জলধি / গল্প / সাধন মাস্টার ও ক্যানেস্তারা
Share:
সাধন মাস্টার ও ক্যানেস্তারা

ওই শোনা যায় ক্যানেস্তারা। ওই শোন কী জোরসে ক্যানেস্তারা পিটায় মধু দাসের ব্যাটা যদু দাস। বাড়ি বাড়ি হাঁটা ধরসে যদু দাস। কানের পোকা আর একটাও থাকবে নানে। হাটিকুমরুলের জনমানুষ কান খাড়া করে। ঘরের বৌ-ঝিরা মাছ কোটা ছাড়ান দিয়া পিঁড়ি ছাইড়া উঠে দাঁড়ায়! বছরভরা বাতের ব্যাধি নিয়া সুরুজের নানীর কোঁকানি দণ্ডমাত্র থামে যেন! সড়কে এমুন বাদ্য বাজায় কেডা? কী হইছে। কেডা মরসে! তল্লাটের ব্যাটা মানুষরা কেউ সাইকেল সারানি, কেউ মনোহারী দোকান খুলবার জইন্যে পা বাড়াইছিল, কেউ ধানের রোয়া বুনবার বাসনায় তৈয়ার। ঢ্যা ঢ্যা করে পুনরায় ক্যানেস্তারা পিটায় যদু দাস!

কী কয় অতঃপর, মধুর ব্যাটা যদু। জোয়ান মর্দ লুঙ্গি কাছা মাইরা নামছে। এই কামডার জইন্যে নিশ্চয় সরকারের মানুষ এক তাড়া ট্যাহা পয়সা দিব! যদু কইতাছে ডাগোর গলায়- ঘরে থাকো হগ্গলে-ঘরের বাইর হইবা না। কপাট ছিটকিনি আটক রাহো। অচিন এক মড়ক আইছে আমগো দ্যাশে। পুরা দুনিয়ায়! মানুষের সাথে মানুষের হাতও মিলান যাইব না।

আমি সাধন মাস্টার। বছরের মাস কয় পাগলা দশা। তহন মাথাডা মনে হয় আহাশে উইড়া গ্যাছে। কি করি, হাসি না কান্দি খাই না খাই- ঘুমাই না জাগা থাহি নিজেই বুঝি না। তবে কিছু লেখাপড়া আছে প্যাটে। এসএসসি পাশ। ছাত্র মন্দ ছিলাম না। সে প্যাচাল থাকগা। দুনিয়ায় নতুন কিসিমের এক অচিন ব্যারাম আসচে! বুজতাছি, এমনেই দিনকাল ভালা না। তার ওপর অচিন ব্যারাম। মাথাডার মইধ্যে টাস টাস করে। হায় ভগবান আবার না কি পাগলাদশা ধরে। এহন এই জৈষ্ঠি মাসে পুরাই জ্ঞানের নাড়ি টনটনা।

শ্রীমান যদু কিরহম ক্যানেস্তারা পিটাইতেছে। কব্জির জোর বহুত মজবুত। গর থাইকা বাইর হইতে না পারলে চলব দিন? ক্যামনে? একলা মানুষ হইলে কী হয়। এই ঘরবাড়ি পিছন দুয়ারের জলা, ১০ বিঘা সরেস জমিন, গাছ-গাছালি ঠাকুরদাদা মনমোহন দাশগুপ্ত আমারে সাফ কবলা দলিল কইরা দিয়া গেছে। তখন তো টনটনা জোয়ান মর্দ। আসফ আলী প্রাইমারি বিদ্যালয়ের ইতিহাস শিক্ষক। ঘটনা ঘটছে পরে। ধীরে সুস্থে জিরাইয়া জিরাইয়া সকল শান্তর কই আরকি। যহন কইতে থাহি তহন তো কইতেই থাকি। যহন কতা শ্যাষ তহন থাহি কিছু সময় কালা বয়রা ধইর‌্যা।

এই বছরডা মন্দ বই ভালো দেখলাম না। বৈশাখ মাসে চেনাজানা মানুষজন জাতিগুষ্টির কেউ না কেউ আসত। কেউ তো মাঝেমধ্যে একখান জংলি ছাপার ফতুয়া বা একখান ধুতি, শাজাদপুরের গামছা দিয়া যাইত। দিনে দিনে মানুষগুলা কেমুন পর পর হয়্যা গেল! হগলেই নিজের নিজের আখের গোছানের তালে আছে বুঝি। তা হইতেই পারে! আমার তো কেউ নাই দেখারও, আখের গোছানেরও না। এক্কেবারে নাইমানুষ! হাসি পায়- একলাই হাসি। আরে ক্যানেস্তারা তো আমার মান্দার গাছের গোড়ায় বাজতাছে!...

