প্রত্যেক মানুষের হৃদয়ে সুপ্ত থাকে এক সত্তা। শিল্পীসত্তা।সে সত্তার কখনো প্রকাশ ঘটে ভাবের ব্যঞ্জনায়, শব্দের অনুরণনে, কখনো অন্য মাধ্যম ব্যবহার করে। একজন শব্দশিল্পীর চমৎকার বিন্যাসে সাদামাটা চিত্রও হয়ে ওঠে বাঙ্ময়। প্রবাসের আয়েশী জীবনেও মনের রথ উড়ে আসে স্বদেশভূমে, যদি সেই কল্পনা বিলাসী মন হয় দেশমাতৃকার প্রেমে উন্মুখ। এমন এক কবি আবদুল হাসিব। কানাডায় তাঁর প্রবাস জীবন। তাঁর প্রথম কবিতাগ্রন্থ : 'অষ্টপ্রহর স্পর্শ চাই'।এটি তাঁর দ্বিতীয় প্রকাশিত গ্রন্থ।
আধুনিক কবিতার জগৎ বর্ণিল, ব্যঞ্জনার মাধুর্যে ভাবিয়ে তোলে পাঠক হৃদয়। কবিতার ইতিহাসের ধারাবাহিক পথে পরিক্রমায় আগন্তুক কবি আবদুল হাসিব। কিন্তু তাঁর শব্দের চমৎকার বিন্যাসে বোঝা যায় এ জগতে তাঁর বিচরণ অনেক দিনের। মুখবন্ধে তাঁর বিনয়ী উচ্চারণ, ' ...তখন আমি কেবল বর্ণমালার অক্ষরগুলোর অবলম্বন নিয়ে নিজের মতো করে অক্ষরবিন্যাসী অনেকগুলো সারি নির্মাণ করি।... আমার ওগুলো কবিতা নয়, ওগুলো কেবল কথা। ' গ্রন্থটি অভিনিবেশসহ অধ্যয়ন করলে অনুমেয় হয়, তাঁর ওগুলো কেবল কথা নয়, ছন্দময় কাব্যিক উচ্চারণ।
তাঁর রচনার সাবলীলতা প্রমাণ করে নবীন কবি শেকড় সন্ধানী। গ্রন্থে সংকলিত ৫৭টি কবিতার ৫০টিই কানাডার প্রবাস জীবনের বেদনামথিত বিন্যাস। মাত্র ৭টি মাতৃভূমিতে অবস্থানকালে রচিত।
দেশ স্বাধীন হলো। পেরিয়ে গেলো ক-য়ে-ক বছর। বিদেশ বিভূইয়ে বসেও কবি আবদুল হাসিবের মনে সঞ্চারিত হয় অযুত প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার ভাবনা। পাওয়া না পাওয়ার যোগ-বিয়োগে তিনিও সচেতন অংশীদার। স্বাধীনতার স্বপ্নসাধের অপূর্ণতা -চিন্তায় কবিমন বিদ্রোহী।
তাঁর ভাষায়,
'এখন আমার হৃদয়জুড়ে একটি মাত্র গান
দেশকে মুক্ত করতে হবে না হয় যাবে প্রাণ,
রক্তস্রোতে অষ্টপ্রহর একটি মাত্র গতি
আত্মদানে উদ্যোগী আমি জন্মভূমির প্রতি।
(আমি আজ বদলে গেছি)
'মহাসড়ক' কবিতাকে কেন্দ্র করে বায়ান্নর রক্তঝরা একুশের স্মৃতি দৃশ্যমান,
'মনে কি পড়ে তোমার বায়ান্নের কৃষ্ণচূড়া ভোর
কতকগুলো তাজা প্রাণের রক্তস্নানে ছিল বিভোর।'মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের উজ্জ্বল দিনগুলোর গভীর ছায়াপাত কবির কবিতায় ভাস্বর। স্বাধীনতার জন্যে আত্মত্যাগ, ছেলেহারা মায়ের আর্তনাদসহ বিচিত্র ভাবনায় কবিচিত্ত কাতর, ব্যথাতুর ।
