জলধি / গল্প / জাকির হোসেনের গল্প
Share:
জাকির হোসেনের গল্প

ওহে দুঃখবতী

বরাবর পঞ্চাশ হাজার টাকার একটি চেক আনোয়ারার হাতে তুলে দিয়েছিল ব্লু বিল্ডার্স।চেকটা ব্যাংকে জমা দিয়ে নগদ টাকা গ্রহণ করে দ্যাশে ফিরে বিধবা আনোয়ারা।আরো বুঝে নেয় নেয়ামতের ভাংতি মাসের টাকা।তার সাথে ঢাকায় গিয়েছিল নেয়ামতের ছোট ভাই কুদরত।সে ভাবীকে কাউন্টারে বসিয়ে রেখে গাড়িতে খাওয়ার জন্য শুকনো খাবার কিনতে গিয়েছিল।ভাবী স্বামীর শোকে কাঁদছিল।ভাবী ভাবছিল তিনি এবং তার চার বছরের ছেলে ফজরের একজন নির্ভর করার মতো মানুষ থাকল না।এই পৃথিবীতে সে একা হয়ে গেল।বোরকার নেকাব খুলে যখন আনোয়ারা চোখের পানি মুছছিল।তখন পাশে বসা এক ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করল-কী গো বইন কান্দুইন ক্যা ? দ্রুত চোখের পানি মুছে আনোয়ারা বলল-বিল্ডিং থেইকা পইড়া পোলার বাপে মারা গেছে এক সপ্তাহ হইলো।স্বামীর সর্বশেষ কামায় তুলতে ঢাকায় আয়ছি।ভদ্রলোক আনোয়ারার কথা বুঝতে পেরে আফসোস করে বলল-আহারে,দুঃখ !

নেয়ামত  ঢাকা শহরে কন্সট্রাকশনসের কাজ করতো।কর্মস্থলে আটতলা ভবনের ছয়তলা থেকে পড়ে ঘটনাস্থলে সে মৃত্যুবরণ করে।কাজ চলাকালীন নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যুতে কোম্পানি থেকে নেয়ামতের পরিবারকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়েছিল।শ্রমিক বলেই কোম্পানির কাছে জীবনের মূল্য মাত্র পঞ্চাশ হাজার টাকা ! অথচ তারো দ্বিগুণের দ্বিগুণ টাকা খরচ করে বহুতল ভবন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ব্লু বিল্ডার্স তাদের আপাদমস্তক সুস্থ লজিস্টিকস হেডকে দেশের বাইরে পাঠিয়েছিল ফুল বডি চেকআপ করতে।ব্যাপারটি ঠিক এমন-কারো অসুখ সারে দুধে,কারো দামী ঔষুধে।কারণ গরীবদের কাছে সকল রোগের ঔষুধ দুধ।তারা মনে করে দুধ পান করলেই বুঝি অসুখ ভালো হয়ে যাবে।ঠিক একইভাবে মনিবরা মনে করেন গরীবদের জীবনের মূল্য নামমাত্র টাকায় শোধ করা সম্ভব।আর সম্ভব বলেই শিল্প বিপ্লবোত্তর কিংবা তারো সুপ্রাচীন সময় থেকে গরীবদের অসুখ সাড়ে দুধ খেলে এমন থিওরিতে মনিবরা ভৃত্যের জীবনের মূল্য নামমাত্র  আর্থিক অঙ্কে পরিশোধ করে আসছে।

