এখন গল্প শুধু আনন্দের জন্য পড়া হয় না; বিনোদনের মাধ্যম হিসেবেও নয়। সময়ের বাঁকে গল্প পাঠের রুহানিয়তে পরিবর্তন এসেছে। গল্প পাঠের মৌলিক এক প্রকল্পের নাম চিন্তা। চিন্তার ভরকেন্দ্রে নাড়া দেয়াই আজকের গল্পের প্রভাবশালী কাজ। মানে, সময়ের প্রেক্ষিতে সাহিত্য করা যেমন নেহায়েত অবসরে শখ পূরণের কাজ নয়, তেমনি পাঠও। অর্থাৎ পাঠকও আজকাল প্রস্তুতি নিয়ে নামছেন পাঠের দুনিয়ায়। ফলত ‘অতঃপর তাহারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল’ টাইপ গল্পসাহিত্যের এখন ‘খানা’ নাই। কী পড়বো, কেন পড়বো প্রশ্নে জারিত সচেতন পাঠকেরা। সামাজিক ফিল্মের মতো চিমটি মেপে বিভিন্ন উপাদানের মিশ্রণ দিলেই ঠিক জমবে না গল্প। চিন্তার জগতে প্রশ্ন প্রতিপ্রশ্নের যে উত্থাপন তাতে একেকটা গল্পের থাকে তুমুল অংশগ্রহণ এবং তা-ই প্রত্যাশিত। ভাবতেই অবাক লাগে, নাসরিন জাহান- যিনি কি না তার বয়সের অধিক বিখ্যাত হয়ে আছেন বাংলা কথাসাহিত্যের ক্রিয়াশীল নদীতে- তিনি আজ থেকে বহু বছর আগেই শুরু করেছেন চিন্তা অন্বেষণকারি গল্পচর্চা। সম্ভবত এ কারণেই আশির দশক থেকে আজতক বাংলা কথাসাহিত্যের আলোচনায় নাসরীন জাহান এক অনিবার্য নাম। হতে পারে, খ্যাতির এই ভিত্তিটা তার গড়ে দিয়েছে লিটলম্যাগচর্চা। লিটলম্যাগের আধুনিকমনস্ক, প্রথাবিরোধী চিন্তার পরিচর্যা মেধাবীদের দেয় দুর্বার সাহস। এই ভিত্তিমূল যাদের যত বেশি মজবুত তাদের অধিকাংশই ‘রাজ’ করছে চিন্তার জগতে। নাসরীন জাহানের কথাসাহিত্য নিয়ে কথাকার কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের মন্তব্য এখনো সমানভাবে প্রাসঙ্গিক- ‘তিনি ঘটনার বর্ণনা করেন চরম কাব্যিকতা প্রয়োগ করে, ভাষার ভেতরে কথিত মেদময়তা তাঁর থাকে না। তিনি যেন চরিত্রকে দেখছেন, তাদের সঙ্গে আছেন, তাদের শাসন করছেন না; কিন্তু তাদের ব্যাপক মায়ায় রাখছেন, দেখে দেখে, নিজে থেকে তাদের কথা বলাচ্ছেন। তারা যেভাবে কথা বলে, কথাকে কাহিনীর ভেতর বাড়তে দেয়, তাতে পাঠকের মননে বারবার চরম যোগাযোগ দাবি করে।’ স্মরণে আসে, আজ থেকে প্রায় এক যুগের অধিক আগে কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের সাথে চট্টগ্রাম রেলওয়ে হাসপাতালে আড্ডা দেয়ার কালে আরো কতিপয় দার্ঢ্য কথাসাহিত্যেকের নামের সাথে শুনি নাসরিন জাহানের নাম। বলা দরকার, এর আগেই তার কিছু লেখাপত্র পড়লেও পয়লা ‘কথা’ সম্পাদক প্রয়াত কথাকার কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরকেই দেখি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে নাসরিন জাহানকে উল্লেখ করতে- অন্তত নগর চাটগাঁর আড্ডায়। এখন মনে হয়, এই শ্রদ্ধাবোধ আলোচ্য কথাকার অর্জন করে নিয়েছেন তার নিরন্তর সাহিত্য-সাধনার ভেতর দিয়ে।
আমরা আলোচনার মূল পর্বে প্রবেশের আগে স্বীকার করে নেবো, নাসরীন জাহান এক ‘উড়ুক্কু’ দিয়ে যা অর্জন করেছেন তা খুব কম লেখকের ভাগ্যেই জোটে। তবে তার বেলায় এই সত্যও সামনে দাঁড়ায়, তিনি নিজেকে ক্রমাগত ভেঙেছেন এক ফর্ম থেকে আরেক ফর্মে। অবাক হতে হয় এই ভেবে, একজন প্রতিষ্ঠিত কথাকারকে কেন কবিতায় যেতে হবে? যাবেন ভালো, সেখানেও খেল দেখাতে হবে! মেধাবীরা সব কিছুই করেন, তার আগে সেরে নেয় যাবতীয় প্রস্তুতি। ফলে উপন্যাস, গল্প, শিশুতোষ রচনা, নাটক এবং কবিতা সবকিছুই ক্রমাগত আঞ্জাম দিতে পারেন তারা। আমরা এই আলোচনায় নাসরিন জাহানের একটি মাত্র গল্পকিতাব নিয়ে কথা বলবো। একটির সূত্র ধরে নানাদিকে যাবার নিয়তও অবশ্য পোষণ করে রাখা যায়, ভাইসব!
