জলধি / গল্প / পুঁটিদি
Share:
পুঁটিদি

বাবার আদালতে পুঁটিদির কখনো সঠিক বিচার হয় না। আর কোনোদিন হবে বলেও মনে হয় না। রোজ অপরাধীর কাঠগড়ায় আমাকেই দণ্ডিত হতে হয়। ভগবানের ত্রিশ দিন বিছানা ভিজিয়ে রাখে দিদি-নাম হয় এই গোপালের। যা বকাঝকা, পিটুনি খাওয়ার সব আমাকেই হজম করতে হয়। পুঁটিদির শাড়ি কখনো চেক হয় না আর কোনো জনমে হবে বলেও মনে হয় না। কারণ সে মেয়েমানুষ। শুধু আমার একারই প্যান্ট ভেজা থাকে না-দিদিরও শাড়ি ভেজা থাকে।

ভেজা থাকলে কী হবে!

তার শাড়ি কখনো চেক হবে না। বহু আগেই জেনে গেছি। পুঁটিদি মেয়ে বলেই তাঁর সাত খুন মাফ। বলি, রোজ আমি একাই কি বিছানা ভিজিয়ে রাখি? দিদি রাখে না? এটা আবার কী ধরনের কথা! বাবা কি বোঝেন না? নাকি ইচ্ছে করেই বিষয়টা এড়িয়ে যাচ্ছেন! বিছানা নষ্ট করবে দিদি আর রোজ সেগুলো পুকুরে নিয়ে ধুতে হবে আমাকে। ভগবান! এটা তোমার বড়ই অবিচার। একদিন এর জন্য তোমাকে কঠিন শাস্তি পেতে হবে! হুঁ, বলে রাখলাম!

পুঁটিদি আমার বছর চারেক বড়। খুব বেশি লম্বাও না; মাঝারি গোছের। ফর্সা, গোলগাল মিষ্টি চেহারা দিদির। তার কোমরে হাত না রাখলে, রাতে আমার নিদ্রা হয় না। ভেবে রেখেছি, আমার নিদ্রা না হলে না হোক। আমি আর পুঁটিদির সঙ্গে ঘুমাব না। পুঁটিদির কোনো গল্প শুনব না। মা বেঁচে থাকলে মার সঙ্গেই রোজ ঘুমাতাম। রোজ তার গলা জড়িয়ে ধরে নানা কিসিমের নিত্যনতুন গল্প-ক্বাসিদা শুনতাম। বিছানা আমি ভেজালেও দিব্যি মার নামে চালিয়ে দিতাম। মা আমাকে যেভাবেই হোক অন্তত বাবার পিটুনির হাত থেকে রক্ষা করত। কিন্তু দিদি কেন মায়ের মতো হতে পারে না! দিদি কি কোনোদিন কারো মা হবে না? আমার মতো তার কি কোনো বাচ্চা-কাচ্চা হবে না!

এক বরফশীতল রাত্তির। চারদিক বসেছে জোছনার মৌ মৌ উৎসব। সেই মুহূর্তে দিদি আমাকে ঘুম থেকে টেনেহিঁচড়ে পুকুর ঘাটলায় নিয়ে এল। ঘাটলাটা শানবাঁধানো। অনেকগুলো স্যাঁতসেঁতে সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে জলে নামতে হয়। শ্যাওলাভরা, জলভরা আমাদের বড়পুকুর। বড়পুকুরের ঘাটলাটা বেশ প্রাচীন। কয়েক জায়গায় ফাটল ধরেছে। শ্যাওলা জমেছে। ফাটলগুলো দেখলে ভয় লাগে। ছেলেবেলার কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এখানে। এই বড়পুকুরেই ডুবে মরেছে আমাদের বড়দা, তুলসি নন্দী। তখন আমার জন্ম হয়নি। সব দিদির মুখে শুনেছি। এখানে খেলতে খেলতেই এতটুকুন হয়েছি। এই ঘাটলায় পা পিছলে মার কোমর ভেঙেছিল। দুমাস পড়েছিল বিছানায়।

আমার বয়স তখন মাত্র চার-এ পা দেবে। দেশে গণ্ডগোল চলছিল। সেই বছরই খান সেনারা এক ভয়াল অন্ধকার রাত্তিরে মা-কে তুলে নিয়ে গেল। মা ছিল গাঁয়ের আগুনসুন্দরী। এটা-ই হয়েছে তার জন্য বড় অভিশাপ। তা না হলে ওরা কেন তিন বাচ্চার মাকে তুলে নিয়ে যাবে! অবিশ্যি অন্য কারণও ছিল। বাবা ছিলেন একজন বীরমুক্তিযোদ্ধা। তাগড়া যুবক। দেশ স্বাধীন করেই গাঁয়ে ফিরেছিলেন। বাবা ফিরে এলেও মা আর কোনোদিন ফিরে আসেনি। বাবা অনেক খুঁজেছে। মা-কে কোথাও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

