জলধি
/ পাঠ-পর্যালোচনা
/ কবি মেহেদী ইকবাল এর কাব্যগ্রন্থ "কী আমি রোপণ করে যাচ্ছি"
কবি মেহেদী ইকবাল এর কাব্যগ্রন্থ "কী আমি রোপণ করে যাচ্ছি"
" আমরা যে যার মতো কুকুর, বেড়াল আর শুকর হয়ে আছি... কোথায় মানুষ পাব? না যদি থাকে হায় মানুষের সমাজ"
( কবিতাঃ"'সিজোফ্রেনিকেরা কেনো তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে")।
- এ আসলে যতোটা সহজীয়া রুপে ব্যক্ত ঠিক ততোটা কাঠিন্যতায় অব্যক্ত ভ্রুকুটি বর্তমান সমাজ ও সংস্কৃতির দিকভ্রান্ত বক্ররেখার প্রতি। সত্য সুন্দর আর কল্যাণময় সমাজ গঠনের তীব্র এষণা থেকে সমাজ সভ্যতার দিকে ছুটে চলা মানুষ হঠাৎ কী করে বিপ্রতীপতায় ঢুকে পড়লো তার তীর্যক প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন কবি। সাথে সাথে মানুষের মতো মানুষ না পাওয়ার হাহাকারের নীলাভ রঙ মেখে দিলেন পাঠকের মগ্ন চৈতন্যে।
উপরোক্ত পংক্তিগুলো কবি মেহেদী ইকবাল এর "কী আমি রোপণ করে যাচ্ছি " কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া ।
কবি এক সরল অথচ গভীর বয়ানে সমাজের এই বিকৃত মানসিকতাকে প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করেন। তাঁর কবিতা আমাদের চোখ খুলে দিতে চায়—কেবল উপলব্ধির জন্যই নয়, নতুন সম্ভাবনার জন্যও। এই'ই হয়তো কবি তার সংরক্ত আবেগে লীলায়িত করতে চেয়েছেন সহজীয়া ভাষার নিপুণতায়।
আধুনিক বাংলা কবিতার বাঁক বদলের পলে অনুপলে কবিতার ভাব ভাষা প্রকার ও প্রকরণে পরিবর্তন অলংঘনীয় ও অনস্বীকার্য । এই পরিবর্তনের তালে ও বৈতালে অনেক কবিই বিবিক্তিতে বিলীন । আধুনিক থেকে উত্তরাধুনিক পর্যায়ে প্রবেশের অভিযোজন কৃৎকৌশল প্রক্রিয়ায় কবি এখনও সদর্পে ও স্বকীয়তায় প্রোজ্জল।
কবি মেহেদী ইকবাল আশির দশকের কবি হলেও তার কবিতাকে তিনি সেই সময়ের অস্থির চিন্তা, দ্বিধান্বিত চেতনা, আর সংশয়বাদী বিশ্বাস থেকে দূরে রেখেছেন। তিনি যা বিশ্বাস করেন তাই অকপটে বলে গেছেন তার কবিতায় তার নিজস্ব ভাষায়। মুক্তিযুদ্ধোত্তর স্বাধীন দেশের মানুষের মোহভঙ্গ, সমাজে পাওয়া না পাওয়ার হতাশা, রাজনৈতিক চেতনার বিপরীত মেরুকরণ, বিপ্লব, প্রতিবিপ্লব, বিদ্রোহ, এক মনস্তাত্ত্বিক সংকট, কালের থাবায় নিপীড়িত নিষ্পেষিত জনতার দীর্ঘশ্বাস; তার সচেতনেই তার কবিত্বকে স্পর্শ করেছে। তিনি দেশ ও সমাজের সংকট আর মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সংকটকে একরৈখিক করতে চেয়েছেন এবং তা তার নতুন আত্মবিশ্বাস আর নিজস্ব ভাষাশৈলী দিয়ে ।
" কী আমি রোপণ করে যাচ্ছি " কবি মেহেদী ইকবালের পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ। যা একুশে বইমেলা ২০২৪ এ প্রকাশিত হয়েছে। এ গ্রন্থে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের কবিতা রয়েছে। বেশ কিছু কবিতাই সচেতন পাঠকের শুধু দৃষ্টি আকর্ষণ নয় তাদের আত্মিক ঘুম ভাঙাতে সাহায্য করবে। তেমনি একটি কবিতার কয়েকটি ছত্র এমনঃ -
" আমি উর্বরতার গন্ধ পাচ্ছি, আমার হাতে বেড়ালের বীজ / আমি আসলে রোপণ করে যাচ্ছি কয়েকটি বেড়াল "।
