জলধি / গল্প / কেউ কোথাও নেই
Share:
কেউ কোথাও নেই

মুঠোফোনে সুপ্রভাত মেসেজ দেয়া নেয়া করে আমার দিনের শুরু হয়। মনটা বেশ ফুরফুরে থাকে। দিন কয়েক আগে সকালে বিছানায় শুয়ে ফোন হাতে নিতেই পিং করে অজানা নম্বর থেকে একটা মেসেজ এল।একটা মন খারাপের গল্প চাই, শব্দ সংখ্যার সীমাবদ্ধতা নেই। আমি মাঝেমধ্যে খোঁজ নেব। গল্পটা শেষ হবে কিন্তু…’ দিনের শুরুতে এমনই ঝটকা খেলাম যে সেদিন কাউকে প্রভাতী শুভেচ্ছা জানানো হল না। সারাদিন কাজের মধ্যে ডুবে থাকলেও সেদিনের পর থেকে মাথার মধ্যে মেসেজটা ঘুরপাক খাচ্ছে। সব থেকে বড় চমক মেসেজের শেষ বাক্যটি অসম্পূর্ণ। বলে রাখা ভালো, আমি তেমন কোনো লেখক নই। লিখি নিজের ইচ্ছে মতো। কেউ ছাপলে ভালো, না ছাপলেও খেদ নেই। তাই আমার কাছে এমন একটি গল্প লেখার বার্তা কেন এল এবং কে পাঠালেন! ফোনের ট্রু-কলার নিশ্চিত ভাবে কিছু জানাতেও পারেনি। অগত্যা বিষয়টা মাথা থেকে আমি সরিয়ে ফেলেছিলাম, কিন্তু ব্যাপারটা যে এভাবে ফিরে আসবে এবং আসবেই সেটা বুঝতে পারিনি। অফিস যাওয়ার সময় কিছুটা হুটোপাটা থাকে, মেট্রোয় রবীন্দ্র সদন স্টেশনে নেমে বাস ধরি। ফেরার সময় মিনিট দশেক পায়ে হেঁটে ময়দান স্টেশন। টিপটিপ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সেদিন অফিস ছুটির পর হো চি মিন সরণির ফুটপাথ দিয়ে হাঁটছি। -ইলিয়ট পার্কে কিছুক্ষণ বসা যাবে? কথাগুলো হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়ে আমাকে পাশ কাটিয়ে দ্রুতবেগে একজন এগিয়ে গেলেন। বৃষ্টি ক্রমশ বাড়ছে। একটু জোর পায়ে হাঁটলে ময়দান স্টেশন খুব বেশি হলে দু মিনিট। হঠাৎ দমকা হাওয়ায় চারপাশ অগোছাল হয়ে গেল। ফুটপাথ লাগোয়া একটা বন্ধ দোকানের শেডের নিচে সবাই শেল্টার নিচ্ছে। পিঠ ব্যাগটা বুকের ওপর নিয়ে সেখানেই একটু জায়গা করে নিলাম। বৃষ্টির ছাট গায়ে লাগছে, কিন্তু কিছু করার নেই। -একটু চা খেতে পারলে ভালো হত তাই না? কথাটা কি আমার উদ্দেশ্যে ভেসে এল! ঘাড় ঘুরিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলাম। সব মুখই অচেনা, তাই আমাকে বলার প্রশ্ন নেই। হতে পারে আমি ভুল শুনেছি। মিনিট দশেক পর বৃষ্টি থামল। গুটিগুটি পায়ে এবার চৌরঙ্গী ক্রশ করে পাতালে ঢুকতে পারলেই শান্তি।বৃষ্টি থেমে গেছে, এবার চলুন পার্কে বসা যাক। আমার সঙ্গে টাওয়েল আছে। বৃষ্টিভেজা বেঞ্চ মুছে দেব। প্লিজ আসুন। সামান্য কিছু কথা বলেই চলে যাব আমার সামনে কেউ নেই। পিছন ফিরে দেখলাম একদল মানুষ আসছেন তবে আমার সঙ্গে দূরত্ব অনেকটাই। তাহলেকি অদ্ভূতুরে কান্ড তাই না!

বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে ব্যালকনিতে চায়ের কাপ নিয়ে বসে অফিস ফেরতা ঘটনাক্রম ভাবছি। ভটাই মায়ের কাছে স্কুলের টাস্ক নিয়ে পাশের ঘরে। স্কুলের টাস্ক শেষ হলেই ভটাই আর আমি এক অনাবিল আনন্দ সাগরে ডুব দিই। এটা আমাদের রোজকার রুটিন, কোনরকম আপোষ নেই। হঠাৎ ভটাই ছুটে এসে জানিয়ে গেল আমার মোবাইলে একের পর এক মেসেজ ঢুকছে। মেসেজ পাঠাচ্ছেন কি সেই পরিচয়হীন ব্যক্তি! কৌতূহল হলেও ব্যাপারটা নিয়ে এই মুহূর্তে কিছু ভাবছি না, কারণ ভটাইয়ের সঙ্গে গল্প এবং খেলাচ্ছলে ব্রেন-স্ট্ররমিং পর্বটা তাহলে শিকেয় উঠবে। সারাদিনে চাই বা না চাই গাদাগাদা মেসেজ আসে, রাতে ঠান্ডা মাথায় দেখে অপ্রয়োজনীয় মেসেজ ডিলিট করি। ডিনারের পর মোবাইল খুলে বসলাম। যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই। বার্তা প্রেরক তিনিই। লিখেছেন -অনেক চেষ্টা করেও আজ আপনাকে ধরতে পারলাম না। বুঝতেও পারছি না, গল্পটা আপনি শুরু করেছেন কিনা! আগামীকাল মাসের দ্বিতীয় শণিবার, পরশু রবি অর্থাৎ দুদিন আপনার ছুটি। সোমবারের আগে আপনাকে পাবার কোন চান্স নেই। দু্টো দিনের অপেক্ষাতেই না হয় থাকি! শুভ রাত্রি।

চেক ক্লিয়ারিং প্রসেস করতে সোমবার অফিসের ডেস্কটপে বসেছি ঠিক তখনই মোবাইল পিং করল। শুক্রবার লাস্ট আওয়ারে সাতটা রিটার্ন্ড চেক এসেছে। সিস্টেম জেনারেটেড মেসেজ পেয়ে ইতিমধ্যেই দুজন কাস্টমার আমার সামনে। সার্ভারটাও খুব স্লো। আমি নিশ্চিত যে তিনিই কিছু বার্তা পাঠিয়েছেন কিন্তু এখন মোবাইল স্ক্রল করা ঠিক হবে না। দপ করে নিভে যাওয়া মোমবাতির মতো থমকে গেল ডেস্কটপ। ক্যাশ কাউন্টারে কর্মরত সহকর্মীর সঙ্গে এবার কাস্টমারদের নরম গরম কথা শুরু হবে। দুদিন বন্ধ থাকার পর সপ্তাহের প্রথম দিন কাজের শুরুতে লিঙ্ক চলে গেলে মাথা ঠিক থাকেই বা কি করে! উত্তেজনার পারদ ক্রমশ চড়ছে। আমার সামনে যে দুজন কাস্টমার, তাঁদের জন্য লিঙ্ক না থাকার সমস্যা নেই। চেক ফেরতের কারণ এবং পরবর্তী পদক্ষেপ কি সেটা জানিয়ে দিলেই গল্প শেষ। প্রথমজন কমবয়সী, তিনি বিষয়টা বুঝে নিয়ে চলে গেলেন। সমস্যা হল দ্বিতীয়জনের বেলায়। ভদ্রলোক সিনিয়র সিটিজেন। সিগনেচার মিস-ম্যাচ হওয়ায় চেক রিটার্ন অথচ তিনি সেটা মানছেন না।হতেই পারে নাবলে এমন জোরে চিৎকার করলেন, যে কিছুক্ষণ আগে ক্যাশ কাউন্টারের সামনে চলতে থাকা হট্টগোল থেমে গেল। গোটা ফ্লোর জুড়ে দশ সেকেন্ড পিন পতন নীরবতা। অ্যাসিস্টেন্ট ম্যানেজার উঠে এসে ভদ্রলোককে চেকটা হাতে দিলেন। তিনি খুব ভাল করে নিরীক্ষণ করলেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন -ভেরি সরি, পোস্ট অফিস অ্যাকাউন্টের সিগনেচার করে ফেলেছি। ভদ্রলোক উঠে যেতে না যেতেই কাস্টমারদের কোলাহল শুরু হল। এই ফাঁকে মোবাইল খুলে দেখলাম, তিনি লিখেছেনক্লিয়ারিং চেকের সঙ্গে একটা ভাঁজ করা কাগজ পাবেন। ভুল করে ওটা কিন্তু ওয়েস্ট পেপার বিনে ফেলে দেবেন না। আচ্ছা পাবলিক তো! ক্লিয়ারিং চেকের বাঞ্চটা হাতে নিলাম ঠিক তখনই ক্যাশ কাউন্টারের সামনে গোলমাল। কে কার আগে লাইনে ছিলেন তাই নিয়ে সমস্যা। তার মানে লিঙ্ক চলে এসেছে। আমি ডেস্কটপে লগইন করলাম।

