জলধি / পাঠ-পর্যালোচনা / চন্দ্রদাহ — মুক্ত আলোর আবহ
Share:
চন্দ্রদাহ — মুক্ত আলোর আবহ

বাংলাদেশের স্বাধীনতাপরবর্তী সাহিত্যজগতে মুক্তিযুদ্ধ একটি মৌলিক অভিজ্ঞতা, এক গভীর ঐতিহাসিক ক্ষত এবং একই সঙ্গে এক অনিবার্য গৌরবের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

স্বাধীনতা অর্জনের পরপরেই যে সাহিত্যিক স্রোত তৈরি হয়, সেখানে মুক্তিযুদ্ধ ছিল প্রধান বিষয়। যুদ্ধের সময়কার নির্মমতা, গণহত্যা, নির্যাতন, দেশত্যাগ, শরণার্থীজীবন এবং প্রতিরোধের গল্প সাহিত্যে প্রবলভাবে উপস্থিত হতে থাকে। প্রথম দিকের অনেক উপন্যাসে যুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আবেগই প্রধান হয়ে ওঠে। লেখকেরা প্রায়শই প্রত্যক্ষদর্শীর মতো করে ঘটনাবলি তুলে ধরেছেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যিক উপস্থাপন ক্রমশ গভীরতর এবং মনস্তাত্ত্বিক হয়ে ওঠে।স্বাধীনতাউত্তর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অধিকাংশ উপন্যাসে ট্রমা একটি কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে ওঠে। যুদ্ধ মানুষের মনে যে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করে, সেই ক্ষত অনেক সময় সরাসরি দৃশ্যমান হয়েছে। আড়ালে পড়ে গেছে মানুষের দুঃস্বপ্ন,বোধ আর অনির্বচনীয় স্বপ্নময়তা।এই জায়গা থেকে বের হয়ে এসে জিল্লুর রহমান শুভ্র অনন্য এক কাহিনি তৈরি করেছেন চন্দ্রদাহ উপন্যাসে। সাতাশ অধ্যায়ে সমাপ্ত এই উপন্যাসকে ইচ্ছে করলে বহু যোজন তিনি নিয়ে যেতে পারতেন, তা থেকে সরে না এসেও উপন্যাসে ছড়িয়ে দিয়েছেন মুক্ত আলোর আবহ।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো স্মৃতি ইতিহাসের পারস্পরিক সম্পর্ক। স্বাধীনতার পরবর্তী সমাজে যুদ্ধের স্মৃতি কখনো গৌরবের, কখনো বেদনার, কখনো আবার দ্বন্দ্বের উৎস হয়ে ওঠে। অনেক লেখক এই স্মৃতিকে একটি নৈতিক প্রশ্ন হিসেবে দেখেছেন। যুদ্ধের সময়কার বীরত্ব যেমন সাহিত্যে এসেছে, তেমনি এসেছে বিশ্বাসঘাতকতা, ভীতি এবং মানবিক দুর্বলতার গল্প। ফলে মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসগুলো কেবল জাতীয় বীরত্বের কাব্য নয়; এগুলো মানুষের জটিল নৈতিক বাস্তবতারও প্রতিফলন।এর ব্যতীক্রমী আবছায়া জিল্লুর রহমান শুভ্র ছড়িয়ে দিয়েছেন এই উপন্যাসে।

উপন্যাসের প্রধান চরিত্র রাসেল আহমেদ এবং সাবিত্রী চ্যাটার্জী। কিছুক্ষণের জন্য উপন্যাসে উপস্থিত হয়েও উজ্জ্বল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তোফায়েল আহমেদ। কাহিনি শুরুর সময়কাল মার্চ'১৯৭১।এই উপন্যাসে জীবন্ত হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ। বিশেষত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষণিকের উপস্থিতি এই উপন্যাসকে অনবদ্য করে দিতে সাহায্য করে। এই উপন্যাসের ধানমন্ডি ৩২ এর অনবদ্য বর্ণনা ফুটে উঠেছে এবং সেটি জিল্লুর রহমান শুভ্র' জাদুকরী ভাষায় উদ্ভূত হয়েছে। জীবন্ত হয়ে উঠেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদের চারিত্রিক উপস্থিতি। এই উপন্যাসের ভাষা পৌরাণিক প্যাটার্ন ভাষিক উত্তরাধিরতার দিকে তীব্র বাঁকবদল করেছে।

