জলধি / গল্প / গান জানা পুরুষ
Share:
গান জানা পুরুষ

গান জানা পুরুষেরা খুব মারাত্নক হয়। এদের থেকে মেয়েদের দশ হাত দূরে থাকা উচিত। মেয়ে পটানোতে তাদের কোন জুড়ি নেই।  সে যদি আবার সুদর্শন হয় তো কোন কথাই নেই।

সাথী এসব ভাবতে ভাবতে তৈরী হচ্ছিল বাইরে যাবার জন্য। সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে কোন আঘাত পাওয়ার পরে প্রথম দশ-পনের দিন লাগে বেদনা আর অপমানের তীব্রতা সহনীয় করতে। তারপর ভাবনায় কিছুটা দার্শনিকতা আসে। নিজেকে প্রবোধ দেয়া যায় এই বলে যে, একটা কিছু শিক্ষা তো পেলাম!

সাথী এখন সেই পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। অন্তত সে নিজেকে তাই বোঝাতে চেষ্টা করছে।

দরজার পিছনে রাখা গাড়ির চাবিটা হাতে নেয় সাথী। ঘর থেকে বের হওয়ার আগে অভ্যাসমতো সব কিছু দেখে নেয়।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো নিজের চুলটা ঠিক করে ও। চোখের নিচে সামান্য ক্লান্তির ছাপ। গত কয়েকদিনে ও অনেক বদলে গেছে। একই মানুষ, অথচ আয়নায় তাকালে নিজেকেই যেন একটু অপরিচিত লাগে।

ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা হাতে নেয়। কোনো নতুন মেসেজ নেই। না থাকুক। এখন আর কোনো মেসেজের অপেক্ষা নেই ওর।

তবু ঘর থেকে বের হওয়ার আগে তার বুকের ভেতর সেই পুরোনো অনুভূতিটা আবার জেগে উঠল। ওর প্রতিবারই কেন যেন মনে হয়- এই যে বের হয়ে যাচ্ছে, হয়তো এই ঘরে আর ফিরে আসা হবে না।

অদ্ভুত ব্যাপার।

কোনো কারণ নেই। কোনো যুক্তি নেই। তারপরও অনুভূতিটা আসে। সাথী দরজার হাতলে হাত রাখে। এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে যায়।

দরজাটা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘরটা আবার নিঃশব্দ হয়ে যায়।

কিন্তু সাথী জানত না, আজকের রাতের পর এই ঘরের সঙ্গে তার সম্পর্ক সত্যিই বদলে যেতে চলেছে। লিফটের সামনে এসে সাথী থামে।

আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বটা আবার একবার দেখে নেয় ও। চোখ দুটো একটু লাল। গত কয়েক রাতের ঘুমহীনতার চিহ্ন। কিন্তু আজ সে কাঁদবে না। কোনভাবেই না।

লিফটের দরজা খুলে গেল। ভেতরে ঢুকে সাথী গ্রাউন্ড ফ্লোরের বোতাম চাপল। তারপর হঠাৎ তার মনে হলো, কেউ যেন তাকে দেখছে।

সে ঘুরে তাকাল। কেউ নেই। লিফটের আয়নায় শুধু তার নিজের মুখ।

‘বেশি ভাবছি,’ নিজেকেই বলল ও। গত দুই সপ্তাহে এই একটা কথা ও নিজেকে অসংখ্যবার বলেছে।

বাইরে এসে গাড়িতে উঠল সাথী। ইঞ্জিন স্টার্ট দেওয়ার পরও কিছুক্ষণ বসে রইল। রেডিও অন করল না। গান তো একেবারেই নয়। গান জানা পুরুষদের সে এখন সত্যিই ভয় পায়। বিশেষ করে যারা গান গাইতে গাইতে চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারে। যারা একটা সাধারণ বিকেলকে অসামান্যে পরিণত করতে জানে। যারা তোমাকে এমনভাবে বিশ্বাস করায় যে, পৃথিবীতে তুমি ছাড়া তার আর কেউ নেই।

তারপর একদিন খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সেই বিশ্বাসটাকে মেরে ফেলে।

সাথী গাড়ি চালু করল। আজ তার একটা জায়গায় যেতে হবে। যেখানে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা তার নেই। কিন্তু না গেলেও চলবে না।

ফোনটা বেজে উঠল। অচেনা নম্বর। প্রথমবার সাথী ধরল না। আবার বেজে উঠল। সাথী গাড়িটা রাস্তার পাশে থামাল।

‘হ্যালো?’