ভেবেছিলাম টিফিন ব্রেকে কাগজটা খুলে দেখব। কিন্তু এত চাপ ছিল সেটা আর হয়ে ওঠেনি। বাসায় ফিরতেও আজ একটু দেরি হল। ব্যালকনিতে না বসে অফিসের ব্যাগ থেকে ভাঁজ করা কাগজ়টা নিয়ে শোবার ঘরে ঢুকলাম। স্কুলের প্র্যাক্টিকাল খাতার পাতার মতো, একদিক সাদা উল্টোদিকে লাইন টানা। বেশ ঝকঝকে হাতের লেখা, কিন্তু লিখতে গিয়ে হাত কাঁপে সেটা বোঝা যাচ্ছে। আমি হস্তলিপি বিশেষজ্ঞ নই, তবে তিনি বয়স্ক এবং পুরুষ তাতে কোনো সংশয় নেই। তিনি লিখেছেন -দুটো দিন শুয়ে বসেই কাটিয়ে দিলেন। ভেবেছিলাম গল্পটা শুরু করবেন। কিন্তু হল না। আর সারাক্ষণ মোবাইল অন থাকলে লিখবেন কি করে! কাজের মধ্যে কাজ যেটা করেছেন, ট্রু-কলারে আমার পোস্টমর্টেম আর তিনবার আমার নাম্বারে কল। একবার আবার অন্য ফোন থেকে, কিন্তু আমাকে কোনোভাবেই পান নি। পাবেন না। পাবেন তখনই যখন আমি চাইব। ভেবেছিলাম ব্যাপারটা আপনি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেবেন। আপনাকে কিভাবে কাল্টিভেট করেছি জানেন? মিন্টো পার্কে ইভিনিং ওয়াকের পর বেঞ্চে বসে রেস্ট নিচ্ছি। পাশেই আপনি একজনের সঙ্গে সাহিত্য চর্চা করছিলেন। আমি আপনাদের শুনছিলাম। তারপর ফোন নাম্বার দেয়া নেয়া করলেন। দুটো নাম্বারই আমার মেমরিতে স্টোর হয়ে গেল। আমার নেটওয়ার্ক সিস্টেম জানাল আপনার বন্ধুটি কবি এবং আপনি অবসর সময়ে গল্প লেখেন। আমার তো চাই গল্প, তাই আপনাকে টার্গেট করলাম। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এবার আপনি আমার অনুরোধ ফেলতে পারবেন না। একটা বিষয় আপনার সঙ্গে শেয়ার করার খুব লোভ হচ্ছে। দিনকয়েক আগে মিডিয়ায় একজন নামী সাহিত্যিকের সাক্ষাৎকার পর্ব চলছিল। একেবারে শেষে সাহিত্যিক ভদ্রলোকের কাছে সঞ্চালক জানতে চাইলেননতুন যাঁরা লিখছেন তাঁদের প্রতি আপনার কিছু মেসেজ বা সাজেশন আছে? উত্তর দিতে গিয়ে তিনি বললেন -প্রথম কথা, লেখার সময় মোবাইল বন্ধ রাখা দরকার। কারণ লেখকের একটা ধ্যান  প্রয়োজন। ধ্যান বলতে আমি বোঝাতে চাইছি, লেখার সময় সমস্ত জগত সংসার তাঁর কাছ থেকে মুছে যাবে এবং তাহলেই লেখার উত্তরণ ঘটবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, লেখকের নিজের গ্রীনরুম না দেখানোই ভাল। সঞ্চালক কিছুটা বিষ্মিত হয়ে এবার বললেন -স্যর গ্রীনরুম তো নাটকের মঞ্চের সঙ্গে সম্পর্কিত! লেখকের গ্রীনরুম বলতে আপনি ঠিক কি মিন্করছেন যদি বলেন খুব ভাল হয়। সাহিত্যিক ভদ্রলোক বললেন -সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে আমার বিন্দুমাত্র বিরোধ নেই। তবুও বলি, ইদানিং সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখছি অনেকেই লেখেন -এইমাত্র উপন্যাসটা শেষ করলাম। শুরুটা এভাবে করেছি বলে কয়েকটা লাইন তুলে দিলেন। এসবের কি দরকার আমি বুঝি না। কিছু পাঠক লাইক দেবে, হাহা হিহি করবে কিন্তু বই কিনবে না। লেখকের সৃষ্টি যদি উন্নত মানের হয় তাহলে পাঠক তাঁর লেখা বই ঠিক খুঁজে নেবে। লেখকের গ্রিনরুম বলতে আমি এটাই বোঝাতে চেয়েছি। সাক্ষাৎকার পর্বটি শেষ হবার পর আমিও ভাবছিলাম, সব ব্যাপারেই সোশ্যাল মিডিয়ায় অযথা মাতামাতি অথবা দেখনদারিতে আদৌ কিছু লাভ হয় কি? যাই হোক অনেক কিছু বলে ফেললাম। সময় নষ্ট না করে এবার লেখা শুরু করুন প্লিজ। আপনি লিখতে শুরু করলে আমি ঠিক বুঝে যাব। দেখবেন একদম বিরক্ত করব না। কথা দিচ্ছি, আপনার ব্রেনের ইনভেস্টমেন্ট বিফলে যাবে না। আপনি রিটার্ন অবশ্যই পাবেন। যথাসময়ে আপনার অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার দিয়ে দেব।