অচিন এক মড়কের পোকা-করোনা না ভরোনা কী নাম! সত্যই এ বছর মানুষে খালি কাঁদুনি গাইতাছে। কী একখান অবস্থা দাদা গো। পুষ্ট বোরো ধানের শীষগুলা হামুড় দিয়া পড়ছে মাটিত। কপাল আছড়ায়। ধান কাটুনি হাইল্যা সব গোল্লায় গেছে গা-শ্মশানে গোরস্তানে ভূত প্যাত হইয়্যা গেছে। দশ বিগায় সরেস জমিন ধান হইসে, বাম্পার ফলন। হাইল্যা নাই। আমার বছর বান্দা বর্গাচাষি রাধামাধব কয়, ‘আমি একলা কয়ডা করি ঠাকুর। হাইল্যা নাই। মানষে কেউ গর থাইক্যা বার হইবে না। সরকারে কইছে, বার হইলে জরিমানা। হুনতাছেন তো এ তল্লাটে যদু দাস কেমুন ক্যানেস্তারা পিটাইতেছে?’

আমি সাধন দাশগুপ্ত এগরে সাতে তাল মিলাইয়া কী কব? মাতা ঠাণ্ডা রাখি। মিনমিনাইয়া কই, ‘ধানের আঁটি সেজদা দিয়া থাকুক। দেখা যাক। তুমি শ্রীমান গরে যাও, খাইয়া দাইয়া গুমাও গিয়া।

রাধামাধব বামন মার্কা একটা মাজবয়সী মানুষডা। কিন্তু মনে মনে চালাকের চালাক-প্যাটে প্যাটে জিলাপির প্যাঁচ। সে পায়ের বুড়া আঙ্গুল দিয়া ছাতিম গাছ তলার মাটি খোটে। নাক ঘষে। নাক ঘষে। এইডা তার মুদ্রাদোষ একখান। মনিবের গোস্বা কতখানি হইসে মনে মনে সেইডা ওজন দেয়। আবার কই, ‘যাও, বাড়িত যাও, বাড়িত যাও, হাইলা পাইলে আইসো।সে কেমন, অচল গাড়ির মতো হেঁচড়াইয়া হাইট্যা যায়।...

বাপ দাদার ভিটি জুইড়্যা চৌচালা টিনের ঘর। চারমুড়া বেদানা, পেয়ারা, কাঁটাল, আমের গাছ। অবশ্য ফল পাকুড় আগের মতো ফলে না, আমি তো ঠাকুরদাদার মতো যত্নআত্তি করতে পারি না। জানিও না তেমন। বাবা রাজন দাশগুপ্ত আমার কৈশোরকালে পরপারে গিয়া আমগরে নিস্তার দিয়া গেছেন। রাজনবাবুর বাবুগিরির ঘটনা অহনও পাড়াপড়শি গুরুজনেরা কয় তামাক টানতে টানতে। বাবা ভজন গাইতেন, কীর্তন গাইতেন। আবার যাত্রা পালায় রাজা বাদশা সাজতেন। বাবায় না কি টপ্পাও গাইতেন। খারাপ যেডা করতেন, হেইডা হইল গাঁজা, ভাঙ, কেরু, বাংলা দিয়া তার প্রাতঃরাশ করতেন। মায় দাদা দাদু পূজার ঘরে জাগ্রত ঠাকুরের পায়ে প্রণাম নিবেদন করতেন। সকাল সন্ধ্যা আমগো বাগানের জবা, বেলি দিয়া পূজা আর্চা হইত, ধূপ ধুনার সুবাস বাতাস ভরা থাকত। আর বাবারে কেউ ঘাটাইত না। ঠাকুরদা বহুত সাদ্য সাধনা করছেন, কাম হয় নাই। রাজন দাশ গাঞ্জা খাইয়া গরের মইধ্যে দুয়ার দিয়া নাচতেন, মাতলামি করতেন। শেষকালে লিভার পইচ্যা চইল্যা গেলেন।

