জলধি / পাঠ-পর্যালোচনা / অনন্তের সরণিতে শব্দের দীপাবলি
Share:
অনন্তের সরণিতে শব্দের দীপাবলি
​গদ্যের অবয়বে কবিতার দিনলিপি
 
​সমালোচনা সাহিত্য যখন তত্ত্বের শুষ্ক কাঠখড় আর নীরস অ্যাকাডেমিক কচকচানিতে পর্যবসিত হয়, তখন অনিমেষ মণ্ডলের গদ্য আমাদের নিয়ে যায় এক সম্পূর্ণ ভিন্নতর আলোকসম্ভবা ভূখণ্ডে। তাঁর গদ্যগ্রন্থ 'সময় ও মহাজগতের সংকেত' (অক্টোবর ২০২৬) নিছক কোনও পুঁথিগত মূল্যায়ন বা প্রথাসিদ্ধ কাব্য-সমালোচনার সংকলন নয়; এ যেন একজন তন্নিষ্ঠ কবির হৃদয়ানুভূতির আশ্চর্য আরতি। গ্রন্থের ভূমিকায় স্বয়ং লেখক অকপটে তাঁর অন্তরের কথা ব্যক্ত করেছেন—
​“যখনই কোনও প্রিয় কবির কবিতা পাঠ করি তখনই একটা ঘোরের রেশ অনেকক্ষণ আমার মনে থেকে যায়। সেই ঘোর থেকে কিছু কথা জন্ম নেয়। সেগুলোই লিখতে থাকি। ... কোনও আলোচনা বা সমালোচনা নয়। এ শুধুমাত্র আমার নিজস্ব পাঠ। আমার কবিতাযাপনের দিনলিপিও বলা যেতে পারে।”
​এই স্বীকারোক্তিই গ্রন্থটির মূল সুর বেঁধে দেয়। অনিমেষ মণ্ডল কবিতা পড়েন এক নিমগ্ন ধ্যানীর মতো, আর সেই পাঠলব্ধ অভিঘাত যখন তাঁর কলমে গদ্যের শরীরে রূপ নেয়, তখন তা নিছক বিবরণাত্মক গদ্য থাকে না—উত্তীর্ণ হয় এক গভীর কাব্যিক সুষমায় ও আধ্যাত্মিক সংকেতে। তিনি প্রতিটি কবির সৃষ্টির অন্তরালে প্রচ্ছন্ন দার্শনিক চৈতন্য, নক্ষত্রলোকের সংকেত এবং আধ্যাত্মিক উপলব্ধিকে স্পর্শ করতে চেয়েছেন।
 