নেয়ামত মারা গেছে তিন বছর হলো।এই তিন বছরে ফজরের কথা ভেবে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে জমি কিনেছে মা আনোয়ারা।সে ভেবেছিল এই পঞ্চাশ হাজার টাকা নিয়ে বাপের বাড়ী চলে যাবে।সেখানে গিয়ে জমি কিনে  কোনোরকম ঘর বেঁধে থাকবে।কিন্তু বাপের বাড়ীতে কে তাকে দেখবে ? মা -বাপ মারা গেছে বহু বছর হলো।চার ভাইবোনের মধ্যে বড়ভাইয়ের ঘরে সাতটা ছেলেমেয়ে।ছোট বোনের স্বামীর দুই সংসার।ছোট ভাই বাড়ীতে আসে না।তারচে বরং স্বামীর বাড়ীতেই শান্তি ।স্বামী না থাকলে কী হবে।স্বামীর ভিটেটি তো আছে।স্বামীর ভিটেটিই আনোয়ারার শক্তি।এই ভেবে আনোয়ারা বাপের বাড়ী বাদ দিয়েছিল কিন্তু জামাইয়ের বাড়ীতে কী আর সহজে সুখ হলো ? উঠতে বসতে শাশুড়ির কটুকথা শুনতে হয়-অলক্ষীর ঘরে অলক্ষী,আমার পোলাডারে খায়ছে।আমার বুকের ধন,আমার পোলাডারে গিলছে এই রাক্ষসী।ওই রাক্ষসী তুই বাইর আমার বাড়ী থেইকা।দূর আমার চোখের সামনে থেইকা।আনোয়ারা শাশুড়ির কথা শুনে কান্নায় ঢলে পড়ে।তার পা চেপে ধরে বলে-মায়ো আমারে পর কৈরা দিয়েন না।স্বামীর ভিটাত আশ্রয়টা দেন।ছেলের বউয়ের এমন আকস্মিক আবেদনে শাশুড়ি কিছু বলতে পারে না।আনোয়ারার সদর ঘরের দরজায় খেলতে থাকা ফজরের দিকে তাকিয়ে থাকে।ফজরের দিকে তাকালে শাশুড়ির মনটা হু হু করে উঠে।তারপর শাশুড়ি কেঁদে উঠে।বউ শাশুড়ির বিলাপে পরিবেশটা ভারী হয়ে যায়।

এই গেল শাশুড়ির অভিযোগ।মেজো ছোট জা আড়ালে আবডালে কানাকানি  করেনি তা কিন্তু নয়।বিধবা আনোয়ারা তাদের কথা শুনেও না শোনার ভাণ করেছিল।দুই জা'য়ের কথার জবাব দিতে গিয়েও দেয়নি।ঘরের লোকের কথা না হয় হজম করতে হয়েছে নিরুপায় হয়ে।কিন্তু বাইরের লোক ? বাইরের মানে বাড়ীর অন্যান্য মহিলারা ? তারা তো সরাসরি বলেই দিয়েছিল-যে নারী হঠাৎ রূপবতী হয়ে উঠে,সেই নারী স্বামী খায়।টিউবওয়েলে কলস ভরতে আসা আনোয়ারা শুনতে পেয়েছিল- চাচী,দ্যাখছেন ? নেয়ামতের বউ হঠাৎ কেমুন ফকফকা হইয়া উঠছে ! কী স্বাস্থ্যটা হৈছে !হাঁটার সময় কেমন কৈরা পাছা নড়ে ! মধ্যবয়স্কা মহিলার কথার জবাবে চাচী বলেছিল - গো বউ, দ্যাখছি।বিয়াইত্তা বেডির আচকা মাইরা যৈবন ঠেলা দেউন ভালা লক্ষণ না।আর হের লাইগাই তো জোয়ান জামাইডা মরলো !

কী আশ্চর্য ! কুসংস্কার পোষা মানুষগুলো তাদের প্রভুকে মানতে নারাজ।অথচ এরাই কী না ধর্মভীরু বলে নিজেদের পরিচয় দেয়।কোনো ধর্মগ্রন্থ কিংবা ধর্মগ্রন্থের কাছাকাছি কোনো 

পুস্তকে প্রভু কী উদ্বৃত্ত করেছেন ? বিয়েতি বউ,যার সন্তান বর্তমান।তার যদি হঠাৎ করে যৌবন বৃদ্ধি পায়।চেহারায় শ্রী বাড়ে।স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়।তবে সেই স্ত্রী লোকের স্বামী পরলোকগমন করবে।নাহ,প্রভুর এমন কোনো বাণী নেই।কিন্তু কুসংসস্কারমনা মানুষগুলো এসকল মিথ্যে কথা সমাজে প্রভুর নামে প্রচার করে প্রান্তিক মানুষদের বিরাগভাজন হতে বাধ্য করে।ছোট -বড় যে কোনো কুসংস্কার শাশ্বত লোকাচারকে গোড়া থেকে বিনষ্ট করতে সক্ষম।

পুকুর ঘাটে,কলের গোড়ায়,বিকেলে বাড়ির উঠোনে মহিলাদের গোল আড্ডায় এসব কথা শুনে আনোয়ারার মেজাজ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে।কতক্ষণ আর মুখে তালা লাগিয়ে থাকা যায় ? আনোয়ারা তো মানুষ।তারও তো রাগ-অনুরাগ আছে।হঠাৎ তীব্র জেদে আনোয়ারা চেঁচিয়ে উঠে বলে-যার মরা তার ধরা।আল্লাহ তোমাগোরে বিধবা করুক।তোমরা যারা আমারে নিয়া কুকথা কইতাছো।জামাই মইরা যাক,তখন বুঝবার পারবা বিধবার কতো জ্বালা ! তখন বুঝবার পারবা সুখের সুতা কত চিক্কণ !

