জলধি / পাঠ-পর্যালোচনা / উড়ুক্কু: বাস্তব, রূপকথা ও মানসিক জটিলতার এক নিবিড় পাঠ
Share:
উড়ুক্কু: বাস্তব, রূপকথা ও মানসিক জটিলতার এক নিবিড় পাঠ

.

বাংলা সাহিত্যের কথাসাহিত্য ধারায় আশির দশকের শেষ থেকে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে একটি নতুন ধ্বনি যুক্ত হয় নাসরীন জাহানের মাধ্যমে দশকের উদীয়মান নারীকন্ঠের মধ্যে তাঁর নাম গুরুত্বপূর্ণ তাঁর কথাসাহিত্য নারীর মানসিক জগত, একাকীত্ব, স্বপ্ন-বেদনা সামাজিক প্রেক্ষাপটকে এক অনন্য ভাষায় প্রকাশ করে উড়ুক্কু (১৯৯৩) তাঁর সৃষ্টিশীল শক্তির এক উজ্জ্বল সৌধ, যেখানে মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা, রূপকথা- ময় বর্ণনা তীক্ষ্ণ বাস্তববোধ মিলেমিশে এক নতুন আখ্যানভঙ্গী তৈরি করে এই তাঁর প্রথম উপন্যাস, যা প্রকাশের পরই সমালোচক পাঠক সমাজে প্রবল আলোড়ন তোলে ১৯৯৪ সালে এটি ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করে- শুধু কাহিনীর জন্য নয়, বরং এক নতুন আঙ্গিকের কথাসাহিত্য চর্চার জন্য

উপন্যাসের নায়িকা নীনা- এক বিচ্ছিন্ন, মধ্যবিত্ত নারী, যিনি অতীতের আঘাত, বর্তমানের সামাজিক চাপ, আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা নিয়ে বেঁচে থাকেন নাসরীন জাহান এই চরিত্রকে গড়েছেন এমনভাবে, যেখানে ব্যক্তিগত বেদনা সামাজিক বাস্তব একে অপরের সঙ্গে অলৌকিকভাবে মিশে যায়

 

.

উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে নীনার মন- যা একদিকে দগ্ধ অতীতের ভারে নত, অন্যদিকে মাতৃত্বের নতুন অনুভূতিতে দ্বিধাগ্রস্ত

* বিবাহবিচ্ছেদ : স্বামী সমকামী হওয়ায় নীনার বিবাহ ভেঙে যায় শুধু সম্পর্কের ভাঙন নয়, এর সঙ্গে জুড়ে থাকে সামাজিক অপবাদ, পরিবার আত্মীয়দের চাপ

* শিশুমৃত্যুর বেদনা : প্রথম সন্তান জন্মের পরপরই মারা যায় এই ট্র্যাজেডি নীনার মনোজগতে গভীর ক্ষত তৈরি করে, যা তাঁকে নতুন মাতৃত্বের আনন্দ উপভোগে দ্বিধাগ্রস্ত করে তোলে

* গর্ভধারণ সংকট : আবার গর্ভবতী হয়ে নীনা দ্বিধায় পড়েনড়্গর্ভপাত করবেন নাকি জন্ম দেবেন? এই সিদ্ধান্তে তার মধ্যে তৈরি হয় প্রবল আত্মসংকট

এই আত্মসংকটকে নাসরীন জাহান উপস্থাপন করেছেন এত সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক বর্ণনায়, যেখানে পাঠক নীনার ভেতরের প্রতিটি ধাক্কা, অনিশ্চয়তা দ্বিধা উপলব্ধি করতে পারেন, অনুভব করতে পারেন নানাবিধ উপকরণে এটা শুধু এক নারীর সংকট নয়- এটা মধ্যবিত্ত সমাজের নারীর অস্তিত্ব-সংকটের প্রতীক

 

.

