য জীবন শুরু হয়েছিলো? সীতার অগ্নিপরীক্ষার গ্লানিময় বিবমিষায় সে-রাতে আমারো ইচ্ছে   হয়েছিল ধরণীকে দু ফাঁক করি? (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ১১৩)

সতীচ্ছদরক্ষা নিজেকে স্বামীর কাছে কুমারী প্রমাণ করা প্রতিটি নারীর কাছেঅগ্নিপরীক্ষা সামিল আবার বৈদেহী উপন্যাসে নিরালা যখন যৌনবৃত্তি বেছে নিয়েছে তখন এমন পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটিয়েছেন লেখকসতীত্ববিক্রি করাই সেখানেঅগ্নিপরীক্ষা ভ্রমরকে নিরালা বলেছে, ‘তুমি জানো না, আমি আমার স্বামীকে কি ভালোবাসি আমার অগ্নিপরীক্ষা  এরকমশীত’, ‘কুয়াশাশিশিরশব্দত্রয় বিভিন্ন মাত্রায় নাসরীন জাহানের গদ্যে সংযোজিত হয়েছে জীবনানন্দ দাশের উপন্যাসে যেমন শীত ঋতুর আধিক্য তেমনি নাসরীন জাহানের উপন্যাসেও এইশীতশব্দটি একজন নারীর নিঃসঙ্গতা আর একাকীত্বের সমার্থক হয়ে ব্যবহৃত হয়েছে, কখনো শব্দটির অর্থ তীব্র ভয়, কখনো অস্পষ্টতা, রহস্যপূর্ণ, স্মৃতিভ্রষ্টতা কিংবা নিস্পৃহতার দ্যোতনা বহন করে উদাহরণস্বরূপ উড়ুক্কু উপন্যাসের কয়েকটি অংশ উদ্ধৃত করা হলো :

         . আমাকে জলের স্রোতে নিমজ্জিত করে বৃষ্টি ক্রমশ বাড়ছে চারপাশে ঘোর কুয়াশা (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ১০)

শাহানার সঙ্গে ঝগড়ার পর মাথার উপর একটি নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য নীনা যখন মায়ের প্রাক্তন প্রেমিকের বাসা খুঁজে ফিরছে তখন হঠাৎ করেই বৃষ্টি শুরু হয় নীনার আশ্রয়হীনতার সঙ্গে বৃষ্টি সমার্থক শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে নীনার সামনে যে অনিশ্চিত আগামী তার ভয়াবহতা বোঝাতেকুয়াশাশব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে কুয়াশায় পথ হাতড়ে ফিরছে যেন নীনা

         . চারপাশে যখন তেমনই পুঞ্জীভূত অন্ধকার সামনে, পেছনে কুয়াশার আবছায়া (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ১৭)       

রেজাউলের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর পরই একাকীত্ব আর্থিক দুঃশ্চিন্তায় চিন্তাগ্রস্থ নীনার পরিস্থিতি বোঝাতেকুয়াশার আবছায়াশব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে

         . প্রবল কুয়াশায় ডুবতে ডুবতে...কি ম্রিয়মান চন্দ্রের আলো আমার ভাঁজ খুলছিলো (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৩৯)

নিজের একাকীত্বের ভার বোঝাতেকুয়াশাশব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে নিঃসঙ্গতা সহ্য করতে না পেরে স্বপ্নের মধ্যে কারো প্রবল আদর উপভোগ করে নীনা দৃশ্যকল্পটি একটি পরাবাস্তব আবহের সৃষ্টি করেছে

         . মাঝে মাঝে যখন রেল লাইন ধরে হাঁটতাম, তখনও বিয়ে হয়নি...দেখতাম দূরে সে আবছায়া দাঁড়িয়ে আছে নীলিমায় মিশে থাকা আবছা কুয়াশার মতো (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৩৮)

ঈশ্বরের অবয়ব কেমন হতে পারে সে সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ধারণা না থাকায় নীনার কাছে তার কৈশোরে ঈশ্বরের অস্তিত্ব মনে হয়েছে নীলিমায় মিশে থাকা আবছা কুয়াশার মতো অস্পষ্টতা বোঝাতে এখানেকুয়াশাশব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে

         . আমি দেখি ভীষণ চেনা কিশোরটির মুখ কোথায় দেখেছি কুয়াশার মধ্যে প্রাণপণে হাতড়াতে থাকি (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ১২৬)

হাসপাতালে দেখা এক কিশোরের মুখ স্বপ্নের ভিতর নীনা কিছুতেই মনে করতে পারে না মনে করার চেষ্টা করাকে লেখক কুয়াশার মধ্যে প্রানপণে হাতড়ানো বলেছেন এখানে স্মৃতিভ্রষ্টতা বোঝাতেকুয়াশাশব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে

         . তারপর অন্ধকার কুয়াশার পথ সামনে এবং প্রচণ্ড নিঃশব্দ আমার চারপাশের পৃথিবী (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ১৫৪)

দুজন অসম বয়সী ব্যক্তিত্ব যখন অনুভব করছে তারা যেমন জীবনসঙ্গী চেয়েছিল তেমনটি খুঁজে পেয়েছে, বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন সে অনুভব নীনাকে হতাশার অন্ধকারে নিক্ষেপ করছে

         . শীতে আমার হাড্ডি মজ্জা একত্রিত (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ১৬৪)

প্রবল জ্বরে নিঃসঙ্গতার ভার বহন করতে পারছে না নীনা বাইরে হালকা বৃষ্টি হচ্ছে বৃষ্টি জ্বর সম্মিলিতভাবে তার হাড়ের ভিতর প্রবলশীতেরকম্পন সৃষ্টি করছে

এরকম আরো কিছু উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো :

         . মরা ছাদের এক চিলতে ফাঁক দিয়ে ফিকে ছায়া চাঁদ দেখা যায় গাঢ় কুয়াশায় আবৃত যেনো (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ১৭৩)

         . কম্বলের গায়ে প্রবল শীত (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ১৭৩)

         . সারারাত দুটি শিশিরসিক্ত বিড়ালের শীৎকার আমারে জাগিয়ে রাখে (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ১৭৩)

         . বুকের ভেতরটায় শীত (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ১৭৩)

         . আমার সামনে শীতের সুদীর্ঘ রাত্রি এবং মৃত্যুর মতো জেগে থাকার কষ্ট(নাসরীন জাহান ২০০৩ : ১৮২)

         . শীতের মৃদু আমেজে চায়ের উষ্ণ ঘ্রাণ (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ১৮৩)

         . সোডিয়াম বাতির তামাটে আলোয়, ঘনঘোর স্তুপীকৃত কুয়াশায় আমার প্রতিদিনের হেঁটে চলা (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ১৯২)

         . কুয়াশা পড়ছে এবং এইভাবে ধীরে চারপাশ শাদা হয়ে আসছে (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ২০৬)

ঈশ্বরের বামহাত উপন্যাস থেকে এরকম আরো কিছু উদাহরণ :

         . সামসুদ্দীনের চোখে ঘোর কুয়াশা, তর্ক করার মুড নেই (নাসরীন জাহান  ২০০৭ : ১৮)

         . বিল্ডিংয়ের পর বিল্ডিংয়ের মধ্যে প্রভাতের সহজাত রহস্যময় কুয়াশা, ফলে যেন ইট-পাথরের কোনো দালান নয়, যেন এক অনন্ত নদীর স্থির স্রোত সব (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ২২)

         . তার চেয়ে কল্পনা কর তুই আমি ধু-ধু বাতাসের মধ্যে শীত সমুদ্রের বালির উপর শুয়ে আছি (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ২৫)

         . পুরো রাজধানীর ওপরটা এই প্রবল দিনেও পুঞ্জীভূত কুয়াশা আঁধারে ঢেকে যেতে থাকলে ছেলেটার সর্ব অস্তিত্বকে দুমড়ে, কুণ্ঠিত করে বিনোদন     সম্পাদকের হাসি চতুর্দিকে সঞ্চারিত হতে থাকে (নাসরীন জাহান ২০০৭ :       ৩০)

         . গভীর রত্তিরে দেবলীনার বুকের বেদনা শিশিরের মত মুচড়ে মুচড়ে বেরিয়ে নিজের সর্বাঙ্গ ভিজিয়ে দেয় (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ৪৪)

         . চারপাশে পুঞ্জীভূত কুয়াশা বিকেলের আলো শুষে খাচ্ছে (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ৫৭)

         . কিন্তু মিছিল কিচ্ছুর পরোয়া না করে যখনই প্রচণ্ড গতিতে ধাবিত তখনই কর্ডন দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকা পুলিশ মিছিলের উদ্দেশ্যে বৃষ্টির মতো টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করতে থাকলে চারপাশ বিষকুয়াশার ধোঁয়ায় ঢেকে   যেতে থাকে (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ১৩৬)

         . ধেয়ে শীত নামছি নামছি এমন ঋতুর ঘ্রাণ আর শীতের ছড়ায়িত আবেশে   শরীরে প্রাণে কী যে কী হয়, সাহসী দেবলীনা একটানে রিকশার হুড খুলে দেয় (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ১৩৯)

         . মানুষের উচ্ছ্বাস ধ্বনির মধ্যেও কুয়াশা জমতে শুরু করেছে (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ১৪৭)

         . আকাশের চন্দ্র চুইয়ে পড়া স্বর্ণ শিশির সৌম্যর কান্তিমান মুখটাকে অপূর্ব করে তুলেছে (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ১৬৫)

         . ধেয়ে শীত ঢুকতে থাকলে থুত্থুড়ে শীতে কাঁপতে কাঁপতে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ নিয়ে সৌম্য চিলেকোঠার দিকে তাকায় (নাসরীন জাহান ২০০৭ :        ১৭৪)

         . রাতভর দেবলীনার চারপাশে থোকা থোকা রক্ত নর্দমার ডুবে থাকা শীতের মৃত্যুময় গ্লানি, সকালে কর্দমাক্ত বাড়ির কাছে আসতেই... বাবা বাবাগো, এই কোন স্বভাবে কোন পৃথিবীতে আমাকে ছেড়ে গেলে তুমি? (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ১৮৬)

এছাড়াও অনুভূতির বিচিত্র রূপায়ণে, উপমা, প্রতীক, রূপক হিসেবে, পরাবাস্তব আবহ সৃষ্টিতে তিনি নির্দিষ্ট কিছু প্রাণীকে বিভিন্ন মাত্রায় ব্যবহার করেছেন প্রথম উপন্যাস উড়ুক্কু থেকেই তিনি সচেতনভাবে নিজস্ব গদ্যরীতি তৈরি করে নিয়েছিলেন :

         . ডানামেলা একটা নিমগাছ দেয়াল ছাপিয়ে ওপরে ওঠে গিয়েছে তার মাথায় সন্ধ্যার এক ঝাঁক কাক, তাদের চিৎকার (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ১৩)

         . দেয়ালে অনেক টিকটিকি ওদের একচ্ছত্র চলাফেরা দেখে মনে হয়, যেন  যত্ন করে পোষা (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ১৪)

         . যার জন্য আমার বাবা মা কুকুর কামড়াকামড়ি ঝগড়া দেখেছি (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ১৪)

         . আপোষ মানেই দুটো জানোয়ারের কুস্তোকুস্তি সঙ্গম (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ১৫)

         . কুত্তার জীবনও এর চাইতে ঢের ভালো (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ১৮)

