নাসরীন জাহান একজন বিশিষ্ট গল্পকার ও ঔপন্যাসিক যার লেখায় সমাজের খুঁটিনাটি সবকিছু খুঁজে পাওয়া যায়। তার গল্প ও উপন্যাস গ্রামীণ আর শহরকেন্দ্রিক জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে। কখনো তার কথাসাহিত্য সরাসরি গ্রাম আর শহরের একটি তুলনা হিসেবে প্রতীয়মান হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস, গ্রামীণ প্রথা ও বৈষম্য, আধুনিক ও সেকেলে জীবনবোধের পার্থক্য, দেশীয় রাজনীতির ভেতর বাস্তবতা, মৌলবাদী শক্তির উত্থান ও রাজনৈতিক সহিংসতা যেমন তার বিভিন্ন লেখার প্রেক্ষাপটে উঠে এসেছে। আত্মসংকট, নারী-পুরুষের সম্পর্কের টানাপোড়েন, নারীর অবদমন, মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, সমকাম, অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা, মার্কসীয় দর্শন, পরকীয়া, মানবপ্রেম কোনোকিছুই তার লেখা থেকে বাদ যায়নি। জাদুবাস্তবতা সবসময়ই তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য।
তার বিভিন্ন লেখায় আমরা বিভিন্ন সামাজিক ঘটনার চিত্রায়ন দেখতে পাই। তার কলমে যেমন অনেকগুলো শক্তিশালী নারী চরিত্র উঠে এসেছে তেমনি তার সৃষ্ট পুরুষ চরিত্রগুলোর শক্তি কোনো অংশে কম নয়। এই বিষয়ে নাসরীন জাহান একটা সাক্ষাৎকারে বলেন,
“পুরুষ যখন নারীদের নিয়ে লেখে তখন সেটা চোখে পড়ে না খুব বেশি। কিন্তু আমি যখন নারী হিসেবে ‘পুরুষ’ চরিত্রগুলো লিখি তখন সেটা চোখে পড়ে। অথচ আমার পুরুষ চরিত্রগুলো কিন্তু ভিলেন হয় না। এরা রক্ত মাংসের মানুষ।”
কানামাছি কোন স্বপ্নে ছুট? (২০১৩) উপন্যাসটিতে নাসরীন জাহান এমন একটি চরিত্র তৈরি করেছেন যেটি আমাদের সমাজেরই একাংশকে ইঙ্গিত করে। শায়েদ চরিত্রটি নিয়ে তিনি একটি নীরিক্ষা করেছেন। বাংলাদেশের সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে একজন সমকামীর অস্তিত্ব সংকট, জীবনভাবনা আর প্রতিকূলতা তুলে ধরেছেন। শায়েদের জীবনের সমান্তরালে উঠে এসেছে বিভিন্ন সামাজিক অসঙ্গতি, গ্রাম্য বিচার ব্যাবস্থা, মনোদৈহিক সংকট, স্মৃতিকাতরতা, জীবনবোধ। “কানামাছি কোন স্বপ্নে ছুট?” একটি নিরীক্ষাধর্মী উপন্যাস। অতীত আর বর্তমানের সম্পূরক কাহিনীর ধারায় এই উপন্যাসের গতিশীলতা বজায় থাকে।
উপন্যাসের মূল চরিত্রই শায়েদ। অসুস্থ শায়েদের মনে উদিত ভাবনা সুস্থতা একটি বড় সুখ এরকমই এক জীবনবোধের মধ্য দিয়ে উপন্যাসের শুরু, সাথে লক্ষ্য করা যায় স্বাভাবিক দম্পতির মতো নবনীতার সাথে তার কথোপকথন।
শায়েদ এখন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজির অধ্যাপক। সে অসুস্থ ছিল কিছুদিন। অসুস্থতা একটু কাটিয়ে উঠতেই খবর পায় তার ছাত্রী ইসাবেলা অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। দোটানায় ভুগতে থাকে শায়েদ। নাসরীন জাহানের কলমে উঠে আসে শায়েদের ভীরুতা, সিদ্ধান্তহীনতা। তারপর উপন্যাসে আমরা আরেকটি চরিত্রের সন্ধান পাই। শায়েদের সবথেকে কাছের বন্ধু রানু। এক্ষেত্রে শায়েদের বক্তব্য,
“তুই-ই তো আমার একটা মস্ত স্বস্তির জায়গা। জবাবদিহি জাড়া যেখানে এক ফোঁটা দাঁড়াতে পারি...”