উড়ুক্কু সম্পূর্ণ বাস্তবধর্মী কাহিনি, তবুও এর ভাষা বর্ণনায় এমন একটি কাব্যিক মাধুর্য রয়েছে যা একে রূপকথাময় আবরণে মুড়ে রাখে

* বাক্যগঠন শব্দচয়ন এমনভাবে সাজানো যে পাঠকের মনে দৃশ্যগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠেযেন এক একটি দৃশ্যময় সিনেমার ফ্রেম

* দৃশ্যের বর্ণনায় বিবিধ রূপক, উপমা, এবং অলংকারের ব্যবহার আছে, যা আখ্যানকে শুষ্ক বাস্তবতার বাইরে নিয়ে গিয়ে অনুভূতির উষ্ণতায় সিক্ত করে দেয় বাংলা গদ্যে, পদ্যের এক নতুন স্বর নিয়ে এলেন নাসরীন বাংলা নারীকেন্দ্রিক উপন্যাসে আমরা পেয়ে এসেছিলাম সাধারণত ভাষার সরলরৈখিক, সরাসরি, স্পষ্ট সামাজিকভাবে প্রতিবাদী ধরণ কিন্তু তিনি নারীর কষ্ট দুঃখের ভাষাকে রূপান্তরিত করে দিতে পারলেন শিল্পসম্মত স্বকীয়তায় তা যে শুধু সৌন্দর্যকে আহ্বান জানালো তাই নয়, মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতাকেও তা মুখর করে তুলেছিল উড়ুক্কু ভাষা পেয়েছে নিঃসন্দেহে এক সাংগীতিক আবহও পাঠ করার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি পাঠক পেলেন শ্রুতির আনন্দময় অনুভূতি আর বাস্তব-অবাস্তবতার মধ্যিখানে 

একখানি যে মায়াময় পর্দা টাঙিয়ে রাখলেন নাসরীন, তা অবশ্যই তাঁর পদ্যময় গদ্যের এক আশ্চর্য বিনিয়োগ অবাক হতে হয়, সন্তানের মৃত্যুদৃশ্যের ভাষাও হয়ে উঠতে পারলো আলো-অন্ধকারের এক স্বপ্নময় ঘোর, কুয়াশাময়, দিগন্তবিস্তারী

প্রথম আলোর এক পাঠ-প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়েছে:

দ্যই তো পড়ছি আমি, কিন্তু মনে হচ্ছে যেন শেষ না হওয়া কোনো কবিতা... শব্দের সুষমায় যে দৃশ্য তিনি আঁকছেন, আমি স্পষ্ট দেখতে পাই

এই কাব্যিক সুর উড়ুক্কু-কে কেবল উপন্যাস হিসেবে নয়, বরং এক দীর্ঘ কবিতা হিসেবে অনুভব করায়

 

.

নাসরীন জাহান উড়ুক্কু-তে আশির-নব্বইয়ের দশকের ঢাকা শহরের সামাজিক বাস্তবতাকে খুব নিবিড়ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন

* নারীর স্বাধীনতার সংকট : নীনার জীবন দেখায়, কীভাবে একজন কর্মজীবী নারী এখনও পরিবার সমাজের পূর্বধারণার শিকার হন

* অর্থনৈতিক চাপ : নীনা নিজের উপার্জনে জীবনযাপন করলেও, তার জীবনযাত্রায় দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা চাপ সবসময় উপস্থিত

* রাজনৈতিক ছায়া : উপসাগরীয় যুদ্ধের আভাস, শহরের অস্থিরতা, এবং অনিশ্চিত কর্মজীবন- সবই নীনার মানসিকতার ওপর ছাপ ফেলে

