জলধি
/ পাঠ-পর্যালোচনা
/ কবি জেবুননেসা হেলেন ও তাঁর কবিতা
কবি জেবুননেসা হেলেন ও তাঁর কবিতা
।।প্রথম পর্ব।।
প্রেম দ্রোহ এবং যুগ সচেতন কবি জেবুননেসা হেলেন। তাঁর কবিতায় পরোক্ষভাবে নারীবাদের কথা উঠে এসেছে,উঠে এসেছে নিঃসঙ্গতা ও অপ্রাপ্তির কথাও। কবির কবিতার পরতে পরতে রয়েছে রোমাঞ্চকর রোমান্টিকতা অথচ শালীনতা বা রুচির ক্ষেত্রে খুবই দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন । কবি জেবুননেসা হেলেন এর কবিতায় রোমান্টিকতা, বিরহ ও উন্নত রুচির ছোঁয়া এসেছে বারবার।
তিনি কর্মজীবনের শুরুতে একটি পত্রিকায় কাজ করতেন। পরবর্তীতে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। তাঁর কবিতায় বৈশ্বিকতাবোধ,বিচিত্র উপমা এবং অভূতপূর্ব ইতিহাসজ্ঞান লক্ষ্য করা যায় এবং যে কারণে চরিত্রগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বন্ধ্যাত্ব এ জাতির পূর্ণ মুক্তি তো কখনো হয়নি। অর্থনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি বাকস্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার জন্য বারবার প্রতারিত হয়েছে জাতি। রাজনৈতিক ছলনা ও প্রতারণার কাছে হেরে হেরে, লড়াইয়ের ফসল ভিন্নভাবে ভিন্ন পথে প্রবাহিত হয়েছে । শিকড় থেকে বিচ্যুত হতে চলেছে আমাদের অস্তিত্ব।
কবিতা সাহিত্যের উন্নত বাহন। ব্যক্তিগত চাহিদা,স্বপ্ন, বাস্তবতা, অসংলগ্ন বিষয়, পারিবারিক, সামাজিক,রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় কোনো ঘটনা যখন কবিকে বিচলিত করে তখন কবি আবেগ জড়িত কণ্ঠে অথবা সচেতনভাবেই কলমের কালিতে লিপিবদ্ধ করে রাখে নিজস্ব মতামত। দীনতা ও জীর্ণতাকে উপলব্ধি করে কবি নেতিবাচক বিষয়কে এড়িয়ে ইতিবাচকের জয়গান গেয়ে থাকে। জেবুননেসা হেলেন সে পথেই হেঁটেছেন।
কবি জেবুননেসা হেলেন ১৯৮০ সাল থেকে লেখালেখি শুরু করেন। ১৯৮৩ সালে স্কুল ম্যাগাজিনে তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত এই কবিতা রোমান্টিক কবি জেবুননেসা হেলেনের আগ্রহকে কয়েক ধাপ এগিয়ে দেয়।
কৈশোরে সহপাঠীর সাথে একমুখী প্রেমে জড়ালেও পরবর্তীতে আবদুল হান্নান এর সঙ্গে প্রেমে জড়ান এবং চলমান জীবনের নিত্যসঙ্গী আবদুল হান্নানই।
কবি জেবুননেসা হেলেনের
জন্ম: ৬ আগস্ট ১৯৬৬ অরিজিনাল / সার্টিফিকেট অনুযায়ী ০৬/০৩/১৯৬৮.