উপন্যাসে রানু গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র। বিভিন্ন ঘটনার বিশ্লেষণে আর শায়েদের খুবই ভালো বন্ধু হিসেবে চরিত্রটির বারবার দেখা পাওয়া যায়।
উপন্যাসের জায়গায় জায়গায় আমরা শায়েদের নিজ গ্রামের প্রতি কাতরতা দেখতে পাবো। মাঝেমধ্যেই সে শৈশবে হারিয়ে যায়। তার সোনালেখা গ্রামটি তার চারপাশে ঘুরতে থাকে। কিন্তু সোনালেখা থেকে বাস্তবে ফিরলেই ইসাবেলা নামক যন্ত্রণা তার জন্য ওঁত পেতে থাকে। ইসাবেলাকে শায়েদ তেমন বড় কোনো প্রসঙ্গ মনে করতে চায় না। কিন্তু স্যারের একতরফা প্রেমিকা হিসেবে ইসাবেলা এই উপন্যাসের একটি বড় চরিত্র হয়ে ওঠে। ইসাবেলার প্রেম মোহ আর এই ছেলেমানুষী আবেগের এই বাঁধন থেকে পালাতে চাইলেও নিজেকে বারবার এক দোটানায় খুঁজে পায় শায়েদ। হয়তো নিজেরই প্রতিরূপ দেখে সে, আরেকটা শায়েদকে যখন সেই শায়েদও ছিল ইসাবেলার মতো একগুঁয়ে। নিজের অতীতে ফিরে দেখে নিজেকে। উজ্জ্বল ভালো স্টুডেন্ট ছিল শায়েদ। কলেজে কবিতার নেশায় ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার সব ছেড়ে যখন শহরে চলে আসে তখন থেকেই তার মূল জীবন শুরু হয়। প্রথমে এক দুঃসম্পর্কের মামার সাথে থাকলেও সেই মামাও বিদায় নেয়। তখনই শায়েদের সাথে ওয়াহিদ এর দেখা হয়। শায়েদের ভার্সিটি জীবনের প্রেমিক সে। তাদের এই প্রেমের শুরু আকস্মিক। শায়েদের জীবনে তার আবির্ভাবও আকস্মিক ছিল। সবকিছু ছেড়ে ঢাকায় শায়েদ যখন একদম নতুন, মামার দেয়া থাকার জায়গাটাও যায় যায় তখনই ওয়াহিদ তাকে নিয়ে নিজের হোস্টেলে ওঠে। সেখান থেকে বন্ধুত্ব। তাদের বন্ধুত্বেই প্রেমের শুরু। দুজনে মিলে একসাথে থাকা, গল্প-আড্ডা-কবিতা। ফর্সা চেহারায় তামাটে রঙের বিশালদেহী পুরুষ ওয়াহিদ। মুখে চাপদাড়ি, মাথায় কোঁকড়ানো নজরুল চুল। পরিচিতির প্রথমে ওয়াহিদের ঝাঁঝালো ব্যাক্তিত্বের সামনে শায়েদ নিজেকে রীতিমতো কুনোব্যাঙ মনে করেছিল। কিন্তু দিন গড়িয়ে শায়েদ আবার লেখায় মন দেয়। একদিনের মনোমালিন্যে দুজনে ঠিক করে হোস্টেলের ছোট্ট রুম ছেড়ে বাইরে কোথাও উঠবে। পরে একটি ফ্ল্যাট পেয়ে ওরা দুজনে বাস করতে থাকল।
মেয়েরা প্রায়ই এই সুদর্শন ওয়াহিদের প্রেমে মগ্ন হতো, ওয়াহিদের ওদিকে অবশ্য উত্তাপ ছিলো না।
“গান বাজনা কবিতা... এই জগতে ডুবে থেকে সে অদ্ভুত আকুলময় হাত বাড়াতো স্রেফ, শায়েদের দিকেই।”
তাদের প্রেমের উপলব্ধি সহজে হয়নি। বন্ধুত্বে ছিল প্রবল আকর্ষণ এক অন্য মোহ। তাদের এই মিষ্টি সম্পর্ক নিয়ে গুঞ্জন উপন্যাস থেকে,