         . এই ছায়ার নিচ থেকে বেরুনো মানে কাক-কুকুরে টানাটানি করে খাওয়া  (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ১৯)

         . কতটা বিষ থাকত গোখরোর থলিতে? কতটা অমৃত? (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৩৬)

         . সোনার ময়না পুত্র হলে কি হতো? (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৩৮)

         . প্রবল প্রেম তাড়িত হলে আমার ওষ্ঠে বিষ সঞ্চিত হয় আমি ছোবল দিয়ে বিষ মিশ্রিত প্রেম ঢেলে দিতে চাই (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৩৯)

         . চারটি ছেলেমেয়েকে গরু-ছাগলের মতো মাঠে ছেড়ে দিয়ে বড় করলো অভাবের মধ্যে (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৪১)

         . উচ্ছল আনন্দে তারা একটি মরা ইঁদুর ছুড়ে দেয় শুণ্যে পিঁপড়েসহ পেট ফোলা ইঁদুর আমার পায়ের উপর ঝপাৎ করে এসে পড়ে (নাসরীন জাহান      ২০০৩ : ৪৪)

         . রামছাগল না হলে ভার্সিটি পড়ুয়া ছাত্রের পকেট কাটা যায় (নাসরীন  জাহান ২০০৩ : ৪৬)

         . কিশোরী ডিম ভেঙ্গে রানু হলো ক্ষয়িষ্ণু যুবতী ... (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৫১)

         . খটখট টাইপের শব্দ, ক্রমেই বাড়ছে সুবিশাল কঙ্কাল তার কাঠি হাত বুক ফুঁড়ে ঢোকে ক্ষতমুখে কাদামাটি চেপে ধরি অনেক কাক এক সাথে    চিৎকার করছে দি বার্ডস এর সেই দস্যু পাখি কি অসম্ভব চিৎকার,   উদভ্রান্তের মতো দৌঁড়াচ্ছি দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে হোঁচট... কাক আমার পা খেয়ে চলে গেছে মাথা চেপে ধরি (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৬৯)

         . মানুষের আর্থিক অবস্থার ছাপ এতো প্রকটভাবে শরীরে পড়ে? কলম বন্ধ  করে স্থির তাকিয়ে থাকি সেদিকে একটি সরীসৃপ ফণা দিয়ে জল উদগীরণ করে (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৭৫)

         . খাঁচার মধ্যে যে হলুদ বরণ পাখি শুধু নিজের ঠোঁট কামড়ায় আর ডানা ঝাপটায়, কিন্তু উড়াল দিতে পারে না কখনো, অমন কোন ছবির ফ্রেমে তোকে মানায় না (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৮০)

         . এক নিরন্তর হাহাকারের শব্দ আমার আত্মা তোলপাড় করে নখ বসায়, আঁচড়ায় (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৮২)

         . এঘরে আর কেউ নেই একটি বিড়াল মেঝেতে বসে শিশুর মত হাই  তুলছে (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৯২)

         . মেঝে জুড়ে তেলাপোকার হল্লা একটি কুকুরকেও দেখি, গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে ঘরে প্রবেশ করেছে শিশু বিড়ালের সাথে তার যুদ্ধ লেগে যায় (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৯৩)

         . আমার রক্ত তখন দই অবিশ্রান্ত ধাক্কায় কাঁপছি কি দেখছি এসব -কি! দেখি বিড়াল হেঁটে আসছে শরীরের ছিদ্র দিয়ে রক্ত ঝরছে তারপর হঠাৎ কুকুর তার শরীর রক্তে আপ্লুত ডানা ঝলসানো টিয়ে, ময়না তারস্বরে    চেঁচাচ্ছে হঠাৎ কঙ্কালের মাথা এবং অদ্ভুত শব্দ (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ১০০)

         . মহিলাটি তরকারি কুটছে ভীষণ একাগ্র সে তার কাজের মধ্যে কিন্তু কি বিশাল উঁই ঢুকেছে ঘরে সব ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে মহিলাটি প্লাস্টার করছে বার্নিশ লাগাচ্ছে... একবারের জন্যও কি দেখার চেষ্টা করছে, কিসের উপর এই     প্রলেপ (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ১০৫)

         . এরকম হনুমানের মত দাড়ি রেখেছেন কেনো? (নাসরীন জাহান ২০০৩ ১৫৮)

         . নিরর্থক একটি লাগামহীন ঘোড়ার পিঠে ছুটে চলা (নাসরীন জাহান ২০০৩   : ১৮৬)

 

ঈশ্বরের বামহাত উপন্যাস থেকেও এমন শব্দপ্রয়োগের কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো :

         . আসমান তার প্রাণ উজাড় করে ঝাঁক ঝাঁক বৃষ্টি ঢালছে (নাসরীন জাহান  ২০০৭ : )

         . ছেলেটার হৃদপিণ্ডে টিকটিক শব্দ তুলে প্রগাঢ়ভাবে এগিয়ে আসে গ্রিলে ঠাসা গভীর দুটো কালো চক্ষু (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ১২)

         . টেবিলের কাগজগুলো ঝটপট ডানা মেলে উড়ন্ত পায়রা হয়ে সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ১৩)

         . চড়ুই পাখির মতো হুস উড়াল দিয়ে নুসরাত এসে টুনটুনি হয়ে লেখকের কাঁধে বসে (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ১৪)

         . ... নিজের নৈঃশব্দ সত্তার মধ্যে নারী অনুভব করে তার ভেতরেও পা থেকে মাথার ফণা অব্দি একটা সাপ বাস করে (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ২৩)

         . নারীটির সারা শরীর বিছা হাঁটছিল, নিঃশ্বাস বন্ধ সমস্ত সত্তায় জমছিল ঘাম ... (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ২৩)

         . ময়নাপাখি আমার পাখি দূরের বাত্তি হাতছানি দেয়, হাঁটতে পারি না    ময়না? (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ২৪)

