জলধি / গল্প / অনলাইনেই থাকুন বাবা !
Share:
অনলাইনেই থাকুন বাবা !

।।  এক ।।

 

১৬ই সেপ্টেম্বর :- কৃষ্ণের মতন ১০৮ খানা না হলেও জরায়ুতে গজিয়ে ওঠা মাংসপিণ্ডটিরও যে কমসে কম চারখানা নাম আছে তা অতনু টের পেল মাত্র সেদিন । দুর্গাপুরের  ‘আ  স্মল টিউমার ইন ইউটেরাস ’ চেন্নাই , দিল্লি এবং কলকাতার হাসপাতালগুলির স্ক্যান রিপোর্টে নাম পেল যথাক্রমে , ফাইব্রয়েড , সিস্ট এবং মায়োমা । হোয়াটস ইন আ নেম ? যে নামেই ডাকো না কেন , গজিয়ে ওঠা মাংসপিণ্ডটির দরুণ ভোগান্তির হ্রাস - বৃদ্ধি কিছু হয় না । যে ভোগে সে জানে । সে না হয় হলো , প্রসঙ্গে ফেরা যাক – প্রথানুসারে হাসপাতাল থেকে রিপোর্টটি সংগ্রহ করে অতনুই এবং তৎক্ষণাৎ একবার চোখ বুলিয়েও নেয় । বিশাখাও পড়ে কি ! তবে সর্বশেষ রিপোর্টটি হাতে নিয়ে বিশাখা এবার বিস্ময় প্রকাশ করল , “ আরে ! দ্যাখো দ্যাখো ! দু'বছর আগে যা সাইজ ছিল তার চাইতে তো সব দিকেই বেড়ে গেছে গো !   হুঁ ! এই কারণেই রোজ পেইনকিলার খেতে হচ্ছে ! নাঃ ! এবার  মনে হচ্ছে অপারেশনটা করাতেই হবে । বুঝলে ? আজকে কি আর ডাক্তার মল্লিকাকে পাবে কোথাও ? দেখবে  একবার ফোন করে ? ” প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে ডাক্তার মল্লিকার মদতপুষ্ট চিকিৎসা কেন্দ্রদুটিতে একবার ফোন করে দেখতে হয় ।  আর বিশাখার ভাবনার সঙ্গে সহমত পোষণ করার আগে ঘরের আলমারিতে সযত্নে রক্ষিত ফাইলে বিশাখার পূর্ববর্তী  স্ক্যান রিপোর্টগুলি বের করে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে হয় ।  হাতে পাঁজি  মঙ্গলবার । চূড়ান্ত তৎপরতার সঙ্গে তখনই রিপোর্ট বার করে অতনু দেখে –  হ্যাঁ ! বিশাখার অনুমান   ঠিক ! জরায়ুর অভ্যন্তরস্থিত মাংসপিন্ডটির বর্তমান ত্রিমাত্রিক মাপ জানাচ্ছে যে সেটি বর্ধনশীল ! আজকাল তো বিভিন্ন পুং ও স্ত্রী গ্যাস্ট্রোএন্ড্রোলোজিস্ট কাম শল্যবিদরা ঠোঁট উল্টে জানাছিলেন , “ না না ! অপারেট করার পক্ষে টূ  স্মল !  একটু বড় হোক না !” তবে আজ  বারো বছর ধরে  বিশাখার যাবতীয় বদহজম গলা–বুক জ্বালা , খুধামান্দ্য  এবং তলপেটে ব্যথার প্রকৃত কারণ উন্মোচিত হতে বিশাখা স্বস্তি পেল ,  অতনুও ।

 “ আপনি লাইফস্টাইলটা একটু চেঞ্জ করুন তো ম্যাডাম ! খাবার টেবিলে বসে খাবো না , হজম যদি না হয় ! পেট ব্যাথা  হয় যদি ! – এসব নেগেটিভ অ্যাটিচিউড একেবারে বাদ দিন !  যা প্রাণ চায় তাই খাবেন হুম হাম করে । রাতে   ল্যাক্সেটিভ কিছু ,যেমন  ইসবগুল ভিজিয়ে খান এক গ্লাস । সঙ্গে প্রচুর জল ।  ব্যস ! সকালে খালি পেটে এই ট্যাবলেটটা , পেট ব্যথা হলে এই ট্যাবলেটটা খান ডেলি  – ম্যাক্সিমাম দুখানা ।  ব্যথা ট্যাথা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিন তো ! সকালে হুমহাম করে হাঁটুন দু-মাইল । ওই ছোট্ট সিস্ট খামোখা কাটাছেঁড়া  করার কোন মানে হয় না ! সবসময় পজিটিভ ভাবনা ভাবুন । টেনশন ফুঁ মেরে উড়িয়ে দিন ! হিন্দি , ইংরেজি এবং বাংলা এই তিনটি ভাষাতেই যে উপদেশ বিশাখাকে শুনতে হয়েছে  সেগুলির মর্মার্থ এইরকমই ,  কিন্তু তাতে ভুরু কুঁচকিয়ে বিশাখার ঘন ঘন অসন্তোষ জ্ঞাপন রেখে ডাক্তারদের সিদ্ধান্তকে মান্যতা দেবার অভিপ্রায়ে অতনু ডাক্তারের পছন্দসই ভাষায় বলেছে , “ করো না ? আমাদের রিন্টুকে নিয়ে , তোমার মাকে নিয়ে টেনশন করো না তুমি ? ” বিশাখা দুর্বল হিন্দিতে অথবা বাংলায় প্রতিবাদ জানিয়েছে , “ ম্যাডাম ! ওসব টেনশন আমি করি না । আমার একমাত্র টেনশন যেটুকু আছে তা কেবল ওকে নিয়েই ! নিজের জামা কাপড় ঠিকঠাক কাচতে দেবে না , আমি খেয়াল না রাখলে নোংরাই পরে থাকবে , ঘর দুয়ার যে কি নোংরা করে রাখে কি বলবো ! ”

 অতনু উপচে পড়া হাসিমুখে বলেছে , “দেখেছেন ম্যাডাম ! ডাস্টফোবিয়া । এটাও কারুর টেনশন হতে পারে ?  দা রেয়ারেস্ট অফ  রেয়ার কেস , তাই না ?” সারাদিন ধরে হরেক রকম রোগের ফিরিস্তি শুনে শুনে ক্লান্ত , তিতিবিরক্ত অন্ত্রবিদের কাছে এই ছদ্ম – দাম্পত্যকলহ তাই একটুখানি রিলিফের  কাজ করে ।

গত বারোটি বছর ধরে অতনুরা ঘুরিতেছিল মাল্টি স্পেশালিটি হাসপাতালগুলির পথে পথে । দুর্গাপুরকলকাতাচেন্নাইদিল্লির সব বিখ্যাত হাসপাতালে গিয়াছে তারা । আজ দুর্গাপুরের ডাক্তার মল্লিকা শেখাওয়াতের  সহায়িকা জানালেন , “ কাল বিকালে ‘ঋষি অরবিন্দ হাসপাতালে’ দেখাতে চাইলে আগামীকাল সকাল আটটা থেকে নটার ভেতরে ফোন করুন ! অফিসিয়ালি নটা পর্যন্ত কল রিসিভ করি আমরা।  তবে জেনারেলি আটটা কুড়ি পঁচিশের মধ্যেই সেদিনের পেশেন্ট কোটা ফিলড আপ হয়ে যায় । ম্যাম তো সেকেন্ড শিফটে  তিরিশটার বেশি রোগী দেখেন না। ”

 এই আচরণীয় বিধি শুনে বিস্ময়ে হতবাক অতনু বলেছিল , “ সকালে বিকেলে  ষাটখানা রুগী মানে  ষাট ইনটু  পাঁচশো অর্থাৎ শুধুমাত্র রুগীর নাভি টিপে ডেলি  তিরিশ  হাজার ! মাসে  পঁচিশ দিন তো রুগী দেখেই অর্থাৎ মাসে সাত লাখ  পঞ্চাশ হাজার টাকা ! এরপর আছে ডেলি দুখানা করে অপারেশন অর্থাৎ ডেলি আরো  চল্লিশ হাজার ! মাসে  সতেরো , আঠারো লক্ষ টাকা ! ওঃ ! এই টাকার ইনকাম ট্যাক্স দিতে হয় না !  এই একই শহরে এইসব ডাক্তারদের সঙ্গে আমরাও বাস করছি ! ওঃ !  বাজারে সবজি মাছ দুধ মাংস কিনতেও যাচ্ছি ! কি আশ্চর্য !  তাই  না ? ভাবলে গায়ে কেমন কাঁটা  দিচ্ছে  দ্যাখো !  ”

 বিশাখা  ব্যাজার মুখে বলল , “  ডাক্তারবাবুরা বাজারে যাওয়ার সময় কোথায় পান ?   তাদের স্ত্রীরা কোনো কাজের লোককে সঙ্গে নিয়ে বাজারে যান । ”

 অতনু বলল , “ যাই হোক ! ব্যাপারটা কেমন থ্রিলিং ভেবে দেখেছো ? ”