শিক্ষাগত যোগ্যতা ঃ এম এস সি,এম এড( ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)
পেশাঃশিক্ষকতা
সিনিয়র শিক্ষক ( জীববিজ্ঞান)
কর্মস্থলঃ নাখালপাড়া হোসেন আলী উচ্চবিদ্যালয়, তেজগাঁও ।
পিতাঃ আব্দুল হাই দেওয়ান( সাবেক বন কর্মকর্তা)
মাতাঃ জাহানারা বেগম( গৃহিণী)
তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সকলের বড় জেবুননেসা হেলেন।
জন্মসূত্রে গ্রামের বাড়ি, মুণ্সিগঞ্জ সদরের মহেশপুর এর বানিয়াল পূর্ব বাঘের চর গ্রামে।
জন্ম ও বেড়ে ওঠাঃ তল্লাবাগ,মোহাম্মদপুর,ঢাকা এবং পূর্বনাখালপাড়া( নানার বাড়ি), তেজগাঁও, ঢাকা।ব্যক্তি জীবনে তিনি বিবাহিত।
স্বামীঃ আব্দুল হান্নান( ইঞ্জিনিয়ার / ব্যবসায়ী)
বৈবাহিক সূত্রে শ্বশুরবাড়িঃ কাথোরা,সালনা,গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন।
দুই সন্তানের জননী তিনি। মেয়ে : আশরাফুননেসা হিয়া( ফ্যাশন ডিজাইনার-আড়ং)
এক ছেলেঃ মুহতাসিম উচ্ছ্বাস (একাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত)
সর্বমোট প্রকাশিত গ্রন্থ : ১৩টি। এর মধ্যে
কাব্যগ্রন্থ ৯টি,ছোট গল্প ১টি, উপন্যাস ১টি এবং ভ্রমণ কাহিনি সহ অন্যান্য ২টি।
কবিতার বইগুলো :
১।।নোঙর( ২০০৯- গুরু প্রকাশন)
২।সদ্যাহত(২০১১-আল্পনা প্রকাশন)
৩।মেঘ জমেছে মুখে( ২০১২- অগ্রদূত)
৪।জ্বরঘুম(২০১৩-রাচী গ্রন্থ নিকেতন)
৫।বেসিন ভালোবাসে সাবানের ঘ্রাণ( ২০১৩- ত্রৈবিদ্য)
৬।উজ্জ্বল বর্ণে অক্ষরের চাষ(২০১৬-উৎস প্রকাশন)
৭।বরং...সুতরাং... (২০২০- খই প্রকাশন)
৮।ইন্দ্রপুরীর স্বর্ণাক্ষর (২০২৪- উৎস প্রকাশন)
৯।লিলিথের আঙ্গিনা( ২০২৪- খই প্রকাশন)
এছাড়া
ছোট গল্পের বইঃআশা( ২০০৯- গুরু প্রকাশন)
উপন্যাসঃ নক্ষত্রের সাথে কথা হয়(২০১১ - সাহস প্রকাশন)
ভ্রমণের গ্রন্থঃ
১। দার্জিলিংঃ আকাশের কাছাকাছি( ২০১০- উৎস প্রকাশন)
২। নিসর্গে যেতে যেতে(২০১১-উৎস প্রকাশন)
জেবুননেসা হেলেন এর কয়েকটি কবিতা -
।।দেবীর শিল্প মাধ্যম।।
লর্ডদের মতো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত
তোমার স্থায়ী রাজত্ব আদায়,
খানাপিনা, ঘরগৃহস্থালি এবং প্রজাস্বত্ব
বিনাই তুমি আধিপত্য বিস্তার করো বটে।
কিন্তু "আমার হাত বান্ধিবি
পা বান্ধিবি" গানের মতোই
আমার মন বান্ধা থাকে না।
মন সেই কবে উড়ে গেছে দূরে
দূর্যাস্ত আইনের খাজনার কথা পড়ে
আছে গোয়ালঘরে।
দৃশ্যত তুমি রাজা হলেও,
তোমার দেউলিয়া হবার
খবর আমি জানি।
কারণ আমি তো মানিনা
সহমরণ প্রথা।
আমি স্বঘোষিত লিলিথের প্রেতাত্মা।
।।বন্দিনী।।
শব্দহীন কাঁচপাত্রে
রেখেছো কয়েদ করে।
স্বচ্ছতায় দেখছো বটে
শব্দ পাচ্ছো না।
মুখ খুললে
মানবিক গুণাবলির
ব্যাখ্যা চাই,
নিজেকে মানুষ ভাবছি,
এ ভাবনা তোমাদের বিপরীত।
জানি,
পৌরাণিক লিলিথকে
যেমন মনে রাখো না।
নারী এক কাঁচের ভেতর
নীরব সংগীত।
মাতৃত্ব।।
মেয়েটির ভ্রুর ভাঁজ শেষে
পল্লব আবরণের নিচে থেকে
নেমে এলো ঝর্ণার শরীর,
আমার কুঞ্চিত শাড়ির
আঁচল ভিজিয়ে দিলো
বন্যার্ত আবেগ।
আমি সর্ষের ফুল দেখে
অস্থিরতার আবর্তন ফেলে
দাঁড়াতে বললাম সম্মুখে।
জৌলুস তার ভদ্রতার অহংকার
থেকে উঁকি দিয়ে
স্বান্তনার জল ছে্ঁটাতে
থমক দাঁড়ালো।
কি ভয়ংকর রায় দিয়ে যায়
সময়ের ব্যবধান।
চমকে উঠে দেখি স্বচ্ছ চোখে
মাতৃত্বের এক শান্ত
কিন্তু ঘূর্ণায়মান দুঃখের অবদান!