আমাকে পুকুরের উল্টোদিকে মুখ করে বসতে বলে দিদি পুকুরে ডুব দিল। এত শীতের ভিতরে কোন পাগলে স্নান করে! কে জানে! প্রথমে ঝপাৎ করে একটা শব্দ হলো তারপর একদম চুপ আর কোনো শব্দ হলো না। সুনসান নীরবতার ভিতরে ঘাটলায় বসে শীতে আমি জমে যাচ্ছি অথচ দিদির কোনো সাড়াশব্দ নাই। জলেও কোনো আলোড়ন নাই। ইচ্ছে করছে গলা বাড়িয়ে দেখি দিদি শব্দহীন জলের ভিতরে ডুবে ডুবে কী করছে! কিন্তু দেখা হয় না। আচানক দিদির একটি কথা আমার খুব মনে পড়ে-জীবনে কোনোদিন কোনো মেয়েমানুষের স্নান দৃশ্য দেখবি না। দেখলে ভগবান তোর চোখ উপড়ে ফেলবে। চোখের সব জ্যোতি কেড়ে নেবে। সমস্ত জীবন তোর অন্ধের মতোই বাঁচতে হবে!

না বাবা, পিছনে তাকিয়ে এত সুন্দর চোখ দুটো খোয়াতে চাই না। বড়দের কথা না শোনাও পাপ।

পুকুরের বাঁপাশে বিশাল ভুতুড়ে বাঁশঝাড়। ডানপাশে জংলার মতো বেতঝাড়। পশ্চিমে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি নারিকেলগাছ। পুকুরটা বাড়ি থেকে বেশ খানিকটা দূরেই বলা যায়। সারি সারি সুপারি গাছের ফাঁক-ফোকর গলিয়ে ঘাটলায় যেতে হয়। কানের কাছে বিকট শব্দ করে ঝিঁঝিঁপোকারা চিল্লাচিল্লি করছে। আমার বেতাল ভয় করছে। দিদিকে কি শেষপর্যন্ত জলের বুড়ি জলের নিচে টেনে নিয়ে গেল! হায় রাম, আমার দিদিকে তুমি রক্ষা করো।

প্রায় মিনিট বিশেক পর জল নড়ে উঠল। ঝুপ ঝুপ করে কয়েকটি শব্দ হলো। শব্দ শুনে ধড়ে যেন প্রাণের সঞ্চার হলো। আমি শুধু শীতে না ভয়েও একদম জমে যাচ্ছিলাম। দিদি জল থেকে উঠে এল। যেন সাক্ষাৎ কোনো জলপরী। বাঁধভাঙা জোছনার আলোয় তার হাস্যোজ্জ্বল মুখ দেখলাম। দিদির চোখে কাজল। তাকে খুব খুশি খুশি লাগছে। শীতের ভিতরে স্নান করে ভূমিকম্পের মতো তার কাঁপার কথা। কিন্তু কাঁপছে না বরং দাঁত কেলিয়ে সে হাসছে। মনে মনে ভাবলাম, দিদিকে কি ভূতে ধরল!

পুঁটিদি!

ক।

তোমার কী শীত করে না?’

কীসের শীত!

আজব! এত শীতের ভিতরে স্নান করেছ অথচ বলছ-কীসের শীত!

আমার কোনো শীত নাই। আমি সব শীত অনেক আগেই ধুয়ে-মুছে খেয়ে ফেলেছি।

পুঁটিদির কথা শুনে আমি বড় বড় চোখ করে বলি, ‘দিদি, তোমাকে কি জিন-ভূতে আছর করল?’

দিদি নির্বিকার গলায় বলল, ‘কী জানি! করতেও পারে! শুনেছি এই বয়সে ছেলেমেয়েদের জিনে ধরে।

দিদি!

ক।

আমার খুব ভয় করছে!

কেন?’

জানি না।

তুই কী আমাকে ভয় পাচ্ছিস?’