নৈঃশব্দ্য, নির্জনতা ও অতীন্দ্রিয় অন্বেষা
 
​অনিমেষ মণ্ডলের কাব্য আলোচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি কবিতার বহিরঙ্গ রূপের চেয়ে কবির মনোজগতের অন্তর্লীন স্পন্দনটিকে ধরতে ভালোবাসেন। আলোক সরকারের কবিতা আলোচনা করতে গিয়ে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে এই কবি অস্তিত্বের সীমানা পেরিয়ে এক অপার্থিব অনস্তিত্বের দিকে যাত্রা করেন। তিনি লিখেছেন—
​“তাঁর কবিতার অন্যতম প্রধান তত্ত্ব হচ্ছে যা কিছু অস্তিত্বশীল তা আছে একটা বিরাট না থাকার মধ্যে। ... আছে অথচ নেই এটা কেমন একটা ধোঁয়াশা মনে হলেও খুব গূঢ় আধ্যাত্মিক চেতনায় এটাই সত্য। আমাদের এই অস্তিত্ব নিমিত্ত মাত্র। সব কিছুর পিছনে এক বিরাট শক্তির গভীর খেলা রয়েছে।”
​আলোক সরকারের কবিতার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি জীবনানন্দের সতর্কবার্তা এবং উপনিষদীয় নির্জনতার উল্লেখ টেনে এনেছেন। অন্ধকার, স্তব্ধতা, হেমন্তের নদী আর শিউলি কুড়ানোর মতো অনুষঙ্গ কীভাবে কবির নিভৃত সাধনালব্ধ চৈতন্যকে নির্দেশ করে, তা অনিমেষবাবুর স্পর্শে অনবদ্য রূপ পেয়েছে।
​বীরভূমের সহজিয়া মাটি ও সুফি ধারার অগ্রগণ্য কবি কবিরুল ইসলামের কবিতা আলোচনাতেও তাঁর এই অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি সমুজ্জ্বল। কবিরুল ইসলামের কবিতার মর্মবাণী উদ্ধৃত করে অনিমেষ মণ্ডল দেখান প্রেমের বিকল্প ঈশ্বররূপ—
​“বস্তুত একটিই বস্তু কবিতার জন্ম দিতে পারে:
ভালোবাসা, হে আমার বিকল্প ঈশ্বর!
একটি বৃক্ষেরও নাম সেই ভালোবাসা
মাটির শরীরে যার দৃঢ় মূল কিন্তু ঊর্ধ্বে ডালপালার বাহু
আলো হয়ে আকাশে বাড়ানো...”
​অনিমেষের ভাষায়, কবিরুল ইসলামের এই প্রেম কোনো রক্তমাংসের কামনায় সীমাবদ্ধ নয়; এ এক বাউল-পথিকের চিরন্তন আত্মানুসন্ধান, যেখানে “নারী হয়েছে অন্তরদেবতা, আর অন্তরদেবতা হয়েছে নারী”।
 
​বিজ্ঞান ও চৈতন্যের সেতুবন্ধন এক  মহাজাগতিক বিষ্ময়
 
​গ্রন্থের অন্যতম গভীর ও প্রাজ্ঞ অধ্যায়টি রচিত হয়েছে কবি বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায়ের কবিতা নিয়ে। বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায়ের কাব্যে পদার্থবিজ্ঞানের কোয়ান্টাম তত্ত্ব এবং উপনিষদের ‘একমেবাদ্বিতীয়ম’ কীভাবে এক মোহনায় মিলিত হয়েছে, অনিমেষ মণ্ডল তার এক অবিস্মরণীয় ভাষ্য নির্মাণ করেছেন। তিনি উদ্ধৃত করেছেন কবির সৃষ্টির রূপক—
​“আদিতে দীপক দীপ্ত মহাবিস্ফোরণে
রৌদ্ররূপে বিশ্বতেজ আছিল গগনে
তখনো একাকী। ক্রমে বিরহের ভার
গান্ধারে আঁধার করে প্রগাঢ় মল্লার।”
​এই আলোচনার গদ্যে অনিমেষ মণ্ডল বিজ্ঞান ও দর্শনের এমন এক মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন, যা বাংলা গদ্যে অতি বিরল। তিনি লিখছেন—
​“বস্তু থেকে ক্রমাগত সূক্ষ্ম, সূক্ষ্মতর, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অন্তিম অস্তিই তার লক্ষ্য। ... বিজ্ঞান তাই শুধু বস্তুই নয়, এক সপ্রাণ, চলমান, গতিশীল বিষয়ের নিরন্তর সাধনা। ... উপনিষদে যা একমেবাদ্বিতীয়ম নামে পরিচিত। তখন চৈতন্য ও বস্তু একাকার হয়ে যায়। চূড়ান্ত পর্যায়ে জন্ম নেয় একত্ববাদ (Solipsism)।”
​বিশ্বদেবের কবিতায় বিগ ব্যাং থিওরি, এনট্রপি কিংবা নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্ব কীভাবে গ্রামীণ দাওয়ার চালকুমড়ো কিংবা বিউলির ডালের সারল্যে মিশে গিয়ে এক মহাজাগতিক ক্যানভাস তৈরি করে, অনিমেষ মণ্ডল তা অত্যন্ত নিখুঁত নিষ্ঠায় বিশ্লেষণ করেছেন।
 