কুদরত তার বউ খাতুনির ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর সবাই সন্দেহ করেছে সে বিধবা ভাবীকে বিয়ে করবে এবং শেষতক তাই হলো।গতরাত্রে কুদরত   আনোয়ারার বিয়ের পর কেউ কেউ বলতে লাগল- ভাবীর রূপ যৈবন দ্যাইখা দিওয়ানা দেওর।তাই বউডারে বিদায় কৈরা ভাবীরে হাঙ্গা করছে।আহারে কতো ভালা আছিলো বউডা।কেউ কী বিশ্বাস যায়বো কুদরতের বউ খাতুনি পরপুরুষের লগে পিরিত করে ? বাপের বাড়িত যায়বার নাম কৈরা আরেক বেডার লগে ভাগে ? কত্ত সহজসরলবউডা ! আর যায় ঘটুক এমুন কাজ খাতুনির দ্বারা সম্ভব না।

কুদরত খাতুনির সাড়ে চার বছরের সংসার।সম্ভবত প্রথম বছর তাদের ঘরে সুখ বাসা বেঁধেছিল চুক্তিবদ্ধ হয়ে।নচেৎ পরের সাড়ে তিন বছর তারা অসুখী ছিল কেন ? প্রথম বছরের শেষে দ্বিতীয় বছরের কোনো একদিন হঠাৎ সাংসারিক বিষয়ে কথা কাটাকাটির সময় কুদরত খাতুনিকে মারতে গেলে বউ চেঁচিয়ে বলল-তুই তো খাটই কাঁপাইতে পারোস না।আবার আমারে মারতে আইছোস ! উত্তম পুরুষের মাইর খাইলেও ইজ্জত রক্ষা।বেডি মাইনষ্যের শৈল্লে হাত উডাস।শরম করে না তোর ? খোদা কী তোর লজ্জা শরম কিছু দিছে না ? কাইজ্যা জঘন্যভাবে জমে যাচ্ছিল দেখে কুদরতকে একজন পরিচিত পুরুষ জড়িয়ে ধরে বাড়ীর বাইরে নিয়ে গেল।তাই কুদরত তুমুল দুঃখে ক্ষ্যাপা বউয়ের কথার উত্তর দিতে পারেনি।তবে শাশুড়ি জিহ্বায় কামড় দিয়ে বলেছিল-ওহ খোদা ! কুদরতের বউ এসব কী কুকথা কৈতাসো ! কুদরতের বউ আগোছালো শাড়ীর আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল-হাছা কথাই কৈছি।আপনের পোলারে বিয়া কৈরা আমার জীবন-যৈবন দুয়োডাই গাঙ্গে ভাসাইছি।

কুদরতের খাট কাঁপানোর কথাটি বাড়ীর বাইরে চলে গেল।কুদরতকে চেনে এমন লোক ঠাট্টা মশকারা করতে লাগল।হাঁসতে হাঁসতে বলল-কী মিয়া খাট কাঁপাইতে পারো না ? বেডি থাকবোনি ঘরে ? কুদরত লজ্জায় লাল হয়ে গেল।পারে তো পালিয়ে বাঁচে।কথার উত্তর দিয়েই হাঁটা শুরু করে-তয় আমি কী খাট কাঁপাইন্না শব্দ মাইনষ্যেরে হুনাইতাম ? অথচ সুঠাম দেহের কুদরতকে দেখে কে বলবে। তার সাথে শারীরিক সম্পর্কে ঘরের বউ সুখী নয় ! অতএব নির্মম সত্য হলো রাগে -দুঃখে বলে ফেলা খাতুনির কথা কুদরতের পরিবারের কেউ বিশ্বাস করল না।