"ওয়াহিদের সান্নিধ্যের মোহ এতই চুম্বকময় ছিল যে, ওর সঙ্গে কিছু করতেই শায়েদের অন্য তরঙ্গ অন্য মজা... ভিন্নভাবে পৃথিবীকে দেখা...তেতো গন্ধময় বিষাদে চুরচুর হয়ে ফ্ল্যাটে এসে যখন বমি করছে শায়েদ... ওয়াহিদ তার বমি পরিষ্কার করিয়ে সাফসুতরা করে ঘুম পাড়িয়ে সকালে নিজ হাতে বানানো লেবু চা হাতে দাঁড়িয়ে বলত, খেয়ে নাও... মাথা ধরা সেরে যাবে। "
শায়েদ পরে লক্ষ্য করে যে ওর সঙ্গে সান্নিধ্যের পর ওয়াহিদ অন্যদের সান্নিধ্য এড়িয়ে চলছে।
নাসরীন জাহান উপন্যাসে ওয়াহিদ চরিত্রের সঙ্গে মাইকেল মধুসূদন দত্তের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ওয়াহিদ চরিত্রটি তৈরিতে ওয়াহিদের নিজের সম্পর্কে এমন ধারণা ওয়াহিদের সমকামী চরিত্রটিকে আরো শক্তিশালী করে।
ওয়াহিদ আর শায়েদের সম্পর্ক নিয়ে গভীর বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন,
“যৌবনকে আটকায় কে? এর মাঝেও সেক্স হতো। রাত বাড়তে থাকলে, শিশ্নের লম্ফঝম্ফনে অস্থির হয়ে কেউ কেউ কেটে পড়ত হয় কান্দুপট্টি... নয়... এক রাতে দেখা গেল কেউ নেই পাশে; কাঁচা ভোরে আধনগ্ন হয়ে জড়াজড়ি করে পড়ে আছে ওয়াহিদ আর শায়েদ।”
সেদিন ভোরে চোখ মেলে দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে কী অনুভব করেছিল, কী দেখেছিল সে নিয়েও প্রশ্ন আছে। শায়েদ ছিল উভচারী কিংবা নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা সমকামী পুরুষ। এক্ষেত্রে একটি ঘটনার পুনরাবৃত্তি করতে হয়,
“মেথরপট্টিতে ক্রমশ বিষয়টার সামনে স্পষ্ট হয়ে দাঁড়াতে থাকে শায়েদ, ওয়াহিদ, সেই ভোরে তুমুল আবেগে এক দুর্লভ কম্পমান মুহূর্তে শায়েদকে উল্টে দিয়ে প্রবল প্রেম আবেগে অদ্ভুত শরীর আনন্দের দিশেহারা ঘোরে ওয়াহিদ তাকেও তা-ই করতে দিয়েছিল। দুজন যখন পুরো নেতিয়ে পড়েছে, মদঘোরের ঘুম তখন তাদের ছেয়ে ধরেছিল... যখন চারপাশ ধীরে ধীরে ফকফকা আচমকা একেবারে বারান্দার সামনে ঘাসের ওপর আসমানের নিচে নিজেদের এই প্রায় উলঙ্গ রূপ দেখে তীব্র লজ্জায়, দুজনে বলা যায় ক্ষয়ে গিয়েছিল।”
তখনই শায়েদ বলে ওঠে,
“না... আমি সৃষ্টিকর্তার পাঠানো নরনারীর সম্পর্কিত চরিত্রের বাইরে আমার আকাঙ্ক্ষার কোনো প্রবণতাকে গ্রহণ করব না। পাত্তা দেব না।”