         . ঘর থেকে বেরোলেই মৌমাছির মতো ঝাঁক ঝাঁক মানুষ আছড়ে পড়ত তার ওপর মেকআপ... ক্যামেরার হুল ফোটানো আগুন ... (নাসরীন জাহান    ২০০৭ : ৩৩)

         . ছেলেটা দুহাতে চোখের পিঁচুটি কষে, সোজা শরীর চাঁদ বরাবর স্থাপন করে রাজহাঁসের মতো গলা বাড়িয়ে পুনরায় চারপাশে তাকায় (নাসরীন জাহান      ২০০৭ : ৩৮)

         . এক পায়ে ভর দিয়ে বকের মতো ছেলেটা নিজেকে চক্কর খাইয়ে টের পায়, বাজনাটা তার শরীর থেকেই আসছে (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ৩৯)

         . অস্থির রাজহাঁসের মতো ছেলেটা হো হো চক্কর খায় (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ৪০)

         . তীর বিদ্ধ কবুতরের মতো কাঁপতে থাকে দেবলীনা (নাসরীন জাহান ২০০৭    : ১০৩)

         . কলজে চমকানো ভয়ে দেবলীনা বসে দেখে, চাগিয়ে ওঠা শিখার মধ্যে দপদপ করছে বৃদ্ধার চোখ, সে শকুনের মতো দেবলীনার দিকে তাকিয়ে আছে (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ১০৭)

         . সৌম্যর মৃত্যুর তৃতীয় রাতে তখন দেবলীনার মাথার উপর লাল নীল প্রজাপতির নাভিশ্বাস (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ১১৩)

         . আমি তো খেয়ালই করি নাই আমার বাড়ির মইদ্যে এত কচকচা রসগোল্লা আমি ... বলতে বলতে দেবলীনার দেহের ওপর নেকড়ের মতো লাফিয়ে পড়ে    এহসান কাকু (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ১১৩)

         . শওকত নামের টিকটিকিটা হাসতে হাসতে তার মেরুদণ্ডের একেবারে নাজুক জায়গাটায় আঙ্গুল ঢুকাতেই ... টুলু ... (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ১১৯)

         . সৌম্যের কাছে সে ওপর আকাশে উড়ন্ত অনবরত (নাসরীন জাহান     ২০০৭ : ১৩৬)

         . আমার ওপর নির্ভর করে একটা ঝুঁকি নিয়েই দেখো না তোমার ভেতরের যে বুনো পাখিটার জন্য বেঁধে রেখেছ, তার একটা ডানাও যদি খোলে! (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ১৩৯)

         . মুহূর্তে দেবলীনার দীর্ঘ চুলগুলো ফেনিয়ে ফেনিয়ে বাতাসে উড়ে উড়ে আকাশটাকে চিত্রা হরিণের মতো করে ফেলতে থাকে দেবলীনা অনুভব করে তার নগ্ন শরীর পেঁচিয়ে আছে কালো ওড়নার মতো সাপ (নাসরীন জাহান   ২০০৭ : ১৪১)

         . স্বামী যখন তাকে স্পর্শ করেছে, মনে হয়েছে একটি ঠাণ্ডা সাপ তাকে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে গিলছে (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ১০২)

         . হিংস্র মেষের মতো স্রোত-শিং দিয়ে তীর গুতোতে থাকা সমুদ্রও যেন শান্ত (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ১৪৭)

         . চরাচর জুড়ে যেন কোনো পাখি নয় অবুঝ নির্ভয় নাইটিঙ্গেলের উড়াউড়ি (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ১৫৩)

         . অফিসে মশার গুঞ্জন (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ১৭৮)

         . আমার মিষ্টি হরিয়াল আমার ডানায় আঁধার কালো গোটা তোমার  জাল (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ১৮১)

         . সেই হিলহিলে এক সাপ ফণা হয়ে সৌম্যকে ছোবল দেয়ার আয়োজন   করে (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ১৮৫)

অন্যান্য উপন্যাস থেকেও এমন কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো :

         . তার দীর্ঘ চুল সাপের মতো এঁকেবেঁকে কণ্ঠ ছাপিয়ে বালিশ অব্দি গলা বাড়িয়েছে, আর হিংস্র বাতাস যেন সব ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে, যেন-বা কালো মোষ, শিং খাড়া করে সশব্দে ধেয়ে আসছে (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ২৪৫)

         .যেন মজ্জায় কামড় বসিয়েছিল জোঁক, সব রস চুষে নিয়েছে (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ২৪৬)

         . অচেনা পরিবেশে সে রাতভর কেঁচোর মতো নিজের চারপাশে নরম মাটির চক্র তৈরি করেছিল (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ২৪৮)

         . উদ্ভট সব!-ভাবতে ভাবতে তক্তপোশে কুকুর ছানার মতো কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে সে ঘুমিয়ে পড়তে চায় (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ২৪৯)

         . চারদিকে হাঙর জলের হাঁ (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ২৫৪)

         . তোর চোখ একদম সাপের মতো (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ২৫৪)

         . নিচে মোষ-কালো রাত কিন্তু দূর আকাশের অক্ষরেখায় আশ্চর্য শাদা ছায়া (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ২৫৯)

         . সে ঘরের জলে যেন-বা কানকোহীন মাছ (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ২৬২)

         . জল যাচ্ছে সর্পিল বেগে (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ২৬৭)

         . আমি বুড়ো জঙ্গলের ছাল উঠে যাওয়া শকুন, আমাকে দিয়ে কি হবে ?  (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ২৭১)

         . উঠোনের মাঝখানে জিওল মাছের মতো তড়পায় যুবতী কন্যা (নাসরীন  জাহান ২০০৩ : ২৭৩)