এই বাস্তবচিত্রণ উপন্যাসকে শুধু ব্যক্তিগত কাহিনি হিসেবে না রেখে সময়ের দলিল হিসেবেও স্থাপন করে নাসরীন নিজেই লিখেছেন এক জায়গায় (উড়ুক্কু-এর নীনা : নাসরীন জাহান: প্রতিদিনের বাংলাদেশ: প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি, ২০২৩)-নিম্নমধ্যবিত্তশ্রেণীর চাকরিজীবী মেয়ের জীবনআখ্যান উড়ুক্কু উপন্যাস বিয়ে পরবর্তী বিচ্ছেদ, অন্য এক পরিবারের সঙ্গে সাবলেটে বাস, দারিদ্র্য, গভীর মন:কষ্ট, চাকরিতে আপস- সব মিলিয়ে দুর্বিসহ জীবনচিত্র হয়ে উঠেছে নীনা এমন বন্ধুর সময়ে তার পরিচয় হয় মায়ের প্রেমিকের সঙ্গে তার সান্নিধ্যে এসে নীনা নতুন করে জগৎ জীবনকে অন্যভাবে দেখতে চিনতে শেখে মানুষটির প্রতি প্রগাঢ় এক শ্রদ্ধাবোধ জন্ম নেয় তার মনের গভীরে এদিকে তার একদা স্বামী আবার মিলিত হতে চায় তার সঙ্গে তবু মাঝেমধ্যে পুরোনো স্মৃতি মনেপড়লে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে নীনা সদ্যোজাত সন্তানের জন্ডিসে মৃত্যু, হাসপাতাল তোলপাড় করা চিৎকার তাকে আতঙ্কিত করে তোলে ইতোমধ্যে ওমরের সঙ্গে তার পরিচয় রাগ-ঘৃণা-আনন্দ-বেদনা কিছুই তাকে যেন ছুঁতে পারে না সমাজের চোখে আত্মসম্মান বোধ-বিবর্জিত ছেলেটির সহমর্মিতায় নীনা আপ্লুত হয় গর্ভে আবার সন্তানের উপস্থিতি টের পায় সে প্রথম সন্তানের মৃত্যু সে ভুলতে পারে না অথচ এই নতুন ভ্রুণ কে নষ্ট করে দিতেও মন চায় না এই যে প্রবল আত্ম- সংকট, এটা তো আমাদের সমাজেরই সংকট এটাতো শুধু একজন নারীর সংকট না আমাদের পুরো সমাজে সংকীর্ণতা সততারও চিত্র সমাজের রুঢ় বাস্তবতা এক চিত্রকল্প এসব দৃশ্যপটকে ধরেই নীনার নির্মাণ এগিয়ে চলা

 

.

নাসরীন জাহান উড়ুক্কু-তে যে ভাষাশৈলী ব্যবহার করেছেন, তা তিনটি দিক থেকে আলাদা-

* কবিতার স্বর : গদ্যে এমন এক ধ্বনি, যা আবৃত্তির মতো প্রবাহিত হয়

* চিত্রকল্প নির্মাণ : শব্দের মাধ্যমে দৃশ্য নির্মাণের ক্ষমতা, যা পাঠকের চোখের সামনে ঘটনার স্পষ্ট ছবি আঁকে

* অভ্যন্তরীণ মনোলগ : নীনার চিন্তাভাবনা, দ্বিধা, ভয়, আশঙ্কা- সবকিছু পাঠক সরাসরি শুনতে পায়, যা মানসিক গভীরতাকে শক্তিশালী করে