 বিশাখা আদার ব্যাপারী এসব ভাবতে তার বয়ে গেছে। অতনুর ইনক্রিমেন্ট বন্ধ গতবছর থেকে বর্ধিত ডিএ টুকু কেবল পাওনা তার ।  তাই এ মাসে ডি এ বাড়ছে কিনা কেবলমাত্র এ সংবাদেই উৎসাহী সে । বলল , “ তোমার মাথা আছে ঘামাও ডাক্তারদের রোজগার নিয়ে । আমি আছি আমার পেটের ব্যথা নিয়ে । তুমি ছুটি নিয়ে রান্নাবান্না করবে ? পারবেও তো না ! তাই জোর করে বিছানা থেকে উঠি , রান্নাঘরে ঢুকি । দিন রাত  চব্বিশ ঘন্টা ধরে টিস-টিস ব্যথা নয়তো কুঁকড়ে যাওয়া ব্যথা আমার সহ্য হচ্ছে না ! চোখের তলায় কালি , কণ্ঠার হাড় বেরিয়ে গেছে ,হাতের শিরা উঁচু হয়ে গেল , মাথার চুল পাতলা হয়ে যাচ্ছে ,দিনদিন তুমি দেখেও দেখছ না  !  সবসময় টগবগ করে ফুটছো তোমার মোবাইলে কি সব পয়েন্ট জমানো নিয়ে । এর বাইরে কোন কিছু হুঁশ আছে তোমার ? তাই মনে করিয়ে দিচ্ছি , কাল দুপুরে আমি আর মিলি পুজোর কেনাকাটা করতে বেরোবো , সন্ধ্যেয় টাকা তুলে রেখো । ”

— কাল যদি ডাক্তার মল্লিকার অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেয়ে যাই , দেখাবে না ?

—  তুমি কিছুই মনে রাখো না ! দুপুরগুলোতে উনি রুগী দেখেন না । ওটিতে থাকেন । রোজ দু তিনটে অপারেশন তো থাকেই । কালকেই যদি অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেয়ে যাও  তো সকাল বা সন্ধ্যেয় দেখাতে অসুবিধে কোথায় ? 

 —  তাহলে ঠিকই আছে , তা  না হয়  যাও , কিন্তু ক্যাশ নিয়ে শাড়ি কিনতে যেত আমাদের মা মাসিরা । এই ডট কমের যুগে দোকানগুলোতে কার্ড  সোয়াইপ করে শাড়ি কেনার ব্যবস্থা নেই  ?  হ্যাঁ ! শায়া ব্লাউজের দোকানগুলোতে না হয় বিক্রি কম , তাই তাদের দোকানে ওই কার্ড সোয়াইপ করার মেশিন বসানো মানে মশা মারতে কামান দাগা । তবে তুমি তো নিশ্চয়ই চার পাঁচ হাজার টাকার শাড়ি কিনবেই তাই বলছিলাম , দুর্গাপুরে শাড়ির দোকানগুলো এখনো মর্ডানাইজড হলো না !

 বিশাখা মুখ ঝামটিয়ে বলে , “ পয়েন্ট জমানোর ঘোরে তুমি এখন সব কেনাকাটাতেই তোমার ম্যাক্সিম ব্যাংকের কার্ড ব্যবহার করতে চাইছো ! ধন্য বাবা তুমি ! বাজারের মুরগিওয়ালা , মাছওয়ালাদের ওই সোয়াইপ মেশিন বসানোর কথা বলেছ তুমি ? ” অতনু বিরক্ত হয় , “ ফাজলামি করছো ! এক একজন খদ্দের কি  আট দশ  হাজার টাকার মাছ বা মুরগি কেনে ? এসি লাগানো কাচের ঘরে কি মাছ মুরগি বিক্রি হয় ? যে কোন মাঝারি মাপের শাড়ির দোকানেও তো এসি থাকে ! 

— হ্যাঁ ! না হলে দোকানগুলোতে যা গিজগিজে ভিড় হয় বাবা ! গায়ে গা ঘেঁসে দাঁড়িয়ে এসি ছাড়া —

— তাই বলছিলাম দোকানগুলো এমনিতে ঝাঁ চকচকে কিন্তু সেই সেকেলেই রয়ে গেল ! 

 পঁচিশ বছরের একত্র বাসের অভিজ্ঞতায় অন্যান্য দম্পতিদের মতই বিশাখা অতনু পরস্পরের হাড়ে কি পরিমাণ ঘুণ ধরেছে তথা কার হাড় কি পরিমাণ অস্টিওপোরাসিস ব্যাধিতে আক্রান্ত তাও জানে ।  সুতরাং বিশাখা জানে অতনুর বাস্তববোধ ততটা প্রখর নয় । কোন কিছু একটা ঘোরে মেতে বছরখানিক বাহ্যজ্ঞানশূন্য বা  বুঁদ হয়ে থাকাটা অতনুর স্বাভাবিক জীবন ছন্দ । তাই তার গলায় ঝাঁঝ এসে গেল , “ পুজোর শাড়ি কিনতে কারা ভিড় করে দুপুরবেলায় ?  হ্যাঁ ! আছে হয়তো দুয়েক জন  তবে সবাই কি কার্ড  হাতে নিয়ে  বাজারে যাবে ? হাসালে ! বিলেত আমেরিকা নাকি ? যাক গে, ওসব পয়েন্ট ফয়েন্ট ভুলে এখন চোখের সামনের সমস্যাটায় এসো দেখি  ! তারপর না হয় পুজোর বাজার করব বা করব না । হ্যাঁ গো ! আমার অপারেশনের খরচাটা তুমি অফিস থেকে পাবে ?

— হ্যাঁ ! পাবো না কেন ?

— পুরোটা ? 

— পুরোটা কি দেয় ? আমার নিজের অ্যানজিওপ্লাস্টির বেলাতেই তো দেখলে , প্রায়  সাত হাজার মতো গেল পকেট থেকে । ধরে নাও ,  তোমার বেলায়  যা বিল হবে নার্সিংহোমের তার চাইতে  আট দশ হাজার টাকা কম ফেরত পাব ।  ওসব নিয়ে তোমাকে  মোড়লি করতে কে বলেছে ? রোজগার তো করছি মন্দ না । তোমার অপারেশনে নার্সিংহোমের যা বিল হবে তার চাইতে অনেক বেশি টাকা প্রতি বছর প্রণামি দিচ্ছি মোদিকে , আর সে পয়সায় মোদি প্রতি মাসে বিদেশে বেড়াতে যাচ্ছে । 

“ হুঁ ! সে তুমি যাই বলো না কেন , খামোকা টাকা খরচ করতে গায়ে লাগে কিনা ! এবছর না হয় মিলিকে বলতে পারব , পুজোর পরপরই তো আমার অপারেশনে ।  তার দরুণ একটা  বড় খরচ হবেই তাই আর  এ বছর দামী কিছু নিলাম না ।  সে যাই হোক , ওদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতন অবস্থা তো আমাদের নয় !এ বছর কত দেবে আমাকে ?

 বিশাখার ব্যাপারে উপুড়হস্ত অতনু এ প্রশ্নে থমকে যায়  , এটা এমন একটা ব্যাড এক্সপেন্ডিচার যে ফেরতযোগ্য  তো নয়ই বরং এর দরুণ  রিটার্ন বাবদ কোন পয়েন্টও লভ্য নয় । ইস ! যদি কার্ড সোয়াইপ করে পুজোর বাজার করা যেত ! তাদের তিনজনের মিলিয়ে মোট দশ পনেরো পয়েন্ট তো আসতই ! এদিকে বিশাখা যে বাস্তব পরিস্থিতির কথা শোনালো তাতে কার্ড সোয়াইপ করে পোশাক কেনার সম্ভাবনা অদূর ভবিষ্যতেও এ শহরে সম্ভব না । যাকগে ম্যাক্সিম ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডে ফ্রি স্মার্টফোনের অফারটা তো এখনো মাসখানেক চালু আছে , অন্য কিছু খরচা করার একটা সুযোগ এসেই যাবে না হয় ! দেখা যাক !