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কর্মরত বাবার জন্যে কঠিন ভাবনা: কখন জানি কোন রাজাকার শনাক্ত করে দেয় পুড়িয়ে দেয় ঘর-বাড়ি, নয়তো অকস্মাৎ চলে যেতে হবে গুলির তলে।
'আমার চোখে যে স্বাধীনতা জ্বলে
সে আমার প্রিয়তমা স্ত্রীর
পাশবিক অত্যাচারের শিকার
ধুলায় লুণ্ঠিত বিবস্ত্র শরীর।'
(মূর্ত স্বাধীনতা)।
এবং
'পশ্চিম দিগন্ত চুমে অস্ত গেল
কত পূর্ণিমার চাঁদ কত আরক্তিম সূর্য
স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী নিকটে এলো
অথচ আমার ছেলেটি বুকে এলো না।'
(নিশীথের খোলা জানালা)
লাল সবুজের পতাকা পতপত করে উড়ছে বীরদর্পে। বাংলার আকাশ স্বাধীন। প্রিয়জন বিচ্ছেদে কাতর স্বজন। তাঁদের বেদনায় কবিমন ভারাক্রান্ত। স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর অকাল মৃত্যু।ব্যাকুল কবি হৃদয় বিষাদাচ্ছন্ন,
'আজও বন্ধুর জন্যে একটি দেশ কাঁদে
একটি পতাকা কাঁদে,
লক্ষ কোটি মানুষের প্রাণ কাঁদে'
(বন্ধুর জন্যে কাঁদে)
দেশের জন্যে কবিমন আকুল। আবার বিয়োগব্যথায় ব্যথাতুর, সহপাঠী- বন্ধুর অকাল মৃত্যুতে। এমনি বৈচিত্র্য আবদুল হাসিবের কবিতায় স্পষ্ট। কবির বন্ধু জসিম উদ্দিন নিহত হয়েছেন সড়ক দুর্ঘটনায়। তাঁর মৃত্যু সংবাদে তিনি স্মৃতিভারে কাতর। বন্ধুর বিয়োগব্যথায় ব্যথিত কবির উচ্চারণ,
'এ বাড়ি আর জেগে জেগে উঠবে না, পুরানো শব্দগুলো অহরহ বাজবে কানে, চোখ হবে নদী, বুক হবে পাথর বাড়িখানা প্রতীক্ষায় রবে নিরব নিথর ; '
(প্রস্তর প্রহর)
কবিতাটি দীর্ঘ হলেও বিন্যাসের কুশলতায় ক্লান্ত হবে না পাঁড় পাঠক। কবির সার্থকতা তো এখানেই।
ভালোবাসা সে তো কবিতার প্রাণ। কবি ভালোবাসেন তাঁর প্রিয়াকে। সে সবুজ-শ্যামল বালাদেশের প্রকৃতির মতো অনিন্দ্যসুন্দর। প্রকৃতির পোশাকেই যেনো তাকে মানায় আরো বেশি। বিরহ ক্লান্ত কবির আহ্বান,
'এমন দেরি করছো কেন এত কেন ভয়
চলে এসো বেনী খুলে এলোমেলো চুলে
'যদি অনাবৃত দেহ থাকে তাও যাও ভুলে
...
রেখে এসো পরিয়ে দেব তৃণলতা যা জুটে।'
(নিকুঞ্জে এসো)
সুদূর পরবাসে কবির বসবাস। দেহ পরবাসী। মন-মনন অবগাহন করছে স্বদেশের প্রকৃতির সৌন্দর্যে। অধিকাংশ কবিতার শরীরে তার পরিচয় সুস্পষ্ট।
ক) 'যতটুকু সুন্দরতায়
শরৎ রাতের শুভ্রখণ্ড মেঘ
চুমু খায় আধখানা চাঁদের ঠোঁটে।
(আমার চোখে তুমি)
খ) 'নগ্ন পায়ে হাঁটতে যাব পুকুরপাড়ে
শিশির ভেজা ঘাসে আমি অনেকক্ষণ ধরে হাঁটবো
আর চোখ ভরে দেখবো, হিজলের নরম ফুল
...'