হুঁ।

কেন রে ভীতুর হাড্ডি! আমাকে ভয় পাওয়ার কী আছে! আমি তোর কোনো ক্ষতি করব না। ক্ষতি করলে করব তোর রতনদার। সে আমার অনেক বড় একটা ক্ষতি করেছে।

সে আবার কবে তোমার ক্ষতি করল! রতনদার মতো ভালো একটা মানুষই হয় না! এই গ্রামে সবাই রতনদাকে ভালোবাসে।

কিন্তু আমি তো তোর রতনদাকে ভালোবাসি না! সে তো আস্ত একটা পাজির হাড্ডি!

পুঁটিদির কথা শুনে আমার চোখ ভ্ররু কুঁচকে কপালে ওঠে-তুমি রতনদাকে ভালোবাসো না?’

মোটেও না! তোর কথা শুনে মনে হচ্ছে তুই যেন আকাশ থেকে পড়লি! দেখিস একদিন আমি তোর রতনদার ঘাড় ঠিকই মটকে দেব!

পুঁটিদির কথা শুনে দে ছুট। হাঁফাতে হাঁফাতে ঘরে ঢুকে দরোজায় খিড়কি দিই। আমার দৌড় দেওয়া দেখে দিদির সে কী বাঁধভাঙা হাসি!

সেদিন থেকেই বিছানা পৃথক হলো। পৃথক হলো না শোবার ঘর। কখনো-সখনো একা একা জিদ করে ঘুমিয়ে পড়লেও মাঝরাত্তিরে প্রায়শই আমার ঘুম ভাঙে। তখন আর চোখে ঘুম আসে না। ভয় লাগে, পিপাসায় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসে। তখন চুপিচুপি ভয়ে ভয়ে বিড়ালপায়ে দিদির পাশে গিয়ে শুইয়ে পড়ি। তার গলা না ধরলে, কোমরে হাত না রাখলে আমার নিদ্রা হয় না। দিদিও অনেকটা পালটে গেছে। এখন আর সে আমাকে সহ্য করতে পারে না। তার ভেজানো বিছানা-চাদর রোজ আমাকেই ধুতে হয়। তবুও তাঁর মন পাই না। আমার বিরুদ্ধে তার যত নালিশ, সময়মতো সব বাবার এজলাসে পৌঁছে যায়। কানমলা, কান ধরে ওঠবোস, চড়-থাপ্পড়, যা খাওয়ার আমাকেই খেতে হয়। শাড়ি, বিছানা-চাদর যে প্রতিদিন শুধু দিদি ভেজায়, এটা আমি বলছি না।

আমিও মাঝেমধ্যে ভিজাই। কিন্তু দিদি ভিজায় বারোমাস। এটা আমার চেভালো আর কে জানে! দিদি এর জন্য অবিশ্যি আমাকে প্রতিদিন লজেন্স, চানাচুর ভাজা অথবা কিছু না কিছু খাবার কিনে দেয়। বাবার কড়া নিষেধ আছে, আমার হাতে এক কানাকড়ি পয়সাও যেন না দেওয়া হয়! তবুও দিদি দেয়। বাবা টের পায় না। দিদির একটা মাটির ব্যাংক আছে-এই ব্যাংকের পয়সা নাকি কখনো ফুরাবে না। ফুরায়ও না। ফুরালে কবে ফুরিয়ে যেত! পুঁটিদিকে হাট থেকে ব্যাংকটা কে কিনে দিয়েছিল মনে নাই। তবে ব্যাংকটা আমি কোনোদিন দেখিনি। একদিন ওটা আমি চুরি করে বকুলতলায় পুঁতে রাখব। তখন বারোমাস অনেক বেশি বকুল গাছে বকুল ফুটবে। বকুলফুল দিদির খুব পছন্দ; আমারও। দিদির কাছে অনেকগুলো বকুলফুলের মালা আছে। আমার চেয়ে বেশি আছে রতনদার কাছে। রতনদা বেশ লম্বাটে। বাঁশের কঞ্চির মতো রোগা-পাতলা ছিপছিপে গড়নের। গায়ের রঙ কুচকুচে কালো। তবে তার চেহারার মধ্যে মেয়েদের মতো একটা মায়াবী ভাব আছে। কথাও খুব সুন্দর করে গুছিয়ে বলে।

 

০২.