 

।।    দুই  ।।

 

১৪ই এপ্রিল :- ‘ গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না’ প্রবচনটি যে বর্ণে বর্ণে খাঁটি তা অতনু টের পেল  এই সেদিন , স্টেশন বাজারে সুমিতের অফিসে গিয়ে । তার বাড়ির উল্টোদিকে আট নখানা পরের বাড়িটি  সুমিতের , যে নাকি শেয়ার ব্রোকার , স্টেশন বাজারে তার অফিস , খোলা থাকে শনিবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল আটটা থেকে রাত নটা অব্দি । লোকাল থানা যেমন তেমনই এই ইনফরমেশনটুকুতেই এতদিন সে সন্তুষ্ট ছিল। সুমিতের কাছে কোন পরামর্শ নেবার কোন গরজ তার ছিল না ।  গরজে গয়লা ঢেলা  বয়। সেই মতোই একদিন সুমিতের অফিসে গেল  অতনু ।  সেদিন ব্যাংকে গিয়ে পাশবই আপডেটেড করিয়ে অতনু দেখল তার সেভিংস অ্যাকাউন্টটিতে মাসের পর মাস ধরে প্রায় লাখ খানেক টাকা অলস অর্থ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে । মানুষ যেমন , তেমনই টাকাকেও না খাটিয়ে  ব্যাঙ্কে সেভিংস  অ্যাডকাউন্টে ফেলে রাখলে উভয়েরই গতরে ঘুণ ধরে ।  ব্যাঙ্কে বা পোস্টাপিসে টাকা গচ্ছিত করা মানে হচ্ছে বেকার ছেলের সঙ্গে  মেয়ের বিয়ে দেওয়া , তাই উপযুক্ত পাত্রের সন্ধানেই সুমিতের শরণাপন্ন হওয়া । কোলাপসিবল গেটের ওপারে ভেজানো কাঁচের দরজার পাল্লা ঠেলতেই টাইলস বসানো মেঝের উপর একটি ডেক্সটপ কম্পিউটারে কর্মরতা এক যুবতীর মুখোমুখি হল সে । সুমিতের সাক্ষাৎপ্রার্থী হিসেবে তার মনোবাঞ্ছা জানানোর পর মিষ্টি হাসির সঙ্গে কাতর আবেদন শুনল অতনু , “ একটু বসুন স্যার প্লিজ ! ভেতরে স্যার অন্য দুজন কাস্টমারকে নিয়ে বিজি আছেন । ম্যাক্সিমাম পাঁচ মিনিট ওয়েট করুন স্যার ! আপনি ততক্ষণ এই ম্যাগাজিনগুলো — ”

 শিহরিত হলো অতনু ! বাব্বা: ! ঝকঝকে তকতকে ঠাটবাট এসি চলছে , সুমিতেরও একজন পিএ আছে ! তার মানে ব্রোকারি করে যথেষ্ট কমিশন পায় ! যা বোঝা যাচ্ছে তার মাস মাইনের তুলনায় সুমিতের আয় বেশি পিছনে নেই ! বাঃ ! বেশ ভালই লাগলো অতনুর । খানিক পরে পরামর্শরত দুজন  ভদ্রলোক বেরিয়ে গেলে স্যারের চেম্বারে ঢোকার অনুমতি পেল সে । সুমিত তো রীতিমত খুশি এতদিনে অতনুদা এখানে আসায় । বেটার লেট দ্যান নেভার ! যাকগে – অতনুদা এখন কি নেবেন ? ঠান্ডা না গরম ? 

 আপ্যায়ণের আড়ম্বর এড়িয়ে সরাসরি কাজের কথায় এলো অতনু , “ একটা পরামর্শের জন্য এলাম সুমিত ।  এই মুহূর্তে আমার হাতে  পঞ্চাশ ষাট হাজার টাকা এক্সেস পড়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে । কোথায় ইনভেস্ট করি বলতো ?  শেয়ারে ফাটকা খেলার পুঁজি বা শখ কোনটাই নেই আমার । ব্যাংক বা পোস্ট অফিসের চাইতে বেশি রিটার্ন কোথায় পেতে পারি ?আমি জানি , আমি জাস্ট তোমার পড়শির চাইতেও একটু বেশি আপন । তাই না ? ”

 সুমিত গালভর্তি হাসির সঙ্গে ঘাড় নেড়ে বুঝিয়ে দিল অতনু ধারনায় তার সমর্থন আছে । তারপর জিজ্ঞেস করল , “ কত টাকা রাখবেন ? ”

— ধরো  ষাট সত্তর ।

— বেস্ট অপশন ম্যাক্সিম ব্যাংকের  দুশো শেয়ার কিনুন  পিঞ্চাশ হাজার টাকায় । ক্রেডিট কার্ডটা হাতে পেতে গেলে অন্তত দুশো শেয়ার থাকা দরকার । 

—  ও ! সেই ম্যাক্সিম ব্যাঙ্ক ! হ্যাঁ হ্যাঁ ! সেদিন তৈরি হলো বটে ! স্টেট ব্যাংক গ্রুপের পরপরই তো এটা তৈরি হলো । আরো বোধ হয় চার পাঁচখানা ব্যাঙ্ক বাকি পড়ে আছে । সেগুলো মিলিয়ে আর একখানা নতুন ব্যাংক তৈরি হবে । কোন কোন ব্যাংক মিশিয়ে এই ম্যাক্সিম ব্যাংকটা তৈরি হল যেন ? নাম ফাম মনেও থাকে না , তাই বিশেষ মাথা ঘামাই না । আমার যা সামান্য পুঁজি , লকারের গয়না , সব স্টেট ব্যাঙ্কে ছিল , ওটার নাম পাল্টে খালি স্টেট ব্যাঙ্ক গ্রুপ হয়েছে – টাকা পয়সা সব যেমনকে তেমনই আছে বাবা ! পাশবই , চেকবই এটিএম কার্ডগুলো খালি পাল্টে গেছে ।

 পাড়ার লোক পেয়ে বোধহয় সুমিতের একটু গল্প করার মুড এসে গেছে । কলিংবেলের সুইচ টিপলো সে, তৎক্ষণাৎ দরজা খুলে রিসেপশন ডেস্কের  সেই যুবতীটির হাসিমুখ উঁকি মারল , “ ইয়েস স্যার ? ”

— শোনো সুইটি ! ইনি আমার নেক্সট ডোর নেবার । বাসুদেবকে একটু পাঠিয়ে দু কাপ কফি আর সামান্য কিছু স্ন্যাকস —

— ওক্কে স্যার ! জাস্ট টেন মিনিটস । প্লিজ ওয়েট ।

 অতনু মৃদু প্রতিবাদ করল , “  আরে সবাইকে ব্যতিব্যস্ত করছ অকারণে । আমি কিছু খাব না।”

সুমিত আড্ডা দেওয়ার মুডে এখন , জোরের সঙ্গে বলল , “ আরে দাদা ! জিএসটি চালু হবার পর থেকে ইন্ডিয়ান ইকনমিক সিনারিওর যে হ্যাভক চেঞ্জেসগুলো ওয়ান বাই ওয়ান ঘটে চলেছে তা বোঝাতে গেলে এক কাপে হবে না , কাপ চারেক কফি লাগবে ! জমিয়ে বসুন তো ! পঞ্চাশ হাজার টাকা আপনার কাছে সামান্য হতে পারে ,  জলে ফেললেন কি ডাঙায় , আপনার তাতে কিছু যায় আসে না। সে আমি জানি । রেলের বড় অফিসার বলে কথা ! এতদিন তো ডেবিট কার্ডই ইউজ করে এসেছেন ,এবার মুফতে পাচ্ছেন এই ক্রেডিট কার্ডটা । মাসে এক লাখ অব্দি কেনাকাটা করুন আর প্রতি মাসে একশ পয়েন্ট করে গিফট পান !”

 এই ভূমিকার পরে সুমিত অতনুর চোখের সামনে যে নতুন দুনিয়ার দরজা খুলে ধরল তা উপলব্ধি করতে গেলে কাজু আর কফি মাস্ট । সুমিত যে নতুন কিছু শোনালো তা নয় , তবে তাতে সারাদিন রাতের নিজস্ব জীবনছন্দের ফাঁকফোকরে টিভির নিউজ চ্যানেল বা খবরের কাগজের হেডলাইনগুলির তাৎপর্য নতুন করে উপলব্ধি করল অতনু । সুমিতের বোঝানোর ভঙ্গিটিও যথেষ্ট চিত্তাকর্ষক , স্কুল শিক্ষকতা তার উপযুক্ত পেশা । “ রাজ্যসভায় জিএসটি  বিল পাশ হয়ে যাবার পর সরকার  সরকার বুঝে নিল , আরব্ধ কাজগুলি আর ফেলে রাখা যাবে না । পরবর্তী লক্ষ্য ছিল দেশের অর্থব্যবস্থাকে খোলা বাজারে টেনে আনা।  ব্যাংক আর বীমা সরকারি বিছানায় সুখে ঘুমাবে আর দেশে খোলা হাওয়া বইবে ! হয় কখনও ? সরকারের কবল থেকে অমুক ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া , তমুক ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়াকে বের করে আনতে গেলে প্রথম ধাপ তাদের সংখ্যা কমানো ।”

 সুমিতের ফ্লোতে বাধা দিয়ে অতনু বলে উঠল , “ হ্যাঁ ! একটু বুঝিয়ে বল দেখি এ ব্যাপারটা । ”