সন্দেহ সেই, জলধি’র এই আয়োজন অনেককেই নতুন করে পড়ার টেবিলে বসাবে নাসরিন জাহানের বই হাতে নিয়ে। মূলত সংগঠন বা সাহিত্যকেন্দ্রিক তৎপরতার বিশেষ একটা মূল্য আছে। ব্যক্তি অনেক সময় বেদিশা বোধ করে পরিপার্শ্বের প্রতিক্রিয়ায় কিন্তু কাঠামোগত শৃংখলা দাঁড় করাতে পারলে অনায়াসেই পৌঁছানো যায় একটা ইতিবাচকতায়। তাই বলে সবাই তো আর ‘জলধি’ হবে না কিংবা ‘এবং বই’র মতো বই নিয়ে পড়ে থাকবে না! জগতের নানা রকম হাহাকারের ভেতর দিয়েই মূলত মহৎ শিল্পের জন্ম হয়। বৈচিত্রময় অভিজ্ঞতা আর জীবনপাঠের তুমুল একটা ছাপ আমরা লক্ষ করি নাসরিন জাহান কৃত ‘আশ্চর্য দেবশিশু’ গল্পগ্রন্থের গল্পগুলোয়। যে পরাবাস্তবতার কথা আজকাল হামেশা শোনা যায়, তার আশ্চর্য রকমের ব্যবহার নাসরিন জাহান গল্পে করেছেন অনেক আগেই। আর আছে ভাষার ব্যবহার। এমন মোহনীয় ভাষাবিস্তার আর চিত্রকল্পের গল্প পাঠের যুগপৎ আনন্দ ও জিজ্ঞাসা পাঠককে আন্দোলিত করবে; প্রশ্ন উত্থাপনে সহযোগিতা করবে এবং সমাজকে দেখার ও বিচারের একটা তরিকা বাতলে দেবে। গল্পকার নিজেই গল্প নিয়ে ‘নির্বাচিত গল্প’র ভূমিকায় বলেন, ‘...ক্রমান্বয়ে চেষ্টা করেছি গল্প নিয়ে বহুমাত্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার, যে নিরীক্ষার ফাঁকে আটকে থাকে যে-কোনো শিল্পের চিরায়ত সত্য-প্রাণ, সেটা যেন না হারায়।...তাই কাঙ্ক্ষিত লেখাটির স্বপ্নে প্রতিদিন হাঁটি। সেই হাঁটা কখনো প্রথাবদ্ধ, কখনো সুররিয়ালিজম, কখনো যাদুবাস্তবতা, কখনো হয়ে ওঠে প্যাঁচ গোজের ফাঁস থেকে বেরিয়ে সরল ধারায় হাঁটার পথ... আমি লিখি না, লেখার মধ্য দিয়ে নিজেকে বদলে বদলে হাঁটার চেষ্টা করি।’ আমরা লেখকের কথার সাথে গল্পের ছায়া মিলিয়ে দেখার মওকা নেবো এক্ষণে।
‘আশ্চর্য দেবশিশু’ গ্রন্থে গল্পের সংখ্যা দুই হালি। ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে সাজানো গল্পগুলো পাঠে বোধ হয় ভিন্ন ভিন্ন পাত্রে অচিন পানীয় পানের সুধা। বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে বিহার করে নাসরিন জাহানের গল্প। বাস্তব এবং পরাবাস্তবের সমন্বয়ে গল্পগুলো কথা বলে উচ্চস্বরে, কখনোবা নিরবতার ভাষায়। ‘হত্যাকারি’ গল্পটি যতটা না বাস্তবের তার অধিক কল্পনার। গল্পের জাদুকর, বৃদ্ধ কিংবা তার স্ত্রীর ভাবনার সাথে পাঠক হয়তো মিলানোর চেষ্টা করবে পরিপার্শ্বকেও। তবে এই গল্পের সবচে বড় চরিত্র ক্ষুধা এবং প্রকৃতি। জাদুকরের কথার সূত্রে দার্শনিক প্রতীতিতে ভরা একটা চিত্র পড়া যাক, ‘জাদুকর বলে, একাগ্র ঈশ্বর ধ্যান এবং ভেতরে ত্যাগের মানসিকতা সৃষ্টির মধ্যেই দারিদ্র্য আর ক্ষুধাকে জয় করা সম্ভব। সেটাই একমাত্র পথ।’ ‘অন্যরকম’ গল্পটা সত্যিকার অর্থেই অন্যরকম চিন্তায় ভরপুর। মা মেয়ের অসম চিন্তার ফসিল দেখতে পাই গল্পটার শরীর জুড়ে। জেনারেশনভেদে চিন্তার যে ভিন্নতা, মা-মেয়ের ভেতরেই যে জেগে ওঠে দ্বৈতসত্তার বিশাল ভূবন তার মনস্তাত্ত্বিক এক ঠান্ডা দ্বৈরথের নাম ‘অন্যরকম’। অভাবের বিস্তার আছে, মায়ের বুঝদার আচরণ আছে, এমনকি মা যে মেয়েকে বুঝবার সর্বাত্মম প্রয়াস চালায় তারও একটা সম্ভ্রম আছে এখানে। সন্তান বেড়ে উঠার ভেতর তৈরি হওয়া ও দৃশ্যমান নানান জিজ্ঞাসায় গল্পকারের মেধাচিহ্নিত স্টেপ আছে এ গল্পে। তবুও গল্পের শেষে করুণ একটা সিম্বল পাঠককেও ভারাক্রান্ত করে বৈকি। একজন মানুষের শারিরীক ঊনতা, সৌন্দর্য যে শেষতক মা মেয়ের সম্পর্ককেও ভিন্ন অর্থে পরিচালিত করে তার চমৎকার এক বয়ানের নাম ‘অন্যরকম’। ‘আশ্চর্য দেবশিশু’ গল্পে মাতৃত্ব ও সমাজচোখের একটা বিশ্বস্ত ধারণা দেন গল্পকার। অসময়ে বিয়ের পর মা হওয়ার বাসনা, সমাজের টিটকারি এবংকি এক চক্ষু শিশু নিয়ে পিতামাতার ব্যবসার কথাও বাদ যায় না। একদিকে মা হবার গৌরব, অন্যদিকে সেই ঊনশিশু নিয়ে বিস্তর অর্থযোগ, আর কী লাগে? পীরের শিখিয়ে দেয়া তরিকায় ডাইনি বনে যাওয়া চন্দ্রমুখীর এমন আক্ষেপ চিরায়ত নারীরই প্রতিভূ- গল্পাংশ থেকেই পড়া যাক, ‘তুই যদি জানিসই আমি ডাইনি, তবে তারপরও আমার ওপর চড়ে বসিস কেন? স্বামীর উদ্দেশে বিড়বিড় করে চন্দ্রমুখী, এ-তো চড়ে বসা নয়, মাটির মধ্যে বীজ পুঁতে দেয়া। অথচ কী ঘেন্না শরীরে। জলত্যাগ করতেও মানুষ এত কম সময় নেয় না।’ চন্দ্রমুখীর সংসারের ইতি টানে পুরুষজাতির প্রতি প্রবল এক ঘৃণায়। এর ভেতর দিয়ে চন্দ্রমুখী নয় শুধু তাবত সমাজচিত্রের একটা খতিয়ান দৃশ্যমান হয়। ‘ইচ্ছাশক্তি’ গল্প ইসকান্দার আলী নামক প্রায়-জমিদার শ্রেনির লোককে নিয়ে লেখা। যদিও এই গল্প এদেশের ত্যাগি, সঞ্চয়ী এবং জীবনপ্রিয় পিতার বিপরীতে লোভী দায়িত্বজ্ঞানহীন পুত্রদের সম্পদলিপ্সার চমৎকার এক বয়ান। বয়স্ক পিতা একেকবার শয্যায় যায় আর ওদিকে পুত্রেরা পোটরা সমেত ওলি-আওলাদ নিয়ে শহর থেকে গ্রামমুখী হয়। বিস্তৃত জমির লোভ সন্তানদের বাড়িমুখো করে আর ইসকান্দার আলী জমি-সবুজ দেখে লাভ করে পুণর্জন্ম। এই খেলা, এই খেলার পেছনে লোভের চকচকে জিহ্বার যে সমাজবাস্তবতা নাসরিন জাহান গল্পে সেঁটে দেন, তা একজন মহৎ সাহিত্যিকের সিম্বলিক কাজ হিসেবেই বিবেচিত হয়। ‘প্রতিপক্ষ শকুনেরা’ বাংলাসাহিত্যের উল্লেখযোগ্য গল্পগুলোর একটি বলেই ধারণা করি। গরুচোরের উৎপাত এবং তাদের কান্ডকারখানা নিয়ে অনেকেই কমবেশি জানি। কিন্তু কুতুবুদ্দিরা যেভাবে গরুর চামড়ার লোভে জ্যান্ত গরুকে মারার আয়োজন করে তা চরম অমানবিক। সংঘবদ্ধভাবে তাদের হৃদয়হীন কারবারের ভয়ে জেগে থাকে সচেতন গেরস্তীর অনেকেই। তবুও শিকারের সম্ভাবনায় যেভাবে মরণকে ডেকে আনে কুতুবুদ্দি- তা এতো বেশি ট্রাজেডিপূর্ণ, বলা ভালো গল্পকারের ভাষাকল্পের কল্যাণে এত হৃদয়গ্রাহি যে পাঠকেরা শেষতক কুতুবুদ্দির অন্যায়ের চেয়েও বড় করে দেখে তার বেদনাদায়ক পরাজয়কে। শকুনেরা দলবেঁধে আসে এবং তাদের সংঘবদ্ধ শক্তি কুতুবুদ্দিদের, এদেশকে বারংবার চুষে নিয়েছে এই বোধও আরেকবার জাগ্রত হয় পাঠকের মননে। শকুন মূলত শোষকেরই প্রতিভূ- এই অনিঃশেষ ভাবনা আমাদের শেষ হতে দেয় না ‘প্রতিপক্ষ শকুনেরা’। ‘পরপুরুষ’ হাফিজ-কুসুমের সংসার করা ও না-করার গল্প। পুরুষামি দেখাতে গিয়ে হাফিজ তালাক দেয় কুসুমকে। কুসুমও তালাকের দায়ে গরিবীপনার দাম দেয় অন্যের ঘরে কামলা দিয়ে। কিন্তু হাফিজেরা এতই শরীরলিপ্সু যে, কুসুমের তালাক-খাওয়া বাসি শরীরেও জোর খাটিয়ে চলে- গোপনে, লোকচক্ষুর আড়ালে। অথচ সেই ঘটনাকেই হাফিজ আবার সামনে আনে এই বলে, ‘আফনের মাইয়া দুইদিন আগেও রাইতে আমার লগে দেহা করছে। অহন আফনেই বুইঝ্যা দেহেন, এই সমাজের কুনহানে অরে জায়গা দিবেন।’ এই হলো গিয়ে মানুষের অবস্থা! জোর করবে আবার জায়গামতো ব্যবহার করবে স্বার্থের প্রয়োজনে। খুব সম্ভবত হাফিজের এই পয়েন্টেই বিপুল বেদনাহত হয়ে ওঠে কুসুম। সে হাফিজেরই আয়োজিত হিল্লাবিয়ে গ্রহণ করে নিজের সাথে বোঝাপড়া শেষে। হিল্লাবিয়েতে রাজি হয়েছে যে ভিক্ষুক, পাতলা দেহের অধিকারী হলেও গানে বেশ পারদর্শী। কুসুম শেষতক সিদ্ধান্ত নেয়- হাফিজের কাছে ফিরে যাবে না, এই ‘গান বেইচ্যা’ খাওয়া ভিক্ষুকের সাথেই থেকে যাবে। শঠতাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে সততাকে আলিঙ্গন