মা হবার জন্য
মেয়েটি কাঁদছে...
।।দ্বন্দ্ব সমাস।।
সকল শূন্যতার মাঝে
তুমি ছেঁকে নিয়েছো
দুটো বর্ণ
যার উচ্চারণ ---প্রেম।
কেউ বলছে,বন্ধু।
যে যাই বলুক,
আভিধানিক ঘোর প্যাঁচ থাক পড়ে।
নাক শুঁকে গন্ধ নিয়ে
মন ম্যাপের শূন্যতা ঘিরে
জনে জনে শরীর বিছিয়ে
আটপৌঢ়ে ভর দুপুর
যদি যতিহীন ক্রিয়া-কলাপ
সমাসবদ্ধ করো, তবু বলতে
হয়-- তুমি চতুর ও চালাক।
।।সিগনাল।।
সবুজ না হতেই গাড়িটি ছেড়ে যাচ্ছে বাঁক-
শতাব্দীর পোড়ো বাড়ির দরজা জানালা
সুড়কি খসে পড়ছে অন্তরালে।
সময় হাতে হাতে জ্বালিয়ে চলেছে নিভু নিভু আলো,
সংকেত না দিয়েই চাঁদ সূর্য বাসি গন্ধ ছড়াচ্ছে।
এখন কাঙ্খিত গ্রহের জ্যোতিস্ক হবার
কতটাইবা দেরী!
অনন্ত শূন্যতাকে প্রশ্ন করা বৃথা।
এভাবেই নিশিথে-নিভৃতে সব নিয়ম যাচ্ছে ভেঙে।
মানুষ যাচ্ছে বেড়ে সবুজ সাবার করে।
জরিমানায় কি হবে? যখন দূর্ঘটনা সম্মুখে।
হেসেলে দুধ পুড়ছে।
।। আলনায় খালি হ্যাঙ্গার।।
মগ্নতার চোখ খুটে খাচ্ছে দানা-পানি।
কবিতার শরীরে রক্ত নেই, ফ্যাকাসে ক্যান্সার
অথবা এনিমিয়া বেঁধেছে বাঁধে।
রোজ অল্প-সল্প খাদ্যাভাস গড়ে উঠছে।
এন্টিবায়োটিক, মাল্টিভিটামিন লেগে
পরিপুষ্ট রুপ জেগে উঠবে।
ফুলেল সুবাসিত হলে বেশ লাগবে রুপের স্বাদ,
অঙ্কুরণ দেখে বোঝা যায়।
কিউট কিউট চেহারা সুরত।
কাজল আনো,কালো টিপ পরাই।
।।দ্বিতীয় পর্ব।।
বাংলা ভাষায় কবিতার একটি সমৃদ্ধ কাব্য ঐতিহ্য এবং এর ভিন্ন ভিন্ন রূপ রয়েছে। বাংলা কবিতার ইতিহাস বিকাশের তিনটি ধারাবাহিক পর্যায় অতিক্রম করেছে বলে মনে করা হয়। প্রাথমিক যুগের কবিতা , মধ্যযুগের কবিতা এবং আধুনিক কবিতার যুগ । বাঙালির রেনেসাঁযুগে স্বর্ণ শিখরে পৌঁছেছিল কবিতা।
বাংলা ভাষার প্রাচীনতম কাব্যের নিদর্শন চর্যাপদ। চর্যাপদ নব্য-ভারতীয় আর্য ভাষার প্রাচীনতমও বটে।
ঢেউ এর মতো উঠানামা ও ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে কবিতা নিজ শরীরকে সাজিয়েছে নব নব ধারায়। নানা উপমা, নানান প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নানা রঙের মেঘমালায় সজ্জিত হয়েছে। মোনালিসা হাসিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে মানব-মননে।
ত্রিশের কবিদের মধ্যে আধুনিক ও ভিন্ন স্বরের ভিন্ন ধারার কবি জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু,শঙ্খ ঘোষ,শক্তি চট্টোপাধ্যয়, সৈয়দ আলী আহসান,আহসান হাবীব, আবুল হোসেন, বিষ্ণদে,আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, সিকদার আমিনুল ইসলাম, নির্মলেন্দু গুণ,হেলাল হাফিজ, আসাদ চৌধুরী প্রমূখ। যারা চলমান ধারার বাইরে এসে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অনেকেই বলে বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে এসেছেন। শুধু বৃত্ত ভেঙে বেরিয়েই আসেননি, বাংলা কবিতাকে সমৃদ্ধ করেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় জেবুননেসা হেলেন লেখালেখি করছেন। তিঁনিও চেষ্টা করছেন নতুন নতুন পথে হাঁটার। তাই ২০১৬ এর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত "উজ্জ্বল বর্ণের অক্ষরের চাষ" কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোর স্বর এবং ২০২৪ এ প্রকাশিত "লিলিথের আঙিনা" কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোর স্বর এক নয়। প্রথমে উল্লেখিত কাব্যগ্রন্থের কবিতা 'প্রজাপতির মথ' এ উল্লেখ করেছেন,