 সুমিত হাসল ,  বলল , “ এই বাংলায় একসময় ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের একটা হাওয়া বইছিল , মনে আছে ?  সেই সময়ের একটা বিখ্যাত স্লোগান বাড়ির দেওয়ালে দেওয়ালে লেখা হতো , ‘ সংসার সুখে বাড়ুক সংখ্যায় নয় ।’ মনে পড়ে ? হ্যা : হ্যা: ! ওই শ্লোগানটা আমাদের অর্থ-মন্ত্রকের মোটো এখন । ব্যাঙ্ক ও বীমা কোম্পানি প্রফিটে বাড়ুক , সংখ্যায় নয় ।  বুঝলেন ? প্রথম টার্গেট ছিল , চারটে  সাবসিডিয়ারিকে স্টেট ব্যাঙ্কের সঙ্গে মিশিয়ে একটা স্টেট ব্যাঙ্ক গ্রুপ তৈরি করা ।  করা হলো । তাতেও তো সারা ভারতে ব্যাংক স্ট্রাইক, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চলল , ভুলে গেছেন নাকি ? তারপর যা হোক রাজ্যসভাতে মেজর পলিটিক্যাল পার্টিগুলো সরকারের পাশে দাঁড়ানোয় ওটা এবং এই ম্যাক্সিম  ব্যাঙ্কটার জন্ম সম্ভব হল । জানেন তো সবই ! তারপর এক ঝটকায়  সেনসেক্স কতটা উঠে গেছে লক্ষ্য করেছেন ? ”

 অতনু হাসল ,  বলল , “ ভাই ! আজ পর্যন্ত এক টাকারও শেয়ার কিনি নি কোথাও ! আদার ব্যাপারী হয়ে জাহাজের খবর নেওয়া কি মানায় ?”  অতনুর কূপমন্ডুকতায় সুমিত একটু অনুকম্পা মেশানো হাসির সঙ্গে কাঁধ শ্রাগ করে বলে উঠল , “ ধন্য দাদা আপনি ! ব্যাঙ্ক মার্জার স্টেপটা সাকসেসফুল হতেই সেনসেক্স একধাক্কায় পঁয়তাল্লিশ ক্রশ করল । তখনই যদি ডিসিশনটা নিতেন দাদা ! তখন এই পঞ্চাশ হাজারেই এই আড়াইশো শেয়ার তুলে রাখতে পারতেন ! আপনারা  তো সেই ঠাকুরদাদার আমলের ফিক্সড ডিপোজিট আর কিষান বিকাশ পত্রের বাইরে তো বেরোবেন না ! এই ম্যাক্সিম ব্যাঙ্কে টাকা রাখতে দুশ্চিন্তা হবে নাতো ? ”

— সে তুমি যখন ভরসা দিচ্ছ ! আচ্ছা সুমিত , কতগুলো সরকারি ব্যাংক তো দেখছি বেশ বহাল তবিয়তেই দুর্গাপুরের এখানে সেখানে রয়েছে  দেখছি । ওগুলো কি সরকারিই থেকে যাবে নাকি ! যেমন ধরো ,কানাড়া ব্যাঙ্ক ,ব্যাঙ্ক অফ বরোদা – 

— আগে বলেছি কি, মোট তিন রকম ব্যাংক থাকবে । যেগুলো দেখছেন ওগুলোরও সাইনবোর্ড পাল্টাবে । আরে দাদা ! পুরো দুর্গা প্রতিমাটাকেই যখন বিসর্জন দেওয়া হল তখন কার্তিক গণেশ সরস্বতী রয়ে যায় কখনো ! দাঁড়ান একটু !  লেবারগুলো নৌকোর পাটাতনে বসে একটু আরাম নিচ্ছে , বিড়ি টানছে । একটু থিতু হয়ে বসলে বাকি কাজটা আরো নিখুঁতভাবে করা যায় ! হ্যা : হ্যা : হ্যা : ! ওগুলোও জলে ফেলা হবে । নতুন নামটা কি হবে জানিনা অবশ্য ।  দাঁড়ান কদিন ! প্রধানমন্ত্রী উগান্ডা সফরে গেছেন । ফিরলেই হচ্ছে !  উগান্ডাটা হয়ে গেলেই গোটা পৃথিবীটাই দুবার করে ঘোরা হয়ে যাবে ওনার । হ্যা :হ্যা: হ্যা :!

 সুমিত একটু বেশি বকে, আর যারা বেশি বকে তারা ডিপ্লোম্যাসি শেখেনি । ফলে প্রায় সময়েই তাদের পক্ষপাত স্পষ্ট হয়ে যায় । আলোচনা আবার আমিষগন্ধী হয়ে উঠছে দেখে সাবধানী অতনু কথা ঘোরালো , “ কোন কোন ব্যাঙ্ক মিশিয়ে এই ম্যাক্সিম ব্যাঙ্কটা তৈরি হলো বলতো ? 

— গড়গড় করে মুখস্থ বলতে পারব না  দাদা ! নেট খুলতে হবে । মনে রাখুন , কলকাতায় হেড অফিস ছিল যেগুলোর তাদের সঙ্গে আরো সাতটা । কলকাতা বা ওয়েস্ট বেঙ্গলে পার্টি আর দালালরাজ ছাড়া কোন কালচার আছে কি ? দাদা ! কর্পোরেট দুনিয়া এখন কলকাতাকে এড়াতে পারলে বাঁচে ! অন্য স্টেট গুলো কি রেটে ডেভেলপ করছে দেখেও দেখছেন না ? শুধু ব্যাঙ্কগুলো কেন , বহু কোম্পানিই তো তাদের হেড অফিস গুটিয়ে নিয়ে দিল্লি চলে গেল , খবরের কাগজে তো দেখেন ! 

আবার সেই আমিষগন্ধী কথাবার্তা ! সাবধানী অতনু বলে উঠলো , “ যাকগে ভাই , বাদ দাও  ওসব । আমাদের তো আর ওসব নিয়ে মাথা ঘামালে চলবে না । কাজের কথায় এসো ! এই পঞ্চাশ হাজার টাকা রাখার সেরা জায়গাটা কি ? তোমার ওই স্টেট ব্যাংক গ্রুপের শেয়ারই কিনি । নাকি বল ? এর দর এখন কত ?

—- দাদা এটার ফেস ভ্যালু ছিল আড়াইশো।  দুবছরে বেড়ে হয়েছে  চারশো । যা অনুমান এটা আর তেমন বাড়বে না । এক্সেস টাকা থাকলে কিনে রাখাই যায় , ধীরে ধীরে হলেও উঠবে ঠিকই । তবে এখন অব্দি কিন্তু হট কেক ম্যাক্সিম ব্যাংক ! ফেস ভ্যালু আড়াইশো । ফ্রি অফার পাচ্ছেন একটা ক্রেডিট কার্ড । দুমাস ধরে এক লাখ টাকা অব্দি কেনাকাটা করুন , পকেটে টাকা নিয়ে ঘোরার দিন শেষ ! দুমাস বাদে রিচার্জ করান , মার্কেটে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ান। হ্যাঁ ! বছরে ন পারসেন্ট  সুদে ম্যাক্সিম ব্যাঙ্কে পঞ্চাশ হাজার টাকার একটা ফিক্সড ডিপোজিটও লাগবে । ইন্টারেস্ট রেটটাও ফেবুলাস ! হুড়মুড় করে লোকে তাই ক্রেডিট কার্ড কিনছে দাদা !

 প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়ার উত্তরে অতনুর  ফ্যালফ্যালে চাহনি দেখে সুমিত বিশদে যা বোঝাল , “ সদ্যগঠিত এই ম্যাক্সিম ব্যাংকটির অর্থনৈতিক ভিত্তিটি এতই মজবুত যে পাতি মধ্যবিত্ত অব্দি এখানে টাকা ঢেলে ভালো  রিটার্ন পাওয়ার নেশায়  ঝাঁপিয়ে পড়েছে । এই ব্যাংকটি প্রথম পর্যায়ে তার কাস্টমারদের মধ্যে যারা  দুশো শেয়ার এবং পঞ্চাশ হাজার টাকার ফিক্সড ডিপোজিটের মালিক তাদের জন্য একটি এক লাখ টাকা লিমিটের ক্রেডিট কার্ড ফ্রিতে দিচ্ছে ! দুমাস বা এক মাসের মধ্যে কার্ড সোয়াইপ করে এক লাখ টাকা পর্যন্ত কেনাকাটা করুন , বৌদির গয়না  কিনুন বা সিঙ্গাপুর ট্যুর , যা  খুশি ! পকেটে টাকা নিয়ে বাইরে বেরোনোর দিন শেষ ।”

— বেশ ! ধরো , এবার কেউ এক লাখ টাকার গয়না কিনে নিয়ে চুপ করে দিয়ে বসে রইল । তারপর শেয়ার বিক্রি করে  আর ফিক্সড ডিপোজিটটি ভাঙিয়ে  নিয়ে আর ব্যাংকের ছায়া মাড়ালো না ।  হতে পারে তো ? তাহলে তোমার এই ম্যাক্সিম ব্যাংক তো ছ’ মাসের মধ্যেই লাল বাতি জ্বালাবে গো সুমিত !