তাঁর উপন্যাসের ভাষা শুধু কাহিনী বর্ণনার ভাষা নয়, তা তাঁর আখ্যানের প্রাণ কাব্যিকতা, প্রতীকধর্মিতা, নারীকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি সংবেদনশীল চিত্রকল্প- একসঙ্গে মিলেমিশে উপন্যাসটিকে বাংলা কথাসাহিত্যে একটি ব্যতিক্রমী অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে তাঁর দীর্ঘবাক্য, ছন্দ-স্পন্দনযুক্ত শব্দপ্রবাহ পুনরুক্তিময়গদ্য প্রায়শই কবি তার আবহ তৈরি করে প্রায় প্রতিটি বর্ণনায় সংবেদন- শীল চিত্রকল্পের নিপুণ ব্যবহার পাঠকের মনের মধ্যে দৃশ্যমান এক অভিজ্ঞতা তৈরি করে চরিত্র পরিস্থিতি কে স্পর্শ করেছেন তিনি প্রতীক রূপকে স্বাধীনতা মুক্তিকে প্রতীকায়িত করেছেন তিনি বারবার পাখি শব্দে আর বেদনা, অতল স্মৃতি অবচেতন জলের প্রতীকে চিহ্নায়িত হয়েছে রঙকে ব্যবহার করেছেন আশ্চর্য এক ভাষায়- বিষন্নতার জন্য নীল, উচ্ছ্বাসের প্রাণশক্তির জন্য লাল নিঃসঙ্গতা বিষন্নতার জন্য প্রতীক হয়ে ওঠে কালো নাসরীনের ভাষার বিশেষত্ব হলো মানসিক গভীরতা প্রকাশের ক্ষমতা উপন্যাসটির বেশিরভাগ অংশেরভাষা ধারণ করেছে তাঁর অন্তর্মুখীনতা স্বগত- উক্তিকে স্বপ্ন বাস্তবের মিলিত উদ্যোগে ভাষার নির্মো প্রবণতা, অনিশ্চয়তা দ্ব্যর্থকতা নীনার মানসিক অভিঘাতের উচ্চাবচতাকে পাঠকের সামনে উন্মোচিত করেছে আশ্চর্য মুন্সিয়ানায় নারী-অভিজ্ঞতার ভাষা তাঁর এক অনন্য সংযোজন মাতৃত্ব, শরীরী অভিজ্ঞতা, একাকীত্ব, সামাজিকচাপ নারীরবাচনে এক অন্যমাত্রা অর্জন করেছে খুব সচেতনভাবে কখনও কোমল এবং কখনও কঠোর শব্দ বাক্যবিন্যাসে, পুরুষতান্ত্রিকতার বিপরীত ভাষ্যে তিনি তাঁর কাহিনীর অভিমুখ নির্ধারণ করেছেন, অগ্রগামী সূচীমুখ করে তুলেছেন তাকে চরিত্র কাহিনীনির্মাণের দিকথেকে শুধু নয়, ভাষাশৈলি দিক থেকেও তাই নাসরীনের লেখা সমসাময়িক- রচনার নিরিখে এতোখানি আলাদা যদিও তিনি নিজে বলেছেন-অনেকের কাছে আমার লেখার ভাষা জটিল বলে মনে হয় কিন্তু আমি এভাবেই লিখি আমার পাঠকরাও এভাবে আমাকে গ্রহণ করতে অভ্যস্তআসলে জটিলতা নারীর অন্তর্বয়নের অনুচ্চারিত অনুরণন

 

.

নীনা কেবল একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র নয়- সে উপন্যাসের মেরুদণ্ড

* শুরুতে সে দ্বিধাগ্রস্ত, ভীত একাকী

* গল্প যত এগোয়, তার সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতা নিজের প্রতি বিশ্বাস বৃদ্ধি পায়

* মাতৃত্বের প্রশ্নে তার যে দ্বিধা- সেটাই শেষ পর্যন্ত জীবনের দিকে নতুনভাবে তাকানোর প্রেরণা হয়ে ওঠে

সহায়ক চরিত্রগুলো- অফিসের সহকর্মী, আত্মীয়, চিকিৎসক- সবাই নীনার মানসিক অবস্থার প্রতিফলনে সহযোগিতা করেছে সার্থকভাবে

 

.

প্রকাশের পর উড়ুক্কু ব্যাপক প্রশংসা পায়

* সমালোচকেরা এটিকে বাংলা সাহিত্যে নারীর আত্মবিশ্বাস, মনস্তাত্ত্বিক সংকট কাব্যিক গদ্যের এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ বলে স্বীকার করেছেন

* কিছু পাঠকের মতে, অতিরিক্ত কাব্যিক ভাষা গল্পের গতি কমিয়ে দিয়েছে, তবে অধিকাংশের মতে তাইই হয়ে উঠেছে উপন্যাসের বিশেষত্ব

* নারীবাদী পাঠে উড়ুক্কু একটি শক্তিশালী সামাজিক দলিল, যেখানে মাতৃত্ব, স্বাধীনতা আত্মনির্ধারণের অধিকারকে কেন্দ্র করে আখ্যান এগিয়েছে সাহসে ভর দিয়ে

 