"পাঠশালার দিনগুলোয়
আমি তোমাকেই খুঁজতাম।
তখন তুমি হয়তো ভূমি জরিপ
শিখে গেছো।
আমি ভূমি কী তাই
বুঝতাম না।"
পরবর্তীতে উল্লেখিত কাব্যগ্রন্থের
'ফসফরাস ক্রাউন ' কবিতায় বলেছেন,
"আমার পরিধিতে বারুদ গন্ধ
কার্বনের ধোঁয়া হয়ে
উড়তে থাকে"।
দুটি কাব্যগ্রন্থের কবিতার স্বর, শব্দের ব্যবহার এবং উপমাগুলো লক্ষ করলে বিষয়টি উপলব্ধি করা যায়। কবি, কবি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তাঁর নিয়মিত অনুশীলন ও চর্চার মাধ্যমে। তাঁর অগ্রযাত্রায় তিনি থেমে যাননি। গতি বাড়িয়েছেন এবং নতুন নতুন পথ খুঁজছেন প্রতিসেকেন্ড, মিনিট ও ঘণ্টাব্যাপি।
সময় এবং প্রেক্ষাপট কবিকে জনসম্মুখে নিয়ে আসে। কবির কবিতা নিয়ে আলোচনা করা হয়। আমরা দেখতে পাই,বাংলা কবিতায় খ্যাতিমান কবিদের মধ্যে আলোচনায় এসেছে, নির্মলেন্দু গুণের " হুলিয়া",হুমায়ুন কবিরের " কুসুমিত ইস্পাত ", সৈয়দ শামসুল হকের " বৈশাখে রচিত পঙক্তি মালা", সৈয়দ আলী আহসানের "আমার পূর্ব বাংলা " ফরহাদ মাজহারের " খোকন এবং তার প্রতিপুরুষ",আবুল হাসানের "রাজা যায় রাজা আসে", শামসুর রাহমানের " নিজ বাসভূমে "। ভাষা আন্দোলন এবং তারই ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনের উল্লেখযোগ্য ইতিহাস। পাশাপাশি স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনও রেখাপাত করেছিল জনগণের সাথে কবি-সাহিত্যিকদের মনে-মস্তিস্কে। ওই সময়কে ধরে রেখেছেন তাঁদের লেখার মাধ্যমে।
সময়ের আলোচিত কবিতাগুলোর মধ্যে উল্লেখিত কবিতাগুলোও উল্লেখযোগ্য।
একইভাবে দেখি কবি জেবুননেসা হেলেনও
সমকালীন রাজনৈতিক বিষয় এড়িয়ে যেতে পারেনি। আমরা নিম্নোক্ত কবিতা থেকে উপলব্ধি করি-
"বেসিন ভালোবাসে সাবানের ঘ্রাণ " কাব্যগ্রন্থে কারচুপি শিরোনাম এর কবিতাটিতে স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন, কুকুরের ঘ্রাণ শক্তি /মানুষের চেয়ে বেশি।
আমি কুকুর হলে/ আর কিছু না হোক/সাবধান থাকতে পারতাম। /ভোট চোরের পায়ের শব্দ টের পেতাম।
বন্ধ্যাত্ব জাতির তরুণ ও বিপ্লবী সন্তানেরা যুগে যুগে লড়াই করে আসছে। লড়াইয়ে মুক্তি তো কখনো হয়নি,শুধু ভূখণ্ড পেয়েছি মাত্র। বাকস্বাধীনতার জন্য ১৯৫২, ১৯৭১, ১৯৮৯ সহ বারবার লড়াইয়ের ময়দানে জয়গান করেছে উত্তাল বেগে উজ্জীবিত বাঙালি সন্তানেরা। অথচ রাজনৈতিক ছলনা ও প্রতারণার কাছে হেরে গেছে বারবার।
সমকালীন রাজনৈতিক ঘটনাবলীর ঘটনার প্রতিবাদ এভাবে ছাড়া আর কীভাবে করা যায়? আমরা বলবো,জেবুননেসা হেলেনের 'কারচুপি 'কবিতাটি রাজনৈতিক সচেতনতারই লক্ষ্মণ।
এখানে উল্লেখ করা যায়, ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী প্রবর্তিত জরুরি অবস্থায় বেশ কিছু কবি জনগণের পক্ষে কলম ধরেছিলেন , নির্যাতন নিপিড়ীত মানুষের কথা বলেছিলেন কবিতায়। কবি শঙ্খ ঘোষ এর "রাধাচূড়া "
কবিতায় তিনি উল্লেখ করেছেন
" মালী বলেছিল। সেইমত
টবে লাগিয়েছি রাধাচূড়া।
এতটুকু টবে এতটা গাছ?