​যাপিত জীবনের ক্ষত, শূন্যতা ও সমাজবাস্তবতা
 
​দার্শনিক ভাবনার পাশাপাশি অনিমেষ মণ্ডল মানবজীবনের রক্তক্ষরণ, নিঃসঙ্গতা ও সমাজসংকটকেও গভীর সংবেদনশীলতায় উন্মোচিত করেছেন। কবি সুধেন্দু মল্লিকের আলোচনা করতে গিয়ে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে একাধারে বাৎসল্যরস ও বৈষ্ণবীয় ভক্তিরসে নিমগ্ন মানুষটিও দেশের রক্তক্ষরণে ব্যথিত হন। সুধেন্দু মল্লিকের উচ্চারণ তিনি তুলে ধরেন—
​“আমি জানি যখনই কোন তুচ্ছ কারণে আমি
ক্রুদ্ধ হয়ে উঠি তখনই দিল্লিতে চণ্ডীগড়ে
... ভারতের কোথাও না কোথাও কেউ বুলেটের অব্যর্থ
আঘাতে ধুলোয় লুটিয়ে পড়ে রক্তের ধারায়।
দ্যাখো আমার বুকে সেই রক্তের দাগ।”
​অনিমেষ মণ্ডলের মন্তব্য এখানে অত্যন্ত অর্থবহ: “আবেগঘন কোনও উচ্চারণ তাঁর কবিতাকে এতটুকু বিচলিত করে না। ... যা আছে তা হলো যুক্তি আর ভক্তির অবিসংবাদী মিশ্রণ।”
​একইভাবে কবি দীপক রায়ের আলোচনায় তিনি নক্ষত্রালোকের বিষাদ ও মানবজীবনের সামান্যতাকে তুলে ধরেছেন। স্কুল ছুটির এক সাধারণ দৃশ্যের ভেতর দিয়ে মহাকালের মুখোমুখি দাঁড়ানোর মুহূর্তটি তিনি ধরেন—
​“পঞ্চাশ বছরের স্কুলে কোটি বছরের নক্ষত্রের আলো
অসময়ে ছুটি হয়ে গেছে আজ আনন্দ পাঠশালায়।”
​এখানে অনিমেষবাবুর ভাষ্য হলো, দীপক রায় বড় কোনও প্রতীক নির্মাণ না করেও সামান্য দৃশ্যের মধ্যে অস্তিত্বের একাকিত্ব ধরতে পারেন। জীবনের ক্ষণস্থায়ী রূপকে তিনি চিহ্নিত করেছেন এক আত্মবিদ্রূপাত্মক কিন্তু সংবেদনশীল ‘তিন পয়সার যাত্রাপালা’ হিসেবে।
​কবি প্রভাত সাহার কাব্যে শূন্যতা ও দেহতত্ত্বের মাধ্যমে ঈশ্বরোপলব্ধি যেভাবে ঘটেছে, অনিমেষ মণ্ডল তার সংকেত নির্দেশ করে লিখেছেন—
​“যেখানে শূন্যের অবকাশ নেই সেখানেই তো পূর্ণতা। কবি প্রভাত সাহা সেই শূন্যের স্তবগান রচনা করেছেন বহুবার। ... ব্রহ্ম বাক্য ও মনের অতীত। ব্রহ্ম শুধু মনকে উদ্ভাসিত করে। চেতনাকে জাগ্রত করে রাখে সদা।”
​আবার শ্যামলকান্তি দাশের মাটি-ঘেঁষা রূপকথার জগত, গেঁড়ি-গুগলি, শালুক, শামখোল আর “ওড়-আড়” শব্দের মেঠো গন্ধকে তিনি শহুরে তথাকথিত কৃত্রিমতার বিপরীতে আবহমান মানবিকতার আশ্রয় হিসেবে শনাক্ত করেছেন। কবি গৌতম চৌধুরীর রাক্ষসের গান ও অনির্ণীত গন্তব্যের যাত্রায় তিনি খুঁজে পেয়েছেন ইতিহাসের পদচিহ্ন ও দূর নক্ষত্রের সংকেত। ফল্গু বসুর কবিতায় গ্রামীণ রূপরেখা ও শ্লেষাত্মক রূপকের আড়ালে মানুষের আপসহীন সংগ্রামের দর্শনকেও তিনি স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন।
 