 সুমিত হাসলো হা হা করে । বলল , “ অত সহজ দাদা ! এরা কি মদন বাবুর মদতে ব্যবসা করতে এসেছে নাকি ! যে কেউ আমার কাছে এসে একশ দুশো শেয়ার কিনতেই পারে তবে যে ক্রেডিট কার্ড চাইবে তাকেই ক্রেডিট কার্ড দেবে নাকি ?  তার ইনকাম তার স্ট্যাটাস সবই দেখে নেবে ওরা । তার জন্যে নেসেসারি প্রমাণপত্রের জেরক্স  তো লাগবেই । তারপরেও তো এসকর্ট সার্ভিস আছেই ! ওসব ইয়ার্কি ফক্কুড়ির গল্প ছাড়ুন , সত্তর লগ্নি করবেন স্থির করেছেন , আরো  তিরিশ ঢালুন !  শেয়ার আর কার্ডটা নিন , লাইফটা চুটিয়ে এনজয় করুন দাদা ! একটাই তো জীবন !”

— শোনো সুমিত , তুমি ফালতু বকছ !   কার্ড ফার্ড নিয়ে মাথাব্যথা নেই আমার । এটিএম কার্ড  তো পকেটেই রয়েছে । এই কার্ডে আর ঘোড়ার ডিম কি হবে ! হ্যাঁ ! ডেবিট কার্ডে এক লাখ টাকার গয়না কিনতে গেলে অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স এক লাখ থাকতে হবে এই যা !

 সুমিত লাফিয়ে উঠলো , “ অ্যাই মজাটা এখানেই ! এটিএম কার্ড সোয়াইপ করে ফ্রি গিফট পাবেন কোনদিনও ? 

 সে আবার হয় নাকি কখনো ! বিভ্রান্তিকে আরো ধোঁয়াটে করতে সমীর নাটকীয়ভাবে বলল , “ ধরুন , ফ্রি গিফট বলতে যদি গোয়া যাতায়াতের প্লেন ভাড়া প্লাস একটা থ্রিস্টার হোটেলে তিন চার দিনের থাকার মোট খরচ যা  – যদি সেটা হয় ? ”

— কি আবোল তাবোল বকছ !  আমাকে একেবারে গাইয়া পেয়েছো নাকি  ?

—  হাঃ হাঃ হাঃ ! সাধে কি আর লোকে যতটুকু পুঁজি আছে নিয়ে ঢালছে দাদা ! রাত দশটার আগে এই অফিসটা বন্ধ করতে পারছি না । আমার  পি এ কাজ ছেড়ে দেবে হুমকি দিয়েছিল , ওকে মাসে এক হাজার টাকা বেশি দেবো বলে কথা দিতে তবে শান্ত হয়েছে । শুনুন মন দিয়ে !

 সুমিত এবার যা বোঝালো তার সংক্ষেপ করলে দাঁড়ায় , ম্যাক্সিম ব্যাংকের  দুশো শেয়ার কেনা লাভজনক তো বটেই তবে মোট  এক লাখ টাকা বিনিয়োগে কার্ডটি নিলে আও সুবিধা । কি রকম ?  কার্ড সোয়াইপ করে কেনাকাটা করলে প্রতিটি কেনাকাটার সঙ্গে মোবাইলে একটা পয়েন্ট এসে জমা হয় প্রতি হাজার কেনাকাটায় গিফট হিসাবে  এক পয়েন্ট করে পাওয়া যায় । এভাবে সঞ্চিত পয়েন্ট সমূহ মদন কথিত ' বিন্দু বিন্দু জমে সিন্ধুতে পরিণত হলে '  রিডিম করিয়ে গিফট আইটেমগুলো তুলে নেওয়া যায়। কি কি গিফট ? পঞ্চাশ পয়েন্ট জমলে একটা মিক্সার বা জুসার  একশো পয়েন্ট জমাতে পারলে একটা স্মার্ট ফোন দুশো পয়েন্ট অব্দি জমাতে পারলে একটা এলসিডি টিভি বা  এ সি তবে জ্যাকপট অফারটা কিন্তু  পাঁচশো পয়েন্টে ! তিন রাত চার দিনের গোয়া ট্যুর  ফ্রি ! প্লেন ভাড়া হোটেল খরচার সঙ্গে ট্যাক্সি ভাড়া অব্দি ! 

 সুমিত বলল , “ ভেবে দেখুন অতনুদা ! দুমাসে এক লাখ টাকা খরচ প্রায় সকলেই করে থাকে , শুধুমাত্র বেসিক নিডসগুলো মেটানোর জন্যেই । নয় কি ?  এবার থেকে আর ক্যাশে বা চেকে নয় , ম্যাক্সিম ব্যাংকের কার্ড সোয়াইপ করে খরচাটা করতে হবে এই যা তফাত ! তার জন্য আবার মুফতে কিছু পেয়েও যাচ্ছেন !  থ্রিলিং নয় ? খালি প্যাটার্ন অফ এক্সপেন্ডিচারটা বদলান !  খরচা কমাতে বলছিনা আমরা , আরো বেশি করে খরচা করুন ! তবে খরচাটা করুন উইদাউট ক্যাশে । আর ফ্রী গোয়া ট্রিপটার জন্যে দাদা একটু বুকের পাটা থাকতে হবে ! হাঃ হাঃ হাঃ !”

 সত্যিই লোভনীয় এবং রোমাঞ্চকর অফার ! তবুও সাবধানী অতনু বলে উঠেছিল , “ দূর ! তুমিও যেমন ! দু'মাসে পাঁচ লাখ টাকা খরচা করার মতো এলেমদার আমি নই। টাটা বিড়লা নাকি ? ”

 সুমিত বলেছিল , “ আপনার তো হয়ই , আমি তো চুনোপুটি এই আমিও দুমাস কেন একমাসেই  পাঁচ লাখ টাকা খরচা করেছি । তবে তখন ম্যাক্সিম ব্যাঙ্কও ছিল না আর কার্ডের গল্পও ছিল না ।

— কি  খরচা ?

— বাড়িটা যখন তৈরি করাই এক মাসে রড সিমেন্ট থেকে শুরু করে হার্ডওয়ারের দোকানেই তো দিয়েছি চার লাখ ! এক কাজ করুন , আপনার টোটাল ইনকাম থেকে টোটাল খরচাটা বিয়োগ করুন । এর মধ্যে নার্সিংহোমের খরচটাও ধরবেন । দেখবেন , বছরের কোনো কোনো দুমাসে পাঁচ লাখ খরচা হয়েই যায়। হ্যাঁ ! ক্যাশে  নয় সমস্ত খরচাই করতে হবে কার্ড সোয়াইপ করে  অথবা যা কিছু কিনবেন অনলাইনে । গোয়া ট্রিপ না হয় হলো না ,  দু মাসে এক লাখ টাকা খরচা করা যায় তো? একটা ল্যাপটপ বা ফ্ল্যাট টিভি  ফ্রিতে পাচ্ছেন ! সেটাই বা কম কিসে ?  তিরিশ পারসেন্ট কমিশন হচ্ছে কিনা ? এই ক্রেডিট কার্ডটার মজাটা এখানেই ! ম্যাক্সিম ব্যাংক চাইছে আপনি বেশি বেশি জিনিস কিনুন ,  তবে টাকা দিয়ে নয় ! 

— বেশ ! এ মাসে দুশো শেয়ার কিনছি । তবে ফিক্সড দুমাস পরে করলেও চলবে কি ? 

—  গড়গড়িয়ে চলবে ! তবে যতক্ষণ না ফিক্সড করছেন ততক্ষণ তো কার্ড পাচ্ছেন না ! দুমাস বাদে না আবার এক লাখ টাকার ক্রেডিট কার্ড পেতে এক লাখ টাকাই জমা রাখতে হয় ! আগাম খবর কি আমাদের কাছে থাকে , যা রাশ এখনই !

 সুমিত যখন এসব ভাবছিল , অতনুর চোখে তখন স্বপ্নের গোয়া ! আহা ! এখনো যাওয়া হয়ে ওঠেনি। ওটা যে ফ্রিতে হতে পারে ভাবা যায় কখনো ! এ সুযোগটা না হয় হাতছাড়া  হবে তবে একখানা করে ফ্ল্যাট টিভি বা ল্যাপটপ জুটে গেলে মন্দ কি ! বেডরুম তো তিনখানা । ছেলের জন্যে তো একখানা ল্যাপটপ লাগবেই ! কেনাকাটা না হয় একটু বেশিই বেশি করতে  হবে । ধার না হয় করতেই হল , পরে শোধ করলেই তো চলবে ! অসুবিধার কি ! রিটায়ারমেন্ট তো এখনো ঢের দেরি !   আরে , মুনি ,ঋষিরাই তো উপদেশ দিয়ে গেছেন সেই কোন কালে  – ‘ঋণং কৃত্বা ….’! বাকিটা কি যেন ?