তক্তপোষের তলায় পইর‌্যা রইল বোতলের সার কত কিসিমেরমায় দিন কয় হেইগুলা ধইর‌্যাই কানতেন। আর কি হাতের নোয়া কপালের সিন্দুর মুইছ্যা মায় কেমন উদাস হইয়া গেলেন। এরপরের বছর মায়ের মামাবাড়ি বর্ধমানে ঠাকুরদা দিদিমা আর ছোট ভাইবোন দুইজনরে নিয়া দ্যাশ ছাড়া হইলেন! ঠাকুরদারও জাতিগুষ্ঠী ছিল বর্ধমানে। আমারে বহুত টানা হেঁচড়া পারছেন। আমি নড়িচড়ি নাই। কানছি চুপে চুপে। কিন্তু দ্যাশ ভিটা ছোটবেলার জনমানুষ ফেলাইয়া যাইতে পারি নাই। আমি ইতিহাসের শিক্ষক মানুষ। শিকড়ের মায়া ছাড়তে পারি নাই। এই ভিটেমাটির দয়া, নাড়িপোতা উঠানের ঋণ বুকে নিয়া পইড়া রইলাম। মাটি কামড়াইয়া।

আমি যখন পাগলাদশায় পড়ি তখন সড়কের পোলাপান চিল্লাপাল্লা করে, ‘পাগলা তোর পাগলি কই?’ আবার মহাব্যাদ্দপ মাস্তানগুলা সুর করে পাগলা তোর পাগলি হইতে চাই, তোর প্রেম অনলে পুইড়া হবো ছাই।আমি তো পুরা পাগল হই না। পাগলা দশা হয়!

ওইসব আমি সামাল দেই। মাথা ঝুঁকাইয়া সমানে সামনে হাঁটা দেই। বৈকালটুক মুন্সির মুদি দোকান আমার ঠাঁই। সস্তায় পাঁচদিন টুকুর ছোট মেয়া টুনটুনি চা বানায়। কী রহম স্বাদের চা গো। এ টুকুনি চড়ুই পাখির মতোন মেয়াডা। দুই বেনি দুলায়া হাইস্যা হাইস্যা চায়ের গেলাস খান আমারে ধরায়া দেয় কাকু চা নেন। গরম গরম।মাইয়া একখানা। বছরভর বাকি খাই। মাঝে মইধ্যে নগদে সওদাপাতি নেই। হালখাতার আগদিন হিসাব-নিকাশ পাই পাই মিটায়া দেই। বাবায় মাতলামি করছে, তাই কি? আমার মায়ে জপতপ পূজা আর্চা করতেন। আমগরে ভালো মানুষ হইতে কইতেন আর কান্তেন। ঠাকুরদা তো কালীভক্ত সাধু দেবতা জাতের মানুষ ছিলেন।

রাধামাধব বছরান্তে হাজার পনেরো টাকা হাতে ধইর‌্যা দেয়। মুন্সি দফায় দফায় জানান দেয়, ‘মাধব আপনারে বেহদ্দ ঠকায় ঠাকুর।আমি মন্দ ছন্দ কথায় কান দেই না। ভগবান সবাইরে সুখে রাখো। দুধে ভাতে না রাখলেও ডাল ভাতে নুন পাস্তায় রাখো। একটা কতা বলি আমি কিন্তু মানুষরে খুব ভালোবাসতে জানি। খু-উ-ব। কিন্তু কেউ যদি অমনি দাগা দেয় তো দাগডা গাঢ়া বিন্দে। কী পোড়ায় যে!

আমার বিবাহের বয়স হইছে। মাস্টারি করি। চারচালা তিনখান টিনের। ঘরদুয়ার ফল ফলসির গাছ গাছালির অভাব নাই। তবে টাকা পয়সা হাতে তেমন নাই। যাহোক, আবার বলি একটু, আমি কিন্তু দেখতে শুনতে মন্দ না। গাত্রবর্ণ শ্যামলা ঘেঁষা ফর্সা। নাক নক্শা ভালো। মানুষে কয় আমি মানুষ হিসাবেও খাঁটি!