সে কি হতে পারে? মালী বলে
হতে পারে যদি ঠিক জানো
কীভাবে বানায় গাছপালা। "
কবি হয়তো বলতে চেয়েছেন 'প্রধানমন্ত্রী চেয়েছিলেন ভারতীয় সকল মানুষকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে রেখে তাদের মতো করে চালানোর জন্য। যা কবি শঙ্খ ঘোষকে বিচলিত করেছিল।
একই সময়ে কবি দীপঙ্কর মজুমদার তাঁর
"জবান বন্দি" কবিতায় বলেছেন,
"আমার ঘেন্না ধরে এইসব ক্ষয়ে যাওয়া অভিব্যক্তি শুনলে
যেমন,অন্তঃসারশূন্যো,পচা,পুঁতিগন্ধময় বজ্জাতের দল,
কিন্তু ওরা বেশ্যাবৃত্তি করছে"
প্রকৃত মানব প্রেমী কবিরা সত্য কথা বলতে দ্বিধা করে না। জেবুননেসা হেলেনকে আমরা প্রকৃত কবি হিসেবে দেখতে পাচ্ছি এবং ভবিষ্যতে দেখতে পাবো বলে প্রত্যাশা করি।
কবি জেবুননেসা হেলেনের কবিতায় পরোক্ষভাবে বিদ্রোহ দেখি। যেমন,
"আমিতো মানি না
সহমরণ প্রথা।
আমি স্বঘোষিত লিলিথের প্রেতাত্মা। "
-(দেবীর শিল্প মাধ্যম)
অথবা
"আমিতো এক বহুযুগের জমে যাওয়া
হোমারের বর্ণনার সেই আফ্রোদিতি "
কবিতায় একদিকে উঠে এসেছে বিদ্রোহ অপরদিকে উঠে এসেছে ঐতিহাসিক চরিত্র।
ধর্মমতে,আদিকালের বা মানব জন্মকালের সময় প্রথমে লিলিথকে সৃষ্টি করা হয় আদি পিতার সঙ্গিনী হিসেবে। কিন্তু লিলিথ আদিপিতার সঙ্গিনী হিসেবে নিচে শয়ন করতে রাজি হয় না। তিনি বলেছিলেন,
" দু'জনেই মাটির তৈরি হলে আমি কেন নিচে শয়ন করবো?"
অর্থাৎ লিলিথ বিদ্রোহ করেছিল এবং অদৃশ্য হয়েছিল।
সনাতন ধর্মের সহমরণের কথা তুলে ধরে কবি কৌশলে বিদ্রোহ ছড়িয়ে দিয়েছে। এবং বলেছেন "আমি স্বঘোষিত লিলিথের প্রেতাত্মা "।
গ্রিক পুরাণের প্রেম, আনন্দ, আবেগ এবং সৌন্দর্যের দেবী। রোমান পুরাণে আফ্রোদিতির প্রতিষঙ্গী চরিত্র ভেনাস। হেসিওডের থিওগোনি অনুসারে আফ্রোদিতির জন্ম সমুদ্রের ফেনা থেকে। ইউরেনাসপুত্র ক্রোনোস তার পিতার লিঙ্গ কর্তন করে সমুদ্রে নিক্ষেপ করলে সেই লিঙ্গ থেকে শুক্র সমুদ্রের জলে মিশে আফ্রোদিতির জন্ম হয়।
গ্রিক ভাষায় আফ্রোদিতি শব্দের অর্থই হলো 'সমুদ্রোদ্ভুতা', অর্থাৎ যার জন্ম সমুদ্র থেকে হয়েছে। এভাবে সাইথেরার লেডি, সাইপ্রাসের লেডি এবং প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি প্রথম আদিম দেবী হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রিক কবি হিসিওড একই মত পোষণ করেন। আরেক বিখ্যাত গ্রিক কবি হোমারের মতে, আফ্রোদিতি দেবরাজ জিউস ও দেবী ডিওনের কন্যা।
কবি জেবুননেসা হেলেন বলেছেন, হোমারের বর্ণনার আফ্রোদিতির কথা । গ্রিক সাহিত্যের বর্ণনায় অপরুপ
সুন্দরী আফ্রোদিতির সাথে শুধু তুলনায় করেননি। তিনি সরাসরি বলেছেন,
" আমিতো এক বহুযুগের জমে যাওয়া... সেই আফ্রোদিতি "।
উল্লেখ্য যে, লিলিথ এক ধর্মগ্রন্থ বা সাহিত্যের আদিম দেবী এবং আফ্রোদিতি আরেক সাহিত্যের অপরুপ সুন্দরী এবং আদিম দেবী।
"একফালি রঙ " শিরোনামের কবিতায় কবি উচ্চারণ করেছেন,
"তুমি কি আর আমার হবে?