বাবাটা ভয়ংকর বদরাগী। তাকে দেখলে ভয়ে আমার হাঁটু কাঁপে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। বাবাকে শুধু আমিই ভয় পাই না, পুঁটিদিও বাঘের মতো ভয় পায়। তাকেও বকাঝকা গালমন্দ শুনতে হয়। তার গতরেও বাবা হাত তোলেন। তখন আমার কলিজা ছিঁড়ে যায়। চোখে জল আসে। বাবাকে দেখলে দূর থেকে পাশ কেটে চলে যাই। পুরুষমানুষ হলেই কি তার এমন বদরাগী আর অত্যাচারী হতে হবে! না বাবা, এসবে আমি নাই। বড় হলে এমন রাশভারী স্বভাবের হবো না। আমি হবো শান্তশিষ্ট সৌম্যদীপ্ত চেহারার পুরুষ। বাবা খুব মোটাসোটা। তার সারা শরীরভর্তি পশম আর পশম অথচ তার ব্যবহার সীমারদের মতো নিষ্ঠুর। বাবার মোচগুলো ভয়ঙ্কর বিশ্রী! দেখলে ডাকাতের মতো লাগে! এমন বিশ্রী মোচ আমি কখনোই রাখব না।

পুঁটিদি অবনত মস্তকে বাবার কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। বাবার হাতে সেই বিড়াল মারা লাঠিটা। যে লাঠিটা আমার পিঠে বেশ কয়েকবার চড়েছে। যতবার চড়েছে ততবারই আমি জ্বরে বিছানায় পড়েছি। দিদি পড়েছে হাতে গোনা দুচারবার। লাঠিটা দেখলে এমনিতেই আমার শরীরে একশো চার ডিগ্রি জ্বর এসে যায়। কিছুক্ষণ পর সাক্ষী হিসেবে কাঠগড়ায় আমাকেও দাঁড়াতে হবে। পুঁটিদি ভয়ে কাঁদছে। তার বিচারকার্য এখনো আরম্ভ হয় নাই। তবে এক্ষুনি আরম্ভ হবে। বাবা একের পর এক বিড়ি ফুঁকে যাচ্ছে। তার আকাশ ভয়াবহ মেঘলা। যে কোনো মুহূর্তে বজ্রপাতের সঙ্গে তুমুল বর্ষণ হতে পারে। বাবা বাঁ হাত দিয়ে কিছুক্ষণ পরপর মোচ পাকাচ্ছে। এটা তার মুদ্রাদোষ।

বাবার ভরাট কণ্ঠস্বর-ভর দুপুরে বকুলতলা কেন গিয়েছিলি পুঁটি?’

বকুল কুড়াতে।

এটা মিথ্যা কথা। সত্য কথাটা বল!

বাবা, মা কালির দিব্যি দিয়ে বলছি-এটাই সত্যি!

আমার কিন্তু রক্ত মাথায় চড়ে যাচ্ছে পুঁটি! আসল সত্যটা কী? সেইটা বল।

বাবা, এটাই আসল সত্য।

বুঝতে পেরেছি তুই সত্যিটা বলবি না। গোপাল!

জি, বাবা।

তোর দিদি বকুলতলা কেন গিয়েছিল?’

ভয়ে আমার হাঁটু কাঁপছে। ঠোঁট কাঁপছে। কথাটা বাবাকে বলা একদম ঠিক হবে না। কিন্তু এই মুহূর্তে না বলেও কোনো উপায় নেই।

গোপাল! চুপ করে আছিস কেন?’

আমি কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে বলি-বাবা, রতনদা দিদিকে দেখা করতে বলেছিল!

কেন?’

আমি জানি না, দিদি জানে।

আচ্ছা মতো প্যাঁদানি খেলে তুইও জানবি! রতনের খবর পুঁটিকে কে দিয়েছিল?’

আমি ভয়ংকর চুপ হয়ে যাই। বাবার মাথায় খুন চড়ে বসল। তার চোখ লাল। চোখ থেকে যেন আগুনের ফুলকি ঠিকরে বেরুচ্ছে। সে তাকিয়ে আছে দিদির দিকে। দিদির চোখ মাটিবর্তী। আমাকে সে বারংবার চোখ পাকাচ্ছিল। প্রতিজ্ঞা করেছিলাম কথাটা বাবাকে বলব না। কিন্তু বাবার হাতে বিড়াল মারা লাঠি দেখে ভয়ে সত্যটা আর লুকিয়ে রাখতে পারলাম না। বাবার চোখ দিদিকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ভস্ম করে দিচ্ছে।

পুঁটি! রতন তোকে কেন ডেকেছিল?’

বাবা আমি জানি না!

আবারও তুই মিথ্যে বলছিস!

না বাবা।

রতন কি তোকে পছন্দ করে?’

