জলধি / পাঠ-পর্যালোচনা / উড়ুক্কু: শরীরী ঘোর ও আত্মার উত্তরণ
Share:
উড়ুক্কু: শরীরী ঘোর ও আত্মার উত্তরণ

উড়ুক্কু: শরীরী ঘোর আত্মার উত্তরণ

নাসরীন জাহানের উপন্যাসউড়ুক্কুবাংলা কথাসাহিত্যে এক অনন্য রূঢ় সাহসী সংযোজন এটি শুধু একটি গল্প নয়, এক বোধের বিস্ফোরণ, এক নারীর অচেতন ঘোর থেকে সচেতন আত্মার দিকে যাত্রাউড়ুক্কুনামেই যেমন রয়েছে ছায়া অনুরণন, তেমনি পুরো উপন্যাসজুড়ে ছড়িয়ে আছে আত্মসন্ধানের এক ধোঁয়াশাময় চিত্রপট

উপন্যাসটি মূলত একজন নারীর-কিন্তু এইনারীকোনো ব্যক্তি নয়, বরং একটি প্রতীক, একটি layered আত্মা, যাকে পাঠক খণ্ড খণ্ডভাবে আবিষ্কার করেন, বুঝে ওঠার আগেই হারিয়ে ফেলেন, আবার অন্য কোথাও তার ছায়া খুঁজে পান

 

গল্পের গঠন আখ্যানভঙ্গি: নিরীক্ষামূলক রূপরেখা

উপন্যাসের কাহিনি লিপিবদ্ধ করার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এর নির্মাণপদ্ধতি প্রচলিত কাহিনির বাঁধন এড়িয়ে লেখিকা তৈরি করেন এক মনস্তাত্ত্বিক আধ্যাত্মিক পটভূমিউড়ুক্কুকোনো একরৈখিক গল্পের নাম নয়, এটি একটি বৃত্তাকার যাত্রা-সময়ের, স্মৃতির, শরীরের এবং মানসিক ঘোরের

উপন্যাসেনায়িকানামহীন থেকেও আমাদের পরিচিত হয়ে ওঠে তার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সে কারো কন্যা, কারো স্ত্রী, কারো মা কিংবা প্রেমিকা হলেও- সব ছাপিয়ে সে একটি স্বতন্ত্র আত্মা, একটি ভাঙনশীল চেতনার নাম উপন্যাসের ভাষা, ছন্দ, বাক্য বিন্যাস-সব মিলিয়ে পাঠককে টেনে নিয়ে যায় এক অন্যতর জগতে, যেখানে বাস্তব পরাবাস্তব একাকার হয়ে ওঠে

 

ভাষা রূপক: শরীরী গদ্যের উত্তুঙ্গতা

নাসরীন জাহানের লেখার প্রকৃত শক্তি তার ভাষায়উড়ুক্কু’-তে ভাষা কেবল তথ্য বা সংলাপ বহন করে না, বরং ভাষা নিজেই হয়ে ওঠে এক জীবন্ত শরীর-মাংসপেশিতে লেপটে থাকা অনুভব, কামনা, ঘৃণা, মুক্তির আকাঙ্ক্ষা

উপন্যাসে বারবার ফিরে আসে কিছু চিত্রকল্প-উড়ুক্কু পাখি, আয়নার ভাঙা প্রতিবিম্ব, জ্যোৎস্নায় জেগে থাকা একাকী নারী, অর্ধেক মুখ-যেগুলো কখনো অবচেতন ঘোরের প্রতীক, কখনো নারীর খণ্ডিত অস্তিত্বের ব্যঞ্জনা এই চিত্রকল্পগুলো পাঠককে ভাবায়, দগ্ধ করে, আবার আবিষ্ট করে তোলে

 

নারীত্ব, শরীর চেতনার দ্বন্দ্ব

উড়ুক্কুকেবল নারীর অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা নয়-এটি নারীর মধ্যকার যুদ্ধের এক নিঃশব্দ রেকর্ড নারী এখানে কেবল নিষ্পেষিত নয়, কেবল প্রেমপিপাসু নয়, কেবল মাতৃত্বের গর্ভধারিণী নয়-সে নিজের সত্তাকে চিনে নিতে চায়, প্রশ্ন করে, ভাঙে, গড়ে তোলে