কিন্তু ভার্সিটিতে উঠে ওয়াহিদের সান্নিধ্যেই এমনটা প্রথম ঘটে নি। এর আগেও কলেজে, বিজয় দিবসে কলেজে সদ্য ভর্তি হওয়া এক কিশোরের উদ্দাম নৃত্যে আমূল আগুন ধরা অনুভূতিতে কেঁপেছিল সে, সেই নর্তকের বাচনভঙ্গি চাহনিতে কম্পিত শায়েদ যখন নিজ বিছানায় রাতে কাম তাড়নায় ছটফট করতে করতে নিজের এহেন প্রকৃতিতে ভীত বিপর্যস্ত বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে, তখন তাদের বাড়ির বয়স্ক কাজের বুয়ার রঙিলা মেয়েটির মধ্যে নিজেকে উল্টেপাল্টে উজাড় করে শায়েদের নিস্তার হয়।
শায়েদ আর ওয়াহিদের সম্পর্ক স্থায়ী হয়নি। শায়েদ ওয়াহিদকে যখন ত্যাগ করে, ওয়াহিদ এক সিদ্ধান্তেই এদেশ ছেড়ে আমেরিকা চলে যায়। এদেশে শায়েদ নিজের এক অন্য সমাজ স্বীকৃত অস্তিত্ব তৈরি করতে থাকে। এক বাচ্চার ডিভোর্সি মা নবনীতাকে বিয়ে করে। বিয়ের পর সংসার তৈরি করে। সময় এগিয়ে চলে, বয়স বাড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সময়ই তার প্রেমে পড়ে ইসাবেলা। ইসাবেলার পাগলামোর মাধ্যমে আবার দেখা হয় সেই ওয়াহিদের সঙ্গে। শায়েদের মিশ্র অনুভূতি আর দ্বৈত সত্তার একটা পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছে এই উপন্যাসে।
ইসাবেলাকে দেখতে যখন ওয়াহিদ হসপিটালে তখন তার সাথে শায়েদের দেখা হয় আবার। ওয়াহিদের বয়সও বেড়েছে, মাথার চুল কমেছে। কিন্তু শায়েদের মধ্যে আবার মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে উপন্যাস জুড়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে শায়েদের অস্তিত্ব সংকট প্রকাশ পায়। নিজের খেয়ালে হারিয়ে যায় সে। কল্পনায় পাক খায়, কখনো উদ্দাম চুল ঝাঁকিয়ে অরণ্য উজাড় করে কবিতা পাঠরত ওয়াহিদে, কখনো স্নিগ্ধ শায়িত ইসাবেলায়।
নিজের বিবাহিতা স্ত্রী নবনীতাকে নিয়েও দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে সে।
নিজেকে প্রশ্ন করে সে,
“আমি কে? হেই আমি কে?
উভচারী!
তবে কেন ওয়াহিদ অত টানে, নবনীতা নয়?
না টানলে পৃথিবী পেছনে ফেলে গেলাম কেন ওর কাছে?”
নিজের আবরণ আরো খসে পড়ে ওয়াহিদের সঙ্গে ইসাবেলার সম্পর্ক জানার পর। এতদিন ইসাবেলার প্রতি কখনোই নিজকন্যারূপ কোনো আবেগ কাজ করেনি, কখনো ছাত্রী কখনোবা প্রণয়প্রার্থীই মনে হয়েছে। কিন্তু ওয়াহিদকে ওর গার্জেন রূপে মানতে এতো কষ্ট হচ্ছে কেন।
কতবছর হয়ে গেছে তাদের সম্পর্কের। এখন এই যে মানুষের এত আধুনিকতার বদল, এই প্রযুক্তির উন্মাতাল বিবর্তন যুগে ছেলেমেয়েরা তাদের সাথে অমানানশীল বিষয়ও গ্রহণ করছে, নিজের রুচি মর্জিকে প্রাধান্য দিয়ে তাচ্ছিল্য করছে কত সমাজে বানানো রীতি, তারপরও... এ দেশে এখনো কোনো পুরুষ বা মেয়ে যুগল প্রকাশ্যে ‘আমরা সমকামী’ বলে একসঙ্গে বাস করতে পারে?