পুঁটিদি না সূচক মাথা নাড়ে।

তুই রতনকে কখনো বকুলের মালা দিয়েছিস?’

পুঁটিদি আবারও না সূচক মাথা নাড়ে। তার চোখ মাটির দিকে। সে পায়ের আঙুল দিয়ে মাটি খুঁড়ছে। তার দু-চোখ দিয়ে সমানে অশ্রু গড়াচ্ছে। দাঁত দিয়ে শাড়ির আঁচল কামড়াচ্ছে। বাবা এবার চোখ রাখে আমার চোখে। আমি ভয়ে সঙ্গে সঙ্গে প্যান্ট ভরে প্রস্রাব করে দিই। আমার দু ঊরু গড়িয়ে প্রস্রাবের ঢল নামে। বাবার সেদিকে নজর নাই।

গোপাল!

জি, বাবা।

তোর পুঁটিদি এ পর্যন্ত রতনকে কজোড়া বকুলফুলের মালা দিয়েছে?’

বাবা, দিয়েছে তো অনেক। কিন্তু কতগুলো যে দিয়েছে-তা আমি গুনে রাখিনি। বাবা তুমি দিদিকে মারবে না। দিদির কোনো দোষ নাই। রতনদাকে দিদি মালা দিতে চায় নাই। রোজ তোমাকে দিয়ে সে ভয় দেখায়। বলে-সব তোর বাবাকে বলে দেব।তাই সে রোজ রতনদাকে মালা দেয়। রাত হলে পুকুর ঘাটলায় দেখা করে...।

বাবা চোখ লাল করে বিড়িতে জোরে জোরে দুটো দম নিয়ে বিড়িটা পায়ের তলায় পিষে বাঘের মতো হুংকার ছাড়ে।

পুঁটি!

পুঁটিদি শরীর কাঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।

রতন তোকে আমার ভয় দেখায় কেন?’

পুঁটিদি এবার শব্দ করে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বাবার পা জড়িয়ে ধরে-বাবা, আমি বলতে পারব না। তার চেয়ে তুমি আমাকে মেরে ফেলো!

পুঁটিদির কথা শুনে বাবা মূর্তির মতো নিথর হয়ে গেল। তার হাত থেকে বিড়াল মারা লাঠিটা যেন কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে পড়ে গেল। মাঝে-মধ্যে বাবার বুকের ভিতরে খুব ব্যথা হয়। বাবা তখন ব্যথায় একেবারে কুঁকড়ে যায়। কারো সঙ্গে আর কোনো কথা বলে না। এখন বাবার সেরকমই অবস্থা হলো। বাবার মুখমণ্ডলে রাজ্যের বিষাদ। সে বুকে না, মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসে পড়ল।

 ০৩.

পুঁটিদি যে রোজ বিছানায় প্রস্রাব করে, কথাটা রতনদাকে প্রথম আমিই বলেছিলাম। সে বলেছিল, ‘তোর দিদির এই অসুখের বড়ি আমার কাছে আছে। ২/৩ দিন ঠিকঠাকমতো এই বড়িটা খেলে সে এমনিতেই ভালো হয়ে যাবে। আর যদি সে বড়িটা না খায় তাহলে আর কোনোদিনও তোর পুঁটিদির বিয়ে হবে না।

রতনদা, বড়িটা তাহলে আমাকে দাও। আমি পুঁটিদিকে খাইয়ে দেব!

তুই বোকা নাকিরে গোপাল! যার বড়ি তাকেই এসে নিতে হবে। তোর পুঁটিদিকে সন্ধ্যার পর তোদের পুকুর ঘাটলায় থাকতে বলিস। আমি নিজে উপস্থিত থেকে তাকে বড়িটা খাইয়ে দেব। এভাবে নিয়ম করে ২/৩ দিন বড়িটা খেলে, দেখবি অসুখটা তার একদম ভালো হয়ে গেছে।

আর আমারটা!

তোর পুঁটিদি খেলে তোর আর খেতে হবে না।

কিন্তু এই কথা শুনলে তো পুঁটিদি উল্টো আমাকে বকা দেবে। কেন তোমাকে বললাম!

দিলে দিক। তার অসুখটা ভালো হোক-এটা কি তুই চাস না!

চাই। তবুও কথাটা শুনলে দিদি খুব লজ্জা পাবে!

পাক। তোকে যা বলেছি-তুই সেটা কর।

আমার ভয় করছে। কথাটা সে কাউকে বলতে বারবার নিষেধ করেছিল!