প্রকরণগত দিক থেকে বিশ্বসাহিত্যের জেম্স জয়েস (১৮৮২-১৯৪১), ভার্জিনিয়া উলফ (১৮৮২-১৯৪১), আলবেয়ার কামু (১৯১৩-১৯৬০), গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ (১৯২৭-২০১৪), বাংলা সাহিত্যের সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ (১৯২২-১৯৭১), আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৪৩-১৯৯৭) প্রমুখের প্রভাব আছে নাসরীন জাহানের লেখায় কিন্তু তাঁর ভাষায় তিনি সঞ্চারিত করতে চেয়েছেন বাংলার লোকায়ত আবহ তাই তাঁর উপন্যাসে রূপকথার ছাঁচে বিশুদ্ধ সাহিত্যরস সৃষ্টিতে তিনি সাধু চলিত ভাষার আকস্মিক ব্যবহার করেছেন উদাহরণস্বরূপ :

         . অস্বস্তি কাহাকে বলে, কত প্রকার কি কি ... আমার শুরু হয়ে যায় প্রথম  কিছুক্ষণ কথা বলতে পারি না তারপর টাল সামলে নিয়ে থেমে থেমে চাপা উত্তেজনায় বলি, আশ্চর্য! আপনি! (নাসরীন জাহান ২০১২ : ৬৫)

- উদ্ধৃতাংশে নীনার ইরফান চাচার মুখোমুখি হবার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত হয়েছে লেখক নীনার মনোজগতের চিত্রায়নে চলিত ভাষারীতির মধ্যেই সাধু গদ্যের আশ্রয় নিয়েছেন

         . কিছু হয়নি বলে ছেলেমানুষী তাচ্ছিল্যে অগ্রাহ্য করবো ভাবছি, চোখ পড়ে অবয়বে অবিন্যস্ত চুল বিনীত ভঙ্গি... সেই থেকে সূত্রপাত তারপর পায়ে   পায়ে হাঁটিয়াছি কতো পথ ... উড়িয়াছি কত আকাশে ... ভাসিয়াছি কত সমুদ্রে      ... সেই ছেলেটি এখন কত দূরতম দেশে? ... তারপর? তারপর তার সাথে রিকশায় শহরতলীর কতো পথ চলিয়াছি, থামিয়াছি, ভাবিত হইয়াছি, পুনরায় চলিয়াছি (নাসরীন জাহান ২০১২ : ৯৮)

- উদ্ধৃতাংশে নীনা তার প্রাক্তন প্রেমিক মহিমের স্মৃতি আচ্ছন্ন হয়েছে এক স্বপ্নময় সুন্দর অতীতের বর্ণনার ভাষা নির্মাণে লেখক সাধু গদ্যের ব্যবহার করে যথাযথ আবহ তৈরি করেছেন বর্ণনাতে মনে হয় যেন আদিকালের কথা

হেলেন সিজো ভাষার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত যুগ্ম বৈপরীত্যের (binary logic)  দিকটি নির্দেশ করে ভাষার পুরুষতান্ত্রিক ছকটির বিপরীতে নারীর নতুন স্বর অনুসন্ধান করেছেন (Rutheven 1984 : 108) নাসরীন জাহান তাঁর গদ্যে নারীকেঅপরনয় বরং একক রূপে বিবেচনা করেছেন উদাহরণস্বরূপ ক্রুশকাঠে কন্যা উপন্যাসটির একটি অংশ উদ্ধৃত করা যায় :

         বড় দুশ্চিন্তা হয় নীলুফার, খালা ভেতর থেকে বারান্দায় এসে দাঁড়ান, রোজ শায়লা এত রাত কইরা ফিরে, একলা একটা মেয়ে-

         আমি বলি একলা দেখলা কই, ওর সাথে তো পাশের বাড়ির শামীমাও ফেরে

         দুইটাই তো মেয়ে, নাকি? (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৬২৩)

হেলেন সিজো লুসি ইরিগ্যারে নারী পুরুষ রচিত ভাষা বিষয়ে আর একটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁদের মতে, ‘[...]Moreover, the masculine tradition that women speak with their sexual organs'| (Rutheven 1984 : 104) এবং তাঁরা মনে করেন,‘ WL features are therefore not so much `sex-exclusive’ as `sex-preferential’| (Rutheven 1984 : 103) তাঁরা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, প্রচলিত সাহিত্যে নারীদেহকে ভাষার মাধ্যমে পুরুষ সাহিত্যিকগণ তাদের যৌন পরিতৃপ্তির একটি ছাঁচ হিসেবে উপস্থাপন করেন ক্রুশকাঠে কন্যা উপন্যাসেও নাসরীন জাহান বিষয়টির উপস্থাপন করেছেন এভাবে :

         দুজন হলেই সেই উপমাগুলো, তোর গাল আপেলের, ঠোঁট কমলার কোয়া,      দাঁত ডালিমদানা- মানুষকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখে জাগতিক খাদ্যগুলো প্রবল প্রেমের উপমার ক্ষেত্রেও মানুষ এরই মধ্যে আবর্তিত থাকে (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ৬৪৮)

নাসরীন জাহানের উপন্যাসে যৌনতা আরোপিত কোনো বিষয় হিসেবে আসেনি, নারীকে sex-object করার কোনো প্রবণতা সেখানে থাকে না সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য:

         জীবনের অনেক বিষয়ের মত শরীর ব্যাপারটিও প্রত্যেক মানুষের জীবনে     অত্যন্ত জরুরী [...] আমার কোনো লেখায়ই শরীরী নগ্ন বর্ণনা নেই, পাঠককে উদ্দীপিত করার মতো বিষয় নেই আমি অসম্ভব প্রাকৃতিকভাবে যেখানে যা অপরিহার্য তাই বর্ণনা করেছি (নাসরীন জাহান ১৯৯৪ : ১৬)

যেমন, ক্রুশকাঠে কন্যা উপন্যাসে নারীর একান্ত অভিজ্ঞতা ঋতুস্রাবের বর্ণনা দিতে গিয়ে ঔপন্যাসিক নারীর প্রথম বিস্ময়কে শিল্পিত সুষমায় রূপায়ণ করেন :

         যাহোক, সেই থেকে, তলপেটের ব্যথার প্রাবল্যে, কিংবা পা চুইয়ে পড়া অবাক লাল স্রোতের বিভ্রম থেকে বেরিয়ে আমি নিজেকে নির্ভার করতে দিঘিতে নেমে টের পাই, আমার চারপাশের জল লালচে হয়ে উঠেছে

         আমি বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে দেখি রোদ্দুর নয়তো?