এই উপন্যাসে নারীর শরীর যেন একটি রণক্ষেত্র-যেখানে সমাজ, সংস্কার, পুরুষতন্ত্র, ধর্ম, প্রেম-সব সংঘর্ষের ক্ষতচিহ্ন রেখে যায় কিন্তু এখানেই লেখিকা তার স্বাতন্ত্র্য তুলে ধরেন: এই শরীর ধ্বংস হয় না, সে জেগে ওঠে, বিদ্রোহ করে, উড়ে যায় উড়ুক্কুর মতো-এক অসীম ব্যাকুলতায়

 

সময় স্মৃতি: অলীক এক মানসচিত্র

উপন্যাসে সময় একটি অনির্ধারিত প্রবাহ-যেখানে অতীত, বর্তমান ভবিষ্যৎ কুয়াশার মতো একে অপরকে ছুঁয়ে যায়, মুছে দেয় আবার ফিরে আসে চরিত্রের স্মৃতি এখানে মসৃণ নয়, বরং বিচ্ছিন্ন, ফিসফিসে, কখনো হ্যালুসিনেটরি

উড়ুক্কু স্মৃতিচারণ যেন ঘুমঘোরে শোনা কোনো পুরনো গান-যার অর্থ স্পষ্ট না হলেও, যার সুরে এক রহস্যময় আরাম থাকে সেই আরামে কখনো আসে বিষণ্ণতা, কখনো ক্লান্তি, আবার কখনো উদ্ভাসিত মুক্তির আলোর রেখা

 

গদ্যভঙ্গি লেখার কারুকার‍্য: এক কাব্যিক বিভ্রম

নাসরীন জাহানের রচনাশৈলী অনেকাংশেই stream of consciousness-এর ঘরানায় পড়লেও, তিনি কেবল মনস্তত্ত্বের বয়ানে থেমে থাকেন না বরং তার ভাষা গড়ে তোলে এক mythic female journey-যেখানে নারীর মিথ, স্বপ্ন, ভয়, প্রেম-সব মিলিয়ে এক কাব্যিক উপাখ্যান তৈরি হয়

লেখার প্রতিটি অনুচ্ছেদ যেন কবিতার মতো-অতিসংক্ষিপ্ত, অথচ গভীর পাঠকের কাছে এটি কখনো সহজবোধ্য নয়-তবু অসাধারণভাবে মোহময় প্রতিটি বাক্য পাঠকের অনুভবকে আঘাত করে, চিন্তাকে উসকে দেয়

 

উপন্যাস পাঠের অভিঘাত: ভেতর থেকে পরিবর্তনের শুরু

এই উপন্যাস শেষ করার পর মনে হয়-একটা তীব্র ঘূর্ণির ভেতর দিয়ে বেরিয়ে এলাম, যেখানে নিজের চেনা গহ্বরগুলোও অচেনা মনে হতে থাকে পাঠকের নিজের ভেতরকারআমিযেন বইয়েরউড়ুক্কুহয়ে ওঠে-আবার উড়তে চায়, ভাঙতে চায়, পালাতে চায়

এই উপন্যাস শুধু নারীদের জন্য নয়, বরং প্রতিটি পাঠকের জন্য যারা জীবনের শৃঙ্খলমুক্ত সংজ্ঞা খোঁজে যারা বিশ্বাস করে-জীবন মানে কেবল টিকে থাকা নয়, নিজের ভেতরের অন্তর্জগতকে ছুঁয়ে দেখার সাহস

 

উপসংহার: উড়ুক্কু এক সাহসী শব্দ

উড়ুক্কুএক উচ্চারণ নয়-এটি এক অস্তিত্বের অভ্যুত্থান এখানে কোনোনিয়মিতগল্প নেই, নেই কোন নৈতিক সমাধান, নেই সুখান্ত পরিণতি কিন্তু আছে বিস্ময়, আছে সাহস, আছে আত্ম-উদ্ঘাটনের পথরেখা

নাসরীন জাহান আমাদের শিখিয়ে দেন-নারী কেবল প্রেমের পাত্র নয়, কেবল জননী নয়, কেবল কল্পনার প্রতীক নয় নারী নিজেই এক অনন্ত রহস্য, এক দ্যুতিময় ঘূর্ণি, এক নিজস্ব গন্ধ, স্বপ্ন, ভাষা সেই নারীর নামইউড়ুক্কু’-যে বন্দী হয় না, ধরে রাখা যায় না, শুধু দূর থেকে ছায়া পড়ে থাকে

এমন বই বাংলা সাহিত্যে ঘনঘন আসে না এবং যখন আসে, তখন পাঠক হিসেবে আমাদের উচিত-তাকে পাঠ করা নয়, তাকে অনুভব করা



অলংকরণঃ তাইফ আদনান