কবির ভবিষ্যতের আশংকা এই নয় যে, এখানে শুধু পশুর জন্ম হবে, কবির গভীর চিন্তা এও না,যে একদিন এখানে সভ্যতার পতন হবে, এখানে অসভ্যতাকেই নতুন সভ্যতা বলে চালিয়ে দেওয়া হতে পারে, এই হচ্ছে কবির অভিযোগ-অনুযোগ । কারণ আমরা ভবিষ্যতের জন্য শুধু নয় বর্তমানেও একে অপরের জন্য রোপণ করে যাচ্ছি পশুত্বের বীজ মানুষের বীজরুপে । এখানেই কবির কাব্যগ্রন্থ " কী আমি রোপণ করে যাচ্ছি " নামকরণের সারাৎসার ও স্বার্থকতার মহিমা।
কবি জীবনের বহুবর্ণা অনুভূতির রং ও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অনুভূতিগুলো মুক্তছন্দে সময়ের বিন্দুতে উল্লম্বভাবে দাঁড় করিয়েছেন সহজবোধ্য ভাষায় তার কাব্যগ্রন্থে। না। দুরূহ বা দুর্বোধ্য শব্দের উল্লম্ফন তার কবিতায় নেই, নেই উচ্চমার্গীয় ভাব ও দর্শনের প্রগলভতা। আছে ভাবের অন্তঃসার, বিষয়বস্তুর বৈচিত্রময় বহুমুখীনতা, আছে সুন্দরতা, বিষয়ের মর্মভেদী প্রতিন্যাস। প্রকার ও প্রকরণে স্বোপার্জিত বিশ্বাসের লীলায়নে সংরক্ত আবেগ এবং নতুন ভাষার ভিন্নমাত্রিকতার শিল্পিত রুপায়ন। যেমন কবি বলেছেনঃ-
" আছি তো বোকাই আজো / দম কলস/ প্রতিদিন খাচ্ছি ডট তিন কলস "( কবিতাঃ দম কলস),
অথবাঃ- " দুনিয়ায় এতো গর্ত থাকতে / কেনো আমরা তত্ত্ব খুঁজি ব্ল্যাকহোলের "( কবিতাঃ মোরগগুলো কেনো চেঁচায় ভোর না হতেই)।
" যখন শেকড় কাটা হয় তখন আমরা চুপ থাকি চুপ / তখন আমরা বলিনা কিছুই "।
(কবিতাঃ " যখন শেকড় কাটা হয়")
হ্যাঁ, আত্মহননে মগ্ন এ জাতি। আমাদের যে গুঢ় সীমাবদ্ধতা আমাদের ব্যক্তি, পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রকে কুরে কুরে খায় তার চমৎকার বয়ান করেছেন মাত্র দুটো ছত্রে। আমরা আসলে স্বঘোষিত গিনিপিগ জাতিও। যখন বিষবৃক্ষ রোপণ করা হয় তখন আমরা দেখেও না দেখার ভান করি, যখন বিষবৃক্ষে লালন পালন করা হয় তখনও প্রতিবাদ করিনা। যখন তার ফলাফলে জাতির উপর দুর্যোগ দুর্বিপাক নেমে আসে তখন আমরা হৈ হৈ রৈ রৈ শুরু করে দিই। সমস্যা সমাধানের জন্য হুজুগে হুমড়ি খেয়ে পড়ি। সমস্যার একটা অস্থায়ী সমাধান করে আবার যে যার মতো ঘরে ফিরে যাই। অর্থ্যাৎ সমাজের ক্ষতস্থানে মলম দিয়ে আপাত উপশম করি কিন্তু স্থায়ী সমাধান দেয়ার প্রজ্ঞা বা সদিচ্ছা কোনোটাই আমাদের নেই। কবি আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় রোগের ডায়গনোসিস করার চেষ্টা করেছেন যা পাঠকের সাথে কুটুম্বিতা তৈরির পথ স্বনির্মাণ করেছেন সশব্দে।
কবি মেহেদী ইকবাল এর কাব্যভাষা সরল হলেও, এর ভেতরকার গভীরতার পাঠ চিরস্থায়ী।
তাঁর শব্দচয়ন বুদ্ধিদীপ্ত, যা পাঠককে এক গভীর অভিজ্ঞান দান করে। কবিতায় শুধু যে শব্দের খেলায় পরিশ্রমী হাতুড়ি, শাবল, গাইতি চালায়ে শিল্পের সুষমায় সুশোভিত করেছেন তাই নয়, তার কবিতা বলার স্বকীয় সুর ও স্বর আছে। একেবারে নতুন ভাষার সৌকর্য তার কবিতাকে অনন্য পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। তার ভাব ও দর্শনে বিপ্রতীপ ভাষা আপেক্ষিকভাবে আংশিক ফোটে উঠলেও সমগ্রতায় তা লীণ হয়ে গেছে সম্পৃক্ত দ্রবণের মতো। অতিপৃক্ততা তার কবিতায় খুব বেশী একটা চোখে পরেনা। যেমন কবি বলেছেনঃ
" আমি কড়া নাড়ছি - কড়া নাড়ছি / আমি কড়া নেড়েই যাচ্ছি, দরজা খুলছেনা কেন?