         না, শ্যাওলাগুলো সরিয়ে সরিয়ে দেখি, লাল!

         ওই একদিন আমার হাজার বছরের বাস্তবতা পাল্টে যাবার দিন (নাসরীন  জাহান ২০০৩ : ৬৪৮)

বুদ্ধদেব বসুর রাত ভরে বৃষ্টি উপন্যাসে কেন্দ্রীয় চরিত্র মালতীর ঋতুস্রাবের ঘটনার বিবরণ রয়েছে পুরুষ ঔপন্যাসিক যে ভাবে বর্ণনা করেছেন এই চক্রটিকে সেটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায় বয়ঃসন্ধিক্ষণে নারীর শারীরিক পরিবর্তনই সেখানে মুখ্য হয়ে উঠেছে নারীর বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রূপকের আড়ালে যৌন উদ্দীপক পটভূমির সৃষ্টি করেছে :

         মাঝে মাঝে আয়নায় দেখতুম নিজেকে- যেদিন ছুটি, তাড়া নেই আমার সূর্যি-   চাঁদের উদীয়মান সৌন্দর্য, আমার রোগা, নগ্ন, ভয়-পাওয়া, উল্লসিত শরীর, আমার প্রথম বর্ষার কদমফুল, আমার সরু কাঁধ, ডিমের মত তলপেট [...]    (বুদ্ধদেব বসু ১৯৯০ : ৩৩)

নীলুফার সায়রার সমকামিতার বর্ণনা দিতেও নাসরীন জাহান শরীরী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কোনো প্রত্যক্ষ বর্ণনা দেননি :

         সায়রা আমার চুলের মধ্যে আঙ্গুল চালিয়ে ক্রমশ উষ্ণ নিঃশ্বাসে কাতর হয়ে পড়ছে এরপর নিভৃত মমতায় এক এক করে আমার সমস্ত পোশাক খুলে আধোছায়ায় শীৎকার করে উঠেছে-তুই এত সুন্দর! (নাসরীন জাহান ২০০৩ :    ৬৪৪)

এছাড়াও পূর্বে উল্লিখিত সোনালী মুখোশ উপন্যাসে মমতা চরিত্রটি নিজের সন্তানের প্রেমিকার সামনে সন্তানের শারীরিক সক্ষমতার পরিচয় দিতে মা স্টেরিওটাইপের বাইরে অবস্থান নিয়েছে, তখন সেই বর্ণনা একজন মায়ের আকুতিকেই ধারণ করেছে

নাসরীন জাহানের বিবৃতিতে এমন কিছু প্রতীক উপমা ব্যবহৃত হয়েছে যা নারীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নির্যাস পুরুষ ঔপন্যাসিকের কলমে যা দূর্লভ নারীশরীর নারীজীবনের এইরূপ ভাষ্য নাসরীন জাহানের গদ্যে অনেক রয়েছে যেমন :

         . এখন সরু বারান্দায় পুরোটা জুড়ে আমি আর সেই লোক সে গুটানো   প্যান্ট সোজা করে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে লোকটি সিদ্ধান্ত পাল্টালো কেনো? দূরারোহ সংশয় নিয়ে লোকটির নির্বিকার মুখ দেখি এতোক্ষণে      আমার শরীর দিয়ে ঠাণ্ডা স্রোত নামতে থাকে উঁচু বিল্ডিংয়ের পানির ট্যাংকের  ওপর কাকের জটলা আমাকে জলের স্রোতে নিমজ্জিত করে বৃষ্টি ক্রমশ বাড়ছে চারপাশে ঘোর কুয়াশা লোকটি পেছন থেকে যদি আমাকে জাপটে      ধরে? আমার হিমচামড়া স্ফীত হয় এই বৃষ্টিপতন, ভীষণ নির্জন গলি, সামনের  চুম্বক শাদা .... (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ১০)

         . [...] কাগজটা ভাঁজ করে রেখে বাতি নিভিয়ে দিই পেটের ওপর হাত রাখি নতুন করে বুক খালি হয়ে আসে প্রাণটির অস্তিত্ব টের পাওয়ার মতো বয়স এখনো হয়নি স্থির হয়ে আছে তবুও ছুঁয়ে ছুঁয়ে পরখ করি কি অদ্ভুত        রোমাঞ্চ (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ২০১)

         . আমি কীভাবে দাঁড়াব আমার প্রতিবেশীদের সামনে? চিন্তায় শিরা-উপশিরা সব বিষাক্ত হয়ে ওঠে আমার কাপড়ে হাজার ফুটো, সেফটিপিন দিয়ে কত জায়গা আটকাব ? (নাসরীন জাহান ২০০৩ : ১৮৭)