দিদি লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে শুধু তিন দিন না, তিন মাস বড়িটা খেল। কোনো কাজ হলো না। বরং বড়িটা খাওয়ার পর তার মাথা ঘোরায়; বমি বমি ভাব হয় কিন্তু বমি হয় না। দিনরাত্তির একবার বকুলতলা একবার পুকুরপাড় করতে করতে পুঁটিদির অবস্থা কাহিল হয়ে গেল। দিদি প্রায়ই ক্লাস ফাঁকি দেয়। কখনো সখনো অর্ধেক ক্লাস করেই বাড়িতে চলে আসে। বাবা টের পেয়েও দিদিকে কিছু বলে না। কারণ পুরো বাড়িটাই দিদির ওপর। হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল, রান্নাবান্না, উঠোন ঝাড়ু দেওয়া, ঘরদোর মোছা, থালা-বাসন ধোয়া, ঠাকুরঘরে সকালসন্ধ্যায় পূজা দেওয়া-এ সবকিছুই পুঁটিদিকে সামাল দিতে হয়। মাঝে-মধ্যে আবার তার তলপেট ব্যথা করে। কমাস ধরে এখন আর তার এই ব্যথার কথা শুনি না। প্রায়ই দিদিকে দেখি ঠাকুরঘরে বসে কান্নাকাটি করে। দিদি বোধহয় বেশিদিন আর বাঁচবে না।

কাল সকালে দিদিকে বাবা হাসপাতাল নিয়ে যাবে। খবরটা শুনে দিদি ভয়ে-আতঙ্কে কেমন যেন জবাই করা মুরগির মতো ছটফট করছে। দিদিকে বাবা কড়া নজরদারিতে রেখেছে। যে কোনো মুহূর্তে সে নাকি ঝুলে পড়বে! সেজন্য বাবাই তাকে ঘর থেকে বেরুতে দিচ্ছে না। পুঁটিদির বোধহয় বড় কোনো অসুখ করেছে! খবরটা শুনে দুপুরে বনগাঁ থেকে ছোট মাসি এসে একচোট চড়-থাপ্পড় মেরেছে। বিষয়টা ভীষণ ঘোলাটে ঠেকছে। অসুখ হয়েছে দিদির অথচ উল্টো তাকেই যেন সবাই দোষারোপ করছে। মারছে। বকা দিচ্ছে যেন সে ইচ্ছে করেই অসুখটা বাঁধিয়েছে।

সন্ধ্যায় আমি দিদির জানালায় এসে দাঁড়ানো মাত্র দিদি বলল, ‘গোপাল, আমাকে তুই ক্ষমা করে দিস। আমার অনেক বড় একটা অসুখ করেছে। এই অসুখ আর কখনো ভালো হবে না। আমি খুব শীঘ্রই টুপ করে মরে যাব। তখন তুই খুব একা হয়ে যাবি। বড়দা মরে যাওয়ার পর আমিও খুব একা হয়ে গিয়েছিলাম। আমার ইচ্ছে ছিল একদিন আমি রতনদার বউ হবো। কিন্তু রতনদা আমাকে কোনোদিনও বিয়ে করবে না। তার থেকে তুই দূরে থাকিস, মানুষটা দুনিয়ার খারাপ। সে তোর দিদিকে ঠকিয়েছে। তাকে তুই সারাজীবন ঘৃণা করবি।

বিড়াল মারা লাঠি দিয়ে রতনদাকে বাবা ইচ্ছেমতো পিটিয়ে বকুল গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখেছে। খবরটা সারা গ্রামে রাষ্ট্র হওয়া মাত্র শত শত মানুষ এসে জড়ো হয় বকুলতলায়। সবার দৃষ্টি এখন রতনদার দিকে। রতনদাকে পিটিয়ে বাবা আধমরা করে রেখেছে। তার বাবা-মাসহ সমস্ত আত্নীয়-স্বজন এসেছে। ঘটনা শুনে সবাই হতবাক। সবাই রতনদাকে ছি ছি করল।

বাবার ধুতি-গেঞ্জি ছিঁড়ে গেছে। তাকে পাগলের মতো লাগছে। বাবার এমন ভয়ঙ্কর অবয়ব দেখে আমি ভয় পেয়ে যাই। সে আচরণ করছে হিংস্র পশুর মতো। বুঝতে পারছি না, শেষপর্যন্ত বাবা কি উন্মাদ হয়ে গেল!

এই ঘটনার পরের দিন ভোর থেকেই দিদি নিখোঁজ।  



অলংকরণঃ তাইফ আদনান