জলধি / পাঠ-পর্যালোচনা / তৃষ্ণা বসাকের কবিতা : অধিচৈতনিক ইস্তেহার
Share:
তৃষ্ণা বসাকের কবিতা : অধিচৈতনিক ইস্তেহার

তৃষ্ণা বসাকের কাব্যদর্শনে স্পষ্টতই ইন্দ্রিয়ভূত হয় প্রতীকী অভিব্যক্তিবাদ ও চিত্রবাদের প্রক্ষেপণ। তাঁর কবিতা মানুষের হৃদয়ের প্রতিমার মতো। সেখানে চিত্রিত, বিবৃত এবং মুখরিত হয় মানুষের ইতিহাস, মানুষের চেতনা-সম্ভূত মানবিক মূল্যবোধ ও আদর্শের পরিপত্র,পরাপাঠ। জীবনবোধে ঋদ্ধ শিল্পশৈলীর রূপায়ণ এবং নবীকরণ দুইই তাঁর কাব্যকলার আরাধ্য লক্ষ্য। তাই তিনি কব্যের সৃষ্টিস্বরূপে আবহ জীবন-চর্চার অভিকল্প সংযোজনাকেই মূখ্য অভিপ্রায় হিসেবে ধারণ করেন। তৃষ্ণা বসাক মনে করেন জীবনের চিরায়ত প্রবহতালগ্ন ঐতিহ্য, প্রকৃতি ও তার প্রাণ-চাঞ্চল্যের শাশ্বত সঞ্চরণ এবং পুরো পার্থিব-অবস্থিতির যৌগ-সমষ্টি মূলত একটি সমন্বিত গ্রন্থ। এ গ্রন্থের অন্তর্পাঠ জটিল। এর অধিদর্শন গভীর রহস্যময়তায় সমাবিষ্ট। এর ভাব-অভিধা ও ভাষ্য  প্রহেলিকাময়। আর সমাজ-যাপিত প্রতিটি মননমুখী ব্যষ্টিমানুষ সেই দূরান্বয়ী এবং দুর্বোধ্য রহস্য উদঘাটনের অনুসন্ধিৎসায় ব্যাপৃত। কবির মানস-ব্যসনের অভিক্ষেপণে আমরা আঁচ করি কবি নিজেই সেই অনুসন্ধিৎসু ব্যষ্টিমানুষ, অথবা তিনি সেই ব্যষ্টি-সন্ধিৎসার প্রতীকী প্রতিনিধি। তাঁর "ছলচ্ছল,ছলচ্ছল" শিরোনামীয় কবিতাটির বিষয় ব্যবচ্ছেদ করলে দেখা যায় এটি ত্রিকাল-বন্ধনীর এক মহাআখ্যানিক কবিতা। এতে সন্নিবিষ্ট এবং সন্নিহিত হয়েছে অতীত ও বর্তমানের সেতুসংযোগ, এতে গ্রথিত এবং প্রণীত হয়েছে মানব-মানবীর মনো-দৈহিক সম্পর্কের ঐতিহাসিক রসায়ন, এতে বিবৃত এবং চিত্রিত হয়েছে প্রজন্ম-পারম্পর্যের অনিবার্য ক্রম-অগ্রায়নের ইস্তেহার, এতে উপস্থাপিত হয়েছে সভ্যতার গাত্রস্থিত লৈঙ্গিক ও আদর্শিক দ্বন্দ্বের অধিচৈতনিক অভিভাষণ। ভাব-সন্দর্ভের এই যৌগ-জটিল সংমিশ্রণের ফলে কবিতাটি প্রতীতিগত গূঢ়তায় সমাহিত হয়েছে, এবং গঠন-কোষে ধারণ করেছে রহস্যঘন দুর্বোধ্যতার এক প্রতিপাদনিক পাঠ। কবিতাটি নিম্নরূপ---


"অন্তস্তল থেকে জল,ছলচ্ছল শব্দ 

  তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ ধৃতিদীপা ৱাহিড়ী?

  আমার যে বাড়িতে স্বামী, কন্যা,ঈশ্বর 

  আমার যে মাছের খাবার, খরগোশের বাঁধাকপি,

  বদরিপাখির চিনাঘাসের বীজ---


  জল,ও জল,হাতের মুঠোর মধ্যে 

  তোমাকে ধরি,আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে যাও,

  আঙুল থেকে কনুই বেয়ে তিল ও তণ্ডুলে--

  বাবা বলতে এই ছবি শেষ ২৫-বছরে!


  সিঁড়ি উঠি,সিঁড়ি নামি,কায়াসাধ,আমার কায়াসাধ জাগে 

  স্ক্যানারের তলায় ব্যাগ ও যাবতীয় স্থাবর 

  ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নেই একবার, বারবার 

  আমার মধ্যেও তাহলে ছিল কোনো বিস্ফোরক? 