করার আরেক চিহ্নায়ন প্রাগুক্ত গল্প। ‘এক রাতে, রোস্তোরাঁয়’ গল্পটি ক্ষুধার। ক্ষুধায় জারিত এক লোকের হোটেলে খাওয়ার মারাত্মক অভিজ্ঞতার গল্প। বিশেষত পকেটে টাকাহীন এক ব্যাচেলরের খাবার হোটেলে ভাব নিয়ে অপেক্ষা করার পর পেটের তাগিদে খাবার খেয়েই ফেলে। একদিকে খালি পেট, অন্যদিকে নতুন বছরের প্রত্যয়- জয়ী হয় ওই ক্ষুধাই! কিন্তু নতুন বছর বলে তো একটা শুরু আছে ব্যবসার- হোটেল মালিকের আক্ষেপ শোনা যায়, ‘দিলেন তো নতুন বছরডার মইধ্যে গিটঠু লাগাইয়া’। নতুন বছর কেন, নতুন অনেক কিছু এভাবেই পরাজিত হতে থাকে ক্ষুধার কাছে। আর সাময়িক ক্ষুধার বিরুদ্ধে জয়ী হবার গ্লানি নিয়ে রাস্তায় বেড়িয়ে পড়ে গল্পের নায়কের মতো মানুষের। আহা, নতুন বছরকে গ্রহণের কত আয়োজন চৌদিকে অথচ কেউবা ঠিকতে পারছে না ক্ষুধার জ্বালায়। কে বলবে এইসব রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিয়ে, কে শুনবে সমতার কথা? ‘জগতে কে কাহার’ আমরা মেনে নিলেও গল্পকারের দরদি হৃদয় দাঁড়িয়ে যায় অসহায়ের পাশে। এই এখানেই বুঝি গল্পের সৌন্দর্য।
হাসান অরিন্দম নাসরিন জাহানের গল্প নিয়ে বলেন, ‘তাঁর কিছু গল্প মুখ্যত চিন্তাপ্রধান- সেখানে বর্ণিত ঘটনা ও দৃশ্যকল্প পাঠকের মধ্যে অভূতপূর্ব এক শিহরণ সৃষ্টি করে।’ উপর্যুক্ত বক্তব্যের সাথে আমরা এরকম কথাও যুক্ত করতে পারি যে, নাসরিন জাহানের গল্পভাষা একেবারেই ব্যতিক্রম, হৃদয় দিয়ে আঁকা, কিছুটা কাব্যিকতা মোড়ানো। খুব সম্ভবত তিনি পরবর্তীতে কবিতাচর্চা শুরু করলেও, তার গল্পের কোথাওবা শুরু থেকেই আলগোছে জড়িয়ে ছিল কবিতার মতো ভাষা-সৌকর্য। ‘হত্যাকারী’ গল্প থেকে পড়া যাক, ‘আসমানের গা ফুঁড়ে গুটি বসন্তের মতো তারা ফুটে বেরিয়েছে। ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটাতেও পাথর চক্ষু ভাবলেশহীন।’ একই গল্প থেকে আরেকটু দেখি, ‘ধীরে ধীরে জেগে উঠতে থাকে সব। যেন নদীর জল ফুঁড়ে বেরিয়েছে চর।’ এরকম প্রকৃতিঘনিষ্ট উপমায় ভরপুর মানবজীবনের অপরিসীম কিছু সত্যের দেখা পাই নাসরিন জাহানের একাধিক গল্পে। গল্প পাঠের সাথে চিত্রকল্পের এমন সাজুয্য দেখে পাঠক বিস্মিত হয়, চমকে ওঠে। ‘ইচ্ছাশক্তি’ গল্প থেকে পড়া যাক, ‘না, ছিটেফোঁটা বৃষ্টি নেই, উঠোনে ঠাঁ ঠাঁ রোদ। পাঁচ বছরের নাতি মতির নুনু গড়িয়ে জল পড়ছে। বাঁশঝাড়ের মগডালে তার স্বরে চিৎকার করছে কোনো একটা পাখি।’ ‘নুনু গড়িয়ে জল’ পড়া আমরা অনেকেই খেয়াল করি বটে কিন্তু এমন স্বাভাবিক আর প্রাকৃতিক নয়; গল্পকার এখানেই ভাষার খেলাটা খেলেন স্বভাবনিষ্ঠ গুণপনায়। ‘দোয়ানো দুধের গরম ফেনার মতো প্রকৃতি। মান্দার গাছের সবুজ পাতায় ঢেউ।’ এমন প্রকৃতির কথা কেউ শুনেছে আগে? কিংবা ‘প্রতিপক্ষ শকুনেরা’ গল্পের অভাবনীয় উপমায় পাঠক অবাক হয়, ‘এই লোকটি তার সম্পত্তির সবখানে আল্লাহর মতোন মিশে থাকে।’ অথবা একই গল্পের আরো খানিক পড়া যাক, ‘তেপান্তরের ওপর গাঢ় হয়ে সন্ধ্যা নামছে। বাতাসের বেগ এখন কিছুটা শিথিল। নদীর শান্ত জল উঠোনে মেলে দেয়া আতপ চালের মতো।’ মজার বিষয়, ভাষার বৈভবে চিত্রকল্প আর উপমার উপদানগুলো গল্পকার তুলে আনেন পরিপার্শ্বের জীবন থেকে। ফলে কাব্যিকতা থাকলেও তা শেষতক মানুষেরই কাছাকাছি আরেকটি সত্তা হয়ে পাঠকের বুকে ওম দেয়। গল্প তো ভাষারই আরেক রকম বিবৃতি- যেখানে জীবন থাকে, জীবনের সাথে সংযুক্ত অপরাপর বিষয়াশয় থাকে। একজন সচেতন গল্পকার তাই নৈবদ্য দেন মানুষী-জাত যাবতীয় ঘটনা পরম্পরায়।
‘জলধি’ প্রকাশিত নাসরিন জাহানের ‘গল্পসমগ্র-২’ এ গ্রন্থভুক্ত প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘আশ্চর্য দেবশিশু’ পাঠান্তে এমন সিদ্ধান্তে আসতে পারি- নাসরিন জাহানের গল্পের ভূবন মানুষেরই জীবন দিয়ে ঘেরা। স্পষ্ট করে বললে, তা প্রান্তঘেষা মানুষদের নানামুখী তৎপরতা নিয়ে। এখানে শহর প্রায় নেই বললেই চলে। আছে প্রকৃতি আর মানুষের গলাগলি। অবশ্য ‘গল্পসমগ্র-২’ গ্রন্থিত অন্যান্য গল্পগ্রন্থগুলোর দিকে নজর দিলে পাঠক খেয়াল করবেন, নাসরিন জাহান গল্পকার হিসেবে অন্যন্য হবার আরেকটা মৌলিক কারণ এই, তিনি পূর্বের গল্পগ্রন্থকে ছাড়িয়ে গেছেন পরের গ্রন্থে; তা বিষয় কি আখ্যানে। এমনকি তার যে ভাষাভঙ্গিমা তাও বদলে যায় গল্পভেদে। নিজেকে ভাংচুরের ভেতর জারি রেখে তিনি প্রয়াস চালান ভিন্নতর ভূগোল নির্মাণে। এই প্রক্ষেপন তার সতত সক্রিয়তা ও নিরন্তর সাধনারই বহিঃপ্রকাশ। নাসরিন জাহান এদেশের কথাসাহিত্যে, আরো নির্দিষ্ট করে বললে, গল্পসাহিত্যে উতরে যাবেন তার সময়জ্ঞান ও চিন্তাপ্রসূত ছোটগল্প নির্মাণের কল্যাণে। ‘আশ্চর্য দেবশিশু’ তার সেই সিম্বলিক কাজ, যা প্রজ্ঞা ও বোধের মহামিলনে ভাস্বর হয়ে থাকবে প্রশ্নমুখর, ভাবুক এবং অগ্রসর পাঠকদের কাছে।
অলংকরণঃ তাইফ আদনান