কাগজটা হাতে নিয়ে মনে করার চেষ্টা করছি নতুন বন্ধু কবি পিয়াল মিত্র সঙ্গে কবে আমি মিন্টো পার্কে বসেছিলাম! ঠিক তখনই ভটাই এসে বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ল। একবার ভটাইয়ের সঙ্গে গল্পের ঝুড়ি খুলে বসলে কিচ্ছু মাথায় থাকে না। সে যাই হোক, জীবনানন্দ দাশেরবোধকবিতার মতো অপিরিচিত লোকটিকে অমি কিছুতেই এড়াতে পারছি না। আমার মাথার চারপাশে তিনি ক্রমাগত ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এমনও তো হতে পারে তিনি কোনো লিট্লম্যাগের সম্পাদক, সাহিত্যিকের সাক্ষাৎকার পর্বের বিষয়টা উল্লেখ করে পরোক্ষে তিনি আমাকে কোনো মেসেজ দিলেন! সুতরাং চ্যালেঞ্জ অ্যাকসেপ্ট করা যেতেই পারে! লেখালিখির ব্যাপারে আমি আবার একটু ধীরজ টাইপের, লিখতে বসলাম মানে এই নয় যে তরতর করে লেখা এগিয়ে গেল! অফিস থেকে ফিরে দুটো দিন মোবাইল বন্ধ রেখে গল্পের প্লট খুঁজছি। কিন্তু জুতসই প্লট পাচ্ছিনা। এর মধ্যেই যে ব্যাপারটা হল সেটা শুধু চমকপ্রদ নয়, রীতিমত রোমহর্ষক। সেদিন ডিনারে বসেছি হঠাৎ পাশের ঘরে মোবাইল বেজে উঠল। পর পর দুবার। কোনো মতে ডিনার শেষ করে মোবাইল হাতে নিলাম। আননোন নাম্বার, ট্রু-কলারে নাম দেখাচ্ছেছায়া মানুষ ইনবক্সে একটা মেসেজও এসেছে। খুলে দেখি আমার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে এক টাকা ক্রেডিট হয়েছে, প্রেরকছায়া মানুষ মোবাইলে নাম টা সেভ করেই বুক ঠুকে কলব্যাক করলাম, কিন্তু কেউ ধরছেন না। যতবার কল করলাম সেই একই কথার পুনরাবৃত্তিকেউ  কোথাও নেই, দয়া করে বিরক্ত করবেন না রাতে শোবার আগে ডাইনিং স্পেসে কিছুক্ষণ হাঁটি। মোবাইলটা সঙ্গে নিয়ে হাঁটছি, মিনিট দুয়েক পরেই বেজে উঠল মোবাইল।ছায়া মানুষকল করেছেন।  হ্যালো বলতেই ওদিক থেকে প্রশ্ন -আপনি ফোন করেছিলেন? বললাম, ফোন তো এই নাম্বার থেকে আগে এসেছিল। আমি ধরতে পারিনি তাই কলব্যাক করেছিলাম।