(একখণ্ড ভূমি চাই)
জন্মভূমির পরশ সে তো মধুময়। প্রবাসী কবিহৃদয় সে পরশের জন্যে পাগলপারা । শয়নে -স্বপনে -জাগরণে কবিপ্রাণ আকুল মাতৃভূমির পরশ পেতে।তার পরিচয় মাত্র দুটো পঙ্ক্তিতে,
'অষ্টপ্রহর স্পর্শ লাগে বুকের পাশে
সর্বত্রই চোখের মাঝে স্বদেশ ভাসে।'
(সর্বত্রই ভাসে)
দূরদেশ কানাডায় পরবাসে ব্যস্ত কবি। তাঁর ভাবনাজুড়ে বিস্তার করে সৌন্দর্যস্নাত বাংলার চিত্র। দেশে ফেরার স্বপ্নে তিনি বিভোর,
'যাওয়া আর কবে হবে, পদ্মের পুকুরে
যার জলে মোটা চাঁদ নিশিরাতে ঝরে,
কবে যে আর যাব আমি বাংলার বুকে
কবে আমি কাটাবো কাল পরম সুখে।'
(আমি আর কবে যাব)
বিদেশ বিভুইয়ের শহরের নিরাভরণ কৃত্রিম পরিবেশ দর্শনে নাভিশ্বাস উঠেছে কবিচিত্তে। তাঁকে বলতে শুনি,
'ওখানে নিমের শাখা নেই, নেই লক্ষ্মী পেঁচা
ওখানে শান্তির পথ নেই, নেই শান্ত কথা
ওখানে নিশি রাতে চলে চরিত্র কেনা-বেচা
ওখানে কঠিন কষ্ট আছে, আছে বুকে ব্যথা।'
(ওখানে ঘুম আসে না)
বিভিন্ন কবিতায় স্পষ্টত দৃশ্যমান- জন্মভূমির ভাবনার গহনে কবির কল্পবাস। নাম কবিতায়ও লক্ষ্যণীয় বর্ণিল বাংলাদেশের চমৎকার রূপ। শেকড়সন্ধানী কবির হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা, প্রিয়ার সান্নিধ্যের কথকতায়ও ধরা পড়ছে বাংলার অনাবিল সৌন্দর্য:
'... তোমার আয়তলোচন মাঝে
স্নিগ্ধ ভোরের পাতা ঝরা দেখবো, শাপলার বিলে
শুভ্র বলাকার ডানায় ডানায় উল্লাস দেখবো
...
তোমার অবস্থানে নিবাস গৃহ হবে নিধুবন
তাই এই আমি, অষ্টপ্রহর স্পর্শ চাই তোমার।'
আধুনিক বাংলা কাব্যাঙ্গনে নতুন অভিযাত্রী আবদুল হাসিব। তাঁর শব্দ চয়ন এবং চমৎকার কিছু উপমাতে হৃদয়গ্রাহী মানসিকতার পরিচয় ভাস্বর।
ক) 'শুভ্রশঙ্কের মতো চালধোয়া পানি'
খ)' বধূয়ার ঠোঁটের মতো আরক্তিম আকাশ'
গ) ' বাঁশঝাড়ের চিরল শরীর'
পাঁচ ফর্মার কবিতাগ্রন্থের বাঁধাই মোটামুটি। সুন্দর প্রচ্ছদ এঁকেছেন ধ্রুব এষ। প্রকাশকাল একুশে বইমেলা ২০০৭, মূল্য ৮০ টাকা। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা।
৩৫শ কবিতার শুদ্ধ শিরোনাম হবে ' নিশীথের খোলা জানালা', এই কবিতার শিরোনামসহ কিছু মুদ্রণ ত্রুটি স্বভাবতই লক্ষ্যণীয়। 'অষ্টপ্রহর স্পর্শ চাই', কাব্যে প্রকাশিত হয়েছে আবদুল হাসিব এঁর বৈচিত্র্যময় ভাবনার সম্মিলন। কবির সৃজনশীল ভাবনার বিকাশে সমৃদ্ধ হোক কবিতার নতুনতর ধারা। গ্রন্থটির বহুল প্রচার আমাদের কাম্য।
অলংকরণঃ তাইফ আদনান