একটু পাপ আমাকে দেবে?"
একই শিরোনামের কবিতায় বলেছেন,
"লাজ যদি খুব ভীড় করে,
হাত ছোঁবো ওই বুকের ভাঁজে"।
কবির আকাশ ছোঁয়া আবেগ প্রকাশ পেয়েছে এ কবিতায়। তিঁনি আরো উচ্চারণ করেছেন,
" চুমু যদি পাপের মাপকাঠি হয়,
এঁকে দেবো,
তোমার চুলের ডগায় "।
সাহসী উচ্চারণই বলতে হবে। কবি প্রেমিকের উদ্দেশ্যেই শুধু বলেননি। পাপের বিষয়টিকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছেন। অর্থাৎ মুক্তমনের পরিচয়ই দিয়েছেন।
"দ্রোপদী নয়,
রাধার প্রণয়।"
দ্রোপদী এবং রাধা দুটি চরিত্রই ঐতিহাসিক। এবং প্রেম ঘটিত বিষয়। ভারতীয় সনাতন ধর্ম বা সাহিত্যের আকর্ষণীয় চরিত্র। আধুনিক কোনো উপন্যাসেও এ রকম আকর্ষণীয় চরিত্র খুঁজে পাওয়া কঠিন। কবি তার "উদাসী" কবিতায় দ্রোপদী এবং রাধা দুটি চরিত্র তুলে এনেছেন, এবং বলেছেন,
" নগররক্ষক আর্তি জানায়,
প্রলাপের জবাব হবে ভালোবাসায়"।
প্রেম-ভালোবাসা চিরন্তন। এই চিরন্তন বিষয়কে অতি আধুনিকভাবে পাঠকের মাঝে উপস্থাপন করেছেন।
লিলিথ,আফ্রোদিতি, ট্রয়ের হেলেন,হোমারের ওডিসি, রাধা,সীতা,দ্রোপদী,কোজাগরী প্রমূখদের নাম কবিতায় নিয়ে এসে অথবা চিত্রকল্প বা উপমা হিসেবে ব্যবহার করে, আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছেন কবিতার চরণ ও উপমা। সৃষ্টি করেছেন রোমাঞ্চ এবং কবিতা পাঠান্তে আদি গ্রন্থগুলো সম্পর্কে পাঠককে পাঠ করার আগ্রহ তৈরি করবে।
বাংলায় শারদীয়া দুর্গোৎসবের পর আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের শেষে পূর্ণিমা তিথিতে কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার আরাধনা করা হয়। প্রায় প্রতি ঘরেই দেবী লক্ষ্মীর পূজা হয়ে থাকে। লক্ষ্মী হলেন ধন সম্পত্তির দেবী। ধন সম্পদের আশায় ঘরে ঘরে কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা হয়ে থাকে। নারী পুরুষ উভয়েই এই পূজায় অংশ গ্রহণ করে। লক্ষীর প্রতি বাঙালি মানসের দূর্বলতাও চিরন্তন।
রাধা বা সীতার বিষয়ে বাঙালি সনাতন ধর্মালম্বীদের রয়েছে ভক্তি, শ্রদ্ধা ও দূর্বলতা। এ সব নাম ব্যবহারের কারণে কবিতায় নতুন একমাত্রা যোগ হয়েছে। এই অর্থে বলা যায়,কবি হিসেবে জেবুননেসা হেলেন একজন উন্নত মস্তিষ্কের ভালো পাঠকও বটে।
কবি তাঁর 'ইচ্ছে জঠর' কবিতায় নীরব অভিযোগ বা বিদ্রোহ করেছেন। তিনি বলেছেন,
" ইন্দ্র সভায় তুমি আমি বারবার অহল্যা।
সতীত্ব পরীক্ষায় বারবার
নারীকে দিতে হয় সীতার পরীক্ষা।...