. নাসরীন জাহানের বিশিষ্টতা

নাসরীন জাহান উড়ুক্কু উপন্যাসে অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে নিজেকে আলাদা প্রমাণ করেছেন-

* নারীর মানসিক গভীরতার সূক্ষ্ম বর্ণনা : যেখানে সমসাময়িকরা ঘটনাপ্রবাহে সীমায়িত থেকেছেন, সেখানে তিনি ডুব দিতে চেয়েছেন মনোগহনের অতলান্তিকে

* বাস্তব কাব্যিকতার মিশ্রণ : শুদ্ধ বাস্তবতা এবং কাব্যিক দৃশ্যপট একসঙ্গে ফুটিয়ে তোলা বাংলা কথাসাহিত্যে প্রায় বিরল

* চরিত্রকে স্বাধীনতা দেওয়া : নীনা চরিত্র লেখিকার ইচ্ছায় পরিচালিত নন, বরং তিনি তাঁর নিজস্ব মানসিক বিকাশ সিদ্ধান্তে বিকশিত হয়েছেন

 

.

উড়ুক্কু শুধু একটি উপন্যাস নয়- এটি এক নারীমনের আভ্যন্তরীণ যাত্রা, যেখানে ভাঙন ক্ষত, আশা আকাঙ্ক্ষা এবং নতুন জন্ম মিলেমিশে বেড়ে ওঠে

মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা, রূপকথাময় আবরণ এবং বাস্তব চিত্রণ- এই তিনটি স্তরে উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য সংযোজন নাসরীন জাহান প্রমাণ করে দিয়েছেন, নীনার ব্যক্তিগত কাহিনিও সমাজের বৃহত্তর সত্যকে ধারণ করতে পারে অসামান্যতায়

 

মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্বের আলোকে নীনার মানসিক অবস্থা

নীনার চরিত্র বিশ্লেষণে কয়েকটি মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করা যায়-

ফ্রয়েডীয় মনোবিশ্লেষণ (Freudian Psychoanalysis)

সিগমুন্ড ফ্রয়েডের তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের আচরণ অনেকাংশে অবচেতনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়

* অতীতের ট্রমা : নীনার বিবাহবিচ্ছেদ সন্তান মৃত্যুর অভিজ্ঞতা তাঁর অবচেতনে স্থায়ী ক্ষত নির্মাণ করেছে এই হাহাকারই তাঁকে নতুন মাতৃত্বের সিদ্ধান্তে দ্বিধান্বিত করে তোলে

* দমন (Repression) : নীনা তাঁর পুরনো বেদনা সরাসরি স্বীকার না করে তা দমন করে রাখেন, কিন্তু উপন্যাসের প্রতিটি অভ্যন্তরীণ মনোলগে সেই দমিত বেদনা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠতে চায়

* এরিক এরিকসনের মনোসামাজিক বিকাশ তত্ত্ব : এরিকসনের মতে, প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো Intimacy vs. Isolation এবং Generativity vs. Stagnation

* Intimacy vs. Isolation: নীনার ব্যর্থ দাম্পত্য সামাজিক বিচ্ছিন্নতাIsolation”-এর দিকে তাঁকে নিয়ে গেলেও, অফিসজীবনের সমাজ- সংযোগবিন্দু ভেতরে ভেতরে তাঁকে ইন্টিমেসির সুযোগ এনে দেয়

* Generativity vs. Stagnation : নতুন সন্তান ধারণের প্রশ্নে নীনা নতুন জীবনসৃষ্টির ইচ্ছা জীবনের স্থবিরতার মধ্যে টানাপোড়েনে থাকেন, দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে চালিত হন এই বিশেষ উপলব্ধিকে এরিকসনের তত্ত্ব দিয়ে বিচার করা সম্ভব

 

এলিজাবেথ কুবলার-রসের শোকের পাঁচ ধাপ (Five Stages of Grief)

নীনার শিশুমৃত্যুর পরবর্তী মানসিক অবস্থা কুবলার- রসের তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারি আমরা-

. Denial (অস্বীকার) : প্রথমে নীনা নিজেকে বোঝান যে এই ক্ষতি তাঁকে মানসিকভাবে ভঙ্গুর করে দিতে পারবে না

. Anger (রাগ) : সমাজ, ভাগ্য নিজের ওপর অপরিসীম ক্ষোভ জমে উঠতে থাকে

. Bargaining (বিনিময়ের আশা) : নতুন সন্তান জন্ম দিলে হয়তো পুরনো ক্ষতি পুষিয়ে যেতে পারেএধরনের আশা তৈরি হয়

. Depression (বিষণ্ণতা) : একাকিত্ব, নিরাশা, এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তাঁকে গ্রাস করে

. Acceptance (গ্রহণ) : গল্পের শেষভাগে নীনা নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলেন, যা গ্রহণের এক অনুপম চিহ্ন

 

. নারীবাদী মনোবিশ্লেষণ (Feminist Psychoanalysis)

নারীবাদী মনোবিশ্লেষণ অনুযায়ী, নীনার সংকট কেবল ব্যক্তিগত নয়- এটি একটি পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোর আউটকাম

* বিবাহবিচ্ছেদের দায় নারীর ওপর চাপানো

* মাতৃত্বকে নারীর প্রধান পরিচয় হিসেবে দেখার প্রবণতা

* অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও সামাজিক সম্মান না পাওয়া

নাসরীন জাহান এই তত্ত্বগুলো হয়তো সরাসরি ব্যবহার করেননি, তবু এই আখ্যানের ভেতরে নীনার অভিজ্ঞতা এমনভাবে ভাষা পেয়েছে যে এগুলোর সঙ্গে মনোবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার অনেকখানিই মিল খুঁজে পাওয়া যায় বাকি যা থেকে যায়, তাহলো তাঁর জীবনের উপলব্ধি পর্যবেক্ষণের এক অনন্যসাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি

উড়ুক্কু নাসরীন জাহানের কথাসাহিত্যের এক বিস্মিত মাইলফলক এটি নারীর ব্যক্তিগত বেদনা সামাজিক বাস্তবতাকে এমনভাবে উপস্থাপিত করে, যা একদিকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে গভীর, অন্যদিকে শিল্প-সম্ভাবনাপূর্ণ রূপকথাময় আখ্যান কাঠামো বাস্তবতার তীক্ষ্ণচিত্রণে শুধু একয়উপন্যাস নয়, বরং নারীর মুক্তি আত্ম- পরিচয়ের  দীর্ঘ যাত্রাপথের সাক্ষী হয়ে থাকে রচনা

 

রেফারেন্স

. জাহান, নাসরীন উড়ুক্কু ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স, ১৯৯৩

. রহমান, মোহাম্মদ আজিজুরনাসরীন জাহানের কথাসাহিত্যে নারীর আত্মসংকট মুক্তির প্রয়াসবাংলা একাডেমি সাহিত্য পত্রিকা, খণ্ড ৪৮, সংখ্যা , ২০১০, পৃ. ৯৭-১১২

. হক, ফরিদা বাংলা নারীর কথাসাহিত্য: আশি নব্বইয়ের দশক ঢাকা: অনন্যা, ২০০৫

. আলম, রুবিনাউড়ুক্কু: বাস্তব কল্পলোকের সংলগ্নতাপ্রথম আলো সাহিত্য সাময়িকী, ১৫ আগস্ট ২০০৩, পৃ. ১২-১৫

. Kabir, Anis. Contemporary Bangladeshi Women Writers and Their Narratives. Dhaka: Writers.ink, 2014.

.       Chowdhury, Shamsad Mortuza. "Psychological Underpinnings in Nasreen Jahan's Fiction." Journal of Bengal Studies, Vol. 2, Issue 1, 2016, pp. 4560.

. Begum, Afroza. "Feminist Consciousness in Nasreen Jahan's Urukku." Asian Journal of Literature, Culture and Society, Vol. 5, Issue 3, 2012, pp. 88102.

.       বাংলা একাডেমি বাংলাদেশের কথাসাহিত্য: ১৯৭১-২০০০ ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ২০০১ 



অলংকরণঃ তাইফ আদনান