জলধি
/ কবিতা
/ সফেদ বিহানের তিনটি কবিতা
সফেদ বিহানের তিনটি কবিতা
কূলহীন জলধি
কূলহীন জলধিতে ভাঙা তরী ভাসে,
ঢেউয়ের আঘাতে হাল ভেঙে পড়ে শেষে।
দূর দিগন্তে নামে ঘন কালো আঁধার,
জলধির বুকে ডুবে সব অধিকার।
দুঃখের বাতাস বয় বেদনার স্রোতে,
স্মৃতির শুকনো পাতা ভাসে হৃদয়পাতে।
দৃষ্টির সীমানায় জল ছুঁয়ে যায় আকাশ,
বিষণ্নতার রঙে ভরে ওঠে নিঃশ্বাস।
অদৃশ্য বিরহে কাঁপে শরীর আর বুক,
সাথীহীন দরিয়ায় ভাসে প্রিয় মুখ।
মনে পড়ে যারা ছিল পাশে একদিন,
দূরের বাতাস হয়ে ডাকে নিশিদিন।
প্রাণ ভরে দিয়েছি যাদের একদিন,
আজ তারা ভুলে গেছে—আমি এখন অচিন।
জীবনের বাঁকা পথে চলেছি কত দূর,
এইসব স্মৃতিতেই বুঝি বুক ভেঙে চুর।
এ কেমন বিভীষিকা, এ কেমন প্রতিদান,
এপারের মোহমায়া বিষাদময় বাণ।
অতীতের রেখাগুলো ঢেউ হয়ে আসে,
পাপের ভারে বুক ভেঙে যায় শেষে।
শূন্য হৃদয় নিয়ে ডুবে যায় তরী,
সব কিছু হারিয়েছি—হারিয়েছে জীবনের কড়ি।
ভয় আর আতংকে জলের ভেতর,
সমস্ত শরীর কাঁপে ভয়ে থরথর।
তবুও এনেছি দু’ফোঁটা হৃদয় নিংড়ে জল,
অনুগ্রহে নিভে যদি ব্যথার অনল।
সঁপে দেব হৃদয়জল, আর কিছু নেই,
ক্ষমা করো প্রিয়—শেষ অশ্রু এই।
ব্যথার ঢেউ
ভেতরে আজও থেমে নেই ব্যথার ঢেউ—
অচেনা জল এসে
হৃদয়ের দেয়ালে ভাঙন তোলে।
চোখের কোণে জমে থাকা নীরবতা
বিন্দু হয়ে ঝরে পড়ে প্রতিরাতে,
তবু ভেজা দৃষ্টি
নিজেকেই আর চিনতে পারে না।
বুকের ভেতর ভাঙা কাঁচের মতো
অকথিত সব শব্দ
নিঃশব্দে কেটে দেয় সময়।
ঢেউ থেমে গেলে শুধু থাকে
ফাঁকা ঘরের প্রতিধ্বনি—
যেখানে সম্পর্কগুলো
শব্দ হয়ে বাতাসে মিলিয়ে যায়।
অন্ধকারে বাজে এক অচেনা সুর,
যার প্রতিটি টানে
স্মৃতি নিজেই ক্ষত হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন জাগে—
এই সুর কি স্মৃতি,
নাকি ভাঙারই অভ্যাস?
তারা কি সত্যিই সার্থপর ছিল,
নাকি সময়ই সম্পর্ককে
নিঃশব্দে আলাদা করে দেয়?
বাতাস বয়ে যায় নির্বিকার,
তার ভেতর লুকিয়ে থাকে
মানুষের রেখে যাওয়া অহংকার।
হয়তো নিয়ম এটাই—
সব সম্পর্ক শেষ হয়
কোনো শব্দ না রেখে।
তবু আমি শিখে যাই—
ভাঙা সময়েও
হৃদয়ের এক কোণে
প্রেমের আলো রোপণ সম্ভব।
বাতাসের ফুল
ভোর নামে; ঘরের কোণে
নিঃশব্দে জেগে ওঠে জবা গাছ।
জানালা খুলে দেখি—
হলুদ পাপড়ির ভেতর
লুকিয়ে আছে রক্তের মতো লাল।
দখিনা বাতাস লাগে,
পাপড়ি দুলে ওঠে ঢেউয়ের মতো।
নববধূর লাজে
নরম হয়ে আসে ফুল।
প্রজাপতির ছোঁয়ায়
নীরব হয়ে আসে সে।
বাতাসের সাথে উড়ে আসে
এক রঙিন প্রজাপতি,
এসে বসে ফুলের বুকে—
কখনো পাপড়িতে।
উড়ে যায়, তবু
অদৃশ্য টানে ফিরে আসে।
মনে হয় বাতাস তাদের ঘটক।
আর মানুষ—
সে কি শোনে হৃদয়ের ডাক,
নাকি মোহেই ফুরিয়ে যায় বেলা,
প্রেমকে খুঁজেই পায় না সে।
সকালে ফোটে ফুল,
ঝরে যায় সন্ধ্যায়;
তবু নিজেকে বিলিয়ে
সুন্দর হয়ে ওঠে
তার মৃত্যু।
তবু
ফুল, প্রজাপতি আর বাতাস
ডেকে যায় নিরন্তর—
প্রেম থেকেই যায়,
যে তা শুনতে জানে,
তার জন্য।
অলংকরণঃ তাইফ আদনান