  লাফ দিয়ে পড়ি নীচের লোকটার ঘাড়ে, 

  চেপে ধরি সামনের লোকটার কলার

  মিলছে না,মিলছে না

  এত লোকের মধ্যে একটাও আমার বাবা নয়!


  তুমি আমাকে ভয়ংকর, ভয়ংকর বোর করছো

  এত ফোন আসে তোমার? এত লোক চেনে তোমাকে? 

  আমার সঙ্গে কথা বলছ,মোবাইল অফ করতে পারছ না?

  ওঃ আবার বেজে উঠলো ওই ছলচ্ছল রিং-টোন!


কবিতাটির প্রথম স্তবকের অন্তস্তল থেকে ছলচ্ছল শব্দে উছলে ওঠা জল কথককে ধৃতিদীপা লাহিড়ীর কোনো নিরুদ্দেশে নিয়ে যাওয়া এবং ন্যারেটারের বাড়িতে রেখে আসা স্বামী কন্যা ঈশ্বর ও অন্যান্য গৃহি-বিষয় তথা সংসারের উল্লেখ কোনোএক গভীর রহস্যের ইঙ্গিত দেয়। অনুমিত - এখানে কবি মানব-অস্তিত্বের আদিম-পর্ব থেকে  চলে আসা মানুষের সঙ্গত এবং অসঙ্গত দেহজ কামকাতরতার চিরন্তন স্বরূপটি তুলে ধরেছেন। মানব-মানবীর মনো-দৈহিক রিরংসার এই অনুভূতি চিরায়ত, দুর্বিনীত এবং দুর্দমনীয়। সুতরাং ধৃতিদীপা লাহিড়ী নিজের পক্ষ থেকে  জোর খাটিয়ে এই বক্তা-রমনীকে কোথাও নিয়ে যাচ্ছে ব্যাপারটি এমন না-ও হতে পারে। বরং রমনীটির মনের অবচেতন স্তরে হয়তো তার অজ্ঞাতেই জন্ম নিয়ে থাকতে পারে এই যাওয়ার অনুকূলে এক অপরোক্ষ সম্মতির  অভিব্যক্তি। তবে একইসঙ্গে তার চেতনার ভেতরে উদ্ভুত হয়েছে অমিমাংসিতব্য এক অন্তর্দ্বন্দ, বিবেকের শ্রবন-ইন্দ্রিয়ে বেজে উঠেছে অনুপেক্ষ এক পিছুডাকের নৈঃশাব্দ্যিক ধ্বনি। স্বীকার্য, বিষয়টি মানব-মনস্তত্ত্বের অতি-অনিবার্য এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। দ্বিতীয় স্তবকের শব্দগুলোর মাঝে ঘন-বয়নে সৃষ্টি হয়েছে আরেক ঐন্দ্রজালিক রহস্যের ঘোর। বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার আলোকে কবি এখানে অধিদার্শনিক ভাবের চিত্র অঙ্কন করেছেন। তিনি বলেছেন তরল জল মুঠির মধ্যে আটকে রাখা যায় না। আঙুলের ফাঁক গ'লে এবং কনুই বেয়ে তা গড়িয়ে পড়ে ভাত ও পাতের অতলে। এ বয়ানটি প্রকৃতিজাত এক সত্যবোধের মেটাফোরিক্যাল উৎপ্রেক্ষণ হয়ে উঠেছে। এর ভেতরে নিষিক্ত হয়েছে পুরাণ-বাহিত প্রবচনের ঐতিহাসিক মনোবেদ। কারণ কবি এখানে প্রমান করতে চেয়েছেন যে, মানুষের মনোজগতে সন্তরণরত শাশ্বত কামনা এবং লালসাগুলোও জলের গতির  মতোই অনিয়ন্ত্রিত, অরোদ্ধ। সুতরাং "সিঁড়ি উঠি, সিঁড়ি নামি, কায়াসাধ, আমার কায়াসাধ জাগে" পঙক্তিটির মাধ্যমে, পাঠক হিসেবে আমরা মনে করি, কবি কেবলই যৌন-জৈবিকতার ক্ষুধা নিবৃত্তির আকাঙ্ক্ষার কথা বলেননি। কেননা স্ক্যানার তথা চিত্ত-দর্পনে বিম্বিত ব্যাগ ও যাবতীয় স্থাবরের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে কবি বারবার দেখেন আর ভাবেন তাঁর নিজের মধ্যেও ছিল দুর্বিনীত আকাঙ্ক্ষার  সেই অনন্ত বিস্ফোরক। মানুষের ভেতরের প্রবৃত্তিগত বাঞ্ছা থেকে জন্ম নেয় কাম-কামনা, বিত্ত-বাসনা এবং ক্ষমতা ও  প্রতিপত্তির মোহ। এই মোহ মানুষকে সমাজের সৃতিসংবিদা থেকে বিচ্যুত করে, মানুষকে উদভ্রান্ত এবং বিভ্রান্ত করে। তখনই মানুষের কোনো বৈধ অভিভাবকের প্রয়োজন হয়, যে অভিভাবক তাকে উপদেশ দেবে, পরামর্শ দেবে, উদভ্রান্তি দূর ক'রে তাকে সঠিক পথে সংযত রাখবে। আলোচ্য কবিতার দ্বিতীয় স্তবকের শেষ লাইন ও চতুর্থ স্তকের শেষ লাইনে উল্লেখিত বাবা-ই সেই অভিভাবক, যা কবির মতে আগে ছিল কিন্তু এখন  নেই। আর সমাজ-মানসের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এই অভিভাবক মূলত মানবিক আদর্শবাদের প্রতীক। উদভ্রান্ত কবিমন তথা ব্যক্তিনিরপেক্ষ মানব-মন আধুনিক জীবনের নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা, অবসন্নতা ও বিভ্রান্তি থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় অসংখ্য মানুষের ভীড়ে সেই অভিভাবক-বাবা, তথা আদর্শকে খুঁজে ফেরেন। এজন্য কখনো লাফিয়ে পড়েন কারোর ঘাড়ে, আবার কখনো চেপে ধরেন কারোর শার্টের কলার। কিন্তু উত্তম-পুরুষ বক্তা তাঁদের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেন কেউ তাঁর বাবা নন, অর্থাৎ কোথাও তিনি তাঁর সেই কাঙ্ক্ষিত আদর্শের সন্ধান পান না। শেষ স্তবকে এসে বক্তা-নারীটিকে  আমরা স্নায়ুবিক বৈকল্যাক্রান্ত অস্থির, অবসন্ন, ক্ষ্যাপাটে এবং অসহায় এক আধুনিক আত্মার প্রতিরূপ হিসেবে দেখতে পাই। এখানে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির যোগাযোগ-যন্ত্র মোবাইল ফোনের মূর্ত এবং বিমূর্ত উভয় রকমের ইমেজ তৈরি হয়েছে। বক্তা-মহিলাটি তার বন্ধু অথবা প্রেমিক অথবা স্বামীর হাতে থাকা মুঠোফোনের রিংটোন বারবার বেজে ওঠায় ভীষণ বিরক্ত হচ্ছেন, ক্ষুব্ধ হচ্ছেন। উত্তেজিত স্বরে অভিযোগ ক'রে বলছেন, 'তোমার নিকট এতো ফোন আসে কেন, তোমাকে এতো মানুষ চেনে কেন? আমার সঙ্গে কথা বলছো অথচ তোমার মোবাইল ফোন অফ করতে পারছো না, অথবা নিদেনপক্ষে ঐসব ফোনকল তুমি ইগনোর করতে পারছো না। তাহলে তুমি আর কার সঙ্গে, কার কার সঙ্গে যোগাযোগ রাখো, তুমি আর কাকে নিয়ে, কাকে কাকে নিয়ে ভাবো!? আমি তোমার কে, আমার সঙ্গে তোমার সম্পর্কটা কিসের এবং কেমন?' কবিতাটির এই লাইনগুলোর মধ্যে স্বনামধন্য আধুনিক কবি T.S. Eliot-এর বিখ্যাত কবিতা 'The Waste Land'-এর দ্বিতীয় সেকশন A Game of Chess-এর নিম্নোক্ত লাইনগুলোর ভাবানুরণন স্পষ্ট। 