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা নেই।

তারপর একজন পুরুষের কণ্ঠ শোনা গেল।

‘আপনি সাথী?’

সাথীর বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।

‘জি। কে বলছেন?’

‘আপনাকে একটা জিনিস জানানো দরকার।’

‘কী?’

ওপাশের মানুষটি একটু চুপ করে থেকে বলল,

‘আপনি যাকে নিয়ে গত দুই সপ্তাহ ধরে কষ্ট পাচ্ছেন, সে আপনাকে যা বলেছে, সব সত্যি নয়।’

সাথী কিছু বলল না।

‘আপনি কি শুনছেন?’

‘জি।’

‘তাহলে মন দিয়ে শুনুন। কারণ এরপর হয়তো এই কথাগুলো বলার সুযোগ আমার আর হবে না।’

সাথীর হাত স্টিয়ারিংয়ের ওপর শক্ত হয়ে গেল।

‘আপনি কে?’

লোকটি এবার খুব নিচু গলায় বলল,

‘আমি সেই মানুষ, যে জানে সেদিন রাতে আসলে কী হয়েছিল।’

কলটা কেটে গেল।

সাথী কয়েক সেকেন্ড ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আবার নম্বরটায় কল করল। বন্ধ। সে দ্বিতীয়বার করল। বন্ধ। তৃতীয়বার। একই অবস্থা।

হঠাৎ তার চোখ চলে গেল রিয়ারভিউ মিররের দিকে।

একটা কালো গাড়ি বেশ কিছুক্ষণ ধরে তার গাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। সাথী গাড়ি চালু করল। কালো গাড়িটাও চলতে শুরু করল। সাথীর বুকের ভেতর ধীরে ধীরে সেই অদ্ভুত অনুভূতিটা ফিরে এল। এই অনুভূতি ও চেনে। যে অনুভূতি ওকে আজ সকালে দরজার সামনে দাঁড় করিয়ে বলেছিল-

হয়তো এই ঘরে আর ফিরে আসা হবে না। সাথী তখন বুঝতে পারেনি। এখন বুঝতে পারছে। ওটা ভয় ছিল না। ওটা ছিল অবচেতন মনের সতর্কবার্তা।

সাথী চুইংগাম খোঁজার জন্য ড্যাশবোর্ড খুলতেই একটা ছবি নীচে পড়ল। হাত দিয়ে ওঠাতে ও দেখতে পেল, গান জানা সুদর্শন পুরুষের দাঁড়িয়ে থাকা একটা ছবি।

তারপর ও একটু আগে আসা অচেনা নম্বরে ফোন করল। এবার ওপাশে রিং হচ্ছে। এবার ফোন ধরল একজন নারী।

‘আপনি সাথী?’

‘জি। আপনি কে?’

‘আমি ওর বোন।’

সাথী কিছু বলল না। কার বোন ও অনুমান করার চেষ্টা করল।

নারীটি ধীরে ধীরে বলল, ‘আপনি যে রাতটার কথা কিছুই মনে করতে পারছেন না, সেদিন আসলে কিছুই ঘটেনি। আপনি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। ও আপনাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল।’

সাথী অবাক হয়ে গেল।

‘কিন্তু সে তো আমাকে বলেছিল, সে আর আমার সঙ্গে থাকতে চায় না।’

‘বলেছিল। কারণ ডাক্তার ওকে জানিয়েছিল, আপনার অতিরিক্ত মানসিক চাপ কমানো দরকার। আর সে জানত, আপনি ওকে আঁকড়ে ধরে থাকলে সেটা আরও খারাপ হবে।’

সাথী ছবিটার দিকে তাকাল।

‘তাহলে আমাকে ছেড়ে যাওয়ার পুরো ব্যাপারটা?’