তবুও খাতুনি কুদরতের সংসারে রয়েসয়ে থেকে গেল।বিভিন্ন কারণে ঝগড়াফসাদ নিয়মিত লেগে থাকল।কখনো কখনো মারামারিও হয়।কুদরত খাতুনিকে পাঁচটা মাইর দিলে খাতুনি অন্তত একটা দিয়ে হলেও তার জেদ কমায়।মা, ভাইয়েরা,ভাবীরা কুদরতকে ডাক দেয়।তাদের জামাই -বউকে থামায়।শাশুড়ি খাতুনিকে চুপ থাকতে বলে এবং জোর গলায় বলে-বেডা মাইনষ্যের মুখে মুখে তর্ক করো ক্যান ? ঘরের পুরুষরে মাইন্না চৈল্লো।

ছোট ছেলের সংসারে সুখ ফেরাতে মা হুজুর থেকে তাবিজ নেয়।হুজুর দুইটা তাবিজ দিয়ে বলে একটা ছেলের বালিশের ভেতর এবং আরেকটা বৌয়ের বালিশের ভেতর ঢুকাইয়া দিবেন।দ্যাখবেন ছেলের সংসারে সুখ সশরীরে হাজির হৈছে।শাশুড়ি হুজুরের কথামতো কাজ করল।ছেলে ছেলের বউয়ের নতুন করে ঝগড়াবিবাদ হলো না।তাবিজের তেলেসমাতি দেখে শাশুড়ি মনেপ্রাণে খুশী।কুদরত এই সুখের সময়ে বউকে শ্বশুর বাড়ি রেখে এলো।সপ্তাহ দুয়েক পর খাতুনিকে আনতে গেলে সে আসতে গড়িমসি করল।যেদিন জামাইয়ের বাড়ী এলো সেইদিন রাতেই খাতুনি কুদরতের সাথে শরীর বিষয়ক কী এক কথা বলতে গিয়ে দুজনের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হলো।

খাতুনি জামাইকে বোঝাতে চেষ্টা করল-উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটা পাশ করা ডাক্তার বসে।তার কাছে গেলে সমস্যার সমাধান দিতে পারবে।কুদরত বউয়ের কথা শুনল না বরং এই সমস্যা নিয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়াকে নিজের জন্য অপমানকর ভেবে খাতুনিকে জোর গলায় গালিগালাজ করল।খাতুনি কুদরতকে কোনো উত্তর দিল না।একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলল।বউকে চুপ থাকতে দেখে কুদরত নিজেকে সুপুরুষ ভাবতে দ্বিধা করল না।ঠিক পাঁচদিন পর খাতুনি কুদরতকে বলল সে বাপের বাড়ী যাবে।কুদরত বউকে বাপের বাড়ী রেখে এলো।সপ্তাহখানেক পর যখন সে বউকে আনতে গেল।খাতুনি আর এলো না এবং বাপের বাড়ী থেকেই সে কুদরতের সংসার করবে না বলে জানিয়ে দিলো।তাদের ছাড়াছাড়ি হলো।কুদরত তার বাড়ীতে নিজের দোষ দুর্বলতা লুকোতো রটিয়ে দিলো -খাতুনি তার বাপের বাড়ী থেইকা এক পোলার লগে প্রেম কৈরা ভাইগা গেছে।বাঙ্গালী সমাজে পুরুষদের মুখের কথা সাধকের স্বরণীয় বাক্যের মতো প্রচার হয় এবং সাধকের মতোই তাঁদেরকে সকলে বিশ্বাস করে।কুদরতের এই ঢাহা মিথ্যে গাঁয়ের লোকজন সাধকের বাণীর মতোই বিশ্বাস করল।অপরদিকে খাতুনি ? হতভাগী মিথ্যে কলঙ্কের কালিমা নিয়ে স্বামীর গ্রামে মুখরোচক গল্প হয়ে থাকল।