"My nerves are bad to-night.Yes,bad.Stay with me

 Speak to me.Why do you never speak? Speak.

 What are you thinking of?What think?What?

 I never know what you are thinking, Think."

Eliot-এর এই স্পিকারও একজন নারী এবং নিউরোটিক পেশেন্ট। অভাবনীয় প্রযুক্তির যন্ত্রতাড়িত যে আধুনিক জীবন তা সর্বতভাবে আশাহত, অস্থির এবং বিশ্বাসহীনতায় আক্রান্ত। এ জীবনের কোথাও স্বস্তি নেই শান্তি নেই, আশা ও ভরসা নেই। এ জীবন নিজেই সর্বৈব এক পোড়োভূমি, অসার ঊষর এবং বন্ধ্যা। কোথায় যেনো হারিয়ে গেছে এর উর্বরতা শক্তি, প্রজনন ও পুনর্জন্মের সক্ষমতা।  


একটিমাত্র কবিতার আলোচনা দিয়ে একজন কবিকে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়, সমীচীনও নয়। তবে এথেকে সংশ্লিষ্ট  কবির সৃষ্টিকর্মের মানামান সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায় বৈকি। এই বিবেচনায় তৃষ্ণা বসাককে একজন ধীমান কবি হিসেবে অভিহিত করা যায় নিঃসন্দেহে।



অলংকরণঃ তাইফ আদনান