পাশ্চাত্যে এমন অনেক যুগল প্রকাশ্যে একসাথে বসে করে। কোনো কোনো দেশ তাদের বিয়েরও অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু মুহূর্তে পাশ্চাত্যকে গ্রহণ করা এদেশের কেউই এমন সম্পর্কে এখনো নিদারুণ লজ্জাতুর থাকে। এদেশের মানুষ অবশ্য এ ব্যাপারে সচেতন হয়েছে, যত সচেতন, তত গোপন, তত আড়াল।
শায়েদের এমন ভাবনায় তার নিজের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন ওঠে, ওয়াহিদকে ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত ঠিক ছিলো কী? আবার নিজের বর্তমান অবস্থাকে জাস্টিফাই করার প্রবণতাও দেখা দেয়।
নিজেকে নিয়ে সবসময়ই ভয় পেতো সে, কিন্তু এই উপলব্ধির পর শায়েদ তার এক সুখী দম্পতি চাচা-চাচিকে লক্ষ করেছে, চাচা যে বালক বা পুরুষদের ব্যাপারে আলাদা রকমের আগ্রহী-এ চাচির চিন্তাবোধের মধ্যেই নেই। দাম্পত্যে যাওয়ার আগে এরপরই ভরসা পেয়েছে শায়েদ, যে, নিজেকে নিয়ে এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
নাসরীন জাহান এখানে একাধারে সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, শায়েদ চরিত্রটি তৈরির মধ্য দিয়ে যেমন অস্তিত্ব সংকট তুলে ধরেছেন, তেমনি লিখেছেন সমাজের অবহেলিত বাস্তবতা, গোঁড়ামি আর সংকীর্ণতা।
শায়েদ চরিত্রটি এরকম সংকীর্ণ সমাজেরই ফল। তবে চরিত্রটি আরো ভেঙ্গে যায় ইসাবেলার আত্মহত্যার চেষ্টার পর ওয়াহিদ তার সঙ্গে সরাসরি দেখা করে। এখানে ওয়াহিদের যৌনতার খোলামেলা পরিচয় পাওয়া যায়।
ওয়াহিদ পুরোদমে সমকামী একটি চরিত্র। নিজের অস্তিত্ব নিয়ে সে অবহিত এবং যথেষ্ট দৃঢ়। শায়েদের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর সে আমেরিকায় গিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো অনেকদিন একাকী ঘুরেছে। শেষে একজন বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে লিভ টুগেদার করছে দশ বছর। কিছু মাস আগে তারা বিয়ে করেছে। এখন ওকে কেন্দ্র করে ইংরেজি কবিতাও লেখে সে।
এরপরই সে শায়েদকে প্রশ্ন করে,
“এতদিন পর আসলে তোমার জীবন, মন বিবর্তন সম্পর্কে জানি না, তুমি সমকামীদের সম্পর্কটাকে সাপোর্ট করো? এদেশে তো এ নিয়ে কথাই বলা যায় না।”
শায়েদ উত্তর দেয়,
“এর সাথে যুক্ত থাকে দুজন মানুষের গভীর প্রেম। একজন ব্যক্তি জন্ম থেকে যদি হিজড়া হয়ে জন্মায়, বড় হতে থাকলে তাকে নিয়ে কেউ বলবে হিজড়াকে সাপোর্ট করো কি না? আহা অসহিষ্ণু হয়ো না ওয়াহিদ, এটা মোটা দাগে বোঝানোর জন্য বলা। কোনো মেয়ে বা ছেলে জন্মের পর বড় হতে হতে যদি আবিষ্কার করে সমলিঙ্গের প্রতিই তার মূল আকর্ষণ, বিপরীতে তার মধ্যে রোমান্সই জন্মে না, তাতে একটা সামাজিক বিচ্যুতি ঘটে। কিন্তু যা সে নিজে বানায় নি, তার সত্তার সে সৃষ্টির ব্যাপারে যার হাত নেই তাকে আমার উদার মন বুঝবে, গ্রহণ করবে, আমি এভাবেই বুঝি।”
পুরো উপন্যাস পড়ে শায়েদের উত্তর স্ববিরোধী মনে হয়েছে আমার। নয়তো এক সংকীর্ণ সমাজ আর পরিস্থিতির স্বীকার সে।
এরপরই ওয়াহিদ শায়েদের হাত ধরেছিল। শায়েদও তার পুরনো প্রেমিকের সাক্ষাতে কাঁপছিল। বুক ঠেলে কান্না আসছিল শায়েদের। কিন্তু শায়েদের চূড়ান্ত ভাঙন ধরে যখন সে নিজের স্ত্রী নবনীতার পরকীয়া সম্পর্কে জানতে পারে। নবনীতার বিয়ের পরও কয়েকবার তার প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে গেছে। শায়েদকে ছিন্ন করে চূড়ান্ত প্রশ্ন,
“বিছানায় স্ত্রীর সাথে অক্ষম হলে বিয়ে করলেন কেন? কাজের মানুষ রাখতেন? আপনি কী ভাই?”