         . মেয়েরা কাপড় চেঞ্জের সময় খালি গা হলে যেভাবে যে কোন শব্দ শুনলেই স্তন চাপতে কাপড় চেপে ধরে ... চারপাশের হু হু খোলা পরিবেশে নিজের নগ্ন শরীর দেখে মুহুর্তে, তেমন অনুভবের মধ্যে পড়ে ছেলেটা কার্নিশে আটকে      থাকা ভেজা ফতুয়াটা বুকে চেপে ভেতর সিঁড়ির দিকে পা ধাবিত করতে গিয়ে টের পায়, তীক্ষ্ণ দৃষ্টির ফলায় হৃদপিণ্ডের মধ্যে মহাশীতের জ্বর ঢুকে গেছে (নাসরীন জাহান ২০০৭ : ১০)

         . ভ্যানিটি ব্যাগ হাতড়াই, মেঝেতে জুতো ঘষি, পর্যবেক্ষণ করি সেদিনের দেখা রুমটি ফ্যানের ঘুরন্ত তীক্ষ্ণ ব্লেডের দিকে দ্রুত ধাবমান সাদা মসলিন ত্রস্ত্র হাতে সামলে আজই প্রত্যক্ষ করি, অশ্রুর মতো এর রঙ (নাসরীন   জাহান ২০০৩ : ৮৫)

দেবেশ রায় তাঁরলুপ্ত দেশ, গোপন গল্পপ্রবন্ধে অনুসন্ধান করেছিলেন কীভাবে বিজাতীয় ভাষার বিপরীতে প্রকৃত সাহিত্যিকরা তাঁদের ভাষায় অজস্র সব দেশীয় ভঙ্গিকে তুলে এনেছিলেন তিনি এক্ষেত্রে প্রাধান্য দিয়েছিলেন গল্প-উপন্যাসে লুকিয়ে থাকা অসংখ্য ভঙ্গি, মুদ্রা, বেদনা, উল্লাস, নেশা, হাসি-কান্না, রান্না-বান্না, রাগ, সম্পর্ক, ডাকাডাকি এইসব আচার-আচরণকে (দেবেশ রায় ২০০৩ : ১১৯) একটু ছল করে বাড়তি কথা বলা, একটু হাত কচলে পুরনো কথা তোলা, একটু বিনয়, নিজেকে আড়াল করার ভারতীয় ভঙ্গিগুলো নাসরীন জাহানের গদ্যেও বর্তমান নারীর বিকল্প বয়ান খুঁজতে নাসরীন জাহানও বেছে নিয়েছেন দেশীয় বাকভঙ্গি যেমন :

         টেবিলে বসে মাথা ঢুকিয়ে দিই ফাইলের মধ্যে কিন্তু তাদের কৌতূহল অসহ্য রকমের আমার টেবিলের পাশে দাঁড়িয়েছে কেউ কেউ, কী, কথা বলছেন না যে! আমার টেবিলের সামনে ভিড় করবেন না...আমি বলি, স্যার পছন্দ করেন      না কথার পর রুমের পুরো পরিবেশ থমথমে হয়ে ওঠে সুড়সুড়িয়ে সবাই চলে যায় যার যার আসনে এবং ধীরতালে শুরু হয় টিপ্পনীর বিভিন্ন রূপান্তর,     চাকরিটাই কি সব? সম্মানী লোকের সম্মান না থাকলে চাকরি ধুয়ে জল খাবে?   বসের চরিত্র জানি না? আমরা মরি আমাশা, কলেরায়, মালিক তাকে এয়ারকুলার গাড়ি দিয়েছে [...] মেয়েলোকের স্বামী থাকলে এক ভাতার, স্বামীর ঘর থেকে বেরিয়ে এলে- দশ ভাতার! [...] (নাসরীন জাহান ২০০৩ :     ১৬৭)

উপর্যুক্ত অংশে নীনার অফিস প্রধান তাকে পৃথকভাবে ডেকে সহকর্মীদের সঙ্গে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করলে চাকরি হারাবে বলে জানায় নীনা অফিস প্রধানের কক্ষ থেকে বের হয়ে নিজেকে আড়াল করার জন্যই কাজের ছলে ফাইলে মাথা ঢোকায় এর ফলে সৃষ্ট সহকর্মীদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন লেখকথমথমে’, ‘সুড়সুড়িয়ে  ধীরতালে শুরু হয় টিপ্পনীএসব শব্দ দিয়ে গুরুগম্ভীর একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছেন লেখক ব্যবহার করেছেন দেশীয় বাকভঙ্গিসম্মানী লোকের সম্মান না থাকলে চাকরি ধুয়ে জল খাবে?’ নীনা একজন বিবাহবিচ্ছেদ প্রাপ্ত নারী বলেই তাকে কটাক্ষ করতে লোকপ্রবচনের ব্যবহার করা হয়েছে, ‘মেয়েলোকের স্বামী থাকলে এক ভাতার, স্বামীর ঘর থেকে বেরিয়ে এলে- দশ ভাতার!’ বিবৃত প্রবচনে নীনাকে দুই দিক থেকে অপমান করা হয়েছে একদিকে নীনা বিবাহ-বিচ্ছেদ প্রাপ্ত, অন্যদিকে নীনা কর্মক্ষম নারী লৈঙ্গিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ভাতার শব্দটি পক্ষপাতমূলক নারীর অন্ন সংস্থানের দায়িত্ব পুরুষকে দেবার মাধ্যমে নারীর পুরুষ-অধীনস্থতাকে নিশ্চিত করা হয় এভাবে নারীর কর্মক্ষম সত্তাকেও অস্বীকার করা হয় (উদিসা ইসলাম ২০০৬ : ২৪৫-২৪৬) উপর্যুক্ত অংশে ভাষার মাধ্যমে নারীকে সামাজিক নিষ্পেষণের দেশীয় ভঙ্গি লিঙ্গবাদী ভাষাকে পাওয়া যায়