" ( কবিতাঃ আনারস)
এ কড়া কীসের কড়া, এ কীসের জাগৃতি ? এ আসলে পবিত্র আত্মার জাগরণের আবাহন। কবির এষণা ও প্রেষণা সমাজ সংসার আর মানুষের মানস সরোবরে। এই পঙক্তিগুলোতে কবি সমাজের বদ্ধ চিন্তাভাবনার দরজা খোলার আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরেন। ভদ্রলোকের ভদ্রতার সীমানা দেয়াল পর্যন্ত। এ প্রবাদ প্রবচন এখন অচল মুদ্রা। ভদ্রলোকের পিঠ দেয়ালে ঠেকে ঠেকে দেয়ালের ভিতরেই প্রবেশ করেছে ভদ্রলোক টেরই পায়নি। সমাজ যখন সর্বংসহা মাটির মতো নীরব নিস্তব্ধ হয়ে যায়, সমাজের পরতে পরতে যখন অন্ধকার রাজত্ব করে তখন সেই অন্ধকার থিতু হয়ে যায়। ভদ্রলোকেরা তখন দুষ্ট লোকদের কাঁধে দোষ দিয়ে নিরাপদে নিজস্ব ঘরে গিয়ে ধর্মের জপমালা জপে।যা সমাজ পরিবর্তনে অর্থহীন। সমাজের সকলেই তখন দ্বিচারিতা উদযাপন করে। কবি তখন বসে থাকতে পারেন না। সমাজ যখন নিজের সংকীর্ণতায় ডুবে থাকে, তখন কবির কড়া নাড়া, এ এক জাগরণের বার্তা।
আমাদের গর্বিত ইতিহাস, ঐতিহ্য, সার্বজনীন পারিবারিক ও সামাজিক শক্তিশালী বন্ধনের সংস্কৃতিকে নবায়ন করে ফিরিয়ে আনার প্রবল আকাঙ্খা কবির কবিতায় লক্ষ্য করা যায়। এ জন্যই কবি বলেছেন এভাবে ;
" ইতিহাস নিয়ে কথা হচ্ছে / ইতিহাস মানে দুবেলা দুমুঠো ভাত " ( কবিতাঃ ভাত)
বাঙালির ইতিহাসে ভাত শব্দটি শুধু একটা গূঢ় শব্দ নয় এ যেনো জীবনীসুধা। যে শব্দের সাথে জড়িয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাসের স্মারক লিপি। এ ভাত শুধু ভাত নয়, এ হলো বাঙালি সংস্কৃতির মূল শিকড়। বাঙালির চাওয়া পাওয়া একসময় সীমাবদ্ধ ছিলো গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছে। মোটা ভাত আর মোটা কাপড়েই বাঙালির চলতো। দিনশেষে কর্মক্লান্ত মানুষ দরোজা জানালা খুলে শান্তির নিদ্রায় যেতো। কিন্তু যখনই বর্গী এলো তখনই বাঙালির স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হলো। ধীরে ধীর বাঙালির ভাতের অধিকারের উপর আক্রমন হলো । এই ভাতের অধিকার আদায় করতে গিয়েই বাঙালির জাত্যাভিমান, বাঙালির অবিকশিত জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ও বাঙালি সংস্কৃতির উদ্ভাস। মূলত জীবন ও জীবীকার স্বাধীকার অর্জনের সংগ্রামেই বাঙালির জীবনে মুক্তির যুদ্ধ। 'ভাত' এখানে বাঙালির বোধ সোধের সফল স্তরান্তরের স্বার্থক রুপক হিসাবে চমৎকারভাবে ব্যবহৃত হয়েছে যা পাঠককে ইতিহাসের সাথে সম্পর্কজাল তৈরী করতে সহায়তা করবে।
আমরা নিজেরাই নিজেদের পথ বন্ধ করে দিয়েছি যা আমাদের জাতিগত চরিত্রের এক অনির্ণেয় দিককে চিহ্নিত করেছেন কবি তার কবিতায় এভাবে ; " পথ, পথগুলো নিয়ে কোথায় যে হারিয়ে গেলো" ( কবিতাঃকুমড়ো)