 

।।    তিন  ।।

 

১৮ ই সেপ্টেম্বর :-  ডাক্তার মল্লিকা স্ক্যান প্লেট দেখে খুবই আশ্চর্য হয়ে গিয়ে উচ্চারণ করেছিলেন , “ স্ট্রেঞ্জ !  ইতনা লার্জার বন গয়া দ্যাট ল্যাপারোস্কপি পসিবল নেহি আছে । অ্যাবডমিনাল হিস্টেরেক্টমি ইজ দা অনলি ওয়ে । ” এইরকমই প্রতিক্রিয়া আসবে অতনু জানতো । স্ক্যান রিপোর্ট হাতে পাবার পর ডাক্তার মল্লিকার দর্শন পেতে দুদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে । এর মাঝে নেট ঘেঁটে  অতনু জেনে নিয়েছে এই সার্জারিটি  কী ! নেটে তো আর সার্জারির খরচা কত কি সেটা লেখা থাকে না , আপাতত উভয়েরই মূল কৌতূহল তা নিয়েই । আবার দুম করে  তো সে প্রশ্ন করা যায় না , তাই প্রথম পর্যায়ে সার্জারির পরবর্তী ধাপগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা ভালো । বিশাখাও সে নিয়ে ভীষণ উৎকণ্ঠিত , তারও ইচ্ছা ভাইফোঁটার পরেই সার্জারি হোক । সে অভিলাষ শুনে মল্লিকা ম্যাডাম বললেন , “ আপনি ডেলি দুটা পেন কিলার নিচ্ছেন । কালীপূজাকে বাদ , দ্যাট মিনস এখুনো মোর দ্যান  মান্থস ! হাও ডেয়ার  ইউ আর ! আই উইল সাজেস্ট  ইট অন দা নেক্সট  উইক ।”

— বেশ ! তাই না হয় হবে ম্যাডাম ! নেক্সট উইকেই হবে না হয় । কতদিন বেড রেস্ট নিতে হবে ?

—- নো  কোয়েশ্চেন অব টেকিং বেড রেস্ট  অ্যান্ড এটসেটরা । হাঁ ! বেন্ড  হোবেন না । সাচ অ্যাজ কি ফ্লোর থেকে কুছু পিক আপ কোরবেন না ।  ওক্কে ? মোস্ট ইম্পরটান্ট , ওয়েট লিফটিং কোরবেন না । 

 অতনু বিড়বিড় করল , “ ও তো ওয়েট লিফটিং করেনি কোনদিনও ! ওর তো কোন স্পোর্টস অ্যাকটিভিটিই নেই ! ”

 ডাক্তার মল্লিকা বেশ শব্দ করেই হেসে ফেললেন । বললেন , “ ওঃ ! স্যরি ! আই অ্যাম নট টকিং অব দ্যাট কাইন্ড ।  শোচ লিজিয়ে কি কিচেন ইয়া বাথরুমমে পানি ভর্তি বালটি উঠা নেহি পায়েঙ্গে । সমঝে ?

 বিশাখা উদ্ভাসিত মুখে জিজ্ঞেস করল , “ তাহলে ঠাকুর দেখতে বেরোতে পারবো ? ”

— জ্যাদা ক্রাউডের মধ্যে ! কেনো রিস্ক নেবেন ? ইউ ক্যান ওয়াক অন দা রোড । 

 এবার মোক্ষম প্রশ্নটি করল অতনু , “ ম্যাডাম ! কত খরচা হবে ? ”

— হাঁ !  দ্যাটস দা  মেইন কোয়েশ্চেন ! আই থিংক , নিয়ার অ্যাবাউট সেভেনটি থেকে  এইটটি হোবে । আপনার তো মেডিক্লেম আছে কি নেই ?

অতনু মাথা নাড়ল , “ না ম্যাডাম ! আমাদের রেলওয়ে হসপিটাল  ছাড়াও বেশ কটা মাল্টিস্পেশালিটি হসপিটালের সঙ্গে ক্যাশলেস ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা করা আছে । বাট ইভেনচুয়ালি দিস ‘ ঋষি অরবিন্দ ’--ডোন্ট মাইন্ড ম্যাডাম , ইটস নট সো ফেমাস অ্যাজ আদারস আর । যাকগে , নো প্রবলেম ! হসপিটালের যা বিল হবে দ্যাট উড বি রিইমম্বারসড । কোম্পানি আমাকে রিটার্ন করে দেবে এক  দো মাহিনা  বাদ ।”

 পরবর্তী প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ , বিশাখা জিজ্ঞেস করল , “ ইউটেরাস  তো বাদ যাবে ? ”

— হাঁ ! দ্য ফাইব্রয়েড হ্যাজ বিকাম সো লার্জ দ্যাট ইউটেরাসকে রিমুভ কোরতেই হোবে । হাঁ ! কিতনা উমর আপ কি ?

বয়েস শুনে বললেন , “ নাঃ ! ইউ আর নট ওল্ড এনাফ । বাট ইতনা বড়া ফাইব্রয়েড নিকালনা পসিবল নেহি আছে । ইফ আই নোটিশ ওভারিজ আর ইন গুড কন্ডিশন দেন ইটস ওকে , নেহি তো ওভারিজ অলসো বি অ্যামপুটেড  ।”

— পিরিয়ড আর হবে না তো?

 মল্লিকা শেখওয়াত হাসলেন । বললেন , “ দ্যাটস দা গুড নিউজ ওনলি ফর ইউ অ্যাট প্রেজেন্ট ।

 বিশাখাও বলল , “ সত্যিই ম্যাডাম ! ওইটুকুই যা  সান্ত্বনা ।  ম্যাডাম ! কবে কবে আপনার ওটি আছে এখানে ?”

— সানডে , ওয়েনেসডে অ্যান্ড স্যাটারডে । আগলে দিন অ্যাট মর্নিং অ্যাডমিশন নিয়ে নেবেন । তার আগে আমার পিএকে একটা রিং করে দেবেন । দিস ইজ হার নাম্বার । ওক্কে ? ”

 ডাক্তারের গলায় উঠে পড়া নির্দেশ ছিল সেটা বুঝে নিয়ে চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে বিশাখা জিজ্ঞেস করল তাহলে ম্যাডাম কবে থেকে আবার সব কুছ করনা সকুঙ্গা ?  ম্যাডাম হাসিমুখেই জিজ্ঞাসা করলেন , “ স্কিপিং ?  জাম্পিং? ডান্সিং ? ” বিশাখা এ প্রশ্নে প্রথমে অবাক তারপর হাসিতে লুটিয়ে পড়ে প্রতিবাদ করল , “ না ! না ! ” ডাক্তার হাসিমুখেই বললেন , “ ইউ ক্যান হ্যাভ সেক্স অলসো অন অ্যান্ড ফ্রম ওয়ান এন্ড হাফ মান্থস।” মুখ চোখ লাল করে বিশাখা বলে উঠলো , “  না  – ম্যায় তো ইয়ে বাত পুছা নেহি । সব কুছ মানে ঘর কা কাজ – ওকে  ধন্যবাদ ম্যাডাম ! ” রাস্তায় নেমে বিশাখা বললো , “ তোমার শান্তি হলো তো ? এটাই তো তুমি জানতে চাইছিলে কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারছিলে না ।  ডাক্তার কিন্তু তোমার মুখ দেখে বুঝে নিয়েছে তোমার মনোভাব । ডাক্তার যাই বলুক ছমাসের আগেই কিছুতেই ওসব নয় বাবা ! বুঝলে ? ” অতনুর কাছে প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া না পেয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বিশাখা বোঝে অতনু যেন কিছু একটা ভেবেই চলেছে ! বিশাখা একটু থমকে গিয়ে বলে , “ কি গো ! তুমি খরচের কথা ভাবছো ? নয় ?  তখন যে বললে , সব পেয়ে যাবে ! পাবে  না নাকি  ? ” অতনু চিন্তিত ভঙ্গিতেই জবাব দিল , “ না । ওসব নয় । একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা জিজ্ঞাসা করতেই ভুলে গেলাম গো ! তুমি  এই গাছতলাটায় দাঁড়াও তো  পাঁচ মিনিট !  যাবো আর আসবো ।, ” দ্রুতপদে ছেড়ে আসা হাসপাতালের দিকে পা চালালো সে । রিসেপশন  ডেস্কে গিয়ে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে  বলল , “ নেক্সট উইকে তো মিসেসকে ভর্তি করছি এখানে , কিভাবে পেমেন্ট করতে হয় ? ক্যাশে ? নাকি কার্ডে ? ” মেয়েটি ডান দিকে আঙ্গুল তুলে বলল , “ স্যার ! ওই রুমটার দরজার মাথায় ‘ক্যাশ’ লেখা বোর্ডটা দেখছেন তো ? ওখানে যান !”

 ক্যাশের যুবকটি  বলল , “ সমঝা নেহী ! কেনো ইয়ে বাত পুছছেন  ? প্লিজ বি স্পেসিফিক । ” ওঃ ! এই প্রাইভেট হাসপাতালেও যত্তসব ইয়ে মাল ! ” প্রচন্ড বিরক্তি চেপে অতনু বলল , “ আমি কার্ড সোয়াইপ করে বিলটা মেটাব । এখানে কার্ড   সোয়াইপ করার ব্যবস্থা আছে ? ”

—- কওন  সা ব্যাঙ্ককা ক্রেডিট কার্ড ?

— ম্যাক্সিম ব্যাংক  ।

— হাঁ ! চলবে ।

 আবার পা চালিয়ে রাস্তায় নামল অতনু বিশাখা বরফ কুঁচকেই ছিল জিজ্ঞেস করল কি ব্যাপার মানিব্যাগ বা ফোন ফেলে এসেছিল তো পেয়েছ অতনু স্বস্তি নিঃশ্বাস পেলে বলল পেলাম

 কিজন্যে দৌড়ালে ?