চরিত্র-উপযোগী ভাষা-নির্মাণ কিংবা ভাষার লিঙ্গীয় রাজনীতি পরিহারের মাধ্যমে নারীর সম্মানজনক অবস্থান ধরে রাখার ক্ষেত্রে নাসরীন জাহান তাঁর প্রতিটি উপন্যাসে যে গদ্যরীতি ব্যবহার করেছেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় নারীর নিজস্ব ভাষা-নির্মাণে তিনি একদিকে দেশীয় বাকভঙ্গি, রূপকথার আদল বায়োস্কোপের দৃশ্যসজ্জাকে গ্রহণ করেছেন, অন্যদিকে ফরাসি নারীবাদী তাত্ত্বিকদের রীতিকেও অনুসরণ করেছেন উপন্যাসে সৃষ্ট নারীচরিত্রের নিজস্ব মানসিক দ্বন্দ্ব, অপর চরিত্রের সঙ্গে আন্তঃসম্পর্ক নাসরীন জাহানের কথাবৃত্তের অন্তর্বয়নে নিজস্ব প্রতিবেদন তৈরি করেছে এখানেই লেখক হিসেবে তিনি অনন্যতার পরিচয়বাহী 

 

নোট - হেলেন সিজো বলেছেন, The binary logic that structures the opposition between ‘‘male’’ and ‘‘female’’ in set up as a relation not between ‘‘A’’ and ‘‘not- A’’. মল্লিকা সেনগুপ্ত তাঁর স্ত্রী লিঙ্গ নির্মাণ (আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ১৯৯৪, পৃষ্ঠা ১৪) গ্রন্থে এ সম্পর্কে বলেছেন ‘‘নারী’’ শব্দটির এই ইমেজ পুরুষ কর্তৃক প্রদত্ত। ফলে পিতৃতন্ত্রের ভাষাও বৈপরীত্যের এক ছক যার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয় পুরুষের সক্রিয়তা, মেয়েদের নিস্ক্রিয়তা। যেমন, সূর্য/ চন্দ্র, মেধা/ আবেগ, বুদ্ধিমত্তা/ অনুভূতিশীলতা, সংস্কৃতি/ প্রকৃতি, উদ্দেশ্য/ বিধেয়, পুরুষ/ নারী]

সোহানা বিলকিস তাঁর বাংলাদেশের উপন্যাস : ভাষা প্রসঙ্গ গ্রন্থে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের উপন্যাস অংশে এ প্রসঙ্গে ১৭৪ ও ২১৬ নং পৃষ্ঠায় একাধিক উদাহরণ দিয়েছেন।

 

তথ্যসূত্র :

উদিসা ইসলাম (২০০৬), ‘অসতী’, জেন্ডার বিশ্বকোষ [-], (সম্পাদক : সেলিনা হোসেন, বিশ্বজিৎ ঘোষ ও মাসুদুজ্জামান), ফারিয়া লারা ফাউন্ডেশন মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা

ভাতার’, জেন্ডার বিশ্বকোষ [-], (সম্পাদক : সেলিনা হোসেন মাসুদুজ্জামান), ফারিয়া লারা ফাউন্ডেশন মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা

গোপা দত্ত ভৌমিক (২০০২), ‘উড়ুক্কু : বিপন্নতার বর্ণমালা, প্রতিবাদের আখর’, পরিকথা, (সম্পাদক : দেবব্রত চট্টোপাধ্যায়), চতুর্থ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, কলকাতা

তপোধীর ভট্টাচার্য (১৯৯৬), বাখতিন : তত্ত্ব প্রয়োগ, পুস্তক বিপণি, কলকাতা

দেবেশ রায় (২০০৩), উপন্যাস নিয়ে, দে পাবলিশিং, কলকাতা

নাসরীন জাহান (২০০১), নিকুন্তিলা, অন্য প্রকাশ, ঢাকা

(২০০২), যখন চারপাশের বাতিগুলো নিভে আসছে, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা

(২০০৩), ‘উড়ুক্কু’, ‘ক্রুশকাঠে কন্যা’, ‘চন্দ্রলেখার জাদুবিস্তার’, ‘সোনালী মুখোশ’, পাঁচটি উপন্যাস, অন্য প্রকাশ, ঢাকা

(২০০৬), বৈদেহী, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা

(১৯৯৪), ‘নাসরীন জাহানের সাক্ষাৎকার’, দৈনিক জনকণ্ঠ, (সম্পাদক : মো.আতিকুল্লাহ খান), ২৩ নভেম্বর, ঢাকা

(১৯৯৯), উড়ে যায় নিশিপক্ষী, অন্য প্রকাশ, ঢাকা

(২০০৭), ঈশ্বরের বামহাত, অন্য প্রকাশ, ঢাকা

(২০১০), নারীর প্রেম : তার বিচিত্র অনুভব, অন্য প্রকাশ, ঢাকা

(২০১২), উপন্যাসসমগ্র , মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা

বেলাল চৌধুরী (১৯৯৮), মৃত্যুর কড়ানাড়া, মূল লেখক : গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, সন্দেশ, ঢাকা

বুদ্ধদেব বসু (১৯৯০), রাত রে বৃষ্টি, এম. সি. সরকার অ্যান্ড সন্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলিকাতা

শক্তি চট্টোপাধ্যায় (১৯৯৮), হাংরি জেনারেশন রচনা সংকলন, কথা কাহিনি, কলকাতা

সুলতানা ইয়াসমীন (১৯৯৪), ‘নাসরীন জাহানের সাক্ষাৎকার’, দৈনিক জনকণ্ঠ, (সম্পাদক : মো.আতিকুল্লাহ খান), ২৩ নভেম্বর, ঢাকা

সোহানা বিলকিস (২০১৪), বাংলাদেশের উপন্যাস : ভাষা প্রসঙ্গ, অবসর, ঢাকা

K. K. Rutheven (1984), Feminist Literary Studies : An Introduction, Press syndicated of the University of Cambridge, London 



অলংকরণঃ তাইফ আদনান