এতে শায়েদের পুরুষত্বে ফাটল ধরে। নিজেকে সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলে সে। ওয়াহিদকে ত্যাগ করে নিজের সত্তাকে বিসর্জন দিয়ে সে যেই সমাজ স্বীকৃত ইমেজ তৈরি করেছিল সেটাও নষ্ট হয়ে যেতে থাকে। নিজেকে সে খুঁজে বেড়ায় প্রকৃতির মাঝে শুধুই জীবন্ত মানুষ হিসেবে, নিজের সোনালেখা গ্রামে।
মানুষ খুবই জটিল। মানুষের নির্মাণ আরো জটিল। একইভাবে মানুষের সেক্সুয়ালিটি বাইনারিতে আবদ্ধ সহজ কোনো বিষয়ও নয়। যতই আমরা অস্বীকার করি সমাজে সমকামী, উভকামী, হিজড়াদের অস্তিত্ব সবসময় ছিল এখনো আছে। আমাদের সমাজ বাস্তবতার প্রেক্ষিতে আমাদের সাহিত্যে তাঁরা প্রায় অদৃশ্য। নাসরীন জাহানের এই উপন্যাসটি সেদিকে গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। এর আগে অভিজিৎ রায়ের এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ বের হয়েছিল ২০১০ সালে। সমকামিতা- একটি ননফিকশন বই ছিল। আবার আল মাহমুদের ‘পুরুষ সুন্দর’- এ নারী সমকামের এক বাস্তবভিত্তিক আখ্যান রয়েছে। অপার বাংলায় স্বপ্নময় চক্রবর্তী সেক্সুয়ালিটি এবং জেন্ডারের উপর বিষদ গবেষণা করে লিখেছেন ‘হলদে গোলাপ’।
‘কানামাছি কোন স্বপ্নে ছুট’ উপন্যাসটি শায়েদ চরিত্রটির মধ্যে দিয়ে অনেক কিছু তুলে ধরেছে। পুরুষত্বের বাইনারি ধারণায় আঘাত করেছে। চরিত্রটিতে ফ্রয়েডীয় তত্ত্বের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। ফ্রয়েডের Psychosexual Development তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের যৌনতা শৈশব থেকেই গড়ে ওঠে এবং এতে দ্বৈত প্রবণতা থাকে (পুরুষ ও নারী উভয়ের প্রতি আকর্ষণ) যেটা শায়েদ চরিত্রটির ক্ষেত্রে স্পষ্ট।
আবার ওয়াহিদ চরিত্রটি স্বজ্ঞাত সমকামী চরিত্র এবং এটি পাশ্চাত্য দুনিয়ার সমকামীদের সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেয়। ২০১৩ সালের বইমেলায় বইটি অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়। সেই হিসেবে বইটি তার সময়ের অনেক এগিয়ে।
ব্যাক্তিগত ভাবে উপন্যাসটি সাবলীল ও আকর্ষণীয় লেগেছে। নাসরীন জাহানের লেখার সঙ্গে পরিচয় থাকায় তাঁর অন্যান্য লেখার থেকে এই উপন্যাসটি ভিন্ন মনে হয়েছে। গ্রিক মিথোলজির যথাযথ প্রয়োগ উপন্যাসটাকে আরো গতিশীল করেছে। শায়েদ চরিত্রটির অস্তিত্ব সংকট পুরো উপন্যাস জুড়ে আকর্ষণ ধরে রাখলেও, বেশি নাটকীয় মনে হয়েছে। উপন্যাসটি আকারে আরো বড় হলে প্লেটগুলো আরো সুন্দর এবং নাটকীয়তা তার রেশ ফেলতে পারতো পাঠকের উপর। মাত্র ৮৮ পৃষ্ঠার মধ্যে শেষ হওয়া উপন্যাসটি আমকে সম্পূর্ণ তৃপ্ত করতে পারে নি। বাংলায় এরকম ভিন্নধর্মী সাহসী উপন্যাস লেখার জন্য লেখিকার প্রশংসা করতেই হয়।
জেন্ডার রোল আর সেক্সুয়ালিটির বিবিধে একটি দারুন ফিকশন এই উপন্যাসটি। সমাজের সমকামী ও উভকামী মানুষের অস্তিত্ব তুলে ধরতে বইটি সার্থক। আমাদের সমাজের অসংগতি, গোঁড়ামি আর সংকীর্ণতা প্রকাশেও বইটি সফল। সবশেষে বলতে চাই বইটি ইন্টারেস্টিং এবং সুখপাঠ্য ছিল।
অলংকরণঃ তাইফ আদনান