আমার এক পিসেমশায় আমার পাত্রী ঠিক করলেন। সম্পন্ন গেরস্ত ঘরের রূপসী কন্যা। পরিমল দাশের কন্যা মাধবী। ওই সময় পরিমল বাবুর স্বর্ণ ব্যবসায় হঠাৎ মন্দা। যমুনার গর্ভে কিছু সয় সম্পদ নিশ্চিহ্নি হয় গো। রমরমা ব্যবসায়ীর ঘরে খানিক অনটন। তা নইলে সহায় সম্পদে সাধন দাশগুপ্ত তাঁর জামাতা হওয়ার যোগ্য না। বিধাতার কত না লীলা! ওই দেবী দুর্গার মতো রূপসী আমার গৃহলক্ষ্মী হয়ে ঘরে আইলো। কী সব্বোনাশ! আমি তারে কোলে রাখি না মাথায় রাখি দিশ পাই না। সে কেমন পাথর মূর্তি মতোন। কতা কইতে সাত পাঁচ ভাবি! কী মরণজ্বালা! এমন রূপের আমার কী দরহার ছিল। মাধবীলতা কথা কয় এতোই আন্তে মাটিও জানি না শোনে। আমারই গৃহলক্ষ্মী তিনি। না কি দেবী! আমার তো কত কথা কওয়ার আছে। আমার ঘরে পালঙ্ক নাই। ঘি, মাখন, রুই, কাতলা, মিষ্টি মণ্ডার ছড়াছড়ি নাই। তার বাপের বাড়ির কুটুম আইলে আমি ছুটি হাট বাজারে। যেমনে পারি বড়ো একখান মৎস্য আমি আনতামই। রাঘরের দোকানের ছানার জিলাপি। ছোটাছুটি কইর‌্যা ঘরে আস্তে না আস্তেই দেখি ঘরবাড়ি শুনশান। মাধবীরে জিজ্ঞাসা করি, ‘দাদা ঠাকুরদা কোথায় গেলেন? আমি বাজার কইর‌্যা আনছি।মাধবী দীঘল চুলের গোছা হাত খোঁপা করতে করতে কয়, ‘উনারা চইল্যা গেলেন। জরুরি কাম আছে।কী করি। কপাল চাপড়াই। পাকঘরে মশল্লাপাতি বড়ো মাছ গইর পাড়ে। মাধবী স্নানে ঢোকে। কী করি। পাশেই আমার পিসেমশাইয়ের ভিটা। ননীবালা পিসতুতো বোন আমার। শেষে সে আসে বলে, ‘দাদা ভাইবো না। আমি দেখতাছি।সারা দুপুর ননীবালা মাছ কোটে, ধোয়, কালিয়া রাঁধে। মাধবী হালকা হেসে বলে, ‘ঠাকুরঝি কখন এলে?’ ননীবালাকে আমি কেমন বলবার পারি, ‘আয় মাছটা কী করবি কর দিদি।কিন্তু মাধবীকে সেভাবে বলা হয় না।

মাধবী মুখে কোনো মন্দ ছন্দ কইত না, খালি কেমনে জানি জলের পদ্মফুলের মতো ভাইস্যা থাকত। পাখ-পাখালি ডাকত বাঁশঝাড়ে। মাধবী ডাগর ডাগর চোখ মেইল্যা খালি শুনত, কী তার মগ্নদশা। ঘুঘু ডাকত সারা দুপুর সে উদাসিনী রূপের নারী নিমতলায় ঠেস দিয়া বইস্যা থাকত। রুমি, হাসিনারা আসত আমি ইস্কুলে গেলে। ওরা সদ্য কিশোরী। পাড়ার রূপসী কাকিমাকে দেখতে আসত। ওরা মাঝে মধ্যে কইত, ‘কাকু আপনে ইশকুলে গেলে গা কাকিমা কান্দে। বিছানায় শুইয়া কান্দে।

