জলধি / কবিতা / মারুফ আহমেদ নয়নের পাঁচটি কবিতা
Share:
মারুফ আহমেদ নয়নের পাঁচটি কবিতা

মৃত্যুমুখী আপেল

তোমাকে ভুলে গেলে পাখিজীবন লাভ হতো।

পশুপর্যবেক্ষকের চাকরি ছেড়ে

লোকালয়ে ফিরে যেতাম।

মুক্তির আনন্দে টহল দিই বনপ্রান্তে।

দেখি, হাতিরা জিপিএস ট্র্যাকার লাগিয়ে ঘুরছে।

সজারুরা লুকাচ্ছে কাঁটার পেখম

যেমন তুমি লজ্জাবনত হয়েছিলে।

তোমার শরীরে ফুটে উঠেছিল

বিবাহরঙহলুদ সুষমার আঁচড়।

তারপর থেকে দলছুট হায়েনার মতো লাগে

যেন ভুলেছি আহার শিকার।

সেই বিচলিত ডাক তাড়া করে ফেরে

যেন তোমার প্রেম।

হাতিদের দলে মিশে যাই,

ফলবতী বৃক্ষ ঝাঁকাই।

ঢলে পড়ি ঘুমে।

তুমি এসে জিজ্ঞেস করো প্রিয় বস্তুর নাম।

আমি বলিসেই মৃত্যুমুখী আপেলের বীজ।


লাল ঘোড়া, লাল দানব

গোল্ডফিশের মতো ভুলে যাই সবকিছু।

তুমি কবে ছুঁয়েছিলে হাত, মনে পড়ে না।

একুরিয়ামে ডুবে যাই, রিং পেরোই,

খাদ্য খুঁজি। ভাবিভ্রাম্যমাণ ব্ল্যাক হোল

যদি পৃথিবীর পাশে এসে দাঁড়ায়,

ধ্বংসের লীলায় মগ্নতা কেমন হবে?

সূর্য গ্রহগুলো গ্রাস করে ফেলছে, আর

পৃথিবীতে ঝরছে আদিম উল্কাবৃষ্টি।

হয়তো এমন দিনে ডাইনোসররা ধ্বংস

হয়েছিল। তোমার প্রেমে ধ্বংস হই।

বলি মহাবিপর্যয়ের কথা

সুপারনোভা বিস্ফোরণের মতো ছড়িয়ে

পড়ি যেন পরমাণুর ক্ষুদ্র কণা।

কেবল তোমাকে ভালোবেসে হয়ে উঠি

লাল ঘোড়া, লাল দানব।


সম্পর্ক

তোমার সঙ্গে আমার কেমন সম্পর্ক ছিল

প্রশ্ন করে শুশুকেরা।

বলি, ঘাতক তিমিদের মধ্যে যেমন বন্ধুত্ব হয়

খাদ্য শিকারের তথ্য আদান-প্রদান করে।

আমাকে ভালোবেসে তুমি হিংস্র করে তুলেছিলে।

একটি সীল মাছের ঘাড় ভেঙে পান করেছিলাম রক্ত।

ভালোবেসে তোমাকেও অপরাধী করে তুলি।

পাখির পালকের তাজ পরে নাচি।

দেহে কাঁপে পাম পাতার আঁশ।

পান করি আয়াহুয়াস্কার পানীয়।

যখন তোমাকে দেখি, খোঁপায় গুঁজেছিলে বুনো ফুল।

তারপর থেকেই আমার যন্ত্রণাভোগের শুরু।

তোমাকে চুলাচাকি ভেবে ভ্রম হয়।

সামনে দাঁড়িয়ে বলি

আমাকে তোমার প্রেমের নামে কতল করো।


মালবেরি উদ্যানে

দেহ রূপান্তর হয়েছিল মালবেরি উদ্যানে,

ছড়িয়েছিল শেকড় মাটির গভীরে।

অরণ্যে হেঁটে গিয়েছিল সে

যেন শীত বসন্তে রূপান্তর হয়েছে।

এমন দিনে প্রেমে পড়েছিলাম তোমার;

যেন আকাশ ভ্রমণ করছিলাম মেঘে মেঘে।

তুমি ক্রমশ অহংকারী হয়ে উঠছিলে

যেমন পাফার ফিশ ক্রোধে শরীর ফুলিয়ে তোলে।

তখন তোমাকে স্ত্রী-গরিলার মতো লাগছিল,

যে পাহাড়ের চূড়ায় চলে গিয়েছিল একাকী।

মনে পড়ে, হরিণদের মধ্যে মিশে গিয়েছিলাম,

চিবোচ্ছিলাম ঘাস দুলকি চালে হাঁটছিলাম।

বাঘিনীর মতো জিজ্ঞেস করলে মাংসের ছায়া।

উত্তর দিলাম— “নির্বোধ খরগোশছানার মতো।

আমাকে হত্যা করলে, বললে

কেন রাজহংসীর সাথে জলাধারে গিয়েছিলে?

যখন সে নগ্ন হয়েছিল, তার মধ্য হতে অজস্র

রাক্ষসী দৌড়ে পালিয়েছিল। সেকথা কেন

জনসম্মুখে বলেছিলে?”


কঙ্কর বিনিময়

গোলাপবনে রক্তাক্ত হলো প্রিয় পায়রা,

কে জানেকুঁড়িতে ধুতুরাফুলের মদিরা।

চিরকাল শুনি

তোমার প্রেমের সিনথেসাইজার বাজাচ্ছে বাদক;

সুরে সুরে গাইছে

অ্যান্টার্কটিকার কোনো এক দ্বীপে

পেঙ্গুইনরা কঙ্কর বিনিময় করছে।

তুমি ফুলের বদলে কাঁটার আঘাত করেছিলে;

মধু ভেষজ উদ্ভিদের বিনিময়ে

পেয়েছিলাম তীরের নকশা। জানি

চিরকাল তোমার প্রাণনাশের বাসনা,

যেরূপ পতঙ্গের মধ্যে দেখা যায়

ড্রাগনফ্লাই ড্যামসেলফ্লাইদের দাম্পত্যে।

বৃক্ষবাসী পাখিদের কলহে

স্পষ্ট হয়ে ওঠে দূরের চিম্বু গ্রাম।

আমাকে ভীত করতে তুমি পড়িয়েছিলে ভূতের সাজ;

দেহে ভয়ংকর আলপনায়

ঘটিয়েছিলে হ্যালুসিনেশন।

যতবার বলিথেকেভালবাসি’,

তোমার কাছ  প্রতিধ্বনিত হয় ঘৃণা।

ততবার মনে হয়

একটি হরিণকে বেয়নেটে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে

হত্যা করছে শিকারি।



অলংকরণঃ তাইফ আদনান