​গদ্যশৈলী ও শব্দ ব্যবহারের চমৎকারিত্ব
 
​অনিমেষ মণ্ডলের গদ্যের সবচেয়ে বড় ঐশ্বর্য তাঁর নিজস্ব বাক্যগঠন ও শব্দচয়নের দ্যোতনা। তাঁর গদ্যে একটি শান্ত, নির্মেদ ও সংহত নদীর বহমানতা লক্ষ করা যায়। তিনি যখন তত্ত্বের কথা বলেন, তখনও সেই তত্ত্বভারাক্রান্ত ভাষা পাঠকের ওপর চেপে বসে না; বরং তা এক স্নিগ্ধ আলোর মতো চেতনাকে স্পর্শ করে।
​তাঁর শব্দব্যবহারের চমৎকারিত্ব চোখে পড়ার মতো। যেমন—‘অস্তিত্বহীনতার দ্যুতিহীন শীতল প্রকাশ’, ‘অর্থহীন অর্থময়তা’, ‘মহাজাগতিক ধুলো’, ‘হিরণ্ময় অন্ধকার’, ‘চিদাকাশ’, ‘মৃন্ময় জীবন’, ‘অনন্ত নিরাশ্রয়’, ‘অশ্রুজাতক’, ‘অক্ষর শরীরে মহামাত্রা’। তিনি এমন কিছু বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ শব্দবন্ধ সৃষ্টি করেন, যা কবিতার মতোই অনুরণন তোলে পাঠকের ভাবনাবিশ্বে। তাঁর বাক্যগুলি ছোট, অথচ তাদের অভিঘাত সুদূরপ্রসারী। প্রতিটি কবিকে তিনি বিচার করেছেন সেই কবির নিজস্ব ভৌগোলিক ও আত্মিক পরিমণ্ডলের ভেতর দাঁড়িয়ে—কখনও বীরভূমের লাল মাটির বাউল সুর, কখনও বা সুদূর মহাবিশ্বের কোয়ান্টাম ক্ষেত্র।
 
মহাকালের পটভূমিতে এক আলোকযাত্রা
 
​সামগ্রিকভাবে অনিমেষ মণ্ডলের 'সময় ও মহাজগতের সংকেত' গ্রন্থটি সমকালীন বাংলা প্রবন্ধ-সাহিত্যে এক ব্যতিক্রমী ও উজ্জ্বল সংযোজন। তিনি কবিতার সমালোচক নন, কবিতার সমমর্মী সহযাত্রী। যে আধ্যাত্মিক আর্তি, দার্শনিক নিবিড়তা এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অনন্ত রহস্য কবিদের তাড়িত করে, অনিমেষ মণ্ডল সেই গোপন সংকেতগুলিকে তাঁর গদ্যের স্ফটিকে প্রতিফলিত করেছেন। তাঁর এই গদ্যপাঠ শেষাবধি পাঠককে এক পবিত্র, নিবিড় ও প্রশান্ত অনুভবের জগতে উত্তীর্ণ করে দেয়, যেখানে জাগতিক কোলাহল স্তব্ধ হয়ে কেবল মহাজগতের অমৃতগানই বেজে ওঠে। 
#
সময় ও মহাজগতের সংকেত : অনিমেষ মণ্ডল, বার্ণিক প্রকাশন,চিন্তামণিপুর, কৈয়ড়, পূর্ব বর্ধমান - ৭১৩৪২৩, ​প্রচ্ছদ: ঋতুপর্ণা খাটুয়া, মূল্য: ৩০০ টাকা।


অলংকরণঃ তাইফ আদনান