বিশদে বলতে গিয়েও থমকালো অতনু । সব কথাই বউকে বলতে হবে নাকি ? ভেড়ুয়া নাকি সে ?

 

।।   চার  ।।

 

৮ই অক্টোবর :-    চারদিন ধরে অসহ্য কষ্টভোগের পর বিশাখা আজ হাসপাতালে বিছানা থেকে ছাড়া পাবে । প্রথম ও দ্বিতীয় চব্বিশটি ঘন্টা সে হাসপাতালে ওষুধের ঘোরে আচ্ছন্ন ছিল । তৃতীয় দিন থেকে অসহ্য ব্যথায় কাতরেছে ! ভীষণ বিভ্রান্ত এবং উদ্বিগ্ন হয়ে অতনু বারবার ছুটেছে বিশাখার কেবিন সংলগ্ন নার্সদের বিশ্রাম কক্ষটিতে । বয়স্কা নার্স শেষে একটু বিরক্ত হয়েই বলেছিলেন , “ শুনুন দাদা ! ওনার ওভারি আর ইউটেরাস দুটো ছিঁড়ে ড নেয়া হয়েছে গত পরশু দুপুরে । ব্যথা ভোগ তো হবেই ! ”

— ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে ?

— আরে ! কেটে নেওয়া  ছিঁড়ে  নেওয়া আলাদা কিসে ? পেশেন্টরা সামলে নেয় কিন্তু তাদের পুরুষ রিলেটিভরাই বেশি আতুপুতু করে । পেইন কিলার ইনজেকশন আবার ডিনারের পরে পাবেন উনি । এখন একটা ট্যাবলেট দিচ্ছি । আপনি এত ছটফট করবেন না । এখন একটু ব্যথা কমবে তবে দিনভর টিসটিসানি  একটা ব্যথা থাকবেই ।  কাল দুপুর থেকে ব্যথা গায়েব  , পরশু বিকেলে ওনার ছুটি এখান থেকে । ঠিক আছে ? প্লিজ দাদা ! আপনি আর  এভাবে আমাদের বিরক্ত করবেন না ।

আজ সকাল থেকে বিশাখার হাসিমুখ , ওয়াকার ধরে ধরে বাথরুমে যাচ্ছে , বেড প্যান নেয়নি । অতনু  চিন্তিত ছিল এই ভেবে যে বিশাখার সঙ্গিনী আয়াটি যেরকম যত্ন করে ওকে চান পরিষ্কার করাচ্ছে বাড়ি নিয়ে যাবার পর এরকম সাহায্য কে করবে !  টয়লেট থেকে ফিরে এসে আয়ার সাহায্যে অতনুর মুখোমুখি এসে পা ঝুলিয়ে বসলো বিশাখা । বলল , “ রান্নার মেয়েটা দুবেলা আসছে তো ঠিকঠাক ? মা ওকে সেরকম নজরে রাখছে নাকি কে জানে ! না হলে আবার কত কি যে পাচার করে দেয় কে বলবে ! ” বিশাখার প্রশ্ন এবং আশঙ্কার উত্তরে হাসিমুখেই  সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লো অতনু । বলল , “ আজ মনে হচ্ছে আর ব্যথা নেই । তাই না ? ”

— খালি চলতে ফিরতে একটা টিসটিসানি ভাব রয়েই গেছে  ! হ্যাঁগো !  এই ভারতী মেয়েটি রাঁধছে কেমন ? একি আর পূর্ণিমার মতো হবে ! রান্নার চাইতে বড় কথা , জিনিসপত্র , মশলাপাতি , তেল ,গ্যাস ফেলে ছড়িয়ে নয় ছয় না করে ! মাকে তো পই পই করে বলে এলাম লক্ষ্য রাখতে ! পূর্ণিমার হাতে  গ্যাস , রান্নাঘর সব নিশ্চিন্তে ফেলে দিয়ে  আসানসোলে গিয়ে দু এক রাত থেকে এসেছি  বাবার অসুখের সময় । বলো ? সবাই তো আর পূর্ণিমা নয় !

 মনে পড়লো সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা ! বেশি দিনের কথা তো নয় ,  গত বছর এখানকার এই  হাসপাতালেরই ডাক্তার খাসনবিশ হতাশ ভঙ্গিতে বলেছিলেন , “ বাড়ি নিয়ে গিয়ে রাখতে পারবেন ?  উনার আর কোন চিকিৎসা নেই । স্যালাইন , অক্সিজেন আর ২৪ ঘন্টার আয়া এই লাইফ সাপোর্টে যতদিন বাঁচিয়ে রাখতে পারেন  ! দো ইফ ইউ  ডোন্ট মাইন্ড , ইটস বেটার ফর হার বেটার ফর হার টু পাস অ্যাওয়ে ।  কথা বলার ক্ষমতাটা গেছে কিন্তু ব্যথাবোধটা তো আছে ! এভরি সেকেন্ড ইজ পেইনফুল ফর হার ।” হসপিটালের বিল উঠেছিল এক লাখ বারো হাজার কত  যেন !  মাকে বাড়ি নিয়ে গেছিল অতনু । স্টেট ব্যাংকের ডেবিট কার্ড ছিল তখন । ম্যাক্সিম ব্যাংকটাই তখন চালু হয়নি । আজকের দিন হলে  একশ বারো পয়েন্ট  বোনাস হিসেবে আসতো ! হ্যাঁ যাকগে ! আফসোস করে আর কি লাভ ! কি দুশ্চিন্তায় দিনগুলো কেটেছে তখন ! বিপদ কখনো একা আসে না । অতনুর গোদের উপর বিষফোঁড়া , মাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার চার-পাঁচ দিন পরেই শ্বশুরমশাইয়ের ম্যাসিভ  হার্ট অ্যাটাক । আইসিইউতে চারদিন থেকে চলে গেলেন ! বিশাখা কোন দিক সামলাবে ? জন্মদাত্রী মা নাকি শাশুড়ি  ! রাঁধুনীর খোঁজ করতে পূর্ণিমার খোঁজ পাওয়া গেল , মাসে পনেরোশো , সকাল আটটায় আসবে একবার , আবার বিকেল পাঁচটায় আসবে রাতের রান্নার জন্যে । আশঙ্কা থাকেই নানারকম ! অভাবী মানুষ , রান্নাঘরে কৌটোভর্তি জিনিস দেখে যদি লোভ সামলাতে না পারে ! প্রথম প্রথম প্রায় আড়চোখে লক্ষ্য রাখতে হয়  বই  কি ! অতনুর সে উপায়  কোথায় ! সে তো হাতে একটা বই বা ম্যাগাজিন নিয়ে পাশের ঘরে মায়ের বিছানার পাশে চেয়ারে , আয়ার দিকে নজর রাখায় ব্যস্ত । তাই বিশাখা যখন তার মায়ের কাছে যেত রান্নাঘর অরক্ষিতই থাকতো । কিন্তু থ্যাংক গড ! পূর্ণিমা অতিশয়  নির্লোভ । বিশাখা হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ি ফিরে হাত পা ধুয়েই একটার পর একটা কৌটো খুলে গম্ভীর ভঙ্গিতে কিছু হিসেব-নিকেশ করে নিত  তারপর পাশের ঘরে মায়ের কাছে । মা তো তাকিয়ে থাকতো খালি , অভিব্যক্তিহীনা, করুণ, অসহায় চোখ ! বিশাখা মায়ের গায়ের চাদর সরিয়ে মায়ের নাভি বুক পেট দেখতো নিবিষ্ট ভঙ্গিতে তারপর আয়াকে জেরা । এখন তো আর বিশাখার জন্য আয়া লাগবেনা । যতটুকু যত্ন আত্তি করার জন্য বিশাখার মা এসে গেছেন !  তিনি থাকবেন দুমাস । তবে পূর্ণিমাকে পাওয়া যায়নি । রান্নার কাজ করার জন্যে ভারতী এসেছে । পূর্ণিমা রান্নার কাজ ছেড়ে ঘরে বসে গেছে । ওর বরের হার্টের অসুখ , দেখাশোনা কে করবে পূর্ণিমা ছাড়া ? অতনুর ঘোর ভাঙলো বিশাখার প্রশ্নে , “ কি হল ? কি ভাবছো বসে বসে ? আমার কথা কানে যায়নি ? 

—- আঁ ?

— ওঃ ! মা কি রোজ সকালে তোমাকে চা করে দিচ্ছে ,  নাকি তুমি নিজেই গ্যাসের শ্রাদ্ধ করছ ? যা কান্ড চলছে বুঝতে পারছি —  ওদিকে ভারতী আর এদিকে তুমি দুজনেই দাউ দাউ করে – বাড়ি ফিরেই গ্যাস বুক করতে হবে , বুঝতেই পারছি ।

 বিশাখার উদ্বেগের ধারে কাছে না গিয়ে যেন বহুদূর থেকে অতনু বলে উঠলো , “ তোমাকে বলা হয়নি , আর বলবোই বা কখন ? কাল বিকেল অব্দি তুমি ব্যথায় কাতরেছো !  পরশু পূর্ণিমা এসেছিল জানো ? 