 এই প্রেক্ষাপটে সমসাময়িক সাহিত্যিকদের কিছু কাজ মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি উপন্যাস জিল্লুর রহমান শুভ্র' চন্দ্রদাহ। এই উপন্যাসপ মুক্তিযুদ্ধের বাহ্যিক ইতিহাস প্রাধান্য পেয়েছে এমনটিই শুধু নয়, বরং সেই সময়ের মানুষের ভেতরের ভাঙন মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতাকেও দারণভাবে চিত্রায়িত করেছে। ফলে বাংলাসাহিত্যের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসের আঙিনায় ভিন্ন এক ধারা সৃষ্টি করেছে যার অবদান প্রধানত তার ব্যতিক্রমী উপস্থাপনা।জিল্লুর রহমান শুভ্র এই উপন্যাসে ভাষার একটি বিশেষ ভঙ্গি ব্যবহার করেছেন। তাঁর ভাষা কখনো জটিল বর্ণনামূলক নয়; বরং অনেক সময় তা কাব্যিক, প্রতীকী এবং মনস্তাত্ত্বিক।তার ভাষায় পশ্চিমা সাহিত্যের ছাপনা থাকলেও প্রকাশভঙ্গিতে পশ্চিমা ছায়াভঙ্গি স্পষ্ট। এই ভাষা পাঠককে কেবল ঘটনার ধারাবিবরণীই দেয় না;সেই সাথে তাকে চরিত্রের অন্তর্জগতে প্রবেশ করতে বাধ্য করে। ফলে উপন্যাসটি সচেতন পাঠকে এক ধরনের মানসিক যাত্রায় অংশ নিতে বাধ্য করবে, মন্তব্য সুনিশ্চিতভাবেই করা যায়।

চন্দ্রদাহ মুক্তিযুদ্ধকে একটি প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে উপস্থিত করলেও এই উপন্যাসে তীব্রভাবে উপস্থিত রয়েছে মারাত্মক বয়নকৌশল। এই উপন্যাসের প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে  জিল্লুর রহমান শুভ্র' ব্যতিক্রমী ভাব বিশ্লেষণমুখী বয়ানকৌশলের মধ্যে। উপন্যাসের চরিত্ররা যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় কেবল বাহ্যিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যতোটা তারও ঢের বেশি তারা মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন, বিভ্রান্ত এবং গভীর অস্তিত্ব সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে। এই সংকট তাদের ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্কে নয় বরং স্মৃতিকে ক্রমাগত পরিবর্তিত করেছে ফলে উপন্যাসটি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধানে পরিণত হয়ে হয়েছে।এই ধাঁচ মার্কেজ আর ম্যাক্সিম গোর্কির ছায়াকে ধারণ করে লেখকের অজান্তেই, এবং এই বাঁক বদল বাংলা উপন্যাসে ব্যতিক্রম।বিপরীত পিরামিডীয় পদ্ধতিতে স্বচ্ছ প্রাঞ্জল ভাষায় প্রকাশ এই উপন্যাসকে অনন্য পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে। জিল্লুর রহমান শুভ্র জড়তাহীন বর্ণনার মুন্সীয়ানা চোখে পড়ার মতো--

ইয়াজুজ-মাজুজের মতো ভয়ঙ্কর দু'জন সৈন্য ভেতরে প্রবেশ করল; নিচতলার কক্ষগুলো ভাংচুর করল এবং তারপর ক্যাচ ক্যাচ শব্দ করে সিডি ভেঙে উপরে উঠল। উপরের কক্ষগুলোতে তন্নতন্ন করে অভিযান চালাল, তছনছ করল, তারপর নিচে নামল। কী মনে করে, তারা আস্তাবলে প্রবেশ করল না। সম্ভবত, তারা ভেবেছিল, ঘোড়াগুলোর কারণে এটি লুকানোর গোপন জায়গা না হতে পারে। তবে বের হওয়ার আগে তারা আস্তাবল লক্ষ করে দু'রাউন্ড গুলি চালালখেয়ালের বশে কিংবা তাদের ট্রেনিংয়ের অংশ হিসাবে।

অল্পের জন্য সাবিত্রী রক্ষা পেলেও দেখতে পেল হঠাৎ সদর দরজা থেকে একজন সৈনিক ফিরে আসছিল, এবং গজর গজর করে উর্দুতে যা বলছিল তার অর্থকেউ লুকিয়ে আছে। ধরা পড়ার ভয়ে সাবিত্রী' শরীরের লোম খাড়া হয়ে উঠল, গলা শুকিয়ে কাঠ। গলা ভেজাতে নিজের থুথু গিলে খাওয়ার চেষ্টা করল। ভগবানের নাম মুখে আনবে তা- পারছিল না। এমন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা যখন, দ্বিতীয় সৈনিক প্রথম সৈনিকের উদ্দেশ্যে উর্দুতে যা বলল তার অর্থকর্নেল স্যার ডাকছেন।