‘ওটা অভিনয় ছিল না। ও সত্যিই আপনাকে ছেড়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু কারণটা আপনি যা ভেবেছেন, সেটা নয়।’

‘কী কারণ?’

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর নারীটি বলল, ‘আমার ভাইয়ের ব্রেন টিউমার ধরা পড়েছে।’

সাথীর হাত থেকে ছবিটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

‘কী?’

‘ও জানত, আপনি ওকে ছেড়ে যাবেন না। তাই আপনাকে নিজের ওপর রাগিয়ে, নিজের সম্পর্কে খারাপ ধারণা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করেছে।’

সাথী চোখ বন্ধ করল। গত দুই সপ্তাহের প্রতিটি কথা, প্রতিটি অপমান, প্রতিটি কান্না যেন হঠাৎ অন্য অর্থ পেল।

‘আর কালো গাড়িটা?’

‘ওর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর গাড়ি। আপনাকে নজরে রাখছিল, যেন আপনি কোনো বিপদে না পড়েন।’

সাথী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।তারপর খুব আস্তে জিজ্ঞেস করল,

‘ও কোথায়?’

নারীটি এবার আর উত্তর দিল না। শুধু বলল,

‘আপনি কি সত্যিই ওকে দেখতে চান?’

সাথী জানালার বাইরে তাকাল।

সন্ধ্যার আলো নেমে এসেছে। শহরটা আগের মতোই ব্যস্ত। মানুষ ছুটছে, গাড়ি চলছে, কেউ জানে না একটি মানুষের পৃথিবী এই মুহূর্তে কতটা বদলে গেছে।

সাথী চোখ মুছে বলল,

‘হ্যাঁ। এবার আমি ওর কাছ থেকে কোনো গান শুনতে চাই না।’

‘তাহলে?’

সাথী মৃদু হাসল।

‘শুধু সত্যিটা শুনতে চাই।’

 

রিহ্যাব সেন্টারের অন্ধকারচ্ছন্ন  ঘরে ঢুকে সাথী দেখল, সে জানালার দিকে মুখ করে বসে আছে। সাথীকে দেখে চমকে উঠল।

‘তুমি এখানে কেন?’

সাথী কোনো উত্তর দিল না। শুধু কাছে গিয়ে বলল,

‘গান জানা পুরুষদের থেকে মেয়েদের দশ হাত দূরে থাকা উচিত, এই কথাটা আমি ভুল বলেছিলাম।’

সে মৃদু হেসে বলল,

‘তাহলে?’

‘কমপক্ষে একশ হাত।’

দুজনে হেসে ফেলল। অনেকদিন পর। তারপর সাথী তার পাশে বসে হাতটা ধরল।

‘এবার থেকে আমাকে কিছু লুকিয়ে রাখবে না।’

সে কোনো উত্তর দিল না।

সাথী বলল,

‘আর যদি আবার আমাকে দূরে সরানোর চেষ্টা করো, মনে রেখো, আমি দশ হাত দূরে থাকব না। আমি আর কোথাও যাবো না।’

বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে।  কখনো কখনো ভালোবাসার সবচেয়ে কঠিন রূপ হলো কাউকে নিজের কাছ থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া।

সাথী তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরল। আজ আর ওর মনে হলো না যে এই ঘর থেকে বের হয়ে গেলে হয়তো আর ফিরে আসবে না।

বরং প্রথমবার তার মনে হলো—

কিছু ঘরে ফিরে আসার জন্যই মানুষ এত দূর ঘুরে বেড়ায়।



অলংকরণঃ তাইফ আদনান