 বিশাখা উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে বলল ,” তাই ? রান্না করবে ? ” 

— না । তা নয় । ওর হাজব্যান্ড তিন দিন আগে মারা গেছে ! 

— ইস ! কত কম বয়স বেচারীর ! হা ভগবান ! কোন বিচার নেই  !  

— হ্যাঁ !  ওর ছেলেটা তো দেখলাম আমাদের বিল্টুর চাইতেও ছোট !

—  হ্যাঁ ! তাইতো ! আমাদের বাড়িতে যখন বিপদ  তখন তো পূর্ণিমার ছেলে থ্রি কিংবা ফোরে পড়তো  ।  দেখলে মানে ? 

— পূর্ণিমা ছেলেটাকে সঙ্গে করেই নিয়ে এসেছিল , গলায়  কাছা — ইয়ে –

— ইস ! কেন এসেছিল ? শ্রাদ্ধের নেমন্তন্ন ? 

— ঠিক তা নয় ! শ্রাদ্ধই করবে তবে – ইয়ে — সাহায্য চাইছিল । 

—  কি সাহায্য ? 

— ওই – চিকিৎসায় প্রচুর খরচ হয়ে গেছে ! এদিকে পূর্ণিমাও তো প্রায় বছরখানেক ঘরে বসা , রোজগার ছিল না — এখন যাদের বাড়ী রান্না করত তাদের সবার ঘরেই যাচ্ছে ,সবাই তো দেবে না ,  , একশো  দুশো করে হয়তো দেবে । দু হাজার চাইছিল ।

— দিলে ?

— ইয়ে  – মানে — সেদিনই তোমার অপারেশন — এদিকে টেনশন –

 — কিসের টেনশন তোমার ! কাটবে তো আমাকেই ! ব্যথার ভয়ে আগের রাতে ঘুমোইনি । তুমি ঘোড়ার ডিমের টেনশনের ঢং কেন করছ ? হ্যাঁ ! টাকা খরচে টেনশন হতে পারে! এই টাকাটা তো পেয়েই যাবে । না  পেলেও আমি জানি এই টাকাটা তোমার কাছে কিছুই না । তুমি ওকে দু হাজার টাকা দিয়েছো কি না ?

— হেজিটেট করছিলাম —ইয়ে  দেড় মাস হয়ে গেল ! মাত্র সাতচল্লিশ পয়েন্ট জমেছে , একশো পয়েন্ট এখনো হলো না !  ফ্রি এলসিডি টিভি টা —! 

বিশাখা অধৈর্য হয়ে তার বেডে ঘুঁসি  মেরে ব্যথা ভুলে  লাফিয়ে নামে , অতনুর কলার খিমচে ধরে বলে , “ কি এত এলসিডি ,  এলসিডি করে হেদিয়ে মরছো ! তোমার তো আছেই একটা ।” 

—- ওটা কি আজীবন থাকবে নাকি ! খারাপ হবে না ? না হয় হলো না ,  আরেকটা যদি স্টকে থাকে ক্ষতি কি ?  সবচেয়ে বড় কথা ফ্রিতে পাচ্ছি ! ফ্রিতে সামান্য একটা চিনে মাটির কাপ পেলেও তুমি খুশি হও কিনা ? বিশাখা দুপাশে মাথা ঝাঁকিয়ে বলে , “ ওঃ ! আমি শুনতে চাই না ! আমার একটাই প্রশ্ন ,তুমি দু হাজার দিয়েছো কিনা ? ” 

—-  আরে ! ওকে তো কার্ড সোয়াইপ করে দেওয়া যাবে না ! দুহাজার দিলে তো দু পয়েন্ট আসে ! কিছু দিয়ে কোন রিটার্ন যদি না আসে — ইয়ে–

 যা শুনলো তা যেন বিশাখা বিশ্বাস করতে পারছিল না ! পরিবেশ পরিস্থিতি ভুলে হু হু করে কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়লো বিছানায় । খানিক পরেই একজন যুবতী দরজা ঠেলে কেবিনে ঢুকে বলল, “  পেশেন্ট বিশাখা রায়ের বাড়ির লোক আপনি তো ? রিসেপশনে ডাকছে আপনাকে ।” তারপর আঙুল তুলে বিশাখাকে দেখিয়ে বলল , “ ইজ এনিথিং রং উইথ হার ? ”

 অতনু ঢোক দিলে বলল , “ আমাদের খুব ক্লোজ একজন মারা গেছে কাল । শুনে এরকম–”

 মেয়েটি আশ্বস্ত হয়ে বলল , “ ম্যাডাম ! প্লিজ বি স্টেডি, ইউ আর নট সো ওয়েল । ইউ হ্যাভ টু চিয়ার আপ । ইটস রিস্কি ।”

অতনু  দৌড়োলো রিসেপশনে ।

হসপিটালের  সামনের লনে হুইলচেয়ারে অপেক্ষা করছিল বিশাখা । ফোলা চোখের কোণায় এখনো কান্নার জল লেগে আছে । অতনু তার গাড়ি এনে হুইলচেয়ারের পাশে দাঁড় করালো , তারপর তাড়াতাড়ি মাটিতে নেমে বাঁদিকে দরজা খুলে ধরলে বিশাখা বলল , “ না । আমি পেছনে বসব ।” অতনু বুঝল বিশাখার দৃঢ়তা টলানো যাবে না । বেশ ! না হয় আরো আস্তেই চালাতে হবে ।  ঝাঁকুনি তো লাগবেই , রাস্তার যা অবস্থা  “  এ মুহূর্তে তার বেশ ফ্রেশ লাগছে । না আঁচালে তো বিশ্বাস নেই শালাদের , শেষ মুহূর্তে হয়তো বলল , “ না স্যার ! আমাদের সোয়াইপিং মেশিনটা আজ আউট অফ অর্ডার সকাল থেকে । আপনি চেকেই  দিন ! ” রক্ষে বাবা !  সাতশো চল্লিশ টাকা নগদে দিয়ে বাকি  উননব্বই হাজার টাকা কার্ড সোয়াইপ করে সে পে করেছে । অতনু প্রতিমুহূর্তে আশা করছিল বিশাখার উৎকণ্ঠিত প্রশ্নটি , “ কত লাগলো ? ”  কি আশ্চর্য ! বিশাখা গম্ভীর হয়েই আছে  ! গাড়ি স্টার্ট করে ফার্স্ট গিয়ারে রেখেই পা দিয়ে আলতো করে ব্রেক চেপে ধরে গাড়ি গড়ালো সে । টুংটাং করে জলতরঙ্গের বাজনা বেজে উঠল তার বুকে , মানে জামার বোতাম খুলে গলিয়ে রাখা ট্যাবটিতে কেউ কোন বার্তা পাঠিয়েছে । রাতে শোবার আগে দেখা যাবে । ঘাড় না ঘুরিয়ে গলা তুলে বলল , “ ঝাঁকুনি লাগলে বলবে ।” গাড়ি গড়াতে থাকলো ।  আর  পনেরো মিনিট । দূর শালা ! সামনে লম্বা মিছিল যাচ্ছে ! রাজ্যের উন্নয়নের স্বার্থে মিছিল ! ‘সমস্ত রকম অপপ্রচারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করুন !’ বোগাস ! বসে থাকো এখন দশ মিনিট ! ট্যাবটি বের করে হাতে নিল সে , গোটা কয়েক ফোনই করা যাক  ! ও! একটা মেসেজ এসেছিল না ? খুলে দেখে , “ কনগ্রাটস ফর স্পেন্ডিং  এইট্টি নাইন থাউজেন্ড । পয়েন্টস আর্নড এইট্টি নাইন । তোমার ব্যালেন্স অব পয়েন্ট এখন মোট  ওয়ান থার্টি টু । নিকটবর্তী ম্যাক্সিম ব্যাংকটিতে গিয়ে তোমার গিফটগুলি কালেক্ট করে নিতে পারো অথবা জ্যাকপট গিফটের জন্য…. ” যাক বাবা ! এলসিডি টিভিটা হতে বেশি দেরি নেই ! হাসিমুখে পেছনে ঘাড় ঘোরালো সে , বিশাখাকে সুখবরটা দেওয়া যাক !  কিন্তু একি ! বিশাখার দুচোখে জলের ধারা , পেছনের সিটে হেলান দিয়ে দুচোখ মুদে রেখেছে সে !  মাত্র তো পাঁচ মিনিট গাড়ি চলেছে ! ঝাঁকুনির তো কোনো প্রশ্নই নেই ! ডানদিকের দরজা খুলে মাটিতে নেমে ঘুরে বিশাখার খোলা জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো সে । ভেতরে মাথা গলিয়ে খুব নরম কণ্ঠস্বরে জিজ্ঞেস করল , “ ব্যথা লাগছে ?”



অলংকরণঃ তাইফ আদনান