চন্দ্রদাহ নামটি প্রতীকী তাৎপর্য বহন করে এটি ভেবে নেয়া সহজ। চাঁদ সাধারণত শান্তি, সৌন্দর্য এবং স্থিতির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। যেন মানুষের অন্তর্জগতের আকাশে যে চাঁদ ছিল, যুদ্ধের অভিঘাতে সেটি দহিত হয়েছে। এই প্রতীকটি উপন্যাসের মূল ভাবনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। যুদ্ধ মানুষের ভেতরের আলোকময়তাকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয় এবং সেই ক্ষত দীর্ঘদিন ধরে মানসিক অন্ধকার সৃষ্টি করে।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যে সাধারণত বীরত্ব সংগ্রামের কাহিনি প্রধান হয়ে ওঠে। কিন্তু চন্দ্রদাহ এই প্রচলিত কাঠামোকে তীব্রভাবে ভেঙে দিয়েছে। এখানে যুদ্ধের বীরত্বের চেয়ে মানুষের যাপিত জীবনের একান্ত  দুর্বলতা, ভয় এবং মানসিক ভাঙনও সমান গুরুত্ব পায়। ফলে উপন্যাসটি এক ধরনের মানবিক বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যায়, যেখানে যুদ্ধ কেবল গৌরবের ইতিহাস নয়, সেই সাথে মানুষের গভীর সংকটেরও ইতিহাস। এই দৃষ্টিকোণ থেকে চন্দ্রদাহকে স্বাধীনতা-পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যে ব্যতিক্রমী সংযোজন বলা যায়। কারণ এটি যুদ্ধকে কেবল ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দেখেনি; বরং একটি মানসিক অভিজ্ঞতা হিসেবে বিশ্লেষণ করেছে। যুদ্ধের পরবর্তী সমাজে মানুষ কীভাবে সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে বসবাস করে, কীভাবে স্মৃতি বাস্তবতার দ্বন্দ্বের মধ্যে নিজের পরিচয় খুঁজে পায়-এই প্রশ্নগুলোর উত্তর উপন্যাসটির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

এই উপন্যাসের শেষের দিকে হঠাৎ চমকে যেতে পারেন সচেতন পাঠক। সাবিত্রী আর রাসেলের প্রেমেরে পরিণতি জরুরি কিনা? প্রশ্ন অবান্তর মনে হলেও  শেষদিকে এমন একজন তাদের দুহাত এক করে দিলেন যিনি সবসময় চাইতেন বাংলার মানুষ এভাবেই সবসময় এক থাকুক, শান্তিতে থাকুক। এখানেই চরম এক সমাপ্তির দিকে এগিয়েছেন জিল্লুর রহমান শুভ্র।

স্বাধীনতার পরবর্তী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসগুলো এক অর্থে জাতির আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আমাদের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ, কিন্তু সেই ইতিহাসের ব্যাখ্যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। সাহিত্য এই পরিবর্তনকে গভীরভাবে ধারণ করে।এই উপন্যাসের শেষ অংশ এই মন্তব্যের পক্ষে সাক্ষ্য দেয়।

এই উপন্যাস প্রমাণ করে যে মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য এখন আর কেবল ঐতিহাসিক পুনর্কথন নয়; এটি মানুষের গভীর অস্তিত্বের নীরব অথচ গভীর অনুসন্ধান। যুদ্ধ মানুষের ভেতরে যে অদৃশ্য ক্ষত সৃষ্টি করে, সেই ক্ষতের ভাষা খুঁজে বেড়ানোই এই ধরনের সাহিত্যের প্রধান লক্ষ্য।

স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসগুলো একদিকে যেমন জাতির ইতিহাসকে ধারণ করে, অন্যদিকে তেমনি মানুষের অন্তর্জগতের গভীর সংকটকে প্রকাশ করে। এই দ্বৈত মাত্রাই এই সাহিত্যের শক্তি। আর সেই ধারার মধ্যেই জিল্লুর রহমান শুভ্রের চন্দ্রাহত উপন্যাস একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন, যা মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে নতুন মনস্তাত্ত্বিক প্রতীকী ব্যাখ্যার মাধ্যমে বাংলা উপন্যাসের ভুবনে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করবে এই বিশ্বাস সবসময়ের।

 চন্দ্রদাহ

জিল্লুর রহমান শুভ্র

প্রথম প্রকাশ: নভেম্বর ২০২৩

প্রকাশক: পুণ্ড্র প্রকাশ

প্রচ্ছদ: কাহাফ দীপ্র 



অলংকরণঃ তাইফ আদনান