জলধি / গল্প / বস্তিওয়ালা জাগো
Share:
বস্তিওয়ালা জাগো

টাকি মাছের পোনার ঝাঁক টুপটাপ ডুবে-ভাসে। গফাইখালীর ডহর। টইটম্বুর পানিতে ভেসে থাকে স্তব্দ নীল আকাশ। ওদিকে মেঘভাঙ্গা রোদে ঝলমল করে আসামপুর গেরাম। ভুতুরে গোরস্থানের পাশে সারি সারি করচ গাছ মুখ দেখাদেখি করে ডহরের পানিতে। শরীরের সবটুকু লাজ-শরম মেলে ফুটে থাকে শাপলা ফুল। মহাকাশের সুখ ঝরে পড়ে কলমি পাতার গাল বেয়ে। বাতাসে একটু একটু কাঁপে বরুণ গাছের নরম ছায়া। একটি-দুটি কানিবক, কয়েকটা জলপিঁপি উড়ে বেড়ায় পানির খুব কাছাকাছি। নাম তার মইয়ার হাওর।

খাঁ খাঁ রোদ। ময়নাচোরার হাওর থেকে ছুটে আসে কুক্ষণের গরম বাতাস। বুড়ো আলদ সাপ শিষ দেয় ঢোলকলমির ঝোপে। বনবিড়াল, শিয়াল, মেছোবাঘ লুকিয়ে থাকে মোতরা বনে। কতকাল যেন মেঘ-বৃষ্টি নাই! গুমোট হাওয়া। কুকুরের গলার আওয়াজে কান্নার রেশ। খোয়া খোয়া জলীয়বাষ্পের আড়ালে এভাবে শুয়ে-বসে ঝিমায় কাজলার হাওর। কেউ দেখেও দেখে না; সোনাখালী হাওরের আকাশে চিল, বাজ আরো কত কী! 

হাওরদেশের কুখ্যাত ডাকাত বুড়ো কলিম মাঝি ঢোবা শুকিয়ে মাছ ধরছে। ধরে ধরে সব খালুই নামের অতল গহ্বরে ঢোকাচ্ছে। একটি দাড়কিনা মাছকেও সে রেহাই দিতে রাজি নয়।

কালো মেঘের খেলা চলছেই। কুদরত চাচার কলাবাগন চিরকাল একই ভঙ্গীতে নুয়ে থাকে। পাশেই নন্দির হাওর। শাপলা-শালুক, কলমি ফুলে দিনের বেলায় রাত নামে। হঠাৎ বজ্রপাত হয় হাওরের বট গাছে। নানা জাতের অনেকগুলো পাখিও জ¦লে ছাই হয়ে যায়! 

থমথম করে আকাশ। ঘনঘন বজ্রপাতের শব্দ শুনা যায়। কামারখাল দিয়ে দূর্বার বেগে ভেসে যায় জার্মনি কচু, টোপা পানা...সবাই হালছাড়া ভঙ্গীতে ভাটিমুখো। নীল নীল কচু ফুলের আড়ালে পুঁটি মাছের ঝাঁক। একটু সামনেই মেছোসাপরা বসে আছে হাঁ-মুখ। 

ভিতু কানিবকরা মাটির খুব কাছাকাছি। ভাব-ভঙ্গীতে পালাই পালাই। কাদাখোঁচা চুপচাপ হেঁটে যায় নিরীহ প্রাণী। শালিকরা কান্না করছে শূন্যে ভেসে! তাদের পাশেই চৌধুরীদের জারুল বন। হাওরের নাম শান্তিবসা। এক সময় নানা জাতের পাখির কলরবে সকাল-সন্ধ্যাগুলো কী আমুদেই না কাটতো! শুনতে রূপকথার মতো লাগছে? আর কে না জানে; জলপিঁপিরা যে প্রায় নির্বংশ। বক, ডাহুক...লিকলিকে শিকারিরা প্রকাশ্যেই হত্যা করছে। 

ভীমরাজ সাপের দখলে হাসন রাজার দেখার হাওর। রাধারমণের দিঘি-বাড়ি গিলে বসে আছে বিশাল এক অজগর। শিয়ালরা ঘিরে রেখেছে পবিত্র আত্মা হুক্কা শাহ’র মাজার। তাদের চোখে-দাঁতে লকলক করে আগুন!

এদিকে নলুয়ার হাওরে কঠিন প্রস্তুতি নিয়েছে শিয়াল-কুকুর-মেছোবাঘ। সুযোগে সবাই এককাট্টা। একটু তফাতে তৈরি হয়ে আছে চিল-বাজ...পেছনে কাকের ঝাঁক। মাথার ওপর শকুনদের অতিদীর্ঘ কায়া। চারদিকে কালো আর ঘোলা পানি থৈ থৈ করছে। উৎসব চলছে বিচ্ছু-ভীমরুলদেরও। তবু বিরান হাওরের বাতাসে ভেসে বেড়ায় পাহারাদারের ধমক, খামোশ! খামোশ!



অলংকরণঃ তাইফ আদনান