-ভেরি সরি, আসলে রাতে শুতে যাবার আগে একবার বাথরুমে যেতেই হয়। বয়স হয়েছে তো তাই একটু সময় লাগে।

-আচ্ছা বুঝেছি, তবে আমি কিন্তু একটা রেকর্ডেড ভয়েস মেসেজ শুনতে পাচ্ছিলাম।

-ভুল  

-কিসের ভুল! আমি তিনবার কল করেছি, কনস্ট্যান্টলি একই কথাকেউ কোথাও নেই, দয়া করে বিরক্ত করবেন না

-প্রিয় লেখক, ওটা আমার ফোনের কলার টিউন। এনি ওয়ে, আপনার অ্যাকাউন্টে এক টাকা ট্রান্সফার করেছি সেটা কনফার্ম করার জন্যই আমি ফোন করেছিলাম।

-অমি তো লেখা শুরুই করিনি 

-সে কি! সন্ধের পর কয়েকদিন আপনার মোবাইল বন্ধ দেখে ভাবলাম

-অমি প্লট খুঁজছি, কিন্তু পছন্দ মতো কিছু পাচ্ছি না।

-আমি আপনাকে একটা প্লট দিতে পারি। ধরা যাক, বালিগঞ্জের কোনো পশ্এলাকার শিক্ষিত স্বচ্ছল পরিবারের বিপত্নীক এবং গৃহত্যাগী একজন মানুষ। শহরের নির্দিষ্ট কিছু এলাকাজুড়ে সারাদিন তাঁর ঘোরাফেরা। রাতের ঠিকানা কলকাতা পৌরসংস্থা কতৃক ঘোষিত একটি বিপজ্জনক বাড়ির গাড়ি বারান্দা। আশা করি এবার আপনি গল্পটা শুরু করতে পারবেন। লেখা শেষ হলে জানাবেন প্লিজ, একটা দিন ঠিক করে আমরা কোথাও না হয় বসব। আপনি গল্প পড়বেন, আমি শুনব! শুধু মাথায় রাখবেন গল্পের শেষটা কিন্তু কথা অসমাপ্ত রেখেই তিনি ফোন কেটে দিলেন। গল্প শুরুই হল না তো শেষ!  হঠাৎ মনে পড়ে গেল, ভদ্রলোকের প্রথমদিনের মেসেজটাও ছিল এমনই। তবে মাত্র তিনটি বাক্যে তিনি যে ছবি আঁকলেন, তার মধ্যে গল্পের একাধিক উপাদান অবশ্যই আছে। সুতরাং দেরি না করে এবার শুধু মোবাইলের নোট-প্যাড খুলে বসা। পরদিন অফিস থেকে ফিরে ভটাইয়ের সঙ্গে যুদ্ধে নামার আগেই লিখতে বসে গেলাম। উনি বালিগঞ্জের পশ্এলাকা বলেছেন, মানে আমাকে তাই লিখতে হবে এমন তো হতে পারে না! গল্পের স্থান, কাল, চরিত্র এবং চিত্রকল্প নির্মাণ হবে আমার হাতে। তবে গল্পের শুরুটা জম্পেশ হতে হবে। রোজ একটু একটু করে লিখছি, ধীর গতিতে হলেও এগচ্ছে এই