....
বহুগামিতা তাদের বেলায় পারফেক্ট।
যত নিয়মের বেড়ি আমাদের বেলায়।"
সহজ-সরল এরকম অভিযোগ একজন নারীর থাকতেই পারে,থাকায় স্বাভাবিক। পুরুষ শাসিত সমাজে যৌনতার ক্ষেত্রে অথবা সঙ্গীকে বাছাইয়ের ক্ষেত্রে পুরুষের থাকে এক পাক্ষিক প্রভাব এবং স্বাধীনতা । নারী সেখানে অধিকার বঞ্চিত। এ ধরণের অধিকার চাওয়া স্বাভাবিকই বটে।
তসলিমা নাসরিনের " জরায়ুর স্বাধীনতা" কবিতা পড়ে কুসংস্কার সম্পূর্ণ মানুষ বা অন্ধ বিশ্বাসী মানুষ অথবা স্বার্থান্বেষী মানুষ প্রতিবাদ করেছে বা করতে পারে।
প্রশ্ন হচ্ছে, কেন প্রতিবাদ করেছে?- নিশ্চয় পুরুষ শাসিত বিবেকে চপেটাঘাত লেগেছে। অথচ মানব জন্মলগ্ন থেকে পুরুষ যৌন স্বাধীনতা ভোগ করে আসছে। যে স্বাধীনতা থেকে নারী যুগে যুগে অধিকার হারা ও বঞ্চিত।
ধর্মকে ব্যবহার করে হোক অথবা ক্ষমতা পূঁজি করে হোক পুরুষ তার স্বার্থ উদ্ধার করে আসছে। তাছাড়া ব্যক্তি স্বার্থে যুগ যুগ ধরে ফতোয়াবাজরা স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ফতোয়া অথবা ধর্মের বুলি আওড়িয়ে আসছে। তাদের মুখে হয়তো বারবার শুনে থাকি
" নাউজুবিল্লাহ"।
কিন্তু বাস্তবে মানুষের মন ও মনন সুযোগ সন্ধানী এবং ভোগবাদে বিশ্বাসী। বেশির ভাগ মানুষ তার ভোগের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বাণী অথবা কোনো দর্শন উপস্থাপন করে নিজের পক্ষেই সাফাই গাইবে। নারী সেটা পারেনি। কবির বিদ্রোহী মনও কবিতার মাধ্যমে করেছে।
একই কবিতার শেষের দিকে উচ্চারণ করেছেন,
"হাস্য উৎপাদক
পৌরাণিক শেকল।"
পৌরাণিক এই শেকলকে কবি হাস্যকর উল্লেখ করেছেন।
লিলিথ সম্পর্কে "অপূর্ণ ক্ষতি " কবিতায় বলেছেন,
"এ আমার সতী সাধনা।
অথবা বলতে পারো,
লিলিথের প্রেতপূণ্যমতি।
লিলিথকে চেনো তো?
ইভের সতীন।"
অর্থাৎ লিলিথের পরিচয়ের মধ্য দিয়ে চলমান সমাজ ব্যবস্থাকে কবি সচেতন করে দিচ্ছেন এবং লিলিথের মতো বিদ্রোহ করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
কবি "দেবী প্রতিমা" কবিতায় আরো লিখেছেন,
"লিলিথের মতো আমি তখন
একপ্রস্ত কাগজে কাব্যে লেখা
পাতায় বোনা স্বাধীন মিথের দেবী।
মিথেই আমার সহবাস।"
প্রসঙ্গক্রমে বলতেই হয় যে, শুধু মাত্র "লিলিথের আঙিনা" কবিতাগ্রন্থে পঞ্চান্নটি কবিতায় লিলিথের নাম ব্যবহার করা হয়েছে নয় বার। লিলিথ সৃষ্টি কর্তার সৃষ্টির শুরুতেই, সেই সৃষ্টি কর্তারই বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বিদ্রোহ করেছিল। নিশ্চিত ভাবে বলা যায়, কবি জেবুননেসা হেলেনের লিলিথের চরিত্রকে ভালো লেগেছে এবং তিনি মনে প্রাণে চায়, এই সমাজে নারী বিদ্রোহ করুক এবং নারী তাঁর অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে আপোষহীন থাকুক। তাই হয়তো বারবার উপমা হিসেবে লিলিথ নামটি ব্যবহার করেছেন।
অবসাদ ধুয়ে ধুয়ে ঝরে পড়ছে সরসর করে।
পা বেয়ে বেয়ে বোধ উঠছে মগজে।
ক্ষতগুলো দুর্গন্ধের সুবাস ছড়াচ্ছে।
বাসি হৃদয় ঢকঢক লাল জলপানে ব্যস্ত
বৃষ্টিরা কলঙ্কিতও হয় এতটা?
