জলধি / কবিতা / শাকেরা আহমেদের পাঁচটি কবিতা
Share:
শাকেরা আহমেদের পাঁচটি কবিতা
উনিশে এপ্রিল
 
আমিতো কেবল মানুষের কাছেই যেতে চাই। কেননা মানুষ মানুষের জন্য এখনো ভাবে। চিত্ত যদি না যাচে তো কী কাজ টঙ্কায়? তাইতো আসন্ন পঁচিশের জন্মদিন মিশে যায় আসন্ন পঞ্চাশে। গড়ে ওঠে এক অনন্য জোড়াসাঁকো।
 
জন্মদিন রিক্সা করে ঘুরে বেড়ায় ডিসি অফিস,সার্কিট হাউস,লেডিস ক্লাবের পথ ধরে। বকুল-ফুল নুপুর পায়ে ঘুর পথে হেঁটে যায় চানমারি, কমলাপুরের বটতলা ধরে। অনাথের মোড় হয়ে বসে পড়ে জুবলি ট্যাঙ্কের পুকুর পাড়ে। মেরুন রঙা আঁচল ছুঁয়ে সন্ধ্যার মুগ্ধতা উপুড় হয় কাজলা জলে। দিগন্ত রেখায় চিত্রিত হয় উনিশে এপ্রিল ; আমাদের আফসানা। হাতছানি দেয় অনাথের আচার, চিকেন উইদ গার্লিক নান। কফিটা জঘন্য হলেও ভালো লেগেছিল। কেননা তা ছিল উল্লাসময়। অবশেষে জন্মদিন কুমারের বুকের 'পরে দাঁড়িয়ে শীতলতায় সিক্ত হয়। আমরা পাশাপাশি, ঈষৎ ঘনীভূত। চেয়ে আছি জলের তলায় চন্দ্রকলায়। 
 
মোহগ্ৰস্ত চোখে তবু বিচ্ছুরিত হয় তোমার মুখের শেহনাই।

আমার মা 
 
বিচিত্র কষ্ট এসে ভীড় করে ও টি–র দরজায়। কষ্টেরা হাঁটে–চলে,ভাত খায়। গল্পে গল্পে হেসেও ওঠে। কোনো কোনো কষ্ট আবার জানালার গ্রিলে কপালে ঠেকিয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে। সবচাইতে উজ্জ্বল নক্ষত্রটি খসে পড়ার স্তব্ধ সময়ে নভমণ্ডল ছেয়ে যায় নিকষ অন্ধকারে। 
 
আব্বাকেে কখনোই জড়িয়ে ধরিনি। অথচ,সময় আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। রাতচরা পাখি ডাকলে আব্বার কথা মনে পড়ে; মা-র জন্য ভয় লাগে।
 
দরকার ছাড়া মা'র সাথে আমার কোনোদিনই অন্তরঙ্গ কথা হয়নাই। যেটুকু হইতো তাও টুটকা ফাটকা। আজকাল তা-ও হয় না। 
 
আব্বার সাথে মা'র ভালোবাসা কোনোদিন দেখিনাই।তাও আজকাল আব্বা ছাড়া মা নিশ্চুপ সচল মূর্তি। বৈশাখের বলকানো গরম গেল, গেল আষাঢ়-শ্রাবণের ঢলাঢল বিষ্টি,মা চুপ। টিনের চালে আগনের নিয়ার পড়ে টুপটাপ, মা তা-ও চুপ।
 
অক্টোবরের মতোই হিমহিম 
জীবনানন্দের মতোই বিষন্ন সুন্দর।

পুরা দুঃখ অর আধা চাঁদ 
 
বহুদিন অধোরোষ্ঠে তোমার চুমু পড়েনি প্রিয়। মধ্যযামিনী থেকে নিশি ভোরের প্রহর গননের শ্রম বড্ড অমেয়।
 
আজকাল শুক্রবারটাও ভাজা ভাজা করে খেতে শুরু করেছি। সকালটাকে খেয়ে ফেলি মুড়ি মুড়কির মতো। পুরান ঢাকার কাচ্চির আবেশে রাতের ঘুম নেমে আসে।
 