হাট বারে স্কুল মাঠে বনাজী ঔষধ বিক্রি করতে আসে ঋষি কবিরাজ।স্বপ্নে পাওয়া গাছগাছড়া থেকে বানানো ঔষধগুলো বেশিরভাগই যৌন চিকিৎসার।স্বপ্নদোষ,মাসিক,স্বাস্থ্যহানি, দ্রুত বীর্যপাত ইত্যাদি সমস্যার সমাধানে ঋষি কবিরাজ ঔষধ দিয়ে থাকেন।একটা মাদুরে গাছের শেকড়বাকড় পসরা করে সাজিয়ে ইমার্জেন্সি মাইক্রোফোনে তিনি রোগ রোগ নিরাময়ের বয়ান করতে থাকেন।উৎসুক লোকজন ঋষী কবিরাজের আশেপাশে ভীড় জমায়।মানুষের গোলাকার ভীড়ের মধ্য থেকে যার যে ঔষধ প্রয়োজন সে তা খরিদ করে।এই ভীড়ের মধ্যেই কুদরত হাতে টাকা নিয়ে ঋষী কবিরাজকে ডাকবে বলে প্রস্তুত থাকে।কিন্তু প্রস্তুতি নিয়েও ডাকতে পারে না।কুদরতের জড়তা তাকে খোলস থেকে বের হতে দেয় না।ঋষী কবিরাজের ঔষধ খেয়ে মোটামুটি অনেকেই ভালো ফল পেয়েছে এমন রব শুনতে পাওয়া যায়।

গোধূলী শেষ।হাটের বিকিকিনি ঢিলে হয়ে পড়েছে।বাড়ীতে ফিরতে শুরু করেছে লোকজন।

সন্ধ্যার আঁধার খুব দ্রুত নেমে আসছে বাজারের পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে।ঋষি কবিরাজ ঔষধপাতি ব্যাগে ঢোকাতে হারিকেল জ্বালিয়েছে।তাকে সাহায্য করছে তার প্রশিক্ষিত এক  বালক।হঠাৎ কুদরত ঋষি কবিরাজের কাছে গিয়ে বলল-দাদা আমারে ঔষধ দ্যান।

কবিরাজ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল-কী ঔষধ ? আর আপনে তো সারা বিকাল এহানেই খাড়াইয়া আছিলেন।ঔষধ নিছুইন না ক্যা ?

কুদরত ইনিয়েবিনিয়ে বলল-শরম করে।

-ধুর মিয়া।রোগের কোনো শরম আছেনি ? কী ঔষধ লাগবো ? কবিরাজের প্রশ্নের উত্তরে কুদরত নিচের দিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকল।

-ওই মিয়া,শরমাও ক্যা ? কও কী ঔষধ লাগবো ?

কুদরত কবিরাজের কানের খুব কাছে গিয়ে বলল-বউয়ের দেহমন জয় করার ঔষধটা দ্যান।

কবিরাজ মাথা নাড়িয়ে বলল- বুচ্ছি,বউ আছেনি ? না কী গেছেগা ?

এই বলে ব্যাগ থেকে কবিরাজ ঔষধ বের করতে লাগল।কুদরত কবিরাজের প্রশ্নের উত্তর দিল না।

রাতে আনোয়ারা বিছানায় এলে কুদরত পরম উচ্ছ্বাসে বলল-ঋষি কবিরাজ থেইকা ঔষধ আনছি।আইজ থেইকা আমি উত্তম পুরুষ।আনোয়ারা অকপটে জিজ্ঞেস করল-খাতুনি তাইলে মিছা কৈছে না ?

কুদরত নিচু স্বরে বলল-না,খাতুনি সত্য।আরো সত্য হৈলো খাতুনি কারো লগে ধরা খায়ছে না।আমিই হের নামে মিথ্যে রটাইছি।নৈলে লোকে আমারে দুর্নাম দিবো।স্বয়ং কুদরতের মুখে কথাগুলো শুনে আনোয়ারার খুব রাগ হলো এবং রাগ করেই সে বলল-আর তুমি যে নির্দোষ এক বেডিরে কলঙ্কীনী করলা ? দায়সারা ভাব করে কুদরত বলল-বেডি মাইনষ্যের কলঙ্ক হৈলে কী আর না হৈলেই বা কী ? আমরা পুরুষগোরে সমাজের দশজনের লগে চলন লাগে।আর তাই পুরুষগোর পরিষ্কার থাকন দর্কার।

আনোয়ারার রাগ বেড়ে গেল।সে মশারি থেকে বেরিয়ে পাশের কক্ষে ফজরের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল।আনোয়ারার এমন কান্ড দেখে কুদরত ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলল-আরেহ,যাও কই ? গোস্তা কর্লা না কী ? আনোয়ারার কেবল রাগ উঠেনি।আপাদমস্তক সে অপমানিত হয়েছে।