ভারি শ্বাস কী ক্ষতের প্রলেপ!
কবিতায় ছন্দ, গদ্যময় ও অস্পষ্ট প্রেমের কোলাহল ফুটে উঠেছে। শ্রাবণ নয়,ভাদ্র ধারার গুমোট গরমে ঘাম ঘাম শিহরণ জাগিয়ে রোমাঞ্চকর দাগ লাগিয়ে দিচ্ছে পাঠককে। স্বপ্নবাজ রোমান্টিক কবি জন্মান্ধ সনাতন চেতনায় আধুনিকতার প্রলেপ দিয়ে নিরূপণ করছে যেন রঙিন কোনো প্রচ্ছন্ন গল্পের ইতিহাস। বৈচিত্র্যময় আয়োজনের মধ্যে লাজুক জলধারায় আশ্চর্য নগ্নতা অথচ নদীর কিনারে দুটি পাখির আনন্দ মিছিলে ক্ষতের দাগ রেখে নিঃশ্বাস নিচ্ছে সংগোপনে।
মৌলিকতার মধ্য থেকে বেরিয়ে নতুন সুর ও সংগীতে মুগ্ধ হয়ে, ভুলে যাওয়া বেশ কঠিন। শরীর,মন ও মননে কখন কোথায় কীভাবে উপলব্ধিতে নিয়ে এসে, মাঠেঘাটে- প্রান্তরে একই আবেগ ভিন্ন ভিন্ন ভাবে উপস্থাপন করে বলা বড়ো কঠিন। যা করতে চেষ্টা করেছেন কবি জেবুননেসা হেলেন।
ঝরণার কিনারে, নীরবে ঝরে পড়ার মতো কোনো কোনো কবিতায় ঝরে পড়েছে এক চিলতে জল। কোনো কোনো কবিতায় আলেয়ার মতো নিকষ আঁধারে শব্দহীন আলো জ্বালতে জ্বালতে হারিয়েছে অজানায়। কখনো কখনো নীরবতায় অনেক শব্দময় কথা বলে যায় গভীরে গভীরে, ছুঁয়ে যায় হৃদয়ের গহীনে লুক্কায়িত প্রেমের ঝুঁড়ি। মানব মনের, কতো দুঃখকষ্ট কান্নাহাসির গোপন অভিসার থাকে অন্তরে। তাঁর শৈল্পিক প্রচার হয়ে ওঠে কবিতা। কবি জেবুননেসা হেলেন তাঁর কবিতায় পরোক্ষভাবে অথবা প্রত্যক্ষভাবে নিজেকেই নৈঃশব্দের শব্দে, ত্রিভুজাকারে অথবা চতুর্থভূজাকারে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন।
কবির" উজ্জ্বল বর্ণে অক্ষরের চাষ "
কাব্যগ্রন্থে নাম শিরোনামের কবিতায় বলেছেন, "সাহসের দরজা খুলে দু'চারবার
লোডশেডিং ঘরে ঢুকে সভ্য সমাজকে
বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়নি তা নয়।
হৃদয়ের উচ্ছ্বাস বারবার পেতে চায় অমৃতের স্বাদ"।
কবির কবিতা জীবনস্বপ্নকে এবং নিজস্ব অধিকারকে ভালোবেসে ব্যক্তিগত গণ্ডি পেরিয়ে রাষ্ট্র, সমাজ ও বিশ্ব মানবতার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেছে। নারী অধিকারসহ নিপিড়ীত জনতার কথা বলেছে তাঁর কবিতায়। বহুমুখী সংকট,সংঘাত, অস্থিরতা ও দ্বন্দ্বের মধ্যে রোমান্টিক কবি তাঁর রোমাঞ্চকর বিষয় গুলোর পাশাপাশি স্বাধীনতাকামী জনপদের আশা আকাঙ্খার মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে প্রত্যাশা।
অলংকরণঃ তাইফ আদনান