মানুষ পথ তৈরি করে চলার জন্য থেমে থাকার জন্য নয় বা হারিয়ে যাওয়ার জন্য নয়। আমরা সকলে মিলে সকলের আগে যাওয়ার জন্য, পাওয়ার জন্য বিশৃঙ্খল ভাবে দৌড়াচ্ছি । সবাই এক ইতর প্রতিযোগীতায় লিপ্ত। আমরা আসলে কেউ কাউকে চলার পথ তৈরি না করে সবাই আগে যাওয়ার জন্য সকলে মিলে সকলের পথ বন্ধ করে দিচ্ছি। অথচ পথ তৈরী হয় সকলের চলার জন্য। তাই কবি আক্ষেপে বলেছেন পথ পথগুলোকে নিয়ে হারিয়ে গেছে। আমাদের সম্মুখবর্তী হওয়ার খুব বেশী পথ আর খোলা নেই।
কবির আরেকটি কবিতা 'মেলা '।
প্রকৃত ময়ূরগুলো এখন আর যাচ্ছেনা চেনা (কবিতাঃ মেলা)
প্রকৃতি থেকেই আসে প্রকৃত বা আসল। সর্বক্ষেত্রে প্রকৃতির বিরুপতার সাথে মানুষের চরিত্রের সমিল বিরাজমান। আজ কোথাও আসলের কোনো চিহ্ন মাত্র নেই। নকলে সয়লাব হয়ে গেছে সমাজ সংসার সংস্কৃতি। সত্যের আকাশ ডুবে গেছে, মিথ্যের আকাশে ঝল ঝল করে তারার মেলা। সুন্দরের জায়গা দখল করেছে অসুরেরা, আর মঙ্গলের স্থলে অভিষিক্ত হয়েছে অমঙ্গল, ন্যায়ের পথে কাঁটা হয়ে বসেছে অন্যায়ের স্রোত৷ তাই সত্য, মিথ্যে, ন্যায়, অন্যায়, মঙ্গল, অমঙ্গল, আসল, নকল সব মিলে মিশে একাকার। কোনটা আসল কোনটা নকল সব ধোঁয়াশার মতো মনে হচ্ছে। সত্য সুন্দর আর কল্যাণকে চিহ্নিত করা যাচ্ছেনা। বর্তমান সমাজের এই কর্কট রোগকে সঠিকভাবে তুলে ধরেছেন পাঠকের কাছে ।
" শিলপাটা না থাকুক, আগে যেমন
এখনও হচ্ছি পিষ্ট অদৃশ্য শিলপাটায় "
( কবিতাঃ শিলপাটা)
ঔপনিবেশবাদ যেমন এদেশের মানুষকে অত্যাচার অবিচার নির্যাতন করেছে শারিরীক ও মানসিক রাজনৈতিক ও অর্থনীতির বেড়াজালে ফেলে, ঠিক তেমনি নিপীড়ন আজও বহাল তবিয়তে আছে ভিন্নরুপে ও ভিন্ন ঢংএ। যদিও দেশের আমজনতা ঔপনিবেশবাদ তাড়িয়েছে রক্ত দিয়ে, স্বাধীনতা অর্জন করেছে রক্ত দিয়ে। তবুও গণতন্ত্রের নামে নব্য ঔপনিবেশীকতাই চালু আছে রাজনীতির ধ্বজা ধরে। আর মানুষ সে সময় যেভাবে অত্যাচার আর নির্যাতনে পিষ্ট হয়েছে এখনও পিষ্ট হচ্ছে, শুধু উপরিকাঠামোটা পরিবর্তন হয়েছে।
তাইতো কবি বলতে চেয়েছেনআদি শিলপাটার সাথে তুলনা করে, সমাজ বা রাষ্ট্রের শাসকের পরিবর্তন হলেও শোষন ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন হয়নি । তাই কবি প্রচন্ড আক্ষেপে ব্যাষ্টিক দুঃখ কষ্ট যন্ত্রনাকে দেখেছেন স্বদেশের চোখে মুখে, কবি বলেছেনঃ
" দেখি ব্যথাদীর্ণ লজ্জিত মুখ বাংলাদেশের”—এই পঙক্তিতে তিনি বাংলাদেশের দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলেছেন। সমাজ ও রাষ্ট্রের চরম নৈতিক অবক্ষয়ের কথা অকপটে বলেতে একটুও দ্বিধা করেননি।