একজন নারীকে ইঙ্গিত করে বলা কথা দশজন নারীকে বলা সমান।নারীর বেদনে নারীই তো সবচেয়ে বেশি দুঃখপ্রাপ্ত হয়।আনোয়ারার নিজের প্রতি ঘৃণা হচ্ছে।সে ভাবতেই পারছে না কুদরতের মতো মিথ্যেবাদী বদ পুরুষ তার স্বামী ! হ্যাঁ,স্বামীই।কুদরতই তাঁর স্বামী।আনোয়ারাকে কুদরতের কাছেই আশ্রিতা হয়ে থাকতে হবে।নৈলে তার নামেও কলঙ্ক রটে যাবে।বাঙ্গালি নারীর কাছে স্বামীর ঘরটি যেন একটি আশ্রয়কেন্দ্র।পুরুষরা তো বটে।নারীরাও গৃহটিকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল ভাবে এবং স্বামীকে ভাবে সুমহান আশ্রয়দাতা।

একধরনের পানসে অথবা তিক্ত স্বাদের মধ্য দিয়ে কুদরত আনোয়ারা দম্পতির দ্বিতীয় সংসার চলতে থাকল।এখন অবধি আনোয়ারা তার এবং কুদরতের নতুন সম্পর্কের সাথে ফজরকে পরিচয় করিয়ে দেয়নি।অথচ তাদের বিয়ের বয়স দুমাস অতিক্রম করছে।খাতুনির মতো অভিযোগ করে না বলে কুদরত আনোয়ারাকে বেশ ভালো পায়।তবে আনোয়ারার মন  অভিমানে গুমরে গুমরে কাঁদে।মাঝেমাঝে নিজেকে ধিক্কার দেয়।ভাবে,কুদরতকে বিয়েটা না করলেই হতো।মরহুম স্বামীর ভিটেতেই খেয়ে না খেয়ে ছেলেটাকে মানুষ করতে পারতো।মা-ছেলে খুব সুন্দর করে চলতে পারতো।এক জীবনের এই জায়গাটিতে এসে আনোয়ারা নিয়তির কাছে ক্ষমা চায়।আর্জি জানায় বাকী জীবনটা যেন তার সুখে সুখে কাটে।

কিন্তু সুখ কী আর সহসা ধরা দিতে চায় ? অতঃপর দুঃখিনী আনোয়ারা নিজেকে সুখী ভেবে দিনযাপন করে।আর আনোয়ারার মিথ্যে সুখ দেখে কানাঘুষা করা মহিলারা ঈর্ষাতুর হয়।আনোয়ারাকে নিয়ে আড্ডার আসর জমায়।আনোয়ারার আগমন টের পেলে,অন্য বিষয়ে কথা বলতে শুরু করে।আনোয়ারা বিষয়টি বুঝে চুপ করে থাকে।

সেইদিন আনোয়ারা জঙলা থেকে কুড়ানো লাকড়ি নিয়ে ফিরছিল।উঠোনে গোল হয়ে কথা বলছিল পাশের বাড়ীর তমিজের বউ,রেজাক চাচার বউ,হারুনের বিয়েতি মেয়ে।আনোয়ারাকে দেখে তমিজের বউ তির্যক সুরে বলল-

কোকিল পক্ষী ডিম পাড়ে

কাওয়া করে হাঙ্গা

ভাবী যখন বউ হয়

জীবন হয় রাঙ্গা।

তমিজের বউয়ের কথাটি আনোয়ারার গায়ে তীরের মতো বিঁধল।বিদ্ধ তীর নিয়ে রসুইঘরে লাকড়ি রেখে এলো।আনোয়ারা যেন আহত বাঘিনী।বিষ যন্ত্রণা নিয়ে মহিলা ত্রয়ীকে জবাব দিতে লাগল-আমি কী কারো ঘর ভাঙছি ? আমি কী কারো  পাতের ভাত কাইরা খাইছি ? সতীনের ঘরে সতীনরা আমার।তোরার এতোই যখন হিংসা।তাইলে তোরা কুদরতের লগে হাঙ্গা বইছোস না ক্যান ? আমি তো তোরার বেডার দিকে চোখ দিছি নাকার কার লাং লাগবো দেহি।আমি ঘর খালি কৈরা দিয়াম।জনে জনে আইয়া আমার জামাইয়ের লগে হুইত্তা যাইস।