আর কি! কদিন ধরে আবার আকাশের মন ভাল নেই, আজ তো সকাল থেকেই মুখ ভার। বঙ্গোপসাগরে ঘনীভূত নিম্নচাপ শক্তিশালী হচ্ছে, রাতের দিকে প্রবল ঝড় বৃষ্টির সম্ভাবনা। প্রতি মুহূর্তে আবহাওয়ার আপডেট নিতে হচ্ছে, তাই গল্প লেখা আপাতত স্থগিত। আমাদের এদিকটায় আবার একটু জোরে হাওয়া দিলেই পাওয়ার কাট হয়ে যায়। ঝড়টা এসেছিল মাঝরাতে। মাত্র কুড়ি থেকে পঁচিশ মিনিট, কিন্তু তাতেই চতুর্দিক লন্ডভন্ড। ঝড় আসার আগে থেকেই আমাদের এলাকা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন। এখন সকাল সাড়ে সাতটা, টিভি খুলে দেখব সে উপায় নেই। মোবাইল অন করে নিউজ চ্যানেলের শিরোনাম দেখছি।

-কুড়ি মিনিটের ঝড়ে বিধ্বস্ত কলকাতা এবং আশেপাশের জেলা।

-গাছ ভেঙে পড়ায় শহরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা বন্ধ।

-বহু এলাকায় বিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পরিষেবা।

-আপার উড্স্ট্রীটে বহু পুরোনো এবং পরিত্যক্ত একটি বাড়ি ভেঙে পড়েছে। উদ্ধারকার্যে দমকল এবং বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তর। অসমর্থিত সূত্রের খবর, বাড়িটির একদিকে বহিরাগত কিছু মানুষ বসবাস করতেন। এখনও পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর নেই।

নিউজ চ্যানেল বন্ধ করে দিলাম। চোখের সামনে ভেসে উঠছে অফিস ফেরত আমার হাঁটাপথের ছবি। বিড়লা প্ল্যানেটারিয়াম মুখী থিয়েটার রোডের ডান দিকে উড্স্ট্রীট বাঁদিকে আপার উড্ আপার উডের দিকে সেভাবে কখনও যাওয়া হয়নি। আচ্ছা, ভেঙে পড়া বাড়িটার কোনো গাড়িবারান্দা ছিল কি? হঠাৎ কি মনে হল জানি না, মোবাইলে সাম্প্রতিক কললিস্ট খুলেছায়া মানুষএর নম্বরে কল করলাম। বেশ কিছুক্ষণ কুঁক কুঁক করে গেল। লাইন কেটে দিয়ে আবার করলাম। পরের পর তিনবার একই মেসেজ শুনতে পেলামডায়ালড্নাম্বার ডাজ নট একজিস্ট”!  



অলংকরণঃ তাইফ আদনান