আমি জানি না আজও। মাধবী তার মনটারে কোনখানে জিম্মা রাখছিল! জানি না। আমার বুকভরা ভালোবাসা থৈ থৈ করে। আর সে কি না আমারে এক দণ্ডের জন্যও চিনল না। বুঝলো না। আমি যে ঠোঙায় করে প্রায় প্রতিদিন সিরাজের দোকানের সিঙ্গারা গরম আলুপুরী আনতাম। কোনোদিন ননীবালাদের বাগানের অজস্র বেলি দিয়ে মালা গাঁথত ননীর ছোট মধুবালা। ননী সুবাসে ভরপুর কয়েকগুচ্ছ বেলফুলের মালা আমার হাতে দিয়ে বলত, ‘বৌদিকে দিওবলেই কেমন করুণ চোখে চেয়ে থাকত। ও হয়তো ভাবত তার এমন রূপবান দাদাটাকে বৌদি চেয়ে দেখে না কেন! হয়তো সে সেটাই ভাবত।

বিধাতার লীলার কিন্তু অন্ত নাই দাদা। বছরও ঘুরল না! মালতীর হৃদয়হীন দেহখানা বাঁশঝাড় আলো করে পড়ে রইল। ওইখানে সে গেছিল কী কারণে। ভগবান ভালো জানে। কেউ বলে কালকেউটে ছোবল দিছিল। কেউ বলে ইন্দুর মারা বিষবড়ি খাইছিল!

আমি তারে ছুঁইতেও পারি নাই। তড়িৎ শ্বশুরমশাই, তার তিন দাদা আরো জাতিগোষ্ঠী হাজির। আমি মরমে মরে যেতে থাকি কেন জানি না। যেন এক খুনী আমি। আমি তো জানলামই না আমার গৃহলক্ষ্মীর মনডা কোন কোটরে বান্দা ছিল! খালি রূপঝলমল শরীরে তো কোন মায়ার খেলা জমে না ভগবান।

রাতারাতি শ্মশানে নিয়া গেল আমার রানিরে। ঘি মাখাইয়া স্নানাদি হইল। চন্দন মাখাইয়া পিণ্ডদান হইল। চিতায় তিন পাক ঘুরলেন তার পিতৃদেব মানে আমারই শ্বশুর তিনি। মুখাগ্নি করলেন ওই কুলের স্বজন।

আমি আসলে মাধবীর কেউ না। কোনোদিন কেউ ছিলামই না। তবে বেহুদা এতো ভালোবাসা কেনইবা জমছিল আমার এই পোড়া বক্ষে? মধুর চাকের মতো। আমি মাধবীর কেউ না গো। এমনও ঘটে সংসারে। এই সেইদিন থাইক্যা মাস দুই আমি দুই চোখের পাতা এক করি নাই! ঘুম আমার ধারে কাছে ঘেঁষে না। দিনেও না রাতেও না। তখন থেকেই আমার মাথাডা সাতমণ ওজনদার লাগতে লাগল। সব যেন কেমন চড়কিবাজির মতো। লাটিম ঘোরে বোঁ বোঁ। আমি বছরে মাস কয় পাগল দশায় ডুব পারি। আবার কয় মাস ইতিহাসের শিক্ষক। আর কি! এইগুলা সাধন দাশগুপ্তের কথা কাহিনি এ সকল মামুলি ঘটনা। আকাশ বাতাসে এমুন কত সাধনের মামুলি মামলা ঝুলে থাকে। তার কোনো মীমাংসা কোনোদিন হয় কি দাদা?

এই ক্যানেস্তারা চলতাছে যদু দাসের কজির তাকতে! জনমানুষ সড়কে হাটে না আগের লাহান! হাট বাজারে গরু ছাগলে হাটে!

আমার কঠিন অবস্থা! বালবিধবা রাঙা পিসি, আমার পাকগর সামলান। ভোরবিহানে আসেন আর সাজ নামলে খানিক ধূপধুনা জ্বালায়া নমঃনমঃ করতে করতে তার ঝুপড়ি ঘরে রওনা দেন। আজ কয়দিন রান্দার মাসি আসে না। কী বিপদ! ঝোলা গুড় আর চিড়া খাইয়া কয়দিন!