বাদ যায় না সপ্তাহের একটা দিনও।
 
ভালো নেই মল্লার, সত্যি ভালো নেই। একটা কণ্ঠ থেকে কতটা মায়া ঝরে পড়লে ভালো লাগার আবেশে বুকটা মুচড়ে ওঠে আর দুচোখ ভেসে যায় নোনা জলে! তোমার কথার, লেখার,ভাষা–ছন্দের নকশিকাঁথা গায়ে জড়িয়ে তোমার আবেশি কণ্ঠের উপাধানে মুখ গুঁজে পড়ে থাকতে ইচ্ছে হয়। কী এক অনুভূতি! কাছে পাবার ইচ্ছে নেই, চোখে দেখার ইচ্ছে নেই, একটা হলুদ খাম খোলার অনুভূতি বিশাল নদী আর জনসমুদ্রের ওপার থেকে টেলিফোনে কথা বলা,বন্ধু মহলে রিসিভার নিয়ে কাড়াকাড়ি,কী কথা হয় আড়ি পেতে শোনার একাগ্ৰ প্রত্যাশা। নুড়ি পাথরের মতো অজস্র ভুলের নষ্ট শশার মতো অতীতকে ছুঁড়ে ফেলে বন্ধু প্রিয়তর এসোনা গড়ে তুলি সুন্দর ভবিষ্যৎ। ছুঁয়ে দেখি সুন্দরের অমল আঙ্গুল!

আপনে ইশক মে সাচ্চা চাঁদ 
 
কিছু কিছু ভোরের গায়ে বিষন্ন রোদ লেগে থাকে।
তবুও মায়ায় জড়িয়ে যাই। রয়ে যায় ছিটে ফোটা তবুও। উপদ্রুত মন নাগরিক বেদনা–বিনাশি শান্তি পেতে খোঁজে প্রাগৈতিহাসিক বন। গভীর থেকে গহীনে বিচরণ–পরিশ্রান্ত পায়ে পললের ঘুম নেমে আসে। শ্রমণ–ধ্যান ভাঙে কালিক কর্কশ স্বরে।
 
জীবন তুমি কোন সায়রে ডোবো, কোন আসমানে শোভা পাও?
 
এখন বাই এয়ারমেইল খাম দেখলে মনে হয় একটা চিঠি আসার কথা ছিল। গোলাপ ঝরতে দেখলে মনে হয় এটা তোমাকে দেয়ার কথা ছিল। এক ভীষণ দুঃসময়ের ভিতর দিয়ে সাঁতরে চলেছি এই আমি। যেকোনো গাড়িতে হলুদ শাড়ি পরা নারী দেখলে মনে হয় তোমার সাথে দেখা হবার কথা ছিল বৃন্দাবনের মাঠ অথবা গোলপুকুরের মোড়ে।
অথচ কিছুই হয় না। হেমন্তের ফসল কাটা মাঠের মতই সব দিক খাঁ খাঁ করে। 
 
ঝাঁঝরা দুপুরে একাকী হেঁটে যাই আমি।

দিল তো বাচ্চা হ্যায়
 
হৃদয় তো কথা ভুলে বসে থাকে
তুমি চুপ হয়ে গেলেই কথা কয়।
 
হাতের চেটোয় রেখে গাল আমি তোমার কণ্ঠের প্রগলভতা মাপি। চোখের কাজল,কাঁচের চুড়িতে বাজে ফাল্গুনী কোমল গান্ধার। অভিমান ফিকে হয়ে গেলে কতটা রঙ আর ধরে রাখে অনুরাগ! বুকের ভেতরের কথারা কড়া নাড়ে বন্ধ শব্দের দরজায়।
 
প্রত্যাখান তবু সয়ে নেয়া যায়। উপেক্ষা বড় বেশি পোড়ায়। ব্যস্ততর এক সন্ধ্যায় আমি তো কেবল তুমি নামক একটা কবিতা পড়তে চাইছিলাম। সোয়া পাঁচটার এসএমএসে বলতে চেয়েছিলাম,নাগরিক কোলাহল পেরিয়ে চলো তোমাকে নিয়ে যাই কোনো এক নির্জন বনে। যেখানে পাতার মর্মরে বাতাসে ধ্বনিত হবে তিলক কামোদে আরোহণ অবরোহন,পকড়। তৈরি হবে এক আশ্চর্য সুরের মূর্ছনা। 
 
দিল তো বাচ্চা হ্যায়।


অলংকরণঃ তাইফ আদনান