এই অবক্ষয়ের মাঝেও কবির প্রত্যাশা একদিন মুক্তির সূচনা ঘটবে। এ দুঃস্বপ্নভরা সময়ে কবি আশার আলো দেখান, আর সেই আলোর প্রতীক্ষায় রোপণ করেন কবিতার বীজ। কবি জানেন অন্ধকার যতোই গভীর ও স্থবির হোক না কেনো একদিন এই অন্ধকারের পেটেই জন্ম নেবে আলোর বীজ। তাই কবি অসাম্য, বৈসম্য, নিপীড়ন মূলক সকল রাজনীতি ও অর্থনৈতিক শিকল থেকে মুক্তির জন্য বলেছেন;
" আসুক আবার বৃষ্টি, ধুয়ে যাক বিভাজন মলিনতা সবার, পতন আর পচনের দিনশেষ বাঁচুক সংঘশক্তি মানুষের "
কবি নরোম কোমল সুরে ও স্বরে যুগপদ দ্রোহ ও সাম্যের কথা বলেছেন। যে দ্রোহের বৃষ্টি মানুষের ভিতরের আত্মউপলব্দির বৃষ্টি। যে সাম্যের বৃষ্টি আত্মজিজ্ঞাসার বৃষ্টি। যে বৃষ্টিতে মানুষের মন গলে গলে জলের মায়ার মতো নরম কোমল হবে। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে কাঁধে কাঁধ রেখে ভালোবাসার বিনিময়ে সমাজ সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন করবে। মানুষ মানুষের বসবাসের জন্য এক নতুন সভ্যতা গড়ে তুলবে। মানুষ সংঘবদ্ধ হয়ে মানুষ হিসাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে শিখবে। কবির প্রত্যাশা একদিন মুক্তির সূচনা ঘটবে। এ দুঃস্বপ্নভরা সময়ে কবি আশার আলো দেখান, আর সেই আলোর প্রতীক্ষায় রোপণ করেন কবিতার বীজ। হতাশাগ্রস্থ, দিকভ্রান্ত এইসব মানুষকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে শুধু কোন দিগন্তে লুকিয়ে আছে অনাগত ভবিষ্যতের আলো ও তার বংশধরেরা। আর এ কাজটিই প্রতিনিয়ত করেন কবি সাহিত্যিকরা। আর কবি মেহেদী ইকবাল তার দায় দেনা চুকানোর কাজটা তার কাব্যগ্রন্থ " কী আমি রোপণ করে যাচ্ছি " এর প্রতিটি কবিতার মাধ্যমে করে গেছেন সুচারুভাবে। এখানেই কবি ও কবিতার স্বার্থক পরিণয়তা প্রকাশ পায়।
কবি মেহেদী ইকবালের কাব্যগ্রন্থটিতে সমাজ, সংস্কৃতি এবং মানবিকতার সংকট সবিস্তারে প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে কবি সহজ কিন্তু তীক্ষ্ণ ভাষায় তুলে ধরেছেন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বিচ্ছিন্নতা ও অস্থিরতা। তাঁর কবিতাগুলি আমাদের চেতনাকে জাগিয়ে তোলে, মর্মস্পর্শী বাস্তবতাকে আমাদের সামনে টেনে আনে, যা সহজেই আমাদের মনোজগতকে আলোড়িত করে। সবচেয়ে বড় কথা হলো তাঁর প্রতিটি কবিতার মধ্য দিয়ে মানুষের সমাজের গভীর সংকট এবং সম্ভাবনাকে শিল্পিত করে তুলতে পেরেছেন । এই' ই তো কবি ও কবিতার লীলা-লাস্য। কবিতাগুলো পাঠকের মনের নিভৃত আবেগ ও বোধকেও আন্দোলিত করবে , যা বাংলা কবিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়েই থাকবে বলে আশা করা যায়।
অলংকরণঃ তাইফ আদনান