ভর দুপুরকাল। পেট ভরতি ভাতের জন্যি হাহাকার। ছাতিম গাছ তলায় কেডারে? সাদা থান পরা এক ছায়ামানুষ। চক্ষুও কি কপালের সাতে গেল গা! চক্ষু রগরাই-আরে ওতো ননীবালা! সাদা থানে শ্যামলা ননীরে লাগতাছে ছবির মতোন। ওর হাতে ঝকঝক করতাছে কাঁসার থাল বাটি। অচিন মড়কে ননীর স্বামী নিধু মণ্ডল গত হইছেন, মনে পড়ছে? ...ননী আমার চড়ুইভাতি খেলার সাথী পিসতুতো দিদি। ছোটকালে ওরে নাহক কত কিল চিমটি কাটছি? দুইডা বাড়ির পর পিসেমশাইয়ের ভিটি। কাঁসার থালে নিমফুলের মতোন ঢিবি করা ভাত, থোড় ভাজা, বাতাসি মাছে কাঁচা আমের ফালি। এতো অন্ন নয়, মায়া গো মায়া? মায়ার কাঙাল পাগল সাধন মাস্টার।

ওহে ওই বাজে ক্যানেস্তারা। তুমুল। ঘরের বাইর হইবেন না। মুকে মুকোস আটেন। কিসু না পাইলে গামছাডা দিয়া নাকমুখ আটক করেন।’...

এইবার ক্যানেস্তারা পিটায় সিধু দাস- যদুর দাদা। যদু জোয়ান মর্দ। হেই শুনছি জ্বরের জ্বালায় বিছানা নিসে। এইডা বুজি হেই নরকের কীট করোনা না ভরোনার কাণ্ড! সিধুর কব্জির জোর যদুর চাইতেও তুরন্ত?

নিমগাছের ডালে ঘুঘু ডাকতাছে। এই পক্ষীর ঘু-ঘু-উ শুনলে আর একজনে কথা মনে পড়ে গো!...

ননী ভিতরে আয়আমি ডাকি আমার গলা বুজে আসে, কেনবা? ননী আসন পাতে। ভাতের থালি সাজায়! আমি কই গাওয়ে জ্বরের ডাইনী আইছে রে। সাবধানে থাকিস ননী।ননী কতার উত্তর করে না। সে যত্ন করে কলসি থেইকা পানির গেলাসে পানি ঢালে আইটা থালি বাটি গোছায় ননী। তুই খাইছিস? আরে আমার সাথে দুই নলা খাইতে পারতিস। কেমুন বেকুব আমি তো কইও নাইকা।

ননী আমার এলোমেলো চুলের দিকে চায়। সে কয়, ‘দাদা তুমি অনেক শুকায়া গেছ! নিজের যতন করনা ক্যা?’ আমি ভরপেট খাওনের পর বেশ আরাম বোধ করি। ননীর দিক নজর কইর‌্যা ফস্ কইর‌্যা কই তুইও অনেক শুকায়া গেছিস রে। কিন্তু তরে’-

কী জানি কইতে চাইছিলাম বেবাক ভুইল্যা যাই! ননীবালা ঠাণ্ডা চোখে আমারে পরখ করে। ওর চোখ দুইটা অনেক সুন্দর, জলে টলমল করতাছে। আমার বুকের এক্কেবারে ভিত্রে যেখানে অনেক মায়া ভালোবাসা জমা থুইছিলাম, সেইখানে কেমুন ভূমিকম্প হয় জানি। তখনও ননী চোখ সরায় নাই! কী জানি কী! স্বাদের ভাত তরকারি খাইছি বইল্যা অন্যরকম লাগতাছে!

বুঝি না কিসসু। কাউরেই ঠিকমত বুঝলাম না। ননীবালা বাবু হইয়্যা বইসা আছে। তারে কী সারদা মায়ের মতো লাগতাছে। দূর ছাই... আমি দাওয়ায় বাইর হইয়া হাত ধুই। ঘুঘুডা ডাকতাছে তার বুকের কাছডা ফুইল্যা উঠতাছে। মনডা কেমুন ব্যাকুল হয়্যা যায়। অমনি সিধুর ক্যানেস্তারা বাজে ঢ্যাঢ্যা ঢ্যা...



অলংকরণঃ তাইফ আদনান