আনোয়ারার উচ্চকন্ঠে বলতে থাকা কথার মধ্যে মহিলা ত্রয়ী জবাব দেয়।এমন উত্তপ্ত সময়ে ফজর এসে আনোয়ারাকে বলল-আম্মা,সিরাজ কাকা কৈলো হাঙ্গা মানে বিয়া।তুমি না কী ছোডো কাকারে বিয়া করছো ? আমি কৈছি মিছা কথা।তারপর সিরাজ কাকা কৈলো তোর মা'য়ে যদি তোর ছোডো কাকারে হাঙ্গা না করে।আমার লগে তোর মা'য়ের বিয়া দিবি ?

ফজরের মুখে আরো কথা থেকে যায়।অনর্গল কথা বলতে থাকা ফজর নিঃশ্বাস নিচ্ছিল।আর এই সুযোগে হারুনের বিয়েতি মেয়ে আনোয়ারাকে বলল-ওই দ্যাখ,আমরা না খালি কই ! এহন তোর পেটের পুত কৈতাছে।হাঙ্গাইল্লা বেডির আবার বড় গলা ! এই বলে মহিলা তিনজন কেটে পড়ে।তারা বুঝতে পারে আনোয়ারা এখন ফজরকে সামলাবে।রাগে -দুঃখে অতিষ্ঠ হয়ে উঠা আনোয়ারা লাউয়ের মাচা থেকে একটা কঞ্চি বের করে নিরাপরাধ ফজরকে পেটাতে থাকে।ফজর বলে -আমার একটা কথা হুনো আম্মা।

-নাহ,তোর কোনো কথা হুনতাম না।ওই পোলা,তোরা না কৈছি মাইনষ্যের কথা হুনবি না।মাইনষ্যের কথা আমারে কৈবি না।তোর লাইগাই তো আমার জীবন শেষ করলাম।তোর কথা চিন্তা করতে গিয়া বিয়া বৈলাম।আইজ মাইনষ্যে আমারে কলঙ্ক দেয়।হাঙ্গাইল্লা কয়।

এলোপাথাড়ি ফজরকে মা পিটিয়ে যায়।কঞ্চির বাড়ির সপাৎ সপাৎ শব্দ হয়।মায়ের এমন ক্ষ্যাপাটে মেজাজ দেখে ফজর অবাক বনে যায়।সে দৌড়ে কোথাও পালাতে চেষ্টা করে না।হয়তো ভাবে,মা আমারে মারছে মারুক।তবুও মায়ের রাগটা পানি হোক।

হেকমতের বাছুর পাওয়া যাচ্ছে না। শাশুড়ি,কুদরত,কুদরতের ভাই হেকমত,হেকমতের বউ-ছেলে হারানো বাছুর খুঁজতে বেরিয়েছে।তাঁরা কেউ বাড়ীতে নেই।তাঁদের মধ্যে অন্তত একজন থাকলে ফজরকে মায়ের হাতে মাইর খেতে হতো না।

আনোয়ারা রাগের বশে ছেলেকে বেদম পিটিয়েছে।মাইর খেয়ে ফজরের শরীরে জ্বর এসে গেছে।ব্যথা ব্যাদনা কমার জন্য রাতে মা ছেলের উদোম পিঠে সরিষার তেল লাগিয়ে দিচ্ছিল।তেল লাগাতে গিয়ে দেখল ফজরের পিঠে কঞ্চির কালো দাগ।মা হাউমাউ করে কেঁদে দিল।চোখের পানি ফজরের পিঠে ঝরে পড়ল। কোনোদিন ছেলের গায়ে হাত তুলেনি। পরম আদরে আগলে রাখা বুকের মানিকটাকে কী মাইরটাই না দিল ! ফজর মায়ের দিকে ফিরে তাঁর চোখ মুছে দিয়ে বলল-আম্মা,সিরাজ চোরা যহন তোমারে নিয়া খারাপ কথা কৈলো।আমি তহন তাঁর মুখে ছ্যাপ মাইরা দৌড় দিছি।কাইন্দো না আম্মা।মা ছেলেকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে।ছেলের পিঠে হাত বোলায়।



অলংকরণঃ আশিকুর রহমান প্লাবন